«

»

Oct ১২

মদিনার এক প্রতিরক্ষার যোদ্ধা

১৯১৪ সাল; পৃথিবীতে মহা যুদ্ধ শুরু হবে এমন পর্যায়। তুরষ্কের রাজনিতিক ক্ষমতা খলিফা হারিয়ে ফেলছিলেন, কারণ আগেই তরুন তুর্কি সেকুলার বিল্ববীরা তুরষ্কের সরকার দখল করেছিল। যেহেতু তরুন তুর্কিরা তুর্কি-জাতিয়তাবাদী ছিল, তাঁর বিপরীতে আরব জাতিয়তাবাদের গোপন উম্মেষ গড়ে উঠল। মক্কা শহের শাষক শরিফকে বুঝানো হল, এই তরুন তুর্কিদের থেকে দূরে থাকতে। তরুন তুর্কিদের নেতা ছিলেন তিনজন, তালাত পাশা, ডেজামল পাশা, ইনভার পাশা। ইনভার পাশার সাথে জার্মানির ভাল খাতির ছিল। ডেজামল পাশার সাথে ফ্রান্সের ভাল খাতির ছিল। ওদিকে খলিফা সপ্নের হেজাজ রেলওয়ে বানানোর চেষ্টা করলেন, সেটা ছিল বিশাল প্রজেক্ট, যদি সাকসেসফুল হত তাহলে আরবের যোগাযোগ ব্যাবস্থায় রিভুলোশন ঘটত। সেটার কন্ট্রাক্ট জার্মানরাই পেয়েছিল।

 

যুদ্ধের শুরুর মুহুর্ত্বে জার্মানি ভাল করেছিল। ইনভার পাশা তুর্কিকে জার্মানির পক্ষে যোগদান করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে ডেজামল পাশা ফ্রান্সের সাথে আলোচনা করছিলেন, কিন্তু ফ্রান্সের অন্যান্য বাধ্যবাধকতা ছিল। জার্মানি চাচ্ছিল তুর্কিরা জার্মান পক্ষে যোগদান করুক, কারন এতে কিছু অঞ্চলে সামরিক সুবিধা পাওয়া যাবে। এ উদ্দোশ্যে অস্ট্র-হাংগেরিয়ান সম্রাজ্যকে জার্মানির পক্ষে নিয়ে আসা হল। তুরুন তুর্কিরা জার্মানির পক্ষে যোগদান করল, কিন্তু চুক্তিতে খলিফার সাক্ষর ছিলনা। তাই চুক্তি প্রকৃতপক্ষে ভেলিড ছিলনা, কারণ তখনও খলিফা ছিলেন কান্ডার ইন চীফ। ইনভার পাশা নিজেকে গ্রেইট মিলিটারি জিনিয়াস মনে করতেন, কিন্তু তাঁর সহকর্মী জার্মান আর্মি অফিসার তাকে মনে করতেন গ্রেইট মিলিটারি বুফে।  অন্যদিকে ডেজামল পাশাও তুরষ্কের জন্য যত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রায় সবগুলোই খারাপ ফলাফল বয়ে নিয়ে এসেছিল একটা ছাড়া। আরো উল্লেখ্য যে, ইনভার পাশা, ডেজামল পাশা ও তালাত পাশা আর্মেনিয়ান গনহত্যার মূল আসামী।

 

যুদ্ধ শুরু হবার পরও তুর্কিরা যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে চাইছিলনা, তাই তুর্কি নৌবাহিনীর জার্মান ইউনিট এই দায়িত্ব কাধে নিল, এবং হঠাত করেই রাশিয়ার কিছু বন্দরে আক্রমণ চালালো। অফিসিয়ালী হল তুরষ্কের যুদ্ধে যোগদান। মধ্য-প্রাচ্যের কামান্ডার হয়ে আসলেন ডেজামল পাশা, যুদ্ধে ব্রিটিশদের সাথে পেরে না উঠে এর জ্বীদ মিটালেন আরব খ্রিস্টানদের উপর। আরব খ্রিস্টানরা সংখ্যালঘু, তাদের কিইবা করার ক্ষমতা আছে। সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার যুদ্ধের একটা অশুভ দিক। যাইহোক, ব্রিটিশরা তুর্কিদের জার্মানির সাথে যোগদান করায় এক প্রকার খুশিই হল। উল্লেখ্য যে তুর্কিরা ব্রিটিশ পক্ষেও যেতে চেয়েছিল কিন্তু ব্রিটিশরা আগ্রহী হয় নাই। তখন তুরষ্কের অধীনে আরব মানে তেল ক্ষেত্র, ধনী অঞ্চল। অন্যদিকে আজারবাইজান ও এইদিকেই। আজারবাইজানের রাজধানি হল বাকু, ব্লাদিমির লেনিন বলেছিলেন "সিভিয়েট ইউনিয়ন ক্যান নট সাসটেইন উইথয়াউট অয়েল ফ্রম বাকু।" তারমানে বুঝতেই পারছেন কি পরিমান তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল। সেজন্য ব্রিটিশরা রাশিয়া এবং ফ্রান্সের সাথে পুরো তুরষ্ককে ভেংগে ভাগাভাগি করার চুক্তি করলেন। কিন্তু জার্মানির জায়গা নিয়েও চুক্তি হয় নাই, অস্ট্র-হাংগেরি নিয়েও চুক্তি হয় নাই, যেন দোষ সব তুর্কিদের।

 

মদিনার প্রতিরক্ষার জন্য ডেজামল পাশা ফরিদ উদ্দিন পাশাকে (অথবা ওমর ফারুখ উদ্দিন পাশা Umar Fakhr ud-Din Pasha) পাঠালেন। এই একটা সিদ্ধান্তই সঠিক নিয়েছিলেন ডেজামল পাশা। ফরিদ উদ্দিন পাশা মে মাসের ২৩ তারিখ, ১৯১৬ সালে পৌছালেন মদিনায়। মদিনার প্রতিরক্ষার যুদ্ধে ফরিদ উদ্দিনকে মোকাবেলা করতে হয় অত্যান্ত চৌকশ বুদ্ধিমান ব্রিটিশ থমাস এডয়ার্ড লরেন্সকে( Thomas Edward Lawrence, Lawrence of Arabia) যার সাফল্যের উপর সিনেমা পর্যন্ত বানানো হয়েছে। 

 

যুদ্দ শুরু হবার পর মক্কার শাষক শরিফ বিদ্রোহ করে ফেললেন। কিন্তু শরীফ মদিনা দখলে ব্যর্থ হন। যুদ্ধ চলতেই থাকল, ফরিদ উদ্দিন পাশাকে শুধু মদিনা রক্ষা করলেই চলবে না, সাপ্লাইয়ের জন্য হেজাজ রেলওয়েকেও রক্ষা করতে হবে। টি ই লরেন্স রেলওয়েতেই আক্রমন করছিলেন, ফরিদ সাফল্যের সাহিত আক্রমন প্রতিহত কর ছিলেন।  আরব আর্মি ফরিদের মোকাবেলায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হল, তাই তারা মদিনা দখলের চিন্তা বাদ দিয়ে অন্যান্য অঞ্চল দখল করতে লাগল।

 

মদিনা দখলের যুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সৈনিকদের সহায়তা এবং সরাসরি ব্রিটিশদের লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট ছিল। মদিনা রক্ষায় ফরিদ উদ্দিনকে সামলাতে হয়েছিল রেলওয়ের উপর ১৯১৭ সালে ১৩০টির মত বড় আক্রমন এবং ১৯১৮ সালে ১০০টির মত আক্রমন একই সাথে এপ্রিল মাসের ৩০ তারিখ প্রায় ৩০০ বোমা । মে ১৪, ১৯১৭ তারিখে যে সাহায্য আসার কথা তা যখন আসল না এবং  যখন নিশ্চিত হলে তিনি আর সাহায্য পাবেন না, এবং মদিনা রক্ষা করতে ব্যর্থ হবেন, তখন মদিনা থেকে holy relics একটি স্পেশিয়াল ট্রেইনে করে ইস্তাম্বুলে পাঠালেন।  

 

ব্যাপক অস্র সমৃদ্ধ প্রায় তিরিশ হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহীনি মদিনা আক্রমণ করল। সৈন্যবাহিনীকে উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব তিনটি ভাগে বিভক্ত করে মদিনার যথাক্রমে উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ করা হল। আর্মিতে ফ্রান্স ও ব্রিটিশ অফিসাররাও ছিলেন বুদ্ধিভিত্তিক সাহায্যের জন্য। পূর্বের বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন আব্দুল্লাহ, দক্ষিনের বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন প্রিস আলি ও উত্তরের বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন প্রিস্ন ফয়সাল। কিন্তু তবুও তারা মদিনা জয় করতে ব্যর্থ হলেন।

 

কিন্তু ঐদিক মহাযুদ্ধে জার্মানি ও তার মিত্রদের পরাজয় ঘটল। তুরষ্ক Armistice of Mudros ডুকল অক্টবর মাসের ৩০ তারিখ ১৯১৮ সালে। কিন্তু সন্ধি কার্যকর হচ্ছিলনা মদিনার সালেন্ডার করা ছাড়া। মদিনায় তখন রসদের অভাব, খাবারের অভাব।  ফরিদ উদ্দিন মসজিদের নববীতে নামাজ আদায় করে, রাসূল সাঃ এর রওজা মোবারকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে কখনই পরিত্যাগ করব না" এবং সৈনিকদের উদ্দোশ্য করে বললেন,

"Soldiers! I appeal to you in the name of the Prophet, my witness. I command you to defend him and his city to the last cartridge and the last breath, irrespective of the strength of the enemy. May Allah help us, and may the prayers of Muhammad be with us.

"হে সৈনিকগন, আমার নিবেদন নবীর নামে ও সাক্ষীরেখে, আমি তোমাদের কমান্ড করছি নিজেদের শেষ গোলা এবং শেষ নিশ্বাস দিয়ে তাঁকে ডিফেন্ড করতে, তাঁর শহরকে রক্ষা করতে; শত্রুবাহিনীর শক্তি যাইহোক। আল্লাহ পাকের সাহায্যে যেন আমাদের সাথে থাকে, মুহাম্মাদুর রাসুল আল্লাহর দোয়া যেন আমাদের সাথে থাকে"

 

একটা সময়, শহরে খাবার শেষ হয়ে গেলে ফরিং ধরে খাবার নির্দেশ দেন। তবুও অত্মসমর্পন করেন নাই। ডেজামল পাশা তাকে আত্মসমর্পনের নির্দেষ পাঠান, ফরিদউদ্দিন সেই নির্দেশ অমান্য করেন। তুরষ্কের মিনিস্টির নির্দেশও অমান্য করেন, এবং আত্মসমর্পণ না করার অবস্থানে অটল থাকেন। তুরষ্ক থেকে খলিফা তাকে পদ থেকে বহিষ্কার করেন। তবুও তিনি মদিনা তুলে দেননি, এবং আত্মসমর্পন করেননি। সৈন্য বাহিনীকে নির্দেশ করেন,

"I am now under the protection of the Prophet, my Supreme Commander. I am busying myself with strengthening the defenses, building roads and squares in Medina. Trouble me not with useless offers."

"আমি এখন রাসূল সাঃ এর অধিনে আছি, আমার সুপ্রিম কামান্ডার। আমি ব্যাস্ত মদিনার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং মাঠ-ময়দান রক্ষার্থে, অকর্মা অফিসার হয়ে আমার সমস্যা করিও না"

 

মহাযুদ্ধ শেষ হবার প্রায় ৭২ দিন পর্যন্ত তিনি মদিনা ধরে রাখেন। মদিনায় তখন খাবার-দাবার রসদ শেষ প্রায়। তাঁর কিছু সহকর্মী তাকে জোর আব্দুল্লাহর হাতে তুলে দেয়। তখন তাঁর সৈন্যবাহিনী কাঁদছিল।  ব্রিটিশরা তাঁকে মরুভূমির সিংহ এবং মরুর বাঘ নামে ডাকত।

যুদ্ধের সময় মদিনা শহর, মসজিদের নববী ও মিনার দেখা যাচ্ছে। ছবিঃ http://www.todayszaman.com/_photo-story-fahreddin-pasas-medina_323097.html.

মদিনা শহর, তখনকার সময় কাল অনুযায়ে ওয়াল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। ছবিঃ http://www.todayszaman.com/_photo-story-fahreddin-pasas-medina_323097.html

হেজাজ রেলওয়ের কার্যক্রম, মদিনা থেকে মসজিদ আল কুবা পর্যন্ত লাইনের কাজ চলছিল। ছবিঃ http://www.todayszaman.com/_photo-story-fahreddin-pasas-medina_323097.html

কৃতজ্ঞতাঃ সকল লিংক, ওকিপেডিয়া ও অন্যান্য সকলের প্রতি।

১০ comments

Skip to comment form

  1. 5
    রাসেল ইউসুফী

    ভালো লাগল। 

    ========

    //আবদুল্লাহ জর্ডানের বাদশা হতে পেরে ছিলেন কিন্তু তাকে পরাজিত করে হেজাজ (মক্কা মদিনা সহ) ইবনে সৌদ দখল করে নেন। সে আরেক বিরাট ইতিহাস।//-- ইতিহাসটি জানতে চাই।

    1. 5.1
      ফাতমী

      সে যে বিশাল ইতিহাস।

  2. 4
    Md. Habibul Basar

    Nice post.

    1. 4.1
      ফাতমী

      ধন্যবাদ।

  3. 3
    মাহফুজ

    //তাঁর কিছু সহকর্মী তাকে জোর আব্দুল্লাহর হাতে তুলে দেয়। তখন তাঁর সৈন্যবাহিনী কাঁদছিল।//

    সেই যুদ্ধের শেষ পরিণতি কি সৌদি রাজতন্ত্র?
    তাহলে কি বলা যায়, 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ'?
    এখনও কি সেই যুদ্ধই চলছে?

    1. 3.1
      ফাতমী

      আবদুল্লাহ জর্ডানের বাদশা হতে পেরে ছিলেন কিন্তু তাকে পরাজিত করে হেজাজ (মক্কা মদিনা সহ) ইবনে সৌদ দখল করে নেন। সে আরেক বিরাট ইতিহাস।

  4. 2
    shahriar

    thanks for share.

    1. 2.1
      ফাতমী

      @ধন্যবাদ।

  5. 1
    মজলুম

    Thanks for the post

    1. 1.1
      ফাতমী

      আপনাকেও ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.