«

»

Dec ১৪

জীবন কী? আসুন বোঝার চেষ্টা করি

মানুষ একা থাকতে পারে না। মানুষকে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হয়। একজনের চাহিদা অন্যজনকে পূরণ করতে হয়। তার চাহিদা আবার আরেকজন পূরণ করে। একে অপরের মায়ায় আবদ্ধ হয়। একের দুঃখ অপরকে পীড়া দেয়। একের আনন্দ অন্যের মুখে হাসি ফোটায়। সবই ঠিক আছে। কিন্তু দিনশেষে একটি নির্মম বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে, প্রত্যেকটি মানুষ একে অপর থেকে আলাদা, একক। 

আপনার একটি নাম আছে, সংসার আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে, পাড়া-প্রতিবেশী-বন্ধু বান্ধব আছে। আপনি কারো বাবা, কারও স্বামী, কারও ভাই, কারও সন্তান। কিন্তু সবার ঊর্ধ্বে আপনার একটি স্থায়ী পরিচয় আছে- আপনি মানুষ এবং অবশ্যই স্রষ্টার একটি ‘একক’ সৃষ্টি। আমার আজকের কথাগুলো সেই ‘একক’ মানুষটির জীবনের ‘উদ্দেশ্য’ ও ‘সার্থকতা’ নিয়ে। প্রথমেই জানা যাক মানুষের জীবন আসলে কী।

‘জীবন’ আর কিছু নয়, এক খণ্ড ‘সময়’। পৃথিবীতে আপনার জন্য এক খণ্ড সময় বরাদ্দ করা হয়েছে যেন এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে আপনি নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে পারেন। সময় শেষ তো নিজেকে প্রমাণের সুযোগও শেষ।

এই ক্ষুদ্র সময়টুকুতে আপনার যে পথচলা তা কখনই মসৃণ হবে না। নানামুখী সংঘাত আসবে। বিপদের পর বিপদ আসবে। ঝামেলার বোঝা এই হালকা হবে তো এই ভারী। চাওয়া-পাওয়ার অমীমাংসিত সমীকরণ যেন মিলবেই না। ক্ষণে ক্ষণে বিস্তৃত হবে মায়ার জাল। এই আনন্দ এই বেদনা। এই উচ্ছ্বাস তো এই হতাশা। উত্থানের পর আসবে পতন, দিনের পর রাত, বৃষ্টির পর খরা। 

জীবনের পথ চলবেন মানেই এই উত্থান-পতন, রোদ-বৃষ্টির মুখোমুখী আপনাকে হতেই হবে। এগুলো আপনার জন্য পরীক্ষা, নিজেকে প্রমাণের সুযোগ। একেকটি পরীক্ষায় পাশ করে মর্যাদার একেকটি স্তর অতিক্রম করবেন আপনি। যত সংঘর্ষের মুখোমুখী হবেন, তত আপনার আত্মার শক্তি বাড়বে, আপনি তত স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাবেন। পরীক্ষা যত কঠিন হবে, মর্যাদাও তত বেশি হবে। শুধু শর্ত হচ্ছে- আপনাকে সত্যের ধারক হতে হবে।

মানুষের সামনে মূলত দুইটি পথ। ন্যায় ও অন্যায়। সত্য ও মিথ্যা। পরিণতিও দুইটি- শান্তি ও অশান্তি। জান্নাত ও জাহান্নাম। আপনি ন্যায়ের পক্ষ নিলে অন্যায়ের পক্ষ কিন্তু বসে থাকবে না। কখনও প্রলোভনের মাধ্যমে, কখনও মায়ায় জড়িয়ে, কখনও ভীতি-প্রদর্শনের মাধ্যমে আপনাকে প্ররোচিত করা হবে অন্যায়ের সাথে আপস করতে, অন্যায়ের সামনে পরাজয় স্বীকার করে নিতে। এই প্ররোচনাকে উপেক্ষা করা সহজ নয়। অনেক কঠিন। আর কঠিন বলেই যারা তা উপেক্ষা করতে পারবে আল্লাহর কাছে তারা সম্মানিত হবেন। কষ্ট করেই কেষ্টকে পেতে হয়।

আপনার সুবিধা হচ্ছে- যতক্ষণ আপনার সামনে জীবনের লক্ষ্য পরিষ্কার থাকবে, আপনি জানবেন যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াই আপনার দায়িত্ব, ততক্ষণ আপনি হাসিমুখে সমস্ত বাধা-প্রতিবন্ধকতা, নির্যাতন, অপমান সহ্য করতে পারবেন। কারণ আপনি জানেন এসবে হতাশ হবার কিছু নাই, এই বাধা-প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করার জন্যই আপনার আগমন। এর মাধ্যমেই আপনি স্বমহীমায় উদ্ভাসিত হবেন, আপনার জীবন সার্থক হবে। সুতরাং আপনি শত কষ্টের মধ্যেও শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পাবেন। জীবন যাবে, কিন্তু জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আসবে না।

অন্যদিকে যাবতীয় সংঘর্ষ থেকে মুখ ফিরিয়ে ঘরের কপাট লাগিয়ে বসে থাকার অর্থ আপনি পরীক্ষায় বসতেই চাচ্ছেন না। আপনি সারাজীবন একই ক্লাসে থাকতে চাচ্ছেন। নিজেকে প্রমাণের যে সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন তা অজ্ঞতাবশত নষ্ট করছেন। যাবতীয় সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে আপনি যে জীবন নির্বাহ করছেন তাকে মানবজীবন বলে না, ওটা পশুর জীবন। ‘খাই দাই-মরে যাই’ মার্কা জীবনযাপন করার জন্য মানুষ পৃথিবীতে আসে নি। যারা এভাবে জীবনের অপচয় করছেন তারা কার্যত নিজের প্রতি অবিচার করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.