«

»

Apr ০৩

সমাজ বিজ্ঞানের আলোকে হিজাব

প্রথমেই আমি যে হিজাব নিয়ে আলোচনা করতেছি, তার একটা সংজ্ঞা দিচ্ছি। মাথায় কাপড় বা  উড়না দেওয়াটাকেই আমি হিজাব বলতেছি। বিভিন্ন কিছুর প্রেক্ষাপটে হিজাবের সংজ্ঞা আলাদা এবং ভিন্ন হতে পারে। আলোচ্য আর্টিক্যেলে, সাধারণত যা হিজাব বুঝায়, সেই সংজ্ঞাকেই তুলে আনা হয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞনের ধারায় হিজাব সহ সর্ব প্রকার ড্রেস বা পরিধেয় বিষয়ে ব্যাপক গভীর তত্ব ও আলোচনা রয়েছে। আমি সে দিকে না গিয়ে সহজ ভাষায় হিজাব নিয়ে আলোচনা তুলে ধরব।

হিজাব এক প্রকারের পোশাক, এবং পোশাক হচ্ছে অপ্রযুক্তিক artifacts।  অতি-নিকট সময়ে, সমাজ বিজ্ঞানীরা artifacts এর ক্ষমতা সম্পর্কে  বুঝতে শুরু করেছেন, তাদের মতে এটি একটি সামাজিক দালাল (উকিল) যা মানুষের আচার-আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। মানুষ বহু বছর যাবত জানত যে প্রযুক্তির artifacts (যেমনঃ টিভি, কম্পিউটার ইত্যাদি) মানুষের আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে (Latour, 1988, source: Diana Crane, 2000), কিন্তু প্রযুক্তির বাহিরের artifacts গুলিও বহু কাল ধরে মানুষের আচার-আচরনকে প্রভাবিত করে আসছে। Diana Crane এর মতে  "cloths as artifacts create behavior through their capacity to impose social identities and empower people to assert latent social identities"(Diana Crane, 2000, Chapter 1).

 

যাইহোক, যখন একটা মেয়ে হিজাব পড়ে, সে নৃত্যুশিল্পি হোক, অভিনয় শিল্পী হোক, গায়ক হোক আর যেটিই হোক, সে সমাজকে এক ধরনের মেসেইজ দেয়। মেসেইজটা হলঃ  

 

  • আমি একজন মুসলিম। আমি ইসলামে বিশ্বাসী। আমি "আল্লাহ" পাক কে এক অদ্বিতীয় হিসাবে মানি। আমি "মুহাম্মদ" সাঃ কে নবী হিসবে বিশ্বাস করি। 

  • আমি হাজারো মুসলিমার একজন। এটি Muslim Sisterhood।

  • আমি আমার পরিচয় নিয়ে সম্মানিত।

  • আমি হালাল খাই, অতএব, আমাকে হালাল খাবারটি দিবেন।

 

আধুনিক নিউ-ক্লাসিক্যাল ইকোনমির যুগে ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়। নিউ-ক্লাসিক্যাল ইকোনমিক্সসের অন্যতম অনুসিদ্ধান্ত হলঃ  মানুষ যৌক্তিক জীব, মানুষ তার বিবেক অনুসারে নিজের জন্য কি ভাল এবং কি মন্দ সেটা বিবেচনা করতে পারে। এবং সেই বিবেচনার আলোকে বাজার থেকে কমডিটিস (goods and services) কিনতে পারে। তাই, এই ব্যাক্তি স্বাধীনতার যুগে একটি মেয়ে কোন পোশাক পড়বে, সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার বলেই ধরে নেওয়া হয়। এবং সে তার পোশাকের জন্য টাকা খরচ করবে বলেই ধরে নেওয়া হয়।

 

এখন সাধারণত হিজাবের বিরুধীতা কারা করেন? হিজাবের বিরুধীতা তারাই করেন, যারা সাধারণত  হিজাবকে একটা ইসলামিক টুল হিসাবে দেখেন। [নোট ১] অর্থ্যাত, সমাজে হিজাবকে ইসলামিক টুল হিসাবে ধরা হয়। সেজন্য, সমাজে বেশী হিজাব দেখা গেলে তারা এটিকে ইসলামের বিজয় হিসাবে মনে করেন। এবং এ জন্যই রাজনিতিক ভাবে হিজাবকে বাধা দিতে উৎসাহী হন। এর প্রয়োজনে সেকুলারিসমকে ব্যাবহার করা হয়। আধুনিক যুগের হিসাবে  হিজাব একটি ইসলামী পোশাক, (যদিও হিজাব বহু আগে থেকে প্রচলিত ছিল, প্রাচীন ইরান থেকে বাইজেন্টাইন সম্রায্যেও হিজাবের প্রচলন দেখা যায়) অতএব, এটি সেকুলারিসমের বিপক্ষে বলেই ধরে নেন নব্য-সেকুলার সমাজ। সেইজন্য, তারা ব্যাক্তি-স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গিয়ে হিজাবকে লক্ষ্য বস্তু বানান। এ উদ্দোশ্যে, তারা সামান্য পরিমাণ মাথায় কাপড় দেওয়া, অথবা মাথায় কাপড় না দেওয়া সত্ত্বেও একটু বড় পোশাক পরাকেই হিজাব বা ইসলামের বিজয় হিসাবে দেখে থাকেন।

 

বস্তুত, বর্তমান হিজাব, তা যতই ফ্যাশনের সাহিত করা হোকনা কেন, সেটাকে ইসলামের সাহিত সম্পর্কিত করা হয়। এটা মুসলিম পুরুষদের মুছ-বিহীন(অথবা ছোট মুছ)  দাড়ি অথবা টুপির সমতুল্য। একজন টুপি ওয়ালা মানুষ, সম্ভবত ফজরের নামাজ পড়েনি, সম্ভবত তাজ্জুদের নামাজও পড়েনি। কিন্তু সে টুপি পড়ে সমাজকে এটাই জানান দেয় যে আমি ইসলামে বিশ্বাসী, এবং  মুছ-বিহীন(অথবা ছোট মুছ) দাড়ি তা যতই ফ্যাশনেবল হোক, একই মেসেইজ প্রদান করে। এবং হিজাব তা জিন্সের পেন্টের সাহিত পড়া হোক, অথবা পাশ্যাত্যের আধুনিক পোশাকের সাথে হালকা করে পড়া হোক, সেটাও একই মেসেইজ দিয়ে যায় যে আমি মুসলিম উম্মার অংশ।

 

 

নোট১ঃ মুসলিমদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মানুষ (যেমনঃ  কোরান আনলিদের এক গ্রুপ)  আছেন, যারা মনে করেন হিজাব ইসলামের কিছু না, তবে সাধারণত তারা হিজাব পড়তে অন্যকে বাধা দেন না।

রেফারেন্সঃ Diana Crane, 2000, Fashion and Its Social Agendas: Class, Gender, and Identity in Clothing The University of Chicago press.

লেখকঃ ফাতমী, তারিখঃ ৩/০৪/২০১৬, প্রকাশঃ সদালাপ।

১২ comments

Skip to comment form

  1. 5
    মজলুম

    অল্প কথায় দারুন পোষ্ট লিখেছেন। হিজাব ফ্যাশানের হোক আর যাই, এক টুরো রঙ্গীন কাপড় হোক আর কালো কাপড় হোক সে একটা পরিচয় (মুসলিম)বহন করে। আর অমুসলিম দেশগুলোতে এই হিজাবের জন্যে তার উপর নানা ধরনের আক্রমন ও হয়। এক্ষেত্রে মুসলিম নারীরা মুসলিম পুরুষের চেয়ে বেশী সাহসী। কারন দাঁড়ি টুপি না থাকার জন্যে কেউ বুঝতে পারেনা সে কোন ধর্মের লোক, তাই আক্রমন ও হয় এদের উপর কম। মুসলিম নারীরা তাই মুসলিম পুরুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে তার পরিচয় সাহসের সাথে তুলে ধরা জন্যে, হোক তা এক টুকরা কাপড়।

    1. 5.1
      ফাতমী

      আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

  2. 4

    মসাময়িক প্রেক্ষাপটের আলোকে আপনার বিশ্লেষন ভাল হয়েছে।

    1. 4.1
      ফাতমী

      আপনাকেও ধন্যবাদ।

  3. 3
    কিংশুক

    ধর্ম ভিত্তিক জাতিয়তার চিহ্ন ধরে খুব সুন্দর লিখেছেন । মুসলিমদের চিহ্নের সাথে সাথে খ্রিস্টানদের ক্রস, শিখদের পাগড়ি  দাড়িও উদাহরণ হিসাবে টানা যায় । কারা হিজাব দাঁড়ি বিরোধী তার বিশ্লেষনও ভাল হয়েছে ।

     

     

    1. 3.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের আলোকে আপনার বিশ্লেষন ভাল হয়েছে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় এই শিরোনাম অসম্পূর্ন। হিজাব বর্তমানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ফ্যাশানের দিকে বেশী ঝুঁকে পড়েছে। সেই দিকটা আপনার হিসাবে অনেকটা কভার করেছে। তবে যদি শিরোনামে মেয়েদের হিসাবে উল্লেখ করতেন -- তা হলে ঠিক হতো। মেয়েদের হিজাবে মতো ছেলেদেরও হিজাব আছে -- যা প্রায় আলোচনাই হয় না। যেমন ছেলেরা টাইট জিন্স পড়ে -- বা টাইট শার্ট পড়ে তা ঠিক না। 

      আমার মতে আপনার লেখাটার শিরোনাম হবে -- সমাজ বিজ্ঞানের মেয়েদের হিজাব 

      1. 3.1.1
        ফাতমী

        @আবু সাইদ জিয়াউদ্দিন,

        আমি আসলে শুধু সমাজ বিজ্ঞানেই থাকতে চেয়েছি, পোস্টের মোড় অন্যদিকে ঘুরাতে চাই নি। হ্যাঁ, মেয়েদের উল্লেখ করলে আরও স্পেসেফিক হত।

  4. 2
    মাহফুজ

    সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আপনার বক্তব্যের যথার্থথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যে কোন ধর্মের নারীরাই মাথায় কাপড় জড়িয়ে এর পার্থিব পজেটিভ ও নেগেটিভ এফেক্টের আওতায় আসতে পারেন।

     

    মুসলিম বাদে অন্যদেরকেও তাদের মত কোরে মাথায় টুপি দিতে ও দাড়ি রাখতে এবং মাথায় ঘোমটা নিতে দেখা যায়। তবে মুসলিমের জন্য নামমাত্র টুপি, দাড়ি, লম্বা জোব্বা এবং হিজাব ও নিকাব নয়, সর্ববস্থায় পর্দার হক আদায় করাটাই যেন মূল উদ্দেশ্য হয়।

     

    হিজাব মানেই নারীদের মাথার একটি চুলও দৃষ্টিগোচর হলে মহাপাপ হয়ে যাবে বলে যারা মনে করেন, তাদের সাথে আমি একমত নই। কথাবার্তায়, স্বভাবে, চলাফেরায়, কর্ম সম্পাদনায়, ভাব ও দৃষ্টি বিনিময় সহ সকল স্তরে যেন বাহ্যিক ও আন্তরিক শালীনতা ক্ষুন্ন না হয় সে ব্যাপারে একজন মুসলিমকে সচেতন ও সাবধান থাকতে হবে।

    ধন্যবাদ-

     

     

     

    1. 2.1
      ফাতমী

      আসসালামুয়ালাইকুম,

      ভাই, আপাত আপনার বক্তব্যের উপর আমার কোন মন্তব্য নেই।

      1. 2.1.1
        মাহফুজ

        সালামুন আলাইকুম’ ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

        যেহেতু আপাতত আপনার কোনই বক্তব্য নেই, তাই আবারও আমিই কিছু বলছি।

        //নোট১ঃ মুসলিমদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মানুষ (যেমনঃ  কোরান আনলিদের এক গ্রুপ)  আছেন, যারা মনে করেন হিজাব ইসলামের কিছু না, তবে সাধারণত তারা হিজাব পড়তে অন্যকে বাধা দেন না।//

        নোট ২ঃ আমার এক ভাইজান কিন্তু আমার জন্য পারফেক্ট একটা গ্রুপ চয়ন করেছেন। তিনি আমাকে “কোরআন ও সিলেক্টিভ হাদিছ অনলি” নামে আখ্যায়িত করেছেন। সে কারণে আমি যারপর নাই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি যেন নামে ও কামে যথার্থভাবে এই পরিচয়েই মহান স্রষ্টার সামনে হাজির হতে পরি- দোয়া করবেন।

  5. 1
    shahriar

    Jajak-allah for nice post.

    1. 1.1
      ফাতমী

      আমার জন্য রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করবেন। ভাল থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.