«

»

Jan ০১

হেযবুত তওহীদ কেন তওহীদের দিকে ডাকে?

পবিত্র কোর’আনের সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হচ্ছে তওহীদ। কোর’আন-হাদীসের সর্বত্র তওহীদের যে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে তা স্বভাবতই অন্য কোন কিছুতে নেই। শত শত আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন আসমান জমিনের একমাত্র ইলাহ হচ্ছেন তিনি এবং মানবজাতিকে উপদেশ দিয়েছেন একমাত্র তাঁকেই ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করতে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকতে। সবগুলো আয়াত উল্লেখ করতে গেলে লেখার কলেবর বড় হয়ে যাবে। আমরা কেবল কয়েকটি আয়াত পাঠকদের সামনে তুলে ধরব, আশা করি চিন্তাশীল ও সত্যনিষ্ঠ পাঠকরা এই কয়টি আয়াতেই চিন্তার খোরাক পেয়ে যাবেন-

  • পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা তওবা করে (তওহীদে) ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তীত করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (ফোরকান: ৭০)
  • ‘তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, অতএব তোমরা তাঁকেই ডাকো, তাঁর প্রতি আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। (মু’মিন: ৬৫)’
  • আপনি তারই অনুসরণ করুন, যা আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি ওহী হয়। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আর আপনি মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন। (আন’আম: ১০৬)
  • তারা তাদের আলেম ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহকে বাদ দিয়ে। এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র ইলাহর ইবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি পবিত্র। (তওবা: ৩১)
  • তোমরা গ্রহণ করো না দুইজন ইলাহকে; তিনিই একমাত্র ইলাহ। (নাহল: ৫১)
  • আপনার পূর্বে আমি সকল রসুলকে এই আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। (আম্বিয়া: ২৫)
  • তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। সুতরাং তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর এবং বিনীতদেরকে সুসংবাদ দাও (হাজ্জ: ৩৪)
  • আর তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। দুনিয়া ও আখেরাতে সমস্ত প্রশংসা তাঁরই; আর হুকুমের অধিকার তাঁরই এবং তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে (কাসাস: ৭০)
  • বলুন হে আহলে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে এসো, যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান, তা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে প্রভু বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।’ (ইমরান: ৬৪)
  • আর তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, শরীক কর না তাঁর সাথে অন্য কাউকে। (নিসা: ৩৬)
  • যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্নপর্যায়ের সমস্ত পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে তো মহাপাপ করল। (নিসা: ৪৮)
  • নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। (মায়েদা: ৭২)
  • এসো, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না . . . (আন’আম: ১৫১)

এছাড়া বোখারী, মুসলিমসহ বহু হাদীস পেশ করা যায় যেগুলোতে আল্লাহর রসুল বলেছেন আল্লাহর সার্বভৌমত্বে, সেরাতুল মুস্তাকীমে অর্থাৎ তওহীদে যে ব্যক্তি অটল থাকবে, বিচ্যুত হবে না, তার পৃথিবী ভর্তি গোনাহও তাকে জান্নাত থেকে ফেরাতে পারবে না। আল্লাহর নবী বলেছেন- বান্দাদের সাথে আল্লাহর চুক্তি (Contract) হচ্ছে যে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে হুকুমদাতা হিসেবে মানবে না, তাহলেই আল্লাহ তাদের কোনো শাস্তি দেবেন না (জান্নাতে প্রবেশ করাবেন) (হাদীস – মো’য়াজ (রা.) থেকে বোখারী, মুসলিম)। তিনি আরও বলেছেন- যে হৃদয়ে বিশ্বাস করে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মোহাম্মদ (সা.) তাঁর রসুল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন (হাদীস- ওবায়দাহ বিন সোয়ামেত (রা.) ও আনাস (রাঃ) থেকে বোখারী, মুসলিম)। আরেক জায়গায় বলেছেন, জান্নাতের চাবি হচ্ছে তওহীদ (হাদীস- মু’য়ায বিন জাবাল (রাঃ) থেকে আহমদ), যদিও বর্তমানে বিকৃত আকীদার কারণে নামাজকে জান্নাতের চাবি বলে প্রচার করা হয়। আনাস (রা.) বলেন ‘আমি রসুলাল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! যদি তুমি জমিন ভর্তি গুনাহ করে থাক, তারপর যে অবস্থায় তুমি আমার সাথে কাউকে শরিক করনি সে অবস্থায় তুমি আমার নিকট আসলে, আমি তোমার কাছে জমিন ভর্তি ক্ষমা নিয়ে উপস্থিত হব (আনাস রা. থেকে তিরমিযি)’।

একদিন আবু তালীব শাতবুল মামদুদ (রা.) রসুলাল্লাহর কাছে এলেন অথবা একজন খুবই বৃদ্ধ ব্যক্তি লাঠিতে ভর দিয়ে রসুলাল্লাহর নিকট এলেন যার চোখের পাতা তার চোখের সাথে লেগে গিয়েছিল। তিনি রসুলাল্লাহর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, যদি কোনো লোক সব ধরনের পাপ করে থাকে, এমন কোনো পাপ নেই যা সে করেনি অর্থাৎ ছোট বড় সব ধরনের পাপই করেছে; তার পাপ যদি দুনিয়াবাসীর উপর বন্টন করে দেয়া হত তাহলে তাদেরকে ধ্বংস করে দিত। এর কি তওবা করার সুযোগ রয়েছে? এই কথা শুনে আল্লাহর রসুল শুধু নিশ্চিত হতে চাইলেন যে, তিনি তওহীদের ঘোষণা দিয়েছেন কিনা। তিনি হ্যাঁসূচক জবাব দিলে রসুল (সা.) তাকে ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ পরিহার করার উপদেশ দিয়ে নিশ্চয়তা দিলেন যে, তার সব পাপকে কেবল ক্ষমা করে দেওয়া হবে তাই নয়, সেগুলোকে পূন্য দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে দেওয়া হবে। (তবারানী, বাজ্জার; আল-মুনজেরী তারগীব গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, এর সনদ মজবুত ৪/১১৩; ইবনে হাজার ইসাবা গ্রন্থে বলেন, হাদীসটি শর্ত মোতাবেক রয়েছে ৪/১৪৯)

ইবনে হিববান এবং আল হাকেম আবু সাইদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসুলাল্লাহ বলেন, ‘মুসা (আ.) একবার আল্লাহকে বললেন, হে আল্লাহ, আমাকে এমন একটি বিষয় শিক্ষা দিন যা দ্বারা আমি আপনাকে সবসময় স্মরণ করব এবং আপনাকে আহ্বান করব। আল্লাহ বললেন, মুসা তুমি বলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। মুসা (আ.) বললেন, এটা তো আপনার সকল বান্দাই বলে থাকে। আল্লাহ বললেন, হে মুসা, আমি ব্যতীত সপ্তাকাশ ও এর মাঝে অবস্থানকারী সকল কিছু এবং সপ্তজমিন যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’কে আরেক পাল্লায় রাখা হয় তাহলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র পাল্লা বেশি ভারী হবে।’ ঠিক একই ধরনের আরেকটি হাদীস পাই আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) এর বর্ণনায়। আল্লাহর রসুল বলেন, কেয়ামতের দিন আমার উম্মতের এক ব্যক্তিকে সকল মানুষের সামনে ডাকা হবে, তার সামনে নিরানববইটি (পাপের) পুস্তক রাখা হবে এবং একেকটি পুস্তকের পরিধি হবে চক্ষু দৃষ্টির সীমারেখার সমান। এরপর তাকে বলা হবে, এই পুস্তকে যা কিছু লিপিবদ্ধ হয়েছে তা কি তুমি অস্বীকার কর? উত্তরে ঐ ব্যক্তি বলবে, হে আল্লাহ আমি তা অস্বীকার করি না। তারপর বলা হবে, এর জন্য তোমার কোনো আপত্তি আছে কিনা? অথবা এর পরিবর্তে তোমার কোনো নেক কাজ আছে কিনা? তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বলবে, না তাও নেই। অতঃপর বলা হবে, আমার নিকট তোমার কিছু পূন্যের কাজ আছে এবং তোমার উপর কোনো প্রকার অত্যাচার করা হবে না, অতঃপর তার জন্য একখানা কার্ড বের করা হবে তাতে লেখা থাকবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। তখন ঐ ব্যক্তি বিস্ময়ের সাথে বলবে, ‘হে আল্লাহ, এই কার্ড খানা কি নিরানববইটি পুস্তকের সমতুল্য হবে?’ তখন বলা হবে, ‘তোমার উপর কোনো প্রকার অত্যাচার করা হবে না। এরপর ঐ নিরানববইটি পুস্তক এক পাল্লায় রাখা হবে এবং ঐ কার্ড খানা এক পাল্লায় রাখা হবে, তখন ঐ পুস্তকগুলোর ওজন কার্ড খানার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য হবে এবং কার্ডের পাল্লা ভারী হবে। (আত তিরমিযি, হাদিস নং ২৬৪১। আল হাকেম ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৫-৬)

আরেক বর্ণনায় দাহিয়া কালবী নামের একজন সাহাবীর তওহীদ গ্রহণের ঘটনা পাওয়া যায়। তিনি সত্তরজন জীবন্ত কন্যা সন্তানকে হত্যা করেছিলেন। তিনি যখন আল্লাহর রসুলের কাছে তওহীদের ঘোষণা দিতে আসলেন, আল্লাহর রসুল প্রথমত তাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে, তার পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে কিন্তু যখন জানতে পারলেন এই লোক এত নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে তখন তিনিও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন, যে এতবড় পাপ আল্লাহ ক্ষমা করবেন কিনা। অতঃপর জিবরাইল (আ.) এসে রসুলকে আশ্বস্ত করলেন যে, যে মুহূর্তে দাহিয়া কালবী ঘোষণা করেছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সেই মুহূর্তে তার অতীত জীবনের ছোট-বড় সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’ এভাবে হাদীস দিতে গেলে বহু হাদীস দেখানো যায় যেগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তওহীদের ঘোষণা দিলে আর কোনো পাপ, কোনো ব্যক্তিগত অপরাধই মানুষকে জান্নাত থেকে ফেরাতে পারে না। আরও একটি হাদীস বলার লোভ সামলাতে পারছি না। একদিন রসুলাল্লাহ বললেন, ‘যে ব্যক্তি বলল আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই সে জান্নাতে যাবে।’ আবু যার (রা.) বললেন, যদি সে চুরি ও ব্যভিচার করে তবুও জান্নাতে যাবে? আল্লাহর রসুল বললেন তবুও জান্নাতে যাবে। এ কথায় সাহাবী কতটা বিস্মিত হলেন তা বোঝা যায় এ থেকে যে, তিনি বারবার রসুলকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন- চুরি ও ব্যভিচার করার পরও? তখন আল্লাহর রসুল বললেন, হ্যাঁ, সে চুরি করলেও, ব্যভিচার করলেও, এমনকি আবু যরের নাক মাটিতে ঘসে দিলেও (হাদীস: বোখারী ও মুসলিম)।

এভাবে কোর’আনের আয়াত ও হাদীস বহু উল্লেখ করা যায়। কোর’আন হাদিসের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রবুবিয়্যাতের ঘোষণা। যারা বোঝার সামর্থ্য রাখেন তাদের জন্য সবগুলো উল্লেখের দরকার নেই, উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস কয়টিই যথেষ্ট হবে। আর যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন যে, তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে, বোঝালেও বুঝবে না, দেখালেও দেখবে না, তারা কোর’আন হাদিসের মহাপণ্ডিত হয়ে গেলেও তওহীদের গুরুত্ব বুঝবেন না। কাজেই তাদের জন্য হেদায়াত কামনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই আমাদের।

এই যে কোর’আনের আয়াত ও হাদীসগুলো উল্লেখ করা হলো, যেগুলোতে দেখা যাচ্ছে কেবল তওহীদের স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে ছোট ছোট অপরাধ তো বটেই, এমনকি চুরি, ব্যভিচার, হত্যা সমস্ত অপরাধকেই ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে- এই আয়াতগুলো ও হাদীসগুলো কিন্তু সবার অজানা বা অজ্ঞাত নয়। কোর’আনে ও হাদীসে যেহেতু উল্লেখ আছে, কাজেই লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিনিয়ত পড়ছেন, আলেমরা মোহাদ্দীসরা মোফাস্সিররা এগুলোর শানে নজুল বের করছেন, বই লিখছেন, ব্যাখ্যা করে ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদিতে জনগণকে শোনাচ্ছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষ পাড়া কাঁপিয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র জিকিরও করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁর রসুলের মাধ্যমে তওহীদের বাণী পাঠালেন, সমস্ত পৃথিবী থেকে অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সেই শান্তির দেখা মিলছে না। সমস্ত পৃথিবী আজ ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমায় ভর্তি এবং আজকের মত এত অন্যায়, অপরাধ, অশান্তি মানবজাতির ইতিহাসে আর কখনও ঘটে নি। এক কথায় বলতে চাইলে যদিও আমরা ১৬০ কোটি মুসলমান ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কলেমা পড়ছি, কিন্তু কার্যত ইবলিসেরই লক্ষ্যপূরণ হয়ে আছে। এমন তো হবার কথা নয়। যে তওহীদের ঘোষণা দিলে যাবতীয় অন্যায়, অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা সেই তওহীদ কেন আমাদেরকে মুক্তি দিতে পারছে না?

এই প্রশ্নের দুইটি উত্তর হতে পারে। হতে পারে আল্লাহ ইবলিসের চক্রান্ত থেকে বাঁচার জন্য যুগে যুগে নবী-রসুল পাঠিয়ে এবং সর্বশেষ আখেরী নবী মোহাম্মদ (সা.) কে পাঠিয়ে বনি আদমকে যে তওহীদের রাস্তা দেখিয়েছেন সেটা শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছে (নাউজুবিল্লাহ), আর যদি তা না হয় (অবশ্যই তা হবার নয়, কারণ আল্লাহ হচ্ছে সোবহান, ত্রুটিহীন, তাঁর বিধান ব্যর্থ হতে পারে না) তাহলে এটাই দাঁড়ায় যে, আল্লাহর রসুল যে তওহীদের ঘোষণা দিয়েছেন, যে তওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন এবং যে তওহীদ প্রতিষ্ঠার ফলে অর্ধপৃথিবী থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অনিরাপত্তা দূর হয়ে গিয়েছিল সেই তওহীদ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তৃতীয় কোনো সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তবে এই কথাটি অনেকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারবেন না এবং পারবেন না বলেই আমরা হেযবুত তওহীদ যখন জাতিকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানাই, তখন অনেকেই অভিযোগের সুরে বলেন, ‘আমরা তো আল্লাহর একত্ববাদে ঈমান রাখি, আল্লাহর প্রতি ঈমান আছে বলেই আমরা নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, হজ্ব করি, যাকাত দেই, মিলাদ মাহফিল করি। ঈমান না থাকলে তো আমল করতাম না। তাহলে হেযবুত তওহীদ কেন আমাদেরকে কলেমা তওহীদে ঈমান আনতে বলে? অন্য ধর্মের লোকদেরকে বলুক, আমরা তো তওহীদেই আছি।’

এখানেই তারা সাংঘাতিক ভুলটি করেন। তারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখেন এতে সন্দেহ নেই। আল্লাহ আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্র, বৃক্ষরাজি, তরুলতা সমস্তকিছু সৃষ্টি করেছেন, মানুষকেও সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের রিজিকদাতা, পালনকর্তা এতেও সন্দেহ নেই। এই বিশ্বাস আছে বলেই তো বিবিধ প্রকার আমল করা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই বিশ্বাস থাকা মানেই কি তওহীদে ঈমান থাকা? আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস থাকলেই এবং নামাজ রোজা উপাসনা করলেই যে কেউ মো’মেন হয়ে যায় না তা পরিষ্কার হয়ে যায় রসুলের একটি হাদীস থেকে। রসুল (সা.) আখেরী জামানা স¤পর্কে বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন- (১) ইসলাম শুধু নাম থাকবে, (২) কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, (৩) মসজিদসমূহ জাঁকজমকপূর্ণ ও লোকে লোকারণ্য হবে কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না, (৪) আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব, (৫) তাদের তৈরি ফেতনা তাদের ওপর পতিত হবে। [হযরত আলী (রা.) থেকে বায়হাকী, মেশকাত]।

পাঠক খেয়াল করুন- রসুল (সা.) কী বললেন? এত নামাজী থাকবে যে, মসজিদ লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে এবং নামাজ পড়াকে বা আল্লাহর উপাসনা করাকে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হবে তা বোঝা যায় এই থেকে যে, মসজিদগুলোকে জাঁকজমকপূর্ণ করে ফেলা হবে। কিন্তু আল্লাহর রসুল বললেন এতকিছু করেও তারা হবে পথভ্রষ্ট, তাদের মধ্যে হেদায়াহ থাকবে না। হেদায়াহ হচ্ছে একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া অর্থাৎ এই হাদিসে যাদের কথা বলা হচ্ছে তারা খুব ভালো মুসল্লি হবে বটে, কিন্তু আল্লাহকে তারা একমাত্র ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে নিবে না। আরেকটি হাদিস উল্লেখ না করলে বিষয়টি অপূর্ণ থেকে যাবে। আল্লাহর রসুল বললেন, ‘এমন সময় আসবে মানুষ রোজা রাখবে কিন্তু তা হবে কেবল উপবাস (রোজা কবুল হবে না), তাহাজ্জুদ পড়বে কিন্তু তা হবে কেবল ঘুম নষ্ট (নামাজ কবুল হবে না) (আবু হোরায়রা (রা.) থেকে সুনানে ইবনে মাজাহ)।’ প্রথমত, এই হাদীসে আল্লাহর রসুল রোযা ও তাহাজ্জুদ না বলে অন্য কোনো আমলের কথাও বলতে পারতেন। কিন্তু বেছে বেছে ফরদ আমলগুলোর মধ্যে তিনি রোযার কথা বললেন এবং নফলগুলোর মধ্যে তাহাজ্জুদের কথা বললেন কেন? কারণ এই দুইটি আমল এমন যা কখনও লোক দেখানোর জন্য করা যায় না, একমাত্র আল্লাহর প্রতি মোকাম্মাল ঈমান থাকলেই তা সম্ভব। আল্লাহর রসুল বোঝালেন তিনি যাদের ব্যাপারে কথাগুলো বলেছেন তাদের গলদটা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসে নয়, আন্তরিকতায় নয়, তাদের গলদ অন্যখানে! দ্বিতীয়ত, কোর’আন ও হাদীসের বর্ণনা থেকে আমরা পূর্বে দেখে এসেছি যে, আল্লাহ কেবল তাদের আমলকেই কবুল না করার ঘোষণা দিয়েছেন যারা তওহীদের স্বীকৃতি দিবে না। অতএব এই হাদীসে যাদের কথা আল্লাহর রসুল বলেছেন তারা ব্যক্তিগত জীবনে পাক্কা মোকাম্মাল বিশ্বাসী হলেও আল্লাহ মানুষের কাছে যে তওহীদের স্বীকৃতি চান সেই জায়গায় তারা হবে ব্যর্থ। তারাও তওহীদহীন মুসল্লিদের মতই তওহীদহীন রোজাদার ও তওহীদহীন তাহাজ্জুদী! প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে?

এই প্রশ্নেরই উত্তর আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর এক বান্দা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর মাধ্যমে মানবজাতিকে দান করেছেন। তিনি আজ থেকে বাইশ বছর আগেই বই লিখে প্রকৃত তওহীদকে মানবজাতির সামনে তুলে ধরেছেন এবং সেই তওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্যই হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছে। এমামুয্যামান বলেছেন, বর্তমানে পৃথিবীর কোথাও প্রকৃত তওহীদ প্রতিষ্ঠিত নেই এবং তওহীদের যে ধারণা পৃথিবীময় অধিকাংশ মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে চালু আছে সেটা বিকৃত ধারণা। বর্তমানে ইলাহ শব্দের অর্থ করা হয় উপাস্য। তওহীদের কলেমার অর্থ করা হয় আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ তো অবশ্যই উপাস্য, কিন্তু এটা এই দ্বীনের মূলমন্ত্র নয়, যে মূলমন্ত্রের স্বীকৃতি দিলে অন্য কোনো গুনাহের কাজ কাউকে জান্নাত থেকে ফেরাতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে ইলাহ হচ্ছেন সেই সত্তা যার হুকুম মানতে হয়, জীবনের যে অঙ্গনে তাঁর কোনো বক্তব্য আছে সেখানে অন্য সকল হুকুম প্রত্যাখ্যান করতে হয়, অর্থাৎ সর্বময় হুকুমদাতা। যেমন অর্থনৈতিক অঙ্গনে আল্লাহর হুকুম হচ্ছে সুদ হারাম। কাজেই যারা আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ বা হুকুমদাতা হিসেবে গ্রহণ করবেন তাদের অর্থনৈতিক জীবন হবে সুদমুক্ত। তারা সুদভিত্তিক বা সুদসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করবেন এবং আল্লাহ যে ব্যবস্থা নাজেল করেছেন সেটাকে কার্যকর করবেন। একইভাবে আল্লাহ জাতির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করাকে নিষিদ্ধ করেছেন। কাজেই তওহীদে যাদের ঈমান আছে তারা এমন কোনো রাজনৈতিক সামাজিক বা পারিবারিক ব্যবস্থাকে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না যেটার কারণে জাতির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়। এক কথায় ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’ এই কলেমার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তিজীবন থেকে আরম্ভ করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, বিচারিক ইত্যাদি জীবনের সমস্ত অঙ্গনে আল্লাহকে একমাত্র হুকুমদাতা-বিধানদাতা হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া এবং আল্লাহর হুকুমপরিপন্থী সমস্ত হুকুম, বিধান, ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা। এই ঘোষণা যদি কেউ দেয় তাহলে তিনি হবেন তওহীদের সাক্ষ্যদানকারী, স্বীকৃতিদানকারী, তার জান্নাত নিশ্চিত। অন্যদিকে এই তওহীদের বিপরীতে শেরক সম্বন্ধে আল্লাহ বলেছেন- আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন, কিন্তু শেরক অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুম মেনে নেওয়াকে কখনই ক্ষমা করবেন না (নিসা: ৪৮)। এমনকি নবী-রসুলদের মধ্যেও যদি কেউ শেরক করতেন তাহলে তার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যেত (আন’আম: ৮৮)। শেরক কতটা অমার্জনীয় অপরাধ তা আরও পরিষ্কার বোঝা যায় যখন কোর’আনে আল্লাহ তাঁর সবচাইতে প্রিয় বান্দা তাঁর আখেরী নবীকেও সতর্ক করে বলে দিচ্ছেন- হে নবী, আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহি করা হয়েছে যে, যদি আল্লাহর সঙ্গে আপনি অংশীদার স্থাপন করেন, তাহলে আপনার সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন (সুরা যুমার: আয়াত ৬৫)। এত গর্হিত অপরাধ শেরক, অথচ পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, আজ আমরা যারা নিজেদেরকে মো’মেন, মুসলিম ও উম্মতে মোহাম্মদী বলে বিশ্বাস করে আত্মতৃপ্তি লাভ করি আমরা আপাদমস্তক তাতে ডুবে আছি এবং তার কারণে আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পৃথিবীর সমস্ত জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপমানিত ও গণহত্যার শিকার হচ্ছি। সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহকে একমাত্র হুকুমদাতা হিসেবে গ্রহণ করা আমাদের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়, আমাদের কাছে মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বীনের খুঁটিনাটি, মাসলা-মাসায়েল, ওজু, গোসল, হায়েজ নেফাজ, ঢিলা, কুলুখ, মেসওয়াক, পাগড়ি, পাঞ্জাবি, টুপি, তসবিহ ইত্যাদি। আমরা উপাসনা-আরাধনায় আছি, খুব ভালোভাবেই আছি। আমাদের লক্ষ লক্ষ মসজিদ আছে। এসি মসজিদ, টাইলস মসজিদ, সোনার গম্বুজ বসানো মসজিদ। লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসা আছে, সেখানে নিখুঁত আরবি শেখানো হয়, ব্যাকরণ শেখানো হয়, কোর’আন-হাদীস, ফেকাহ, তাফসির, মাসলা-মাসায়েল মুখস্থ করানো হয়। এসবের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞান নিয়ে অসংখ্য আলেম, প-িত বের হন। মিলাদ, মাহফিল, ইজতেমা, হজ্ব ইত্যাদিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হয়। অনেকে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন। পাড়া-মহল্লা কাঁপিয়ে জিকির করেন। কিন্তু একটি জায়গায় আমরা ধরা এবং সেই জায়গাটি দ্বীনের একেবারে মূলমন্ত্র, ভিত্তিমূল, যেখানে কোনো আপস চলে না। সেটা হচ্ছে আমরা আল্লাহকে সর্বাঙ্গীন জীবনের একমাত্র হুকুমদাতা, বিধানদাতা অর্থাৎ ইলাহ হিসেবে মানছি না। আমরা আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানকে কয়েক শ’ বছর পূর্বেই পরিত্যাগ করে পাশ্চাত্যের তৈরি বিধানকে কার্যকর করে নিয়েছি। পাশ্চাত্যের তৈরি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, আইন, কানুন, দণ্ডবিধি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবন। আমাদের ইলাহ এখন আল্লাহ নেই, দ্বীন বা জীবনব্যবস্থাও ‘ইসলাম’ নেই। আমরা উপাসনা করছি আল্লাহর, আর হুকুম মানছি মানুষের। পূর্বে একটি হাদীস বর্ণনা করেছি যেখানে আখেরী যামানায় কি কি হবে সে সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণীতে আল্লাহর রসুল বলেছিলেন, তখন মসজিদসমূহ এমনভাবে পূর্ণ হবে যে, জায়গা পাওয়া যাবে না, কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না (বায়হাকী)। হেদায়াহ’ই হলো আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ, হুকুমদাতা বলে বিশ্বাস করা, মেনে নেওয়া অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। মুসল্লি দিয়ে ভর্তি মসজিদগুলোতে যদি হেদায়াহ’ই না থেকে থাকে তবে সেখানে আর রইল কী? আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ যে আইন, বিধান নাযেল করেছেন তা দিয়ে যারা হুকুম করে না তারাই কাফের, জালেম, ফাসেক (সুরা মায়েদা- ৪৪, ৪৫, ৪৭)। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে- আল্লাহর ভাষায় কার্যত কাফের, জালেম, ফাসেক হবার পরেও ব্যক্তিজীবনে আমরা খুব আমল করে যাচ্ছি, নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কড়া ফেলে দিচ্ছি, আর ভাবছি- খুব বোধহয় সওয়াবের কাজ করে ফেলছি, মহান আল্লাহ কতই না খুশি হচ্ছেন। এই ঈমানহীন আমল যে আল্লাহ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন সেটা বোঝার সাধারণ জ্ঞানটাও আমাদের লোপ পেয়েছে। (সমাপ্ত)

৪ comments

Skip to comment form

  1. 3
    Anonymous

    আসসালামু আলাইকুম।আমার একটা প্রশ্ন ছিল। কিন্তু উপরোক্ত বিষয় বহিঃভুত।তাই একটু সংকোচ নিয়ে প্রশ্ন করলাম।যদি ভহল হয় ক্ষমার চোখে দেখবেন।— রাসুল সঃ কী বিয়ের আগে ওনার বাকী স্ত্রিদের অনুমতি নিতেন?? জানালে খুবই উপকৃত হব।আল্লাহ সবার মজ্ঞল করুক। আমিন।

  2. 2
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    আমরা হেযবুত তওহীদ মনে করি (প্রকৃতপক্ষে জানি) আমরা সেরাতুল মোস্তাকীমে আছি 

     

    -- এ্‌ই দাবীত ওসব দলই করছে -- তাতে আপনি একটা নতুন দাবীদার হিসাবে আসলেন। পার্থক্য কোথায়? আমার মনে হয় এই বিচারের ভার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলেই ভাল হয়। আর দলগত ভাবে কোন জবাবদীহিতার সুযোগ নেই -- ব্যক্তিগত ভাবেই জবাবদীহিতা হবে। তাই দল-গোষ্ঠী নিরপেক্ষ হয়ে বরঞ্চ কোরান আর সুন্নাহর অনুসরনের চেষ্টা করই মনে হয় উত্তম পথ। সাইনবোর্ড লাগিয়ে সরল পথ দেখানোর মাঝেও একটা গোষ্ঠীবাজি আছে -- আছে একটা দলের বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য পোষনের বিষয়। সেইটাও একটা ভুল। দল একটাই তা হলো মুহাম্মদ (সঃ) এর দল -- সেইটাই একমাত্র পথ -- বাকীগুলো সবই বিভ্রান্তির পথ -- সেইটা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

    ‘….. তোমরা ঐ সকল মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা নিজেদের দ্বীনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়ে খুশি’ – (সূরা রুম ৩০/৩১-৩২)।

    … তারা সবাই যুক্তি দেখাবে, যারা তাদেরকে বিপথগামী করেছিল, তারাই প্রকৃত দোষী এবং সকলশাস্তি তাদের প্রাপ্য, কিংবা তাদেরকে দ্বিগুন শাস্তি দিতে হবে, অথবা কমপক্ষে তারা তাদেরঅনুসারীদের শাস্তির অংশীদার হোক! নেতারা পাল্টা … এরাই (পৃথিবীতে) আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল; অতএব তাদেরকে দ্বিগুন পরিমাণ (জাহান্নামের) আগুনের শাস্তি দাও!

    ভাল থাকবেন। 

     

  3. 1
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    লেখার শিরোনাম ছাড়া বাকীটা ঠিক আছে। অবশ্যই তাওহীদই একমাত্র আরাধ্য হওয়া কথা। সেখানে এর বত্যায় হচ্ছে -- আগেও হয়েছে। শিরোনামের কারনে একটা গোষ্ঠীর প্রচার হিসাবে দেখা যাবে এই লেখাটা। এইভাবে উম্মাকে গোষ্ঠীতে ভাগ করা কতটা যুক্তিযুক্ত সেই প্রশ্নটা থাকলো আপনার কাছে। কারন যদি একটা গোষ্ঠী সঠিক হিসাবে দেখা হয় তবে বাকী সবাই ভুল -- এই বিচারের দায়িত্ব নেওয়ার সাহস না থাকাই ভাল -- কারন এইটা আল্লাহর এখতিয়ার ভুক্ত। 

    1. 1.1
      মোহাম্মদ আসাদ আলী

      আবু সাঈদ ভাই, সহজ-সরলভাবে একটি চিন্তা করা যাক। সেরাতুল মোস্তাকীম নিশ্চয়ই হাজার হাজার হবে না; হবে মাত্র একটা। জান্নাতের রাস্তা হবে একটা। কিন্তু আমরা রাস্তা বানিয়েছি হাজার হাজার, কোনোটা সন্ত্রাসবাদী রাস্তা, কোনোটা সুফিবাদী রাস্তা, কোনোটা গণতান্ত্রিক রাস্তা, কোনোটা সমাজতান্ত্রিক রাস্তা, কোনোটা রাজতান্ত্রিক রাস্তা ইত্যাদি। আবার এই রাস্তাগুলোর মধ্যে গড়ে তুলেছি হাজারো অলি-গলি। একেভাগ একেক অলিতে গলিতে ঢুকে আছি। এখন যেহেতু প্রত্যেকের রাস্তা আলাদা, প্রত্যেকের দিক ভিন্ন ভিন্ন, কাজেই সবাই সেরাতুল মোস্তাকীমে আছে, সবাই সঠিক পথে আছে সে কথা বলার সুযোগ থাকল কি? বড়জোড় এর মধ্যে একটি রাস্তা সঠিক হতে পারে এবং কোনো রাস্তা সঠিক হবার অর্থই হচ্ছে ঐটা বাদে অন্যান্য যত রাস্তা অর্থাৎ ফেরকা, মাজহাব, দল, উপদল, তরিকা ইত্যাদি আছে সবগুলো বেঠিক, পথভ্রষ্টতা।

      আমরা হেযবুত তওহীদ মনে করি (প্রকৃতপক্ষে জানি) আমরা সেরাতুল মোস্তাকীমে আছি এবং মানবজাতিকে সেরাতুল মোস্তাকীমে আহ্বান করছি। এই যে নিজেদের হেদায়েতের ব্যাপারে অস্পষ্ট ধারণা না রাখা, সন্দেহ না রাখা, এটার মধ্যে খারাপ কিছু আছে কি? সন্দেহ থাকলে সেই রাস্তায় আমি উঠব কেন? যেটাতে নিশ্চিত থাকব যে, এই রাস্তা আমাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে আমি সেই রাস্তাতেই উঠব। কেন আমাকে সন্দেহগ্রস্ত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থাকতে হবে? আল্লাহ কাকে সঠিক রাস্তা দেখাবেন আর কাকে দেখাবেন না সেইটা আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত বিষয় অবশ্যই, কিন্তু যাকে সঠিক রাস্তা দেখিয়েছেন তিনি তো তার রাস্তাকে সঠিক বলতেই পারেন এবং কেবল পারেন নয়, বলতেই হবে। এটা ঈমানের অংশ।

Comments have been disabled.