«

»

Jun ১৫

কোরানের কথা-৩২,সুরা বাক্বারা,১৮৩-১৮৮,রুকু-২৩

সাধারনতঃ ইবাদত দুই প্রকারে হয়ে থাকে, শারীরিক ও অর্থনৈতীক। রোজা শারীরিক ইইবাদের অন্তর্ভুক্ত। নামাজ অপেক্ষা রোজা কঠিনতর ইবাদত। কোন কঠিন কাজে অন্যের সহযোগীতা বা আর কেউ করেছে শুনলে, মনে সাহসের সঞ্চার হয়। তাই রোজার ঘোষনার সাথে, আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী উম্মত গনের উপর রোজা ফরজ ছিল বলে সাহস দেবার চেষ্টা করছেন। পবিত্র কোরানে অন্যান্ন ইবাদত বা শরিয়তের বিধান গুলি বভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ণনার মাধ্যমে পূর্নাঙ্গ হয়েছে, কিন্তু রোজার বিধি বিধানগুলি এই রুকুর ছয়টি আয়াতের মাঝেই পরিপূর্ণ করা হয়েছে।

প্রথম দুটি আয়াতে মূলতঃ সাবেকা উম্মতের রোজার কথাই বলা হয়েছে। মক্কার লোকদের শরিয়ত ছিলনা, তাই তারা শরিয়তে অজ্ঞ ছিল। অবশ্য তারা ঘোড়াকে রোজা রাখাতো,অর্থাৎ অনাহারে দীর্ঘ সময় থাকার অভ্যাস করাতো। কারণ মরুভুমিতে কাফেলা লুট করা তাদের পেশার অংশ ছিল। উট মরুভূমির বাহন। কিন্তু উটদিয়ে একাজ সুবিধা হয়না। চাই দ্রুতগামী বাহন। ঘোড়া দ্রুতগামী, কিন্তু মরুভূমীর কষ্ট ও অনাহার সইতে পারে না। তাই তাকে অভ্যস্থ করানো হত। হুজুর সঃ যখন মদীনায় এলেন, দেখলেন ইহুদীরা রোজা রাখে। প্রতি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে। রসুল সঃ সেই সঙ্গে আশুরা বা ১০ তারিখ যোগ করে রোজা রাখতেন।

১৮৩/ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَঅর্থাৎ;-হে ইমানদার গন, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরুপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার। পূর্ববর্তী উম্মতের রোজার ধরণ ভিন্ন ছিল। ইফতারের পর ঘুমানোর পরই পরের দিনের রোজা শুরু হত। অর্থাৎ রাতও রোজার মধ্যে শামিল ছিল। ‘কামা কুতেবা’ বলে রোজার ফরজিয়ত ও তাকওয়া অর্জনের ব্যপারটিই বলা

১৮৪/أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ অর্থাৎ;-গননার কয়েকটি দিনের জন্য, অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে বা সফরে থাকবে, তাকে অন্য সময় পূরণ করে নিতে হবে, এতে সামর্থবান ফিদিয়া স্বরূপ মিসকীনকে খাদ্য দেবে, যে ব্যাক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যান কর, আর যদি রোজা রাখো তা তোমাদের জন্য কল্যানকর, যদি তোমরা তা জানতে। ‘মায়দুদাত’ শব্দটি ‘জমা কিল্লাত’ এর কার্য্যকারিতা ৯ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে সাবেকা উম্মতের প্রতি মাসে ৩ দিন রোজার কথাই বলা হয়েছে। ‘ইয়ুতীকুনাহু’ অর্থ সমর্থ। রোজাও ফিদিয়া দুটোতেই সামর্থ আছে এমন লোকেরা ফিদিয়া দিলেই আদায় হত, তবে রোজা রাখাই উত্তম। আবার উভয়টিই আদায় অতি উত্তম বলা হয়েছে। পরবর্তী আয়াত নাজিলের দ্বারা এ নিয়মের অবসান হয়। রসুল সঃ এর কিছু অংশ বাকি রেখেছেন, রোজায় অসমর্থ ব্যাক্তি মিসকীনকে খাদ্য দিয়ে রোজার হক আদায় করতে পারবেন। আদি কালে সফর অনেক কষ্টকর ছিল, তাই মুসাফীরের জন্য সফর শেষে কাযা রোজা করার বিধান করা হয়েছে। পায়ে হাঁটা মুসাফীর তিন মঞ্জিল যাবার পর, মুসাফীর বলে গন্য হবেন, বিশেষজ্ঞ গন এমন মত দিয়ে থাকেন। বর্তমানে কার, ট্রেন, বিমানে ভ্রমন মুসাফীরের জন্য এ বিধানের কার্য্যকারিতা বিবেচনার দাবী রাখে।

১৮৫/شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلاَ يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُواْ الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ اللّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَঅর্থাৎ;-রমজান মাসই হল সেই মাস,যাতে কোরান অবতীর্ন করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও আন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী, কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এমাসটি পাবে,সে এমাসের রোজা রাখবে, আর যে অসুস্থ বা মুসাফীর অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গননা পূরণ করবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, জটিল করতে চাননা, যাতে তোমরা গননা পূরণ কর, আর হেদায়েত দান করার জন্য আল্লার মহত্ব বর্ণনা কর, আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। এ আয়াতের দ্বারা মদুদাত দিনের রোজা রহীত করে রমজান মাসের রোজায় সীমাবদ্ধ করা হল। প্রতি মাসে ৩ দিনের বদলে একত্রে মহীমাময়, ফজিলতের মাস, রমজান মাসে একত্রিভূত হল। অতএব, যিনি রমজান মাস পাবেন, তিনিই রোজা পালন করবেন। আল্লাহ সহজ করতে চান, এই অজুহাতে সুবিধামত মাসকে রোজার মাস পালন করার কোনই অবকাশ নেই।

১৮৬/وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُواْ لِي وَلْيُؤْمِنُواْ بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ অর্থাৎ;-আর যখন আমার বান্দা আমার ব্যপারে, তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, আমি সন্নিকটেই রয়েছি, যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করি, কাজেই আমার হুকুম মান্য করা ও আমার প্রতি বিশ্বাস করা একান্ত কর্তব্য, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে। আল্লা বলেন তিনি অতি নিকটেই রয়েছেন। প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা তাৎক্ষনিক ভাবে কবুল করেন।কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। এব্যাপারে ১৮৮ নং আয়াতে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এ আয়াতেও বলাহয়েছে,আমাকে মান্য করো ও আমার প্রতি ইমান আনো। এ শর্ত আমরা স্মরণে রাখিনা তাই আমাদের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন।

১৮৭/أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَآئِكُمْ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ عَلِمَ اللّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْ فَالآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُواْ مَا كَتَبَ اللّهُ لَكُمْ وَكُلُواْ وَاشْرَبُواْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّواْ الصِّيَامَ إِلَى الَّليْلِ وَلاَ تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُودُ اللّهِ فَلاَ تَقْرَبُوهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَঅর্থাৎ;-রোজার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রীসম্ভোগ বৈধ করা হল, তারা তোমাদের পরিচ্ছদ, তোমরা তাদের পরিচ্ছদ, আল্লাহ অবগত আছেন যে, তোমরা পরষ্পর গোপনে যাকরতে, তিনি তোমাদের দিকে ফিরেছেন এবং ক্ষমা করেছেন, সূতরাং এখন তাদের সাথে সঙ্গত হও, এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর, আর পানাহার কর যতক্ষন না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখাযায়, অতঃপর রোজাপূর্ণ কর রাত পর্য্যন্ত, স্ত্রীদের সাথে মিশোনা যতক্ষন মসজিদে ইতেকাফে অবস্থান কর, এই হল আল্লাহ প্রদত্ত সীমানা, অতএব এর কাছেও যেওনা, এভাবেই আল্লাহ তার আয়াত সমুহ বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাকওয়া অর্জন করতে পারে। সাবেকা উম্মতের রোজার ভিতর রাত শামিল ছিল তাই তাদের স্ত্রীসম্ভোগে বিরত থাকতে হত। উম্মতে মোহাম্মদী সঃ এর জন্য রাতকে রোজার বাইরে ও স্ত্রীসম্ভোগ বৈধ কর হল, কোন কোন সাহাবী স্ত্রীসহবাসের পর নিজেকে অপরাধী মনেকরে কুন্ঠিত হতেন, তাদের কুন্ঠা দূরীকরণের জন্য এ আয়াতের মাধ্যমে, ইতেকাফ বা রোজার শেষ দশকে, একান্ত চিত্তে মসজিদে অবস্থান বাদে অন্য রাতে সম্ভোগ বৈধ করা হলও অহেতুক সন্দেহ দূর করে, স্বামী স্ত্রী উভয়ে উভয়ের অতি নিকটজন, ঠিক পোষাকের মত বলা হল। সেই সঙ্গে রোজার দুই প্রান্ত বলে দেওয়া হল।

১৮৮/وَلاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُواْ بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُواْ فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ অর্থাৎ; তোমরা অন্যায় ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ কোরনা, অন্যের ধন সম্পদের অংশ বিশেষ জেনে শুনে অন্যায় ভাবে গ্রাস করার জন্য বিচারকের কাছে পেশ কোরনা,  জীবন ধারণ ও বংশ বিস্তারের জন্য মানুষ পশু নির্বিশেষে তিনটি জিনিষ অত্যন্ত প্রয়োজন, তা হল খাদ্য, পানীয় ও যৌন প্রবৃত্তি। কিন্তু মানুষের বেলায় আরও একটা প্রয়োজন প্রকট হয়ে দেখা দেয়, তা হল সম্পদের আকাঙ্খা। আকাঙ্খার বশবর্তী হয়ে মানুষ ক্রমশঃ সৎ পথ ত্যাগ করে, অসৎ পথে সম্পদ আহরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে চুরি-ডাকাতী, সূদ-ঘুষ, তহবীল তসরুপেও মত্ত হয়। অনেক সময় অন্যায় ভাবে অন্যের সম্পদ গ্রাস করার জন্য, প্রভাবশালী বা বিচারককেও ঘুষের দ্বারা প্রভাবিত করে। শুধু মাত্র শুকরের মাংস ও মদকে হারামের তালিকায় রেখে আর গুলোকে মুছে ফেলে। অসৎ পথে অর্জিত মালও হারাম। হারাম খাদ্যও তদ্বারা ক্রীত পোষাক, ‘আমি বান্দার অতি নিকটে ও প্রার্থনা কারীর প্রর্থনা তাৎক্ষনিক ভাবে কবুল করি’ আল্লার এ উক্তির পরও দোওয়া কবুল না হওয়ার এটাই কারণ। হজরত সাদ ইবনে আবি যতখন চল্লিশ দিন পর্য্যন্ত তার কোন আমল কবুল হয়না। যে শরীরের মাংস হারাম মাল দ্বারা গঠিত, সে শরীরের জন্য জাহান্নামের আগুনই যোগ্য

শরীরকে শুদ্ধি করার জন্য দিনে রোজা ও আল্লার নৈকট্য লাভের জন্য চাই রাতে ইবাদত। আহার্যের জন্য চাই সৎপথে অর্জিত আহার। তবেই আত্মার শুদ্ধি ও আল্লার নৈকট্য লাভ সম্ভব।—-চলবে—-

২ comments

  1. 2
    Abdus samad

    জনাব শামস ভাই,
    আমি বলেছি ‘স্বাধারণতঃ’ দুই ভাগ। আমরা টাকা পয়সার দ্বারা যা ভাল কাজ করি তা অর্থ সমপর্কিত, যেমন দান খয়রাত,পরিবার পরিজনের পালনও এর মধ্যে পড়ে। নামাজ রোজা, শারিরীক এবাদত। হজ্ব আবার দুটোর সমাহার। এখন জিকির, বা মনে মনে কোন ইবাদত, এমনকি পরিবার পরিজনের সাথে ভাল ব্যবহার ও তো ইবাদতের মধ্যে পড়ে। এগুলো অবশ্যই শরীর সম্পর্কিত। তাই নয়কি? প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ভাব, এটাও ইবাদত, এটাও আপনার ব্যাক্তি বা শরীরের সাথেই তো সম্পর্কিত। ভাল থাকেন।ধন্যবাদদ।

  2. 1
    শামস

    সামাদ ভাই,
    আমার কিছু প্রশ্ন ছিল ক্ল্যারিফাই করতে চাই।

    আপনি বলেছেনঃ <সাধারনতঃ ইবাদত দুই প্রকারে হয়ে থাকে, শারীরিক ও অর্থনৈতীক।>

    আপনার লেখার কনটেক্সট অনুযায়ী ইবাদতের যে শ্রেনীবিভাগ করলেন তা ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল ইবাদত কি আসলেই দুই প্রকার।  আপনি যদি নামায রোযার বাইরে মনে মনে আল্লাহকে ডাকেন সেটা কোন ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত হবে, “আধ্যাত্নিক ইবাদতের”
    আপনি প্রতিবেশীর সেবা করলেন সেটাও কি ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত না? তাকে কোন ইবাদত বলা হবে?

    ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.