«

»

Apr ১২

বিক্ষিপ্ত সাংঘর্ষিক চিন্তা চেতনা

বাড়ির নাম “হ্যাপি গার্ডেন”।

পুরো পরিবার নিয়ে কর্তা এ বাড়িতে থাকেন।

বাবা প্রাক্তন জবরদস্ত সরকারী চাকুরে, এখন রিটায়ার্ড। মা চিরকালের গৃহিণী।

বাবা এবং মা উভয়েই ধার্মিক, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে এক ওয়াক্ত-ও কাযা হয় না। এর সাথে আছে কোরান তেলাওয়াত। গরীবদের মাঝে দানেও উদার হস্ত।

বাবার মত সন্তানেরাও উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের অধিকারী। বড় ছেলে ব্যারিস্টার, একমাত্র মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর ছোট ছেলে বিসিএস দিয়ে চাকরীতে জয়েন করেছে তা-ও তো কম দিন হলো না। এত ভালো ক্যারিয়ার, ভালো ফ্যামিলি …সবই ঠিক আছে; বাবা-মার কাছে মনে হয় সমস্যা একটাই; সন্তানদের সবাই  ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন তো বটেই বরং আরো এককাঠি সরেস; ধর্ম-কর্মের নাম শুনলেই তাদের এ্যালার্জি। বয়োবৃদ্ধ বাবা-মাকে ধর্ম নিয়ে বাধা দেয় না কারন তারা বয়স্ক, তার ওপর বাবা মা, তবে মাঝে মাঝে খোঁচা দিতে ছাড়ে না বাড়ির কেউই।

বাড়িতে পার্টি লেগে আছেই হরহামেশাই। কেউ বলতে পারবে না যে হ্যাপি গার্ডেনে আনন্দ নেই। সবাই আনন্দে আছে, শুধু মাত্র দুইজন ছাড়া। অবশ্য তাদের কথার দাম কে দেয়, মানুষ বৃদ্ধ হলে এমনিতেই খটমট স্বভাবের হয়ে যায়। তারমানে এই না যে বাড়ি দুই বৃদ্ধ ক্যাটক্যাটে স্বভাবের, তারা তাদের সন্তান এবং নাতি নাতনীদের চলার ধরণ পছন্দ করছে না, তবে তারা যে সবসময় ক্যাটক্যাট করছে এই কথা কেউ বলতে পারবে না। এটা হচ্ছে সন্তান আর নাতি নাতনীদের ধারনা যে বয়োবৃদ্ধ দুজন ক্যাটক্যাট করছে। এর কারন একটাই, “জেনারেশন গ্যাপ” বাড়ির সবার ধারণা।

আইনের লোক তো বাড়িতে আছেই উপরি হিসেবে সাথে আছে আবার সরকারী আমলা, তারপর-ও একদিন আইনের রক্ষাকারীরা এসে হাজির হলো। সবাই অবাক, এত হিম্মতওয়ালা পুলিশের লোক কবে হলো যে না জানিয়ে এবাড়িতে হামলা দেয়? এদেশে টাকাওয়ালা, ক্ষমতাওয়ালাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কখনোই হিম্মত থাকে না। তবে কথায় বলে “বাঘের উপরেও ঘোগ আছে”। সেই ঘোগের দাপটে-ই নিরীহ পুলিশ বাহিনী এসে হানা দিয়েছে বাঘের আস্তানায়।

বিশিষ্ট মন্ত্রীর টিনএজ ভাতিজী গত দুই দিন যাবৎ নিখোজ, হ্যাপি গার্ডেনের কর্তার টিনএজ বড় নাতি তার বিশেষ বন্ধু। দুইদিন আগে মন্ত্রী মহোদয়ের ভাতিজী, বিশেষ বন্ধু এবং আরো কিছু বন্ধু মিলে লং ড্রাইভে গিয়েছিলো। লং ড্রাইভ দোষের কিছু না, প্রায়শই তারা যেত। গান-বাজনা সাথে রঙ্গিন পানীয়। এতে কাজ না হলে আরো চড়া কিছু। দুইদিন আগেও তারা গিয়েছিলো এরকম লং ড্রাইভে এরপর থেকেই ভাতিজী নিখোঁজ। একদিন, দুইদিন বাসায় না ফেরা এমন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা না, ইন্টারনেটে একটা ভিডিও পাওয়া গেছে সেটাই অস্বাভাবিক। এরপরে ঘটনা সংক্ষিপ্ত, ঘটনা ধামাচাপা দিতে বেসামাল টাকা খরচ হলো, বাড়ি কর্তাসহ সবাই নাতিকে বাচানোর জন্য সব ধরনের চেষ্টা তদবির চালিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত “গুরু পাপে লঘু শাস্তি” ভোগ করে নাতি ঘরে ফিরে এল, শান্তি বজায় থাকলো। কর্তা মানে ধার্মিক বাবা থেকে নাতি নাতনী পর্যন্ত সবাই হাপ ছেড়ে বাঁচল আর চিন্তা করল “যাক মান সম্মান তো রক্ষা হলো”।

গল্প শেষ।

টীকা টিপ্পনী:

  • আমাদের দেশে বেশ কিছু বছর যাবৎ সন্তানদের পাঠ্যপুস্তকের জাহাজ বানানোর একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। এর ফলে কার সন্তান কোন ভালো স্কুলে পড়ে, ক্লাসে কততম হলো ইত্যাদি নিয়ে বাবাদের সাথে অফিসের কলিগ, বন্ধু, আত্মিয়দের আর মায়ের সাথে পাশের ফ্লাট, এলাকাতো ভাবী, বান্ধবী ইত্যাদিদের সাথে প্রতিনয়ত চলে খোঁচাখুচি। সন্তান ক্লাসে প্রথম না হলে, ভালো স্কুলে না পড়লে বাবা মার মান সম্মান শেষ। অপর দিকে মানবিকতা, নৈতিকতা চর্চার জন্য যে ধর্ম শিক্ষা প্রয়োজন তা থাকে পুরোপুরি অনুপস্থিত। দায়সারা গোছের একজন মৌলভী রাখা হয় যার কাজ হলো নামকাওয়াস্তে কোরান পড়ানো। শুদ্ধভাবে কোরান পড়ানো বা বুঝানো কোনটাই সেই মৌলভির দায়িত্বের মধ্যে ছিলো না, অবশ্য বাবা-মা চেয়েছেন সন্তান আরবীর সাথে সহজ হোক। শুদ্ধভাবে কোরান পড়ুক, বুঝুক, জানুক এবং নিয়মিত চর্চা করুক তা তারা চান নি। তারা চেয়েছেন সন্তান হোক টাকা বানানোর মেশিন, তথাকথিত স্ট্যাটাসের সিম্বল। সুতরাং প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে সন্তানরা তা-ই হয়। ততদিনে হারিয়ে যায় তাদের নীতি নৈতিকতা, বিবেক।
  • আমাদের সমাজে এখন এটা বহুল প্রচলিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে যে, বাবা-মা ধার্মিক, সৎ হওয়া সত্ত্বেও সন্তানরা ধর্ম বিদ্বেষী, নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত, স্বার্থান্বেষী, অসৎ।
  • কেউ যদি সুপারী গাছ বুনে তার থেকে আম আশা করে তা কি সে পাবে? উত্তর, না।
  • সুতরাং এ নিয়ে আফসোস করার কিছু নেই।
  • জেনারেশন গ্যাপ বলে যা চালানো হচ্ছে তা হলো চিন্তা চেতনার পার্থক্য। প্রথম জেনারেশন চিন্তা চেতনার দিক দিয়ে উত্তর মেরুর বাসিন্দা আর দ্বিতীয় তৃতীয় জেনারেশন চিন্তা চেতনার দিক দিয়ে দক্ষিন মেরু বাসিন্দা।
  • ধার্মিক হওয়ার পরেও কর্তা তার নাতির অপরাধ ঢাকার জন্য বিভিন্নভাবে তদবির করেছেন। এটাও একধরনের অন্ধ মায়া যে, আমার সন্তান, নাতি নাতনীরা কখনো খারাপ কিছু করতে পারে না, আমার ফ্যামিলি রয়্যাল সুতরাং এই ফ্যামিলির লোক এই ধরনের কাজ করতে পারে না ইত্যাদি আরো নানান অন্ধ বিশ্বাস। এইধরনের ভুল ধারনার সূচনা সন্তান জন্মের পর থেকেই। যেহেতু আমি খারাপ কাজ করি নাই সেহেতু আমার সন্তান-ও তা করতে পারে না। কিন্তু সন্তানকে যে শিক্ষা দেয়া দরকার ছিলো তা-ই তো দেয়া হয় নাই, সুতরাং সন্তানদের প্রতি এ ধরনের বিশ্বাস থাকা কতটা যুক্তিযুক্ত তা আমার বোধগম্য নয়।
  • নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত যে নাতি আজকে টাকা এবং ক্ষমতার জোড়ে ছাড়া পেয়ে আসলো সময় এবং নিয়মের আবর্তনে সে-ই হবে একদিন দেশের নীতি নির্ধারক। এসব জঞ্জালদের কাছ থেকে মানুষ কি আশা করতে পারে?

শেষের কথা:

এক্সেপসন হতেই পারে, কিন্তু ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে:- এক্সেপসন কখনো উদাহরণ হতে পারে না।

সন্তান টাকা বানানোর মেশিন না, স্ট্যাটাসের সিম্বলও না। প্রত্যেকটা বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদেরকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

৫ comments

Skip to comment form

  1. 3

    ধন্যবাদ।

  2. 2
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    ধন্যবাদ আপনাকে সুন্দর একটি বিষয় তুলে ধরার জন্য। ভাল লাগল আপনার লিখা।
    বেশিরভাগ সন্তানদের বিপথগামিতা ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য পিতা-মাতা দায়ী। সন্তানদের সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে যে ধৈর্যের প্রয়োজন, তা বেশির-ভাগ পিতা-মাতার থাকে না।

    1. 2.1
      শ্রমিক

      ধন্যবাদ তাজুল ইসলাম।

  3. 1
    মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত

    ভালো একটা বিষয় নিয়ে লিখেছেন ভাই,আপনাকে ধন্যবাদ।এই দেশের মুসলমানরা এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছে ব্রিটিশদের কাছ থেকে।ব্রিটিশদের সহযোগিতা করে হিন্দুরা যখন সামাজিকভাবে এগিয়ে যেতে লাগল,তখন মুসলমানদের মধ্যেও কেউ কেউ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সামাজিক মর্যাদায় আসীন হল।কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে তারা নিজেদের কালচারটাকেই বিসর্জন দিয়ে দিল।ইসলাম বন্দি হয়ে গেল মসজিদে,মাদ্রাসায়।
     
    সেই ধারা এখনো চলছে।এখন মুসলমানদের লক্ষ্য হচ্ছে একটা ফ্ল্যাট,একটা গাড়ি আর কিছু জমি।সেগুলো পেতে হলে পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে হয়।সেই শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ইসলামের লেশমাত্রও নেই,সেটা তো বলাই বাহুল্য।ঘুষ খেয়ে বা সুদ খেয়ে যেভাবেই হোক,টাকা বানাতেই হবে।আর টাকাই হচ্ছে এখন সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড।যার টাকা আছে,তার সম্মান আছে আর যার নেই,তার সম্মানও নেই।সেই টাকা যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গরিবদের জুলুম করে অর্জিত,সেটার খোঁজ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করে না।
     
    মা-বাবারা কিভাবে সন্তানকে ইসলামি শিক্ষা দেবে?তারা তো সন্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত নির্মাণেই ব্যস্ত এবং সেই কারণে তারা নিজেরাই ইসলামের চর্চা থেকে বহু দূরে।নিজেরা ইসলাম চর্চা না করলে সন্তানকে কিভাবে ইসলাম শিখাবে?বাচ্চাটা কোথায় যায়,কি করে-সেসবের খবর নেয়ার টাইম নেই।শুধু খবর রাখা হয় বাচ্চাটা পরীক্ষার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রথম হচ্ছে কি না।বেশিরভাগ মা-বাবাই কোনোমতে একজন হুজুর রেখেই দায়িত্ব শেষ ভাবেন।আবার সেই হুজুরকে ৫০০টা টাকা দিতেও তাদের যত আপত্তি,যেখানে অন্য বিষয়ের শিক্ষকের জন্য লাখ টাকা খরচ করতেও রাজি।কোনোদিনই তারা সন্তানদের বলেন না অন্তত নামাজ পড়তে।পড়তে বললে তো সন্তানের আগ্রহ জন্মাত নামাজ জিনিসটা কি সেটা জানার জন্য। 

    1. 1.1
      শ্রমিক

      ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.