«

»

Nov ২৬

রায়ট

[ভূমিকাঃ গেল সপ্তায় সিটি অব স্কট্‌স্‌ডেল-এর লাইব্রেরি থেকে 'কাই পো চে' (kai po che) শিরোনামের ভারতীয় একটা হিন্দি ছবি রেন্ট করে বাসায় এনে দেখলাম। হিন্দি সিনেমা সাধারনত আমি তেমন একটা দেখিনা। তবে সিটি অব স্কট্‌স্‌ডেল-এর  ফরেন মুভি সেকশনে যেহেতু সাধারনভাবে উঁচু মানের ফরেন মুভির কালেকশন থাকে, তাই কিছুটা আগ্রহ নিয়েই ছবিটা রেন্ট করে নিয়ে এলাম। গুজরাটি ভাষায় 'কাই পো চে' অর্থ 'Brothers… For Life'। আমি হিন্দি/উর্দু সামান্য কিছুটা বুঝি। তবে ইংরেজি সাব-টাইটেল থাকায় ছবিটা বুঝতে কোথাও সমস্যা হয়নি। ২০০২ সালে গুজরাটে সংঘটিত হিন্দু-মুসলিম দাংগাকে কেন্দ্র করে এ ছবির কাহিনী। ভবিষ্যত অর্থনৈতিক স্বপ্ন, ধর্মীয় রাজনীতি ও ক্রিকেটপ্রেম তিন হিন্দু বন্ধুর মধ্যে এক মুসলিম কিশোরের সম্ভাব্য ক্রিকেট তারকা হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে কিভাবে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং তাদেরকে ক্রমে হিন্দু-মুসলিম দাংগায় জড়িয়ে ফেলে, তার চমৎকার রূপায়ন ফুঁটে উঠেছে এ ছবিতে।

 

ছবিটা দেখে আমার নিজের হিন্দু-মুসলিম দাংগা নিয়ে লেখা একটি গল্প পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে মন চাইলো। ২০১১ সালের বইমেলায় বিদ্যাপ্রকাশ কর্তৃক প্রকাশিত 'ব্যবধান' শিরোনামে আমার একটি গল্পের বই বের হয় যেখানে ১৫ টি গল্পের ভেতর 'রায়ট' ছিল একটি। আশা করি গল্পটি পাঠকদের ভাল লাগবে, বিশেষ করে যারা  'কাই পো চে' ছবিটা দেখেছেন। ধন্যবাদ।]

 

রায়ট

 

।। এক।।

টান টান হয়ে সোফায় বসে আছে নাঈম উদ্দিন। যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। ঘরে তিল ধারনের জায়গা নেই। সবার চোখ দেয়াল-ঘেঁষা বিয়াল্লিশ ইঞ্চি রঙ্গিন টেলিভিশনের স্ক্রিনে। ভারত-পাকিস্থান ম্যাচ। ওয়ান ডে সারজাহ কাপ। পঞ্চাশতম ওভার চলছে। সচীন টেন্ডুলকার সেকেন্ড ডাউনে নেমে তেমন একটা রান তুলতে না পারলেও ক্রিচ আঁকড়ে টিকে রয়েছেন ম্যাচের একেবারে শেষ পর্যন্ত। বল করছেন পাকিস্থানের শোয়েব আখতার। যেন রাওয়াল পিন্ডি মেল-ট্রেন। ঝড়ের মত ছুটে আসছে একেকটা বল। ওভারের পাঁচ নম্বর বলটা খেলতে পারলেননা সচীন। দারুন ব্যাট ঘুরিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাটে-বলে একটুর জন্যে সংযোগ হলোনা। ভারত পাঁচ রানে পিছিয়ে রয়েছে। জয়ের সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি।

 

মাঠের প্রায় ওপ্রান্ত থেকে বল হাতে দৌড়াতে শুরু করেছেন শোয়েব আখতার। প্রথমে মৃদুলয়ে, তারপর জোরে। এক, দুই, তিন,… প্রচন্ড ক্ষিপ্রতায় বল ছুঁড়লেন শোয়েব আখতার। দারুন বল। একেবারে স্ট্যাম্প বরাবর। ক্যামেরা শোয়েব আখতারের ওপর থেকে সরে এখন সচীনের ওপরে। ডানপা মাটিতে ভাঁজ করে দুহাতে ব্যাট ঘুরালেন সচীন। নিদারুন উত্তেজনায় চোখ বন্ধ করে ফেললো নাঈম। মনে মনে বিড় বিড় করে আল্লাহকে ডাকলো। এবং তুমুল চিৎকারে চোখ খুললো সে। ছক্কা। সচীন ছক্কা মেরেছেন। ভারত জিতে গেছে। “জয় হিন্দ” বলে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠলো নাঈম। ভাই আর কাজিনদের সাথে বুকে বুক মেলালো, ঘরের সবার সাথে কোলাকুলি করলো। সবার চোখে পানি। আনন্দের। ঘরের কোনায় ভারতের পতাকা রাখা ছিল। তিন লাফে ঘরের কোনায় পৌছে গেল নাঈম। তারপর পতাকা হাতে একদৌড়ে উঠোন পার হয়ে সোজা রাস্তায় নেমে এলো সে। ভাই আর কাজিনরাও অনুসরন করলো তাকে। রাস্তায় ইতিমধ্যেই মানুষের ঢল নেমেছে। দলে দলে ভাগ হয়ে সবাই দৌড়াচ্ছে এদিক-ওদিক, উদ্দেশ্যবিহীন। প্রতিটা দলের সাথেই রয়েছে ভারতের পতাকা। সবার মুখে মুখে ঘুরে-ফিরে কেবল একটাই স্লোগান- “জয় সচীন, জয় হিন্দ”, “জয় সচীন, জয় হিন্দ”। তুমুল আনন্দে উদ্বেলিত গোটা জামালপুর।

 

গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদের অন্তর্ভূক্ত ছোট্ট শহর জামালপুর। মুসলিম অধ্যূষিত। এ শহরের অধিবাসীদের অধিকাংশই বংশ-পরষ্পরায় কসাই। নাঈমদের পরিবারও তাই। নাঈমের আব্বাজান আগে মূলত গরু কাটতেন। বিজেপি ঘেঁষা স্থানীয় প্রাদেশিক সরকার সম্প্রতি আইন করে গুজরাটে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার পর থেকে এখন তিনি শুধু ভেড়া আর মহিষই কাটেন। বংশ-পরষ্পরায় কসাই হলেও নাঈমরা কিন্তু মোটেও দরিদ্র নয়। এলাকার অন্যতম নামকরা মিট্‌ ফার্ম তাদের। আব্বাজানদের জেনারেশন খুব একটা পড়ালেখা করেননি। তবে নাঈমদের জেনারেশনের কথা অবশ্য আলাদা। প্রতিবেশী প্রদেশ, সুরাটের নামকরা একটা ইউনিভার্সিটি থেকে বিজনেস এ্যাডমিনিষ্ট্রেশনে আন্ডারগ্রাজুয়েট শেষ করেছে নাঈম। এরপর এম.আই.এস. (মাষ্টার্স ইন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিষ্টেম) শেষ করেছে গুজরাটেরই একটা ইউনিভার্সিটি থেকে। তাও প্রায় বছর দেড়-দুই আগে। চাকরির চেষ্টা করেছিল। লাভ হয়নি। পরিচিত হিন্দু বন্ধুদের সবাই চাকরি পেয়ে গেছে ইতিমধ্যে। কেবল তার হয়নি। সম্ভাবনাও খুব একটা নেই। গুজরাটে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ খুব প্রকট। ‘মোহাম্মাদ নাঈম উদ্দিন’ নামটা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাঁধা নাঈমের জন্যে। সাউথের দিকে গেলে হয়ত চাকরি পাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। নামকরা বড় বড় অনেক আমেরিকান কোম্পানী আই.টি.’র অফিস বানিয়েছে সাউথে। ওখানে ধর্মীয় বা এথ্‌নিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে কেউ নাকি খুব একটা মাথা ঘামায়না। আব্বাজান কয়েকবার বলেছিলেনও। কিন্তু নাঈম গা-করেনি। ভারতে চাকরি করলে কেবল গুজরাটেই চাকরি করবে সে। নইলে নয়। GRE, TOEFL ইতিমধ্যে দেয়া হয়ে গেছে। স্কোরও উঠেছে অনেক। আমেরিকার দু’চারটে ইউনিভার্সিটিতে যোগাযোগও করেছে নাঈম। চোখ বুজে এ্যাডমিশন হয়ে যাবে। সেকেন্ড আরেকটা মাষ্টার্স করবে সে আমেরিকায়। এম.বি.এ.। চাকরি-বাকরি নিয়ে এরপর হয়ত আমেরিকাতেই থেকে যাবে নাঈম। অন্তত সেরকমই ইচ্ছে তার।

 

।। দুই।।

মুশতাক চাচা গোপনে একটা গরু কেটেছেন। বহুদিন ধরে মেয়েটা তার গরুর ভূঁড়ি খাওয়ার বায়না ধরেছিল। দশ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ের সাধ মেটাতে শেষমেষ বাধ্য হয়েছিলেন মুশতাক চাচা। জামালপুরের কোনো মুসলিম খোঁয়াড়ে গরু রাখা সরকারিভাবে নিষেধ। পুলিশ নিয়ম করে টহল দিয়ে বেড়ায় খোঁয়াড়ে খোঁয়াড়ে। কেউ নিয়ম ভাঙ্গলে মোটা অংকের ফাইন। সাথে জেল-জরিমানা। মুশতাক চাচা তার পরিচিত এক হিন্দু কাষ্টোমারের কাছ থেকে গোপনে ছোট একটা বক্‌না গরু চড়া দামে কিনে চার পা বেঁধে ওনার মাংস আনা-নেয়ার মাইক্রোবাসের পেছনে বসিয়ে গরুটাকে কসাইখানায় নিয়ে এসে দ্রুত জবাই করে ফেললেন। মাংস কেটে এবং ভূঁড়ি সাফ-সুতোরো করে গরুর শিং, খুর এবং চামড়া বাড়ীর পেছনে গর্ত খুঁড়ে দ্রুত পুতে ফেললেন।

 

দুপুরে মুশতাক চাচারা খেতে বসেছেন। নাঈম কবে আমেরিকায় চলে যায়, সেদেশে গরুর ভূঁড়ি পাওয়া যায় কী যায়না, সে জন্যে তাকেও দুপুরে খেতে বলা হয়েছে মোস্তাক চাচার বাসায়। টাটকা রান্না করা ভূঁড়ি এক টুকরো রুটিতে মেখে মেয়ের মুখে কেবল তুলে দিতে যাবেন মুশতাক চাচা ঠিক এমন সময় ভয়ানক জোরে নড়ে উঠলো দরজার কড়া। পুলিশ এসেছে। অন্তত পাঁচ-ছয় জন। গরু জবাইয়ের খবর ইতিমধ্যেই পুলিশ পেয়ে গেছে। কিভাবে জেনেছে সেটা গোপন তথ্য। তা জানাতে পুলিশ বাধ্য নয়। মুশতাক চাচা গোপনে গরু জবাইয়ের কথা স্বীকার করলেন। চাচার বাড়ীর পেছনটা খুঁড়ে গরুর শিং, খুর, চামড়া, ইত্যাদি ফের ওঠানো হলো। পত্রিকার লোকজন এলো, ফ্রিল্যন্স সাংবাদিক এলো। দফায় দফায় সেসবের ছবি তোলা হলো এবং পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে মুশতাক চাচাকে থানা-হাজতে নিয়ে গেল পুলিশ।

 

একটা ট্যাক্সি ডেকে একটু পরেই থানায় এসে পৌছালো নাঈম। মুশতাক চাচাকে ইতিমধ্যেই হাজতে ঢুকিয়ে ফেলেছে পুলিশ। থানার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে চেয়ে সফল হলোনা নাঈম। পুলিশ কেইস তৈরীর কাজে ব্যস্ত। চাচার জামিনের ব্যবস্থা করা দরকার। কিন্তু তার আগে চাচার সাথে একটু দেখা করা দরকার। চাচী বারবার করে বলে দিয়েছেন। চাচার হাঁপানীর রোগ আছে। পুলিশ চাচাকে ধরে আনার সময় আতংকে, ঘটনার আকস্মিকতায় চাচার ওষুধের কথা কারো মনে ছিলনা। ওষুধগুলো চাচাকে হাতে হাতে পৌছে দেয়া দরকার। সেন্ট্রিদের হাতে দিলে ওরা নাকি বেশীরভাগ সময় ফেলে দেয় ওষুধ। চাচী সেকারনেই বার বার বলে দিয়েছেন ওষুধগুলো সরাসরি চাচার হাতে দিতে।

 

টানা চার-পাঁচ ঘন্টা থানায় বসে থেকে অবশেষে চাচার দেখা মেলে নাঈমের। তাও দুশো রুপী ঘুষ দিয়ে। বুড়ো মত এক সেন্ট্রি টাকা খেয়ে সুযোগমত নাঈমকে নিয়ে যায় মুশতাক চাচার কাছে। কিন্তু এ কোন্‌ মুশতাক চাচা! চাচাকে দেখে শিউরে ওঠে নাঈম। মার খেয়ে চাচার ডান চোখের ওপরটা ভীষন ফুলে গিয়ে চোখটা প্রায় ঢেকে গেছে। ঠোঁটের কোন কেটে গেছে অনেকটা। দুই হাতে লাল লাল চাকা চাকা লাঠির বাড়ির দাগ। চাচার শরীরেও নিশ্চয় অসংখ্য মারের দাগ আছে যা গায়ে শার্ট থাকার কারনে দেখা যাচ্ছেনা! চাচাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে নাঈম। চাচাও ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন নাঈমকে দেখে। ফিসফিস করে বলেন তার মার খাওয়ার ঘটনা। থানার মেজো কর্মকর্তা নিজে পিটিয়েছেন মুশতাক চাচাকে। “জেল-জরিমানা তো পরের কথা। আহমেদাবাদে গো-হত্যা? ধর্মের এতবড় অপমান? শালা মুচলমানের বাচ্চার এত্তবড় সাহস!” একগাদা খিস্তি-খেউড় করে সমানে চাচাকে পিটিয়েছেন মেজো কর্মকর্তা। নাঈম ভেতরে ভেতরে ফুঁসে ওঠলেও নিজেকে সংবরন করে। কিন্তু কীইবা করার আছে তার, মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া? চাচার হাতে ওষুধগুলো কোনোরকমে গুঁজে দিয়ে একদৌড়ে থানা থেকে বেরিয়ে আসে নাঈম। চাচার এমন করুন অবস্থা বেশীক্ষণ চোখে দেখা সম্ভব না তার পক্ষে। ট্যাক্সি নিতে ইচ্ছে হয়না নাঈমের। অন্ধ রাগে চিন্তা-ভাবনাগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আসে। হেঁটে হেঁটেই বাড়ীমুখো রওনা হয় সে।

 

।। তিন।।

জামালপুরে টান টান উত্তেজনা। গতকাল সকালে বড় বড় হেডলাইনে জামালপুরে গো-হত্যার খবর বেরিয়েছিল স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোয়। গর্ত থেকে তোলা গরুর শিং, খুর, চামড়া, ইত্যাদির বিভৎস বড় বড় রঙ্গিন ছবিও সামনের পাতায় ছেপে দিয়েছিল কিছু কিছু পত্রিকা। মুশতাক চাচাকে পুলিশ প্রহরায় থানা-হাজতে নিয়ে যাওয়ার কথাও লেখা হয়েছিল খবরে। এরপর গতকাল রাতে কারা যেন জামালপুর জামে মসজিদের মেইন গেইটে বালতি বালতি গরুর গোবর ঢেলে রেখে গেছে। গোবর মাখিয়ে রেখে গেছে মসজিদের প্রতিটা জানালা-দরজায়ও। আজ শুক্রবার। জুম’আর নামাজের দিন। অথচ গন্ধে মসজিদের ত্রিসীমানায়ও যাওয়ার উপায় নেই কারো। মুশতাক চাচাকে পুলিশের বেধড়ক পেটানোর খবরটাও ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জামালপুরের মুসলমানদের মধ্যে। সকাল থেকেই জায়গায় জায়গায় জটলা করছে মুসলমানরা। সবাই ক্ষুব্ধ। বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে কয়েকটা বিক্ষিতভাবে। এর একটা বিহিত না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় কোনো হিন্দু মাংস বিক্রেতার কাছে কিম্বা হিন্দু রেষ্টুরেন্টগুলোতে মাংসের সাপ্লাই দেয়া বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে কসাইদের কেউ কেউ।

 

এর মধ্যেই হঠাৎ “পাকড়ো”, “পাকড়ো” রব ওঠে। ধর ধর বলে ছুটে যায় যুবকদের কয়েকটা দল। জামে মসজিদের কাছাকাছি হাতে-নাতে দুজন হিন্দু যুবককে আটকেছে মুসলমান যুবকদের একটা দল। ওরা নাকি গোপনে মজা দেখতে এসেছিল যে মুসলমানরা আজ গোবর-মাখা মসজিদে কিভাবে নামাজ পড়ে। তিনজন ছিল। একজন দৌড়ে পালিয়ে গেছে। মসজিদে গতরাতে গোবর মাখানোর সাথে যে এরা সন্দেহাতীতভাবে জড়িত তা বুঝতে কারো বাকি থাকেনা। যুবকদের দলটা কষে উত্তম-মধ্যম দেয় হিন্দু যুবক দুজনকে। এরপর মসজিদের সামনের গোবরের মধ্যে তাদেরকে নাকে খত দেওয়ানো হয়, কান ধরে একশ' বার উঠ-বস করানো হয় এবং অবশেষে মুসলিম পাড়া থেকে ঘাড় ধরে দুজনকে বের করে দেয়া হয়। এতে করে কিছুটা হলেও মানসিক তৃপ্তি ও স্বস্তি নেমে আসে জামালপুরের মুসলিম পাড়ার অধিবাসীদের মনে। যে যার কাজে ফের ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

এরপর আধা বেলাও পার হয় না। জামালপুর হয়ে ওঠে যেন সাক্ষাৎ একটা রণক্ষেত্র। মুসলমানদের হাতে হিন্দু যুবকদ্বয়ের অপদস্থ হওয়ার ঘটনা আশপাশের হিন্দু এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে শত শত হিন্দু যুবক জোটবদ্ধ হয় জামালপুরকে ঘিরে। ধারালো রামদা, কুড়াল, কিরিচ, ইত্যাদি ধারালো অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে মাথায় লাল রঙের ফিতে বাঁধা শত শত হিন্দু যুবক একযোগে হামলা চালায় জামালপুরে। ছেলে, বুড়ো, যুবক,… সামনে মুসলমানদের যাকেই পায় তাকেই সমানে এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করে উন্মত্ত হিন্দু যুবকদের দলটা। জামালপুর কসাই এলাকা। মুসলমানদের প্রায় সবার ঘরে ঘরেই রয়েছে মাংস কাটার বড় বড় ছুরি। তারাই বা ছেড়ে দেবে কেন? মুসলমান যুবকদের কেউ কেউ মাংস কাটা ছুরি হাতে ধেয়ে যায় হিন্দু যুবকদের দিকে। তবে প্রতিরোধ ততটা জোরালো হয়না। অসংখ্য মুসলমান কচুকাটা হয়।

 

নাঈম সেই শিশুবেলা থেকেই খুব নিরীহ ধরনের ছেলে। পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলতে গিয়ে কতদিন মার খেয়ে মুখ বুজে বাড়ী চলে এসেছে সে। কখনও প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু নাঈমের রক্তে কে যেন আজ আগুন ধরিয়ে দেয়। মুশতাক চাচার মার খাওয়া বীভৎস মুখখানা সুস্পষ্ট ভেসে ওঠে নাঈমের চোখে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে বাড়ীর সামনের গলিটায় তিন তিন জন হিন্দু যুবকের সাথে সমানে লড়ছে তার চাচাতো ভাই আশফাক। রামদার আঘাতে ইতিমধ্যেই রক্তাত্ত হয়ে উঠেছে সে। নাঈমের হাত-পা শক্ত হয়ে আসে। ফুলে ওঠে চোয়াল। এভাবে আর কতকাল মার খাবে তারা? একছুটে মাংস কাটা ঘর থেকে বড়সড় একটা ছুরি হাতে করে হিন্দু যুবকদের দিকে ধেয়ে যায় নাঈম। আশফাক ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। পাগলের মত যুবক তিনজনের ওপর এলোপাথাড়ি ছুরি চালায় নাঈম। কাউকে সে আঘাত করতে পেরেছে কিনা তা লক্ষ্য করেনা। তবে ডান-বাম থেকে নাঈমের হাতে, পিঠে, পেটে, গলায় অসংখ্য কোপ পড়ে ধারালো রামদার। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। পৃথিবীর সমস্ত আলো ক্রমশ কমে গিয়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে নাঈমের চোখে একসময়।

 

নাঈমদের বাড়ীর সামনের গলিতে তখন রক্তের বন্যা বইছে। চিৎ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা নাঈমের বুকের ওপর এক পা তুলে দিয়ে রক্তমাখা রামদাখানা আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরে গমগমে ভরাট গলায় স্লোগান দিয়ে ওঠে তিনজনের ভেতর নেতা গোছের হিন্দু যুবকটা- “জয় রাম, জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম্‌”।

 

১১ comments

Skip to comment form

  1. 5
    মাহবুব

    ভালো লাগল।

    1. 5.1
      আব্দুর রহমান আবিদ

      গল্পটি পড়ার ও মন্তব্য করার জন্যে ধন্যবাদ।

  2. 4
    সত্যবাদী

    অসাধারণ !!!!!!!!!!!! 

    1. 4.1
      আব্দুর রহমান আবিদ

      গল্পটি পড়ার ও কমপ্লিমেন্টস্‌-এর জন্যে ধন্যবাদ।

  3. 3
    শামস

    রায়ট দেখা হয়নি, Firaaq দেখা হয়েছে। পুরো ছবিটি rel="nofollow">ইউটিউবে আছে। কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা এ ধরণের ছবি নির্মাণে যে সাহস দেখিয়েছেন তা প্রশংসার যোগ্য। ভারতে মুসলিমদের উপর নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র দেখে আতকে উঠছি। সাম্প্রদায়ীক সহিংশতার দিক থেকে আমাদের অবস্থা ভালো না হতে পারে, কিন্তু ভারতের অবস্থা আমাদের থেকে অনেক নাজুক।  এই উপমহাদেশে মুসলিমদের ভারত বিরোধীতায় এসব বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। 

     

    1. 3.1
      আব্দুর রহমান আবিদ

      আমি Firaaq দেখিনি। তবে ইউটিউবে যেহেতু লিংক দিয়েছেন, আশা করি দেখবো ইনশাআল্লাহ। জানিনা Firaaq'এর নির্মাতা কী ধরনের সাহস দেখিয়েছেন। তবে 'কাই পো চে' (Kai Po Che) যে একই সাথে সাহসী এবং ভারতীয় সামাজিক বিবেককে নাড়া দেওয়ার মত একটা ছবি, আমার কাছে অন্তত সেরকমই মনে হয়েছে। অবশ্য ইউটিউবে Kai Po Che-এর লিংক আছে কিনা সেটা চেক করে দেখিনি। ধন্যবাদ।

  4. 2
    ফাতমী

    লেখাটি স্পর্শকাতর, সময় নিয়ে বুঝে শুনে তাই মন্তব্য করতে হবে। 

    1. 2.1
      আব্দুর রহমান আবিদ

      গল্পটি পড়ার জন্যে ধন্যবাদ।

  5. 1
    এম_আহমদ

    আপনার লেখাটি গত রাতে প্রকাশ করার পর পরই দেখেছি। তবে তখন ছিল বেড-টাইম। তবু দ্রুত পড়ে নিয়েছি। একটা মন্তব্য তখনই দিতে ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু ভাবলাম, না, দেখি কী হয়। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। আজ রাত আবার আসলাম। এবং ইন্টারেস্টটা আরও বর্ধিত হল। যাক, আপনার গল্পে যাই।

    গল্পটি ‘গল্পীয়’ ভারতের এক করুণ চিত্র উন্মোচিত করে। এখানে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের (discrimination) অস্তিত্বই প্রধানত স্পষ্টত বিষয়। এই ভূখণ্ডের ‘জাতি’ ও ‘জাতীয়-আদর্শের’ স্বরূপও দিবালোকের উন্মোচিত। এই সমাজের এক নিরীহ ছেলের সব আশা আকাঙ্ক্ষা যখন রামদার কোপে, রক্তের ফিনকিতে, মরণের কোলে ঢলে পড়েছিল –তখন সেই দেশের বাস্তবতা তার চোখে, মুখে, তার মরদেহে মূর্তমান হয়ে ওঠেছিল। নাঈম নিজেকে “ভারতই” দেখেছিল। একদিন সচীনের জয় ছিল তার জয়, ভারতের জয় ছিল তারই জয়। বলেছিল, জয় সচীন, জয় হিন্দ। সচীন [এখন প্রতিনিধিত্ব ও রূপকতায় ধরুন] ও ভারতে তার চিন্তা চেতনা একাকার ছিল।  শুধু সে নয়, গোটা জামালপুরই। “জয় সচীন, জয় হিন্দ” বলে তারাও তুমুল আনন্দে উদ্বেলিত হতে পেরেছিল। 

    কিন্তু ভারত ও নাঈমের মধ্যকার বাস্তবতা কী ছিল? নাঈম মাস্টার্স করেও চাকুরী পায়নি।  কারণ তার নাম ছিল  ‘মোহাম্মাদ নাঈম উদ্দিন’। মুশতাক চাচা আইনের ঘরে ঢুকেই  বেধড়ক মার খেতে হয়েছিল। তার চোখ, মুখ ও গোটা দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল। আইনের লোকই তাকে পিটিয়েছিল। কি বলে পিটিয়েছিল? “…আহমেদাবাদে গো-হত্যা? ধর্মের এতবড় অপমান? শালা মুচলমানের বাচ্চার এত্তবড় সাহস!”  এখানেই আইন, জাতি, আদর্শ ও বিশ্বাস মূর্তমান।

    মুশতাক চাচা কিন্তু ‘গোপনে’ গরু কিনেছিলেন। পরে পুলিশ এসেছিল। কিন্তু গরু কার কাছ থেকে কিনেছিলেন? ‘পরিচিত এক হিন্দু কাষ্টোমারের কাছ থেকে।’ এই ছিল সামাজিক বাস্তবতা। মানি গল্পের সামাজিক বাস্তবতা।

    মুশতাক চাচার বাড়ীর পেছন খুঁড়ে গরুর শিং, খুর, চামড়া ইত্যাদি ওঠানো হল, পত্রিকার লোকজন এলো, ফ্রিল্যন্স সাংবাদিক এলো, দফায় দফায় ফটো তোলা হল; তারপর তাকে থানায় নিয়ে গেল –এ ছিল যেন ‘মানুষ-হত্যার’ কাণ্ড!

    এই গল্পটি অনেককিছু বলে যায়।

    1. 1.1
      আব্দুর রহমান আবিদ

      গল্পটি পড়ার ও মন্তব্য করার জন্যে ধন্যবাদ।

      1. 1.1.1
        এম_আহমদ

        ভাই, শুরুতে একটি কথা লিখতে ভুলে গেছি। আর তা হচ্ছে, ‘এই গল্পটি আমি যেভাবে বুঝেছি তা হল এই।’ আমরা সাধারণত কোনো মজলিসে বা সংবাদপত্রে যখন গল্প, কবিতা, উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করি তখন লেখক উপস্থিত থাকেন না। এবং মন্তব্যের কথা ও ভাষা পাঠককে লক্ষ্য করে হয়। এই মন্তব্যটি সেই আঙ্গিকে। না হলে, এটা যেন গল্পকারকে গল্পের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত দেখানোর মত হয়ে পড়ে। ধন্যবাদ।

Leave a Reply to ফাতমী Cancel reply

Your email address will not be published.