«

»

Sep ১৫

কালজয়ী প্রতিভা : সৈয়দ মুজতবা আলী

অসাধারণ প্রতিভাধর রম্য রচয়িতা এবং পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪- ১৯৭৪)

রম্যলেখক ভালো কথা কিন্তু “পণ্ডিত” ১৮টি ভাষা যার দখলে, যে ভাষায় উনি কথা থেকে শুরু করে লিখতে পর্যন্ত পারেন, রাশিয়ান ভাষায় “প্রেম” উপন্যাস এর বাংলা অনুবাদ, জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট, বিশ্বভারতী থেকে স্নাকত, আল-আজহারে পড়াশুনা, তুলনাত্নক ধর্মচর্চা যার নখদর্পনে, গীতা যার সম্পূর্ণ মুখস্ত আর রবীন্দ্রনাথের গীতিবিতান টপ টু বটম ঠোঠস্ত তাকে যদি পণ্ডিত বলা হয় তাহলে কি আপত্তির থাকতে পারে?

তবে “সব কিছু যে পণ্ড করে সে পণ্ডিত” এটা অবশ্য সৈয়দদার ভাষ্য।

বিশ্বভারতীতে পড়াশুনা করার সময় একবার রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা নকল করে ভুয়া নোটিশ দিলেন, “আজ ক্লাশ ছুটি” .. ব্যাস যায় কোথায় সবাই মনে করল রবীন্দ্রনাথ ছুটি দিয়ে দিয়েছেন  🙂

রম্য রচয়িতা মুজতবা

আর রম্য রচনা? সেতো বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রবন্ধকে রম্য রচনার আংগিকে লেখা আর কোনো লেখক আছি কি? ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরুন “মুনির চৌধুরী” অসাধারণ রম্য লেখক কিন্তু “নাটক”, হুমায়ুন আহমেদ “উপন্যাস”, শিব্রাম ” উপন্যাস” বা “গল্প”, বার্নাড শ’ “নাটক”, জেরোম কে জেরোম “উপন্যাস” … কারণ কি? প্রবন্ধে “রম্য রচয়িতা” নেই কেনো?

উত্তর অতি সোজা “প্রবন্ধ কে রম্য ফ্লেভার দেয়া অতিব কঠিন কাজ। সেই কাজটাই পানির মতো করে দেখিয়েছেন সৈয়দ দা।  কী নাই তার লেখায়, “হিটলারের প্রেম থেকে শুরু করে ওমর খৈয়াম এর কবিতা কোনটাই বাদ যায়নি।”

যে বার দেশ পত্রিকায় তার লেখা “দেশে-বিদেশে” বের হতো না সে বার পত্রিকার কাটতি একলাফে কমে যেত।

মাস্টারপিস   

পাঠকের মনে হয়ত প্রশ্ন থাকতে পারে ২৫-৩০টা লেখার মধ্যে কোনটা মাস্টারপিস? নিসন্দেহে “দেশে বিদেশে”, তার প্রথম কীর্তি এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। আবদুর রহমানের বর্ণনায় চমৎকৃত হন নাই এমন পাঠক হয়ত পাওয়া যাবে না। সহজ সরল আফগানদের জীবন প্রণালী অসধারণ মুজতবা লেখনীতে মূর্ছনা ছড়িয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে স্টুডেন্ট ওয়েজ সমগ্র রচনাবলী প্রকাশ করেছে ৭ খণ্ড।

সাংসারিক মুজতবা আলী 

মুজতবা আলী একবার ছেলের নাম রাখলেন “ভজুরাম”, সবাই জিজ্ঞেস করল এমন বিদঘুটে নাম কেনো রাখলেন? তিনি বললেন “সন্তানের নাম রাখা এক বিশাল ঝামেলার ব্যাপার, নেপালে দারোয়ানকে বলে “ভজুরাম”, তাই গিন্নিকে এই নাম বললাম যাতে কখনও আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস না করে  🙂

জার্মানে মুজতবা আলী 

জার্মানে যে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন সে সময়ে “আইনস্টাইন” সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একবার জার্মানে জোকস প্রতিযোগিতা। লোকাল জার্মান ভাষায়। চিন্তা করা যায় বাংলাদেশের এক সিলটি সন্তান লোকাল জার্মান ভাষায় জোকস বলে সেকেন্ড প্রাইজ জিতে নিলো?

আড্ডাবাজ মুজতবা আলী 

যে কোনো আড্ডায় ঘন্টার পর ঘন্টা পৃথিবীর তাবত বিষয় নিয়ে অনর্গল বলে যাওয়া তার কাছে নস্যি। একবার এক রাষ্ট্রদূত তার সাথে সাক্ষাত করে আলাপ করলেন। পরে সেই রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, “আমি জীবনে এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর এত বিষয়ে আলাপ শুনি নাই, যেটা সৈয়দ মুজতবা আলী আমাকে শুনিয়েছিলেন অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে।”

তুলনাত্নক ধর্মচর্চা

একবার এক অনুষ্ঠানে এক হিন্দু পুরোহিত গীতা সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সভায় সৈয়দ মুজতবা আলী উপস্হিত ছিলেন। দূর্ভাগ্যক্রমে সেই পুরোহিত যে সব রেফারেন্স গীতা থেকে সংস্কৃত ভাষায় দিচ্ছিলেন তাতে কিছু ভুল ছিল। সৈয়দ মুজতবা আলী অবশেষে দাঁড়িয়ে উনার সমস্ত রেফারেন্স মূল সংস্কৃত ভাষায় কি হবে তা সম্পূর্ণ মুখস্হ বলে গেলেন। সমস্ত সভার দর্শক বিস্ময়ে হতবাক।

মুজতবা ও বাংলা ভাষা 

“বংগিয় শব্দকোষ” নামে একটি অভিধান বের হয়েছে কোলকাতা থেকে লেখক হরিচরন গংগোপাধ্যায়। বাংলায় বৃহত অভিধানগুলোর মধ্যে একটি। সেই হরিচরন গংগোপাধ্যায় মারা যাবার পূর্বে বলেছিল, “আমার অভিধান যদি কোনো সময় সংশোধন করার প্রয়োজন হয় তাহলে যেন সৈয়দ মুজতবা আলী সেটা করে।” তাহলে বুঝুন মুজতবার বাংলা ভাষায় কত গভীর দখল ছিল।

কিছু মুজতবা ডায়লগ

“বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না”

“আমার চাকরের নাম কাট্টু, কেননা সে পকেট কাটে, মাছের মাথা কাটে, আর প্রয়োজন হলে মনিবের মাথা কাটে”

“যে ডাক্তার যত বড় তার হাতের লেখা তত খারাপ”

মুজতবার একটি জোকস

এক লোকের গাড়ি খুবই পুরান, মরমর অবস্হা। লোকটিকে জিজ্ঞেস করা হলো ভাই আপনার গাড়ীর কি অবস্হা? লোকটি বলল “আমার গাড়ীর এতই খারাপ অবস্হা যে হর্ন ছাড়া আর সব অংশই শব্দ করে”

উপসংহার

এই প্রতিভাবান লেখককে কি আমরা তার উপযুক্ত মর্যাদা দিতে পেরেছি?

[লেখায় যদি কোনো রেফারেন্স ভুল থাকে, সহৃদয় পাঠক উল্লেখ করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব]

১০ comments

Skip to comment form

  1. 8
    এম ইউ আমান

    কথা সত্য, মুজতবা আলী কখনো অন্য কারো জিনিস নিজের মনে করে লিখে দেননি। সেটা তার দরকারো পড়েনি। তার কুট্টির জোকস গুলি ক্যারেক্টারিস্টিক। ওই যে… আস্তে কন কর্তা, ঘোড়ায় শুনলে হাসবো…
    আপনি দু’একটি মনে করতে পারলে আমাদের সাথে শেয়ার করুণ।
    অন এ সেপারেট নোট- মাঝে মাঝে ভাবি যে তিনি যদি আজ থাকতেন, কি চমৎকার একজন ব্লগার হতেন!

  2. 7
    nirmalya

    দাদা, সৈয়াদি জোকস বলে যেটি বললেন সেটি, শিব্রামের একটি গল্প, মুজতবা আলী যদি এটি বলে থাকেন (এখুনি মনে পড়ছে না), তবে রেফারেন্স দিয়েছিলেন নিশ্চই. কারণ উনি কখনো কারো মাল ঝেড়ে দিয়েছেন বলে মনে হয় না. তবে আর কোনো “সৈয়াদি জোকস” আপনার মনে পড়ল না…et least বহু প্রচলিত কুট্টির জোকসগুলি না হয় আবার বলতেন… তবে বেশ informative লেখা… পড়ে ভালো লাগলো …

    1. 7.1
      হাফিজ

      @nirmalya: @nirmalya:

      দাদা, সব জোকস আমি বললে আপনারা আছেন কিসের জন্য? শিবরামের যদি হয় তাহলে রেফারেন্স আপনে দিন, সেটাই ভালো।

  3. 6
    ফুয়াদ দীনহীন

    “যদি লেখায় কোনো রেফারেন্স ভুল থাকে , সহৃদয় পাঠক উল্লেখ করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব”-দেশে-বিদেশে

    -রেফারেন্স দিলেন কোথায় ?

    এডিট করে রেফারেন্স দিন। আগে আমি রেফারেন্স ভুল ধরিনি, বলেছিলাম রেফারেন্স বক্স বক্স আসছে। কোন বাংলা সংখ্যার পর দাড়ি দিয়ে, কিছু লেখলে সব সময় বক্স বক্স আসে, প্রায় সব ব্লগেই। তাই বল ছিলাম, সংখ্যার পর একটা ব্রেকেট দিয়ে বাকি নাম লিখলে বক্স বক্স আসবে না।

  4. 5
    সরোয়ার

    ‘দেশে-বিদেশে’ সাহেব পাঠকদের দাবী অনুযায়ী বরেণ্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে পোষ্ট দিলেন। গঠনমূলক আলোচনা মাধ্যমে তাঁর প্রতিভা সমাজে তুলে ধরতে হবে। তরুণ প্রজন্ম এসব খ্যাতনামা লেখকদের সম্পর্কে তেমন অবগত নন। লেখককে অশেষ ধন্যবাদ।

    সৈয়দ মুজতবা আলী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন এখানে

  5. 4
    সাদাত

    “যদি লেখায় কোনো রেফারেন্স ভুল থাকে , সহৃদয় পাঠক উল্লেখ করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব”

    -রেফারেন্স দিলেন কোথায়?

  6. 3
    সাদাত

    “যে বার দেশ পত্রিকায় তার লেখা “দেশে-বিদেশে” বের হতো না সে বার পত্রিকার কাটতি একলাফে কমে যেত।”

    আপনি বুঝি সেই দেশে-বিদেশে?

    1. 3.1
      হাফিজ

      @সাদাত:

      নারে ভাই, বিদেশ আর যাইতে পারলাম কই, আপনাদের ভালোবাসার টানে এই বাংলার মাটি কামড়ে পড়ে আছি। তাই “বিদেশে” বাদ দিয়ে শুধুই “দেশে”।

  7. 2
    ফুয়াদ দীনহীন

    পড়া যাচ্ছে না, সব বর্ণমালা আলাদা আলাদা দেখাচ্ছে। সেটিং ঠিক করুন।

  8. 1
    হাফিজ

    ফর্মেটিং কেনো নষ্ট হয়ে গেলো বুঝতে পারলাম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.