«

»

Oct ০৮

‘ইসলামী রাজনীতি’র ব্যর্থতা: গলদ কোথায়? (পর্ব ০৬)

……পূর্ব প্রকাশের পর……

মানবজীবনের সর্বাঙ্গনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ইসলামের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্য অর্জন করতে আল্লাহর রসুল কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে সংগ্রাম করে গেছেন তা আজও বিস্ময়কর ইতিহাস হয়ে আছে। উদাহরণ মদীনা সনদ।

ইসলামপূর্ব মদীনার অবস্থা কত ভয়াবহ ও যুদ্ধসংকুল ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছুদিন পূর্বেই মদীনার আওস ও খাজরাজ গোত্র নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী বু’আস যুদ্ধ শেষ করে। ওই যুদ্ধে এই দুই গোত্রের প্রথম সারির যোদ্ধারা প্রাণ হারায় এবং শেষাবধি আওস গোত্র পরাজিত হয়। এ পরাজয় মেনে নিতে না পেরে আওস গোত্র আবারও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যার অংশ হিসেবে আওস গোত্রের কয়েকজন প্রতিনিধি মক্কায় যায় কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে এবং ঘটনাক্রমে ওই প্রতিনিধি দলটির সাথে রসুল (সা.) এর সাক্ষাতও ঘটে। এতে বোঝা যায় মদীনাবাসী তখন এমন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল যখন আল্লাহর রহমত হিসেবে রসুলকে (সা.) কাছে না পেলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তারা যুদ্ধ করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যেত। এরকম একটি অবস্থায় আল্লাহর নবী কেবল তাদেরকে নিশ্চিত ধ্বংস থেকেই রক্ষা করলেন না, চিরশত্রু গোত্রদ্বয়কে কয়েক মাসের ব্যবধানে একে অপরের ভাই বানিয়ে দিলেন। যারা কিছুদিন আগেও একে অপরকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে ছিল বদ্ধ পরিকর, তারাই এতটা পরিবর্তিত হয়ে গেল যেন, একে অপরের জন্য জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত! আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এই কাজটি আল্লাহর রসুল কীভাবে করলেন?

ইতিহাসে পাই রসুল (সা.) মদীনায় হিজরতের পর প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে হাত দিয়েছিলেন তাহলো মদীনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে সনদ বা চুক্তির ভিত্তিতে তিনি মদীনার সকল গোত্রকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, এক উম্মাহ (Nation) হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, তার মূল কথাই ছিল মদীনার সার্বিক ‘নিরাপত্তা’ রক্ষা করা, আর কিছু নয়। এক গোত্র অপর গোত্রের উপর হামলা তো করবেই না বরং সবাই সবার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে। উম্মাহর একটি অংশ আক্রান্ত হলে অপর অংশ তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে যাবে।

এই চুক্তির মাধ্যমে দু’টি কাজ হলো। প্রথমত- সমগ্র মদীনার অভ্যন্তরভাগ থেকে যাবতীয় ভয়, আতঙ্ক, সন্ত্রাস দূর হলো; দ্বিতীয়ত- বহির্ভাগ থেকেও কোনো আক্রমণ হলে বা মদীনা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে তা প্রতিরোধ করার প্রস্তুতিও নেয়া হয়ে গেল। এভাবে মদীনার ইহুদি, পৌত্তলিক, মুসলিম, মুনাফিক, নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত জনগোষ্ঠী এমন একটি নিরাপত্তা বলয়ে প্রবেশ করল যা কিছুদিন আগেও কেউ কল্পনা করতে পারত না। একমাত্র আল্লাহর রসুলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সেটা সম্ভব হয়। উপরন্তু সারা বিশ্বের রহমত, রহমাতাল্লিল আলামিন কেবল ওই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, সেই নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য, তাঁর জাতিটিকে যাবতীয় ভয়-ত্রাস-আতঙ্ক থেকে মুক্ত রাখার জন্য সারাটাজীবন অতন্দ্র প্রহরীর মত সজাগ ও সচেতনও ছিলেন তিনি। 

হঠাৎ একবার মদীনার অদূরে শোরগোল শোনা গেল। শোরগোল শুনে মদীনাবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠল। সবাই ভাবতে লাগল বুঝি শত্রু বাহিনী হামলা করতে এসেছে। অনেকেই শব্দটার উৎস খোঁজার জন্য অগ্রসর হলো। এমন সময় দেখা গেল নবী কারিম (সা.) সেদিক থেকেই ফিরে আসছেন। তিনি সবার আগে ঘোড়ার শূন্যপৃষ্ঠে আরোহন করে সেদিকে ছুটে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসেই লোকদেরকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ঘাবড়িও না, কোনো ভয় ও আশঙ্কার কারণ নেই।’ (হাদীস)

এই হচ্ছেন বিশ্বনবী মোহাম্মদ, যিনি তাঁর দেশ, তাঁর জাতির এতটুকু বিপদের আশঙ্কা উদ্ভূত হওয়ায় কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একাই ছুটে গেছেন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। তারপর যখন নিশ্চিত হয়েছেন জাতির কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, কোনো বিপদের কারণ নেই, তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন এবং জাতিকেও অভয় প্রদান করেছেন। অথচ আজ সেই নবীর উম্মতের দাবিদার একটি শ্রেণি ইসলাম প্রতিষ্ঠার নাম করে যখন এখানে ওখানে রাস্তাঘাটে, দোকানপাটে, রেস্টুরেন্টে, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালে বোমা হামলা করে নিরীহ মানুষ খুন করে, ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে তখন অবাক না হয়ে পারা যায় না। যে নবীর সারাটা জীবন ব্যয় হলো যাবতীয় সন্ত্রাস, হানাহানি বন্ধ করে মানবজীবনে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য, সেই নবীর উম্মত দাবিদাররা যখন জনমনে ত্রাস সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডকে অতি পূন্যের কাজ মনে করে পালন করে তখন বোঝাই যায় গত ১৪০০ বছরে ইসলামের বিকৃতির ক্ষত কত গভীরে পৌঁছে গেছে। এতখানি বিকৃতি এসেছে যে দ্বীনের উদ্দেশ্যই আমূল পাল্টে গিয়ে একদম বিপরীতমুখী হয়ে গেছে। একটা ছিল উত্তরমুখী অপরটি দক্ষিণমুখী। একটা পূর্বমুখী অপরটা পশ্চিমমুখী। যাহোক এ নিয়ে যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আপাতত রসুলের আগমনের উদ্দেশ্য আলোচনা করতে গিয়ে আমরা যে বিষয়টিকে বারবার সামনে পাচ্ছি অর্থাৎ অনৈক্য, সংঘাত, হানাহানি, রক্তপাত নির্মূল করে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি, সেটার ভেতরে প্রবেশ করা যাক। (চলবে)

 (পর্ব ০৭)

 (পর্ব ০৫)

১ comment

  1. 1
    মাহফুজ

    ইসলাম প্রতিষ্ঠার নাম করে এখানে ওখানে রাস্তাঘাটে, দোকানপাটে, রেস্টুরেন্টে, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালে বোমা হামলা করে নিরীহ মানুষ খুন করা যেমন অন্যায়, তেমনি জঙ্গি নিধনের নামে নিরীহ মুসলিম নারী-শিশু ও পুরুষদের উপর ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করাও অন্যায়।

    রসুল (সা.) মদীনায় হিজরতের পর মদীনা সনদ বা চুক্তির ভিত্তিতে মদীনার সকল গোত্রকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। প্রয়োজনে যেমন তিনি সন্ধি করেছিলেন, তেমনি আবার অনেক যুদ্ধও করেছিলেন। আশাকরি সে বিষয়েও কিছু বলবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.