«

»

Jun ১৯

কোরানের কথা-৩৩,সুরা বাক্বারা-১৮৯-১৯৬,রুকু-২৪

রসুল সঃ এর মক্কী জীবনে, ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায়, নও মুসলীমদের উপর যে অমানুষীক অত্যাচার হয়, তা সবারই জানা। সামনে সমূহ বিপদ জেনেও সত্যের পথে তারা বিন্দু মাত্র পিছপা হননি। ধৈর্য্যের প্রান্ত সীমায় দাঁড়িয়েও অনেকে শাহাদত বরণ করেছেন, কিন্তু কেউ কোনদিন কোন প্রতিবাদ করেননি। এ ব্যাপারে রসুলের সঃ কাছে অনুযোগের উত্তরে, সুরা ‘আনকাবুতের’ দ্বিতীয় আয়াতে আরজ হল;-‘ইমান এনেছি বললেই হবেনা, তাকে পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হবে’। অন্যত্র বলাহল, ‘কুফ্ফু আইদিয়াকুম’-তোমাদের হাতগুলো বেঁধে রাখতে হবে।সুরা বাক্বারার ১৫৫ নং আয়াতেও ধৈর্যের পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। সেই ধৈর্যের শেষ, হাতের বাঁধন উন্মুক্তের সুখবর, যুদ্ধের প্রস্তুতি ও হজ্বের নিয়ম কানুন নিয়ে আসছে রুকু ২৪।

১৮৯/يَسْأَلُونَكَ عَنِ الأهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَنْ تَأْتُوْاْ الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا وَلَـكِنَّ الْبِرَّ مَنِ اتَّقَى وَأْتُواْ الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ অরথাৎ;-নতুন চাঁদের বিষয়ে তোমাকে তারা জিজ্ঞেস করবে, বলে দাও যে, এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ এবং হজ্বের সময় ঠিক করার মাধ্যম(ক্যালেণ্ডার), আর পিছনর দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করায় কোন পূন্য নেই, অবশ্য পূন্য হল আল্লাহকে ভয় করার মধ্যে, আর তোমরা ঘরে প্রবেশ করো দরজা দিয়ে এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতকার্য্য হতে পার। ইসলামের ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলি চাঁদের সাথে সম্পর্কযুক্ত, চাঁদ দেখে সাধারণ ভাবে মাসের তারিখের কিছুটা আন্দাজ আজও আমরা করে থাকি। (প্রথমা,সপ্তমী, পুর্ণীমা, আমাবস্যা) সেই অর্থে চাঁদকে সময় নিরুপক বা ক্যালেণ্ডার বলা হয়েছে। হজ্বের মৌসুমে এহরাম বেঁধে বা নিয়ত করে, ক্বাবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবার পর কোন কারণে বাড়ী ফেরার প্রয়োজন হলে, সাহাবীগন ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেন।নিয়তের পর সামনের দরজার ব্যবহারকে অপরাধ মনে করতেন। এ আয়াতের মাধ্যমে তাদের অহেতুক দ্বিধা দূর করে, প্রকৃত পূন্য খোদাভীতির মাঝেই রয়েছে বলাহল সফলতা তারই মাঝে নিহীত।

১৯০/وَقَاتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلاَ تَعْتَدُواْ إِنَّ اللّهَ لاَ يُحِبِّ الْمُعْتَدِينَ অর্থাৎ;-আর লড়াই কর আল্লাহর জন্য তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে, আর বাড়াবাড়ি করোনা, আল্লাহ সীমা লঙ্ঘন কারীকে পছন্দ করেন না। যদি কেউ লড়াই করতে আসে, তবে তাদের সাথে লড়াই করো। হাত বন্ধনমূক্ত করাহল, কিন্তু গণ্ডির বাইরে যাওয়া চলবে না, বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ্জ্ঞা আরোপ করা হল। আক্রান্ত হলেই লড়াই করো, আক্রমন কোরনা। আগেভাগে আক্রমন করা ও যুদ্ধ নীতির বরখেলাপ করাকেই সীমালঙ্ঘন বলা হয়েছে। জিহাদ ও কেতাল শব্দ দুটি সমার্থক হলেও এদের মাঝে তফাত রয়েছে। কেতালের বদলে জিহাদের ব্যবহার দেখাযায়, জিহাদের বদলে কেতাল ব্যবহার হয়না। আবার জিহাদের চারটি স্তর রয়েছে। সর্বশেষটি কেতাল। তাই জিহাদ মানেই যুদ্ধ নয়। পবিত্র কোরানে যুদ্ধের অনুমতির এটাই প্রথম আয়াত। তার সাথেই যুক্ত হল গণ্ডি।

১৯১/وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُم مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ وَلاَ تُقَاتِلُوهُمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِن قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ كَذَلِكَ جَزَاء الْكَافِرِينَ অর্থাৎ;-আর তাদেরকে হত্যাকরো যেখানে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে, যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে, বস্তুতঃ ফেতনা-ফাসাদ(দাঙ্গা-হাঙ্গামা)সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ, মসজিদে হারামের কাছে তাদের সাথে লড়াই কোরনা, যতক্ষন না তারা সেখানে তোমাদের সাথে লড়াই করে, যদি তারা সেখানে তোমাদের সাথে লড়াই করে, তাহলে তাদের হত্যাকরো, এই হল কাফেরদের শাস্তি। প্রথমেই বলা হয়েছে, সীমা লঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ি করা যাবেনা। এখানে বলাহচ্ছে, যেমন ভাবে তারা তোমাদের ঘরবাড়ি ছাড়া করেছে, হত্যা করেছে, তেমনই ভাবে তোমরাও তাদের হত্যা করো, ঘরছাড়া করো। মসজিদে হারাম এলাকায় আক্রান্ত না হলে আক্রমন কোরনা। এটা ক্বাবার ঐতিহ্য। জাহেলিয়াতের যুগেও ক্বাবার চত্তর নিরাপদ বিবেচিত হত, আজও তা বহাল আছে। এটা হজরত ইব্রাহীম আঃ প্রার্থনার বাস্তবায়ন।

১৯২/فَإِنِ انتَهَوْاْ فَإِنَّ اللّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌঅর্থাৎ;- আর তারা যদি বিরত থাকে তবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল,দয়ালু। যদি শত্রু পক্ষ্য যুদ্ধে বিরত থাকে তবে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমাশীল। মক্কা বিজয়ে আমরা দেখেছি এ আদেশের সফল বাস্তবায়ন।মক্কা বাসী ভয়ে তটস্থ ছিল, কিন্তু তাদের কোন রকম শাস্তি দেওয়া হয়নি।

১৯৩/وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لاَ تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلّهِ فَإِنِ انتَهَواْ فَلاَ عُدْوَانَ إِلاَّ عَلَى الظَّالِمِينَ অর্থাৎ;-আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্য্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লার দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়, অতঃপর তারা যদি নিবৃত হয়, তাহলে অত্যাচারী ব্যাতিত কারও উপর জবরদস্তি নেই। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা, দাঙ্গা-হাঙ্গামার অবসানের জন্য লড়াই করে যাও, তবে অপর পক্ষ নিবৃত হলে, জুলুম না করলে, তোমরাও বিরত হও। এখানেও সেই পুরানো কথার রিমাইণ্ডার, আক্রান্ত না হলে আক্রমন করা যাবেনা।

১৯৪/الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصٌ فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُواْ عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ অর্থাৎ;-সম্মানিত মাসের বদলে সম্মানিত মাস, পবিত্রতা রক্ষায় সমতার বিধান রয়েছে, যারা তোমাদের উপর জবরদস্তি করে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি করো, যেমনটি তারা করেছে তোমাদের উপর, আল্লাহকে ভয় করো, জেনে রাখো আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন। আরবীয় ক্যালেণ্ডারে চারটি মাসকে সন্মানিত মাস মানাহয়।মাস চারটি যথাক্রমে, মহরম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ। মাস চারটিতে মারামারি ঝঝগড়া, যুদ্ধ বিগ্রহ, অসন্মানের বিধায় বন্ধ রাখাহত। এ আয়াতে বলা হচ্ছে, পবিত্রতা রক্ষায় সমতা রাখতে হবে। আক্রান্ত হলে তোমরাও সমপরিমান আক্রমন করবে। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ মুত্তাকীগনের সাথে রয়েছেন।

১৯৫/وَأَنفِقُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَلاَ تُلْقُواْ بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوَاْ إِنَّ اللّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ অর্থাৎ;- আর ব্য।য় কর আল্লাহর পথে, আর নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরনা, আর তোমরা সৎ কাজ করো, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভাল বাসেন। যুদ্ধের জন্য অর্থের জোগান প্রয়োজন, তাই যুদ্ধের কথার মাঝে আল্লার রাস্তায় খরচের কথা এসে গেল। দান করতে বলা হয়েছে সেই সঙ্গে অতিরিক্ত দান করে নিজেকে নিঃস্য করতেও নিষেধ করা হয়েছে। মানুষের প্রতি সদয় হয়ে মাল খরচ করাকেও আল্লা ইবাদতের সাথে শামিল করেছেন। সুরার প্রথমেই ৩ নং আয়াতে,দেয় রিজিক হতে খরচ করতে বলাহয়েছে।১৭৭ নং আয়াতে, নামাজ ও জাকাতের আগেই মানবতার জন্য মাল খরচ করার কথা বলা হয়েছে। অতএব মানব দরদী হওয়াও ইবাদত।

১৯৬/وَأَتِمُّواْ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضاً أَوْ بِهِ أَذًى مِّن رَّأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِّن صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍ فَإِذَا أَمِنتُمْ فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ অর্থাৎ;-আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্য হজ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর, যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও তাহলে কোরবনীর জন্য যা কিছু সহজলভ্য তাই কোরবানী কর, আর তোমরা ততক্ষন পর্য্যন্ত মাথা মুণ্ডন করবেনা, যতক্ষন না কোরবানীর পশু যথস্থানে পৌঁছে যায়, যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে, কিংবা যদি মাথায় ক্ষত থাকে, তবে তার পরিবর্তে রোজা করবে, কিংবা খয়রাত দেবে, অথবা কুরবানী করে ফিদিয়া দেবে,যখন তোমরা নিরাপদ হবে, আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চায়, সে যা কিছু সহজলভ্য তাদিয়ে কুরবানী করবে,তবে যদি কেউ তা না পায়, তাহলে সে হজ্বের সময় তিন দিন ও ঘরে ফিরে সাত দিন, মোট দশ দিন রোজা রাখবে, এ নির্দেশ তাদের জন্য যাদের পরিজন বর্গ মসজিদে হারামের আশে পাশে বসবাস করেনা, আল্লাহকে ভয় কর এবং নিশ্চিত জেনে রেখ, আল্লাহর আজাব বড়ই কঠিন। এ আয়াতটি যখন নাজিল হয় তখন, ক্বাবা মুশরিকদের দখলে ছিল, তাই হজ্ব ব্রত পালনে বাধা প্রাপ্ত অবস্থার করনীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে।—-চলবে—-

Leave a Reply

Your email address will not be published.