«

»

Feb ০৩

সময়ের অমীমাংসিত ইতিহাস

সময় কি? এই প্রশ্ন হাজার বছরের পুরানো। বিজ্ঞানীরা এখনও সময় নিয়ে জ্ঞান-সাগরে হাবুডুবু খান। সময় নিয়ে আবু হুরায়রা রাঃ বর্নিত এবং ইমাম বুখারির সংরক্ষিত বিখ্যাত হাদিস হলঃ- আল্লাহ পাকের রাসূল সাঃ বলেছেনঃ "আল্লাহ (পাক) বলেছেন, আদম সন্তানেরা সময়কে গালি দিয়ে আমাকে আঘাত করে; আমিই সময়, আমার হাতেই আছে সব কিছু, এবং আমি দিন এবং রাত্র আবর্তিত বিল্ববের কারণ" (বই ৬৫, হাদিস নাম্বার ৪৮২৬), তাই সময় নিয়ে আমার আগ্রহ প্রচন্ড। হাদিসটির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে, এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ পাকই ভাল জানেন, তাই দয়াকরে ভেবে নিয়েন না যে আল্লাহ পাকই সময়। বরং এটা বলা যায় যে, আল্লাহ পাকের কারণেই সময় আছে, তাই সময়কে গালি দেওয়া আল্লাহ পাককে গালি দেওয়া, যেমন আল্লাহ পাকের রাসূলকে গালি দেওয়া মানে আল্লাহ পাককে গালি দেওয়া।

সময় আমাদের চোখে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ধরা দেয়। ছোট বেলায় সময়ের মূল্য রচনা লেখার সময় লিখতাম, সময়ের মূল্য অনেক, আদিকাল থেকে সময় বয়ে চলেছে, সময় নদীর স্রোতের মত, কারো জন্য অপেক্ষা করে না, একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আমরা প্রত্যেহ জীবন যাত্রায় সময়ের ব্যাবহার করি, যেমনঃ রোজ ১০টার সময় স্কুলে থাকি। বেঞ্জামিন ফ্রাংক্লিনের মত "সময় হল টাকা", আবার পদার্থ বিজ্ঞানে সময় দিয়েই (motion) গতি এবং (Force) বল পরিমাপ করা হয়, তার মানে সময় হল একটি মাত্রা। আমরা দৈর্ঘ প্রস্ত ও উচ্চতার পরিমাপ করতে পারি এবং দেখতেও পারি, কিন্তু সময় পরিমাপ করতে পারলেও সময়ের অবস্থান দেখতে বা অনুভব করতে পারি না, সেজন্যই আমরা ত্রি-মাত্রিক (three dimensional) প্রাণী। আইন্সটাইন সময়ের ধারণাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়েছেন, আইন্সটাইনের ব্যাখ্যা সময় থেমে থাকে অর্থ্যাৎ সময়ের চলার গতি কমে যায়। সেটা তখনই ঘটে যখন আপনার গতি বেড়ে যায়, আপনার গতি যদি আলোর গতির নিকটবর্তী হয়, তখন আপনার সাপেক্ষে আপনার সময়ের গতি একদম কমে যাবে। কিন্তু পৃথিবী তাঁর আপন গতিতে চলবে, এবং পৃথিবীর সময়ও। তাই আপনি মহাকাশ যানে ব্যাপক গতিতে ১ বছর ঘুরে আসলে হয়ত পৃথিবীতে দেখবেন অনেক বছর হয়ে গেছে। যাইহোক, সত্য কথা হল, মানুষ সময় দ্বারা আবদ্ধ।

 

পদার্থ বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় সময়ঃ সময় হচ্ছে একটি স্কেলার (সংখ্যায়) পরিমান। পরিমাপযোগ্য চলমান কালই হল সময়। নিউটন ১৬৬৫-৬৭ সালে বর্ননা করেন, "Absolute, true, and mathematical time, of itself, and from its own nature flows equably without regard to anything external, and by another name is called duration: relative, apparent, and common time, is some sensible and external (whether accurate or unequable) measure of duration by the means of motion, which is commonly used instead of true time; such as an hour, a day, a month, a year" (লিংক)

সময়ের আপেক্ষিকতাঃ  

   \Delta t' = \frac{\Delta t}{\sqrt{1-\frac{v^2}{c^2}}} (ছবিঃ উইকিপেডিয়া)

এটা খুব সহজ সূত্র দিয়ে ব্যাক্ষা করা যায়, এখানে v হচ্ছে বস্তুর গতি এবং c হচ্ছে আলোর গতি। বস্তুর গতি বৃদ্ধি সাপেক্ষে উক্ত বস্তুর অনুভূত সময় পরিমান কমতে থাকবে। বস্তুর গতি আলোর গতির যত নিকটবর্তী হবে, উক্ত বস্তুর সময় অনুভূতির হার তত কমতে থাকবে। তাছাড়া, মহাকর্ষের প্রভাবেও সময়ের গতির কম বেশী হয়ে থাকে।

বিষয়টা সহজভাবে বুঝোতে সাইন্সফিকশনের সহায়তা নেওয়া যায়। ক্রিস্টেফার নোলানের Interstellar মুভিতে একজন সাইন্টিস্ট মহাকাশযানে মহাকাশ ঘুরে এসে দেখে, যে তার বয়স সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু তার ছোট মেয়ে এখন বুড়ি হয়ে গেছে। অর্থ্যাৎ মহাকাশযানের ভিতরের সময় স্লো হয়ে চলেছে কিন্তু পৃথিবীতে সময় মহাকাশ যানের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি কেটেছে।

সময়ের আপেক্ষিকতার বাস্তব প্রমাণ রয়েছে। আমরা যে গাড়িতে GPS টেকনলজি ব্যাবহার করি, সেই GPS, আকাশের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পৃথিবীর একটা পয়েন্ট নির্ধারন করার জন্য। মহাকর্ষের কম থাকায় স্যাটেলাইটের সময় পৃথিবীর থেকে বেশী গতিতে চলে। যেজন্য পৃথিবীতে অবস্থান নির্নয়ে সমস্যা হয়। তাই প্রতিদিন স্যাটেলাইটের ঘড়ি 38,500 nanoseconds স্লো করে দেওয়া হয়। তাছাড়া, সুক্ষ এটোমিক ক্লকে সময়ের খুব ছোট ইন্টার্ভাল ধরা পরে। বিমানে থাকা এটোমিক ক্লকে খুব সহজেই বিমানের গতির কারণে সময় কমে যাওয়া ধরা পরে যা পৃথিবীতে থাকা ঘড়ির সাথে পার্থক্য করে। (রেফারেন্স ও আরো জানতে পড়ুন লিংক)

উল্লেখ্য আপাতদৃষ্টিতে মনেহয় যদি আলোর গতির বেশী গতি পাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে ঐ বেশী গতিশীল বস্তু সময়ের বিপরীতে যাবেই বলে ধারনা হয় কিন্তু এতে জটিল গানিতিক সমস্যার তৈরি হয়। অথবা হয়ত আইন্সটাইনের ইকুয়েশনের কোন পরিবর্তন দরকার।

আসাবে কাহাফের ঘটনাঃ

আসাবে কাহাফ হল, কিছু মানুষ যারা অবিশ্বাসীদের আক্রমনের ভয়ে গুহায় আশ্রয় গ্রহন করেছিল। তারা সেখানে অনেক দিন ছিল কিন্তু তারা মনে করেছিল একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ সময় তারা সেখানে থেকেছে। আল্লাহ পাক বলেন "আপনি কি ধারণা করেন যে, গুহা ও গর্তের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল ?"(১৮ঃ০৯) "আমি এমনি ভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললঃ তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? তাদের কেউ বললঃ একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করছি। কেউ কেউ বললঃ তোমাদের পালনকর্তাই ভাল জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন নম্রতা সহকারে যায় ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়।"(১৮ঃ১৯)

তারপর আল্লাহ তালা বলেন, "তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে।"(১৮ঃ২৫) উল্লেখ্য সূর্যের ক্যালেন্ডারের হিসবে যা ৩০০ বছর, চাঁদের ক্যালেন্ডারের হিসাবে তা ৩০৯ বছর। আল্লাহ পাক কি সুন্দর করে আলাদা আলাদা দুটি ক্যালেন্ডারের গানিতিক হিসাবই দিয়ে দিয়েছেন (আরো জানতে লিংক)। যাইহোক, আসাবে কাহাফের লোকেরা এত শত বছর থাকার পরও মনে করেছিল, একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ কাল তারা সেই গুহায় থেকেছে। অর্থ্যাৎ এত বছর থাকা সত্তেও তারা এত সময় অনুভূত করেনি, তাদের মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি, তাদের বয়স বেড়ে যায়নি।

আরো বিবেচ্য বিষয়, একই সূরায় আল্লাহ পাক বলেন, "আপনি কোন কাজের বিষয়ে বলবেন না যে, সেটি আমি আগামী কাল করব। ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’ বলা ব্যতিরেকে। যখন ভুলে যান, তখন আপনার পালনকর্তাকে স্মরণ করুন এবং বলুনঃ আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চাইতেও নিকটতম সত্যের পথ নির্দেশ করবেন'(১৮ঃ২৩-২৪), তারমানে হচ্ছে ভবিষতের কোন কিছু করার বেলায় 'ইনশা-আল্লাহ' বলতে হবে, মানে 'আল্লাহ পাক ইচ্ছা করলে'।

সময়ের কিছু যৌক্তিক এবং দার্শনিক ব্যাক্ষা ও থিউরিঃ

নিয়তিবাদ (Fatalism) বা সুনির্দিষ্ট ভবিষৎঃ নিয়তিবাদের কথা হল ভবিষতে কি ঘটবে তা সুনির্দিষ্টিত। সুনির্দিষ্ট বলতে এটাই বুঝানো হচ্ছে যে, মানুষ এর কোন পরিবর্তন করতে পারবে না। যুক্তির ফরমেশন এ রকমঃ

  1. ভবিষতে কি কি ঘটতে পারে তাঁর একটি সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।
  2. প্রতিটি সম্ভাবনা হয় সত্য-মানে ঠিকই ঘটবে, অথবা মিথ্যা অর্থ্যাত ঘটবে না।
  3. যদি এক এবং দুইয়ের পয়েন্ট বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং যদি দুই সত্য হয়, তাহলে কতগুলো সম্ভাবনা এমন যে ভবিষতে কি কি ঘটবে তাঁর সব কিছুই বলতে পারবে।
  4. তারমানে ভবিষতে যা ঘটার, তাই ঘটবে এবং আমরা এটাকে এড়াতে পারবো না, মানে ভবিষত সত্যের দ্বারা সুনির্দিষ্ট।

পরম সময়ের অস্থিত্বঃ যদি এমন সম্ভব হয়, আপনি কথা বলছেন বা গান শুনছেন, আর সব কিছু আটকিয়ে গেল, টিভি, পৃথিবীর গতি সব আটকিয়ে গেল। এভাবে একবছর পার হবার পর, যব কিছু ঠিক আগের জায়গা থেকে চালু হল। মনে করেন, ঐ সময় আপনি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কবিতা পড়ছিলেন। "শূন্য নদীর তীরে রহিনু পরে" এই লাইন পরার পর আপনি আটকিয়ে গেলেন, ঠিক একবছর পর পরলেন "যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী"। যদি এ রকম সম্ভব হয়, তাহলে পরম সময়ের অস্থিত্ব আছে।

অর্থ্যাত যদি এভাবে সব কিছু আটকিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় তাহলে সব কিছু অপরিবর্তিনীয় থাকবে কিন্তু শুধুমাত্র পরম সময় চলতে থাকবে।

সময়ের ব্যাপারে প্লাটনিসম ও এরিস্টোটেলিসমঃ প্লাটনিসমের মতে কোন কিছুর পরিবর্তন ছাড়াই সময়ের স্বাধীন অস্থিত্ব আছে। অর্থ্যাত এক অক্ষর লেখার পর আরেক অক্ষর লেখার মধ্যেখানে হয়ত হাজার বছর চলে গেছে আমরা জানিও না। অর্থ্যাত সময় কোন ঘটনার উপর নির্ভর করে না। মনে করুন, পৃথিবীর সব কিছু স্থির আছে কিন্তু মংগল গ্রহে সব কিছু চলতে ছিল। তাহলে পৃথিবী স্থির থাকলেও সময় চলেছে মংগলের সাপেক্ষে। অর্থ্যাত সময়কে চলতে হলে কোথাও কোন ঘটনা ঘটতে হবে তাহলেই সময় চলছে। কিন্তু প্লাটনিসম অনুসারে কোন ঘটনা ঘটা ছাড়াই সময় চলছে। অর্থ্যাত পরম সময় বলে কিছু রয়েছে।

এরিস্টটলিসমের মতে, সময় কোন ঘটনার উপর নির্ভর করে। অর্থ্যাত কোন কিছু ঘটা ছাড়া সময়ের স্বাধীন অস্বিত্ব নেই। এই ধারায় পরম সময়ের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। কোন ঘটনা বা কোন কিছুর পরিবর্তিনই সময় নির্দেশ করে। ঘটনা ছাড়া সময়ের অস্বিত্ব নেই। অর্থ্যাত সময়কে পৃথিবীতে আটকিয়ে দেওয়া যায়, তবুও সময় চলতে থাকবে যদি অন্য কোথাও কিচু ঘটতে থাকে। যুক্তি গুলি এরকমঃ

  1. সময়ে পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে চলে। যদি সূর্য উঠে, তখনই সকাল হয়। সূর্য যদি নাই উঠে, আর আপনিও কিছু না বুঝেন, কিছু না ঘটে তাহলে সময় ঘটবে না। অর্থ্যাত, পরিবর্তন ছাড়া সময় অসংজ্ঞায়িত।
  2. যদি সময় চলেও থাকে, এবং আমরা অপরিবর্তনীয় থাকি, তাহলে এমন কোন উপায় নেই যে আমরা সেটা জানতে পারবো। অতএব, ঘটনা ছাড়া সময়ের স্বাধীন অস্থিত্ব নেই।

প্লাটনিসমের যুক্তিঃ

  1. সময় একটি বড় কন্টেইনারের মত, এখানে একটু একটূ করে বিভিন্ন ঘটনা জমা হয়।
  2. তাই এমন একটা কিছু সম্ভব যে কিছুই জমা হচ্ছে না, কিন্তু কন্টেইনারটা ঠিকই আছে, অর্থ্যাত পরম সময় ঠিকই আছে।

প্লাটনিসমের পক্ষে আরেকটা যুক্তি দেওয়া যায়, তা হল। হয়ত কোথাও কিছু ঘটেনি নির্দিষ্ট সময়ে ভিতরে। কিন্তু ঐ সময়ে ঐ সব ঘটনা ঘটতে পারতো, কিন্তু ঘটানো হয়নি। অতএব, ঘটনা ছাড়াই স্বাধীনভাবে সময়ের অস্থিত্ব রয়েছে।

 

সময় বলে কিছু নেই!: ১৯০৮ সালে McTaggart যুক্তি দেখান যে, যেকোন ঘটনা একটা অবস্থানে থাকলে তাকে বর্তমান বলা হয়, আবার সেই ঘটনাটাই আরেকটা অবস্থানে অতীত এবং তারও আগের অবস্থানে সে ছিল ভবিষ্যৎ, তাহলে দাড়াল সময় কোন অবস্থানেই নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ করে না এবং প্রতিটি সময়ই ভবিষ্যৎ বর্তমান এবং অতীত হয়ে চলতে থাকে। অর্থ্যাত, সময় বলে আসলে নির্দিষ্ট কিছু নেই। সময় শুধু মাত্র একটা ইলোশন। কিন্তু উল্লেখ্য এই তত্বের দুর্বলতা হল, সময় কোন জিনিস নয়, তাই সুনির্দিষ্ট রুপে ইহার থাকার দরকার নেই।

 

ব্লক মহাবিশ্বের সময়ঃ ব্লক মহাবিশ্বের ধারনায় সময় হল দৈর্ঘ, প্রস্ত ও উচ্চতার মত স্থান ও কাল। ভবিষতের প্রভাব এবং অতীতের প্রভাব বর্তমানের উপর থাকে। এই ধারনায় স্বাধীন ইচ্ছা-শক্তি বলে কিছু থাকে না। এটা একটা বিশাল স্থানের মত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলছে। তারমানে, একই সাথেই সব কিছু ঘটছে এবং আমাদের বিলিয়নের উপর কপি রয়েছে। ঠিক এখনই আপনি জন্মগ্রহন করেছেন, ঠিক এখনই আপনি আছেন। ঠিক জমির মত, যেমন জমির একজায়গায় এক গাছ আছে, অন্য জায়গায় আরেকটু বড় গাছ এরপর আরেকটু দূরে বৃদ্ধ গাছ। সব কিছুই সময় নামক স্থান ও কালে স্বজ্জিত। অর্থ্যাত, সময় পরিভ্রমন সম্ভব, মানে সময়ের পরিভ্রমনের জন্য সময়ের এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে আপনাকে যেতে হবে।

(ছবিঃ http://www.timephysics.com/)

 

সময় পরিভ্রমনঃ

যদি সময় পরিভ্রমন করা সম্ভব হয় তাহলে কি হয় যুক্তিমালাঃ

  1. সময় পরিভ্রমন করে কেউ অতীতে গেল, অতীতে গিয়ে সে তার দাদাকে পেল।
  2. আপনার বাবার জন্ম হবার আগেই দাদাকে মেরে ফেলল।
  3. লজিক্যালী তার অস্থিত্ব নেই।

অতএব, সময় পরিভ্রমন সম্ভব নয়। আপনারা হয়ত টারমিনেটর ছবিটি দেখে থাকবেন। টারমিনেটর ছবিতে রোবটদের স্কাইনেট, মানুষদের নেতা জন কার্নার এবং তার মা কে মারার জন্য অতীতে টারমিনেটর পাঠায়। যদি অতীতে জন কার্নারকে মেরে ফেলতে পারে, তাহলে জন কার্নারেরী জন্ম হবে না। এবং জন কার্নারের নেতৃত্বে কোন যুদ্ধ হবে না। যাইহোক, লজিক্যালী এখন পর্যন্ত এটা সম্ভব নয়।

সময়ের ব্যাপারে ইসলামিক আলোচনাঃ (নিম্নউক্ত আলোচনা অনলাইনে পেলাম)

"রাজিবঃ কিন্তু ইসলামের কি শিক্ষায় কি দৃঢ়ভাবে সময়ের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যাতে এর অনুসারীরা যে কোন সময়ে সে নির্দেশনার অনুসরন করতে পারে?

রাশেদঃ হ্যাঁ, ইসলামে কোরআন ও হাদিসে সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। কেউ কোরআন, ইসলামের নবীর জীবনী ও সাহাবা ও তাবেঈনদের জীবনী দেখলে বুঝতে পারবে যে, তারা সব সময় সময়ের গুরুত্বদানকারী ও নিয়মাবনুর্তী ছিলেন। এর উদাহরণ হল আল্লাহ তায়া’লা পবিত্র কোরআনে অনেকবার সময়ের শপথ করেছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির, শপথ তার” (সুরা ফজরঃ ১-২) আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “শপথ রাত্রির, যখন সে আচ্ছন্ন করে” (সুরা আল লাইলঃ ১)।

আল্লাহ তায়া’লা আরো বলেনঃ “কসম যুগের (সময়ের)” (সুরা আসরঃ ১)।

তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, চন্দ্র সূর্য সৃষ্টি তার নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম যাতে মানুষ বছর ও সময়ের গণনা ও হিসেব করতে পারে।

ইসলামের অধিকাংশ ইবাদতে সময়ের গুরুত্ব বাস্তবায়ন করা হয়েছে, কেননা ইসলামের সব ইবাদতই সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। শুরু ও শেষ হিসেবে। বরং ইবাদত সহি ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সময়কে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে। এজন্যই ইসলামী শরিয়ত এ ব্যাপারে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য সময়ানুবর্তীতাকে শর্ত করে দিয়ে সময়ের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে”।(সুরা নিসাঃ ১০৩) ।

নামাজ যা দ্বীনের খুঁটি, রাত দিনকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে এর ওয়াক্ত নির্ধারিত সময় ও নির্দিষ্ট আলামতে করা হয়েছে। এমনিভাবে ইসলামের অন্যান্য রুকুনগুলোঃ রোজার রয়েছে বাৎসরিক নির্ধারিত সময়। এ সময় মুসলমান নির্দিষ্ট সময়ের অনুসরন করে। এমনিভাবে যাকাত, যা আর্থ-সামাজিক পদ্ধতি, যা সময়ের সূক্ষ্মতা ও নির্ধারিত সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। হজ্জের ব্যাপারেও একই কথা।

কোরআন যেমনিভাবে গুরুত্ব দিয়েছে তেমনিভাবে সময়ের গুরুত্বের ব্যাপারে রাসুলের (সাঃ) সুন্নতেও অনেক উদাহরণ রয়েছে, । কারো সাথে সময়ের অঙ্গিকারের ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। ইহা রাসুলের (সাঃ) এ হাদিসের অন্তর্ভূক্তঃ “মুসলমানগন তাদের শর্তের উপর অটল থাকবে” । তাই কারো সাথে দেখা করার সময় নির্ধারন করা মানে প্রত্যেক লোক নিজের জন্য নির্ধারিত সময় মানার শর্ত করে নেয়া। যদি সে উক্ত শর্ত ভঙ্গ করে তবে সে নিজের জন্য যা শর্ত করেছে তাই ভঙ্গ করল। আর ওয়াদা ভঙ্গ করাকে রাসুল (সাঃ) মুনাফিকের আলামতের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ মুনাফিকের আলামত তিনটিঃ কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে আর তার কাছে আমানত রাখলে তার খিয়ানত করে”। অতএব অযথা বিলম্বকারী ও এপয়েন্টমেন্ট ভঙ্গকারী ওয়াদা ভঙ্গকারী হিসেবে গন্য হবে। ।

মাইকেলঃ তবে সব সংস্কৃতি ও সভ্যতায় সময়ের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, ইসলাম এ ব্যাপারে বাড়তি কি গুরুত্ব যোগ করেছে?

রাশেদঃ ইসলাম সময়ের সদ্ব্যাবহার ও শৃঙ্খলা করতে তিনটি প্রধান মাত্রা সংযোগ করেছে।

প্রথমতঃ মেয়াদ, যা মানুষের সব জিনিসের মধ্যে সময় সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ, ইহা তার জীবন। সে একে আগ-পর করতে বাবাড়াতে পারেনা। সময় চলে গেলে আর ফিরে আসেনা। এজন্যই ইসলাম সময়কে জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত সঠিকভাবে কাজে লাগাতে বলেছে। বরং একে এ জীবনের পরের জীবনের সাথে বেঁধে দিয়েছে। পুনরুত্থান, কিয়ামতের দিনে হিসেব নিকাশ ইত্যাদির সাথে সময়কে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে। এমনিভাবে ইসলাম মুসলমানকে খুব কঠিন মূহুর্তেও সময়কে কাজে লাগাতে উৎসাহিত করেছে। যেমন রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ যদি কিয়ামত সংঘটিত হচ্ছে এমন সময় তোমাদের কারো হাতে চারা থাকে, তবে সে যদি সক্ষম হয় তখনও যেন উক্ত চারা যেন বপন করে দেয়”।

দ্বিতীয় মাত্রা হলোঃ অত্যাবশ্যকীয় করাঃ ইসলাম সময়ের সুষ্ঠ বিনিয়োগ ও শৃঙ্গখলাকে শুধু গুরুত্বই দেয়নি বরং একে মুসলমানের ইচ্ছা অনুযায়ী না রেখে অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছে। কেননা মানুষের জীবন হল সময়ের সমষ্টি মাত্র, যা শুধু তার মালিকানা নয়, বরং ইহা তার রবের পক্ষ থেকে তার সন্তুষ্ট কর্মে ব্যয়ের জন্য দান করা হয়েছে। এভাবেই ইসলাম সময়কে মানুষের জন্য মূলধন হিসেবে দিয়েছে। তার মূলধন কিভাবে বিনিয়োগ ও ব্যয় করে সে হিসেব নেয়া হবে। রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন বান্দা চারটি জিনিসের হিসেব না দিয়ে এক পা ও নড়তে পারবেনাঃ তার জীবন সম্পর্কে তা কিভাবে ব্যয় করেছে….”। রাসুল (সাঃ) আরো বলেছেনঃ “দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অনেক মানুষই উদাসিন থাকেঃ সুস্বাস্থ্য ও সময়”। তিনি আরো বলছেনঃ “ পাঁচটি জিনিস চলে যাওয়ার আগেই সুযোগ গ্রহণ করঃ মৃত্যুর পূর্বে তোমার জীবন, রোগের আগে সুস্বাস্থ্য, ব্যস্ততার আগে অবসর সময়, বৃদ্ধ হওয়ার আগে যৌবন বয়স ও দারিদ্রতার আগে সচ্ছলতা – কে কাজে লাগাও-“। নিঃসন্দেহে বলা যায়, যার মূলধন বেশি হবে তাকে বেশি হিসেব দিতে হবে, (অর্থাৎ যার বয়স বেশি হবে তাকে বেশি হিসেব দিতে হবে)। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি,যাতে যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল”। (সুরা ফাতিরঃ ৩৭)।

রাসুল (সা:) বলেছেনঃ “আল্লাহ তায়া’লা যাকে দীর্ঘায়ু করেছেন, এমনকি তাকে ষাট বছরে পৌঁছিয়েছেন তার ওজর পেশ করার সুযোগ রাখেননি”।

হযরত হাসান বছরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি কতিপয় দিনের সমষ্টিমাত্র। যখনই তোমার থেকে একদিন চলে যাবে তখনই তোমার কিছু অংশ চলে যাবে”। এ (কিছু অংশ) আবার ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ডে বিভক্ত। যখনই এক মিনিট বা এক সেকেন্ড চলে যাবে তখনই কিছু অংশ চলে যাবে। অতএব সময়ই জীবন।

তৃতীয় মাত্রাটি হলঃ এ মহামূল্যবান বস্তুর প্রতি প্রেরণা ও এর প্রতিদান। সময় হল বাহ্যিক পরিবর্তনশীল বস্তু , কেউ এর উপর বলপ্রয়োগ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা, এজন্যই ইসলাম মুসলমানের মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রেরণা দিয়ে দিয়েছে যা তাকে সেসব প্রেরণা ও উৎসাহে শীর্ষে নিয়ে যায়। আর এখানেই আসে বিবেকের রক্ষণাবেক্ষণের ভূমিকা, যেহেতু তা কোন কিছু গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে মূল পরিচালিকা শক্তি। ইসলামে ব্যক্তির বিবেকের নিয়ন্ত্রণ মানে স্রষ্টার কাছে হিসেব দেয়ার ভয় ও ভাল কাজে সাওয়াব পাওয়ার আশা । আর ইহাই মুসলমানকে ব্যক্তি ও জাতির কল্যানে সময় ব্যয় করতে আহবান করে।"

আলোচনাঃ

  1. সময়ই কি বাস্তবতা? অধিক সম্ভাবনায়, সময় এবং বাস্তবতা একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। সময়ই বাস্তবতার অবতারনা করে।
  2. সময় এবং সত্যের সম্পর্ক? অধিক সম্ভাবনায়, সময় এবং সত্য একই জিনিস। কারণ একটা বিষয় সত্য হলেই সেটা অতীতে ঘটবে, বা বর্তমানে ঘটছে অথবা ভবিষতে ঘটবে।
  3. আমরা কি সময় অনুভব করি? সময় আছে কি নাই, এই বিতর্কের বাহিরে আমরা সময়কে অনুভব করতে পারি। সময়কে আমরা দেখিও না, ছুইও না কিন্তু বুঝোতে পারি।
  4. আমাদের কাছে সময়ের অর্থ এবং মূল্য কি? সময়ের মূল্য অপরিসীম। আমাদের দেওয়া সময়ের ভিতর আমদের অস্থিত্বে আসে, যেমন কাউরো জন্ম ১৯০০ সালে মৃত্যু ২০০০ সালে হলে সে ঐ সময়ের ভিতর পৃথিবীতে অস্থিত্বশীল। নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন ও ভাবতে পারি আমাদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট সময়ের ভিতরই। অর্থ্যাত, আমরাই আমাদের সময়, এবং আমাদের দেওয়া সময়ই আমরা। অতীতের কবি হোমারের ভাষায় “If they ever tell my story let them say that I walked with giants. Men rise and fall like the winter wheat, but these names will never die. Let them say I lived in the time of Hector, tamer of horses. Let them say I lived in the time of Achilles.” (In Odysseus's saying) (link)    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়ঃ "যাত্রার কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও। তারি রথ নিত্যই উধাও, জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন, চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।"-(লিংক)
  5. সময়ের সংজ্ঞা কি? সময় এবং পরম সময়কে আমরা সুনির্দিষ্ট রূপে সংজ্ঞায়িত করতে পারিনা। সময় কি আল্লাহ পাকই সেটা ভাল জানেন। সময়ের অনেক কিছুই এখন পর্যন্ত আমাদের বুঝার সীমানার বাহিরে রয়েছে, হয়ত আল্লাহ পাক চাইলে আমরা তাহা একদিন বুঝোতে পারব।

 

উপসংহারঃ মহান আল্লাহ পাক আমাদের সময় দান করেছেন। এটা একটা অমূল্য উপহার, এবং আমার আলোচনা থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন এটা কত দামী উপহার। উক্ত হায়াত বা সময়ের ভিতরেই আমরা পরিক্ষা দেই, ভাল অথবা মন্দ কাজ করার সুযোগ পাই। ইমাম শাফেয়ী রাঃ বলেছেন, "সময় তোলোয়ারের মত, যদি তুমি ইহাকে না কাটো, ইহাই তোমাকে কাটবে, তিনি আরো বলেন, যদি তোমার আত্মা সত্য নিয়ে ব্যস্ত না থাকে তাহলে অসত্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে"(লিংক) । 

 

 

কৃতজ্ঞতাঃ

উপরে ব্যাবঋত সকল রেফারেন্স ও লিংক এবং

time. (2016). In Encyclopædia Britannica. Retrieved from http://www.britannica.com/science/time

Markosian, Ned, "Time", The Stanford Encyclopedia of Philosophy (Spring 2014 Edition), Edward N. Zalta (ed.), URL = <http://plato.stanford.edu/archives/spr2014/entries/time/>.

mkhan@timephysics.com, What is time http://www.timephysics.com/

৪ comments

Skip to comment form

  1. 2
    শাহবাজ নজরুল

    আমার মনে হয় -- সময়ের সবচাইতে ভালো প্রায়োগিক বিবরণ আছে সুরা আসর- এ। 
    বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা সময়ের অমীমাংসিত ইতিহাস ভালই লাগলো। 

    1. 2.1
      ফাতমী

      আমি অবশ্যই ইনশাআল্লাহ, এ ব্যাপারে পড়ে দেখব। মন্তব্যের জন্য শাহবাজ ভাইকে অনেক ধন্যবাদ।

  2. 1
    মাহফুজ

    আপনার বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত আল-কোরআনের আয়াত-

    (২২:৪৭) তারা তোমাকে শাস্কি ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনও তাঁর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন না। তোমার পালনকর্তার কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।

    (৩২:৫) তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছে পৌছবে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।

    ……………………………………..

    (৭০:৪) ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তা’আলার দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।

    1. 1.1
      ফাতমী

      ধন্যবাদ মাহফুজ ভাই আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.