«

»

May ২৫

ইসলামী শারিয়া -শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

এই লেখাটির সাথে সম্পর্কিত আমার আরও কিছু লেখা রয়েছে, বিশেষ করে নিচের কয়টি। সবগুলো মিলিয়ে একটি সার্বিক ধারণার রূপ পাওয়া যেতে পারে। এই ধারায় আরও কয়টি লেখা নিয়ে আসার চিন্তাও করছি।

বৈধ (রাজ)নীতি: সিয়াসাহ শারয়্যিয়াহ
ইসলামের রাজনীতি: শাব্দিক উৎস ও ধারণা
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও প্রতিবন্ধক যুক্তি
কাল-সাগরের ঢেউ (মন্তব্যসহ পড়বেন)

ভূমিকা

ইসলামের জীবন বিধানে শারিয়া (شريعة) শব্দটি অতি পরিচিত। এখানে রয়েছে আমাদের জীবন জিজ্ঞাসার প্রাচুর্যপূর্ণ উত্তর। এই স্থানটি আমাদের জীবনের সকল অঙ্গকে আবেষ্টন করে। এই বেষ্টনী-ঘেরা স্থানের সমঝকে আমরা ফিকহ হিসেবে উপলব্ধি করি। শারিয়ায় রয়েছে আমাদের ব্যক্তিক, পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধান। সমাজের নীতি-নৈতিকতা, অধিকার,  ন্যায় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় শারিয়ার অবস্থান এক অপরিসীম গুরুত্বের। এই পরিসরে ব্যক্তিক ও সমাজিক পরিশুদ্ধির (তাজকিয়া) অঙ্গন অবমুক্ত হয়। অধিকন্তু জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে মেনে চলার বিন্যাসিত নিয়ম-কানুন সুষ্ঠুভাবে এখানে পাওয়া যায়। আবার যেখানে কোরান ও সুন্নাহর আইন অনুপস্থিত অথবা অস্পষ্ট সেখানে ফিকহের উসূল পদ্ধতি প্রয়োগে জীবন জিজ্ঞাসার উত্তরসমূহ সৃষ্টিশৈলী ও যৌক্তিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কোরান ও সুন্নাহর সাথে সমন্বিত করা হয় এবং এতে মূল বিধানের নিকটবর্তী সমঝে উপনীত হওয়া হয়। এখানের পরিসর প্রশস্ত, জীবনের অঙ্গন সুস্থ।

এই শারিয়া ব্যবস্থার বাস্তব রূপ শত শত বৎসর ধরে মুসলিম সমাজে অনুপস্থিত থাকায় এবং খোদাহীন-রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপস্থতিতির কারণে এবং ইসলামী ব্যবস্থার বিপক্ষে প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারের ফলে গণমনে নানান বিভ্রান্তির জন্ম নিয়েছে। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে ইসলাম বহির্ভূত শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে ও সেই সংস্কৃতিতে আত্মীভূত হয়ে মুসলিম সমাজের এক বিরাট অংশ ইসলামী শাসন ব্যবস্থার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বিদেশি আদর্শে উদ্বুদ্ধ ও চেতনাপ্রাপ্ত।

ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম উপাদান হল সুকর্মের আদেশ ও অপকর্মের নিষেধ (আল-আমর বিল মারুফ ওয়ান্নাহয়ু আনিল মনকার  الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر)। এই উপাদান ইসলামকে অন্যান্য ধর্ম থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে। আজ সমাজ-জীবন থেকে তা নিশ্চিহ্ন। এই কাজের জন্য মুসলমানদেরকে বিশ্ব-মানবতার জন্য বের করে আনা হয়েছিল (উখরিজাত লিন্নাস)। এই কঠিন কাজের সংশ্লিষ্টতায় তাদেরকে বিশ্বমানবের সাগর কূলে শ্রেষ্ঠ মানবগোষ্ঠী (খাইরু উম্মাহ, ৩:১১০) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তারা এই কাজ করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করবে। আজ সেই বাস্তবতা নেই। মুখে আল্লাহতে বিশ্বাস আছে বটে তবে বৃহত্তর পরিসর হচ্ছে অনেকটা দ্বীনে এলাহির মত। এককালে বাদশাহ আকবরের দ্বীনে এলাহির পক্ষে অনেক সমর্থক ছিল। তারা কোরান/হাদিস থেকে তাদের ‘কল্যাণকর’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ পক্ষে ধর্মীয় যুক্তি দেখাত। আজও সেভাবে গোজামিলের মুসলমানগণ কোরান ও হাদিস থেকে তাদের অসাম্প্রদায়িক মানব ধর্মের যুক্তি দিয়ে শারিয়াকে সমাজ থেকে সরিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাদ’ প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত।

শারিয়ার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়রূপ তিরোহিত হওয়ায় শারিয়া নিজ ঘরেই আগন্তুক, অর্বাচীন। শারিয়া অনেকের কাছে এতই অপরিচিত যে কেউ কেউ বলতে শুরু করছেন, আমরা তো কেবল কোরান হাদিসই মানতেই আদিষ্ট, শারিয়া আবার কী? তাদের ধারণায় এটা যেন কোরান হাদিসের বাইরের বস্তু। আজকে নবিশের জ্ঞান ও তার দৃঢ়তা রূঢ়তায় পর্যবসিত হচ্ছে।

শারিয়া নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। কেউ কেউ ভাবেন সমাজে শারিয়া প্রবর্তিত হলে বৎসর পূর্তিতে দেশের রাস্তা-ঘাটে দেখা যাবে হাত-কাটা লোকের অগণিত বিচরণ। কোথাও দেখা যাবে লোকজন জড়িত হয়ে কাউকে সঙ্গেছার করছে। আর এখানে-সেখানে লম্বা কোর্তা, দীর্ঘ দাড়ি ও সবুজ পাগড়ী পরিহিত ‘মোল্লাগণ’ নগ্ন তলওয়ার হাতে হন হন করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন; আর মাসের পর মাস ব্যাপী  শহরে বন্দরে ঘুরলেও কোনো নারীর চেহারা-চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হবে না। অধিকন্তু কেউ অপরাধ করলেই তাকে ধরে আনা হবে এবং কোরানের অমুক সূরা থেকে অত নম্বর আয়াত প্রযোজ্য বলেই শুরু হবে শাস্তি: কিল আর ঘুষি! ইদানীং এক মূর্খের লেখা একটি বাংলা নাটক এভাবে প্রকাশ পেয়েছে। মূলত, কোনো বিচার ব্যবস্থা, কোনো সামাজিক ও আধ্যাত্মিক রূপরেখা সম্বলিত আইন যে এভাবে হতে পারে না,  কোনো সমাজ সভ্যতা যে এভাবে গড়ে উঠে না, এই ধারণা তাদের নেই।

ইসলামী শারিয়া হচ্ছে কোরান-সুন্নাহ বুঝার ও অনুসরণ করার এক প্রজ্ঞাপ্রসূত ঐতিহ্যবাহী পরিসর। এখানে আছে যুক্তির ব্যবহার, বিবেচনার স্থান, আইন প্রয়োগের পদ্ধতিগত রীতিনীতি ও আচরণ। আমার প্রবন্ধে এই বিষয়ে প্রাথমিক কিছু কথা উপস্থাপন করতে চেষ্টা করব। এতে দেখা যাবে কোরান ও সুন্নাহর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যেসব নীতি-পদ্ধতি গৃহীত হয় তাতে কোরান ও সুন্নাহকে সঠিকভাবে বোঝা ও অবলম্বনের ইচ্ছা ব্যতীত আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াবি হাসিলই হয় আসল লক্ষ্য।  শারিয়া ইসলাম বহির্ভূত কিছু নয়।  শারিয়া বা ইসলামী আইন জীবনের সকল অঙ্গনকে সুনিয়ন্ত্রিত এবং সুসজ্জিতও করে।

জীবন ও আইনের বিষয়াবলী সার্বিকভাবে বুঝাতে শারিয়াবিদগণ নানান বিভাগে তাকে বিভাজন করেন। ‘ইসলামী আইন দার্শনিকদের মতে, আইন পাঁচভাগে বিভক্ত: ১। ইতিকাদ (বিশ্বাস), ২। আদব (ন্যায়নীতি), ৩। ইবাদাত (উপাসনা), ৪। মুয়ামালাত (কাজ-কারবার), ৫। উকুবাত (শাস্তি)’ (গাজী শামছুর রহমান, ১৯৮১: ভূমিকা)। অর্থাৎ এই পাঁচ ভাগে প্রধান সকল দিককে কভার করা যায়। তবে অন্যরা আরও বিভাগে বর্ধিত করেন। তাছাড়া প্রশাসনিক নিয়মনীতির বিধানও এর অন্তর্ভুক্ত হয়। এখন আমরা শারিয়ার শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ দেখব।

শারিয়া শব্দের ক্রিয়াবাচক অর্থ

প্রথমত, বাংলায় শারিয়া শব্দের বানানটি দেখে নেই। তারপর অর্থ বিবেচনা করব। এই শব্দটি স্বাধারণত তিনভাবে দেখে থাকি: 'শরিয়ত', ‘শরিয়া’, ‘শারিয়া’ ও ‘শারিয়াহ’। প্রতিবর্ণনের (transliteration) দিক থেকে এটি শারীআহ (شريعة/sharī‘ah) লেখা অধিক সংগত মনে হয়। তবে এই প্রবন্ধে আমি প্রচলিতভাবে ‘শারিয়া’ লিখে যাব। কেননা হঠাৎ করে নতুন কিছু শুরু করা ঠিক হবে বলে মনে হয় না। 

শারিয়া শব্দ ক্রিয়াবাচক শারা (شرع) শব্দ থেকে নির্গত। শারাআর শব্দের অনেক অর্থ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হল ‘শুরু (شروع) করা’। আমরা বাংলায় শব্দটিকে গ্রহণ করেছি। তবে আমাদের এই প্রসঙ্গে ‘শুরুর’ তাৎপর্য অনুসন্ধান করছি না যদিও একটু ব্যাখ্যায় গেলে এই তাৎপর্যেও শারিয়ার অর্থ দেখা যেতে পারে। আল্লাহই মানুষের জন্য তার নৈতিক জীবনের পথ নির্দেশ করেছেন, শুরু করে দিয়েছেন। এই শুরু তাঁরই নির্দেশ। নৈতিকতার বিষয়টি আমরা কেবল প্রাণী জগতে মানুষের মধ্যে স্পষ্টত লক্ষ্য করি। পানি থেকে আল্লাহ যেমন প্রাণবন্ত সবকিছু সৃষ্টি করেছেন (২১:৩০) তেমনি যেন তাঁর নির্দেশ থেকে নৈতিক জীবনের পরিমণ্ডল রূপায়িত হয়েছে। তাঁর নির্দেশকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় আমাদের ভাল-মন্দ বিবেচনার নৈতিক জীন্দেগী। এই নির্দেশই নৈতিকতার আসল বস্তু। হত্যা কেন হারাম হবে অথবা শুয়ের গোশত কেন খাওয়া যাবে না, অথবা যিনা-ব্যভিচার কেন মন্দ হবে? উত্তর হবে আল্লাহ তা নিষেধ করেছেন  -এটা তাঁরই নির্দেশ। আল্লাহ বলেন, ‘সতর্ক হও, সৃষ্টি তাঁরই এবং নির্দেশও তাঁর। তিনি মহামহিমাময় আল্লাহ্ -বিশ্বজগতের প্রভু’ (৭:৫৪)!  আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো নৈতিক জীবনের ধারণা যৌক্তিক নয়। আমি এই যৌক্তিকতা অন্য কোনো প্রবন্ধে আলোচনা করব।  আর এদিক দিক থেকে তার নির্দেশে সমন্বিত কর্ম সাধনের নামবাচক (noun) শব্দ হয় শারিয়া। শুরু-কেন্দ্রিক এই তাৎপর্য এক পাশে রেখে আমরা অপর অর্থ অনুসন্ধান করতে যাব। 

শারা (شرع) শব্দের অপর অর্থ হয় জলাশয়ে যাওয়া, জলাশয়ে নামা, জলাশয় থেকে পানি পান করা ইত্যাদি। যেমন বলা হয় শারাআত আদ-দাওয়াব  (شرعت الدواب الماء) পশুগুলো জলাশয়ে নেমেছে (বা জলাশয় থেকে পানি খেয়েছে) [লিসানুল আরব/আরবি লেক্সিকন]। শারাআতু ফী আল-মা ( شرعت في الماء) আমি (জলাশয় থেকে) পানি খেয়েছি, বা আমি জলাশয়ে নেমেছি (পানিতে ঢুকেছি) [উইলিয়াম লেন/আরবি লেক্সিকন]। এটিই প্রাচীন অর্থ।

জলাশয় হচ্ছে সেই স্থান যেখানে পানির সংকীর্ণতার অবসান হয়েছে, পানির পরিমাণ বৃহৎ হয়েছে। (এটা সংকীর্ণ অর্থের জলাশয় নয় যা বৃষ্টিতে জমে এবং পরে শেষ হয়)। আবার রূপকতায় কোনো একটি ধারণা বা চিন্তাকে বর্ধিত বা প্রশস্ত করা অর্থেও শারা শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। পথ প্রবর্তন বা পথে আসার সুযোগ করা অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন শারাআ আল-বাবা ইলাথ থারীক্ব (شرع الباب إلي الطريق) সে রাস্তায় আসায় জন্য একটি দরজা খোলে দিয়েছে (লিসান/মুখতারুস সিহাহ)। কেউ কোনো আলোচ্য বিষয়ে প্রবেশ করা অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন শারাআ যাইদ ফী আল-আমর (شرع زيد في الأمر যাইদ এই বিষয়ে নেমেছে, (অর্থাৎ যাইদ আলোচনায় নেমেছে বা কোনো বিশেষ কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। এটি প্রথমে যে ধারণা দিয়েছি তার সমার্থক)। কোনো একটি ধারা প্রতিষ্ঠা, প্রবর্তন বা নির্দেশ/জারি করা অর্থেও হতে পারে। যেমন শারাআ লাহুম ফুলান (شرع لهم فلان) অমুক ব্যক্তি একটি (আইনি/ধর্মীয়) নির্দেশ করেছেন, বা পথ নির্ধারণ করেছেন। এভাবে, কোনো বিষয়কে স্পষ্ট করা, ব্যাখ্যায় বর্ধিত করা, দ্ব্যর্থতা দূর করা, জটিলতা পরিষ্কার করাও হতে পারে। নির্ধারণ ও নির্দেশের অর্থ আমরা কোরান থেকে নিতে পারি। যেমন: شَرَعَ لَكُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحاً وَٱلَّذِيۤ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ أَنْ أَقِيمُواْ ٱلدِّينَ وَلاَ تَتَفَرَّقُواْ فِيهِ ‘তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সেই পথই নির্ধারিত  করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি (এখন)প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না’ (৪২:১৩)। এভাবে কুফুরি দ্বীন-ধর্মের ব্যাপারেও শব্দটির ব্যবহারটি এসেছে, সেই ধর্ম হোক পৌত্তলিকতা, নাস্তিকতা অথবা সংকর ধর্ম (সেক্যুলারিজম), যেগুলো মানুষ নিজেরাই নিজেদের জন্য নির্ধারিত করে নিয়েছে যার পক্ষে আল্লাহর কোনো বাণী আসেনি। আল্লাহ বলেন, لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنْ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ তাদের কি এমন কিছু শরীক দেবতা রয়েছে, যারা তাদের জন্যে ধর্ম নির্ধারিত করেছে, যার অনুমতি (বা যে নির্ধারণের অনুমতি) আল্লাহ দেননি’ (৪২:২১)?

নামবাচক (nominal) অর্থ

উল্লেখ হয়েছে, শারিয়া অর্থ জলাশয়, পানির স্থান। তবে এর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে আইন-এটিই সকলের কাছে পরিচিত। মরুর কোনো জলাশয়ে উপস্থিত হওয়া জীবন লাভের মত। শব্দটির গভীর তাৎপর্য আমরা মরুভূর রূঢ় পরিবেশে পাই। ইসলামের অনেক মৌলিক শব্দ মরুর জীবন ব্যবস্থায় উৎসারিত। একটি প্রাণী যখন পানির অন্বেষায় চতুর্দিকে ঘোরে,তার সন্ধানী মন বিভিন্ন বিকল্প পথ বা ধারা অবলম্বনের চিন্তা করে, অস্থিরতা অনুভব করে, তারপর যখন সে জলাশয়ে উপনীত হয় তখন যেন তার সমস্যার সমাধান হয়েছে,অস্থিরতার অবসান হয়েছে।  
শারিয়া হচ্ছে জীবন সমস্যার সমাধান-কল্পে, নৈতিক জীবন যাপন করতে, নানান ধারণা, নানান পথ, নানান সমস্যার মোকাবেলায় একটি নিশ্চিত ও নির্ধারিত পথ। এখানে জীবন জিজ্ঞাসার যাবতীয় সমাধান রয়েছে। এই স্থানটি যেন জীবন সঞ্জীবনী,  জীবন নির্ঝরিণী।   

ইসলামী শারিয়ার মূল উৎস হচ্ছে কোরান, সুন্নাহ (এখানে সুন্নাহ হাদিস অর্থে নয়), ইজমা ও ক্বিয়াস। কখনো বিধানের স্পষ্টতা কোরানেই রয়েছে, কখনো বা সুন্নায়, অথবা হয়ত ইজমায় স্পষ্ট হয়েছে, নতুবা ক্বিয়াসে, (শেষোক্ত পরিভাষাদ্বয়ের অর্থ পরে আসছে)। কোরান হচ্ছে আল্লাহর বাণী। সুন্নাহ তাঁর রাসূলের ব্যাখ্যা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, নির্দেশনা –এক কথায় তাঁর দেখানো পথ যা তাঁর কাছ থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে নির্যাস করা হয়। এই সুন্নাহ সাহাবিদের (রা.) মাধ্যমে প্রচারিত ও সংরক্ষিত। নবী থেকে প্রাপ্ত বর্ণনায়, তাঁর কর্মধারা ও শিক্ষায় কালীন ও চিরন্তনী যে যে মূলনীতি পাওয়া যায় সেটিই হয় সুন্নাহ। তবে কখনো কখনো হাদিস ও সুন্নাহ শব্দদ্বয় পারস্পারিক প্রতিস্থাপিত (interexchanged) অর্থে ব্যবহৃত হতেও দেখা যায়। তবে কথা আগেইটাই থাকে অর্থাৎ সুন্নাহ হাদিস থেকেই নির্ধারিত ও সংরক্ষিত।  পরের পর্বে শারিয়ার প্রয়োজন, শারিয়ার ভিত্তি এবং ফিকহি নিয়ম-পদ্ধতি (methodology) আলোচনা করা হবে।

রেফারেন্সেস

____________________________

(১) ইবন মানযুর, লিসানুল আরব, [অনলাইন, প্রাপ্তব্যস্থানের লিঙ্ক এখানে ]

(২) আর-রাজি, (১৯৯৭).মুখতারুস সিহাহ।  বাইরূত:মাকতাবাহ লুবনান [আনলাইনেও প্রাপ্তব্য লিঙ্ক এখানে]

 (৩) Lane, E. W. (1968). An Arabic English Lexicon, Beirut: Librairie Du Liban [অনলাইনেও প্রাপ্তব্য, লিঙ্ক এখানে]

(৪) গাজী শামছুর রহমান, (১৯৮১), ইসলামী আইনতত্ত্বের বিকাশ ও পরিচিতি , ঢাকা: ইসলামী ফাউণ্ডেশন

২ comments

  1. 1
    সুজন সালেহীন

    শারিয়া কি একটি চলমান বিষয়? সালাফীরা কিভাবে শারিয়া নির্ধারণ করে?

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      (১) শাব্দিক অর্থের শারিয়া বা জলাশয় যেভাবে আবদ্ধ পানি নয় বরং নানান ফোয়ারায় নতুন পানির সংযোগ হয় তেমনি পারিভাষিক শারিয়াও ফিকহি সিদ্ধান্তের মূল নীতি-পদ্ধতির ভিত্তিতে এবং  বিশেষ করে ইজতিহাদের ধারায় একটি চলমান ও প্রাণবন্ত প্রসেস কার্যকর রাখে। তা না হলে ইসলামী ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ত। গত কাল সমাপ্ত হওয়া মিশরের ২০১৪ সিসির পাতানো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়া হারাম ফাতয়া দিয়েছিলেন ২০০ জন বিশেষজ্ঞ শারিয়াবিদ -এদের শীর্ষে ছিলেন ইউসুফ আল-ক্বারদায়ী। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইসলাম জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে যেসব পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে তা কেবল আশার দরজা উন্মোচিত করে। আমার পরবর্তী প্রবন্ধে শারিয়ার প্রসেসের চলমান প্রকৃতির কিছু উপাদান দেখা যেতে পারে। (২) ‘সালাফি’ বস্তুটি আসলে আরেকটি মজহাব। তারা যতদ্দুর মনে হয় ক্বিয়াসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন না। তবে এখানেও চিন্তা বিবেচনা কার্যকর, ‘ব্যাখ্যা’ কার্যকর, ফিকহি নীতি কার্যকর। কিন্তু রাজনীতিবিদগণ যেভাবে এবং যেসব কারণে তাদের প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করেন আবার সেই কারণসমূহ তাদের নিজেদের মধ্যে বিরাজ করে, তেমনি সালাফিগণও মাজহাবের বিরোধিতা করেন এবং বিরোধিতার অনেক মৌলিক বিষয় যে তাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে তা বেমালুম ভুলে যান। আমার পরবর্তী প্রবন্ধে শারিয়ার মূলনীতির উপর কিছু আলোচনা আসবে সেখানে শারিয়া কীভাবে প্রাণবন্ত থাকে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা থাকবে।

      ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.