«

»

May ০৪

যুক্তি, বিশ্বাস ও কোরান

এই দুনিয়ায় কেউ বিশ্বাসী, কেউ অবিশ্বাসী। যুক্তি বিজ্ঞানের আলোকে যদি বিশ্বাসের স্থানে পৌছা যেত, তবে এই বিশ্বের বড় বড় মহাবিদ্যালয়গুলোতে যারা আজীবন যুক্তি-শাস্ত্র, অংক ও দর্শনের উপর শিক্ষকতা করে আসছেন তাদের সকলকেই হয়ত বিশ্বাসী পেতাম। আবার যদি এই শাস্ত্রাদির মাধ্যমে বিশ্বাসকে উড়িয়ে দেয়া যেত, তবে সবাইকে হয়ত অবিশ্বাসীই পেতাম, কেননা যুক্তি বিদ্যার সংজ্ঞা ও তার ব্যবহারিক জ্ঞান তাদের অবশ্যই আছে।  বিশ্বাস আসলে যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে সর্বসাধারণের আয়ত্তাধীন কোন বিষয় নয়। মানুষের আয়ত্তে যেসব বস্তু রয়েছে এবং যেসব বস্তু তারা নিজেরাই চেষ্টা সাধনা করে বের করতে সক্ষম, সেসব বস্তু ওহীর (ঐশীর) মুখ্য বিষয় নয়। আল্লাহ আছেন কী নাই, মৃত্যুর পর জীবন আছে কী নাই, সেখানে জবাবদিহির কোন বিষয় আছে কী নাই –এগুলো মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয় অনুসন্ধানের বাহিরে। কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করে সেখানে নিঃসন্দেহভাবে উপনীত হবার কোন পথ নেই। তাই আল্লাহ নিজেই পঞ্চেন্দ্রিয় পথে মধ্যস্থতা (intervene) করে রিসালাতের ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের অস্তিত্ব যেমন এক মহান নেয়ামত, তেমনি এটাও।  পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে অতীন্দ্রিয়তে পাড়ি দেয়ার এই বিষয়টিও আবার আসমান জমিনের মত। এটা এক ধরণের সম্ভব/অসম্ভবের ব্যাপার। “মুহাম্মদ বলেছেন তাঁর কাছে সরাসরি এবং এক ফেরেশতার মাধ্যমে এই মর্মে বার্তা এসেছে যে আল্লাহ আছেন, তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং মানুষের মৃত্যুর পর পুনরুত্থান হবে অর্থাৎ পরকার আছে” –এখানের সত্য-মিথ্যা কীভাবে নির্ণয় করবেন? আবার কোন যুক্তিতে মুহাম্মদকে “আস্থায়” নিয়ে আপনার গোটা জীবন তাঁর সেই বাণীর আলোকে সাজাতে যাবেন? অবস্থানের প্রকৃতি হচ্ছে এই যে হয় তাঁকে বিশ্বাস করে সেই পথে পাড়ি জমাবেন, আর না হয় যেখানে আছেন সেখানেই থেকে যাবেন। এই সিদ্ধান্ত এক চরম সিদ্ধান্ত। তাই যে বিশ্বাস করতে পারল আর যে পারল না –এই দুজন কি এক? এমন ধরণের অলঙ্কারবহুল (rhetorical) অনেক প্রশ্ন কোরান বার বার করেছে। এই জটিল কাজ কেউ করতে পারবে আর কেউ করতে পারবে না, এটাই অনুমেয় এবং বাস্তবতাও বটে। মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস এই পারা না-পারার সাক্ষ্য বহন করে। (তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন তিনি ফেরেস্তা দেখেছেন, বেহেস্ত-দোযখ দেখেছেন  এবং এ দিক থেকে তাঁর বাণীর একটি জ্ঞান-তাত্ত্বিক (epistemological) দিক রয়েছে, যেখানে রয়েছে seeing, perception, justication and knowledge, কিন্তু এই আলোচনা আমরা সেদিকে নিতে চাচ্ছি না, সেটা অন্য প্রকৃতির আলাদা আলোচনা। এর উপর এক সময় হয়ত আরেকটি লেখা দেবো।)   

    বস্তুত  যা পঞ্চেন্দ্রিয় পদ্ধতিতে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করা যায় তার জন্য ‘বিশ্বাস’ শব্দের প্রয়োগ যথাযথ নয়, এবং হয়ত সমীচীনও নয়। পঞ্চেন্দ্রিয়ের যুক্তিতে যদি অতীন্দ্রিয় ‘অকাট্য’ হয়ে পড়ত, তাহলে আল্লাহ, পরকাল নিয়ে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এত মশগত করত না।

    বিশ্বাস/অবিশ্বাস, আমার ব্যাখ্যায়, যুক্তিপূর্ব মুহুর্ত্তে সাধিত হয়। মানুষের প্রকৃতিতে একটি অতি সূক্ষ্ম প্রবণতা (disposition) রয়েছে যা ইতি/নেতির দোলকে (pendulum) সুপ্তভাবে বিচরণ করে, এবং স্থানভেদে কোমল অনুভূতিতে দোলন জাগায় আর এখানেই আসে তার তকদীর। যাকে যে পথের জন্য তৈরি করা হয়েছে,  তার সুপ্ত দোলন সেদিকে ইঙ্গিত করবে এবং সেই পথের ‘যুক্তি’ অনুভব করবে। একটি হাদিসে এসেছে যে মানুষের ক্বলব (অন্তরাত্মা) আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মধ্যে (রূপক কথা) অবস্থিত, তিনি তাকে যেদিকে ঘুরান, তার মন সেদিকেই যায়। যুক্তি অনেক পরের বস্তু। আবেগে ধারণা যখন সম্পর্কশীল (emotive sense associates with concept) হয়, যুক্তি তখন সৃষ্টি শৈলী প্রবণতায় স্ফূলিঙ্গিত হয়ে ব্যাখ্যার অনুকূল ভাষা লাভ করে। শব্দ ও বাক্যের, বিশেষ করে অনুকূল metaphor পেয়ে গেলে যুক্তির পথ সুলভ হয়ে পড়ে। যুক্তির আগের মূহুর্ত্তটি হচ্ছে সুপ্ত আবেগ পরশের মূহুর্ত্ত, ইতি বা নেতির কোমল অনুভূতি লাভের মুহুর্ত্ত। যুক্তি হচ্ছে simply একটা হাতিয়ার (tool) যা সেই অনুভূতিকে একটি বিশেষ রূপে রূপায়িত করে, গ্রহণীয় রূপে। বৃহৎ অর্থে আমাদের গোটা ভাষাটাই একটি tool যা আমাদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা সাজাতে সাহায্য করে। কোনো ছেলে যদি একটি মেয়েকে ভালবেসে ফেলে, তখন সে তাকে কেন বিয়ে করতে হবে –এর পক্ষে যুক্তি পেতে কোন অসুবিধে হবে না। প্রয়োজনে সে ১০১ যুক্তি দাড় করাতে পারবে। কিন্তু মেয়েটিকে যদি তার মা-বাবা অপছন্দ করেন, তবে তাদেরও যুক্তি পেতে অসুবিধে হবে না। তাদের সৃষ্টিশৈলী faculty-প্রজ্বলিত হয়ে উঠবে এবং ১০১ বিপরীত যুক্তির অনুভূতি পাবেন।  যুক্তি হচ্ছে ব্যাখ্যার একটি relative process and it is not an  infallible tool. It works largely around selective metaphors. Consider Marxism and their selective metaphors. What we see there is the use of ‘structural’ metaphors: base, structure, superstructures etc., and from there the Marxist argument lifts off.  দাউদ (আঃ) এঁর গৃহের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে যখন দুই ব্যক্তি বিচার চেয়ে প্রবেশ করেছিল তখন তাদের একজনের অভিযোগ ছিল যে তার একমাত্র ভেড়ীটি প্রতিপক্ষের অধিকারে থাকা ৯৯ টি ভেড়ীর সাথে দিয়ে দিতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে তার প্রতিপক্ষ তাকে পরাস্ত করেছে সুতরাং সে ঐশী বিচার পেতে এসেছে! 

    যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না, তাদের এই সিদ্ধান্ত যুক্তির অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে, যুক্তি এসেছে পরে, ব্যক্তির অবস্থানের justification হিসেবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের আবেদন হয় যুক্তির পূর্ব-মুহুর্ত্তের ‘ক্বালবি’ অনুভূতি থেকে। তবে কেউ অনুভূতিতে সাড়া না পেয়েও এবং যুক্তি ব্যতীরেকে বিশ্বাস করতে পারেন, তাতে অসুবিধে নেই। ধর্মীয় কাহ অভ্যাসে আত্মস্থ হলে যুক্তি এক সময় আসবেই। তবে ঈমানের জন্য কোন যুক্তির প্রয়োজন নেই।

    যুক্তিকেন্দ্রিক বিষয়ের একটি উদাহরণ টানা যাক। মনে করুন আমি আপনাকে একটি বিল (bill) পাঠালাম, আপনাকে এই বিল পে করতে হবে। বিলের নিচে যদি ছোট অক্ষরে লিখা থাকে যে যদি ১৫ দিনের মধ্যে এই টাকা আদায় না করা হয়, তবে আপনার উপর কোর্টের শমন জারি করা হবে। এত্থেকে বুঝতে হবে যে এখানে কোন যুক্তি বা যৌক্তিক স্বাধীনতা বাকি থাকে নি। এখানে আইনি ‘হুমকি’ এসে গেছে। কোন যুক্তি থাকলে, তা আদালত সাপেক্ষ।

    আমাদেরকে ঈমানের দিকে আহবান করা হয়েছে, আসমান জমিনের দিকে তাকাতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, গোটা সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করতে আহবান করা হয়েছে যাতে করে আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করতে পারি এবং তাঁর অনুগত হতে পারি। কিন্তু সেখানে এই হুমকিও রয়েছে যে যদি আমরা ঈমান আনতে ব্যর্থ হই এবং তাঁর অবাধ্য হয়ে পড়ি, তবে আমাদেরকে দোযখের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। এখানে আবেদন যুক্তি সংগত থাকত যদি বলা হত যে আসমান আর জমিনের দিকে তাকাও এবং দেখ ঈমান আনতে পার কি না। পারলে পেরেছ, না পারলে নাই –এতে কোন জোরাজুরি নেই, এতে শাস্তি-পুরষ্কারের কিছু নেই। কিন্তু বিষয়টি এভাবে আসেনি। এখানে আসমান আর জমিনের দিকে তাকানোর আহবান প্রচলিত অর্থের নিছক যুক্তির আহবান নয়, কেননা এই যুক্তি হচ্ছে সামাজিক ও ভাষিক, এটা ভাষার প্যাচে সৃষ্ট একটি দুর্বল উপকরণ। তাই আহবান হচ্ছে অন্তরাত্মা দিয়ে ধ্যান ও তপস্যামূলক আহবান। এই তাকানোতে যুক্তিপূর্ব মুহুর্ত্তের ‘ক্বালবি’অনুভূতির প্রতি আহবান, এটা হচ্ছে লুবাবের ব্যাপার। কোরান এই শব্দটি (এক বচনে বাব্ব, বহুবচনে আলবাব) ও ক্বলব শব্দটি (বহু বচনে ক্বুলুব) বার বার ব্যবহার করেছে। কোরান বলছে, চিন্তা করো, মননিবেশ করো ‘ওহে উলুল আলবাব’।   ওহীর এই আবেদন হচ্ছে জীবন সঞ্জীবনী, ক্বালবকে (অন্তরাত্মাকে) তার নির্জীব, রুগ্ন, মুমূর্ষু অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য। জীবন মৃত্যু যেমন তকদীরে অংশ তেমনি ক্বালবের ব্যাপারটি। বৃষ্টি ঝরলে যেভাবে কিছু উদ্ভিদ জীবন্ত হয়ে ওঠে তেমনি ওহীর সয়লাবে কিছু ক্বালব জীবন্ত হয়ে ওঠে। এ জন্য ওহীর উপমা বার বার মেঘের বিচরণ, বৃষ্টির অবতরণ আর তরু-লতা ও নানা উদ্ভিদ এবং ফলফসলের কথা দিয়ে এসেছে। ওহী হচ্ছে বৃষ্টি-ঝরা পানি। এই পানিতে কিন্তু সব বীজ জীবন্ত হয়ে ওঠে না, কিছু উঠলেও মরে যায়, কিছু উদ্ভিদ মাটির গভীরে জড় গেড়ে উপরের দিকে প্রশস্ত হয় এবং কিছু জড় গভীরে যায় না, এগুলো ঝড় তুফানে নিঃশেষ হয়। এগুলিই হচ্ছে ক্বালবের জগতের উপমা। এগুলোর আবেদন ভিন্ন। 

 

আল্লাহর ইচ্ছা –কেনোর কোনো মানি নেই

আল্লাহ কেন এক দল লোককে হেদায়াত দেবেন এবং কেন অন্যদলকে দেবেন না- এই প্রশ্নের উত্তর অনাদি, অনন্ত কালের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার কার্যকারণের সাথে জড়িত, চিরন্তনতার সাথে সংযুক্ত। আমরা সেই অনন্তে ছিলাম না, যেতেও পারব না, আল্লাহ আমাদেরকে এই বিশ্ব-লোকের সৃষ্টির সাক্ষ্য করেননি। এই বিষয়টি আমাদের সামাজিক ও ভাষিক যুক্তির উপকরণ দিয়ে সামলানো সম্ভব নয়। আল্লাহ কেন অসংখ্য গ্রহ উপগ্রহ কোটি কোটি বৎসরে সৃষ্টি করেন, কেন এগুলোকে নানান সৌন্দর্যে বিকশিত করেন, তারপর, ব্যাং!  এক আঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলেন! আমাদের মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে এগুলো  বিচার করতে গেলে হিমসিম খেতে হয়।         

    এই বিশ্ব জগত আমাদের পুরোগামী (it precedes us)। এই অনন্ত লোকের দিকে তাকিয়ে তার নানান গঠন/সংগঠন কীভাবে হয় এবং কেন এটা এভাবে আর ওটা সেভাবে –এগুলো জানার মত বয়স আমাদেরকে দেয়া হয়নি। অনেক জিনিস বুঝার বস্তুও নয়। নবী রাসূলদেরকে আল্লাহ যা জানিয়েছিলেন, (একান্ত প্রয়োজন না হলে), তারা তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। কেননা তারা ছিলেন সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। বিলিয়ন বিলিয়ন বৎসরে গড়া আমাদের চারিধারের এই জগতের মার-প্যাচ জানার তেমন উপায় উপকরণ নেই। এটাই বাস্তবতা। আমরা সবকিছু জেনে শুনে এখানে আসি নি এবং সবকিছু জেনে শুনে এখান থেকে যাবও না। সবকিছু জেনে বুঝে তবেই যদি ‘বিশ্বাস’করতে হয়, তাহলে ৮০ মণ ঘিও আসবে না, রাধাও নাচবে না। সবকিছু জানার দুঃসাহস এক ধরণের ঔদ্ধত্য।

 

তকদীর

তকদীরের ব্যাপারটি যুক্তিজ্ঞানে জটিল থেকে যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে ওহীর প্রকৃতি এবং যুক্তি ও অযুক্তি তথা মানসিক সেন্টারের rationality/irrationalityএর অবস্থানিক পার্থক্য।  মানুষ একান্ত যুক্তি সর্বস্ব প্রাণী নয় আবার সে যুক্তির বাইরেও নয়। নবীর উপর যখন ওহী নাজিল হত, তখন তিনি আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় যৌক্তিক জগতের চেতনায় (consciousness-এ) থাকতেন না। তার অবস্থার পরিবর্তন হত। প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত যেসব সাধকেরা ধ্যান-সাধনায় মনোনিবেশ করতেন, তাদের মানসিক চেতনা (consciousness) স্থানান্তরিত হত। অনুভূতির জগতে তারা অনেক কিছু বুঝতেন, যা সামাজিক/ভাষিক যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হত না। ভাষিক ব্যবহার হচ্ছে এক বস্তুর আলোকে (অর্থাৎ উচ্চারণ ও লিখার symbolic মাধ্যমে ) অন্য বস্তু বুঝানো, এটাই তার সিস্টেম, এবং এটা প্রকৃতিগতভাবে রূপক (metaphorical)। আর রূপকতা (metaphoricity) অকস্মাৎ যুক্তির ধারা ছেদন করতে পারে অর্থাৎ যুক্তির এক ধারাকে অন্য ধারায় মোড়িয়ে দিতে পারে, ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই ভাষায় যা কিছু বলা হবে তাতে দ্বৈততা, বৈপরীত্য থেকে যেতে পারে (because of its symbolic nature)। তাই সাধকেরা অনেক বৎসর অতিবাহিত না হলে নব্য-শিষ্যের সাথে তাত্ত্বিক আলোচনায় যেতেন না। যখন শিষ্যেরা ভাষায় নিহিত সমস্যার মার-প্যাচ অনুভূতিতে ধারণ করে, এই মাধ্যম বা tool-টির সীমাবদ্ধতার পর্যায়াদি আয়ত্ত করে, আলোচনার পর্যায়ে উপনীত হতেন, অর্থাৎ গুরুর বিবৃত কথার আপাতদৃশ্য ভাষিক অসামঞ্জস্যতা পুষিয়ে নেয়ার স্থানে পৌঁছতেন, কেবল তখনই গুরু-শিষ্য আলোচনা সংগঠিত হত।

    কোরান নাজিলের সময় নবী করীম (সঃ) অর্থ-জগত ও রূপক জগতের  ( العالم المعنوي والعالم المثالي) যা কিছু হৃদয়ঙ্গম করতেন, বুঝতেন এবং তাঁর জ্ঞান-পরিধি যে সসব বস্তু পরিবেষ্টন করত, তা সর্বসাধারণ থেকে ভিন্ন। আমাদেরকে সে জগতের বিষয় ‘বিশ্বাস’ করতে বলা হয়েছে, যেহেতু আমরা সেই পর্যায়ে নেই। নবুওয়তের মাক্বামে পৌঁছার কোন পথ নেই –এটি হচ্ছে আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত।  ওহী নাজিলের মাধ্যমে আমরা যে বস্তুটি পাচ্ছি, যে বাণী পাচ্ছি, তা ‘ভাষায় প্যাক-করা’ বিবরণ। এ বিবরণ এমন এক জগত থেকে উদ্ভূত হয়েছে যেখানে যৌক্তিক/অযৌক্তিক (rationality/irrationality) এর পার্থক্য নেই, যেখানে স্থান ও কালের অনুভূতি ভিন্ন। এসব বিষয় বুঝতে হলে ধ্যানের জগতে চেতনা (consciousness) যেখানে rationality/irrationality -এর পার্থক্য অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছতে হয়। যেহেতু বাণী ‘ভাষিক’ হয়ে পড়েছে, তাই ভাষা ও সমাজ কেন্দ্রিক তাবৎ জ্ঞান অর্জনও করতে হবে। এগুলো অনেক বৎসরের সাধনা ও ইবাদত-তপস্যার ব্যাপার।

    কোরানের বিষয়াদি বুঝতে গিয়ে আবার কিছু আয়াতকে অন্য কিছু আয়াত দিয়ে চাবকানি (বাড়াবাড়ি) করলেই বুঝা সম্ভব নয়। এখানে সমস্যা হচ্ছে ভাষার এবং সামাজিক যুক্তির। যুক্তি আমাদের সৃষ্ট একটি মাধ্যম, এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে –যুক্তি স্থান ও কাল সর্বস্ব। মূল স্থানে না গিয়ে আয়াতকে আয়াত দিয়ে চাবকানি করাতে সমাধান নেই, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এটা করতে নিষেধ করেছেন। মসজিদে এমন কিছু বিতর্ক লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন, তোমাদের কি হল যে তোমরা কোরানের এক অংশ অন্য অংশ দিয়ে কশাঘাত করছ? তোমাদের পূর্ববর্তীরা এভাবেই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে। (আহমদ/ইবন মাজাহ)।

 

যা যুক্তির মত দেখা যায়

কোরানের যে সব আয়াতে জীবন-জগতের যুক্তির বিষয়াদি আসতে দেখা যায়, সেগুলো সাধারণত দুই ধরণের যুক্তি বহন করে। একটি চিরন্তন, যেখানে এই এহসাস পাওয়া যায় যে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া এখানে আর কিছুই ঘটে না, ভাল-মন্দ বিশেষণ আরোপণের ঊর্ধ্বে, সবকিছুই  তার দিকেই সমন্বিত। আর অন্যটা হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনের সামাজিক যুক্তিবাহী কথা। যেমন আমরা দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তায় কর্তা ও ক্রিয়াপদকে সংগঠিত বিষয়ের সাথে সমন্বিত করি এবং তাতে যে যুক্তি অনুভব করি, তাই। যেমন আমি বললাম, ‘আমার পিতা একটি ঘর বানিয়েছেন’। এখানে ঘর বানানোর সাথে আমার পিতার কর্ম, ইচ্ছা ও সামর্থ্য সম্পর্কিত হয়েছে –আল্লাহর ইচ্ছা ও তার তকদীরের সাথে সম্পর্কিত নয়। মূল বাক্য যদি এভাবে বলা হত, ‘আমার পিতা আল্লাহর হুকুমে এবং তাঁর সাহায্যে একটি ঘর বানিয়েছেন’, তবেই তা বিশ্বাসের যুক্তিতে খাপ খেত, চিরন্তন যুক্তিতে যেত। কিন্তু সব কথা যদি এভাবে দীর্ঘায়ত করা হয় তাহলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই বস্তু জগতের কার্যকারিতার সাথে আমাদের কর্মকে সংযুক্ত করে আমরা সচরাচর যে আলাপ আলোচনা করে থাকি এবং যুগ যুগ ধরে করে আসছি, তাই প্রথাগত হয়ে পড়েছে। এখানে আমরা নিজেরাই কর্তা-পদে থাকি, বিশ্বাসে কোন বিঘ্নতা আসেনা। সব ভাষাতেই এই প্রথা, এই বৈশিষ্ট্য। আর কোরান যেহেতু আরবী ভাষায় বিবৃত হয়েছে তাই সেখানে ভাষার বৈশিষ্ট্যাদি স্থান পেয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর ব্যাখ্যা শুরু হলে সেখানে সব কিছুর উৎসই আল্লাহর দিকে সমন্বিত হবে।

 

যা মানুষের  কর্ম স্বাধীনতার মত দেখায়

দৈনন্দিন জীবনের ভাষিক-যুক্তির উৎস সমাজ ও সামাজিক বিশ্বাসের সাথেও সম্পর্কিত থাকে। ভাষা তার  ব্যবহার প্রক্রিয়ায় সেই বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে পরিবহন করে চলে। অনেক পৌত্তলিক সমাজ/সভ্যতার নানান বিশ্বাস ভাষার বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে প্রথাগত হয়ে থাকতে পারে। কোনো জাতি তাদের ধর্ম পরিবর্তন করে অন্য ধর্মে চলে গেলেও পূর্ব প্রথার কিছু কিছু জিনিস সেই ভাষার অংশ হয়ে নতুন ধর্মে প্রবেশ করে (migrates into the other) এবং যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতেও পারে। ভাষিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান (linguistic archaeological investigation)   চালালে তা ধরা পড়তে পারে। একটি ভাষার সুদীর্ঘ জীবনে (within the long span of a language’s life) তার ব্যবহারকারীরা ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়। অন্য ধর্ম, বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে বিপরীতধর্মী অভিব্যক্তির (expression) আগমন ঘটে, সময়ের সাথে কিছু কিছু বৈপরীত্যের সামঞ্জস্য ঘটে আবার অনেক জিনিসের সামঞ্জস্য হয় না। পূর্ব ও পরের ধারণাগত বিগ্রহ থেকেই যায়। যেমন আমরা সিলেট জেলায় বলে থাকি, ‘আল্লাহ চাল ফুঁড়ে লাল দেন না’ –এই কথাটি Free Will এর বিশ্বাস থেকে এসেছে, তকদীরের বিশ্বাস থেকে নয়। তকদীরের বিশ্বাসে চাল ফুঁড়ে লাল আসতে পারে যদি তা তকদীরে লেখা থাকে। কেননা, আল্লাহ যার তকদীরে ‘লাল’ (টাকা/সম্পদ) রেখেছেন, সে ঘরে বসে থাকার অবকাশ পাবে না, তাকে বেরিয়ে পড়তেই হবে, সেই অনুভূতি, সেই জ্বালা তার অন্তরাত্মায় সৃষ্ট হবে এবং সেই তাড়াই তাকে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যাবে। অথবা অন্য কোথাও থেকে আল্লাহ তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন –যার কল্পনাও সে করেনি। মানুষের স্বাধীনতা/অধীনতার দর্শন হাজার হাজার বৎসর থেকে স্থান, কাল, ধর্ম, দর্শনের ময়দান চরে বেড়াচ্ছে। সেক্যুলার জগতে এই টান-পোড়েন  free will versus social determination এবং free will versus genetic determination এ পর্যবেশিত হয়েছে। আমরা আল্লাহর ইচ্ছার determination-এ বা তকদীরেই বিশ্বাসী। এই বিশ্ব জগতে কেবল আল্লাহর শক্তি ছাড়া আর ছোট/বড় কোন কিছুই determine করতে পারেনা। আমরা ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলে এই ধারণার ঘোষণা দেই। আমার তকদীর আমিই গড়ি –এমন ধারণা ইসলামী নয়। এই বিশ্বে যদি আর কেউ শক্তি প্রয়োগ করতে পারে এবং সে শক্তি যদি আল্লাহ থেকে ভিন্ন হয়, তবে এমন (গাইরুল্লাহর) ধারণা শিরক হবে। আমরা যে কাজ করার ইচ্ছা লাভ করি এবং যে কাজ সম্পাদন করার শক্তি পাই –তা আল্লাহ থেকেই আসে। আল্লাহ বলেন, ‘ওয়া তাশাউনা ইল্লা আউইয়াশা আল্লাহু রাব্বুল আলামীন’ –অর্থাৎ তোমরা ইচ্ছাই করতে পারবে না যদি আল্লাহ ইচ্ছা না করে থাকেন।

 

যা বলা হল তাতে ভুল কিছু থাকলে আল্লাহর ক্ষমা ও তাঁর আশ্রয় কামনা করি। সব সত্য কেবল আল্লাহই জানেন। 

________________________

দ্রষ্টব্য ১, নিচে মন্তব্য সেকশনের 4.1 এ "দ্বিতীয় আলোচনাঃ যৌক্তিক সমস্যা" নিয়ে কিছু  গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এসেছে যেখানে সজ্ঞা ও epistemology নিয়ে আলোচনা এসেছে। এই অংশও মূল লেখার সাথে জরুরি।
 

দ্রষ্টব্য ২, এই লেখার বিষয় বস্তুর সাথে নিচের দু’টি লেখার সম্পর্ক রয়েছে, চাইলে দেখা যেতে পারে।  

 

.

১৬ comments

Skip to comment form

  1. 9
    কিংশুক

    এম_আহমদ ভাইয়ের অন্য অনেক লেখার মতোই অসাধারন একটি লেখা। ঈমান আল্লাহর দান, যাকে আল্লাহ পাক ঈমান দান করলেন তা তার জন্য চরম সৌভাগ্য। আর যে ঈমান পেলোনা তার সব শেষ কিংবা শেষের চাইতেও অতি খারাপ কেননা তার হতভাগ্যের কোন শেষ নাই হোক সে বিল গেটস/মার্ক জুকারবার্গ/ বারাক ওবামা। এই নশ্বর দুনিয়ার সামান্য কয়েক বছরের সাফল্যের চরম সীমায় পৌছলেও অসীম অনন্ত দুনিয়ায় তার হতভাগ্যের কথা চিন্তাাও করা যায়না।

  2. 8
    মহিউদ্দিন

    অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ একটি লিখা।
    আমার কাছে মনে হল যুক্তি দিয়েই অবিশ্বাসীদের যুক্তির অজুহাত চমৎকারভাবে খণ্ডন করা হয়েছে।

  3. 7
    শাহবাজ নজরুল

    অসাধারণ লেখা আহমদ ভাই। আপনার বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখে ইর্ষান্বিত হয়ে যাই মাঝে মধ্যে…

    1. 7.1
      এম_আহমদ

      ভাই ব্লগটি পড়া ও সদয়চিত্ত মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  4. 6
    রাতুল

    ধন্যবাদ শামস ভাই, আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্যে। আপনার কথাগুলো আমাকে পুরো লেখাটা আবার পড়তে বাধ্য করেছে। সবই ঠিক মনে হয় তবে একটা জায়গায় এসে কেন জানি আবার গড়বড় লেগে যায়।
    আমার বিশ্বাস যদি একটা জায়গায় প্রোথিত হয়েই থাকে এবং সে স্থান থেকে যদি আমাকে বিন্দুমাত্র টলানো না যায় তবে এত যুক্তিতর্ক কিসের জন্যে? যারা নাস্তিক তারা কি আগেই বিশ্বাস করে রেখেছে স্রষ্টা বলে কিছু নেই। নাকি তারা তাদের নিজস্ব যুক্তিবলে এই বিশ্বাসে উপনীত হয়েছে, আমার প্রশ্ন এখানেই। যদি আগেই বিশ্বাস করে বসে থেকে হাজারো যুক্তি দাড় করায় তবে তো তাদের সাথে তর্ক করাই বৃথা। কেননা সে মুক্ত চিন্তার ধারে কাছেই নেই। তবে কেন বৃথা বৃথা এত লেখালেখি।  







  5. 5
    শামস

    মনে করি, আমি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। আমার মন মজ্জা সব বলে যে ভগবানকে পেতে হলে তার বিভিন্ন রুপকে পূজা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস স্থির হয়ে আছে। আমার কোন এক মুসলিম বন্ধু আমাকে বুঝাতে সক্ষম হল যে, আমি যে ভাবে ভগবানের পূজা করি তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত……………। 

    আপনি যা বলতে চেয়েছেন তা লেখার মূল ফোকাস থেকে ভিন্ন বলে মনে হল । স্রষ্টার বিশ্বাস ও তাকে পাওয়া বা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করা দুটি ভিন্ন জিনিষ। হিন্দু, মুসলিমসহ নির্বিশেষে সবাই একজন স্রষ্টাতেই বিশ্বাসী, কিন্তু তারপরও তার রূপ বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন! কিন্তু এসব পরের বিষয়, প্রথম কথা হল স্রষ্টা আছে কি নাই যা এখানের আলোচ্য বিষয়।

    এখানে আসমান আর জমিনের দিকে তাকানোর আহবান প্রচলিত অর্থের নিছক যুক্তির আহবান নয়, কেননা এই যুক্তি হচ্ছে সামাজিক ও ভাষিক, এটা ভাষার প্যাচে সৃষ্ট একটি দুর্বল উপকরণ। তাই আহবান হচ্ছে অন্তরাত্মা দিয়ে ধ্যান ও তপস্যামূলক আহবান

    সেটা হয়ত ঠিক যুক্তির আহবান নয়, চিন্তা-ভাবনার আহবান। আর সে চিন্তা-ভাবনাটা হল র‍্যাশনাল থিঙ্কিং। সেটা প্রচলিত ধ্যান বা তপস্যার মত নয় বলে মনে করি। যদি তা র‍্যাশনাল থিঙ্কিং না হয়ে প্রচলিত ধ্যান বা তপস্যার মত হয়, তবে স্রষ্টার উপলব্দিটা হাতির মাথাওয়ালা দেবতার মত হতে পারে! তবে আপনার চিন্তার ধারণাটা ভাল লেগেছেঃ

    তার মানে আমি মনে করি যে আসমান যমিন দেখে আমাদেরকে ভাবতে হবে, গভীর চিন্তাই নিমজ্জিত হতে হবে। কে, কেন, কোন উদ্দেশ্যে এসব সৃস্টি‌ করলেন। সেখান থেকে যুক্তি পূর্বক স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আর কোন একটা বিশ্বাসে পা দিতে হবে। ভুল যুক্তির ফলে সে যদি বিপথগামী হয় তাহলে তার দায় অবশ্যই সে লোকটির। সঠিক সিদ্ধান্তে না আসতে পারা যুক্তির সমস্যা নয়। সঠিক যুক্তির অভাব সেখানে পরিলক্ষিত।

    কোন  একটি পক্ষ নিয়েই তারপর যুক্তি করতে হয়। একজন বিশ্বাসীর জন্য সেই পক্ষটা হল স্রষ্টার অস্তিত্ব সবার আগে স্বীকার করে নেয়া ও যেকোন অবস্থায় সেই পক্ষে থাকা। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যে যার যার মত করে যুক্তি দিবে, কিন্তু পক্ষটা ঠিক থাকলে ক্ক্ষচ্যূত হবে না।

    আর একটা ব্যাপার, চিন্তা করে কোথায় লাভ নেই সেটার খেত্র ও আল্লাহ্‌ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব নিয়ে কোন লজিকে পৌঁছানো যাবেনা। আর যেখানে পৌঁছানো যায় না সেখানে যুক্তির ও কোন দাম থাকতে পারেনা। যেখানে আছে সেখানে শুধুমাত্র বিশ্বাসকে অবলম্বন করে থাকাটা কিছুটা বোকামি ও মনে হয় আমার কাছে।

    ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়নে! 
     

    1. 5.1
      এম_আহমদ

      শামস ভাই, আপনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাটির জন্য ধন্যবাদ।

  6. 4
    রাতুল

    অনেক ধন্যবাদ এমন সুন্দর লেখা পোস্ট করার জন্যে। বুঝতে ও যথেষ্ট ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। আর কতটুকু বুঝতে পেরেছি তা ও প্রশ্ন সাপেক্ষ। 
    [1] মুল কথাই আসি। আপনার লেখনীতে আপনি বিশ্বাসকে যুক্তির অনেক পূর্বেই স্থান দিয়েছেন। এ ও বলেছেন যে যারা বিশ্বাস করেন না, তাদের সিদ্বা‌ন্ত যুক্তির অনেক আগেই হয়ে গেছে। তাহলে কি এ কথা আর বলা যায়না যে, মানুষকে আল্লাহ্‌র পথে ডাকার কোন লাভ নেই। কেননা যে যার বিশ্বাসে অটল থাকবে তাকে আর যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই। 

    [2] মনে করি [করুন], আমি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। আমার মন মজ্জা সব বলে যে ভগবানকে পেতে হলে তার বিভিন্ন রুপকে পূজা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস স্থির হয়ে আছে। আমার কোন এক মুসলিম বন্ধু আমাকে বুঝাতে সক্ষম হল যে, আমি যে ভাবে ভগবানের পূজা করি তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আমার বিভিন্ন যুক্তির বিপরীতে সে তার যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করলো যে সেই সঠিক তাহলে কি আমি আমার পূর্বতন বিশ্বাস থেকে ফেরত আস্তে পারবোনা। হোক সে যুক্তি স্থান কালের গণ্ডী ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। বা যাওয়ার দরকার ও নেই। আমি আমার বর্তমানকে দিয়ে যতটুকু বুঝার তততুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকলাম। তাহলে আমি যদি ধর্মান্তরিত হই তবে এ ক্ষেত্রে ও কি বলা যাবে যে আমার নতুন বিশ্বাসে যুক্তির কোন ভূমিকা নেই।

    আমাদেরকে ঈমানের দিকে আহবান করা হয়েছে, আসমান জমিনের দিকে তাকাতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, গোটা সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করতে আহবান করা হয়েছে যাতে করে আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করতে পারি এবং তাঁর অনুগত হতে পারি। কিন্তু সেখানে এই হুমকিও রয়েছে যে যদি আমরা ঈমান আনতে ব্যর্থ হই এবং তাঁর অবাধ্য হয়ে পড়ি, তবে আমাদেরকে দোযখের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে…………………………… এখানে আসমান আর জমিনের দিকে তাকানোর আহবান প্রচলিত অর্থের নিছক যুক্তির আহবান নয়, কেননা এই যুক্তি হচ্ছে সামাজিক ও ভাষিক, এটা ভাষার প্যাচে সৃষ্ট একটি দুর্বল উপকরণ। তাই আহবান হচ্ছে অন্তরাত্মা দিয়ে ধ্যান ও তপস্যামূলক আহবান …

    তার মানে আমি মনে করি যে আসমান যমিন দেখে আমাদেরকে ভাবতে হবে, গভীর চিন্তাই নিমজ্জিত হতে হবে। [3] কে, কেন, কোন উদ্দেশ্যে এসব সৃস্টি‌ করলেন। সেখান থেকে যুক্তি পূর্বক স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আর কোন একটা বিশ্বাসে পা দিতে হবে। ভুল যুক্তির ফলে সে যদি বিপথগামী হয় তাহলে তার দায় অবশ্যই সে লোকটির। সঠিক সিদ্ধান্তে না আসতে পারা যুক্তির সমস্যা নয়। সঠিক যুক্তির অভাব সেখানে পরিলক্ষিত। 

    আর একটা ব্যাপার, চিন্তা করে কোথায় লাভ নেই সেটার খেত্র ও আল্লাহ্‌ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব নিয়ে কোন লজিকে পৌঁছানো যাবেনা। আর যেখানে পৌঁছানো যায় না সেখানে যুক্তির ও কোন দাম থাকতে পারেনা। [4] যেখানে আছে সেখানে শুধুমাত্র বিশ্বাসকে অবলম্বন করে থাকাটা কিছুটা বোকামি ও মনে হয় আমার কাছে।

    1. 4.1
      এম_আহমদ

      প্রথমত আমার লেখাটি পড়া ও মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। সকালে এক সময় মন্তব্যটি প্রিন্ট করে সাথে নিয়ে একটি প্রতিমন্তব্য তৈরি করেছিলাম। এবারে দেখছি শামস ভাই ও আপনার মধ্যে আলাপচারিতায় অনেক কিছু সমাধান হয়েছে। তবে আমার মন্তব্য যখন লিখা হয়ে গেছে সুতরাং তা দেয়া যেতে পারে –এতে অন্য প্রেক্ষিত আসবে।   আমার মন্তব্যের দুটি অংশ থাকবে। প্রথমটি আপনার মন্তব্যের সাথে জড়িত আর দ্বিতীয়টি তেমন জড়িত নয়। দ্বিতীয়টি লিখেছি শুধু যুক্তির সমস্যাদি তুলে ধরার জন্য, তাই তা প্রশ্নের আকারেই আসবে।   প্রতিমন্তব্যের সুবিধার্থে আপনার মূল মন্তব্যটিকে (comment 4) নাম্বারিং করেছি এবং সেই ক্রমধারায় আমার কথাগুলো রাখতে যাব।  

      [1] … মানুষকে আল্লাহ্‌র পথে ডাকার কোন লাভ নেই। কেননা যে যার বিশ্বাসে অটল থাকবে তাকে আর যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই।  

      [1]  না, আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করতে এই ব্যাখ্যায় কোন বাধা দেয় না। আপনি লক্ষ্য করবেন যে আমি ওহীর কথা বৃষ্টির উপমায় এনেছি। কোরানেও তা এভাবে এসেছে। এখানে অর্থ হচ্ছে এই যে আমি সেই বারিধারাকে (ওহীকে) অন্য স্থানাদিতে ছড়িয়ে দেবার প্রয়াস পাচ্ছি। আমি এই পানি যেখানে যেখানে নেব, সেখানেই অসংখ্য বীজ অংকুরিত হয়ে যাবেনা। কেবল সেই বীজই অংকুরিত হবে, যে বীজকে অংকুরিত করার বা অস্তিত্বে আনার ইচ্ছে আল্লাহর আছে। এখানে আমি পানির সঞ্চালন করা ও এই সঞ্চালনের মাধ্যম হওয়া এবং অন্যরা এত্থেকে উপকৃত হওয়া অথবা না হওয়ার সব কিছুতে আল্লাহর তকদীর রয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়িত হচ্ছে।    একত্ববাদের বিশ্বাসে অর্থাৎ আল্লাহর একচ্ছত্র শক্তির দাওয়াতে নবীর প্রতিপক্ষরা সহজেই যুক্তি পেয়েছিল। তারা বলেছিলঃ   “আল্লাহ যদি চাইতেন,তবে আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করতাম না এবং আমাদের পিতৃপুরুষেরাও করত না এবং তাঁর নির্দেশ ছাড়া কোন বস্তুই আমরা হারাম করতাম না।” (১৬:৩৫)   কিন্তু এর উত্তর কি ছিল? পরবর্তী বাক্যে বলা হয়েছে, “তাদের পূর্ববর্তীরা এমনই করেছে। রাসূলের দায়িত্ব তো শুধুমাত্র সুস্পষ্ট বাণী পৌছিয়ে দেয়া।” (১৬:৩৫) অর্থাৎ এই বারিষকে ছড়িয়ে দেয়া। কেননা যুক্তি তর্কে বীজ গজাবে না, পানি ঢেলে যান, যা হবার তাই হবে। আল্লাহও সেই কথা বলছেন যে তিনি যাকে হেদায়াত দেননি সে হেদায়াত পাবে না। তবে জাগতিক যুক্তি এড়িয়ে গিয়ে দেখুন আল্লাহ কীভাবে পরকালীন একটি দৃশ্য সামনে এনেছেন  –যার আবেদন অন্যরূপ, বিচার দিনের অবস্থানগত বিবেচনাঃ     “মুশরিকরা যখন ঐ সব বস্তুকে দেখবে, যেসবকে তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছিল, তখন বলবেঃ হে আমাদের পালনকর্তা এরাই তারা যারা ছিল আমাদের শেরেকীর উপাদান,তোমাকে ছেড়ে আমরা যাদেরকে ডাকতাম। তখন ওরা তাদেরকে বলবেঃ তোমরা মিথ্যাবাদী। সেদিন তারা আল্লাহর সামনে আত্নসমর্পন করবে এবং তারা যে মিথ্যা অপবাদ দিত তা বিস্মৃত হবে।”(১৬:৮৬-৮৭)  

      [2] মনে করুন, আমি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী … এক মুসলিম বন্ধু আমাকে বুঝাতে সক্ষম হল … তার যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করলো … তাহলে আমি যদি ধর্মান্তরিত হই তবে এ ক্ষেত্রে ও কি বলা যাবে যে আমার নতুন বিশ্বাসে যুক্তির কোন ভূমিকা নেই।  

      [2] আমার দৃষ্টিতে (তবে মনে রাখবেন আমি ভুলের ঊর্ধ্বে নই) আপনি আগেও মুশরিক ছিলেন এবং ধর্মান্তরিত হবার পরও আংশিক মুশরিক। অর্থাৎ আপনি আগে এক আল্লাহর শক্তির বাহিরে অন্য শক্তিতে বা capacity-তে বিশ্বাস করতেন আর এখনও কিন্তু এক আল্লাহর শক্তি, capacity ও তাঁর ইচ্ছাতে বিশ্বাসী নন, আপনার ‘নিজ যৌক্তিক capacity’তেই আপনি মুসলমান হয়েছেন, আপনার নিজ শক্তিই এখানে কার্যকর। পক্ষান্তরে এও বলা যেতে পারে যে আপনি যৌক্তিক দুর্বলতার কারণে মুসলমান হয়েছেন এবং এতে আপনার প্রতিপক্ষের ‘যৌক্তিক-শক্তিই’  ধর্মান্তের মূল কারণ হয়েছে। যুক্তির ঘোড়াটি আমাদেরকে অনেক দিকে নিতে পারে। এও বলা যেতে পারে যে আপনি নিজ ধর্মের যৌক্তিকতা প্রথমেই বুঝেননি, তাই সেই জ্ঞানের অভাবই আপনাকে এখানে, অন্য ধর্মে, হাজির করেছে। কিন্তু তাওহীদ এখানে কারো কোন ক্ষমতা/দুর্বলতার প্রয়োগ করে না। এটা ছিল সেই মহান সত্তার করুণা, তাঁর প্রেমময়ী ইচ্ছা, তিনি  যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়াত দান করেন, তাই তাঁরই দিকে মুখ ফিরাতে হবে, তাঁরই প্রসংসায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।    এবারে যুক্তির বিষয়টি তার চতুর্থ স্থানে এনে বলি যে যুক্তি হচ্ছে একটা হাতিয়ার যা আমি আগে উল্লেখ করেছি এবং হাতিয়ারটি ব্যবহার করে একজন মুসলমান আপনাকে মুসলমান করেছে –এখানে যুক্তির স্বীকৃতি ততটুকুই যততুকু একটি হাতিয়ারকে দেয়া যেতে পারে। আমার মূল ব্লগ এবং ৩ং মন্তব্যে দেখতে পাবেন যে যুক্তিকে অস্বীকার করছি না বরং একটি হাতিয়ার বা ব্যবহারিক বস্তু হিসেবে উল্লেখ করছি। শুধু এতটুকু বলছি যে যৌক্তিক জ্ঞান আর ওহীলব্ধ জ্ঞান এক নয় –দ্বিতীয়টি প্রথমটির অনুকুল করা যাবে না, যুক্তি আগে নয়, ওহী আগে, ওহী নির্ভুল, যুক্তিতে ভুলের স্থান থাকতে পারে ।  

      [3] … আসমান যমিন দেখে আমাদেরকে ভাবতে হবে … কে, কেন, কোন উদ্দেশ্যে এসব সৃস্টি‌ করলেন …  যুক্তি পূর্বক স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে … সঠিক সিদ্ধান্তে না আসতে পারা যুক্তির সমস্যা নয়। সঠিক যুক্তির অভাব সেখানে পরিলক্ষিত।  

      [3] শাস্ত্রীয় যুক্তির ভিত্তিতে বিশ্বাসে উপনীত হওয়ার তেমন কোন নিশ্চয়তা নেই – কেউ এলে বা না এলে তা হবে arbitrary -এটাই ছিল আমার মূল উপপাদ্য। এটা যদি আপনি গ্রহণ করতে না পারেন, তবে আমার সাধ্য এখানেই শেষ। [তবে শামস ভাইয়ের আলোচনায় মনে হয় তার নিরসন হয়েছে। যুক্তির সমস্যা মূল ব্লগে কিছুটা আছে আর এখানে নিচে যে দ্বিতীয় অংশ প্রিন্ট করছি, সেটা পড়ে দেখতে পারেন যুক্তির সমস্যাটা কী।]  

       [4] যেখানে [যুক্তির স্থান] আছে সেখানে শুধুমাত্র বিশ্বাসকে অবলম্বন করে থাকাটা কিছুটা বোকামিও মনে হয় আমার কাছে।  

      [4] পঞ্চেন্দ্রিয়ের জগতে যেখানে যৌক্তির স্থান আছে সেখানে যুক্তি ব্যবহার না করার পক্ষে আমিও নই।      ________________________ দ্বিতীয় আলোচনাঃ যৌক্তিক সমস্যা ________________________   যৌক্তিক আলোচনায় প্রথমেই যে বস্তু আসে তা হল epistemology –আমারা যা কিছু জানি তা কীভাবে জানি, এই অনুসন্ধিৎসা ও জিজ্ঞাসা। আমি কীভাবে জানি ‘সত্য’ কি বা ‘বাস্তবতা’ কি? এর আগে, আমিই বা কে, কেননা এই ‘আমি’ই হচ্ছে সেই সত্তা যে ‘জানে’ বা জানার দাবি করে। ব্যক্তি যদি ভাষা ও সামজিক construct হয় তাহলে relatively নাস্তিক-পুত্র নাস্তিকী যুক্তি দেবে এবং আস্তিক-পুত্র আস্তিকী, সেখানে 'আমি' সত্তা কে? আমিত্ব কিভাবে নিশ্চিত (ascertain) করা হবে? তারপর আমি যা জানি বলে জ্ঞাত এবং যার যুক্তি তুলতে যাচ্ছি তা কি আমি ‘ভাষার মাধ্যমে’ জেনেছি, (জ্ঞাত হয়েছি), না ভাষার বাহন অতিক্রম করে, অন্য কোনোভাবে জেনেছি? আমার বাহন সম্পর্কে ধারণা কি? বাহনটি (medium) কি নির্ভেজালভাবে অর্থাৎ অবিকলভাবে মূল বাস্তবতা/সত্যকে আমার জ্ঞানের আওতায় এনে দিয়েছে? এটা কি ছিল বিশ্ব জগতের দিকে তাকিয়ে পাওয়া অর্থাৎ observation  and contemplation, না ভাষার মধ্যমে অর্জিত জ্ঞান/সত্য/বাস্তবতা? আমি কি একথা চিন্তা করেছি যে আমার "মাধ্যমে" কোন সমস্যা (বা কমতি/দূর্বলতা) থাকতে পারে?   উদাহরণ স্বরূপ আয়নার কথা ভাবতে পারি। আয়না যদি বক্র হয়, তবে জগত (ও যুক্তি) সেই আকৃতিতেই দেখা যাবে, যদি তাতে রঙের মিশ্রণ থাকে, তবে সেই মিশ্রণও প্রতিফলিত হবে, এবং আমার জ্ঞানও নির্ভেজাল বলা যাবে না। যে সত্য আপনি আপনার যুক্তির মাধ্যমে বুঝেছেন বলে দাবি করছেন, সেই বুঝ বা সমুঝ কীভাবে এল এবং কীভাবে আপনি নিশ্চিত হলেন যে তা সঠিক ও বাস্তব। আপনি এখন আমাকে যুক্তির মাধ্যমে যা বুঝাতে চাচ্ছেন তাতে ‘ভাষার’ ব্যবহার আসছে, তুলনার কথাবার্তা (comparison) আসছে, উদাহরণ (example) আসছে, metaphor ও রূপকতার ব্যবহার আসছে, কিন্তু মূল বস্তুতে কি এগুলোর সমন্বয় রয়েছে, না এই অসাদৃশ্য বস্তুর জোড়াতালি দিয়ে আমাকে অন্য বস্তুর বাস্তবতা/সত্য বুঝাচ্ছেন যার প্রকৃতি আপনার ব্যাখ্যাস্থিত tool (হাতিরয়ার অর্থাৎ ভাষা ও তৎসংশ্লিষ্ট রূপকতা) থেকে ভিন্ন? তারপর এই মাধ্যম (আয়নার কথা মনে রাখবেন) ব্যবহার করে আমার কাছে, যুক্তিতে, যে ‘অর্থ’ প্রকাশ করতে চাচ্ছেন, আমার কাছে  কি ঠিক ‘সেই অর্থ’ প্রতিভাত হচ্ছে্, ‌ না হচ্ছে না –তা কিভাবে নিশ্চিত করবেন? আপনার শব্দাবলি ও উদাহরণ থেকে আমি কি ‘অন্য অর্থ’ তৈরি করতে পারি না? যদি পারি, তাহলে আপনি আমার মনের জগতে আপনার ‘অর্থ’ পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর কারণ কি আপনি জ্ঞানী আর আমি অজ্ঞ? যদি সেটা না হয়, তাহলে কারণটা (সমস্যাটা) কোথায়? বাহনে (অর্থাৎ) ভাষায়)? না বস্তুতে (অর্থাৎ যে বস্তু নিয়ে আলোচনা করছেন, তাতে? অর্থাৎ বস্তুটি আপনাতেই অনেকটা জটিল, অবোধগম্য -এজন্য)?   এখানে যে প্রশ্নমালার অবতারণা করছি তা যদি অনুধাবন করেন (আর না করলে চিন্তা নেই, এতে আমি বিজ্ঞ আর আপনি এর বিপরীত কিছু হয়ে যাননি), তাহলে একথা হৃদয়ঙ্গম হতে পারে যে যুক্তি নামক হাতিয়ারটি ব্যবহার করা গেলেও তার প্রকৃতিগত জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠা সম্ভব নয়। কেননা যুক্তির অবতারণা করতে গেলেই ভাষার ব্যবহার আসে, ভাষা হয়ে পড়ে মাধ্যম। ভাষা ও যুক্তিতে যদি সমস্যা থেকে থাকে এবং এই সমস্যাবহুল পদ্ধতি ও ব্যাখ্যায় অতিন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়ে কোন কিছুকে সত্য বলে মনে করে থাকি, তবে তা সত্য নাও হতে পারে, সেই সম্ভাবনা প্রকটই থাকে। এই বিশ্ব জগতের পিছনে ‘এক খোদা’ থাকবেন কেন? বহু খোদা থাকতে অসুবিধা কোথায়? খোদা নামক সত্তারা যদি মানুষ না হন এবং তারা যদি মানবিক রিপু দ্বারা তাড়িত না হন, তবে সমস্যা হবে কেন? কোনো বস্তু ‘এক’ (singularity) হওয়াতেও সমস্যা থাকতে পারে এবং ‘একাধিকে’ (in plurality) হয়ত সমাধানও থাকতে পারে। আবার উল্টোতাও হতে পারে। আপনার খোদা ‘এক’ তাই আপনার কাছে ‘যুক্তি’ আছে, আর আমার দেব-দেবী ‘অনেক’ –তাই কি আমি যুক্তিশুন্য? বিষয়টা যদি এতই সাদা-মাটা হত, তাহলে এইবিশ্বে এত ধর্মের বিকাশ ঘটত না।   এত কথা বলছি যুক্তির সমস্যা নিয়ে, ভাষা নিয়ে, ‘অর্থ’ নিয়ে –এগুলো আপনার কাছে ‘অর্থবহ’ নাও হতে পারে, কেননা এগুলো দর্শন ও ভাষাতত্ত্ব, বিশেষ করে আধুনিকতাবাদ (modernism) এবং আধুনিকতাত্তোরবাদ (postmodernism) দর্শন থেকে উৎসারিত হচ্ছে।   আগেই উল্লেখ করেছি, যুক্তি হচ্ছে একটা হাতিয়ার (tool) –এর মাধ্যমে এক ধরণের শব্দমালার সাথে পরিচিত হবেন। এই শব্দমালা যদি এমন হয় যে তার বিপক্ষে আরেক ধরণের পালটা  শব্দমালা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন, তবে আপনার ব্যর্থতা প্রতিপক্ষের ‘সত্য’ প্রতিষ্ঠা করে না, বরং আপনাকে পরাস্ত করে মাত্র। আপনি বছরখানেক অন্যত্র পড়াশুনা করে এসে সেই শব্দমালার মোকাবেলা করতে পারবেন –তখন আগের যুক্তির কি হবে? আগের সত্য কি এখন মিথ্যায় প্রতিপন্ন হবে না? [আমি এখানে যে শব্দমালা ব্যবহার করছি, postmodernist দার্শনিক Richard Rorty এটাকে final vocabulary বলে উল্লেখ করেন। Rorty একজন অজ্ঞেয়বাদী দার্শনিক বলে মনে হয়।]   মূল কথা ওহীই হচ্ছে আমাদের বিশ্বাসের মূল স্থান, এটাকে যুক্তির অধীন করলে অর্থ দাঁড়াবে এই যে যা কিছু যুক্তিতে ধরবে, তাই গ্রহণ করা হবে এবং যা কিছু ধরবেনা তাই হবে বর্জিত। আমেরিকার টমাস জেফারসন এবং তার সমসাময়িক অনেকে এবং ইউরোপের অনেক খৃষ্টিয়ান যুক্তিবাদে আস্থা স্থাপন করে প্রথমে মিরাকল অস্বীকার করেন, তারপর আস্তে আস্তে ধর্মীয় সবকিছু। শেষ পর্যন্ত তারা হয়ে পড়েন deists.  .

      1. 4.1.1
        রাতুল

        অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনার সুন্দর প্রতিউত্তরের জন্যে। ভালো থাকবেন এবং সুন্দর সুন্দর লেখা নিয়ে হাযির হবেন এটাই চাওয়া। 

        1. 4.1.1.1
          এম_আহমদ

          ধন্যবাদ

  7. 3
    এম_আহমদ

    সংলাপে এই লেখাটি পোস্টিং করলে মহিউদ্দিন ভাই একটি মন্তব্য করেন এবং একটি প্রশ্নও রাখেন, যা এখানেও  relevant বলে জবাবটি এখানেও আনছি। 
     

    এ প্রসঙ্গে কথা হল ধর্মনিপেক্ষবাদীরা প্রায়ই বলে থাকেন “ধর্ম হচ্ছে একটি অন্ধ বিশ্বাস এখানে যুক্তির কোন অবকাশ নাই”। এখন প্রশ্ন হল ইসলাম কি সত্যিই অন্ধ বিশ্বাসের এক ধর্ম এখানে যুক্তির কি কোন প্রয়োজন নাই ?

     
    অন্ধ বিশ্বাস

    ভাই, আমাদের হাতে যে বিতর্ক তার ইতিহাস অনেক পুরনো। এনলাইটনম্যান্টের উপর যে ব্লগটি আমি জানালায় ছেপেছিলাম, সেটি মনে থাকলে স্মরণ করুন। ‘অন্ধ’-ধারার কথাবার্তা আসছে ‘যুক্তিবাদ’ও ‘বিজ্ঞানবাদের’ আন্দোলন থেকে অর্থাৎ এনলাইটম্যান্টের আধুনিকতাবাদের (মডার্নিজমের) অত্যুৎসাহী অভিলাষ থেকে। এই আন্দোলনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ১৭৮৯ ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে, বাদশাহ ষোড়শ লুইসের শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে এবং সমাপ্তি ঘটেছে ১৯৮৯ কমিউনিস্ট বাস্তবতার প্রতীকী পতনে, বার্লিন ওয়াল ধূলিস্যাতের মাধ্যমে, যদিও এর জের এখনও চলছে এবং আরো অনেক কাল পর্যন্ত চলার কথা, এটাই  মানব দর্শন ও চিন্তার স্বাভাবিক নিয়ম।

        লক্ষ্য করুন, এখানে  বিশ্বাসের সাথে “অন্ধ” বিশেষণটি মিছামিছি জোড়ে দেয়া হয়েছে। আপনি যে বিষয় সম্পর্কে জানেন না, যা আপনার যুক্তিতে ধরে না, তা “অন্ধ” বিশেষণে বিশেষায়িত হবে কেন? “খোদা নাই” –এটাও যুক্তিতে প্রমাণিত নয়, তাহলে নাস্তিক্যবাদও “অন্ধ”। প্রকারান্তরে অজ্ঞেয়বাদও “অন্ধ” হতে পারে, কেননা খোদা-প্রসঙ্গে এই অবস্থান “অজ্ঞতা” প্রকাশ করে এই অর্থে যে সে হ্যাঁ/না কিছুই জানেনা, তাই তার স্থান “অন্ধকার”না হলে নীরব থাকবে কেন?

        এই জগতের যা কিছু আপনার সামাজিক ও ভাষিক যুক্তি ধারণ করবে না, তার সবকিছুই কী “অন্ধ”? এই “অন্ধ” শব্দটি জোড়ে দেয়াই হচ্ছে একটা “চালাকি”। যারে দেখতে নারি, তার চরণ বাঁকা। আপনার চরণের দিকে একটু তাকিয়ে দেখুন, আপনারটা সোজা না বাঁকা। [আপনাকে mean করছি না, বরং প্রেক্ষিতগত প্রবক্তাকে]। এখানে অন্ধ বিশ্বাস বলে যে ভাষিক চালাকি করা হল, এবং তা করতে গিয়ে ভাষাকে যেভাবে ব্যবহার করা হল, তা এখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কারণ এখানে অতি ক্ষুদ্রাকারে, বাক্যাংশে (phrase) ‘অপব্যবহারটি’ ধরা পড়ছে। ভাষার মার-প্যাচের বিষয়টি যখন পুস্তকাকারে বৃহৎ হয়, তখন সর্বসাধারণের পক্ষে তার মোকাবেলা করতে হিমসিম খেতে হয়। আপনি বিশ্বাসের সাথে “অন্ধ” বিশেষণ ঢালবেন কেন, “ঔজ্জ্বল্য” ঢালবেন না কেন? বিশ্বাসে অন্তরাত্মা ঔজ্জ্বল্য লাভ করে, মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বে তার মনের সায় অনুভব করে। যারা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে “অন্ধ” বিশেষণ “নির্বাচন” করে, তাদের এই নির্বাচনই তাদের নিজ গোঁড়ামি অবস্থানের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।
       
        পক্ষান্তরে প্রপোজিশন যদি এই হয় যে যা-কিছু প্রমাণ করা যায় না, তাই হবে “অন্ধ”, তাহলে বিজ্ঞানবাদ ও যুক্তিবাদের অনেক কিছুও অন্ধ। বিবর্তনবাদও অন্ধ, কেননা তা indisputable-ভাবে প্রমাণিত নয়।

        এখানে একটি ক্ষুদ্র phrase  (‘অন্ধ বিশ্বাস’) -এর ভাষিক ব্যবহার কীভাবে বুঝের অবস্থানকে এক জাগা থেকে জাগায় নিয়ে যাচ্ছে -তার প্রতি লক্ষ্য রাখুন। এখানে ‘অন্ধ’বিশেষণের বাইরে গিয়ে metaphor  হয়ে কাজ করছে, রূপকতার অবতারণা করে ‘যুক্তিকে’ স্থানচ্যুত করছে, metaphor breaks  logic। এসব ধারণা অনেক জটিল, এগুলো সামান্যতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে দর্শনে যখন এই সত্য ব্যাপকভাবে উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ে,(that it’s a play of metaphors), তখন আধুনিকতাবাদের দর্শন প্রাণ হারায়, এনলাইটনম্যান্ট (বিজ্ঞানবাদ/যুক্তিবাদ) নিস্তেজ হয়ে পড়ে, মার্ক্সবাদও (যা ছিল সেই এনলাইটনম্যান্ট প্রজেক্টের অংশ) হোঁচট খেয়ে উলটে পড়ে, এখানে যা দেখা যায় তার সবই ভাষার খেলা। (দেখি, সময় করতে পারলে আমাকে এর উপর আরো লিখতে হবে।)

        শেষ কথা। আমরা ওহীতে প্রাপ্ত বাণীতে বিশ্বাস ও অন্তরাত্মার স্বীকৃতির পর, যুক্তিকে হাতিয়ার (tool) হিসেবে পাচ্ছি, হাতিয়ারকে অস্বীকার করছি না, এর ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি, এবং তার আপন স্থানে প্রয়োগও করি, যেমন একখানা ছুরিকাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি। ভাষার প্যাচের সামাজিক যুক্তিকে আমরা ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে (infallible) ভাবি না, এটাকে দেবতা করে নেই না,  কোরান হাদিসকে এই দুর্বল ভিত্তির স্থাপন করি না। আমাদের আলেম/ওলামারা মু’তাজিলা আন্দোলন থেকেই এর দূর্বলতা ঠের পেয়ে গেছেন, তাই তাত্থেকে সরে গিয়ে আমরা বেঁচে গেছি এবং অনুবাদের মাধ্যমে মধ্যযুগে যখন মুসলিম জ্ঞান বিজ্ঞান বিস্তার লাভ করে তখন তারা মু’তাজিলি হাতে গ্রীকদের দর্শনের ব্যাপক উন্নয়ন ও পরিবর্ধনকেও  বুভুক্ষ প্রাণীর মত গিলে ফেলে আর এতে যে বিষ-বীজ সুপ্ত ছিল তা সপ্তম শতাব্দীতে মহীরূপে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে, কারণ এখানকার গীর্জিয় নির্যাতন, রাজকীয় নির্যাতনের রাজনীতি, সামাজিক বাস্তবতার মৃত্তিকা সেই বীজের অংকুরণের অনুকুল ছিল। যদিও আমরা যুক্তিকে কোরান হাদিসের অগ্রমাগী করি না,  তবে অনুগামী করতে বাধা দেখিনা, ব্যাখ্যার tool হিসেবে এর যথার্থ ব্যবহার করি, এটাই হচ্ছে যুক্তির আসল স্থান।    

  8. 2
    শামস

    পড়লাম, ভালো লাগল।
     

    1. 2.1
      এম_আহমদ

      ধন্যবাদ।

  9. 1
    এন্টাইভণ্ড

    চমৎকার! আপনার এইরকম লৈখার জন্য কত যে হা করে তাকিয়ে থাকি সদালাপে।
    কেমন আছেন?

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      ভাল আছি ভাই। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.