«

»

Nov ৩০

“নগরীতে কাফেরদের চাল-চলন যেন তোমাদিগকে ধোঁকা না দেয়”।

(পূর্ব প্রাশিতের পর। সুরা আলে ইমরাণ রুকু;- ২০ আয়াত;-১৯০-২০০ কোঃ কথা-৬৯)

=========================================================

সুরা বাক্বারার ২০তম রুকুটি শুরু হয়েছিল ১৬৪ নং আয়াত, আয়াতুল আয়াত বা নিদর্শণ সমূহের আয়াতের মাধ্যমে। উদ্দেশ্য ছিল, জলে স্থলে, অন্তরীক্ষে, সামনে পিছনে সর্বত্র আল্লাহর নিদর্শণাবলী অবলোকন কর আর এ সবের কারিগর বা সৃষ্টিকর্তা, আল্লাহকে চিনে নাও।

 

পৃথিবীতে যুগে যুগে এমন কিছু মানুষ জন্মেছেন, যারা আল্লাহর সৃষ্টিকে দেখে ঠিকই তার কারিগরকে চিনেছেন। এবং সব কিছুর অন্তিমকেও বিশ্বাসে এনেছেন। এর পর ‘ইহদেনাস সিরাতাল মুস্তাকিম’ বলে পথের নির্দেশনা চেয়েছেন। অন্য কথায়, ইমান বিল্লাহ ও ইমান বিল আখেরার পর রেসালাতের মুখাপেক্ষী হয়েছেন।

 

সুরা আলে ইমরাণের বিশ নং রুকুটিও ঠিক তেমনই একটি আয়াতের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে। এ রুকুর এগারোটি আয়াতের প্রথম ছয়টি আয়াত অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ণ। এতে রয়েছে কয়েকটি দোয়ার আয়াত। সুরা বাক্বারার শেষ রুকুটির মত। প্রথম ছয়টি আয়াত একই সাথে এক রাত্রে নাজিল হয়। ঐ রাত্রে রসুল সঃ বিনিদ্র থাকেন ও অস্থিরতায় তাঁর রাত শেষ হয়। হজরত বিলাল ফজরের নামাজের জন্য এসে অস্থিরতার কারণ জানতে চাইলে তিনি আয়াত গুলির কথা বলেন। শেষের পাঁচটি আয়াত সুরার উপসংহার।

 

১৯০/إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاخْتِلاَفِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لآيَاتٍ لِّأُوْلِي الألْبَابِ

অর্থাৎ;-নিশ্চয় আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত্রি দিনের আবর্তনে নিশ্চিত নিদর্শণ রয়েছে জ্ঞানবানদের জন্য।

 

যারা আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য গবেষনা করে আল্লাহকে চিনেছেন বা এ সৃষ্টি অহেতুক নয় বলে জেনেছেন, আল্লাহ তাদেরই জ্ঞানবান আখ্যা দিয়েছেন। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ পরের আয়াতে আসছে।

 

১৯১/الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىَ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا

بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

অর্থাৎ;-যারা দাঁড়িয়ে বসে এবং শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা ও গবেষনা করে আসমান ও জমিনের ব্যাপারে এবং বলে; হে আমাদের পালনকর্তা, এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করোনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুমি দোজখের আগুন থেকে রক্ষা কর।

 

এরাই সেই চিন্তাশীল জ্ঞানবান, যারা নিদর্শণ সমূহ দেখে, বিনয়ের সাথে স্বীকার করে যে, অবশ্যই এসবের সৃষ্টি কর্তা আছেন এবং এও স্বীকার করে কোন কিছুই বিনা প্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়নি। স্বীকার করে অবশ্যই পরকাল আছে এবং তার প্রয়োজনও অবশ্যই আছে। সৃষ্টির সেরা জীব, স্বাধীন মানুষ, ন্যায় ও অন্যায় দুটি ধারায় বিভক্ত। অন্যায় কারীরা বাহুবলে, কৌশলে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। অন্য দিকে ন্যায়বানগন বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিতদের প্রাপ্য অবশ্যই পাওয়ার অধিকার আছে। এবং তারই জন্য আখেরাত।

 

১৯২/رَبَّنَا إِنَّكَ مَن تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

অর্থাৎ;-হে আমাদের পালনকর্তা নিশ্চয় তুমি যাকে দোজখে নিক্ষেপ করলে তাকে লাঞ্ছিত করলে। আর জালীমদের জন্য তো সাহায্যকারী নেই।

 

১৯৩/رَّبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلإِيمَانِ أَنْ آمِنُواْ بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الأبْرَارِ

অর্থাৎ;-হে আমাদের রব, আমরা নিশ্চিত রূপে শুনেছি একজন আহবানকারীকে, ইমানের দাওয়াত দিতে, তোমাদের রবের প্রতি ইমান আন, তাই আমরা ইমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গোনাহ মাফ কর এবং আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দাও আর আমাদের মৃত্যু দাও নেককারদের সাথে।

 

এরাই তারা যারা ইমান বিল্লাহ ও ইমান বিল আখেরাতে অটল থেকে রেসালাতের আহবানে সাড়া দিয়ে সমস্ত জীবন ইমান ও আমলে বহাল থেকে সালেহীন বা নেককার গনের সান্নিধ্যে জীবনাবসান প্রার্থনা করছে।

 

১৯৪/رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلاَ تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لاَ تُخْلِفُ الْمِيعَادَ

অর্থাৎ; হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের দাও যা, রসুলের মাধ্যমে আমাদের দেওয়ার ওয়াদা করেছ। এবং কেয়ামতের দিন তুমি আমাদের অপমানিত কোরনা। নিশ্চয়ই তুমি ওয়াদা খেলাফ করনা।

 

১৯৫/فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لاَ أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُواْ وَأُخْرِجُواْ مِن دِيَارِهِمْ وَأُوذُواْ فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُواْ وَقُتِلُواْ لأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ ثَوَابًا مِّن عِندِ اللّهِ وَاللّهُ عِندَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ

অর্থাৎ;-অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের প্রার্থনা কবুল করে বললেন; আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর কর্মই বিনষ্ট করিনা, হোক সে স্ত্রী কিংবা পুরুষ। তোমরা একে অপরের অংশ। অতএব, যারা হিজরত করেছে, যাদের নিজ মাতৃভূমী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আমার পথে যাদের উৎপীড়ন করা হয়েছে, যারা লড়াই করেছে, যারা মৃত্যু বরণ করেছে। অবশ্যই আমি তাদের উপর হতে অকল্যানকে অপসারিত করব, অবশ্যই তাদের সেই জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার পাদদেশে নহর প্রবাহিত। এই হল আল্লাহর পক্ষ হতে বিনিময়; আর আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম পুরষ্কার।

 

প্রার্থনার পরক্ষনেই আল্লাহ তায়ালা তা মঞ্জুরের ঘোষনা দিলেন। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, তিনি বললেন, তিনি করো কর্মই বিনষ্ট করেননা। পুরুষ বা স্ত্রী উভয়েই যার যার কর্ম অনুযায়ী বদলা অবশ্যই পাবে। আর জান্নাতের ঘোষনা দিলেন বিশেষ ভাবে তাদের জন্য, যারা আত্মীয় স্বজন, ধন-সম্পদ ছেড়ে হিজরত করেছিল বা যাদের নিজ মাতৃভূমী হতে বার করে দেওয়া হয়েছিল, যারা আল্লাহর দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করেছে এবং যারা শহীদ হয়েছে। তাদের ত্রুটি গুলোও এড়িয়ে যাওয়া হবে। বর্ণিত জান্নাত অপেক্ষাও উত্তম পুরষ্কারে আল্লাহ তাদের ভুষীত করবেন।

 

পরের পাঁচটি আয়াত এ সুরার উপসংহার। যা মুমিন, মুশরীক, মুনাফেক, ইহুদী-নাসারা সবার জন্য প্রযোজ্য।

 

১৯৬/لاَ يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُواْ فِي الْبِلاَدِ

অর্থাৎ;-নগরীতে কাফেরদের চাল-চলন যেন তোমাদিগকে ধোঁকা না দেয়।

 

১৯৭/مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ

অর্থাৎ;-এতো ক্ষনিকের উপভোগ। তারপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর তা নিকৃষ্ট আবাস।

 

 দুনিয়ার চাক চিক্কে যারা নিজেদের সমর্পন করেছে, তারা সামান্য দিনের জন্য তা উপভোগ করবে। আখেরাতের অনন্ত কালের কাছে দুনিয়াকে সামান্য কয়দিন বলা হয়েছে। তাদের স্থায়ী নিবাস হবে নিকৃষ্ট জাহান্নাম। আর যারা এ ধোঁকায় না জড়িয়ে, আফসোস নাকরে তাকওয়া বা খোদাভীতি অবলম্বন করবে, তাদের কথা আসছে পরের আয়াতে। খোদাভীতি অন্তরে থাকলে তা মানুষকে অবশ্যই বর্মের মত পাপাচার হতে আগলে রাখে।

 

১৯৮/لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْاْ رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلاً مِّنْ عِندِ اللّهِ وَمَا عِندَ اللّهِ خَيْرٌ لِّلأَبْرَارِ

অর্থাৎ;-কিন্তু যারা ভয় করে নিজেদের পালনকর্তাকে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে প্রস্রবন। সেখানে অনন্তকাল থাকবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা আপ্যায়ন। আর যা আল্লাহর কাছে রয়েছে তা সৎকর্মশীলদের জন্য অধিক উত্তম।

 

১৯৯/وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَن يُؤْمِنُ بِاللّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلّهِ لاَ يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللّهِ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَـئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ إِنَّ اللّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

অর্থাৎ;-আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ইমান আনে, আর যাকিছু আপনার উপর অবতীর্ণ হয়, আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর। আল্লাহর উপর বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লাহর আয়াত সমূহকে অল্প মূল্যের বিনিময়ে সওদা করেনা, তারাই হল সেই লোক যাদের পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় আল্লাহ যথাশিঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন।

 

আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদী-নাসারাদের মধ্যে এমন কিছু পূন্যবান লোকের কথা এখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তার কিতাব যা তাদের কাছে আছে আর যা রসুল সঃ এর উপর নাজিল হচ্ছিল তার উপরও বিশ্বাস রাখে। কিন্তু রেসালাত বা নবীর ক্রমাগমন ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখেনা। তাদের পূন্যের বদলা শিঘ্রই আল্লাহ দিয়ে দেবেন। ১৯৫ নং আয়াতেই বলেছেন, কারোরই কর্মফল বিনষ্ট হবেনা।

 

২০০/يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

অর্থাৎ;-ওহে যারা ইমান এনেছো, ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে অন্যকে অতিক্রম কর, শৃঙ্খলাবদ্ধ হও আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে সফলকাম হতে পার।

 

মুমিনগনকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ধৈর্যে অন্যের মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে হবে। শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছ, অতএব শৃঙ্খলা বজায় রাখ, নিয়মানুবর্তিতা মেনে চল,(chain of commend) আল্লার উপর ভয় ও বিশ্বাস কর, যাতে সফলকাম হতে পার।বিমর্ষ মুসলীম বাহিনীকে এ আয়াতের মাধ্যমে মনে করিয়ে দিলেন যে, মুশরীক গন বদরে পরাজিত হয় ও সত্তর জন আত্মিয় হারায়। কিন্তু ধৈর্য ধরে মাত্র এক বছরের মাথায় তারা আবার চড়াও হল। অতএব তোমরাও ধৈর্য অবলম্বন কর ও তাদের অপেক্ষা বেশী অগ্রসর হও।

 

(আল্লাহর অশেষ রহমতে সুরা আলে ইমরাণ এখানেই শেষ হল)

৩ comments

  1. 3
    ফোরকান

    খুব সহজ ও প্রাঞ্জলভাবে তাফসির করেছেন। খুব ভাল লেগেছে। ধন্যবাদ।

  2. 2
    আবদুস সামাদ

     শেয়ার করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  3. 1
    জব্বার খান

    খুব ভালো লাগলো। মহান, পরম করুনাময় আল্লাহপাক আমাদেরকে তাঁর নির্দেশিত পথে চালিত করে  তাঁর নিকট সফলকাম হবার সৌভাগ্য দান করুন। দুনিয়ায় অর্জিত স্বল্প পুঁজির বিনিময়ে তাঁর দয়া- ক্ষমা, অশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্তদের মধ্যে গন্য করে আখেরাতের সূকঠিন পরীক্ষায় সফলকাম বিবেচিত হওয়ার তৌফিক দান করুন।
    কিছু খোদা ভীতু ইহুদি বোধহয় এখনও রয়েছে :

    rel="nofollow">
    কষ্ট স্বীকার করে সূরা "আলে ইমরান" এর তাফসির বঙ্গানুবাদ করে শেয়ার করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.