«

»

Apr ১৪

মুসলিম বীরদের দস্যু প্রমাণ এবং অনার্য বাঙালির শিকড় নিয়ে মিথ্যাচার

আজকে সুষুপ্ত পাঠক এর পোস্ট পড়ে এসে মাথাটাই গরম হয়ে গেল। সে আমার পছন্দের একটি টপিক অনার্য এবং আর্যকে মুসলিমদের বিপক্ষে চালিয়ে দেবার একটি ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। তার লেখার লিঙ্ক-

https://www.facebook.com/pathoksusupto/posts/658081404397266

তো মিঃ সুষুপ্ত দেখা যাক আপনার লেখাতে ভুল কোথায় কোথায় আছে , তার লেখার প্রথমদিকেই সে বলেছে যখন আর্যরা ভারত বর্ষে আগমন করে , তখন ভু-মধ্য সাগর থেকে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল এর অনার্য অধিপতি ছিল বাঙালির পূর্বপুরুষ তো এই মহান তত্ত্ব দেবার সময়ে সে একটা বারও উল্লেখ করেনি , যে কেমন ভাবে তার এই সনাতনি পূর্ব পুরুষ আর্যরা ৯৯ টা পূর বা দুর্গ ধ্বংস করেছিল , এতটাই তারা নৃশংস ছিল যে শেষতক ইন্দ্র বা তৎকালীন আর্য রাজাদের পুরন্দর বলা হয় । ইনারা সেই সিন্ধু থেকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে চালাতে , গঙ্গার অববাহিকা তে এসে বাঙালি দের পূর্ব পুরুষ দের হাতে মার খেয়ে বেত্রাহত কুকুর এর মত পলায়ন করেছিলেন । জয়া বা যেটা আদি মহাভারত সেটা তে এর উল্লেখ পাওয়া যায় যে আদি আর্যরা নগর নির্মাণ করতে আগ্রহী ছিল না কেননা তারা পশুপালক ছিলেন ।

উল্লেখ্যঃ Jaya an Illustrated retelling of the Mahabharata by Devdutt Pattanaik

তো সে এরপরে উল্লেখ করেছে , গঙ্গারিদ্ধি সাম্রাজ্য এবং এর মাঝে থাকা বাঙালি বীর বিজয়সিংহ এর কথা , যিনি আমারও গর্ব তিনি কেমন করে সিংহল জয় করলেন , তবে তিনি এখানে একটা চালবাজি করেছেন , এই ঘটনা কে সূচিত করতে গিয়ে উনি শেষ দিকে উল্লেখ করেছেন , "আমার পূর্বপুরুষ যিনি তমলুকে জাহাজে চড়তেন তিনি না হিন্দু ছিলেন না মুসলমান" , তবে তিনি এটা জানতেন না যে গঙ্গারিদ্ধি এর ধর্ম ছিল তীর্থাঙ্কর বা ভবঘুরে সন্ন্যাসি দের দ্বারা প্রচারিত ধর্ম , যেটা সিদ্ধার্থ গৌতম এর সময়ে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম তে পরিণত হয় । কিছুদিন পূর্বে কনকমুনি এর স্তম্ভ আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে এই ধারণা আরও পোক্ত রূপ লাভ করেছে । 

এবং এর পরেই তিনি বিষ হানার মত করে , বাংলা এর ইতিহাস এর শ্রেষ্ঠ অত্যাচারী সেনদের কে ভূমিপুত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করেন ,

তো তার নিজের ভাষাতে সেটা জানা যাক

"যদিও লক্ষণসেন বাঙালী নন, দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেন রাজবংশ, তবু আফগান দস্যু বখতিয়ার খিলজির আগমনে তার খিড়কি দিয়ে পলায়নের মিথ্যা কাহিনী আসলে বাঙলাকে হীন করার চেষ্টা।"

তো আসলে দেখা যাক এই লক্ষণসেন আসলে কতবড় বীর আর সহনশীল ছিলেন 

প্রফেসর ডঃ গোলাম রসুল এর লেখা

Bengal Society Before the Advent of Islam এই গবেষণা পত্র তে উল্লেখ করা আছে। 

"The persecution of the Buddhists began at the advent of the 13th century when sena's conquered the Bengal they couldn't stand up to the liberalism practiced by buddhist monks at that time .The persecution rose to its height in a village named Gajpur in the district of Hoogly. According to Vivekananda,the Buddhists were oppressed by Mumaril,Sankaracharja,Rananuja and Madhab to establish Brahman hegemony.Kumaril also was responsible for killing several thousands of Buddhists through the help of a King
of Maharastra".

“The way in which the low caste Hindusembraced Islam to escape from Brahmanical torture”,R.C.Dutt remarks,“was a sad reflection onHinduism.”

এছাড়াও মূলধারা বাংলাদেশ এ উল্লেখ করা হয়েছে-

"নালন্দার অনুশাসনলিপি থেকে জানা যায়ঃ বর্মন বংশের হিন্দুরাজা জাত বর্মনের সৈন্যবাহিনী সোমপুরে (বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় অবস্থিত) বৌদ্ধ বিহারের একাংশ পুড়িয়ে দিয়েছিলো। তিব্বতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তারানাথ ষোড়শ শতকে বাংলাদেশ পরিভ্রমনে এসে, সেন আমলে এসব অত্যাচারের কাহিনী লিপিবদ্ধ করে গেছেন। অন্যদিকে, নির্যাতিত বৌদ্ধরা এসব কারণে মুসলমানগনকে স্বাগতম জানিয়েছে এবং মুহাম্মদ-বিন-বখতিয়ার খলজীকে বাংলা বিজয়ে সাহায্য করেছে"।

চর্তুদশ শতকের কবি রুমাই পন্ডিত বলেনঃ

"জাজপুরে ব্রাক্ষণদের ষোলশত পরিবার আছে। দানদক্ষিণা আদায়ের নিমিত্তে তারা বিভিন্নভাবে গমন করে। তা না পেলে অভিশাপ দিয়ে পৃথিবী ছারখার করে।"

তারা বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে এবং অনবরত ক্রোধ প্রকাশ করে থাকে অন্তরে দুঃখ পেয়ে লোকে বলে ওগো ধর্ম, তুমি আমাদের রক্ষা করো। তুমি ভিন্ন আমাদের উদ্ধার করার কে আছে? এরুপে ব্রাক্ষণরা সৃষ্টির বিনাশ সাধন করে। এ হল অন্যায়ের চরম নির্দশন। কবি রুমাই পন্ডিত এভাবে ব্রাক্ষণ্য অত্যাচারের এক অন্ধকার অধ্যায়কে উদঘাটিত করেছেন। যার ফলে বৌদ্ধ এবং সাধারণ হিন্দুরা এত বেশী উত্যক্ত এবং আলাদা হয়ে পড়েছিলো যে, তারা মুসলমানদেরকে তাদের মহান মুক্তিদাতা হিসাবে স্বাগতম জানালো।

তার লেখা একটি কবিতার অর্থ এরুপ যে ঃ ব্রক্ষা হলেন মুহাম্মদ, বিষ্ণু হলেন পয়গম্বর, শিব হলেন আদম, গণেশ হলেন শেখ (মুসলিশ সাধু পুরুষ), ইন্দ্র হলেন একজন মাওলানা, চন্দ্র-সূর্য এবং দেবতারা হলেন পদাতিক সৈন্য এবং সবাই মিলে যুদ্ধের বাজনা বাজাতে লাগলেন। চন্ডিকা দেবী হলেন হাওয়া বিবি, পদ্মাবতী হলেন বিবি নূর (আলোবিবি, বিবি ফাতেমা) সব দেবতারা একমন হয়ে জাজপুরে প্রবেশ করলেন, তারা মন্দির মূর্তি ইত্যাদি ধ্বংস করলেন, ধন-সম্পদ হস্তগত করলেন এবং একে পাকড়াও করার জন্য চিৎকার শুরু করে দিলেন

এরপরে আসল সুষুপ্ত দাদা এর  আসল সাম্প্রদায়িক রূপ আর সব কিছু ঝেড়ে ফেলে উনি হয়ে গেলেন একেবারে আদি সনাতনী বজরঙবলি-

"বাঙালীকে শোনানো হয়েছে ইয়েমেনের দরবেশ হযরত শাহজালালের ভয়ে রাজা গৌড়গোবিন্দ পালিয়ে গিয়েছিল। এই গল্প শুনে বাঙালী আমোদ পেয়েছে। ইয়েমেনের এই ভাগ্যাণ্নেষি দরবেশ ধর্ম প্রচারের অনুসঙ্গ হিসেবে সিলেটকে দখল করেছিল তার দস্যুবৃত্তি দিয়ে। এদের পদস্পর্শকে বলা হয়েছে ‘পূণ্যভূমি’। আর ভূমিপুত্ররা হয়েছে শত্রু। শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চা হয়েছে এভাবেই…।"

প্রথম কথা গৌড় গোবিন্দরা কোনদিন বাংলার ভূমিপুত্র চন্দ্র, দেব, পালদের বংশ ছিল না , সে ছিল এক দখলদার যে কিনা খাসিয়া দের কে ধ্বংস করে বিভিন্ন গালগল্প রচনা করে , এক গোবিন্দ রাজবংশের সূচনা করে শ্রীহট্ট গৌড় তে যাকে সমুদ্র দেবতার সন্তান এর বংশজ বলা হত । তাহলে একটা জিনিস এর প্রশ্ন থেকে যায় যে বাঙালি এক ভূমিপুত্র নিজেকে কোন দুঃখে আরয দেবতার সন্তান বলতে যাবেন????

আর দেখা যাক উনি কত বড় বীর ছিলেন উনার জীবনী থেকে জানা যায় যে প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময়ের রাজত্ব ছেড়ে দিয়ে পরিবার পরিজন ফেলে পেঁচাগড়ে পালিয়ে আত্নগোপন করেন। ১৩৮৪ খৃষ্টাব্দে শ্রীহট্ট বিজয়ের পর শাহজালাল তাঁর শিষ্য অনুসারীদের বিভিন্নস্থানে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। হযরত শাহজালাল(রাঃ) ৩২ বছর বয়সে শ্রীহট্ট আগামন করেন এবং ৩০ বছর বাস করার পর ৬২ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন।

তো এখন আমার কথা হচ্ছে, যে শাহজালাল এর দরগাহ তে গিয়ে হিন্দুরা তক আগরবাতি জ্বালায় আর সেই দিন এর কথা স্মরণ করে যেদিন তিনি তাদের কে অত্যাচারী এর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেখানে এই সুষুপ্ত দাদা, কোন বাঙালিত্ব দেখিয়ে বলেন উনি দস্যু ছিলেন????

তার লেখার লিঙ্ক উপরে  এ দেয়া আছে।

৭ comments

Skip to comment form

  1. 5
    ইমরান হাসান

    একটা টেকনিক্যাল প্রবলেম এর কারণে আমি কারো মন্তব্য এর রিপ্লাই দিতে পারছি না , তবে আমি এটাই বলতে চাই , যে আরিয়ান এবং অনার্য বা নন-আরিয়ান এর বিষয়টিও আজ  আর বিকৃতি থেকে বাইরে নেই , এটাও আজকাল নব্য জাতীয়তাবাদী দের কৌশলে রুপান্তরিত হয়েছে ।

  2. 4
    সজল আহমেদ

    @এস. এম. রায়হান: ভাই

    এই দাস-মনোবৃত্তির বর্ণমনা প্রজাতি যে শক্তের পূজারী, নরমের যম – সেটা অনেকভাবেই প্রমাণিত সত্য। তবে মজার বিষয় হচ্ছে অভিজিতের মতো সেও লেঞ্জা (আসল নাম) লুকিয়ে অভিনব পন্থায় নিজেকে ‘মুসলিম নাস্তিক’ দাবি করে ইসলাম ও মুসলিমদের দিকে গোচনা-গোমূত্র ছিটিয়ে সুকৌশলে হিন্দুত্ববাদ ও মোদিস্তানকে জাতে তোলার চেষ্টা করছে!

    আরো মজার কথা হলো এদের মূর্খামি প্লাস ভন্ডামি অল্পতেই ধরা পরে যায়।কিন্তু এরা এতটা নির্লজ্জ যে,ধরা খাওয়ার পরও নির্লজ্জ ভাবে মিথ্যাচার করে যায় এদিক-ওদিক না তাকিয়েই।কি চামড়া মাইড়ি!এরা নিজেদের হালের বড় বৈগ-গিয়ানিক কিংবা বড় ইতি-হাঁস বীদ ভেবে বসে আছেন।আর এই ভাবনা থেকে তাঁরা বড় সড় গবেষণা, প্রামাণিক ইতিহাস কে “মিথ্যা,সাম্প্রদায়িক” বলতে এতুটুকু দ্বিধান্বিত হননা!গুরুজির শিক্ষাকে তাঁরা যে শক্ত করে ধরে আছেন এ থেকে বের হওয়ার কোন ইচ্ছে, সৎ সাহস কিংবা জোড় তাঁদের নেই।আর তাদের মিথ্যাবাদীতা “সদালাপে” প্রমাণ হওয়ার পরে এরা ধুতির কোঁচা খোলার ডরে স্বনামে সেসবের কাউন্টার করতে আসেন না কখনোই।তাঁরা বড়সড় মিথ্যাচার করে ধরা পরার পরও,তাঁদের সমমনা(!)ভক্তরাদের জ্বী হুজুর, ইয়েস হুজুর, লাব্বায়েক হুজুর আমার কাছে যারপরনাই আশ্চর্য ঠেকে!এতটা নির্লজ্জ গৃহপালিত প্রভূ ভক্ত প্রাণী পৃথিবীতে বিরল!

  3. 3
    এস. এম. রায়হান

    এই দাস-মনোবৃত্তির বর্ণমনা প্রজাতি যে শক্তের পূজারী, নরমের যম -- সেটা অনেকভাবেই প্রমাণিত সত্য। তবে মজার বিষয় হচ্ছে অভিজিতের মতো সেও লেঞ্জা (আসল নাম) লুকিয়ে অভিনব পন্থায় নিজেকে ‘মুসলিম নাস্তিক’ দাবি করে ইসলাম ও মুসলিমদের দিকে গোচনা-গোমূত্র ছিটিয়ে সুকৌশলে হিন্দুত্ববাদ ও মোদিস্তানকে জাতে তোলার চেষ্টা করছে!

    1. 3.1
      ইমরান হাসান

      সে বাংলার ইতিহাস এর কালো অধ্যায় এর সূচনাকারী সেন রাজবংশ কে এক কথাতে ভুমিপুত্র বানিয়ে দিল আমাদের দেশ এর , বা ভুমিপুত্র সমতুল্য , অথচ বাঙালি নামটাই যাদের দ্বারা আবিষ্কৃত সেই স্বাধীন সুলতান দের ধর্মগুরু দের কে এক কথাতে দস্যু বানিয়ে দিল ।এই সুষুপ্ত , কিন্ত একটা কথাই বলার থাকে যে ইতিহাস কখনও মিথ্যাশ্রয়ী কে স্থান দেয় না , এইসব সাভারকার এর অনুসারি আমাদের সনাতন দাদারা প্রায় একই ধরণ এর মনোভাব সম্পন্ন ।

  4. 2
    সজল আহমেদ

    সুষুপ্ত নামের এই লোকটা নাস্তিকতার খোলসে অন্যধর্ম পালনকারী কেউ।তাঁর লেখাগুলো অন্তত তাই বলে।এরা নৈতিক মূল্যবোধকে মা কালির পায়ের তলে পাঠাবলির মত বলিদান করে ইন্টারনেটে প্রোপাগান্ডা ব্যস্ত।

    এই মহান তত্ত্ব দেবার সময়ে সে একটা বারও উল্লেখ করেনি , যে কেমন ভাবে তার এই সনাতনি পূর্ব পুরুষ আর্যরা ৯৯ টা পূর বা দুর্গ ধ্বংস করেছিল , এতটাই তারা নৃশংস ছিল যে শেষতক ইন্দ্র বা তৎকালীন আর্য রাজাদের পুরন্দর বলা হয় ।

    এ তথ্যগুলো তাঁরা পাঠ করলেও এড়িয়ে যান কি কারণে সেটা আমার কাছে আশ্চর্যের ঠেকে।আপনি লক্ষণ সেন এর কথা উল্লেখ করলেন কিছু তথ্য দিলেন।আমিও কিছু যোগ করলাম।
    লক্ষণ সেন কে নিয়ে তিনি যে গর্ব-টর্ব করতে চাচ্ছেন সে অহেতুক বৈ কিছুই নন।লক্ষণ সেন এর পরাজয়ে বাংলাকে হীন করার দাবী সে হালের কু ইতিহাস চর্চাকারী ছাড়া কেউ করতে পারেনা।সেন বংশীয় রাজারা ছিলো যারপরনাই অত্যচারী তাই তাদের পরাজয়ে বাঙ্গালীরা খুশিই হয়েছিলেন।অত্যাচারীর পতনের ইতিহাস বর্ণনা করলে সে অপমানকর এই দাবী কি হাস্যকর শুনায় না?

    বিদেশি আক্রমণে এই চন্দ্রদের পরাজয় ঘটে এগারো শতকে। সেন বংশের এই আক্রমণকারীরা এসেছিলেন দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে। যোদ্ধা সেনরা একসময় পালরাজাদের সৈন্যবাহিনীতে চাকরি করার জন্য বাংলায় এসেছিল। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের শক্তি বাড়াতে থাকে। পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে তারা পাল সিংহাসন দখল করে নেয়। এভাবে বাংলা বিদেশি শাসকদের অধিকারে চলে যায়। পাল এবং চন্দ্র রাজাদের স্বাধীন রাজ্যের অবসান ঘটে দক্ষিণ ভারতের এই সেনাদের হাতে।
    অল্প কিছু সময় বাদ দিলে পাল ও চন্দ্র রাজারা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সকল শ্রেণির ও ধর্মের মানুষ এসময় মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতো। কিন্তু মানুষের এই শান্তির দিন শেষ হয়ে গেল। বিদেশি শাসক সেনরা এদেশের সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করতো। সেন রাজাদের মনে একটা ভয় ছিল। তারা দেখেছেন বাংলার মানুষ স্বাধীনতা প্রিয়। বিদেশি শাসনকে তারা সহজে মেনে নেয়নি। সুযোগ পেলেই প্রতিবাদ করেছে। বিদেশি আক্রমণকারীদের ওপর অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
    সেনরা তো নিয়ম মতো সিংহাসনে বসেনি। যে পাল রাজারা তাদের সেনাবাহিনীতে চাকরি দিয়েছে সুযোগ মতো তাদের হটিয়ে দিয়ে,— হত্যা করে দখল করেছে সিংহাসন। এদেশের বিপ্লবী মানুষরা তা মেনে নেবে কেন?— এভাবে না ভেবে সিংহাসনে বসে সেন রাজারা যদি নিজেদের পেছনের কথা ভুলে গিয়ে এদেশের মানুষের যাতে ভাল হয়, অর্থাত্ সাধারণ মানুষের বন্ধু হয়ে দেশ শাসন করতো, তবে বাঙালিরা সহজেই গ্রহণ করতে পারতো সেন রাজাদের। পরবর্তী সময় দেখা যাবে বিদেশি শাসক মুসলমানরা এদেশে এসে প্রজাদের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরি করলে এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে বাঙালি তাদের আপন করে নিয়েছে।
    সেনরাজারা ছিলেন হিন্দু ব্রাহ্মণ। নিজেদের খুব উঁচু গোত্রের মনে করতেন। এই ব্রাহ্মণ রাজারা নানাভাবে শোষণ করতে থাকেন বাংলার সাধারণ হিন্দু ও বৌদ্ধπ ধর্মের মানুষদের। বৌদ্ধপণ্ডিত এবং বিহারগুলোর শিক্ষকদের অনেকে সেন শাসকদের অত্যাচারের ভয়ে বইপত্র নিয়ে বাংলা ছেড়ে নেপাল, তিব্বত ও চীন দেশে চলে যান। সাধারণ বৌদ্ধদের অনেকেই হিন্দু ধর্মের সাথে মিশে যেতে থাকে।
    সাধারণ বাঙালি যাতে সেন রাজাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে তাই শাসকরা একই ধর্মের মানুষদের চারটি বর্ণে ভাগ করে দিলেন। সবচেয়ে উঁচু বর্ণের হিন্দুদের বলা হতো ব্রাহ্মণ। এরা ছিলেন রাজা এবং পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের প্রায় সবাই কর্ণাটক এবং উত্তর ভারত থেকে আসা। এরপরের উঁচু শ্রেণিতে ছিলেন যারা তাদের বলা হতো ক্ষত্রিয়। সাধারণত যোদ্ধারাই ছিলেন ক্ষত্রিয়। এদের বেশিরভাগই বাঙালি ছিলেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য করা বা বড় বড় জমির মালিক যারা তাদের তৃতীয় শ্রেণিতে ফেলা হতো। এই বর্ণের নাম বৈশ্য। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এদের কিছু অধিকার দেয়া হতো। এর বাইরে থাকা বেশির ভাগ বাঙালি হিন্দুকে ফেলা হতো চতুর্থ স্তরে। এই বর্ণের নাম শূদ্র। এই সাধারণ বাঙালিরাই সকল সময় স্বাধীনতা আর অধিকারের জন্য প্রতিবাদ করে বলে তাদের দমন করার জন্য কঠিন কঠিন নিয়ম বেঁধে দেয়া হলো। বলা হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শূদ্রদের কোনো অধিকার থাকবে না। এরা শুধু উপরের তিন শ্রেণির মানুষের সেবা করবে। হিন্দু হলেও নিম্নবর্ণের বলে তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়া নিষেধ ছিল। লেখাপড়া করার অধিকারও ছিল না শূদ্রদের। সেন রাজারা সতর্ক ছিল যাতে সাধারণ বাঙালি মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে।
    সেন রাজাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করার মতো শক্তি তখন বাঙালির ছিল না। তাদের ক্ষোভ মনের ভেতর জমা হতে থাকে। অনেককাল পরে এর প্রকাশ ঘটেছিল। সাধারণ মানুষ নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছিল তেরো শতকের শুরুতে। এসময় মুসলমান সেনাপতি আক্রমণ করেছিলেন বাংলার পশ্চিম ও উত্তর সীমানায়। দেখা গেছে বাঙালি যুগে যুগে বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু বখতিয়ার খলজির আক্রমণের সময় তারা নিশ্চুপ হয়ে যায়। বাংলার পশ্চিম সীমান্তে বখতিয়ার খলজি যখন সেন রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করলেন তখন সাধারণ মানুষ কোনো প্রতিবাদ করেনি। এসময়ে বিপন্ন মানুষ সেন রাজাদের দুঃশাসন থেকে মুক্তি খুঁজছিল। তাই সেন রাজাদের পরাজিত করতে আসা বখতিয়ার খলজিকে তাদের কাছে শত্রু মনে হয়নি।
    [দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইন সংস্করণ সংখ্যা ৯ই সেপ্টেম্বর ২০১৫;ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ,প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়]

    শাহজালাল সম্বন্ধে উনি এই তথ্য কোথায় পেলেন তা আমার বোধগম্য নয়!সুষুপ্তরা তাদের সেন বংশীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ টিকাতে বা মহান বানাতে যতকাল এরকম মিথ্যে ইতিহাসের চর্চা করে যাবে ততকাল তাদের মুখে ঝামা ঘষে ইতিহাসের ইতিহাস চর্চা হবে।ইতিহাসের ও যে বাপ আছে সেটা মনে হয় তিনি বা তাঁদের দল ভুলে বসে আছে।

  5. 1
    মজলুম

    অনেকদিন পর আপনার পোষ্ট দেখে ভালো লাগলো।

    1. 1.1
      ইমরান হাসান

      আপনাকেও ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.