«

»

May ২৪

ঘুষ বাংলাদেশের অর্থনিতিতে কি কাজ করে

ঘুষ কী? ঘুষ হচ্ছে উদ্দোশ্যপূর্নভাবে কাউকে কোন মূল্য বান কিছু দেওয়া যেন তাকে প্রভাবিত করা যায় তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা থেকে। ঘুষ বিভিন্ন ভাবে দেওয়া হয়ে থাকে, যেমনঃ কাউকে উদ্দোশ্যমূলক ভাবে টিভি, ফ্রিজ অথবা গৃহের সামগ্রী অথবা সরাসরি আর্থিক মূল্য দেওয়া। ঘুষ তিন লেভেলের হতে পারে। একঃ কাউকে সম্পূর্ন উপহার বাবদ কিছু দেওয়া বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্কের খাতিরে। এ ধরনের ঘুষকে সরাসরি ঘুষ বলা যায় কি না, এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কারণ এতে গ্রহিতার কোন সম্মতি এবং কোন প্রকার কমিটমেন্ট থাকে না। গ্রহিতা ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত নিবার অধিকার রাখেন। এটা কোন মৌখিক অথবা লিখিত কন্ট্রাক্ট নয়। উল্লেখ্য, কন্ট্রাক্ট তিন ধরনের হতে পারে, যথাক্রমেঃ সাংকেতিক কন্ট্রাক্ট, মৌখিক কন্ট্রাক্ট এবং লিখিত কন্ট্রাক্ট। বিচারের ক্ষেত্রে শেষাক্ত দুইটি বিবেচিত হয় বিধায়, এ ধরনের ঘুষ এতই সুক্ষ যে অপরাদের শাস্তির আওয়তার বহিরভূত। দুইঃ মৌখিক কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে লুকানো ঘুষের আদান-প্রদান। এটা আইনের বিবেচ্য। এটা দেশের জন্য সামান্য ক্ষতিকর এবং সামান্য লাভজনক। তিনঃ প্রকাশ্যে ঘুষের আদান প্রদান। এটি দেশের জন্য এবং পুরো নৈতিকতার জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর।

ঘুষ কি করেঃ

প্রথমত ঘুষ কোন প্রকার উতপাদন ছাড়াই আদান প্রদান হয়। এতে করে জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যায়, কিন্তু এই দাম বাড়া কোন প্রকার চাকরির সৃষ্টি করে না। বরং সঠিক পন্থায় আয় করার পথ কমিয়ে দেয়। অর্থ্যাত, আপনি বাজার থেকে ১ কেজি চাল কিনলেন; ধরেন ১০০ টাকা দিয়ে। এই একশত টাকার মধ্যে ঘুষ খেয়ে ফেলে ১০ টাকা। ঘুষ না থাকলে ৯০ টাকায় ঐ ১ কেজি চাল কিনতে পারতেন। এই যে এক্সট্রা ১০ টাকা খরচ, সেটা কিছু মানুষের পকেটে ঢুকে। এবং তাদের খরচ করার সামর্থ্য বেড়ে যায়। কিন্তু অবৈধ পন্থায় আয়কৃত টাকা তারা খুব সাধারণত অবৈধ কাজে ব্যয় করবে। অন্যদিকে, বৈধ আয়করা ব্যাক্তি নিজের বৈধ কাজের প্রতি উতসাহ হারিয়ে ফেলবে। ফলে, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ভয়ংকর উতপাদন ঘাটতি দেখা দিবে। অন্যদিকে কিছু মানুষ আংগুল ফুলে কলাগাছ হবার লোভে সমাজে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিবে। ফলাফলে আমরা পাবঃ সন্ত্রাস, ক্ষতিকর ড্রাগ, মেয়েদের প্রতি অসম্মান (পতিতালয়)। লুকানো ঘুষের আদান প্রদানে এই সমস্যা হয় না বা হলেও খুব কম। কিন্তু প্রকাশ্যে ঘুষ আদান প্রদান উপরের বর্নিত ফলাফল তৈরি করে।

ঘুষের ভাল দিকঃ

প্রকাশ্যে ঘুষের কোন ভাল দিক নেই। কিন্তু গোপন ঘুষের আদান প্রদানে কোন কোন সময় ভাল দিক রয়েছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ টেনে আমি বলেছিলাম, ‘সেখানে অনেক কাজ করতে গেলে তা এজেন্টের মাধ্যমে করতে হয় এবং এজেন্টরা এ কাজ অর্থের বিনিময়ে করে থাকেন। যা সেখানে স্পিড মানি হিসেবে পরিচিত। এটা সেদেশে অবৈধ নয়। সেখানে সেবার পরিবর্তে দাম দেওয়ার রেওয়াজ আছে।"(bdnews24.com) যেমনঃ মিস্টার এক্স এর জমি ৭ বিঘা। কিন্তু কোন আনফরচুনেইট কারণে তার দলিলে সমস্যা আছে। তসিলদার বিষয়টা জানেন, এবং তিনি কিছু টাকার বিনিময়ে খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান করে দিলেন। এটিকে সাদা ঘুষ বলতে পারেন। এতে মিস্টার এক্স এর ব্যাবসার কাজ দ্রুত হবে, মানে সে চাষাবাদ শুরু করতে পারবে।

ঘুষ কি আসলেই গ্রহিতার কোন লাভ বয়ে নিয়ে আসেঃ

ঘুষ মানুষ বিভিন্ন উদ্দোশ্যে দিয়ে থাকে, কোনটা অন্যায় করার জন্য, আবার কোনটা নিজের অধিকার আদায়ের জন্য, কিন্তু বেশীরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ঘুষ আসলে গ্রহিতার তেমন কোন লাভ বয়ে নিয়ে আসতে পারে না।  মনে করুন, সুমন ৮০০০ টাকা বৈধ আয় করে্ন। এই আয় দিয়ে তিনি যেরূপ চলা ফেরা করতে পারতেন, ঘুষ লেনদেনের ফলে, সেই ৮০০০ টাকা দিয়ে সেরূপ চলতে পারবেন না। কারণ টাকার কমে যাওয়ায় ৯০ টাকার ১ কেজি চাল ১০০টাকায় কিনতে হচ্ছে। যারা খুব অতিরিক্ত ঘুষ খায় তারা ব্যাতীত বেশীর ভাগ লোকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে কোন লাভ বয়ে নিয়ে আসে না। বরং অধিকাংশ লোক ঘুষ ছাড়াই তারা বর্তমানে যেরূপ জীবন ধারন করেন, তার থেকে ভাল জীবন ধারন করতে পারতেন। মানে, ঘুষ বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে ন্যাশনাল সম্পত্তি কমিয়ে দিচ্ছে।

মানুষ কেন ঘুষ খায়?

মানুষ ঠিক দুটি কারণে ঘুষ খায়। একঃ বাধ্য হয়ে। এটা আবার দুই প্রকার, প্রথমত আর্থিক কারণে বাধ্য হয়ে ঘুষ খায়। তাদের যুক্তি হলঃ যদি ৯০ টাকার ১ কেজি চাল ১০০ টাকায় কিনতে হয়ে, তাহলে বাকি ১০টাকা কোথা থেকে আসবে? দ্বিতীয়ত, সামাজিক, শারিরিক হামলার ভয়ে বাধ্য হয়ে, ঘুষ খায়। তারা সাধারণত ক্ষমতাবানদের হাতে থাকেন, এবং যেকোন সময় বিপদের আশংকা করেন। এটা বদলি থেকে চাকরি থেকে বহিষ্কার সবই হতে পারে। দুইঃ উচ্চ লোভে। তারাই আসলে ঘুষের চক্র শুরু করেন। ঘুষের চক্রঃ বেতনের টাকায় পরিবার চলে না, তাই ঘুষ খেতে হয়। পরিবার চলে না কারণ জিনিস পত্রের দামের সাথে ঘুষের মূল্য যুক্ত হওয়াতে বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হয়। ঘুষ=বাড়তি খরচ=ঘুষ=বাড়তি খরচ=চলমান।

ঘুষের (বর্তমান অবস্থায়) ফলাফলঃ

আমাদের ভাল উতপাদন থাক সত্তেও আমাদের সিস্টেম ভাল কাজ করছে না। মানুষ অশান্তিতে থাকছে। সে জন্য অর্থনিতি পূর্নাংগ ফাংশনাল হচ্ছে না, এবং পূর্ন-কর্মসংস্থায়ন তৈরি হচ্ছে না। যেহেতু অর্থনিতি কর্মসংস্থান দিতে পারছে না সেহেতু কিছু জনগুস্টি চাকরি পেতে ব্যার্থ হচ্ছে, তারা হতাশায় সমাজকে দায়ী করছে এবং দিন দিন উগবাদী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে তাদের কিছু সংখ্যাক বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকালাপে লিপ্ত হচ্ছে। সেই অনৈতিক কার্জকালাপ নতুন অনৈতিক কাজ তৈরি করছে, যা চলমান। 

 

বিদ্রঃ অর্থনিতি অরগানাইজ করার ভিত্তিতে একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট আছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যেখানে সম্পূর্ন কর্মসংস্থান হবে। (জিনিস পত্রের দাম) ঐ পয়েন্টের উপরে (অথবা নিচে) গেলেই কর্মসংস্থান কমতে থাকবে। যদি ইকনমি খুব ভাল করে অরগানাইজ করা হয়, তাহলে ০%(দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রায় হবে না) বৃদ্ধিতেই সম্পূর্ন কর্মসংস্থান পাওয়া যাবে। কিন্তু ঐ পর্যায় পর্যন্ত যেতে যতেষ্ট সময় দরকার পরে।

 

৪ comments

Skip to comment form

  1. 3
    জামশেদ আহমেদ তানিম

    আরেকটা ব্যাপার: ঘুষের কারণেই বাজারে মুদ্রাস্ফীতি অত্যাধিক।

    উদাহরণ: একজন ব্যবসায়ীকে যদি সবসময় ঘুষ দিতে হয় (কাগজ তৈরী করা শুরু থেকে পণ্য পরিবহণ, বিল পাওয়া পর্যন্ত বকশিস) তাহলে সে অবশ্যই তার পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখবে। এখন সেই পণ্যই বাড়তি দামে ঘুষখোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী কিনছে। অল্পকিছু পণ্য ঘুষখোরদের কাছে চলে গেল এখন অতিরিক্ত উদ্ধৃত পণ্যের মধ্যেও ঘুষ দেয়া থাকে যার ফলে যারা ঘুষ খেতে পারছে না বা খায় না তাদের সলিড আয়ে ঘুষ দেয়া পণ্য বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এবং তাদের উপরে চাপ বাড়ছে।

    সুতরাং ঘুষ যেভাবেই লেনদেন হোক না কেন তা সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

  2. 2
    জামশেদ আহমেদ তানিম

    স্পিড মানি হিসেবে আপনি যে উদাহরণ দিয়েছেন ব্যপারটা আসলে তা নয়। বরং এটা সরাসরি ঘুষের উদাহরণ।

    উন্নত বিশ্বের মানুষদের সময় কম যে তারা হাল্কা বিষয় নিয়ে দৌড়াদৌরি করবে, তাই তারা এজেন্ট নিয়োগ করে যে তার পক্ষ হয়ে কাজগুলো করে দিবে। অভিজ্ঞ এজেন্ট তার সমস্যার ধরণ অনুযায়ী কাজ করবে। অপরদিকে তহসিলদারের কোন অপশন নাই ঘুষ খাওয়ার, অথবা আইনকে ম্যানুপুলেট করার। আইনে যা আছে সেই মোতাবেক তহসিলদার ব্যবস্থা নেবে।

    টাকা পয়সা যা নেয়ার সব সেই এজেন্ট নিবে, তহসিলদার কোন টাকা পয়সা পাবে না।

    এই যে এজেন্ট আপনার পক্ষ হয়ে কাজ করে টাকা নিচ্ছে এটাকে স্পিড মানি বলে। এক্ষেত্রে আপনার 'ওয়ার্কিং আওয়ার'-এর অপচয় হলো না আবার কাউকে ঘুষ দিতে হলো না। মাঝখান থেকে একজন কাজ করে টাকা নিলো, একজনের কর্মসংস্থান হলো।

    এছাড়া আপনি এজেন্ট নিয়োগ করা ছাড়া নিজে গিয়েও কাজ শেষ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আপনার 'ওয়ার্কিং আওয়ার' ব্যয় হবে।

    বাংলাদেশের দৃশ্য: জমিতে এমন ঝামেলা আছে যা আইনত দখলকারী স্বত্বভোগ করতে পারবে না। তহসিলদারসহ অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তারা মিলে কাগজ এমনভাবে তৈরি করে দিবে যাতে জমির কাগজ আসল মনে হয়। টাকার পরিমাণের উপরে কাজের দ্রুততা নির্ভর করবে। এটা ঘুষ, জালিয়াতী, আইন লংঘন। উন্নত বিশ্বে এরকম হয় না।

    এক্ষেত্রে তৃতীয় কেউ টাকা পেল না বরং বেতনভোগী একজন লোক অবৈধ সুযোগের বিনিময়ে টাকা আয় করলো। কোন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো না, বেকার কারো জন্য কাজের স্কোপ তৈরী হলো না।

    আরেকটা বিষয়: বাংলাদেশে বকশিস নামক একটা বিষয়ের প্রচলন আছে, যা ঘুষেরই নামান্তর।

  3. 1
    মিলন

    আমাদের সোনার দেশে, স্কুলে ভর্তি হতে গেলে ঘুষ, পরীক্ষার পূর্বে ফরম ফিলাপের সময় ঘুষ, ন্যায় পাবার আশায় আদালতে গেলে ঘুষ, পুলিশ রক্ষক হয়েও ভক্ষক, চাকরীর প্রমোশনের জন্য ঘুষ, কাজের কন্ট্রাক্ট পেতে ঘুষ, চাকরী করতে ঘুষ, চাকরী হবার পরে তা রক্ষা করতে ঘুষ, বিয়ে করে সংসার করতে গেলে কাজীকে ঘুষ, এমনকি প্রেম করতে পার্কে গেলেও ঘুষ হা হা হা….

    আমাদের দেশে ঘুষ খাওয়াটাকে জাতীয় আহার হিসাবে সম্মতি প্রদান করা উচিত।

    1. 1.1
      ফাতমী

      মানুষদের আর কত দোষ দেওয়া যাবে। রাস্তা না থাকলে তারা কি করবে? এমন পরিস্থিতি তৈরি করে কোন লাভ নেই। মানে যারা ঘুষ নিচ্ছেন, তাদেরও লাভ হচ্ছে না বরং ঘুষের চক্রতে পরে গিয়েছেন। কোন সময়ই ঘুষকে ১০০% শূন্যতে নেওয়া যায় না, কিন্তু ঘুষ এত ব্যাপকভাবে থাকুক তাও আশা করা যায় না, এবং ঘুষের কারণে ফরিয়াদীর ন্যায়-বিচার বাধা-প্রাপ্ত হোক সেটাও কাম্য নয়। অর্থ্যাত, একটা লিমিটের ভিতর নিয়ে আসা এবং প্রকাশ্যে পুরোপুরি বন্ধ রাখার ব্যাবস্থা করা উচিত।
       

Leave a Reply

Your email address will not be published.