«

»

Nov ২৩

জাতিসংঘে গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ভাষণ -২০০৯

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নামে যা লিবিয়া কর্তৃক প্রসংশিত, আফ্রিকান ইউনিয়নের নামে এবং ১০০০ ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান রাজ্যগুলির নামে, আমি সুযোগ গ্রহন করে আফ্রিকার(আমাদের) সন্তান বারাক ওবামাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই সমাবেশ তখনই হল, যখন পৃথিবী অনেক সমস্যায় আক্রান্ত।  এই সমস্যা গুলি অর্থ্যাৎ পরিবেশের ক্ষতি, আন্তর্জাতিক ক্রাইসি, অর্থনিতিক সমস্যা এবং খাদ্য ঘাটতি,  মোকাবেলায় আমাদের সবাইকে ঐক্যবোধ্য হতে হবে। 

সম্ভবত, "সোয়ান ভাইরাস" ল্যাবট্রারিতে নির্মিত কোন যুদ্ধাস্র, যা কন্ট্রলের বাহিরে চলে গিয়েছে ঐ সব সেনাবাহিনীর হাত থেকে যাদের পারমানবিক অস্র আছে এবং যারা মুনাফিক। ভাইয়েরা, আপনারা জানেন জাতিসংঘ প্রতিষ্টিত হয়েছিল, তখনকার জার্মান বিরোধী মিত্র বাহিনীর হাত ধরে। বর্তমান জাতিসংঘ ঐসময়কার মত নয়। জাতিসংঘের একটি সনদ আছে। সনদে বলা আছে, ছোট হওক বড় হওক সকল জাতি সমান। কিন্তু আমরা কি আসলেই সমান? না আমরা সমান নই। আমাদের ভেটো ক্ষমতা নেই। তাই, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ জাতিসংঘের সনদের বিরোধী, ভোটের পক্রিয়া জাতিসংঘের সনদের বিরোধী। তাই, আমরা এই সব গ্রহন করি না, আমরা এই সব স্বীকার করি না, এবং আমরা এই সব মানি না। [বিদ্রঃ জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা প্রাপ্ত স্থায়ী দেশ পাঁচটি, যথাক্রমেঃ আমেরিকা, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং চীন। ল্যাটিং আমেরিকা, ওশেনিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কোন দেশের স্থায়ী সদস্য পদ নেই]

জাতিসংঘের সনদে আরো বলা আছে, সবার ঐক্যমত ছাড়া কোন প্রকার শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে কি ঘটে? ৬৫টির মত যুদ্ধ হয়েছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর। এবং ঐসব যুদ্ধের ভিক্টিম ছিল কোটি মানুষ যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের থেকেও বেশী। এই সব অগ্রাসন এবং শক্তিপ্রয়োগ কি সবার ইচ্ছা অনুসারে হয়েছিল, নাকি একটা দেশ অথবা তিনটা দেশ অথবা চারটা দেশ অথবা একটা দেশের ইচ্ছায় ঘটেছে? এগুলো সুস্পষ্ট ভাবে জাতিসংঘের সনদের লঙ্গন।

সনদে আরো বলা আছে, যদি কোন সদস্য রাষ্ট্র অন্য সদস্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে, তাহলে জাতিসংঘ ঐআক্রমন প্রতিহত করবে এবং অনুসন্ধান করবে। যেমনঃ লিবিয়া যদি ফ্রান্স আক্রমন করে, তাহলে জাতিসংঘ ফ্রান্সকে রক্ষা করবে এবং অনুসন্ধান করবে। কারণ ফ্রান্স হচ্ছে সদস্য রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র একে অপরের সার্বোভোমত্ত রক্ষা করে। কিন্তু ৬৫টি যুদ্ধ হয়ে গেল, জাতিসংঘ না ঐসব যুদ্ধ থামালো, না অনুসন্ধান করল। বহু মানুষ হতাহত হল, কিন্তু কথা ছিল ঐসব দেশে্র স্বাধীনতা ও সার্বোভোমত্ত রক্ষা করা হবে। 

আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয়, ঐসব স্থায়ী সদস্য দেশগুলি আমাদের নিরাপত্তা দিবে এবং শান্তি রক্ষ্যা করবে। আসলে ঐসব দেশগুলিই একটার পর একটা যুদ্ধ লাগায়। সত্য বলতে, তাঁরা ভেটো দিবার ক্ষমতা উপভোগ করে। অন্যদিকে যুদ্ধ লাগায়, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্ষতি হয়।

আমরা জাতিসংঘে যোগদান করেছিলাম, এটা জেনেই যে আমরা সবাই সমান। কিন্তু তারপর দেখলাম, আমাদের সকলের সিদ্ধান্তই একটা দেশ বাতিল করে দিতে পারে, তা হল নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য প্রাপ্ত দেশ। কে তাদের স্থায়ী সদস্য পদ দিল? তাঁরা নিজেরা নিজেরাই নিজেদের স্থায়ী সদস্য পদ দিয়েছে শুধু মাত্র চীন ছাড়া যাকে আমরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি। চীন ব্যাতীত বাকি সকল স্থায়ী সদস্য পদ আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং এটা মেনে নেওয়া আমাদের উচিত নয়। এটা সৈরাচারী সিদ্ধান্ত।

যদি স্থায়ী সদস্য পদ বাড়ানো হয়, যেমন জার্মানিকে স্থায়ী সদস্য পদ দিলে, ইটালিও চাইবে। আবার ভারতকে দিলে পাকিস্থান অখুশি হবে। আমরা কি জবাব দিব, পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দেনেশিয়ার কাছে, কি জবাব দিব আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং লিবিয়ার কাছে। লিবিয়া কিছুদিন আগে ব্যাপক বিধংসী অস্র ধ্বংস করে নিরাপত্তা পরিষদকে সহায়তা করেছে। আসলে সকল দেশই গুরুত্বপূর্ন। আমরা কিভাবে খুশি হব, যদি পৃথিবীর দশটি দেশ বা চারটি দেশ সকল সিদ্ধান্ত নেয়?

আমরা ১৯০ দেশ ও জাতি, আমরা শুধু কথা বলে যাই কেউ আমাদের কথা শুনে না, আমরা হাইড পার্কে সাজসজ্জা। আর্থ্যাত, আমাদের কথাগুলির কোন দাম নেই, আমরা হাইড পার্কের কোনায় বসে কথা বলি, এবং আমরা বলি আর চলে যাই, এতটুকুই আমাদের অধিকার।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ হওয়া উচিত পৃথিবীর পার্লামেন্ট। কাউরো কিছু বলার থাকলে এখানেই বলতে হবে, এটাই ন্যায়বিচার, এটাই গণতন্ত্র। কারণ এর বাহিরে আমরা অন্য কিছু মানি না। নিরাপত্তা পরিষদ নিজেই একটা সন্ত্রাস।  আমাদের "নিরাপত্তা পরিষদ" থাকা উচিত নয়, কারণ এটা নিজেই সন্ত্রাসী।

আমরা সবাই স্বাধীন, পৃথিবীর ভবিষত বিবেচনা করে আমাদের সবাইকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই কোন বিষয়ে ভোটাভোটি হলে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেই হতে হবে। এবং সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদ হল, নিরাপত্তার ভন্ডামী। এটাকে নিরাপত্তা পরিষদ বলা উচিত নয়, বলা উচিত সন্ত্রাসী পরিষদ।  আমার ভাইয়েরা, যখনই দেখবেন তাদের দরকার, তখনই তাঁরা নিরাপত্তা পরিষদ ব্যাবহার করে, আর যখন তাদের দরকার নেই, তখন সেটা ফেলে রাখে। ভেটো ক্ষমতা হল অবিচার এবং আমরা এটা মেনে নিব না।

নিরাপত্তা পরিষদ শুধু  আমরা ছোটদের বিরুদ্ধেই ব্যাবহার করা হয়। যেমনঃ বড় বড় শক্তিদের পারমানবিক অস্রের চালান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় না। যদি প্রশ্ন করেন কেন? উত্তর, ওরা বিশ্ব শক্তি। আসলে নিরাপত্ত্বা পরিষদ আমাদের বিরুদ্ধে, আই এ ই এ আমাদের বিরুদ্ধে, আন্তর্জাতিক আদালত শুধু আমাদের বিচারের জন্য। আর তাঁরা ফ্রি মুক্ত। এটা কোন ন্যায়বিচার হল না, এটা জাতিসংঘ হল না।  

এমনকি যদি জাতিসংঘ সংস্কার নাও করা হয়, তবুও মনে রাখতে হবে, আফ্রিকাকে উপনিবেশে পরিনত করা হয়েছিল, isolated করা হয়েছিল, নির্যাতিত করা হয়েছিল, দখল করা হয়েছিল, প্রাণীদের মত ব্যাবহার করা হয়েছিল,  গোলামের মত ব্যাবহার করা হয়েছিল, দখলদারদের অধিনস্ত করে রাখা হয়েছিল।

জাতিসংঘের সংস্কার নাই হোক, কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের, কিন্তু আফ্রিকার প্রাপ্য ছিল নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ যা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এবং আফ্রিকার কাছে এর মূল্য পরিশোধ করার বাকি রয়েছে। এমন কোন যুক্তি আছে কি, যে আফ্রিকার স্থায়ী সদস্য পদ পাবার যোগ্য নয়? কেন আফ্রিকানরা ইউরোপে অভিবাসন করতে যায়? কারণ আফ্রিকার সম্পদ লোট করা হয়েছে। আমাদের সম্পদ আমাদের ফিরিয়ে দাও, আফ্রিকার ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭ হাজার ৭ শ ৭৭ বিলিয়ন ডলার প্রাপ্য। (বিদ্রঃ ১ বিলিয়ন=১০০ কোটি)

সত্য বলতে আমরা খুশি এবং গর্বিত যে আফ্রিকার একজন সন্তান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু ওবামার পরে কি হবে? এর গ্যারান্টি নাই! আমিরিকার প্রেসিডেন্ট একসময় আমাদের হুমকি দিতেন, তাঁরা আকাশ থেকে বজ্রপাত ঘটাবেন, ক্যামিক্যাল দিয়ে লিবিয়ার শিশুদের মারবেন, আমাদের এইখানে ইরাক এবং ভিয়েতনামের মত ত্রাস সৃষ্টি করবেন। কিন্তু আমাদের সন্তান ওবামা ভিন্ন মানুষ, তিনি একজন ইতিহাস এবং তিনি সাধারণ নন।

আমারা জানতে চাই, কেন জন এফ কেনেডির হত্যাকারীকে সাথে সাথেই হত্যা করা হল? এবং সেই খুনির খুনিও বিচারের আগেই মারা গেল!

ফিলিস্থিন ও ইসরাঈলের দুই রাষ্টের কোন সমাধান নেই। একটাই সমাধান আছে লেবাননের মত গণতান্ত্রীক রাষ্টের যেখানে ইহুদি, মুসলিম এবং খ্রিস্টানরা থাকবে। ইসরাঈলীদের সাথে আরবদের থাকার কোন সমস্যা নেই। "আরবের কোন ভবিষত নাই! আরবের কোন ভবিষত নাই!, আরবের ভবিষত হল ইস্রাফিল"  (বিদ্রঃ ইস্রাফিল- একজন ফেরেস্থা যিনি কিয়ামত সংঘটিত হবার ঘোষনা প্রকাশ করবেন) ফিলিস্থিনি রিফুজিদের বাড়ি ফিরার অনুমতি দিতে হবে এবং তাদেরকে শান্তিপূর্নভাবে বসবাস করার অনুমতি দিতে হবে। এটা তোমরা যারা তাদের প্রতি হলকাস্ট তৈরি করেছ (বিদ্রঃ হলকাস্ট হল নাজি কর্তৃক গণহত্যা) তাদেরকে ইউরোপে আগুনে জ্বালিয়েছ, ইহা তোমরাই যারা ইহুদিদের ঘৃনা করতে, আমরা নই। [বিদ্রঃ পড়তে পারেনঃ ২য় বিশ্বযুদ্ধে মুসলিমদের অবস্থান]

এবং কাশ্মিরের জন্য স্বাধীন হওয়া ছাড়া আর কোন সমাধান নেই। কাশ্মির না হবে ভারত, না হবে পাকিস্থান, বরং স্বাধীন হবে এবং ভারত এবং পাকিস্থানের মধ্যে বাফার হিসাবে থাকবে। এভাবেই ভারত পাকিস্থানের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে। আর দারফুর; দারফুরে এখন আর যুদ্ধ নেই, শান্তি আছে, এবং এটা তোমরাই তেলের জন্য দারফুরে যুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছিলে।

মানবতাকে সংগ্রাম করতে হয় শান্তিতে থাকার জন্য। তৃতীয় বিশ্ব এবং ছোট দেশগুলি যারা শতকের কোঠায়, তাদেরকে সংগ্রাম করতে হয় নিজ সম্মান ও স্বাধীনতা নিয়ে বেঁচে থাকতে, এবং তাঁরা এই সংগ্রাম চালিয়ে যাবে শেষ পর্যন্ত। শান্তি বর্ষিত হোক।

[সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্যিত ভাবানুবাদ, মূল ভিডিওঃ  এবং  এবং মোটামোটি টেক্সট আকারেঃ http://metaexistence.org/gaddafispeech.htm]

[অনুবাদ করা হয়েছে: সদালাপ ২৩ নভেম্বর, ২০১৪| ভাল লাগলে ফেইস বুক সহ বিভিন্ন জায়গায় শেয়ার করুন]

 

 

৪ comments

Skip to comment form

  1. 2
    kaisarahmed

    Excellent! Thank you so much for sharing and being so honest.

    1. 2.1
      ফাতমী

      ধন্যবাদ।

  2. 1
    মাহফুজ

    এ বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত একটি কবিতা-

    'শান্তি-সংঘ'

    জাতিসংঘের বুকে চেপে বসে
    স্থায়ী অস্থায়ী বৈষম্যের ঘোরে
    শক্তিধরেরা আঙ্গুল নাচায়,
    শান্তির বাণী ঠোঁটে ঘুরে ফেরে
    জাতিসংঘকে মুঠে ভোরে ফেলে
    স্থায়ী সদস্যরা বগল বাজায়,
    শ্বেত-পতাকা পায়েতে পিষে
    স্বার্থপরেরা এক নিমিষেই
    অশান্তি আর ভীতি ছড়ায়,
    বিবেকের বুকে এক লাথি মেরে
    স্বার্থ হাসিলে সেয়ানা পাপীরা
    নম নম কোরে বাহবা জানায়।

    বিশ্বের সব মজলুম দেশ
    এক সারিতে একই সুরে যন
    সব কু-কাজের ধিক্কার দেয়,
    দু-মুখী নীতির বেড়াজাল ছিড়ে
    বিশ্ব-বাসির কল্যাণে যেন
    সাম্যের পথে শপথ নেয়,
    বিবেকের টানে অচিরেই যেন
    'শান্তি-সংঘ' রচনা কোরে
    মহামিলনের জয়গান গায়।

     

    1. 1.1
      ফাতমী

      পড়ার এবং কবিতার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ মাহফুজ ভাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.