«

»

Jun ১০

ইসলামী শারিয়া ও বুঝের ভুল

[দীর্ঘ প্রবন্ধ]

ভূমিকা

পূর্ব-প্রবন্ধে শারিয়ার শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ দেখানো হয়েছে। এবারে শারিয়া কেন –এই প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি এবং শারিয়ার অঙ্গনে পদ্ধতিগতভাবে কীভাবে কোরান ও সুন্নাহর টেক্সট বিবেচনা করা হয় তা আলোচনা করা হবে।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য প্রধানত দুটি। প্রথমটি হচ্ছে শারিয়ার সাথে কোরান ও সুন্নাহর সম্পর্কগত কিছু ভুল সমঝের মোকাবেলা করা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে, যার মূলে রয়েছে অনৈসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক আদর্শ, কিছু মুসলমান শারিয়াকে ইসলামের বাইরের কিছু মনে করে থাকেন। আবার কিছু লোক শারিয়া সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই রাখেন না -ভুল/শুদ্ধ দূরে থাকুক। প্রথম গ্রুপের কেউ কেউ কোরানের কোনো একটি আয়াত অথবা রাসূলের কোনো একটি হাদিস সামনে এনে শারিয়ার বিপক্ষে যুক্তি উত্থাপন করতেও দেখা যায়।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামি আইনের উৎস দেখানো এবং এই আইনকে মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করতে যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয় –সেই প্রেক্ষিত দেখানো।

প্রবন্ধটি প্রথমে কোরান ও সুন্নাহর টেক্সটের প্রকৃতির সাথে অর্থগত যেসব প্রকারভেদ রয়েছে তা উপস্থাপন করবে এবং এসবের আলোকে  পদ্ধতিগতভাবে অর্থ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করবে। তারপর শারিয়া ও ফিকহের পার্থক্য দেখানো হবে এবং শারিয়ার ভিত্তি কী -এর উপরও আলোচনা করা হবে। অতঃপর শারিয়ার কিছু মৌলিক পরিভাষা: ইজমা‘, ক্বিয়াস, উরফ, ইহতিহসান, ইসতিসলাহ ও ইসতিসহাব বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। উল্লেখিত পদ্ধতিসমূহের আলোচনায় দেখা যাবে কোরান সুন্নাহর অর্থ বুঝে জীবনকে আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে যাপন করাই শারিয়া অঙ্গনের একান্ত প্রচেষ্টা। এই প্রচেষ্টা ইসলামের বাইরের কিছু নয়।

প্রবন্ধটি তার পূর্ব-প্রকাশিত অংশসহ (ইসলামী শারিয়া -শাব্দিক ও পরিভাষিক অর্থ) যদি শারিয়ার উপর একটি প্রাথমিক পরিচিতি হিসেবে রূপলাভ করতে পারে তবে তা হবে বাড়তি উদ্দেশ্য ও কল্যাণ।   

কোরান ও সুন্নাহর টেক্সটের প্রকৃতি

ইসলামে দ্বীন-ধর্ম ও আইনের সমঝ গোটা কোরান ও সুন্নাহর পরিমণ্ডল থেকে গ্রহণ করা হয় –ইচ্ছেমত পক্ষের কিছু দলিল নির্বাচন করে নয়। যথেচ্ছা অর্থ গ্রহণে কোনো পদ্ধতির রূপায়ন ঘটে না। তাছাড়া যে পরিমণ্ডলে কোরান ও হাদিসের টেক্সট যেভাবে উৎসারিত হয়েছিল এবং সেদিন সেই পরিমণ্ডলে টেক্সটের অর্থ কীভাবে উপলব্ধি করা হয়েছিল সেই জ্ঞানও প্রকাশ পায় না। এর বিপক্ষে ইসলামী শরিয়ায় পদ্ধতিগত সমঝই প্রাধান্য পায়।
কোরান ও সুন্নাহর টেক্সট সপ্তম শতাব্দীর আরবের হিজাজ অঞ্চলের, বিশেষ করে এবং প্রধানত, কোরাইশ বংশের বাচনিক ভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে। এই সমাজের টেক্সট ১৪ শো বছর পরে একবিংশ শতাব্দীর কোনো এক টেবিলে বসে, অনুবাদ পড়ে, সকল ঐতিহাসিকতা, সকল ঘটনা প্রবাহ, আর্থ-সামাজিকতার প্রেক্ষিতসমূহ টেক্সট থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাঠ করা ও সমঝ লাভ করা সম্ভব নয়। বরং যাদের সাথে এই টেক্সট সেদিন সম্পর্কিত ছিল তাদের ধারণা সম্পর্কে জানা ও হৃদয়ঙ্গম করা জরুরি।
তারপর এই বিশ্বের সকল ভাষাতে প্রকৃতিগতভাবে কিছু মৌলিক রীতি-পদ্ধতি কাজ করে থাকে। যে ভাষা যে সমাজের সেখানেই তার অর্থ পেতে হয় এবং সেই অর্থ অনুসন্ধানে পদ্ধতি (methodology) অবলম্বনের প্রয়োজন হয়।

ভাষিক দলিল ও এর প্রকৃতি
কোরান ও সুন্নাহ উভয়ই ভাষিক দলিল। অর্থাৎ এই দুই উৎসের বর্ণনা ভাষায় লিপিবদ্ধ। আর ভাষা হচ্ছে সামাজিক কনভেনশন। ভাষার অর্থ সমাজ সংস্কৃতিতে ও প্রথাতে নিহিত। ভাষার ব্যবহার মৌখিক হোক অথবা লিখিত –তাতে দ্বিমতের স্থান দেখা দিতে পারে, ব্যাখ্যার অবকাশ আসতে পারে। কথা বা বিবরণের (Text/narrative) পিছনে আবার পটভূমি (context) থাকে। পটভূমিতে অনেক অর্থ নিহিত থাকতে পারে। তারপর পটভূমির সাথে জড়িত শ্রোতার সমঝের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে এবং অর্থের অঙ্গনে তাও জরুরি হতে পারে। ভাষা আপনাতেই কিছু সমস্যা হাজির করতে পারে –এটা ভাষার প্রকৃতিতে (nature of language) নিহিত। অনেক টেক্সট সমঝের দিক থেকে জটিল হয়ে দেখা দিতে পারে। অনেক শব্দ ও বাক্যে দ্ব্যর্থকতা ও রূপকতা থাকতে পারে। অনেক বাক্যের অর্থ বহুবাচক হতে পারে (plural in meaning)। অর্থ ‘সাধারণ’ (‘আম) হতে পারে, আবার খাছ (specific) হতে পারে। কোথাও বক্তব্য ‘আম’(সাধারণ) দেখাতে পারে কিন্তু তার অর্থ খাছ (বিশেষ/particular) হতে পারে। আবার এর বিপরীতও হতে পারে। কোথাও টেক্সটে ‘আক্ষরিক অর্থ’ (literal meaning) চোখে পড়তে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য আক্ষরিক নাও হতে পারে।
জরুরি কথা হল এই যে কোরান থেকে, এবং স্থান বিশেষে হাদিসের এবারত থেকে, ধর্মীয় ও আইনি অর্থ নিরুপন করতে গিয়ে যখন টিক্সট বিবেচনা করা হবে তখন সেই টেক্সটের অর্থ-বিষয়ক প্রকৃতি কোথাও কাথয়ী (قطعي/unequivocal, স্পষ্ট অর্থবোধক টেক্সট); কোথাও যান্নী (ظني, denotative, indicative meaning, ঈঙ্গিতবাহী টেক্সট); কোথাও হাকিকী (আক্ষরিক/literal টেক্সট); আবার কোথাও মাজাযী (রূপক/metaphorical টেক্সট) হতে পারে। তাই কোন্‌ স্থানে কী হচ্ছে সেই জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি। এর অভাবে দ্বীন-ধর্ম গড়ে ওঠবে না। এই জরুরতের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠেছে ফিকহ (فقه)-শাস্ত্রের ব্যাপক নিয়ম-পদ্ধতি (methodology)। এখানে বিভিন্ন বিদ্যার সংযোগ হয়েছে। যেমন যুক্তি বিদ্যা (মানতিক), ভাষাবিদ্যা (ইলমুল লুগাহ), সমাজ বিদ্যা (ইলমুল মুজতামা‘), প্রথা ও সংস্কৃতি (عرف) বিদ্যা ইত্যাদি। এই শাস্ত্রীয় অঙ্গনে কোরানের আয়াতকে যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখা হয় তেমনই হাদিসের এবারতকেও। এখানে হাদিসের শ্রেণীবিন্যাস হয়, রাওয়ীর (বর্ণনাকারীর) যোগ্যতা দেখা হয়, রাওয়ীর শ্রেণীসূত্র দেখা হয়, বর্ণনার সংযুক্তি/বিযুক্তি দেখা হয়, ট্যাক্সটের (মতনের/متن) চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ হয়, বিরোধ ও সাংঘর্ষিক অর্থের সামঞ্জস্য দেখা হয়। আর এই সবই সেই মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত –টেক্সট বুঝা, আল্লাহ রাসূলের আনুগত্য হৃদঙ্গয়ম করা এবং অনুসরণ করা এবং দুনিয়া ও আখেরের সফলতা অর্জন করা। শারিয়া ইসলামের বাইরের কোনো বস্তু নয়। এটাই ইসলাম।
কোরান ২৩ বৎসর ব্যাপী নাজিল হয়েছে। এতে বিভিন্ন প্রেক্ষিত ও পটভূমি সম্বলিত কথা এসেছে। কোনো বিষয় সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্নরূপ পরিগ্রহ করেছে। কোনো এক পূর্ববর্তী সমস্যায় যে সমাধান এসেছিল, অবস্থার পরিবর্তনের ফলে অন্য আয়াত নাজিল হয়েছে বা নবী (সা.) অন্য ধরণের সমাধান দিয়েছেন । তাই পূর্বাপর অবস্থা জানা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। হাদিসের পরিমণ্ডলেও সেই একই ব্যাপার রয়েছে। ধর্মীয় অনেক নির্দেশাবলী রাসূল (সা.) আল্লাহর নির্দেশেই প্রণয়ন করেছেন কিন্তু সেই নির্দেশ দুই প্রকৃতিতে হয়েছে। প্রথম প্রকৃতি হচ্ছে পাঠ্য-টেক্সট (মাতলু –যা কোরানে তেলায়াত করা হয়), এটি হচ্ছে কোরান। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে অপাঠ্য-টেক্সট (গাইর মাতলু -যা তেলায়াত করা হয় না), এটিই সুন্নাহতে স্থান পেয়েছে। কোরানের আদেশ/নির্দেশের সাথে নাসিখ/মানসূখ বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে অর্থাৎ একটি নির্দেশ পূর্বের কোনো নির্দেশকে আংশিক বা পুরোভাবে রহিত করেছে বা পাঠকে রহিত করেছে। যে আইন সম্বলিত টেক্সট রহিত হয় সেটি হয় ‘মানসূখ’ এবং যে টেক্সট পূর্বের টেক্সটকে রহিত করে সেটি হয় ‘নাসিখ’। তাছাড়া রাসুলের নির্দেশকে আমরা মানতে বাধ্য, এমন নির্দেশ কোরানে থাকুক অথবা না’ই থাকুক। কারণ রাসূলের আনুগত্য করার কথা কোরানে নির্দেশিত হয়েছে (৩:৩২, ৪৭:৩৩)। তাই রাসূলের আনুগত্য হবে বিনা-বাক্য ব্যয়ে (৩৩:৩৬)। এই হচ্ছে রাসূলের আনুগত্যের প্রকৃতি (nature)।
অর্থ গ্রহণে পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা ও ফিকহ
উপরের কথাগুলোর আলোকে হয়ত এটা স্পষ্ট হয়েছে যে যে দুই ধরণের টেক্সট (কোরান ও হাদিস) ২৩ বৎসরের চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এবং নানান ঘটনা ও পটভূমির প্রেক্ষিতে প্রকাশ লাভ করেছে, সেই সব টেক্সট যেকেউই, বই খোলে, পাঠ করলেই বুঝে ফেলতে পারবেন –এমনটি ধারণা করা ঠিক নয়। তবে তারা কিছুই যে বুঝতে পারবেন না এমনটি নয় বরং ই‘তিকাদ (বিশ্বাস), আদব (ন্যায়নীতি), ইবাদাত (উপাসনা), মু‘য়ামালাত (কাজ-কারবার) এবং ‘উকুবাত (শাস্তি), এই সব অঙ্গনের সকল বিধান নিরূপণ করে নিজের, পরিবারের এবং সকলের জন্য চলার পথ নির্ধারণ করতে পারবেন, কী পারবেন না, সেই কথা বলা হচ্ছে আর তা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা দেখাতে। এই হচ্ছে বক্তব্যের এক দিক। অপর দিক হচ্ছে এই যে সকল দেশের, সকল সমাজের, সকল কালের, সকল সমস্যার সমাধান আইনের কোনো একটি বইয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণিত হয়ে থাকে না। যা নাই, তা বিশেষজ্ঞগণ এক বা একাধিক পূর্ব-উদাহরণের ভিত্তিতে, সমাজ ও প্রথার ধারণার বিবেচনায়, অনুরূপ কোনো আইনের তুলনামূলক নতুন সমাধান পান এবং এভাবেই মূল উৎসের আইনি উদ্দেশ্য ও এহসাসের সাথে মিল রাখা হয়।
সর্বোপরি আমাদের যুক্তির স্থান হচ্ছে এই যে উল্লেখিত দুই প্রকার টেক্সট থেকে জীবন জিজ্ঞাসার সমাধান পেতে হলে বিশেষজ্ঞ পাঠের প্রয়োজন। সেই পাঠের জন্য হয় আপনার নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে নতুবা যিনি যোগ্য তার দ্বারস্থ হতে হবে। কেননা সবাই এককভাবে নানান ব্যাখ্যার পথ তৈরি না করে আল্লাহ আনুগত্যের যে ধারা নির্দেশ করেছেন সেই ধারায় যেতে হবে। নিয়ম-নীতি বহির্ভূত পথে সেই ধারা আসে না।
অর্থের সমঝ আমাদেরকে নিয়ম-পদ্ধতি অনুযায়ী কোরান ও সুন্নাহ থেকে পেতে হবে। এই কাজ করতে গেলে টেক্সট বিষয়ক সামাজিক জ্ঞান পেতে হবে কেননা ভাষা সামাজিক। টেক্সট, ভাষা, সমাজ ইত্যাদির সাথে ‘অর্থের’ সংযুক্তি ইত্যাদি যেভাবে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে একটু চিন্তা করলে একথা হয়ত বুঝা যাবে যে দ্বীন ধর্ম ও আইনের ক্ষেত্রে অর্থ নির্ধারণে পরিমিত জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে এবং এই জ্ঞানের অভাব হলে, স্থান বিশেষে, সামাজিক ঝুঁকি বা রিস্ক প্রবল হয়ে ওঠতে পারে। কোনো এক ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হওয়া বা ফাসাদি হওয়া এক কথা, আর সামষ্টিকভাবে সেই পথভ্রষ্টতা বা ফাসাদ প্রসারিত হওয়া এক জিনিস নয়। এই গুরুত্ব বিবেচনা করে নবীর সাহাবিগণ (রা.) কোরান ও সুন্নাহর অর্থ নির্ধারণের যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করতেন এবং তাঁদের মধ্যে যেভাবে ইজমা‘ (তাদের শ্রেণীর উলামাদের ঐক্য) প্রকাশ পেত, এবং তাঁরা ক্বিয়াসের ক্ষেত্রে যেসব নীতি অবলম্বন করতেন, আজো কোরান ও সুন্নাহর অর্থ নির্ধারণে সেই পথই অবলম্বন করতে করতে হবে। কেননা কোরান ও সুন্নাহর টেক্সট তাঁদের সমাজে, তাঁদের ধারণায় এবং তাঁদের প্রথা ও সংস্কৃতিতে প্রকাশ পেয়েছে। নবী থেকে সাহাবি, সাহাবি থেকে তাবে‘য়ী, তাবে‘য়ী থেকে তাবে-তাবে‘য়ী এবং তাঁদের থেকে তাঁদের শিষ্য –এই যে ধারা, এটি হচ্ছে কোরান ও সুন্নাহর অর্থের স্রোতস্বিনী। এই ধারার সমঝ বা ফিকহের বিকল্প নেই।

শারিয়া ও ফিকহের পার্থক্য
এপর্যন্ত ‘ফিকহ’ শব্দ কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ফিক্‌হ’ হচ্ছে জ্ঞান বা সমঝ। এই শব্দের পারিভাষিক অর্থও ‘আইন’। সংজ্ঞায় এনে বলা যেতে পারে যে ‘এটি শারিয়ার ব্যবহারিক নিয়ম-পদ্ধতি বিষয়ক জ্ঞান।’ এই জ্ঞান মূল উৎসদ্বয়ের (অর্থাৎ কোরান/সুন্নাহয়) আনুপুঙ্খিক দলিল/তথ্য থেকে অর্জিত’ (কামালী, ১৯৯১:২)। ‘ইমাম আবু হানিফার মতে যাহা মানুষের অনুকূলে (লাহু/له) এবং যাহা মানুষের প্রতিকূলে (আলাইহি/عليه) তৎসম্পর্কে জানা বা তাদের জ্ঞানই হইতেছে ফিক্‌হ” (স্যার আব্দুর রহীম, ১৯৮০:৪৭)। শারিয়া হচ্ছে আল্লাহ যা আদেশ/নিষেধ করেন তা। আর ফিকহ হচ্ছে  ‘আইনি হুকুম-আহকাম সম্বলিত  কার্যাবলীর বিস্তারিত দলিল প্রমাণ সংক্রান্ত জ্ঞান’ (معرفة الأحكام الشرعية العملية من أدلتها التفصيلية إسلام ويب-صلة)। 

 

শারিয়ার সমঝ, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের জ্ঞানই ফিকহ। অন্য কথায় বলা যায় যে ফিকহের ময়দান হচ্ছে শারিয়ার উৎস থেকে আইন ও আইনের ব্যাখ্যা আহরণ (استنباط)। এটাকে ইংরেজি ‘jurisprudence’ (আইনের দর্শন ও বিজ্ঞান) এর কাছাকাছি বা সমার্থক বলা যেতে পারে। শারিয়া যেখানে আল্লাহ ও রাসূলের আইন, নির্দেশ ও পথ, তাই এই ক্ষেত্রটি চিরন্তন এবং নির্ভুল আর ফিকহ যেখানে শারিয়ার ব্যাখ্যা, তাই এই ব্যাখ্যার সাথে স্থান ও কালের উপযোগিতার সম্পর্ক আসে, পরিস্থিতি ও অবস্থানের প্রেক্ষিত বিবেচনার প্রয়োজন আসে, এবং  কখনো ফক্বিহের (আইনবিদের) ব্যাখ্যায় ভুলের সম্ভাবনা থাকতে পারে। ফিকহে (শারিয়া) ব্যাখ্যার কোনো কোনো স্থানে দ্বিমতের অবকাশ থাকতে পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত অবশ্যই কোরান ও সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে এবং সমঝের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিয়োগের ভিত্তিতেই আসতে হবে, যেভাবে দ্বিমতের উদাহরণ বিভিন্ন মাজহাবে স্থান পেয়েছে। এখানে ইজতিহাদ থাকতে হবে এবং ইজতিহাদও শারিয়ার ভিততের বস্তু এবং উসূলপ্রসূত।

ফিকহের অঙ্গন অত্যন্ত গভীর। এই গভীরতা বুঝতে হলে এই অঙ্গনে নামতে হবে। এই ‘জলাশয়ে’ সময় কাটাতে হবে। কেননা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ঝর্ণা, ফোয়ারা যেসব উৎসধারা বেয়ে সমষ্টিগতরূপে জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে সেই জ্ঞান আসতে হবে। এখানে অসংখ্য বিজ্ঞ-বিশেষজ্ঞজন সব ধরণের টেক্সট,সমস্যা ও প্রশ্ন নিয়ে দিগ্বিদিক চড়াই উতরাই করেছেন। কখনো বিহঙ্গের মত গগণের সীমা উৎরিয়ে বিচরণ করেছেন। এই হচ্ছে শারিয়াহ, কোরান সুন্নাহর সমঝের অন্তর্নিহিত কেন্দ্র ও আলোচনার স্থান। এস্থান ইসলামের বাইরের কিছু নয়।

 

শারিয়ার ভিত্তি ও কিছু মৌলিক পরিভাষা

 

পূর্ব-প্রবন্ধে শারিয়ার ভিত্তির কথা উল্লেখ হয়েছে। এবারে বিষয়টি বর্ধিত হবে। এ প্রসঙ্গে মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী (২০০০:৮) বলেন, ‘ইসলামী আইন হচ্ছে ‘কিতাব’ –এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ আমাদের জন্য যা কিছু লিখে দিয়েছেন (ما كتب الله لنا) তা। এর আরেক নাম হচ্ছে ‘সুন্নাহ’ –এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নবী (সা.) যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন (ما سنه النبي صلي الله عليه وسلم) তা। এবং তৃতীয় বহুল পরিচিত শব্দ হচ্ছে ‘শারিয়াহ’ যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ আমাদের জন্য যে আইন করে/নির্ধারণ করে দিয়েছেন (ما شرع الله لنا) তা।’

মুসলিম ব্যক্তি ও সমাজ আল্লাহর আইন মোতাবেক জীবন গড়তে নির্দেশিত। আল্লাহ বলেন, ‘যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী বিচার/ফায়সালা করে না, তারাই কাফের’ (৫:৪৪)। ‘যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সেই অনুযায়ী বিচার/ফয়সালা করে না তারাই জালেম’ (৫:৪৫)।’ ‘যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক’ (৫:৪৭)।

স্যার আব্দুর রহীম (১৯৮০:৫০) উল্লেখ করেন, ‘আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পালন না করা শুধু অকৃতজ্ঞতা নয় নিদারুণ অজ্ঞতাও বটে (প্রসঙ্গতঃ স্মরণযোগ্য যে, কাফিরের শাব্দিক অর্থ হইতেছে অকৃতজ্ঞ)। কোনো কোনো আইনতত্ত্ববিদগণ বলেন, সৃষ্টিকালে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সাথে একটি প্রাথমিক চুক্তি (মিসাক-ঈ-আজালি/ميثاق أزلي) করিয়াছিলেন। সেই চুক্তিতে মানুষের আরওয়া আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের শপথ লইয়াছিল এবং আল্লাহ তা‘আলা মানুষের ব্যবহার ও ভোগের জন্য বিশ্ব সৃষ্টির ওয়াদা করিয়াছিলেন।”

আগেই উল্লেখ হয়েছে, শারিয়াহ আইনের ভিত্তি বলতে প্রধানত কোরান, সুন্নাহ, ক্বিয়াস ও ইজমা‘ ধরা হয় (আমিন আহসান ইসলাহি, ২০০০:২৭, স্যার আব্দুর রহীম, ১৯৮০:১১৩)। তবে এটা সাধারণী অর্থের ব্যাখ্যা। অন্য কেউ কেউ বলেন যে শারিয়ার মূল উৎস হচ্ছে কোরান ও সুন্নাহ (আবুসাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ১৯৮২:১৭ ) এবং উল্লেখিত দ্বিতীয় দুটি হচ্ছে মূল উৎস ব্যাখ্যার পদ্ধতি (parts of the methodology) বা ব্যাখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি, উসূলগত বিষয়।  এই ফিরিস্তিতে আরও বিষয় রয়েছে।

উসূলুল ফিকহে (the methodology of fiqh) অর্থ নির্ধারণ ও ব্যাখ্যার জন্য যেসব মূলনীতি গ্রহণ করা হয় সেখানে প্রধানত আসে ইজমা‘(اجماع) ও ক্বিয়াস (قياس)। তারপর উরফ (عرف) ইহতিহসান (استحسان), ইসতিসলাহ (استصلاح) ও ইসতিসহাব (استصحاب)। এগুলো হচ্ছে আইনের ক্ষেত্রে অর্থ ও ব্যাখ্যা নির্ধারণের যৌক্তিক পদ্ধতি (methods)। এগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ।

ইজমা‘ (ijmā‘: consensus of opinion) হচ্ছে কোরান সুন্নাহ থেকে অর্থ গ্রহণের ঐক্যমতের স্থান। যেসব স্থানে (হাদিসে/কোরানের আয়াতে, কোনো অভিমতে) দ্ব্যর্থকতা বা অস্পষ্টতা রয়েছে কিন্তু সেখানে প্রকৃত অর্থ কোন্‌টি ধরা হবে বা কোন্‌ আইন প্রযোজ্য হবে সেই বিষয়ে ওলামা/আইনবিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন স্থানই হচ্ছে ইজমা‘র স্থান। নবীর সাহাবি, তাঁর নিকটের শিষ্যগণ এবং পরে শিষ্যের শিষ্যগণ (তাবে‘য়ী ) এবং তৎপরবর্তী ওলামাদের মধ্যে এমন ধরণের ব্যাখ্যার স্থান রয়েছে। এই নিয়ম আজও কার্যকর। কোনো একটি বিচ্ছিন্ন এবারত কোথাও পাওয়া গেল বলে ইজমায় প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান, অর্থ, আইন সরে পড়ে না বরং ইজমার জ্ঞানই বিচ্ছিন্ন ভার্সনকে নাকচ করে। আগেই উল্লেখ হয়েছে যে ভাষার অর্থ সামাজিক, সামগ্রিকভাবে ভাষার ‘অর্থ’একান্ত ব্যক্তিক নয়। আরবিতে সমাজকে ‘মুজতামা‘’ বলা হয়, এখানে ব্যক্তির সমন্বয়ে সামষ্ঠিক সত্তা গঠিত হয়।

শাব্দিক দিক দিয়ে ইজমা‘ শব্দ জমা হওয়া ও একত্র হওয়ার’ ধারণা বহন করে। আলোচ্য প্রসঙ্গে ‘মত/অভিমত’ ও ‘ব্যাখ্যার’ ঐক্য বুঝায়। একটি যৌক্তিক দলিল এই অর্থে, যে, গৃহীত-অর্থ বা ব্যাখ্যা, যেভাবে-সেভাবে গৃহীত নয়, অস্বাভাবিক (queer) বা নিয়ম-প্রথা থেকে সরে গিয়ে গৃহীত নয়। বরং এটাই সামাজিক উপলব্ধি, বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমতে প্রতিষ্ঠিত।

ইজমা‘ অর্থবিজ্ঞানের দিক দিয়েও এটি সঠিক উপাদান। ইজমা‘ শারিয়ার একটি বলিষ্ঠ দলিল -এটা কোরান ও সুন্নাহয় সাবিত হয়েছে। এমনসব মর্মের হাদিস রয়েছে যেখানে নবীর (সা.) উক্তি আছে যে ‘আমার উম্মতগণ অন্যায়ের উপর (ভুলের উপর)  একমত হবেন না। সুতরাং যখন তোমরা ইখতিলাফ দেখবে তখন সংখ্যাধিক্যের অনুসরণ করবে’(আনাস বিন মালিক/ইবন মাজাহ); ‘জামাতের উপর আল্লাহর হস্ত প্রসারিত ও বিচ্ছিন্নবাদীগণ দোখখে যাবে’ (ইবন ওমর/)। কোরানে এসেছে, ‘যে কেউ, তার কাছে হেদায়াতের রাস্তা স্পষ্ট হওয়ার পর,  রসূলের বিরোধিতা করে এবং সকল মুমিনের পথ বাদ দিয়ে অন্য পথে চলে, আমরা তাকে ঐ পথেই রেখে দেব যে পথ সে অবলম্বন করেছে। এবং তাকে জাহান্নামে দাখিল করব। আর তা বড়ই মন্দ গন্তব্যস্থল’ (৪:১১৫)। তাছাড়া যে যা জানে না, তা যে জানে তার কাছ জানার নির্দেশও আছে। আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তাদেরও যারা উলুল আমর ((কর্তৃত্বের অধিকারী, আলিম/ওলামা, মুত্তাকি শাসক, নেতা, (৪:৫৯))।  আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন (আলাদা আলদা) হয়েছে এবং স্পষ্ট দলিল আসার পরও ইখতিলাফ (দ্বিমত পোষণ) করেছে’ (৩:১০৫)।

ইজমার বিভন্ন স্তরভেদ রয়েছে। কোন শ্রেণীর এবং কোন পর্যার্যের যোগ্যতাসম্পন্ন ওলামা/ফকিদের ইজমা‘ বিবেচিত হবে, তারও দিক নির্দেশনা রয়েছে।

ক্বিয়াস (qiyās: analogical deduction) শব্দটি আরবির ক্রিয়াবাচক ক্বাসা-ইয়াকিসু (قاس يقيس) শব্দের নাম-বাচক শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে কোনো কিছু মাপা (to measure)। দর্জি মেপে-জোকে কাপড় কাটেন এবং সেলাই করেন। তাই নির্মিত জামা শরীরের মাপের প্রতিফলন বহন করে। রূপক অর্থে তাই এক পরিস্থিতি বা মামলা (কেস) আরেকটি নিকটতম তুলনায় ধারণ করার অর্থ হয়। কোরান বা সুন্নাহয় যখন সরাসরি কোনো বিষয়ের সমাধান বা  বিবরণ পাওয়া যাবে না, তখন এক বা একাধিক সামঞ্জস্যশীল অন্য ঘটনার আলোকেই বক্ষ্যমাণ সমস্যার সমাধান ওলামা/আইন-বিশেষজ্ঞগণ খোঁজেন। এটাই ক্বিয়াস। ‘হানাফিগণ বলেন, কিয়াস হইতেছে আইনের বিস্তৃতি; মূল আইন যখন সমস্যা সমাধানের মোকাবিলায় কুলাইয়া উঠে না বা মূল আইনের শুধুমাত্র ভাষা যখন তাহার উদ্দেশ্য পূর্ণভাবে পরিস্ফুট করে না, তখন মূল আইন হইতে ইল্লাতের (علة) সূত্রে বা মাধ্যমে নতুন বিধি আহরণ করিতে হয়; ইহাতে আইনের যে বিস্তৃতি ঘটে তাহাই কিয়াস’ (স্যার আব্দুর রহীম, ১৯৮০:১১৩)। কিয়াসে জ্ঞান, যুক্তি ও বিবেচনা ব্যবহৃত হয়। ক্বিয়াস করার নিয়ম-পদ্ধতি এবং অনেক শর্ত রয়েছে। এখানেও বুঝা যাচ্ছে যে কোনো ব্যক্তি কোরান ও হাদিসের এবারত বুঝতে ব্যর্থ হয়ে নিজ ইচ্ছা মত কোনো অর্থ গ্রহণের স্থান নেই। অর্থ গ্রহণের স্থানও আসতে হবে ক্বিয়াস ছুয়ে। ক্বিয়াস করারও পদ্ধতিগত নিয়ম রয়েছে যা ব্যাপক বিধায় এই প্রবন্ধে আলোচনা করা যাবে না।

উরফ (عرف) হচ্ছে সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি। এটাকে তা‘আমুল (تعامل) ও আদাহ (عادة)ও বলা হয়, (শেষোক্ত শব্দটি বাংলায় ‘আদত’ বলা হয়)। ‘রাসূলুল্লাহর (সঃ) আবির্ভাবকালে আরব দেশে অনেক প্রথা ও রীতিনীতি ছিল। এই প্রচলিত প্রথা এবং রীতিনীতির একটি বৃহৎ অংশ আল-কোরান বা আল-হাদিস স্পষ্ট অনুজ্ঞা বা আদেশ দ্বারা রদ করা হয় নাই। আইনদাতা তাহার নীরবতার দ্বারা এইগুলিকে অনুমোদন করিয়াছেন বলিয়া ধরিয়া লওয়া হয়। প্রথা (উরফ, তা‘আমুল, আদত عرف- تعامل – عادة) সর্বতোভাবে আইনের একটি উৎসরূপে গণ্য হয়। আইনতত্ত্ববিদগণ ইহাকে ইজমার মর্যাদা দিয়াছেন’ (স্যার আব্দুর রহীম, ১৯৮০:১১১)।  কোনো অর্থ যদি জটিল হয়ে দেখা দেয় তবে তার সমঝ আরবের সামাজিক প্রথাতে বা রীতিতে অনুসন্ধান করতে হবে। তারা কোনো বক্ষ্যমাণ শব্দ, বাক্য, ধারণাকে কীভাবে বুঝেছিল –সেটি সামনে আনতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে বসে কোরান হাদিসের এবারত নিজ ইচ্ছেমত এবং একালের নানান আদর্শ  ইজমের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে তা সেদিনের নাজিল হওয়া অর্থ হবে না। কেবল সেদিনের অর্থ বুঝতে পারলে চিরন্তনতার ভিত্তিতে অর্থকে এদিনের পরিসরে আনা সম্ভব হতে পারে এবং প্রয়োগও হতে পারে।    

ইসতিহসান (istiḥsān) হচ্ছে  দলিল প্রমাণ বিবেচনা ও তাহক্বীকের পর আইনবিদ যে অর্থ নির্ধারণ করেন তারপর তার আইনি মত প্রদানে যে প্রাধান্য (jurist preference) দেন সেই প্রাধান্য। এটা স্থানভেদে ন্যায়পরায়ণতা অর্থেও হয়, যা ইউরোপিয়ান আইনে এক্যুইটি (equity) ধারণায় নিহিত।  কোনো একটি সমস্যা এমনিভাবে জটিল হতে পারে যে সেখানে আইনের উপস্থিতি আছে বটে কিন্তু সেই আইন প্রয়োগ করতে গেলে সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে বরং বর্ধিত হতে পারে; বা ইনসাফের পরিবর্তে বেইনসাফি হয়ে যেতে পারে; অথবা এতে দারুণ অকল্যাণ হয়ে যেতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বিচারক তার বিচারিক সুবিবেচনা (discretion) ব্যবহার করতে পারেন। ইসতিহসান ‘হাসান’ শব্দ থেকে আসা। হাসান অর্থ সুন্দর আর ইসতিহসান অর্থ সুন্দর বিবেচনা। এটি ইমাম আবু হানিফার মাজহাবে বেশি অবলম্বন করা হয়। এর মোকাবেলায় অনুরূপ নীতি শাফেয়ী মযহাবে রয়েছে যাকে ইসতিসলাহ (istiṣlāḥ) পরিভাষায় উল্লেখ করা হয়। এই নীতি ক্বিয়াসকে রদ করতে পারে। ‘কিয়াসভিত্তিক আইন যদি আইনতত্ত্ববিদ্গণের ধারণায় সংকীর্ণ বা অগ্রহণযোগ্য মনে হয় কিংবা আইনবিদ যদি মনে করেন যে ঐ আইনের প্রয়োগ শুধু অসুবিধা এবং দুরাবস্থা ডাকিয়া আনিবে, তবে সেইক্ষেত্রে হানাফিগণের মতে আইনবিদ ঐ কিয়াসভিত্তিক আইনকে উপেক্ষা করিয়া জনকল্যাণ ও সুবিচারের স্বার্থে নিজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারিবেন। যে নীতির বলে তিনি কিয়াসকে উপেক্ষা করিতে পারেন, তাহাকে ইসতিহসান বলে। যাহা ভাল মনে করা যায় তাহাই ইসতিহসান। (স্যার আব্দুর রহীম, ১৯৮০:১৩১)।   

বলা হয়েছে, ইসতিসলাহ (استصلاح) নামক নীতি ইমাম শাফেয়ীর মজহাবে বেশি প্রচলিত আর হানাফি মজহাবে ইসতিহসানের আলোচনা ও ব্যবহার বেশি।  ইসতিসলাহ ক্রিয়াবাচক ধাতুমূল সালাহা/সালুহা (صلح) থেকে নির্গত যার অর্থ হয় সঠিক হওয়া, ভাল হওয়া, উপযোগী হওয়া ইত্যাদি। আর ইসতিসলাহ হচ্ছে উপযোগী বিবেচনা করা, উত্তম বিবেচনা করা, সঠিক বা ভাল বিবেচনা করা ইত্যাদি। আইনের অঙ্গনে ‘যাহা জনকল্যাণমূলক; তাহাই গ্রাহ্য; ইহাই ইসতিসলাহের মূল বক্তব্য’ (স্যার আব্দুর রহীম, ১৯৮০:১৩৩)।

ইসতিসহাব (Istiṣḥāb/استصحاب) নীতিও অনেকটা পূর্বে আলোচিত উপাদানগুলোর মত। এটা ক্রিয়াবাচক সাহিবা  (صحب) শব্দ থেকে নির্গত যার অর্থ হয় সঙ্গী হওয়া, বন্ধু হওয়া, নিকটবর্তী হওয়া) ইত্যাদি। ইসতিসহাবের (Istiṣḥāb) অর্থ হচ্ছে নিকটবর্তী হিসেবে গ্রহণ করা, সংগ দেয়া (to accompany/escort), কোনো কিছুকে নিকটবর্তী ধারায় গ্রহণ করা। এ ব্যাপারে কামালীর (১৯৮৯:২৯৭) একটি উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য: ‘The technical meaning of istiṣḥāb relates to its literal meaning in the sense that the past ‘accompanies’ the present without any interruption or of change’. এসতিসহাব এক ধরণের যৌক্তিক দলিল যা অতীত দৃষ্টান্তসমূহের নিকটবর্তী হয় এবং কোরান ও সুন্নাহর আইনি এহসাসের ধারায় গৃহীত হয়। এটার মধ্যেও পদ্ধতিগত দিক থেকে ইসতিহসান ও ইসতিসলাহের ভাবধারা রয়েছে।

এই পর্বের উপসংহার

কোরান ও সুন্নাহ যেহেতু ভাষায় লিপিবদ্ধ এবারত (বা টেক্সট) -তাই ভাষিক টেকনিক্যালিটি ও প্রকৃতিগত বিষয় অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা প্রথমত দেখানো হয়েছে। শারিয়া জীবন যাপনের সার্বিক বিধান। এই বিধানের সমঝ হচ্ছে ফিকহ। কোরান ও সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝা ও আমল করার উদ্দেশ্যে এখানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়। সুতরাং মানুষের কল্যাণেই শারিয়ার অবস্থান। আইন কখনও যদি প্রেক্ষিত বহির্ভূত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় অথবা যদি আইনের অনুপস্থিতি থাকে তখন আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে সেই প্রেক্ষিত সংকটের মোকাবেলা করা হয়। কেননা আইন মানুষের জন্য, মানুষের সমস্যার সমাধানকল্পে। এখানেই শারিয়ার প্রয়োগ ও প্রয়োগিক তারতিবের বিশেষ অঙ্গন। 

কোরান সুন্নাহর ভাষিক প্রকৃতি ও অর্থগত উপাদানসমূহ উল্লেখের পর আলেমদের ইজমা‘য় যে অর্থ প্রকাশ পায় তাও দেখানো হয়েছে। এই পদ্ধতিতে ভাষার সামাজিক অর্থ স্থান পায়। যে কোনো সমাজে যে কোনো বিষয়ে নানান জন নানান কথা বলতে পারে।  কিন্তু জরুরি বিষয়ে জ্ঞানীদের গৃহীত অর্থ প্রণিধানযোগ্য হয়। তবে সামষ্ঠিক অর্থ এমন নয় যে একারণে ব্যক্তিক অর্থ সর্বত্র পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে। বরং জটিলতা সমাধানে সামষ্ঠিক অর্থ গ্রহণের পদ্ধতি নিরাপদ হয়। উরফের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠিত সামাজিক অর্থ ও সেই অর্থের ভিত্তিতে সামাজিক আচরণ ও প্রথা পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষিতেও ইচ্ছেমত অর্থ গ্রহণের প্রবণতা দূর হয় এবং অর্থ স্পষ্ট হয়।

ক্বিয়াস গ্রহণের পদ্ধতিতেও অর্থের উৎসগত স্থান অনুসন্ধান করা হয়। এটাও আলোচিত হয়েছে। তারপর  ইহতিহসান, ইসতিসলাহ ও ইসতিসহাবের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন মামলা বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিক সমস্যা বা অবস্থার সৌষ্ঠব ও মানবিক কল্যাণ-সমন্বিত সমাধান গ্রহণ করা হয় এবং স্থানভেদে আইনের আক্ষরিকতার ঊর্ধ্বে ওঠে সমাধান পাওয়া হয়। আল্লাহ মানুষের জন্য যে সহজতা পছন্দ করেন এবং কঠিন্যতা করেননা (২:১৮০), সেই মহৎ রূপ প্রকাশ লাভ করে। 

পরিশেষে, কোরান ও সুন্নাহর সমঝই (ফিকহ) হচ্ছে অপরিসীম গুরুত্বের এবং এই সমঝের ভিত্তিতে জীবন যাপন করাই মুসলমানদের আসল উদ্দেশ্য। এই সমঝ সম্বলিত বিধানই হচ্ছে শারিয়া -মুসলমানদের জীবন সঞ্জিবনী (জলাশয়)।

 

রেফারেন্সেস

_____________________

(১) আবু ছাইদ মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, (১৯৮২), ফিকহ শাস্ত্রের ক্রমবিকাশ, ঢাকা: ইসলামী ফাইণ্ডেশন

(২) Amin Aḥsan Islāḥi, (1979), Islāmic Law: concept and codification, Lahore: Islāmic Publications (translated by S.A. Rauf)   

(৩) Kamali, M. H. (1991), Principles of Islāmic Jurisprudence, Cambridge: The Islāmic Text Society

(৪) স্যার আব্দুর রহীম, (১৯৮০), ইসলামী আইনতত্ত্ব, ঢাকা: ইসলামী ফাউণ্ডেশন অনুবাদ ও অভিযোজনে গাজী শামছুর রহমান

(৫) গাজী শামছুর রহমান, (১৯৮১), ইসলামী আইনতত্ত্বের বিকাশ ও পরিচিতি , ঢাকা: ইসলামী ফাউণ্ডেশন

_______________________________________

আরও কিছু সংশ্লিষ্ট লেখা
(১) ইসলামের রাজনীতি: শাব্দিক উৎস ও ধারণা
(২) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও প্রতিবন্ধক যুক্তি
(৩) কাল-সাগরের ঢেউ (মন্তব্যসহ পড়বেন)

(৪) রাষ্ট্র ও সমাজ বিবর্জিত ধর্মের নাম ব্যক্তিক ইসলাম?

(৫) ইসলামী শারিয়া -শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

(৬) তাওহীদের কলিমায় ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক আনুগত্য -পর্ব এক

(৭) কলিমার স্বীকৃতিতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনের ধারণা -পর্ব দুই

(৮) কলিমা তাওহীদে আনুগত্যের ধারণা -ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র -পর্ব তিন

(৯) কেউ কথা বলতে পারবে না

(১০) আবহমান কালের বাঙালীয়ানা -ধোঁয়াকুণ্ডের পশ্চাৎ দিকে কি?

(১১) কমিউনিজম, মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ: একটি মন্তব্য-ব্লগ

(১১) রাজনীতি- সেই হাসির অর্থ কি হবে?

২ comments

  1. 1
    মুনিম সিদ্দিকী

    অজানা অনেক কিছু জানলাম। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। ধন্যবাদ।

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      পাঠ করেছেন, ভাল লেগেছে -এটাই নয় আনার সন্দেশ। এই ছুতো ধরে আরও দুটি কথা বলি। আমরা অনেকেই ইসলামী শারিয়া, সমাজ ও শিক্ষার পক্ষে কথা বলে যাচ্ছি কিন্তু মুসলমানদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও মানসিকতা এমন যে তাত্থেকে উত্তরণ করে সেই অবস্থায় পৌঁছা অনেক কঠিন। প্রত্যেক দল/গ্রুপ চায় বাকিরা তাদের 'মতো' হয়ে যাক। কিন্তু এটা তো সম্ভব নয়। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। এক ধর্মের লোক যেভাবে আরেক ধর্মীদের কাছে মিশনারি কাজ করে এরাও নিজেদের মধ্যে তাই করে। সস্যিয়াল মিডিয়ায় এগুলো দেখতে বেশ disconcerting লাগে। কিন্তু কি আর করা। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের যেটুকু করণীয় সেটুকু করা আর আল্লাহর উপর নির্ভর করা -এটাই চলার পথের পাথেয়।

      শারিয়া প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা রয়েছে। সময় করে লিখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.