«

»

Feb ০৮

ইসলামে সম্পদের বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের নিয়ম-নীতিঃ সংক্ষিপ্ত আলোচনা

প্রথম কিস্তি

(লেখাটিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের ইচ্ছা রাখছি। সে হিসেবে ধারাবাহিক প্রবন্ধের প্রথম কিস্তি দেয়া হলো)

 

প্রারম্ভিক আলোচনা:

আসমান ও জমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই, আল্লাহর নিকটই সবকিছু প্রত্যাবর্তিত হয়। (সূরা আল-ইমরানঃ ১০৯)

আসমান-জমীনে অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বলোক এবং এই দুয়ের মাঝে যা কিছু আছে, তার সব কিছুরই একচ্ছত্র ও নিরংকুশ মালিক একমাত্র বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্।

আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সবকিছুর একমাত্র নিরংকুশ মালিক যে আল্লাহ, এই মালিকত্বে কেউই যে আল্লাহর সাথে শরীক নেই, তাঁর এই মালিকত্ব যে সম্পূর্ণরুপে নিরংকুশ ও একচ্ছত্র, তার প্রমানসরূপ পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াতে রয়েছে। এখানে কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা যায়:

সূরা আল-ইমরানঃ ১৮০ :

“আকাশ ও পৃথিবীর চির স্বত্তাধিকার একমাত্র আল্লাহরই।”

সূরা আ’রাফঃ ১২৮ :

“নিঃসন্দেহে পৃথিবী আল্লাহরই, তিনি তার ‘ওয়ারিস’ করেন তার বান্দাহদের মধ্যে যাকে চান।”

সূরা আন-নূরঃ ৩৩ :

“এবং তোমরা তাদের দাও আল্লাহর সেই মাল থেকে যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন।”

সূরা আশ-শূরাঃ আয়াত ১২ :

“মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর ভান্ডারের চাবিকাঠির মালিকানা ও কর্তৃত্ব আল্লাহর। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তার জীবিকায় (অর্থ সম্পদে) প্রশস্ততা দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা সীমিত দিয়ে থাকেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞানী।”

অর্থাৎ, সম্পদ স্বয়ং আল্লাহর, তিনিই এর প্রকৃত মালিক। মানুষ আল্লাহর দেয়া এই সম্পদ পেয়েছে দান হিসেবে। শুধু সম্পদই নয়, সেই সাথে পেয়েছে সেই সম্পদের বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের বৈধ নিয়ম-নীতি। সেই নিয়ম পুংখানুপংখভাবে অনুসরনের মাধ্যমেই সেই মাল তাকে রাখতে হবে। সে মাল নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করার কোনো অধিকার আল্লাহ তা’আলা মানুষকে দেননি। মানুষ সেই মাল দিয়ে স্বীয় প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে শুধু এই জন্য যে, আল্লাহ তাকে তা করার অনুমতি দিয়েছেন। অনুমতি দিয়েছেন বলেই মানুষ তা পারে। অনুমতি না দিলে তা সে পারতো না। কেননা, সে মালিক নয়, মালিক হচ্ছেন আল্লাহ যিনি মানুষকে তা দিয়েছেন। (সূত্র: মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, ইসলামে মালিকানাতত্ত্ব-১, আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০, পৃষ্ঠা-৫২৩)

ইসলাম অর্থনীতির অস্বাভাবিক কোনো সংজ্ঞা প্রদান করেনা। ইসলাম বলে, সম্পদের মূল মালিক মহান আল্লাহ আর মানুষ সম্পদের আমানতদার। সম্পদের মূল মালিক যে মহান আল্লাহ তায়ালা আর মানুষ যে সে সম্পদের আমানতদার এ বিষয়ক আয়াতগুলোর কয়েকটি দেখে নিই এখানে:

“আমি পৃথিবীতে খলিফা নিয়োগকারী।” (সূরা আল বাকারাঃ ৩০)

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এই দুনিয়ার খলিফারুপে সৃষ্টি করেছেন। যে প্রতিনিধি বা খলীফা সে নিশ্চয়ই আসল স্বত্তা নয়, যার সে প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়েছে। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি মাত্র, ‘আল্লাহ’ নয়। আল্লাহ সারা বিশ্বলোকের মালিক, কিন্তু মানুষ মালিক নয়, যদিও সে আল্লাহর প্রতিনিধি।

কেননা, “সেই মহান আল্লাহই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি বানিয়েছেন।” (সূরা আল-ফাতিরঃ ৩৯)। আর মানুষ এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বে, ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্বে, প্রতিনিধি আল্লাহর সবকিছুর নিরংকুশ মালিকত্বে।

আল্লাহর নিরংকুশ মালিকত্বের প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ সম্পদ পেয়েছে। আর এই সম্পদ তথা অর্থ মানব জীবনের অখন্ড ও অবিভাজ্য বিষয় সমূহের একটি মাত্র। আল্লাহ বলছেন: “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো এবং তোমরা সেই জিনিস থেকে ব্যয় করো যাতে তিনি তোমাদেরকে খলীফা বানিয়েছেন। অতঃপর তোমাদের জন্য বিরাট শুভ ফল রয়েছে।” (সূরা আল-হাদীদঃ ০৭)। এ আয়াতটির তাফসীরে বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার ধন-সম্পদের ব্যপারে মানুষ আল্লাহর খলীফা। সে  ধন-সম্পদ থেকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এবং তাঁর বিধানের মধ্যে থেকেই তা ব্যয় করতে পারে। নিজ ইচ্ছানুযায়ী কিছুই ব্যয় করতে পারেনা। আর যে জিনিসের উপর ব্যক্তির নিজের ইচ্ছে চলেনা, সে তার ‘মালিক’ হতে পারেনা।

কেননা, “আল্লাহ ছাড়া অন্যরা নিজেদের জন্য না কোনো উপকার লাভের মালিক, না ক্ষতির।” (সূরা রা’দঃ ১৬)।

সূতরাং একথা স্পষ্ট যে, কুরআন আসমান-জমীনের মালিকানাসহ সব কিছুরই মালিকানা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট বলে ঘোষনা করেছে এবং এই মালিকানায় আল্লাহর সাথে অন্য কেউই শরীক নয়। আল্লাহই মালিক, তিনিই তাঁর মালিকানা সম্পদ-সম্পত্তি মানুষকে ভোগ-ব্যবহার করার অধিকার এবং সে সবের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছেন। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ নির্দেশিত জীবন দর্শনের ভিত্তিতে মানুষের জীবিকা আহরণ, আহরিত সম্পদের ন্যায্য বন্টন এবং সুষ্ঠু ও সুন্দর ব্যয় ও ভোগ ব্যবহারের নির্দেশনাই অর্থনীতি। ইসলামি অর্থনীতি একই সাথে ইতিবাচক এবং নীতিবাচক। ইসলামি অর্থনীতিতে উন্নয়ন ও সমস্যার সমাধানের নির্দেশনা প্রদান করা হয় আদর্শ ও ন্যায় নীতির ভিত্তিতে।

ইসলামে সম্পদের বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের নিয়ম-নীতিতে ব্যক্তির আমানতদারীর সাথে সাথে সামষ্টিক আমানতদারীর অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রতিটির জন্য রয়েছে স্বতন্ত্র ও নিজস্ব নিয়ম নীতি। প্রত্যেক আমানতদার তার নিজস্ব ক্ষেত্র ও পরিবেশে আল্লাহর আইনের বেষ্টনীর মধ্যে পূর্ণ স্বাধীনতা পাচ্ছে। ব্যক্তির যেমন স্বাধীনতা রয়েছে তেমনি তার উপরে রয়েছে সমষ্টির অধিকার। একইভাবে সমাজ-সমষ্টির যেমন স্বাধীনতা রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যক্তির জন্য দায় দায়িত্ব। এর কোনো একটি দিককেই অস্বীকার করা যাবেনা। ব্যক্তি সমষ্টির সীমা লংঘন করবেনা, সমষ্টিও ব্যক্তির অধিকার যুক্তিসংগত ও আইনভিত্তিক কারন ছাড়া হরন করবেনা। ব্যক্তি ও সমাজ-সমষ্টির মাঝে এ এক অপূর্ব সমন্বয়।

আর এই অপূর্ব সমন্বয়ের নামই ইসলামী অর্থব্যবস্থা। আর দুনিয়ার মানুষকে এই ব্যবস্থাই মেনে চলতে হবে। সূরা আনফাল এর ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করে দিচ্ছেন এইভাবে: “হে ঈমানদার লোকেরা, জেনেশুনে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে বিশ্বাস ভংগের কাজ করোনা, নিজেদের আমানতের ব্যপারে বিশ্বাসঘাতকতার (খিয়ানতের) প্রশ্রয় দিও না।” কেননা, “যারা (আল্লাহর দেয়া বিধান) প্রত্যাখ্যান করেছে, ধন ও সন্তান তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবেনা।” (আল-কুরআন ৩:১০)।

পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তিই প্রধান ও নিয়ন্ত্রক, সমাজ-সমষ্টি অনেকটাই উপেক্ষিত। পক্ষান্তরে, সমাজতান্ত্রিক সমাজে সমাজ’ই প্রধান ও একক, ব্যক্তি সেখানে চরমভাবে উপেক্ষিত। অথচ যুক্তি, বিজ্ঞান ও সভ্যতার দৃষ্টিতে ব্যক্তিও সত্য, সমাজও সত্য। এই উভয়ের মাঝে যে সামষ্টিক ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন, তা কেবলমাত্র ইসলামী অর্থব্যবস্থায়ই পূর্ণরূপে সংরক্ষিত হয়েছে। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যপারে মৌল মতবাদ হচ্ছে- মালিকানা আল্লাহর, আর মানুষের ভূমিকা রয়েছে আমানতদারীর দায়িত্ব পালনের। আল্লাহ বলছেন: “এবং তোমরা সেই জিনিস থেকে ভোগ-ব্যবহার ও বিনিয়োগ করো, যাতে তিনি তোমাদেরকে খলিফা বানিয়েছেন। (সূরা আল-হাদীদ: ০৭)। ইসলাম ব্যক্তি-মালিকানা ও সামষ্টিক মালিকানার পরিবর্তে ব্যক্তির আমানতদারী ও সামষ্টিক আমানতদারী- এই দু’য়ের গুরুত্ব স্বীকার করেছে। অর্থাৎ আল্লাহ সৃষ্ট বিত্ত-সম্পদ-শক্তিতে ব্যক্তির আমানতদারী চলবে, কিন্তু তাতে সামষ্টিক আমানতদারী রয়েছে। ব্যক্তি আমানতদার, কিন্তু কেবল ব্যক্তিই নয়, সমষ্টিও। আবার সমষ্টিও আমানতদার, কিন্তু কেবল সমষ্টি নয়, ব্যক্তিও।

ইসলামী গবেষক মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী তাঁর “এ ইসলাম ইসলামই নয়” প্রবন্ধের “অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” অধ্যায়ে ইসলামী অর্থনীতির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এভাবে: ইসলামী অর্থনীতির প্রণেতা স্বয়ং স্রষ্টা, আল্লাহ। এই ব্যবস্থার ভিত্তি নীতি হচ্ছে সম্পদকে মানুষের মধ্যে দ্রুত গতিতে চালিত করা, কোথাও সঞ্চিত হতে না দেওয়া। পুঁজিবাদ বলছে সম্পদ খরচ না করে সঞ্চয় করো; সবার সঞ্চয় একত্র করো, পুঞ্জীভূত করো (ব্যাংকে), আল্লাহ কোরআনে বলছেন খরচ করো, ব্যয় করো, সম্পদ জমা করোনা, পুঞ্জীভূত করোনা। অর্থাৎ ইসলামের অর্থনীতি পুঁজিবাদী অর্থনীতির ঠিক বিপরীত। একটায় সঞ্চয় করো অন্যটায় ব্যয় করো। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রী সাম্যবাদী অর্থনীতি ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করে জাতির সমস্ত সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে পুঞ্জীভূত করে। এটাও ইসলামের বিপরীত। কারণ, ইসলাম ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পূর্ণ স্বীকার করে এবং রাষ্ট্রের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে না।

চিন্তাবিদ, ইসলামী গবেষক অধ্যাপক রায়হান শরীফ বলছেন, ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞা ও পরিধি আধুনিক অর্থনীতির বিবর্তিত সংজ্ঞা ও পরিধি থেকে যথেষ্ট ভিন্নধর্মী ও ব্যপক। ইসলামী অর্থনীতিতে মানুষের জীবনের কল্যানকে অনুসরন করাই লক্ষ্য নির্ধারিত। এ ক্ষেত্রে জীবন শুধু জড় নয়, শুধু ইহকালের জীবনও নয়, অর্থনেতিক আচরণকে মানুষ যাতে সেই সামগ্রিক ও সমন্বিত ইহকাল-পরকালের সর্বোত্তম সমৃদ্ধি ও কল্যান অর্জনের উপযোগী করা যায়, ইসলামী অর্থনীতির পরিকল্পনাতে ও ভাবধারাতে তারই ব্যবস্থা অনুর্নিহিত রয়েছে। এই ভিত্তিগত পরিকল্পনা ও ভাবধারনা আল-কুরআনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আয়াতের বিশ্লেষন থেকে পাওয়া যায়। (সূত্র: অধ্যাপক রায়হান শরীফ, ইসলামী অর্থনীতিতে মৌল প্রাকৃতিক সম্পদের সংজ্ঞা ও ভাবধারনা, আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০, পৃষ্ঠা-৫১৩)।

 

ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রধান প্রধান দিক নির্দেশনা:

ইসলামে সম্পদের বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের নিয়ম-নীতিকে সঠিকরুপে মেনে চলতে তথা ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে যে যে নির্দেশনাগুলোকে প্রথমেই আত্মস্থ করতে হবে সেগুলোকে একটু দেখে নিলে ভাল হয়।

 

প্রথমতঃ আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-প্রসূত বিধি প্রয়োগের যোগ্যতার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গই নিযুক্ত হবেন দায়িত্ব পালনের জন্য। কেননা, ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকেই মানুষের ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আল-কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শকে ভিত্তি করে। এ আদর্শ মানুষকে মুমীন হিসেবে সুসমন্বিতভাবে সংগঠিত ও বিবর্তিত ব্যক্তিবর্গে রূপান্তরিত করে। ইসলামী জীবনের অধীনে ব্যক্তি মানুষ আদর্শবাদের নৈতিকতা এ বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পূর্ণ মানুষ, আংশিক সংকীর্ণ মানুষ নয়। এ সকল পূর্ণ মানুষই সংগঠিত করে সুসমন্বিত সমাজ সত্তা এ সামাজিক আচরন। সামাজিক ইসলামী নৈতিকতা ও বিধি থেকেই আসে প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হয় শিক্ষা-প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হয় মানুষের রাষ্ট্ররূপ ও সরকার। প্রতিষ্ঠিত সরকার প্রতিনিধিত্ব করে ব্যক্তি চরিত্রের গুণমর্যাদার। পারস্পরিক আলোচনা ও পরামর্শ নীতি অনুসরনে তাঁরা  প্রতিনিধিত্ব করবেন সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের সংকল্পকে- যার নির্দেশ আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত। সে সংকল্প প্রশিক্ষণ ও পূর্ণ জ্ঞান থেকেই উদ্বুদ্ধ হবে। (সূত্র: ভূমিকা, আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০)। ক্ষমতা ভোগ বা ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য, আর শাসক ও শাসিত উভয়কেই কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের ক্ষমতা লাভ করতে হবে আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে। কেননা আল্লাহ ঘোষনা করছেন: “হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহর বিধি পালন করো, রাসুল (স.) কে অনুসরন করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বের দায়িত্বে আসীন তাদের আদেশ পালন করো। তোমরা যদি কোনো কিছু নিয়ে মতবিরোধে পৌঁছো, তাহলে তাকে আল্লাহ ও রাসুলের কাছে বিচারের জন্য পেশ করো।” (সূরা আন-নিসাঃ ৫৯)।

 

দ্বিতীয়তঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থায় মানুষের ভূমিকা পূর্ণ মানুষ হিসেবে। মানুষ শুধু শ্রম নয়। শ্রমের পরিমান বা শ্রমশক্তিই মূল্য বা মর্যাদার উৎস নয়। মানুষের ভূমিকা কেন্দ্রীয় শক্তি- যে শক্তি মানুষকেও গড়ে, সমাজকেও গড়ে, আবার অর্থনীতিকেও গড়ে। মনোবল, বুদ্ধিবল, জ্ঞানবল, উদ্যোগবল এবং শ্রমবল মিলিয়ে মানুষ এসব গড়ে। আর তার ফলেই গড়া হয়ে যায় সভ্যতা আর অগ্রগতির ইতিহাস আর তারই উপযোগী হয় মানুষের কাজকর্ম ও আচরন। তারই মধ্যে প্রতিফলিত ও প্রবাহিত হয় প্রক্রিয়া ও প্রগতির স্রোতধারা। মানুষ এ স্রোতধারার নির্মাণকর্তা আবার নির্মিত প্রতিনিধি, বিশ্বস্রষ্টার প্রতিনিধি। আর বিশ্বস্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করতে হয় বিশ্বস্রষ্টার বিধানের প্রয়োগের সাহায্যে আর প্রকৃতির শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদকে বিশ্বস্রষ্টার আমানত বলে গণ্য করে। (সূত্র: প্রাগুক্ত)। আর তাই ইসলামী অর্থব্যবস্থার ৩টি মৌলনীতি।

১. শ্রম, প্রয়াস আর উদ্যোগ ছাড়া কিছু গড়া হয়না আর গড়া না হলে মানুষের পাওয়ার বা অর্জন করার কিছু নেই।

২. পৃথিবীর সব সম্পদ মানুষ সন্ধান করবে, আহরন করবে ও অর্জন করবে শুধু তাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। তার সাথে পার্থিব জীবনের প্রয়োজনকে ভুলে না যাওয়ার জন্য। সে উদ্দেশ্যেই বিশ্বস্রষ্টা মানুষকে কর্তৃত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আর পৃথিবীতে দিয়েছেন জীবনকে সফল করার সব পাথেয়।

৩. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের মালিকানা ইসলামী সংজ্ঞায় হবে আমানতদারী, যা তত্ত্বাবধানের সংকীর্ণ মালিকানা- নিরংকুশ মালিকানা নয়। আল্লাহ প্রদত্ত সকল সম্পদ ও শক্তিকে  আল্লাহ মানুষের ব্যবস্থাধীন করেছেন, যাতে মানুষ স্রষ্টার দান থেকেই পার্থিব সম্পদ নির্মাণ, উৎপাদন ও বিতরণ করতে পারে এবং অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে। আর সংগে সংগে যেন নিজেকে প্রকৃত সম্পদোপকরনের স্রষ্টার আমানতদার মনে করে।

 

তৃতীয়তঃ ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় পণ্য ও সেবার উৎপাদন হবে ইসলামী ভোগ প্রক্রিয়ার অনুসারী এবং উৎপাদনের প্রক্রিয়া হবে সামাজিক কল্যাণমুখী ও শোষণমুক্ত। ‘হালালান তাইয়্যেবান’ অর্থাৎ ইসলামী সংজ্ঞায় হালাল ও পবিত্র ভোগ্য পণ্য ও সেবা সরবরাহ করাই উৎপাদন পদ্ধতি ও সংগঠনের কাজ। উৎপাদনের প্রক্রিয়ার ভিত্তি হলো-

১. ভোগব্যবস্থা শরীয়া বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এবং অপচয় ও বিলাসের সমর্থন অবাঞ্চিত, ফলে অর্জিত আয়ের ব্যয় ও বন্টন হবে উৎপাদনমুখী।

২. অর্জিত উদ্বৃত্ত আয় ব্যয় করা হবে অর্থনৈতিক উৎপাদনে পুঁজি ব্যবহারের মাধ্যমে এবং সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে (যাকাত ও সদকা বন্টনের মাধ্যমে)।

৩. বৃহদাকার উদ্যোগে জমাকৃত সঞ্চয়ের তহবিলকে পুঁজি হিসেবে গ্রহন করে সে তহবিল সূদহীন ব্যাংক ব্যবস্থায় সূদহীন ঋণ বা পুঁজি শেয়ার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। সূদ ভিত্তিক লেনদেন ইসলামী উৎপাদন ব্যবস্থাতে হারাম বা অবৈধ। ফলে, সামাজিক শোষনের একটি বিরাট হাতিয়ারকে বর্জন করা হয়েছে। জাতীয় আয়ের এ অংশ সূদবর্জিত উৎপাদন প্রক্রিয়াতে আয় বৃদ্ধি করবে সব শ্রেণীর মানুষের, যা বর্ধিত শ্রম মজুরী হিসেবে এবং দায়িত্ব বন্টন ব্যবস্থায় বর্ধিত মুনাফার অংশ বন্টন মাধ্যমে, যার ফলে আবার সঞ্চয় প্রক্রিয়া এবং উদ্যোগ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া শক্তিশালী হতে থাকবে। (সূত্র: প্রাগুক্ত)

 

চতুর্থত: ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় ভোগের প্রক্রিয়া ও জীবন যাপনের মান ‘শরীয়া’র বিধির অধীন। ভোগের মাত্রা ও ভোগের পণ্য ‘শরীয়া’র বিধি অনুসারে নিয়ন্ত্রিত হয়। “হে মানবমন্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী ভক্ষন করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরন করোনা, সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল-বাকারাঃ ১৬৮)।” “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার করো, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসাবে দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় করো আল্লাহর, যদি তোমরা তাঁরই বন্দেগী করো।” (সূরা আল-বাকারাঃ ১৭২)। (সূত্র: হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী (র.), অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, তাফসীরে মা’আরেফুল-কুরআন, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪০০ হিঃ, পৃষ্ঠা- ৪৬০)। এখানে পণ্য ভোগের যোগ্য হবে যদি তা ‘হালালান তাইয়্যেবান’ অর্থাৎ ইসলামী সংজ্ঞায় হালাল ও পবিত্র হয়। সূতরাং যা হালাল নয় ও পবিত্র নয় তা চাহিদা ও ভোগের অন্তভূর্ক্ত নয়। ভোগ এক্ষেত্রে শুধু জৈব প্রক্রিয়া নয়। এ হলো ইসলামী জীবনবাদী প্রক্রিয়া, যার অধীনে মানুষ এক নির্ধারিত পরিমিত ভোগ করে এবং সে সুযোগের জন্য মৌল অর্থনৈতিক সম্পদের স্রষ্টা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। নিয়ন্ত্রিত ভোগই এভাবে ভিত্তি স্থাপন করে নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের ও বিতরণের। (সূত্র: ভূমিকা, আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০)।

 

সহায়িকা:

  • তাফসীরে মা’আরেফুল-কুরআন, হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী (র.), অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪০০ হিঃ।
  • আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০।
  • ইসলামী স্যোসাল ফ্রেমওয়ার্ক (Islamic Social Framework), অধ্যাপক রায়হান শরীফ, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮০।
  • http://ipcblogger.net/bashar/?p=281
  • http://thisislamis-notislamatall.blogspot.com/2011/12/blog-post_4490.html
  • আল-কুরআনুল করীম, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৭৯।

(চলবে…)____________________________________________

৪ comments

Skip to comment form

  1. 2
    আবদুস সামাদ

    আপনার লেখায় মুসলীমদের বোধদয় হোক৷ ভাল লাগল৷ কিন্তু ভাই ঘন্টাতো আছে, কিন্তু িড়ালের গলায় বাঁধার লোকের অভাব যে৷ ধন্যবাদ৷

    1. 2.1
      rপরী

      মুসলমানদের সুদীর্ঘ কালের ইতিহাস আছে আর সে ইতিহাস শৌর্য বীর্যের ইতিহাস। আমরা আজকের মুসলমানরা কতটুকু মুসলমান? যদি আমরা সত্যিকার মুসলমান হতে পারতাম তাহলে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধার লোকের অভাব হতো না।

  2. 1
    শামস

    এখানে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থারর আলোচনা করলেন তা তত্বীয়। এর প্রাক্টিক্যাল আপ্লিকেশন খুব কম।
     

    1. 1.1
      ইমন রেজা

      @শামস: ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য..

      তবে কথা হচ্ছে, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোচনা করলাম তা শুধু তত্তীয় নয়, প্রাকটিক্যালও।  হ্যাঁ এর প্রাক্টিক্যাল আপ্লিকেশন হয়তো কম..কিন্তু আছে।

      কিন্তু আমদের মনে রাখতে হবে যে, এই তত্ত্বটাই কুরআন এর নির্দেশ। প্রতিটি মুসলমানের এই নির্দেশ মেনে চলাই কর্তব্য..আর এর প্রাক্টিক্যাল আপ্লিকেশন কম কেনো সেটাও কিন্তু আলোচনাতেই রয়েছে।

      বলা হচ্ছে-

      আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-প্রসূত বিধি প্রয়োগের যোগ্যতার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গই নিযুক্ত হবেন দায়িত্ব পালনের জন্য। কেননা, ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকেই মানুষের ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আল-কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শকে ভিত্তি করে। এ আদর্শ মানুষকে মুমীন হিসেবে সুসমন্বিতভাবে সংগঠিত ও বিবর্তিত ব্যক্তিবর্গে রূপান্তরিত করে। ইসলামী জীবনের অধীনে ব্যক্তি মানুষ আদর্শবাদের নৈতিকতা এ বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পূর্ণ মানুষ, আংশিক সংকীর্ণ মানুষ নয়। এ সকল পূর্ণ মানুষই সংগঠিত করে সুসমন্বিত সমাজ সত্তা এ সামাজিক আচরন। সামাজিক ইসলামী নৈতিকতা ও বিধি থেকেই আসে প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হয় শিক্ষা-প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হয় মানুষের রাষ্ট্ররূপ ও সরকার। প্রতিষ্ঠিত সরকার প্রতিনিধিত্ব করে ব্যক্তি চরিত্রের গুণমর্যাদার। পারস্পরিক আলোচনা ও পরামর্শ নীতি অনুসরনে তাঁরা  প্রতিনিধিত্ব করবেন সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের সংকল্পকে- যার নির্দেশ আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত। সে সংকল্প প্রশিক্ষণ ও পূর্ণ জ্ঞান থেকেই উদ্বুদ্ধ হবে। ক্ষমতা ভোগ বা ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য, আর শাসক ও শাসিত উভয়কেই কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের ক্ষমতা লাভ করতে হবে আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে।

      ভাববেন না আমি রাজনীতির কথা বলছি। কিন্তু কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে, এই তত্ত্বকে প্র্যাকটিক্যাল করতে কুরআনের আর্দশে প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্ররূপ ও সরকার প্রথমেই প্রয়োজন। যে কারনে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারী খলিফাদের সময়ে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।

      ভালো থাকবেন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.