«

»

Sep ১৪

কলিমা তাওহীদে আনুগত্যের ধারণা -ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র, পর্ব ৩

এ নিয়ে চলতি বিষয়ে তিনটি লেখা দেয়া হল।  

প্রথম পর্বে এই কলিমার (কলিমা তৈয়্যিবার) সার্বিক জীবন ধারণা আলোচিত হয়েছে। এক মা‘বুদ গ্রহণ করার পর কেবল তাকেই ডাকা হবে, তার আশ্রয় চাওয়া হবে, বিপদে আপদে তিনিই মুক্তি দেবেন –এসব গুণ আছে বলেই তার আনুগত্য, তার দাসত্ব, তার স্তুতি জ্ঞাপন, তার উপর ‘আস্থা’ বা বিশ্বাস স্থাপন। ৩৬০ মূর্তি ও মূর্তি-কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা, নেতৃত্ব ও মূল্যবোধের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে সেদিন এক ইলাহের আনুগত্য প্রতিষ্ঠার আহবান ছিল এক অকল্পনীয়, দুর্দান্ত বিষয়। এই দিকগুলো প্রশস্ত করা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্বে দেখানো হয়েছে এই কলিমায় নিহিত সামাজিক, নৈতিক ও আইনি ধারণার কারণে সর্বসাধারণ ও সমাজপতিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠেছিল। কেননা তারা এই কলিমার অর্থ বুঝতে পেরেছিল। ওয়ারাকাহ বিন নাওফলের আগাম সতর্কীকরণ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া, আবু তালিবের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ,  উতবাহ বিন রাবি‘আর প্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি আলোচনায় সেই সার্বিক অর্থ দেখানো হয়েছে।  

এবারে, এই পর্বে, ইলাহ শব্দের অর্থ, প্রকৃত ইলাহ কে, বানোয়াট ইলাহ ও বিস্তৃত প্রতারণা –এই কয়টি উপশিরোনামে সমাজ ও রাষ্ট্রে যেসব ধোঁকাবাজি চলে এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মানবিক দুর্বলতা ঘিরে যেসব খেলা হয়, সংক্ষেপে, সেই বাস্তবতা নিয়ে কিছু কথা হবে।   

ইলাহ শব্দের অর্থ

আরবি ক্রিয়াবাচক শব্দ أله-يأله –আলিহা/ইয়া’লাহু –এর অর্থ আশ্রয় গ্রহণ, নিরাপত্তা চাওয়া, স্বস্তি লাভ করা ইত্যাদি। এর প্রেক্ষিত হয় ভীতি থেকে নিরাপত্তা, সংশয় ও অনিশ্চয়তার স্থান থেকে নিশ্চয়তা ও স্বস্তি লাভ। যখন বলা হয়, ‘আলিহা ইলাইহি/أله إليه’  তখন এই বাক্যের অর্থ হয় সে (ভীত হয়ে, নিরাপত্তার জন্য) ওর কাছে আশ্রয় নিয়েছে। ব্যবহারের  আরেকটি প্রেক্ষিত হচ্ছে এই যে এক ব্যক্তি বহুমুখী সমস্যায় হিমসিম খেয়ে এখন সে কারো কাছে (বিশেষ অর্থে আল্লাহর কাছে) স্বস্তি লাভ করেছে, নিরাপত্তা পেয়েছে বা স্বস্তির ধারণায় উপনীত হয়েছে।  যার কাছে আশ্রয় নেয়া হয়, যিনি আশ্রয় দানের যোগ্য, নিরাপত্তা দানের যোগ্য, স্বস্তি ও শান্তির নীড়, শাব্দিক অর্থে তিনি হন ‘ইলাহ’। এটা আবার আলাহা/ইয়া’লাহু উচ্চারণে আসতে পারে এবং অর্থের রূপ কিছু ভিন্ন হতে পারে। যেমন  أله الرجل  -আলাহার রাজুলু, লোকটি ইবাদাত করেছে, ভক্তি জ্ঞাপন করেছে, অনুগত হয়েছে। তবে ইবাদত-আরাদনা মানুষ কেবল তারই জন্য করে থাকে যার ঐশী ক্ষমতায় ও গুণে সে মুগ্ধ; যার প্রতি ভক্তি জ্ঞাপনে সে সার্থকতা খোঁজে। এ দিক থেকে অর্থ তেমন ভিন্ন নয়। তবে ব্যবহারের ভিন্নতায় তা সরাসরি সকর্মক (transitive/متعد) অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন أله جاره   -আলাহা জারাহু, সে তার প্রতিবেশীকে নিরাপত্তা দিয়েছে, সান্ত্বনা দিয়েছে, নির্ভয় করেছে।

 

প্রকৃত ইলাহ কে?

‘ইলাহ’ (إلاه/إله) হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ (লিসানুল আরব)। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। হাফিজ আল-মুনযিরী হাইসাম থেকে বর্ণনা করেন যে হাইসামকে ‘আল্লাহ’ শব্দের উৎপত্তি বা ধাতুগত ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটা মূলত ছিল إلاهٌ ‘ইলাহ’। তারপর এই শব্দে নিদিষ্ট-সন্ধিকা (definite article) ‘আল’ সংযুক্ত হলে তা হল أَلإلاهُ ‘আল-ইলাহ’। তারপর ‘আল’ এর পরের (إ) হামযাকে (আলিফকে) সরানো হলে হামযার অবশিষ্ট কাসরা (ِ ) বা যের-এর সাথে মিলে শব্দটির রূপ হয় أَلِلاهٌ ‘আলিলাহ’। কিন্তু নির্দিষ্ট-সন্ধিকার ‘লাম’ যেহেতু সুকুনযুক্ত (সাকিনযুক্ত) তাই প্রথম ‘লাম’কে দ্বিতীয় লামের সাথে সংযুক্ত করা হয় এবং এতে (অর্থাৎ এই তাহলীলের) পরে শব্দটি হয় الله ‘আল্লাহ’ (লিসানুল আরব)। ‘ইলাহ’ শব্দটি ‘ফিআল’ (فعال) শব্দের ওজনে বা মাপে হয়। অর্থের দিক থেকে তা মাফউল অর্থের (مفعول/grammatically passive particle/ অর্থাৎ যে জিনিসকে কেন্দ্র করে ক্রিয়া সম্পাদিত হয়েছে সেই জিনিস)। ‘ইলাহ’ মানি মা’বুদ, যার ইবাদত করা হয়। আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্যই হয় ইবাদত। আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করা হয় সেইসব ব্যক্তি/বস্তু উপাসকদের ‘ইলাহ’। এই শব্দের বহুবচন হচ্ছে ‘আলিহাহ’ (آلهة)।

আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের ইলাহ হচ্ছেন একমাত্র ইলাহ। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরম করুণাময়, দয়ালু’ (২:১৬৩)। ‘আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কোনো ইলাহ দাড় করে নিও না, কেননা এতে তুমি নিন্দিত, নিঃসহায় হয়ে পড়বে’ (১৭:২২)।

আল্লাহ আরও বলেন, ‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকর্তা। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই’ (৭৩:৯)। ‘তিনিই নভোমন্ডলে ইলাহ এবং তিনিই ভূমণ্ডলে ইলাহ। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ’ (৪৩:৮৪)।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই -এই সত্যটি প্রকাশ করতে আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দান করেছেন। এই সাক্ষ্যের গাম্ভীর্য, ওজন ও তাৎপর্য লক্ষণীয়:   ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দেন যে তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়’ (৩:১৮)।

এই আয়াতে ফেরেস্তা ছাড়াও আলিমগণের (উলুল ইলম) এবং জ্ঞানের (ইলমের) মর্যাদাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

বানোয়াট ইলাহ ও প্রতারণা

‘ফিরাউন বলেছিল, হে আমার সভাসদগণ, আমি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ আছেন বলে জানি না’ (২৮:৩৮)। যুগে যুগে একদল লোক অপর দলকে আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছে। তাদের আনুগত্যের মাধ্যমেই ওদের সুখ/শান্তি নিহিত দেখিয়েছে। কিন্তু এতে ব্যক্তি  ও সমাজ প্রতারিত হয়েছে। ফিরাউনের আনুগত্যে সামাজিক ন্যায়-কল্যাণ কায়েম হতে পারেনি। সে কেবল তার ও তার শ্রেণীর ‘যোগ্য’ শাসনে এবং সেই ব্যবস্থার শ্রেণী বিন্যাসে তাদের শক্তি, শাসন ও ক্ষমতা জোরদার করেছে।  একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা কায়েম হতে পারে। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কেউ নিজেদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের মোকাবেলায় ইলাহ হিসেবে দাড় করাতে নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের মধ্যে যে কেহ বলে যে, তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত আমিই ইলাহ, তাকে আমি জাহান্নামের শাস্তি দেব। আমি জালেমদেরকে এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি (২১:২৯)।

এই প্রসঙ্গে ফিরাউন ও ফিরাউনী ব্যবস্থা একক বিষয় নয়। অপরাপর মানব-সৃষ্ট বন্দী দশা রয়েছে। শিকল রয়েছে। মানুষের বিপদ, আপদ, দুঃখ-দুর্দশা ও দুর্বল স্থানকে কেন্দ্র করে এগুলো গড়ে ওঠে। কোনো ব্যক্তি, বস্তু  বা সিস্টেমের সাথে মিথ্যা বিশ্বাস জুড়ে দিয়ে মুক্তির (emancipation/deliverance) ধোঁকা তৈরি হতে পারে। তারপর মানুষকে আল্লাহর ইবাদত/আনুগত্য থেকে বের করে এনে ব্যক্তি, বস্তু বা সিস্টেমের আনুগত্যে দাখিল করা হতে পারে। মানব জাতি তাদের দুর্বল স্থানেই শিকল-বন্দী হয়। অমূলক বিশ্বাসের সাথে আশা-আকাঙ্ক্ষা জুড়ে দিয়ে তাকে বস্তুর  মেজিক বুঝিয়ে দেয়া হয়। এতে প্রথা তৈরি হয়। এর ভিতরে ‘পুরোহিত’ আসে, দর্শন তৈরি হয়, সমর্থক বৃদ্ধি পায়।

বিস্তৃত প্রতারণা

আল্লাহকে বাদ দিয়ে, এর পিছনে, ওর পিছনে গিয়ে বিত্তের আশা, রোগ-মুক্তির আশা, সুখের আশা, দুঃখ নিরসন, দেশ ও দশের জন্য স্বর্গ রচনার ইজম (ism)  ইত্যাদিতে কেবল প্রতারণাই কাজ করতে দেখা যায়। আবার যেখানে সেখানে ‘মাক্বাম’ (মোকাম) তৈরি করে, যেকোনো বস্তুকে কেন্দ্র করে, কিছু গোজামিল-বিশ্বাস জুড়ে দিয়ে, আপনাতে বিদগ্ধ মানবমণ্ডলির রক্তচুষে যে প্রথা তৈরি হয় তা দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ব্যাপী কেবল মিথ্যা আশা ও ধোঁকার বিশ্বাস সঞ্চালন করা হয়। আপনি কেবল পান-শাহের মোকামের দিকে তাকালে চলবে না। এটাকে এবার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রসারিত করুন। দেখুন, দ্বীনহীন অঙ্গনে যা হচ্ছে সেই একই ধোঁকার ওয়াদায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যবস্থাপনা। এখানে যেমন আছে ভিন্ন ভিন্ন মোকাম ও পুরোহিত, সেখানেও আছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পুরোহিত ও তাদের প্রথা। এখানের মোকামের দায়িত্বে থাকা লোকগুলো যেভাবে ‘নিয়ম আত্মস্থ করে’ তাদের প্রথা চালিয়ে যায়, ওখানেও শিক্ষা ব্যবস্থা ও অপরাপর ‘নিয়ম আত্মস্থ করে’ সেই ধোঁকার বিশ্বাস ও ব্যবস্থা যুগপৎ চালিয়ে যাওয়া হয়। উভয় ব্যবস্থায় ‘মানুষ’ কালান্তরে প্রতারিত হয়।

আল্লাহকে ছেড়ে সেদিনের আরবগণ যাদেরকে ‘ইলাহ’ হিসেবে গ্রহণ ও বিবেচনা গ্রহণ করত, সেইসব সত্তাদের সাথে ‘সাহায্য’ প্রাপ্তির বিশ্বাস জুড়ে দিত;  ইজ্জত ও ক্ষমতা প্রাপ্তির ধারণাও জুড়ে দিত। এই কথাগুলো কোরানে এভাবে এসেছে, ‘তারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরাপর ইলাহ গ্রহণ করেছে যাতে তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হতে পারে’ (৩৬:৭৪)। এবং, ‘তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য ইলাহ গ্রহণ করেছে, যাতে তারা (অর্থাৎ সেই ইলাহগণ) তাদের জন্যে সাহায্যকারী হতে পারে’ (১৯:৮১)।

অথচ এই লোকগুলো আবার আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখত। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন  কে এই নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন,  কে চন্দ্র ও সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করছেন? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহ। তাহলে তারা কোন দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে’ (২৯:৬১)?

তাদের প্রতারণা ব্যবস্থায় আল্লাহর সৃষ্টি-কর্ম, জগত পরিচালনা ও প্রতিপালন বিষয়কে তারা আল্লাহর  উলুহিয়্যৎ(বা ইলাহের স্থান) থেকে আলাদা করত। এটাই ছিল শিরক। অংশিদারিত্ব। আল্লাহর উলুহিয়্যাতের আসনেই তারা দেব-দেবীদের বসাত। Homage জ্ঞাপন করা হত। ওদের ক্ষমতায় বিশ্বাস করত। এদের আরাধনা-উপাসনায় আপদে-বিপদে সাহায্য আসবে, ধনমাল বৃদ্ধি পাবে, মান-ইজ্জত বর্ধিত হবে এবং সর্বোপরি ওরা কাল-কিয়ামতে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য শাফায়াৎ করবে, মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে –এইসব বিশ্বাস রাখত। আজকের ফালতু মোকামগুলোতে গিয়ে দেখুন কী অবস্থা। রাজনৈতিক দলের বিশ্বাস ও প্রথার দিকে তাকান। দেখুন, পার্থক্যটা কোথায় –যদি একান্ত থেকেই থাকে। মূলত মানুষকে এইসব প্রতারণা থেকে বের করে আনতেই এসেছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ -আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ/মা‘বুদ নেই –এই কলিমার আহবান।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.