«

»

Nov ১৩

আবহমান কালের বাঙালীয়ানা -ধোঁয়াকুণ্ডের পশ্চাৎ দিকে কি?

[প্রথম প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০১৪]

রাগ –পটমঞ্জরী  

ভাব ণ হোই অভাব ণ যাই

আইস সংবোহেঁ কো পতিআই  ||ধ্রু||

লুই ভণই বট দূলক্খ বিণাণা।

তিঅ ধাএ বিলসই উহ লাগে ণা ||ধ্রু||

জাহের বাণচিহ্ন রুব ণ জানি

সো কইসে আগম বেএঁ  বখাণী  ||ধ্রু||

কাহেরে কিষভণি মই দিবি পিরিচ্ছা

উদক চান্দ জিম সাচ ন মিচ্ছা  ||ধ্রু||

লুই ভণই ভাবই কিয্

জা লই অচ্ছমতা হের উহ ণ দিস্  ||ধ্রু||  

 

উপরের কবিতার মত যে লেখাটি দেখাচ্ছে আমি তা প্রিন্ট করে আমাদের এক সাহিত্য বৈঠকে নিয়ে যাই এবং সবাইকে একেক কপি দিয়ে জিজ্ঞেস করি কে কী বোঝেছেন। কেউ কিছুই বোঝেন নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা কি বাংলা? সবাই নির্দ্বিধায় বললেন ‘এটা বাংলা নয়’।  অতঃপর আমি বিষয়টি কিছুটা ব্যাখ্যা করার পর, সকলের মধ্য থেকে একজন বলেছিলেন, ‘আমি এটাই ভেবেছিলাম।’ তিনি এটা বলতে পেরেছিলেন এজন্য যে এ বিষয়ে tতার অনেক আগে পড়াশুনা ছিল, তাই স্মৃতিতে সামান্য হলেও ভেসে এসেছে।

পাঠকগণ দ্রুত এটি পড়ে নিজেদের অভিমত নিজেদের মনেই আপাতত রাখতে পারেন।

চর্যাপদ 

উপরে যে পদ বা গানটি দেখছেন সেটা চর্যাপদের একটি পদ। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী  নেপাল নরেশের পুস্তক সংগ্রহে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে ১৯১৬ সালে প্রকাশ করেন। এই চর্যাপদ বা চর্যাগীতিকে বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন লেখা বলে ‘বিবেচনা’ করা হয়। চর্যাপদের রচনাকাল ৮/৯ শো বছর আগের ‘ধরা’ হয় (চর্যাগীতি)। আবার কেউ কেউ এই সময় সীমাকে ৮ শো থেকে ১২ শো বছরের  ভিতর স্থাপন করেন।  ((হালদার, গো. (১৯৮০) বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা, ঢাকা: মুক্তধারা))। তবে, লেখকের ধারণা ‘চর্যাপদের মূল পূঁথিখানি ১৪শো শতকের’ (প্রাগুক্ত ১৯৮০:১৮)। এ প্রসঙ্গে সকলের ধারণা আনুমানিক। 

চর্যার রচনা-কাল সুনির্দিষ্ট নয়। এগুলো কোনো এক সিদ্ধাচার্যের নয়। বরং অনেকের। ‘সর্বমোট ৪৬/৪৭ চর্যায় ২৪ জন পদকের (সিদ্ধাচার্যের) নাম পাওয়া যায়। বাকীরা বিস্মৃত। অথবা এই ২৪ জনই তাদের তাদের পূর্ব সিদ্ধাচার্যদের পদ মৌখিকভাবে নিজেদের লেখায় স্থান দিয়েছেন। পূর্বেকার যুগে প্রথমত অনেক বাণী, শ্লোক ইত্যাদি মৌখিক পদ্ধতিতে গুরু থেকে শিষ্যে পরিবাহিত হত এবং এক পর্যায়ে তা লিখিত আকার ধারণ করত’ (প্রাগুক্ত)।

কিন্তু লেখাটি ৭/৮ শো বছরের হোক, অথবা কম/বেশ, তা যে তখনো ‘আমাদের’ বাংলার রূপ লাভ করেনি –একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অর্থাৎ চর্যাপদকে ‘আমাদের’ বাংলা বলা যায় না। ভাষার সেই পর্যায় থেকে আমাদের পর্যায়ে উপনীত হতে, কমসে-কম, আরও দেড়-দুই শতকের প্রয়োজন ছিল বা তার চেয়েও বেশি। মূল কথা হল ৭/৮ শো বছর আগে আমাদের এই ‘বাংলা ভাষা’ ছিল না। এটা তখনও গঠিত হওয়ার পথে বা তখনও গঠিত হচ্ছে। এবারে বিবেচনা করুন, ‘বাংলা ভাষা’ যদি জাতি সত্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়, তবে তখনও এই দেশে কোনো বাঙ্গালী নেই। চৌদ্দ শতক থেকে ধরলে ‘আমাদের’ বাংলার বয়স হয় ৬ শো বছর। তবে যখন থেকেই ধরুন না কেন,  মনে রাখতে হবে যে যে টেক্সট “বোধগম্য” নয়, যা বুঝিয়ে দিতে “অনুবাদ” করতে হয়, সেটা মূলত ‘আমাদের পর্যায়ের’ বাংলা নয়।

আবহমান কালের বাঙালীদেশ

এবারে আমাদের আবহমান কালের বাঙালী-সত্তা ও আমাদের একক দেশটি কোথায় তা দেখা যাক। হালদার (১৯৭৪: ৩-৪) বলেন, ‘যাঁরা বাঙলা দেশের অধিবাসী তাঁরা এই বাঙলা ভাষা বলতেন না, মূলত তাঁরা ‘হিন্দু-আর্য-ভাষী’ ছিলেন না।’ হালদার সাহেব একটু অগ্রসর হলে বলতে পারতেন, এটা ছিল দ্রাবিড়, অনার্য লোকের বসতি, কিন্তু তিনি সেদিকে যাননি। অতঃপর তিনি গারো, বডো, কোচ, মেছ, কাছারি, টিপরাই, চমকা প্রভৃতির নাম উল্লেখ করে বলেন,  ‘ শুধু নানা ভাষাই যে এই বাঙলা দেশে প্রাচীনতম কালে চলত তা নয়, দেশটাও ছিল নানা জাতি-উপজাতির বাসভূমি: বাঙালী বলে একটা গোটা জাতও তাই তখনও পর্যন্ত জন্মায়নি। ‘রাঢ়’ ‘সুহ্ম’ ‘পুন্ড্র’ ‘বঙ্গ’ প্রভৃতি প্রাচীন শব্দগুলি প্রথম দিকে বুঝাত বিশেষ বিশেষ জাতি বা উপজাতিকে।’  

‘ব্রিটিশ-পূর্বকালে আজকের বাংলাভাষী অঞ্চল কখনো একচ্ছত্র শাসনে ছিল বলে প্রমাণ নেই। কাজেই বাঙলার সার্বিক ধারণা কল্পনা-সম্ভব, বাস্তব নয়। আমরা যখন বাঙলার আদি ইতিহাসের কথা বলি, তখন আবেগবশে সত্যকে অতিক্রম করে যাই, কেননা, জানা তথ্য আমাদেরকে সে অধিকার দেয় না। পূর্বে যেমন রাঢ়, সুহ্ম, পুণ্ড্র, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিখেল প্রভৃতি নামে বিভিন্ন অঞ্চল পরিচিত ছিল, কোন একক নামে বা একক শাসনে গোটা আধুনিক বাঙলা কখনো অভিহিত বা প্রশাসিত ছিল না, তেমনি তুর্কী আমল থেকে ১৯০৫ সাল অবধি ‘সুবাহ বাঙলা’র প্রায়ই অপরিহার্য অঙ্গরূপে থাকত বিহার-ওড়িশ্যাও। … অতএব তুর্কী বিজয়ের অব্যবহিত পূর্বাবধি বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাসও কখনো নামসার, কখনো বা কঙ্কালসার। এই রাজারা কি দেশী? মৌর্য-কাম্ব-শুঙ্গ-গুপ্ত-পাল-সেনেরা ছিলেন বিদেশী’ ((শরীফ, আ.(১৯৯২). বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব। কলিকাতা: সাহিত্যলোক,  পৃ.৫))

আমাদের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কেবল চৌদ্দ শতকেই তিনটি রাজ্য ছিল: লাউড়, গৌড় ও জৈন্তা। এর পিছনে গেলে আরও ভিন্ন চিত্র পাই। ((চৌধুরী, দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন, (১৯৯৭). ঢাকা: বাংলা একাডেমী, পৃ.২))।

এখানে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার বছর আগে বাঙলা ভাষা ছিল না এবং বাঙালী জাতিও ছিল না, এই বৈশিষ্ট্য ও একক শাসনের দেশও ছিল না। তবে, এই অঞ্চলে জনবসতি ছিল এবং তারা বিভিন্ন জাত-উপজাতের লোক ছিলেন এবং তারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতেন। সার্বিকভাবে, বর্ণ-হিন্দুদের বাদ দিয়ে, এই জনগোষ্ঠীর লোক ছিল অনার্য শ্রেণীর –প্রধানত দ্রাবিড়। এরা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছিল, অপরাপর জাতি-উপজাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছিল, কালের আবর্তে এবং ছিন্ন যোগাযোগের ফলে ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও আচার-আচার্যে বিভিন্নতা এসেছিল। ধরা হয় মগধ অঞ্চলের দ্রাবিড় সভ্যদের ভাষা ছিল প্রাকৃত যা খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে চলে আসছিল (আনুমানিক) এবং অনেক পরবর্তীতে এটিই বাঙলার আদি উৎস হয়ে ওঠে। এর সাথে খৃষ্টপূর্ব আনুমানিক ৬০০ শো অব্দ থেকে, মতান্তরে ২০০ অব্দ থেকে চলে আসা পালি ভাষাকেও সংযুক্ত করা হয়। পালিতে সংস্কৃতের মিশ্রণ ছিল বলে ধারণা করা হয় এবং পরবর্তীতে উদ্ভূত সংস্কৃত-বিবর্জিত ভাষা ছিল বৌদ্ধদের। এই দু’ইয়ের সমন্বয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠছিল বাংলা ভাষার ভিত্তি, যা উপরে আলোচিত হয়েছে।  একটি নতুন ভাষা গড়ে ওঠতে যে অনেক সময়ের প্রয়োজন সে কথা না বললেই চলে। 

কল্পনা প্রসূত আবহমান -ইতিহাস নিয়ে রাজনীতিগণবিভ্রান্তি

উল্লেখ হয়েছে যে ব্রিটিশ-পূর্বকালে আজকের বাংলাভাষী অঞ্চল কখনো "একচ্ছত্র" শাসনে ছিল না, এদিক থেকে এমন সার্বিক ধারণা কল্পনা-সম্ভব, বাস্তব নয় (আহমদ শরীফ)। আমরা জানি যে কালের আবর্তনে বিভিন্ন ভূখণ্ডে মানুষের বিভিন্ন পরিচিতি ছিল। এসবে রয়েছে জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের রূপ এবং কালের আবর্তনে এগুলোর পরিবর্তন-বিবর্তন। জয়-পরাজয়ে, প্রাকৃতিক তাণ্ডবে, সুযোগে-বিপর্যয়ে মানুষের স্থানান্তর, বসতির মিশ্রণ, নতুন ও ভিন্ন পরিচিতি ইত্যাদি হয়েছে। মানব জাতির ইতিহাস এভাবেই গড়ে ওঠেছে।

কিন্তু ধরুন আজকের কোনো এক ভূখণ্ডে কোনো এক জাতি আছে, তাই তাদের পরিচিতি ধরে, কালের আবর্তে চলে যাওয়া, অত্র অঞ্চলের গোটা মানব-গোষ্ঠীকে কি বর্তমানের পরিচয়ে চিহ্নিত করতে হবে? অর্থাৎ আজ বাংলার ভূখণ্ডে বাঙ্গালী আছে, তাই কালের প্রবাহে এই ভূখণ্ডে যারাই ছিল বা এসেছিল সবাইকে কি বাঙালী ধরা হবে? এমনটি কেন করা হবে? আপনি বাঙালী, তাই ‘আপনার’ নিজ ঐতিহাসিক দীর্ঘ-সূত্রিতা প্রতিষ্ঠার জন্য? আপনার “জাতীয়তাবাদের” ঢঙ সাজাতে অপর গোষ্ঠীকে টেনে এনে আপনার জাতীয়তা  প্রমাণ করতে? ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে? এটা কি কোনো নৈতিক বিষয়? না, বরং যৌক্তিকতা অন্যত্র যা আমরা পরে বলছি।

যদি আপনি বলেন যে আপনি “আবহমান” কালের বাঙালি, তবে আপনাকে বলতে হবে, কোন কাল থেকে আপনার সেই “আবহমান” কাল। আপনার “বাঙালীত্বের” বৈশিষ্ট্য কি বা কি কি? না, ঘটনা কি এই যে কালের চক্রে যে’ই এই ভূখণ্ড অতিক্রম করে থাকবে তারাই বাঙালী? এটা নিশ্চয় যুক্তি নয়। তবে যুক্তি কোথায়?

বাঙালী জাতীয়তাদের আড়ালে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিমদের গণতান্ত্রিক শাসন অধিকার বানচাল

আজকের বাস্তবতায় বাংলাভাষী এক জনগোষ্ঠী ‘বাঙালী’ নামে পরিচিত। আমরা এই বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারি না। একটি দেশে বা জনপদে অনেক গোষ্ঠী, জাতি, উপজাতি এবং ভাষাও থাকতে পারে। আধুনিক ভৌগলিক জাতীয় রাষ্ট্রে (in modern territorial nation state) উল্লেখিত অনেক জাতি উপজাতি ভৌগলিক জাতীয়তার ভিত্তিতে বাস করেন। এই আঙ্গিকে বাংলাদেশের সকল নাগরিক, সকল জাতি উপজাতি, সকল ভাষিক লোকের পরিচিতি হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’।

এই দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ আবার মুসলমান। আধুনিক সমাজে যেহেতু অনেক গোষ্ঠীর লোক থাকতে পারে তাই এমন সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার এই গণতন্ত্র সংখ্যালঘিষ্ঠের নিরাপত্তা ও অধিকারকে নিশ্চিত  করে। ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ যদি ভিত্তি না হয়, তবে কাদের মূল্যবোধ, কাদের আদর্শ, কাদের নিয়ন্ত্রণে দেশ ও সমাজের ব্যবস্থাপনা সাজানো হবে? এটা হয় শক্তির মাধ্যমে হতে হবে, অর্থাৎ যাদের শক্তি আছে তাদের মতাদর্শে অথবা উল্লেখিত গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে। আমাদের বাংলাদেশ চলছে প্রথম ভিত্তিকে কেন্দ্র করে। এক শ্রেণীর সংখ্যালঘিষ্ঠদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আদর্শের ভিত্তিতে।

শক্তি ও কৌশল প্রয়োগে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমগণের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আদর্শকে দেশের শাসন ব্যবস্থা থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ‘উহ্য’ করে দিয়েছেন। তারা মুসলমানদের ধর্ম, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে প্রান্তিকতায়  টেনে (by marginalisation), “আবহমান” কালের বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের হাঁক-ডাক দিয়ে সেই যৌক্তিকতা দেখাচ্ছেন এবং এতে করেই, কৌশলে, মুসলিমদের গণতান্ত্রিক অধিকার স্থানভেদে খর্ব ও বঞ্চিত করছেন। কৌশলীদের কথা হচ্ছে আমরা ইসলামী মূল্যবোধ চাই না, বরং আমরা চাই আবহমান কালের বাঙালী মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং এসবের ভিত্তিতে সমাজ গঠন। আবহমান কালের বাঙালীয়ানা যে কোন চিজ তা নিশ্চয় পাঠকের মনে আছে। আজ আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে নানান কথার ধোঁয়া তুলে, একটি শ্রেণীর আদর্শকে পূজনীয় মূল্যে ধারণ করে (by deifying it), এবং স্থানভেদে নাস্তিকতার আড়ালে থেকেও, যে পৌত্তলিক প্রথার বিস্তার হচ্ছে, এগুলো জাতির সকল শ্রেণীতে গৃহীত হতে পারে না, যদি না তারা পৌত্তলিক হয়।

অধিকন্তু হাজার হাজার বছর আগের কিছু যদি থেকেও থাকে তবে তা কি এজন্য ধারণ করা হবে যে তা ‘পুরানো” বস্তু? এটা কি ধর্মীয় কোনো মূল্যবোধ? হাজার বছর আগের কোন বাঙালীর কাজ যদি অনুকরণীয় হয়, তবে আপনারটা হবে না কেন? আপনি কেন পরবর্তীদের জন্য অনুকরণীয় কিছু করে যাবেন না? এসবের মধ্যে যুক্তি নেই। যুক্তি কেবল একটাই। আর তা হচ্ছে ছদ্মরূপী পৌত্তলিকতা ও নাস্তিক্যবাদ। সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিকতা, জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থা থেকে ইসলামী মূল্যবোধ সরিয়ে রাখা, মুসলিমদের গণতান্ত্রিক শাসনাধিকার বঞ্চিত করা।   

সারাংশ

আবার “আবহমান” কালটিতে ফিরি। প্রশ্ন ছিল এটা কোন কাল? উত্তর হচ্ছে এটি ধাপ্পাবাজির কাল -নানান উপাদানের গোজামিলে গঠিত মগজ ধোলাইয়ের কাল। যেখানে “আবহমান” বলে কিছুই নির্ণীত নয়, সেই আনুমানিক কালের বাঙালী নিয়ে কী কথা হবে? কিন্তু যা স্পষ্ট তা হল এখানে হাজার বছরের বাংলা ভাষা নেই, বাঙালী নেই, সার্বিকভাবে একক শাসনের কোনো “বঙ্গাল-মুল্লুক” নেই। এসব আবিষ্কার হচ্ছে মুসলমানদের শাসন-অধিকার নাক করতে; মিছামিছি ঐতিহাসিকতার অবতারণায় তাদের বিপক্ষের মূল্যবোধে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে; তাদেরকে ঠকিয়ে দিতে; তাদেরকে অজুহাত দেখাতে; তাদের গণতান্ত্রিক সংখ্যা-গরিষ্ঠ-অধিকারকে খর্ব করতে। এই বাঙালীয়ানা হচ্ছে প্রতারণা। আমরা এখানে যৌক্তিকতাকে প্রেক্ষিত করছি। এর মাধ্যমে পৌত্তলিক ও নাস্তিক সম্প্রদায়ের মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সাজানোই হচ্ছে কৌশল। রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম সংখ্যা-গরিষ্ঠের উপস্থিতিই সমস্যা।

আজ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নামে বাংলাদেশে পৌত্তলিকতার প্রাচীন ভিত্তি সুদৃঢ় হচ্ছে। শাসন প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ সরানো হচ্ছে। ‘গণতান্ত্রিক পথ বেয়ে’ সমাজে শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনকে নৈতিক ভিত্তির উপর সাজাতে যারা রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করছেন তাদেরকে গণতান্ত্রিক পরিসর থেকে “নির্মূল” করা হচ্ছে। আজ দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায়  'সন্ত্রাসের' নামে ত্রাস সৃষ্টি হচ্ছে। তাদেরকে "বৈশ্বিক সন্ত্রাস" বক্তব্যের  বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠা করতে (to fit within the discourse of terrorism) প্রান্তিকতায় ঠেলে দেয়া হচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম নামক বৃহত্তর এক ওলামা প্রতিষ্ঠানকে কোণঠাসা ও কঠোর হস্তে দমন নীতির আওতাভুক্ত করা হয়েছে –তাদের উপর সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার এলজাম দেয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে যেসব উদ্দেশ্য লক্ষ্য করা যায় সেগুলো সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার “প্রকৃতি” বিষয়ক। আজ ইসলামের মোকাবেলায় যে আদর্শ ও শক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা, আইন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানাদি সাজানো হয়েছে এই ধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। সংজ্ঞা ভিত্তিকভাবে বাঙালীয়ানার যেকোনো আলোচনায় প্রতারকদের চেহারা প্রকাশ হয়ে পড়বে। কিন্তু সেই আলোচনায় না গিয়ে ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে, ইসলামী সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের রাজনীতিকে “সাম্প্রদায়িক” আখ্যা দিয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠ এক “সম্প্রদায়” এই চাতুরী করছে। এই হচ্ছে আবহমান কালের আভ্যন্তরীণ ‘গল্প’।

৭১ comments

Skip to comment form

  1. 27
    Madhumangal Saha

    জনাব Madhumangal Saha,
    আপনার মন্তব্য মুছে দিলাম। যেখানে-সেখানে কথা বলার আগে পড়াশুনা করুন। লিখা শিখুন। তারপর পরধর্ম সহিষ্ণু হোন। অপরের ব্লগে গিয়ে ফালতু কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকুন। আত্ম-সম্মানবোধ অর্জন করুন। অযথা সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ। -এম আহমদ।

  2. 26
    মহিউদ্দিন

    আপনার লিখাটি আরো একটু বৃহত্তর আঙ্গিনায় অর্থাৎ পুরা উপমহদেশকে সামনে রেখে দেখলে কেমন হয়? তাই নিচের ভিডিওটি কিছুটা প্রসঙ্গিক মনে হচ্ছে।

    https://youtu.be/fc2Qcca8xkE

  3. 25
    সত্য সন্ধানী

     আহমদ ভাই সালাম।

    খুবই যৌক্তিক লেখা সন্দেহ নেই। এই লেখাটা আমার মনে একটা একটা নিষিদ্ধ (!) প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখানে বিজ্ঞজনরা সমাধান দিয়ে বাধিত করবেন আশা করি। যদিও প্রশ্নটি কিছুটা অপ্রাসংগিক তবু সম্পর্ক হীন নয়!

    আচ্ছা সত্যি তো যদি আমাদের বাংলার জন্মই না হয় ৬/৭ শত বছর আগে, তাহলে এইযে বাঙালী  জাতি, সংস্কৃতিকে নিয়ে এত বেশি বাড়াবাড়ি হয় এর মানে কি? স্বাভাবিক ভাবে একটা প্রশ্ন এসে গেছে মনে আর সেটা হল বাংলাভাষার জন্মই যদি হাজার বছরের না হয় তবে কিসের ভিত্তিতে হাজার বছরের সেরা বাঙালী নির্বাচনের ভোট হয় এবং বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম, রবিন্দ্রনাথ ২য় আর নজরুল ৩য় হন?

    কিসের ভিত্তিতে এমন কান্ড হয়েছে এবং এ নিয়ে মাতামাতির শেষ নেই। হাজার বছরের সেরা বাঙালী কে নিয়ে একদল রাজনীতি ব্যবসায়ীর উচ্ছাসের ও শেষ নাই। এরা কি আসলেই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখেবি যে এই বাংলা আসলে আমাদের বাংলা নয়? যদি সেটা বাংলাই না হয় তবে কিসের হাজার বছরের বাঙালী  সত্বার ইতিহাস নিয়ে টানাটানি?

    বেশ ভয়ে নিয়ে প্রশ্নটা করলাম কারন এইসব প্রশ্ন নাকি এই দেশে করা বারন আর প্রশ্ন করলে গন্ধম খাবার পাপের মত কোন ট্যাগ লেগে যাওয়াটাও বিচিত্র নয়। যদি আমার প্রশ্ন এই পোষ্টে অপ্রাসংগিক বিতর্ক জন্ম দেয় তবে অন্য কোথাও আলোচনার অনুরোধ জানাচ্ছি আপনাকে।

    আপনি নিসচই বুঝেছেন যে আমি গন্ধম ফলের একাংশ খেয়ে ফেলেছি। জানিনা আরো কত প্রশ্নের উদয় হবে আমার মনে ভবিষ্যতে। আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুন সুস্থ রাখুন, আমীন!

    1. 25.1
      এম_আহমদ

      @সত্য সন্ধানী: ওয়া আলাইকুমস সালাম

      আপনার উভয় মন্তব্য নিয়ে কীভাবে কী বলব বুঝতে পারছি না। তবে অনেক কথায় সহমত পোষণ করছি তাই সেই থান থেকে কিছু কথা বর্ধিত করতে পারি।

      উপরের (১১.১.১.১) মন্তব্যে যা “বিজাতীয়” সংস্কৃতি বলছেন, তা’ই আপনার দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী “জাতীয়” সংস্কৃতি বলছে! তাদের অনেকের দৃষ্টিতে এই ভূখণ্ডে যা কিছু ইসলাম-পূর্ব তাই খাটি “বাঙ্গালী”! আবার ইদানীং তাদের মধ্যে আরেকটি গ্রুপ বলছে বাঙালীর কোন ধর্ম নাই, হতে পারে না! তাদের মধ্য আরেকটি স্বল্প সংখ্যক লোক রয়েছে যারা বলতে শুরু করেছে, ‘কবির কোন খোদা’ থাকতে পারে না। কিন্তু এরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত! তারাই কালচার ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনা করছে, তারাই মিডিয়ার কর্ণধার, তারাই জাতির “শিক্ষিত” লোক! অন্যরা কথা বলতে পারবে না কেননা ১৯৭১ তারা নাকি বাকিদের পরাজিত করে দেশ তাদেরই করেছে। সুতরাং পরাজিতের কোন কথা থাকতে পারে না। এই কথাটি অন্যভাবে দেখতে পারেন। ১৯৭১ ভারতের লঙ্কা বিজয় হয়েছিল। তারপর, তারা বিভীষণদের হাতে অর্পণ করেছে। সুতরাং ভারতের চ্যানেল নিয়ে কথা বলার খুব একটা অর্থ নেই।

      এখন আপনার ভাবনা হচ্ছে ইসলাম ও মুসলিম পরিচিতি কীভাবে থাকবে, এবং বিশেষ করে এই সাংস্কৃতিক সয়লাবে, আপনার মেয়ের ইসলামী ভবিষ্যৎ। সমাজ দার্শনিক দৃষ্টিতে বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থা ক্ষুদ্র সমাজ বা জনগোষ্ঠীকে সর্বদাই প্রভাবিত করে –এখানেই হচ্ছে আপনার জীবনাদর্শ নিয়ে বেঁচে থাকার বড় আশংকা। আমি নতুন কী আর বলব, যা বলার তা তো বিগত ৫ বছর ধরে এখানে বলে আসছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, যে শিক্ষা, আচরণ ও বিনোদন আপনার সমাজে লজ্জাষ্কর সেটি যদি হয় অন্যদের আবহমানকালের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একটি গোষ্ঠী যদি চায় আপনার জীবনাদর্শ ও বিশ্বাসকে এই মাটি থেকে উৎখাত করে দিতে তখন আপনি শঙ্কিত না হয়ে পারবেন না।

      এই লেখাটা আমার মনে একটা একটা নিষিদ্ধ (!) প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

      বাংলা ভাষার উদ্ভব, উন্নয়ন  ও কালীন প্রেক্ষিত নিয়ে এই লেখায় যা কিছু এসেছে তা অনেক মিথ্যাচারকে চাক্ষুষ করে তোলে। তবে আগামীতে অনেক কথা বলতে পারবেন না -ক্রাইম হবে। আজকে যে শ্রেণীটি তিলকে তাল করছে ও ইতিহাসকে বিকৃত করছে সেটা তাদের ঊর্ধ্বতন এক পর্যায়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাধারণ পর্যায়ে নিছক জাতীয় আবেগ। শেখ মুজিব এবং একাত্তরের বিষয় নিয়ে এই শ্রেণীটি যা কিছু মেনে নিতে বলবে, তা সেভাবে নিতে না পারলে, মুখ বন্ধ রাখতে হবে, না হলে জেলে যেতে হবে, নির্যাতিত হতে হবে, কেননা তা আইন বিরোধী হবে, রাষ্ট্রদ্রোহ হবে। কারণ লঙ্কা বিজয় ও বিভীষণের কথায় অনেকটা এসে গিয়েছে।

      শেষ মুজিব প্রথম দিকে একজন বড় রাজনীতিক বলে আখ্যায়িত হতে থাকেন, তারপর এখান থেকে বিশেষণ বর্ধিত হতেই থাকে। এক সময় যুগের শ্রেষ্ঠ, কালের শ্রেষ্ঠ, তারপর শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ, তারপর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ, এখন হাজার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ আখ্যায়িত হতে দেখা যায়।

      ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা এম আর মুকুল তার ‘ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা’ (১৯৯৯) পুস্তকে বিংশ শতাব্দীর ১০ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালীর একজন হিসেবে শেখ মুজিবুর রাহমানকে দেখেছেন মাত্র। এই দেখার পিছনেও সমাজ-রাজনৈতিক কারণ স্পষ্ট।

      তবে এসবের মধ্যে বাঙালীর ব্যক্তিপূজার প্রবণতা, এবং অনেকের নিজেদের ব্যক্তি সত্তার আপন পূজার প্রবণতাই বেশি কাজ করে। নিজেদের পূজার অর্থ হচ্ছে এভাবে: কোনো সভা সমিতিতে বক্তৃতার সময়, অথবা নিজেদের সংবাদ মাধ্যম ও ম্যাগাজিনে সৃষ্টিশৈলী পদ্ধতিতে শেখ মুজিবের গুণকীর্তন করে রচনা নামালে আপন শ্রেণীতে এক ধরণের ‘অবস্থান’ তৈরি হয়। তারপর এই ‘অবস্থান’ আরও বর্ধিত হয় যদি তাতে প্রতিপক্ষকে নিয়ে ব্যাঙ্গ-তিরস্কার, বিষোদ্গার, আক্রমণ বা গালাগালির সমন্বয় করে বক্তৃতা বা রচনার অলংকার বৃদ্ধি করা যায়।      

      আপনি আমার এই লেখাটি না পড়ে থাকলে দেখে নিতে পারেন।

       

      1. 25.1.1
        সত্য সন্ধানী

         আহমদ ভাই সালাম, বইয়ের প্রসংগ যখন এসে গেল তাই বলতেই হচ্ছে যে দুটি বই হাতে পেয়েছি। ডেড রেকনিং আর তাজউদ্দিন আহমদ নেতা ও পিতা। ডেড রেকনিং আগে ভাসাভাসা ভাবে পড়েছি। এখন দুটাই মন দিয়ে পড়ার ইচ্ছা আছে।

        ৭১ সম্পর্কে এই দুটো মতের বাইরে আরেকটা মত আছে যা হয়ত জনপ্রিয় নয়, বা তেমন প্রচলিত নয় কিন্তু অবশ্যই যৌক্তিক বলেই মনে হয়।শারমীন আহমেদের বইটায় নাকি সেটাই আছে। পড়ে দেখি আগে ভাল করে।

        এমন হতে পারে যিনি আজ দেশের মাথা তিনি না বুঝে বা না জেনেই এক দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার এমন হতে পারে রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই যেহেতু এই দেশে প্রধান দুটি ট্রাম কার্ড হল ধর্ম গেল কাফেরের হাতে এবং তুই নব্য রাজাকার।

        তাই হয়ত এক পক্ষ প্রথমটা ব্যবহার করার জন্য ২য় পক্ষ বাধ্য হচ্ছে ২য় টা আকড়ে ধরতে।

        যাই হোক আপনি সঠিক বলেছেন, এইখানে আর এই বিষয় নিয়ে আলাপ করাটা স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে, যেহেতু এই দোষে সাধারনত চুন থেকে পান খসলে আজকাল শাস্তি হচ্ছে।

        দেশ খারাপ চলছে না আগের চেয়ে যেমন ধরেন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি সহ অনেক কিছু। আবার ভাততের চ্যানেলের দৌরাত্ব সত্যি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে মনে মারাত্বক ভাবে।

        যাই হোক ভাই ইমেইলের মাধ্যমে কি আপনার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব? না হলে এখানেই কথাবার্তা চালাতে হবে, তবে অবশ্যই মেপে মেপে, যেহেতু বাক স্বাধীনতার (!?) দেশে বসবাস করছি!!

        আপনার রেফার করা লেখাটি ইনশাল্লাহ পড়ব কাল সকালে। ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।

        আল্লাহ আপনার  হেফাজত করুন,  আমীন।

      2. 25.1.2
        সত্য সন্ধানী

         আর ভাই কি বলব বলেন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রোজা থাকেন এবং বোরখা ছছাড়া বেবের হন না,এমন মহিলাদের কেও দেখি স্টার জলসা নিয়ে মেতে থাকতে।এটাই মনে হয় সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারন।

        বলাবলি করা হয় যে এখানে পরকিয়া শেখানো হয়, কিন্তু যারা ভাল তারা ভালই থাকবে।

        মুল সমস্যাটা এখানেই। কারা ভাল বা কারা ভাল থাকবে? জন্ম সুত্রে কেউ ভাল বা খারাপ হয় না, পরিবেশই মানুষকে ভাল মন্দ বানায়। আজ যিনি প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ভাল মানুষ, পরিবেশ পরিস্থিতি যে তাঁর সন্তান কে কুপথে ঠেলবে না তার নিশ্চয়তা তিনি/তারা পেলেন কিভাবে এটাই মাথায় আসে না।

        সম্ভবত এটাই আত্ম পুজা, যে তার বা তার পরিবারের লোক, তার সন্তান, ছোট ভাই বোন খারাপ কিছু করতেই পারে না। এই যে অতিরিক্ত আত্ম বিশ্বাস ( নাকি আত্ম অহংকার?) এটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পতন ডেকে আনে।

        তবু মানুষ শেখে না। এই যে ভারতীয় চ্যানেল গুলি সর্ব স্তরের মানুষ দেখছে এটার পিছনেও এই ধারনা কাজ করে যে আমার লোক খারাপ কাজ করবে না! এটাই হয়ত সবচেয়ে বড় বিপদ।

      3. 25.1.3
        সত্য সন্ধানী

         আরেকটি প্রশ্ন ছিল ভাই, আপনার মুল্যবান মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে।

        এইযে আমরা ছোট বেলা থেকেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে পড়ে আসি এবং এর নানা দিক নিয়ে কথার খই ফুটাই। আজ আমার কাছে সব একটু আজব লাগছে। এই দেশে যেহেতু সব কিছুই বিকৃত হয় তাই জানতে চাচ্ছিলাম।

        ভাষা নিয়ে জিন্নাহ আসলে কি বলেছিলেন? শুধু তো এটুকুই যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা? তিনি কি আর কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন? তিনি কি বাংলা সহ তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যান্য ভাষা যেমন পাঞ্জাবী, পশতু, সিন্ধি এইসব কে অস্বীকার করেছিলেন?

        সেখানে আমার প্রশ্ন হল অন্য ভাষাভাষীরাও কি বিক্ষোভ করেছিলেন নাকি শুধুই বাঙালী রা?

        আর যেখানে পাকিস্তানে তখন উর্দু ৫% লোকেরও নাকি মাতৃভাষা ছিল না সেখানে উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারন ভাষা হিসাবে ঘোষনা করে যদি অন্য ভাষাগুলি কে অস্বীকার না করা হয় তাহলে সমস্যা কোথায় বুঝতে পারছি না আমি। ভারতেও তো হিন্দি খুব কম লোকের মাতৃভাষা, তবু তো সেখানে হিন্দিই সরকারী ভাষা। তাহলে পাকিস্তানে উর্দু কমন ভাষা হলে সমস্যা কি ছিল?

        নাকি বাঙালী রা তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ছিল বলেই এই বিক্ষোভ?

        1. 25.1.3.1
          এম_আহমদ

          @সত্য সন্ধানী:

          হ্যাঁ, আপনার কথা ঠিক। আজ অনেক কিছুই বিকৃত। পাকিস্তান সৃষ্টির পর, প্রথমে, আন্দোলন আকারে, বড় ধরণের যে মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা শুরু হয় তা ছিল রাষ্ট্রভাষা নিয়ে, এর জের এখনো শেষ হয় নি। পাকিস্তানীদের ৫ ভাগ লোক যেভাবে উর্দু বলত সেই তুলনায় এদেশের অনেকের মধ্যে উর্দু ছিল। এদেশের আলেম উলামা, মাদ্রাসার ছাত্র সম্প্রদায়, বিহার ও ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে আসা লোকজন এবং আমলাদের একটি শ্রেণীতে উর্দু চলত। তাছাড়া এদেশের আলেমগণ তাদের ওয়াজ-নসিহতে উর্দু-ফার্সি থেকে দু/একটা বয়েত উদ্ধৃত করে তাদের বর্ণনাকে না পাজালে যেন আরামটাই আসত না।

          “ভাষা নিয়ে জিন্নাহ আসলে কি বলেছিলেন? শুধু তো এটুকুই যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা?” ঠিক বলেছেন। জিন্নাহর বক্তব্য প্রেক্ষিতগত হতে পারে এই পরিমাণ কথার কোন উল্লেখ সাধারণত দেখতে পাবেন না, কেননা প্রোপাগান্ডা প্রায়ই প্রেক্ষিত বর্জিত হয়। জিন্নাহ নিজেও সেই ৫ ভাগের বাইরের লোক। তার ভাষাও উর্দু ছিল না। তাই এখানে সাম্প্রদায়িক বিষয় থাকার কথা ছিল না।  

          সেদিনের রাষ্ট্র ভাষার বিতর্ক মূলত ১৯৩০ দশকের ল্যাজ ধরে এসেছিল। এটা প্রথমত ছিল অবিভক্ত ভারত স্বাধীন হলে উর্দু-হিন্দির বিষয় নিয়ে। কিন্তু দেশ ভাগ হলে সেই আলোচনা বাংলা উর্দুতে বসে পড়ে। উর্দু-হিন্দি বয়সের দিক থেকে অনেকটা সমসায়িক হলেও মূল থেকে উর্দুতে ইসলামী জ্ঞানের সঞ্চালন ও ধারা শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত উর্দুতে ইসলামী জ্ঞানের যে সম্ভার গড়ে উঠে তা বাংলায় হয়ে উঠে নি। বাংলা ইতিপূর্বে ইংরেজদের আনুকূল্যে হিন্দুদের প্রভাব ও দখলদারীতে বহমান হওয়ায় সেই ধারা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। বাংলাভাষী মুসলিমদের সাধারণভাবে আর্থিক অনুন্নয়ন বা গরীবী অবস্থাও ছিল আরেকটি অন্তরায়। এর তুলনায় উর্দুভাষীদের মধ্যে অনেক ধনাঢ্যতা থেকে যাওয়ায় উর্দুর স্রোতে ইসলামী জ্ঞান সঞ্চালিত হয় এবং এই ভাষাকে আলেমগণ (বাংলাভাষীসহ) তাদের মাদ্রাসায় শিক্ষার বাহন করে নেন। এদিক থেকে বাংলার কমিনিস্ট আন্দোলনকারীরা ও তাদের ঘরাণার ছোপা নাস্তিকরা উর্দুকে বুর্জোয়াদের ভাষা মনে করত এবং অনেক হিন্দু তাদের ধর্মীয় কারণে এর প্রতি বিরাগী ছিল।

          আজ ইংরেজি ও হিন্দি সারা বাঙলা জুড়ে যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তার কারণ কি এই দুই ভাষা বাংলার রাষ্ট্রভাষা? বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার ৬ দশক পার হলেও উচ্চশিক্ষিত ও ধনাঢ্যদের মধ্যে বাংলার কদর কি বেড়েছে? তাদের ছেলেমেয়েদের ভাষিক অবস্থান বর্তমানে কোথায় ও কেমন? এটা কি বলা যায় না যে বাংলাকে নিয়ে কেবল ‘রাজনীতি’ই হচ্ছে এবং আজও ভাষা দিবসে টেবিলে থাপ্পড় দিয়ে বক্তৃতা, ঈদের মত সাজগুজ এবং মিডিয়া কর্তৃক এনটারটেইনম্যান্টের বড় এক মৌসুমী আবহ –এগুলোই প্রধান হয়ে আছে। আবার অনেকের আমিত্ব প্রকাশের মওকাও।

          আপনি এ পর্যন্ত পড়ে না থাকলে বদর উদ্দিন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (৩ খণ্ডে) ও আহমদ রফিকের ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও উত্তরপ্রভাব’ –এই দুটি বই দেখতে পারেন। এখানে আমার একটি লেখা (পাকিস্তান ও শোষণের বক্তব্য) রয়েছে -এর মধ্যে ভাষা নিয়ে কিছু আলোচনা এসেছে, সেই স্থানটি দেখে নিতে পারেন। তাছাড়া চিত্রশিল্পী রনবীর কার্টুন চরিত্র ‘টোকাই’ ও বাংলা ভাষা নিয়ে অঙ্গিত কার্টুনগুলো পেলে দেখে নেবেন। কার্টুনের মাধ্যমে অনেক সত্য নগ্নভাবে উত্থাপন করা যায় যা হাজারো শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না। “টোকাই” নামে ৩ খণ্ডের একটি বই প্রকাশিত আছে যেখানে প্রায় সবগুলো কার্টুন স্থান পেয়েছে। লাইব্রেরীতে দেখে নিতে পারেন। ওখানে সমাজ, রাজনীতি ও ভাষার বিষয়টি অপূর্ব হয়ে ভেসে উঠেছে।

        2. সত্য সন্ধানী

           সালাম আহমদ ভাই, অনেক ধন্যবাদ ব্যাখ্যা করার জন্য এবং অন্য সাইটে আপনার লেখার লিংক দেবার জন্য।

          বই দুটি আমি যোগাড় করার চেষ্টা করব, অথবা পি ডি এফ ফাইল পেলে ডাউনলোড করে নেব ইনশাল্লাহ।কার্টুন টাও সংগ্রহের চেষ্টা করব।

          আসলেই ভাই আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় যা দাড়িয়েছে এতে অন্ধ মানুষও বুঝবে ভাষা আন্দোলনের অসারতার কথা, কারন এই দেশে বিশেষ করে ইংরেজী মিডিয়ামের ছেলে মেয়েদের মধ্যে বাংলা নামের ভাষাটি আর নেই।

          উপর দিকে থুতু ফেললে নিজের গায়ে এসেই পড়ে, আর এখানে ট্র‍্যাজেডী হল যে বা যারা ২১ ফেব্রুয়ারী আসলেই স্টেজ,পত্রিকার পাতা গরম করেন, তাদের ছেলে মেয়েরাই বাংলা ভাষা বলতে পারে না, যা বলে সেটা কে বাংলা বললে চর্যাপদের ভাষাটা দুঃখ পাবে।

          'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়' এই গানটি মনে হয় সবচেয়ে বেশি প্রতারনা মুলক যেটা আপনি আপনার লেখায় সুন্দর করে ব্যখ্যা দিয়েছেন।

          বাকি গুলো নিয়ে বলা এখানে বলা সমীচীন কিনা জানি না, তবে আনি দারুন ভাবে কনভিন্সড আপনার আজকের দেয়া লেখাটা পড়ার পর থেকে!

          সত্যি তো আজ তো সিলেটে সিলেটী ভাষা চলছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে পাহাড়ী ভাষা।

          আজ যদি বৈষম্যের ধুয়া তুলে এই দুটি এলাকা কিছু একটা করতে চায় সেখানে ঠেকাবেন কোন যুক্তি যে, যেহেতু ভাষাই নাকি একটি জাতির মুল ভিত্তি!!

          ভারতের কথা বাদ দিলাম,আমেরিকার কতগুলি ভাষা আছে? স্প্যানিশ হল ইংরেজীর  পর ২য় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষা, তাহলে এবার কি হবে?

          এগুলো সবাই বুঝে;সবচেয়ে ভাল বুঝে চক্রান্তকারীরা। কিন্তু সাধারন শিক্ষিত বাঙালি রাই এটা বুঝল না। জানি না সমস্যা টা আসলেই জেনেটিক কিনা।

          ৩০ লাখ শহীদের কথা নাই বা বললাম এটা ছোট বেলা থেকেই শুনছি আগে শুনতাম ২ লাখ মা বোনের কথা যেটা বেড়ে গিয়ে ৫ লাখে দাড়িয়েছে। এভাবেই সব পল্লবিত হয়,তিল তাল হয়ে উঠে।

          কোনটা বিশ্বাস করব? এত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা গুলো বললাম মনের ক্ষোভ সংক্ষেপে প্রকাশ করার জন্য। 

          আমি কখন থেকে ধাধার মধ্যে ছিলাম জানেন? যখন ডেড রেকনিং বইটি ভাসাভাসা ভাবে পড়ার পর এক কাজিনের সাথে মত বিনিময় করলাম তখন থেকে।

          সে উত্তর দিয়েছিল যে যেহেতু বাংলদেশে আমাদের দেশ, আর তাই শহীদের সংখ্যা যাই হোক আমরা বেশি করেই বলব এতেই দেশের লাভ! সেদিন খানিকটা ভ্যবাচাকা খেয়ে গেলেও প্রশ্ন করিনি। 

          আপনার ভায়াষ নিয়ে লেখাটা পড়ার পরেই অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করা শুরু করেছি।

          আজ বুঝেছি যে ছোট বেলা থেকেই শিখে এসেছি অনেক টা কমিউনিস্ট ভোটের কায়দায়, হয় আমাদের ভোট দাও, নয়ত ভোট দিও না; মানে আমি বা আমরা যা শেখাই সেটাই হল সঠিক,অন্য কিছু জানা বা জানতে চাওয়া পাপ!  আর তাই সুত্র যাচাই করে কোন জিনিস পড়ার বা জানার মানসিকতাই তৈরী হয়নি।

          অনেক ধন্যবাদ আপনাকে আবারো, আপনার এই পুরাতন লেখাটি আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে। সাথে আমাদের চারপাশের যে আধুনিকতার নামে প্রকাশ্যে আর গোপনে চলা বিজাতীয় নোংরামীর আতংংক।

          আসলে কি ভাই জানেন, তিতা হলেও সত্য কথা এই যে এই বাঙালি  জাতির জন্য সত্যি ভারতের পেটে যাবারই দরকার ছিল। কাশ্মীরের মুসলিম রা অযথা যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন সেইভাবে যদি বাঙালি ও নির্যাতিত হত আজ পর্যন্ত সেদিন তারা বুঝত সেক্যুলারিজম কি জিনিস। কনিজেকে, নিজের কালচার কে ভুলে যাবার ফল কি হতে পারে সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝত। দাদাদের পা চাটা যে কুকুর গুলোও আছে তারাও  দাদাদের পায়ের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে বুঝে যেত ধর্ম নিরপেক্ষতা কাকে বলে, আর বিজাতীয় নির্যাতন কাকে বলে।

          দোয়া করি আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুন আমীন।

           

      4. 25.1.4
        সত্য সন্ধানী

             ভাই, দুঃখিত আপনার মন্তব্যে একটি জিনিস আমার চোখ এড়িয়ে গেছিল।

        তাহলে চরম পত্রের পরিচালক এম আর আখতার মুকুল কিনা শেখ সাহেব কে বিংশ শতাব্দীর সেরা দশজন বাঙালিরর একজন হিসাবে দেখেছেন!তথ্যটা জানাবার জন্য ধন্যবাদ! 

        তাহলে কিসের ভিত্তিতে এত বড় বড় কথা আমাদের শুনানো এবং শেখানো হয়েছে, আর কিসের ভিত্তিতে এই মুখজোর! আজ তো মনে হচ্ছে যে সুক্ষ অনেক জিনিস এড়িয়ে শুধু ভুলটাই শিখেছি! শেরে বাংলার কথাটা অন্তত সবার মাথায় রাখা উচিত। রাজনিতি বিদ হিসাবে বা মানুষ হিসাবে তিনি বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সেরা ব্যক্তি!! তাহলে অন্তত তাঁর কথাটা আমাদের মনে আসেনি কেন!!

  4. 24
    এম_আহমদ

    ইতিহাসের বিজ্ঞ পাঠকমহল এবং যারা বিগত ৪০/৪৫ বছরের বাস্তবতার সাক্ষী তারা লক্ষ্য করে থাকবেন যে একটি বিশেষ পৌত্তলিক মহল এবং পৌত্তলিকতা প্রভাবিত মুসলিম ও নাস্তিকমহল ম্লেচ্ছ-যবনের শব্দাবলী ধীরে ধীরে ও কৌশলে তৎসম, তদ্ভব বা হিন্দি শব্দে প্রতিস্থাপন করে আসছেন। আজকাল সভাসমিতিতে জনাব শব্দের পরিবর্তে 'মহাত্মন'ও এসেছে কেননা বাঙ্গালী জাতীয় সত্তায় তার 'নিজ' (!) সংস্কৃতি ও ইতিহাস (!), ঐতিহ্যের (!) প্রতিফলন চাই। কিন্তু এই যুক্তি কেবল এই একটি শব্দ:”শহীদ” এর বেলায় নির্লজ্জভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। এই শব্দের কোনো বিকল্প বা প্রতিশব্দ কি বাংলার আবহমানকালের (!) সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে নেই যে তা ম্লেচ্ছ-যবনের ধর্মীয় ধারণা ও ৭০ হুরের কাহিনীতে প্রোথিত শব্দে গৃহিত হবে যে হুর আর স্বর্গবিলাস নিয়ে ল্যাজে-গোবরে-পাছা-বিশিষ্ট সংস্কৃতি ও মিডিয়াকর্মী ছানুগণ হাস্যরসিকতাও করেন?

    এই একটি রিপোর্ট যা সামাজিক মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, যেখানে এবং দেশের সরকারী অনেক স্থানে অবিশ্বাসীদেরকেও শহীদ বানানো হচ্ছে। কিন্তু উতবাহ বিন রাবিয়াহ, শাইবাহ বিন রাবিয়াহ, মুয়াবিয়া বিন আমির, উমাইয়্যা বিন খালাফ, নাদর বিন হারিস এবং আরও অনেক বীর যোদ্ধা যারা তাদের পৌত্তলিক সংষ্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের জন্য বিপুল সম্পদ ব্যয়সহ তলোয়ার হাতে মৃত্যুবরণ করল (কেবল বদরেই), যাদের তুলনা অনেক বঙ্গাল-ছানুর অনেক ঊর্ধ্বে, তারা তাদের নিজেদের ভাষার শব্দটি থেকে মাহরূম থাকল এবং এখনো সেই শব্দটি তাদের বেলায় প্রয়োগ না হয়ে সুদূরের বাঙ্গলায় পৌত্তলিক এবং ইসলাম বিদ্বেষীদের ব্যাপারে প্রয়োগ হয়ে যায়?

  5. 23
    এম_আহমদ

    এই প্রসঙ্গে এবনে গোলাম সামাদ এঁর লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই লিঙ্ক করে রাখলাম। ভবিষ্যতে এর উপর আর কিছু লিখলে কাজে আসবে।

    বাংলা অক্ষরের উদ্ভব হয়েছে ব্রাহ্মী অক্ষর থেকে। সম্রাট অশোক তার সম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় প্রধানত ব্রাহ্মী অক্ষরে ওই সব অঞ্চলের প্রচলিত ভাষায় দিয়েছেন তার অনুশাসন (আদেশ, নির্দেশ, উপদেশ)। অশোকের সাম্রাজ্য ছিল বিশাল; বর্তমান পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে চুনাপাথরের পিণ্ডের ওপর লিখিত অশোকের একটি অনুশাসন পাওয়া গেছে, যা ব্রাহ্মী অক্ষরে এবং অশোক প্রাকৃতে লেখা। অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয় …

    ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চলেছিল নুরুল আমিন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে; পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে নয়। কিন্তু এখন অনেকের লেখা পড়লে মনে হয়, গুলি চলেছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে। সেটা আদৌ সত্য নয়। পূর্ব বাংলায় যদি নুরুর আমিন সরকার না থেকে অন্য কোনো সরকার থাকতেন, তবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা বন্ধ করার জন্য দিতেন গুলি চালাবার নির্দেশ। নুরুল আমিনকে এখন যেভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে, তিনি সম্ভবত অতটা খারাপ ব্যক্তি ছিলেন না। কেননা, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি কোনো কারচুপি করেননি। তাই জিততে পেরেছিল যুক্তফ্রন্ট। তিনি এ সময় দিয়েছিলেন যথেষ্ট গণতন্ত্রী মনের পরিচয়। হতে দিয়েছিলেন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন। পুলিশ ছাত্র মিছিলে গুলি চালিয়েছিল, কিন্তু পুলিশ প্রশাসন গুলি চালিয়েছিল যথেষ্ট সাবধানে। না হলে আরো অনেক ছাত্র প্রাণ হারাতেন। ২১ ফেব্রুয়ারিতে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তারা কেউই ছিলেন না ছাত্র মিছিলে। একজন দাঁড়িয়েছিলেন পথের ধারে। আরেকজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে। আর একজন ছিলেন মেডিক্যাল হোস্টেলের ভেতরে। তখন পুলিশ প্রশাসন বিশেষভাবে মেনে চলতেন ব্রিটিশ শাসন আমলের বেঙ্গল পুলিশ কোড। তারা বেপরোয়া ছিলেন না। তারা বেপরোয়া হলে শহীদের সংখ্যা যে বাড়ত, সেটা সহজেই অনুমান করা চলে।

    http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/95201

     

  6. 22
    এম_আহমদ

    @শাহবাজ ভাই। আজ একটি ভিডিও নজরে এল। আমাদের পুর্ব আলোচনায় এটি অত্যন্ত জরুরি। দেখুন এখানে https://www.youtube.com/watch?t=85&v=SoI-Qh_T0GA

  7. 21
    এম_আহমদ
  8. 20
    এম_আহমদ

    যারা ১৯৪৭ সালের পর থেকে দুই বাংলা প্রশ্নের ইতিহাস ও পটভূমি সম্পর্কে খুব একটা অয়াকিফহাল নন, তারা ইদানীং যেসব লেখা দুই বাংলা নিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলো একটু মনযোগ দিয়ে দেখবেন।

    1. ‘দুই জার্মানি এক হতে পারলে দুই বাংলা নয় কেনো?’

    2a. দুই বাংলাকে এক করে দাও –এটাই আমাদের স্বপ্ন  

    2b. https://www.youtube.com/watch?v=XIu3cMZD3zw#t=16  (this link is not working now)

    new link: https://www.youtube.com/watch?v=3q6tas6A1F8

     

  9. 19
    এম_আহমদ

    [নতুন সংযোজন। সবাইকে পাঠের আহবান। এটা ১৭.২ সাথে পাঠ হবে।] শাহবাজ ভাই, প্রাকৃত ও পালি ভাষা আগের, না সংস্কৃত আগের এই প্রসঙ্গে যে বিবর্তনবাদী ইউরো-ভারতী আর্য থিওরি Max Muller and G.A. Grierson উপাস্থপন করেছিলেন সেই বিষয়ে এবং আরও দু/একটি পয়েন্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধ করছি। সাথে আরও কিছু প্রসঙ্গ থাকবে।

    কথাগুলো ড. মুনিম চৌধুরীর (২০০৮:৩২) লেখার ধারা থেকে শুরু করি। “The academic study of Buddhism that Burnouf’s [Eugène Burnouf, 1801-1852] seminal work generated initially remained preoccupied with the question as to which of the two versions, the Pali or the Sanskrit, was the older. It was not until   the 1870s that the Pali version were regarded as the earliest” [cited from D. Burnett, 1996:250].

    আসলে জার্মান ওরিয়ান্টালিস্ট ম্যাক্স মুলার এই থিওরি দিয়ে যাচ্ছিলেন যে ভারতী, গ্রীক, রোমান, দাস-দাসী, কেল্ট (Celts), জার্মান –এই সব জাতের লোকজন কোন এক কালে একই ভূখণ্ডে বাস করে থাকবেন এবং কালের ইতিহাসে সেমিটিক ও তুরানীয়ানের  মোকাবেলায়ে প্রথমোক্ত আর্যজাতি শাসকের ভূমিকায় আসে। পরে মুলার ফরাসী-জার্মান যুদ্ধের পরে ১৮৭১ সালে তার এই দাবী থেকে সরে আসেন কিন্তু পাঠ্যপুস্তকগুলোতে আগের ভার্সন চলতে থাকে। আর্য জাতের পক্ষে এইসব unsubstantiated দাবী ফরাসী চিন্তাবিদ জ্যোঁ ফিনো (Jean Finot) তীব্র সমালোচনা করেন।

    মুমিন চৌধুরী (২০০৮:৩৪) তারিনীচরণের মত এভাবে উল্লেখ করেন, “Take the theory of Indo-European race and language. The logical-empirical character of the Orientalists’ claim of common Indo-European racial and linguistic ancestry is a tissue of interferences underpinned by an almost compelling but surely false logic of its own. Apart from certain selective philological commonality, there is no evidence that an original common language ever existed, or that there  was ever an original home to enclose a father-race. Nor is there any trace of the supposed transcontinental migration in the archaeological record [Ref. cited as E. leach in E. Ohnuki-Tierney 1990, C. Renfrew 1987].

    … Human societies are not organism of Social Darwinism stipulation, nor are the languages instinctively produced sound bites of human sub-species” (Munim Choudhury, 2008:34-35).

    তারপরের বাস্তবতা এভাবে উল্লেখ হয়, “… the commonplace histories of the origin and development of Bengali continues to approach their subject, in the main, from the Social Darwinist organic perspective of Max Muller and George Grierson. These focus on Bengali’s supposed birth-time from one or the other Prakrit and chart the stages in the modification of its grammatical rules and phonology. After all these laborious efforts a big gaping hole remains. Whereas their theoretical perspective anticipates progressive distancing between Sanskrit and Bengali, their charted development of Bengali shows the opposite. Revealingly, later in his life Grierson pointed to the real reason for this when he noted that it was the ‘Sanskrit-ridden pandits’  who virtually rewrote the Bengali print language during nineteenth century.

    “… something like ninety per cent of the genuine Bengali vocabulary was excluded, and its place supplied by words borrowed from Sanskrit, which the writers themselves could not pronounce. … under such circumstances literary Bengali is divorced from the comprehension of every native to whom it has not been specially taught” [citation from G.A. Grierson, 1912:251].

    এই যে এভাবে ভাষাকে “শুদ্ধ” করা হল, এর ফলে বাংলা ভাষী সর্বসাধারণ একটা বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত পড়াশুনা না করে এই বাংলা সঠিক ও সহজভাবে  বুঝা যেত না। আমাদের সাধারণ লোক এখনো বলতে শুনা যায়, “ভাই আমি ‘শুদ্ধ’ ভাষায় কথা বলতে জানি না।” আহারে! তার শুদ্ধ ভাষাকে আবার কারা ‘শুদ্ধ’ করে দিল? এটা কি উর্দুভাষীরা করে দিয়েছিল? মুসলমানদের হাতে কারো ভাষা নষ্ট নয় নি, বরং উন্নয়নই হয়েছিল।  

    হোসেন শাহের আমলে বাংলার উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল এবং তা সকলের জন্য। দেশে যখন শান্তি ও নিরাপত্তা আসে তখন মানুষ তার হাতের ‘সময়কে’ নিয়ে সৃষ্টিশৈলী কাজ করতে পারে। এতে শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি গড়ে উঠার সুযোগ হয়। “গোড়ের বাদশা হোসেন শা’র শান্তিময় শাসনের ফলে দেশে আবার শাস্ত্রচর্চার সুবিধা হইয়াছিল; নবদ্বীপেও ক্রমশ অনেক পণ্ডিতের আর্ভিভাব হইল” (কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০০২:৫২)।

    কিন্তু হোসেন শাহের বিরুদ্ধেও একটি পক্ষ প্রোপাগান্ডা করেছিল।জয়ানন্দ লিখেন:  

    নবদ্বীপে শঙ্খধ্বনি শুনে যার ঘরে

    ধন প্রাণ লয় তার জাতি নাশ করে||     

    দেউল দেহারা ভাঙ্গে উপাড়ে তুলসী

    প্রাণভয়ে স্থির নহে নবদ্বীপবাসী||

    ‘পিরল্যা’ গ্রামেতে বৈসে যতেক যবন

    উচ্ছন্ন করিল নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ||  

    এসব প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় (২০০২:৫৫) বলেন, “জয়ানন্দ নবদ্বীপ হইতে দূরে বাস করিতেন; কাহারও নিকট গল্প শুনিয়া এই সমস্ত কথা লিখিয়া থাকিবেন। প্রামাণিক বৈষ্ণব কাব্য চৈতন্য ভাগবতে বা রচিতামৃতে নিজ নবদ্বীপে যবনের অত্যাচারের কথা দূরে থাকুক, মুসলমান রাজপুরুষের প্রশংসা আছে।”

    নবদ্বীপে যখন দলে দলে শ্রীচৈতন্যের (তখনও শ্রীচৈতন্য নামধারিত হয় নি) হরি নামে সংকীর্তন যাত্রা দিনের পর দিন করে চলত, সেখানে ও রাজার কাজির কোনো বাধা ছিল না। অনেক সময় উত্যক্তও করা হত, তবে কাজি ধরে নিতেন ওরা হরি নামের অত্যধিক ভাবোচ্ছ্বাসে তা করে ফেলছে। “কীর্তনের দল একদিন কাজির বাটি পর্যন্ত ধাওয়া করিল। কাজি পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন; তিনি এ ভক্তদলের সম্মানই করিয়া ছিলেন” [টিকা, এই কাজি হোসেন শা’র শিক্ষক মওলানা সিয়াজুদ্দিন] (কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০০২:৬৩)। [স্মরণ রাখবেন, এই মধ্যযুগেও ‘মাওলানা’ ছিল, এম_আহমদ।] 

    শাহবাজ ভাই, এসব নিয়ে লিখতে থাকলে সারা বছরই লিখা যাবে। কিন্তু সমস্যা হল দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমনসব লোকদের কব্জায় যারা ব্রাহ্মণবাদী ধারার, যারা ব্রাহ্মণ্য প্রভাবিত সাংস্কৃতিক মুসলিম, যারা বিবর্তনবাদী নাস্তিক এবং আরেক দল এদের ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে চাকুরী রক্ষার্থে আত্মসমর্পিত হয়ে প্রচলিত ধারার। এই বাংলা আর মুসলমানদের নিয়ে যত ‘পরিকল্পনা’। আজও তা শেষ হচ্ছে না। এখন “সাম্প্রদায়িক” মুসলমানদের জীবন ও মূল্যবোধের মোকাবেলায় চলছে আবমান কালের বাঙালীনার বক্তব্য। আমি শুধু এই দিকটাই আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। কল্পনাও করিনি যে কথাগুলো এত দীর্ঘ হবে।

    1. 19.1
      ফাতমী

      সত্য কখনো চাপা পড়ে থাকে না, আপ্ন রাস্তায় তা প্রকাশিত হয়ে আসে। তবে আমাদের সকলের সত্যকে স্বীকার করার মত মন মানষিকতা নেই।

      1. 19.1.1
        এম_আহমদ

        @ফাতমী:

        সত্য কখনো চাপা পড়ে থাকে না, আপন রাস্তায় তা প্রকাশিত হয়ে আসে। তবে আমাদের সকলের সত্যকে স্বীকার করার মত মন মানষিকতা নেই।

        আপনার মন্তব্যটি দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। তবে আগেই বলেছি, এটা আপনাদের সময়। শিক্ষা-ব্যবস্থায় যে যেসব ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে তা পরিবর্তনের শক্তি না থাকলেও ক্ষুদ্রাকারে কিছু কিছু কাজ করা যেতে পারে। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে ক্লাব বা সমিতি গড়া যেতে পারে। আলোচনা সভা ও সেমিনার করা যেতে পারে। এসব কর্মকান্ডে কিছুটা হলেও কালের সেই ধারণাগুলো পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে।

         

        1. 19.1.1.1
          ফাতমী

          @এম আহমদ,

          সময়ের মালিক আল্লাহ পাক, আমাদের সময় তোমাদের সময় বলে কিছু নেই। সেমিনার-সমাবেশ হয়। কিন্তু সব কিছু তো আর একসাথে হয় না, আবার হতেও পারে।

          আপনার জন্য দোয়া রইলো,  আমাদের সকলের জন্যই দোয়া করবেন। 

        2. এম_আহমদ

          @ফাতমী: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। সময় এভাবে বিভাজ্য নয় -এটা শুধু কথার কথা। হয়তবা এমন কথায় উৎসাহব্যঞ্জক কিছু থাকে, হয়তবা সমাজ এমন কথার মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার কোনো উপাদান রাখে। শুধু বললাম, এই যা।

  10. 18
    শাহবাজ নজরুল

    একটা পরীক্ষা করলাম -- কবি নজরুলের গানের দু'টো লাইন নিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম এতে শব্দ মিশ্রণ কেমন ধরনের।

     

    এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে?

    টলমল জল মতির মালা দুলিছে ঝালর পলকে।

     

     

    উত্তরটা এমন --

     

    এত (সংস্কৃত)  জল (সংস্কৃত)  ও(?) কাজল (সংস্কৃত)  চোখে(সংস্কৃত/তদ্ভব) পাষাণী (?)  আনলে(তদ্ভব) বল (?)  কে(তদ্ভব)

    টলমল(দ্রাবিড়?) জল (সংস্কৃত) মতির (?)  মালা (সংস্কৃত) দুলিছে (সংস্কৃত/তদ্ভব) ঝালর (?) পলকে (?)

     

  11. 17
    শাহবাজ নজরুল

    এই নিয়ে সুনীতিকুমারের একটা পরিসংখ্যানের কথা আগে জেনেছিলাম -- বাংলাপিডিয়াতেও পেলাম এভাবে। যদিও এই পরিসংখ্যান ব্যত্যয় বা বিতর্কমুক্ত নয় বলেই মনে হচ্ছে।

    শব্দভান্ডার  উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া বাংলা শব্দভান্ডারের প্রধান উপাদান  তদ্ভব (সংস্কৃত থেকে প্রাকৃতের মধ্য দিয়ে বাংলায় এসে অন্তত দুবার পরিবর্তিত শব্দ), তৎসম (মূলত সংস্কৃত বানানে রক্ষিত কিন্তু উচ্চারণে পরিবর্তিত শব্দঋণ) এবং অর্ধতৎসম (বাঙালির মুখের উচ্চারণে ভেঙেচুরে নেওয়া সংস্কৃত শব্দ, যেমন প্রত্যাশাপিত্যেশ)। এগুলির উৎস সংস্কৃতভাষা। সেই সঙ্গে আছে অজস্র অজ্ঞাতমূল বা দেশী শব্দ যেগুলি হয়তো দ্রাবিড়, অস্ট্রিক বা ভোটবর্মী ভাষা থেকে প্রাচীন ঋণ। এছাড়াও আছে প্রচুর নতুন শব্দঋণ ফারসি, আরবি, ইংরেজি, পর্তুগিজ ও অন্যান্য ভাষা থেকে।  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানের মোট শব্দের পরিসংখ্যান নিয়ে দেখেছিলেন, তাতে তদ্ভব ৫১.৪৫ শতাংশ, তৎসম ৪৪.০০ শতাংশ, ফারসি-আরবি ৩.৩০ শতাংশ আর ইংরেজি-পর্তুগিজ ইত্যাদি ১.২৫ শতাংশ। অবশ্য এ পরিসংখ্যান সর্বৈব সঠিক নয় এবং এ থেকে বাংলা শব্দের ব্যবহারিক (মৌখিক ও লিখিত) কোনো ছবি পাওয়া যায় না। তাছাড়া জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানে প্রায় দেড়লাখ শব্দ থাকলেও সব উপভাষা মিলিয়ে ব্যবহূত বাংলা শব্দের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। link

    আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকদের করা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ইন্দো-আর্য অংশে বেদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত হয়ে মগধি হয়ে বাংলার শাখা দেখানো হচ্ছে। পালিকে দেখা যাচ্ছে গান্ধারী অংশে। তবে বাংলাপিডিয়াতে আপনার কথা অনুসারে এও পেলাম --

    বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ  বাংলা ভাষা দ্রাবিড় ও কোল এ দুটি অনার্য ভাষাদ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। শুধু শব্দসম্ভারে নয়, বাক্য গঠনেও এ দুটি ভাষার প্রভাব রয়েছে। বাংলায় প্রচুর অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক শব্দ, দ্বিত্ব শব্দ এবং যৌগিক ক্রিয়াপদের যে ব্যবহার হয় তা অনার্য প্রভাবজাত। যেমন- ঘোড়া-টোড়া, কাপড়-চোপড় (এ ক্ষেত্রে মূল শব্দের প্রথম ব্যঞ্জনের স্থলে অন্য ব্যঞ্জন বসিয়ে ’ইত্যাদি’ অর্থে মূল শব্দের সঙ্গে যোগ করে পদসাধন করা হয়েছে), টুক্টুক্, খট্খট্, খাঁখাঁ, ধাঁধা (এ ক্ষেত্রে একই শব্দ দ্বিতীয়বার ব্যবহার করে পুনরাবৃত্তি বোঝানো হয়েছে), বসিয়া পড়া, লাগিয়া থাকা (এ ক্ষেত্রে সহকারী ক্রিয়ার ব্যবহার হয়েছে) ইত্যাদি। বাংলা ভাষায় দ্রাবিড়াদি ভাষার শব্দও যথেষ্ট আছে, বিশেষ করে স্থান নামের ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষার উদ্ভবের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে বিভিন্ন পর্যায় ও সূত্রের প্রভাবে। সেগুলি হলো: (ক) প্রাচীন বাংলার ভাষারূপের সঙ্গে কিছু সংস্কৃত প্রভাব প্রথম থেকেই যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ খ্রিস্টীয় অব্দের প্রথম থেকেই সংস্কৃত ভাষা ছিল প্রায় সমগ্র ভারতের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার বাহন।  [ পালিও অর্ধমাগধি ছিল যথাক্রমে বৌদ্ধ ও জৈনদের নিজ নিজ ধর্মীয় আলোচনা ও সংস্কৃতির বাহন।] প্রাচীন বাংলার যুগে বাংলাভাষী অনেকেই কাব্যচর্চা করতেন সংস্কৃতে। ভারতের ইন্দো-আর্য ভাষা যখন প্রাচীন ও মধ্যস্তর উত্তীর্ণ হয়ে আধুনিক স্তরে পৌঁছায়, তখন বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর প্রভাব সত্ত্বেও [পাল রাজত্বে গৌড় সম্রাজ্যের পত্তন সত্ত্বেও] সুপ্রসিদ্ধ বাঙালি কবিগণ (জয়দেব, উমাপতিধর, গোবর্ধন আচার্য প্রমুখ) সংস্কৃতেই কাব্য রচনা করেছেন। ফলে প্রাচীন যুগ থেকে  তৎসম ও অন্যান্য প্রভাব বাংলায় এসে গেছে; (খ) ১৩শ শতকে বঙ্গদেশে মুসলিম শাসনের পর থেকে আরবি-ফারসি ও তুর্কি ভাষার প্রভাব বাংলায় পড়তে শুরু করে; (গ) ১৪শ/১৫শ শতকে মুসলিম শাসনামলে ফারসি রাজভাষা হওয়ায় এবং এর বিশেষ মর্যাদার কারণে, সেই সঙ্গে এই ভাষা-সম্পৃক্ত সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলায় স্থান পায় প্রচুর বিভাষী শব্দ; (ঘ) আবার একই সঙ্গে মুসলমান শাসকগণ ‘জবান-এ-বাংলা’র সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করার ফলে তৎকালীন পন্ডিতদের কথিত ‘গৌড় ভাষার’ শ্রীবৃদ্ধি ঘটে, অর্থাৎ বাংলায় তৎসম শব্দের ব্যবহার বেড়ে যায়; (ঙ) ১৬শ শতকে পর্তুগিজদের আনীত শব্দাবলি বাংলায় অন্তর্ভুক্ত হতে শুরু করে [আনারস, আতা, তামাক ইত্যাদি]; (চ) মধ্যযুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ফারসি এবং এর মাধ্যমে আগত শব্দ ও ভাষিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়; (ছ) ১৭শ শতকে বঙ্গদেশে বিদেশীদের আগমন বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে পর্তুগিজ এবং ওলন্দাজ ছাড়াও ফরাসি ও ইংরেজি শব্দের প্রভাবও বাড়তে থাকে [ফরাসি: কার্তুজ, কুপন, ডিপো; ওলন্দাজ: হরতন, ইস্কাবন, ইস্কুরুপ; ইংরেজি: টেবিল, চেয়ার, লাট, জাঁদরেল ইত্যাদি]; (জ) ১৭শ/১৮শ শতকে  খ্রিস্টধর্ম প্রচারকদের প্রচেষ্টায় বাংলায় প্রথমবারের মতো গদ্য-ভাষার কার্যকর ব্যবহার শুরু হয়; (ঝ) ১৮শ/১৯শ শতকে ইংরেজ শাসনে ইউরোপীয় শিক্ষার প্রভাবে ইংরেজি ও তার মাধ্যমে অন্যান্য বিদেশী ভাষার প্রভাব বাংলা ভাষায় যুক্ত হতে থাকে। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর তার প্রধান  উইলিয়ম কেরী ও তাঁর সহযোগী বাঙালি পন্ডিতদের প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা সৌষ্ঠবপূর্ণ গদ্য-সাহিত্য রচনার উপযোগী হয়ে ওঠে; (ঞ) পরবর্তী পর্যায়ে ১৯শ শতকে রাজা রামমোহন রায়, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন প্রমুখের প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে এবং গতিসঞ্চার হয়। তৎসম-তদ্ভব শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই ভাষা হয়ে ওঠে সাহিত্যের যথার্থ বাহন; (ট) বিশ শতকে কথ্য ভাষা লেখ্য সাহিত্যিক ভাষায় উন্নীত হয় প্রথম চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ এবং আরও অনেক প্রতিভাবান বাঙালির হাতে।

     

    1. 17.1
      ফাতমী

      বাংলাপিডিয়ায় এই কথাও লিখা আছেঃ

      সিলেটি নাগরীতে রচিত পুথির ভাষা এবং দোভাষী পুথির ভাষা অভিন্ন। এতে  তৎসম শব্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে; যুক্তবর্ণের ব্যবহারও কম। আরবি-ফারসি ও হিন্দি-উর্দুর প্রচুর শব্দ সিলেটি নাগরীতে লিখিত পুথিতে প্রবেশ করেছে। দোভাষী পুথির অনুকরণে সিলেটি নাগরীর পুথির পত্রবিন্যাসও ডান থেকে বামে খরোষ্ঠি পদ্ধতিতে করা হতো।

      এক আঞ্চলিক ভাষায়ই দেখেন সংষ্কৃত শব্দ (আপনার উল্লেখিত তৎসম ৪৪.০০ শতাংশ) অনুপস্থিত। 

      1. 17.1.1
        এম_আহমদ

        @ফাতমী: বেশ তো। যথার্থ ধরেছেন। এভাবেই উদ্ধৃত বস্তুকে চ্যালেঞ্জ করে দেখে নিতে হবে। নিচে নজরুল ভাইকে দেয়া মন্তব্যটিও দেখে নেবেন। ধন্যবাদ।

    2. 17.2
      এম_আহমদ

      @শাহবাজ নজরুল: ভাই সালাম। অনেক কথা। এটা এক বিরাট ফিল্ড। নিচে কছু কথা বলছি।

      (১) আমি প্রথমে আপনার দেখানো ভাষার “বিবর্তনরূপী” চার্ট থেকে শুরু করি। এগুলো tricky. আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন যে ইভ্যুলুশনারি ধারণা ইউরোপিয়ানদের হাতে এবং তাদের কলোনিগুলোতে inter-disciplinary সকল বিষয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল  –এটা কেবল বায়োলজিতে থাকে নি। সাইকোলজি , সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদিতে দ্রুতই ছড়িয়েছিল। আপনি এটাও লক্ষ্য করে থাকবেন যে cosmic লেভেলেও সেই থিওরি ছড়িয়ে প্রে। প্লানেটারিয়ান সংঘর্ষের মাধ্যমেও যে নতুন অবস্থা সৃষ্টি হয় সেই ডেভেলপম্যান্টকেও ইভ্যুলুশনারি টার্মে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রাণী জগতের স্পেসিজগুলোকে তাদের আপন আপন সত্তায় না দেখে বিবর্তনের চার্ট দেখিয়ে যে ‘ম্যাজিক’ তৈরি হয়, অনেক ভাষার ব্যাপারেও তাই। ব্যাখ্যার বেসিসও একই।  মাইক্র উদাহরণ টেনে ম্যাক্রোতে নেয়া। ভাষার উদাহরণে শুধু উৎসই নয় বরং সেখানে ইউরোপীয় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

      (২) চার্টে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় আর্যের সাথে বৈদিক-সংস্কৃত এবং এত্থেকে উদ্ভূত প্রাকৃত, তাত্থেকে মাগধী, তাত্থেকে বাংলা কিন্তু পালি বৈদিক-সংস্কৃত থেকে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ভূত হলেও বাঙলার সাথে অসংযুক্ত দেখাচ্ছে।

      (৩) আমরা ঐতিহাসিকভাবে আগের কথাগুলো আবার দেখি। ভারতে আর্য আগমনের পূর্বে অনার্য, দ্রাবিড়দের কি কোনো ভাষা ছিল না? বিশেষভাবে বাংলার কথা বলা যাক। ড. অতুল সুর (১৯৮৬: ২১) বলছেন, “বাংলায় প্রথম অনুপ্রবেশ করে দ্রাবিড়রা। এরা দ্রাবিড় ভাষার লোক ছিল।’ উল্লেখিত চার্টে এদের অবস্থান কই? সকলের ভাষা বৈদিক-সংস্কৃত থেকে উৎসারিত দেখাতে যে কসরত হচ্ছে তা অর্থবহ হচ্ছে না। রমেশ মজুমদারের ধারণা বাংলাদেশের আদিম বাসিন্দা হচ্ছেন ‘নিষাদ জাতি’ (cited in কিরণচন্দ্র মজুমদার, ১৯৯৫:৪৮২)। কিন্তু এরাও অনার্য। এদের কি কোনো ভাষা ছিল না? তারা কি কোনো এক কালে আর্য আসবে এবং তাদের ভাষা গ্রহণ করবে –এই আশায় ছিল? কিন্তু আর্যরা তো এই অঞ্চলের লোকদেরকে ‘দস্যু’ বলেও আখ্যায়িত করত (প্রাগুক্ত), দস্যুদের কি ভাষা নেই? আপনার উল্লেখিত সূত্রের বক্তব্য লক্ষ্য করুন, “বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ  বাংলা ভাষা দ্রাবিড় ও কোল এ দুটি অনার্য ভাষাদ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। শুধু শব্দসম্ভারে নয়, বাক্য গঠনেও এ দুটি ভাষার প্রভাব রয়েছে।” এখানে দ্রাবিড় ও কোল বলে যে দুটি ‘অনার্য ভাষা’ বাংলাকে প্রভাবিত করল সে দুটি ভাষা সেই চার্টের কোথায়? আবার এগুলো তো বৈদিক-সংস্কৃত চার্টে দেখানো যেতে পারে না কেননা এই ভাষাগুলোর উৎস বৈদিক-সংস্কৃতে নয়। এই যখন অবস্থা তখন এই চার্ট তো অসম্পূর্ণ –It has been produced to tell one kind of story and not the other.

      (৪) এবারে অন্য কথায় যাই। ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়। বরং তার syntax order-এ যে নিয়ম রয়েছে (meaning the grammar) তাই। প্রত্যেক ভাষাভাষীর লোক অপর লোকের সংস্পর্শে একে অন্যের শব্দ ধার (loan) করে। আর্যরা যখন এই অঞ্চলের লোকদের সংস্পর্শে আসে তখন নিশ্চয় অনার্যের অনেক শব্দ অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রহণ করে থাকবে। বাস্তবতা হল এই যে চাকর-নকর ও দাস-দাসীদের শব্দও মালিকগণ ব্যবহার করে থাকেন, যদিও তাদের জাত, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অনেক সময় অবজ্ঞা দেখিয়ে থাকেন। প্রত্যেক ভাষায় অপরাপর ভাষার শব্দ-সূত্রের ধারণ রয়েছে। আপনি যদি ৫০টি প্রাকৃত শব্দে সংস্কৃতের উৎস দেখিয়ে থাকেন তবে এতে কীভাবে সুনিশ্চিত হবেন যে এই শব্দগুলো (বা তাদের অনেকগুলো) প্রাকৃত থেকেই সংস্কৃতে যায়নি? একটি ভাষা অপর ভাষা থেকে ‘শব্দ’ ধার করলে সেই উৎসটি অমনিতে সেই ভাষা উদ্ভূত হওয়ার প্রত্যয় বহন করে না। আমরা দৈনন্দিন জীবনে বাংলায় কত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সেই ব্যবহার eventually  বাংলার ভাষিক অবয়বের ভিতরে সংগঠিত হয় (অর্থাৎ শব্দ যতই আনা হোক না কেন সেগুলো বাংলার syntax order-এ অর্থাৎ পদবিন্যাসেই স্থান পেয়ে আসতে হয়) এবং এতেই কথা অর্থবহ হয়।

      (৫) আমাদের বক্তব্য হচ্ছে উৎস আলোচনার ইতিহাসে repression’ রয়েছে। Repressed history-কে যেভাবে উদ্ঘাটন করা হয়, যেমন text and analysis interrogation –এর মাধ্যমে, সেই কাজ করতে হবে। কেননা কোনো narrative যখন কিছু repress করে তখন তার বক্তব্যে কিছু বেমিল রেখে যায় যা কেবল expert interrogation এ ধরা পড়তে পারে। ফুঁকো (Michel Foucault) তার archaeology of knowledge-এ সেই repression ও  উদ্ঘাটন থিওরি নিয়ে আলোচনা করেন। আজকে আমরা দেখতে পাই অনেক আনুমানিক কথার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করা হয় তারপর হঠাৎ করে আর্য এবং সংস্কৃতমুখী উৎসের বিষয় নিশ্চিত করে কথা বলা হয়ে যায়। 

      এবারে এই কথাটি লক্ষ্য করুন, ‘আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলাদেশে যে অনার্য জাতি বাস করিত তাহাদের সভ্যতা, আচার-আচরণের অনেক কিছু বাঙ্গালাদেশে আগত আর্যগণ কর্তৃক গৃহীত হইলে আর্য-অনার্য সংমিশ্রণে বাংলার সামাজিক, ধর্মনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন নতুনভাবে গড়িয়া উঠিল” (কিরণচন্দ্র চৌধুরী, ১৯৯৫:৪৮৩)। আর্যদের মূলত কোনো ‘সভ্যতা’ ছিল না। যাবাবর যোদ্ধাংদেহী জাতি ছিল। পরাজিতদের জীবন থেকেই স্থায়ী বসতির বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে এবং অপরের ‘চর’ দখল করেছে।

      (৬) এবারে আপনার নজরুলগীতির উদাহরণে আসি।

      “এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে?/টলমল জল মতির মালা দুলিছে ঝালর পলকে।”

      (ক) “এত” পরিমাণ নির্দেশ করে, কিন্তু সংস্কৃতের চার্টে আমি যেন সেই পরিমাণের অনুরূপ অর্থ দেখতে পাচ্ছি না। ‘কাজল’ হচ্ছে শ্যামবর্ণ (কাল) কিন্তু এই অর্থও পাচ্ছি না। ‘আনলে’-কে সংস্কৃতে দেখানো হচ্ছে Anayati { A- nI } হিসেবে, এখানে কথা বলার অবকাশ আছে। জলের অর্থ ‘প্রস্রাব’সহ অনেক অনেক দেখা যাচ্ছে। একথা ঠিক, জলকে হিন্দুরা পানি বলে না। এতে তাদের একটা প্রথার প্রকাশ পায় এবং এর দীর্ঘ সূত্রিতায় সংস্কৃত হয়ে থাকতে পারে। তবে এখানে ১৫টি শব্দের ২/৩টা হয়ত সহজে সংস্কৃতের মাত্রায় পাড়ি দিতে পারে।  ৬টি শব্দ আপনাকেই সংস্কৃত নয় এবং একটি দ্রাবিড় বলা হয়েছে।  

      (খ) তারপর আমরা তো কেবল শব্দ দিয়ে ভাষা বুঝি না, বরং পদাবলির অবস্থান পদ্ধতি দিয়ে (through the syntactical arrangement)। নজরুলের পঙতিতে বাংলার যে রূপ এসেছে সংস্কৃতে সেই পদাবলীর অবস্থান কি?

      (গ) আমরা যদি নজরুলের এই পঙতি নেই, ‘নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/আম্মা গো! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’ তাহলে আলোচনার ময়দানে কি পার্থক্য আসবে?

      (ঘ) স্মরণ করতে হবে, আমাদের এই আলোচনার মূল thesis কি ছিল। সেটি ছিল বাঙলা ভাষা সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত, না  প্রাকৃত পালি থেকে উদ্ভূত –এটি দেখানো। এটি দেখাতে হলে নজরুলের ব্যবহৃত টেক্সট দিয়ে হবে না। আমাদেরকে উৎস-লগ্নের টেক্সট দিয়ে তা ‘এদিকে’, না হয় ‘ওদিকে’ -তা প্রমাণ করতে হবে। আমরা বলেছি এই ভাষার কিবলা পরিবর্তিত হয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আপনার উদাহরণে এসেছে, “তৎসম-তদ্ভব শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই ভাষা হয়ে ওঠে সাহিত্যের যথার্থ বাহন।  বিশ শতকে কথ্য ভাষা লেখ্য সাহিত্যিক ভাষায় উন্নীত হয় প্রথম চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ এবং আরও অনেক প্রতিভাবান বাঙালির হাতে।” কেন? এ কথার মারফতি কি?

      (ঙ) তৎসম-তদ্ভব শব্দের মাধ্যমে যদি ভাষা সাহিত্যের বাহন হয় তবে তৎসম-তদ্ভব শব্দের আগে কি এই ভাষা ‘ভাষা’ ছিল না? তাহলে, ইংরেজ আমলের আগ পর্যন্ত যাকিছু লিখা হয়েছিল তা বুঝি সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত ছিল না? এসব বক্তব্যকে ভাষা-তাত্ত্বিক দিক দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা যায়। তৎসম-তদ্ভব শব্দের সংযোগ ও বৃদ্ধি তো এটাই প্রমাণ করে যে এ-ভাষায় আগে তৎসম-তদ্ভব শব্দের প্রাধান্য ছিল না এবং এগুলো ছাড়াই সেই ভাষা ‘ভাষা’ হিসেবে প্রচলিত ছিল। অধিকন্তু “তৎসম-তদ্ভব শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই ভাষা হয়ে ওঠে সাহিত্যের যথার্থ বাহন” –এই কথাটির ভিতরের ধারণা শুদ্ধ নয়।

      (চ) কিন্তু কথা এখানেই শেষ নয়। আমরা চার্ট দেখেই প্রাকৃতকে সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত বলে মানতে পারছি না, যেমন চিম্পাঞ্জির চার্ট দেখে ইভ্যুলুশন মেনে নিচ্ছি না।

      (ছ) উপরে ফাতমী ভায়ের পয়েন্টটিও বিবেচনা যোগ্য। আজ তাদেরকে সাহসিকতার সাথে চ্যালেঞ্জিং প্রশ্ন করতে হবে, প্রথম দিকে ভুল-টুল হোক কিছুই আসে যায় না। কিছু চার্ট, কিছু স্ট্যাটিস্টিকস দেখিয়ে আমাদেরকে যেন কোনো পক্ষ পানি ঘোলা করে না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

      অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।

      1. 17.2.1
        শাহবাজ নজরুল

        মানলাম আপনার কথা – হয়ত কিছুটা – কিন্তু তাই বলে আমি পুরো চার্টকে হিসেবের একেবারে বাইরে রাখতে পারছিনা। ইতিহাস, শব্দ ও ভাষার ব্যাকরণিক ও অন্যান্য গাঠনিক সাযুজ্য থেকে দেখলে বৈদিক সংস্কৃতকে এই অঞ্চলের সবচাইতে পুরনো ভাষা বলেই মনে হয়। বাংলাতে অবশ্যিই পালি কিংবা প্রাকৃতের প্রভাব আছে – কিন্তু সময়ের ও ঐতিহাসিক অভিক্ষেপে ওই ভাষাগুলো ও সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত বলেই প্রতিয়মান হয়। আপনি যেমন proto-পালি কিংবা proto-প্রাকৃত ভাষার কথা বলছেন তা কোনো না কোনভাবে বৈদিক সংস্কৃতের সাথে সংযুক্ত বলেই মনে হচ্ছে। 

        ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে দ্রাবিড় ভাষা ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আলাদা মূলত ভাষিক গঠন ও ব্যাকরণ সম্পূর্ণ আলাদা বলে। অন্য কথায় বলতে গেলে বাংলা ভাষার সাথে ধরেন ফরাসী কিংবা রুশ ভাষার যতটুকু সাযুজ্য আছে তার চাইতে কম সাযুজ্য দ্রাবিড় ভাষার সাথে। বিষয়টা একটু ধাক্কা দেবার মত কনসেপ্ট মনে হলেও একে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ব্যাকরনগত ভাবে (কাল, লিঙ্গ, সর্বনাম, বিশেষণ এর ব্যবহার কিংবা একটি বাক্যে ক্রিয়া, বিশেষ্য, সর্বনাম, করণ এর স্থানিক অবস্থান এবং কাল, লিঙ্গ ও বক্তা/কারক ভেদে ক্রিয়াপদের বিন্যাস ) বাংলা ফরাসী ভাষার যতটুকু কাছাকাছি – দ্রাবিড় ভাষার ততটুকু কাছাকাছি নয়। ভাষিক সেন্স ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা দ্রাবিড় ভাষা থেকে মূলগত ভাবেই আলাদা। 

        এজন্যেই খুব সম্ভবত, প্রায় অচেনা মারাঠি কিংবা মৈথিলি ভাষাতে হঠাত করে আকাশ চ্যানেলে এসে যাওয়া সংবাদ শুনলে মনে হয় ভাষাটি বেশ পরিচিত লাগছে – তামিল কিংবা কেরালার সংবাদ যদি রিমোটে চলে আসে তবে মনে হয় এ কোন ভাষারে বাবা? 

        একই কারণে হয়ত উত্তর ও দক্ষিন ভারতের মধ্যে অপরের হিন্দি কিংবা তামিল, তেলেগু ভাষা শেখার চেষ্টার চাইতে ঔপনিবেশিক ইংরেজিতে তারা কমিউনিকেট করেন। ইন্দর কুমার গুজরাল যখন ভারতের প্রধান মন্ত্রী হন তখন মনে আছে তার হিন্দি শিখতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। মনে হয় প্রায় বছর খানেক লেগেছে। একই কথা আমরা শুনি দক্ষিনের নায়ক/নায়িকারা যারা বলিউডে কেরিয়ার গড়তে এসেছিলেন তাদের ক্ষেত্রে। দক্ষিনের সবার জন্যে ভাষা সবচাইতে বড় impediment – যেন একেবারে হিব্রু ভাষা শেখা!!!

        একই কারণে হয়ত আমরা যত সহজে উর্দু কিংবা হিন্দি রপ্ত করতে পারি তত সহজে আরবী রপ্ত করতে পারিনা। এমন অনেক উদাহরণ আছে যে বাংলার মাদ্রাসাতে ছোটো কাল থেকে কোরান হাদিস পড়া ছেলে হয়ত কোরান হাদিস মুখস্ত করে ফেলেছে – কিন্তু আরবিতে কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে। অথচ একাডেমিক ভাবে হিন্দি উর্দু না থাকলেও তাবলিগী ভাইদের সাথে ৩/৪ দিন মুখে কথা বলেই দিব্যি হিন্দি/উর্দুতে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মূল inherent কারণ হচ্ছে বাংলা, হিন্দি, উর্দু আসলে একই আদি ভাষা থেকে উদ্ভুত। এদের মধ্যে mutual  inherent  structural মিল আরবির চাইতে অনেক বেশি।

        মাদ্রাসার ছাত্রের উদাহরণের সাথে আরেকটা কথা বলা যেতে পারে। ব্যপক ভাবে আরবি পড়া ছাত্রকে দেখেবেন খুব সহজেই অনেক কম পড়া ইংরেজিকে রপ্ত করতে পারছে – কিন্তু কেন যেন আরবিতে কথা বলে সে fluent নয়। আমার মনে হয় এর কারনও সেই একই। অর্থাৎ মৌলিক অর্থে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা – ইংরেজির সাথে বেশি মিলে যায় (Indo -European Family) – আরবীর (Semitic Language) চাইতে।

        1. 17.2.1.1
          এম_আহমদ

          শাহবাজ ভাই সালাম। আমাদের মূল আলোচনাটি যেহেতু অনেক আগে হয়েছে এবং যেহেতু সেই সময়ের মানসিক স্রুত (the stream of thought) এখন মনে তেমন প্রখর নয়, তাই পিছনের মন্তব্যগুলো আবার দেখলাম। আমরা এই আলোচনাটি আগেও করেছি তবে হয়ত অনেক কিছু  open ended  রয়ে গিয়েছে।  ৯ নম্বর এবং ৯.১ মন্তব্য।  (তবে ইউকির একেক এন্ট্রিতে একেক ধরণের কথা দেখা যাচ্ছে। এটা যেন ব্লগ সাইটের মত হয়ে যাচ্ছে)।

          বৈদিক-সংস্কৃত “সবচেয়ে” পুরানো ভাষা এবং অপরাপর ভাষাগুলো সংস্কৃত থেকে আসা এবং বাংলা ইউরোপীয় ভাষিক পরিবারের নিকটবর্তী এবং দ্রাবিড়-ভাষা থেকে দূরবর্তী –এগুলো এভাবে প্রতিয়মান হওয়ার কারণ হয়ত সেই ভাষিক ‘চার্ট’টি।

          অধিকন্তু, “ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে [a generalised phrase] দ্রাবিড় ভাষা ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।” ঠিক আছে। কিন্তু যখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় দ্রাবিড়দের (dravidian language) ভাষা ছিল এবং Dravidian Languages were once spoken more widely across the Indian subcontinent বলা হয়, তখন অনেকাংশে বিপরীত সত্যই গৃহীত হয়ে যায়। অর্থাৎ দ্রাবিড়দের ভাষা সংস্কৃত থেকে উদ্ভাবিত নয়। কেননা সংস্কৃত তো ইন্দো-ইউরোপিয়ান শ্রেণীভুক্ত।

          “দ্রাবিড় ভাষা ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা” -এই ধারাটি গ্রহণ করতে সমস্যা দেখি না। পালি-প্রাকৃতির বিতর্ক আপাতত এক পাশে রেখে যদি এই ধারায় অনুসন্ধান করা যায় তবে দ্রাবিড়রা যে নূহের (আ) অধস্তন জাতি এই ধারণা হয়ত আরও বলবৎ হয়। কিন্তু উইকি সোর্স যখন দ্রাবিড় শব্দের উৎসও সংস্কৃতে দেখতে শুরু করে তখন তো বিষয়টি এলোমেলো হয়ে যায়। কেননা সংস্কৃত তো ইন্দো-ইউরোপিয়ান।    

          তারপর বাংলাকে ইন্দো-ইউরোপিয়ান পরিবারের সাথে এবং দ্রাবিড়দের দুরবর্তী দেখাতেও সমস্যা অনুভূত হয়। নিচের উদাহরণ বিবেচনা করুন:

          Bengali: আমি (subject) আমার হাত দিয়ে (adverbial) ভাত (object) খাই (verb)

          English: আই (subject) ইট (verb) রাইস (object) উইথ মাই হান্ড (adverbial)

          Arabic: আকুলু (subject and verb) আল-উরযা (object) বি ইয়াদী (adverbial)

           

          Bengali: Subject>adverbial>object>verb

          English: Subject>verb>object>adverbial

          Arabic:  Subject&verb>object>adverbial

           

          এই পদবিন্যাসে ইংরেজি ও আরবিকে সমান দেখা যাচ্ছে এবং বাংলাকে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এত্থেকে কী কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে? আমি বলব, এত দ্রুত ঠিক হবে না কেননা এর উপর বর্ধিত আকারে আরও ফিলোলজিক্যাল ও গ্রামাটিকেল অনুসন্ধানের প্রয়োজন। তবে ক্ষুদ্র পরিসরে হয়ত বলা যেতে পারে যে বাংলা দ্রাবিড়দের সাথে সম্পর্কিত বিধায় তা সম্পর্ণ আলাদা।

          অরিজিন প্রসঙ্গে আমার ১৯ নম্বার মন্তব্যে ম্যাক্স মুলার ও গ্রিয়াসনের প্রাথমিক থিওরি ও জ্যোঁ ফিনো (Jean Finot) এর সমালোচনার বিষয়টি লক্ষণীয়। অষ্টম ও উনবিংশ শতাব্দীর কলোনিয়েল এডমিনিস্ট্রেটিভ পন্ডিতগণ (আর্য) বেশির ভাগই এনলাইটনম্যান্ট আন্দোলন-প্রভাবিত এবং ইউরোপীয় সভ্যতার উপযোগিতায় (fittest) বিশ্বাসী, যারা ভারতীয় আর্যদের সংশ্লিষ্টতায় অনার্য ভাষার ইতিহাস অনুসন্ধান, স্থান নির্ধারণ, চার্ট, গ্রাফ ও সাহিত্য ইত্যাদি সৃষ্টি করে, স্কুল গড়ে, সেগুলোকে শিক্ষার ধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন যা মহিরূপে পরবরতী অনেকের জন্য daunting হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবুও এগুলো চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে এবং সুখের বিষয় যে তা কিছু হিন্দুরাও করছেন। এখানে ড. অনিন্দিতা ঘোষের প্রেজেন্টেশনটি (ভিডিও) শুনা অত্যন্ত জরুরি। ওখানে ১৮/১৯ শো শতাব্দীতে বাংলা ভাষার ময়দানে কলোনাইজারদের নিজেদের প্রয়োজনে ও বর্ণহিন্দুদের সহযোগিতায় যা হচ্ছিল, বিশেষ করে ফোর্ট ইউলিয়াম কলেজের কাজ; প্রিন্টিঙে হিন্দু ভদ্র-লোক শ্রেণীর একচ্ছত্র অবস্থান; ইংরেজ কলোনিয়েল এডমিনিস্ট্রেশন ও খৃষ্ট ধর্ম প্রচারের বাহন হিসেবে বাঙলার বিশেষ রূপায়ন ইত্যাদি প্রণিধানযোগ্য হয়ে এসেছে। আমি ভিডিওটি মাত্র ১০ মিনিট শুনেছি, সময় করে বাকি অংশ শুনব। তবে অনার্য প্রতিষ্ঠিত থিওরি ও চার্ট যেমন ইনডিস্পিউটেবল নয় তেমনি আমাদের অবস্থানও যে রিফাইন করা যাবে না এমনটিও নয়।

          উর্দু-হিন্দি-বাংলার উদাহরণ

          [বাঙালী ভায়েরা] তাবলিগী ভাইদের সাথে ৩/৪ দিন মুখে কথা বলেই দিব্যি হিন্দি/উর্দুতে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মূল inherent কারণ হচ্ছে বাংলা, হিন্দি, উর্দু আসলে একই আদি ভাষা থেকে উদ্ভুত।

          Nope. বিষয়টাকে রিভার্স করুন। হিন্দিভাষী ও উর্দুভাষী ভায়েরা যদি বাঙালী তাবলীগী ভাইদের সাথে ৩/৪ দিন একত্রে কাটান, তাহলে, তারা কি মুখে দিব্যি বাংলায় কথা চালিয়ে যেতে পারেন? আমার অভিজ্ঞতায় তো তা দেখি না। যদি ‘বাঙলা-হিন্দি-উর্দু’ সংস্কৃত থেকে উদ্ভাবিত হবে তবে কেন পারবে না? লক্ষ্য করে থাকবেন, একজন গ্রামীন বাঙালী মেয়ে অতি অল্প সময়ে হিন্দি-উর্দু রপ্ত করে তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সারতে পারে। কিন্তু অপর দিক থেকে তা হয় না। এটার মূল কারণ হচ্ছে বাংলার ‘লেহানে’ তার পদপ্রকরণে, তার উচ্চারণ ভঙ্গিতে হয়ত এমন কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে যা অপর ভাষাদ্বয়কে আয়ত্ব করে কিন্তু অপর ভাষাদ্বয় বাঙলাকে সেভাবে আয়ত্ব করতে পারে না। এই কথাটি প্রমাণের জন্য ভাষিক রিসার্চের প্রয়োজন। কিন্তু আমি কথাটি অনুভূতি থেকে বললাম।

          ভাষার ফ্লুয়েন্সির ব্যাপারে মাদ্রাসার ছাত্রদের বেলায় যা বলেছেন, সেটাও তেমন সঠিক বলে মনে হয় না। মনে কিছু করবেন না। মত তো ভিন্ন হতেই পারে। মাদ্রাসার ছাত্ররা অল্প সময়ে ইংরেজি রপ্ত করতে পারে –এটা আমার চোখে পড়ে না। তবে অনেক বাঙালী আরব গিয়ে যেভাবে তাদের দেশিয় (colloquial) ভাষা রপ্ত করেন, সেভাবে ইংল্যান্ডে এসে ইংরেজি শিখতে দেখি না। তবে এসবের মধ্যে অন্যান্য কারণও র‍্য়েছে। সৌদি হোক অথবা ইংল্যাণ্ড, যারা বিদেশে গিয়ে সরাসরি সেই ভাষার লোকদের অধিনে চাকুরি করেন তারা সেই ভাষা তাড়াতাড়ি শিখেন। যারা নিজেদের লোকদের মধ্যে কাজ করেন তারা ৮/১০ বছর পেরিয়ে গেলেও তেমন কিছু কিছু শিখেন না। এই বিশেষ ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজন’ই প্রধান কারণ, ভাষিক প্রকৃতি নয়। আবার ভাষায় ফ্লুয়েন্ট হওয়া আর ভাষিক জ্ঞান অর্জনেও ভিন্নতা রয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্রদের ইংরজি আরবিতে অনেকটা কাঁচা থাকার কারণ হচ্ছে শিক্ষা পদ্ধতির পশ্চাদগামীতা, উপযুক্ত ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব,  উপকরণের অপর্যাপ্ততা (scanty resources) এবং মৌখিক ব্যবহারের পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থতা।

          মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

          ______________________

          যারা এই আলোচনায় আগে অংশ গ্রহণ করেন নি তাদের জন্য নিচের কয়েকটি কথা

          আমরা ইতিপূর্বে ভারতের আদিবাসীদেরকে মূলের দিক দিয়ে দ্রাবিড় (সেমেটিক জাতির লোক) বলে নানান আলোচনা করেছি। বিভিন্ন অঞ্চলের নাম সেদিন সাধারণত গোত্র প্রধানের নাম বা ভাষার নাম থেকে হয়ে থাকত। এই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মত রয়েছে। হরপ্পা মোহেঞ্জোদারো সভ্যতা সেমেটিক উৎসেই দেখা হয়। আর এই লোকজন নূহের অধস্তন সেমের বংসদ্ভূদ জাতি। ইদানীং ড. মোহাম্মাদ হাননানের ‘বাঙালির ইতিহাস’ (১৯৯৮, ঢাকা: মিলন নাথ/অনুপম প্রকাশনী) নামে একটি বই দেখলাম। লেখক সেখানে বাঙালিদেরকে নূহ (আ) থেকে এভাবে দেখিয়েছেন: নূহ>হাম>হিন্দ>বঙ্গ (পৃ.১৯)। [এখানে পুরো জিনোলোজি ও আলোচনা উদ্ধৃত করার সুযোগ নেই]।

          আমাদের মধ্যে অতীতে এই মর্মেও আলোচনা হয়েছে যে দ্রাবিড় হচ্ছে ‘দার-আবি-ফিহর/ফীর’ –দ্রাবির (دار أبي فهر/فير) এই অপভ্রংশে সৃষ্ট শব্দ। অর্থাৎ আবু ফীর বা ফিহিরের বাসস্থান, এলাকা, দেশ (দার)।  আবু ফিহর বা ফীর নূহের এক অধঃস্তন পুরুষ। 

          আমার ৯.১ নম্বার মন্তব্যে দ্রাবিড় ও তাদের ভাষা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। এতে নীহাররঞ্জন রায় ও ড. অতুল সুরের কথাগুলো ভালোভাবে লক্ষণীয়। দ্রাবিড়দের ভাষা যদি সংস্কৃতের সমসাময়িক হয়, অথবা দু/এক শতাব্দীর একদিক সেদিক হয়, তবে দ্রাবিড়ের ভাষা কী –তা ভাল্ভাবে নিশ্চিত না করে সংস্কৃতে কিছু শব্দের উপস্থিতি দেখালেই সংস্কৃত ভাষাকে এই অঞ্চলের সকল ভাষার মা বলা দুষ্কর হবে, যেভাবে সমসাময়িক উর্দু-হিন্দি-বাংলার শব্দের মিল আছে দেখিয়ে কোনো পরবর্তী কালে একটিকে অন্যটির উৎস কঠিন হবে। সংস্কৃতের আলোচনা ৬ নম্বার মন্তব্যেও এসেছে।  তাছাড়া  ১৪.১.১.১ মন্তব্যেও বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তারপর বর্তমান স্লটের ১৭.২ কমেন্টেও এই আলোচনা আছেন। ২৩ নম্বার মন্তব্যে এবনে গোলাম সামাদের লেখাটি লিঙ্ক করেছি -যা গুরুত্বের দাবি রাখে। 

  12. 16
    শাহবাজ নজরুল

    এই বিষয়ে ভালই আলোচনা হলো। কমেন্ট গুলো থেকে গুছিয়ে নিয়ে আরো কিছু লিখা দিতে পারেন। আরেকটা অনুরোধ থাকলো -- বাঙালিয়ানার বিষয়ে যে বইগুলো আছে সেগুলোর একটা তালিকা দিন। কম্প্রিহেনসিভ তালিকা। ইচ্ছুক পাঠকগণ হয়ত তখন প্রয়োজনবোধে বইগুলো সংগ্রহ করে পড়ে নিতে পারবেন। 

    1. 16.1
      এম_আহমদ

      @শাহবাজ নজরুল: আমরা বাঙালিয়ানার যে বিষয় আলোচনা করছি তা লিস্ট করে পাঠ করার মত কিছু বলে মনে হয় না। এর উদাহরণ পশ্চিমা বিশ্বে জায়োনিস্ট আদর্শের বক্তব্যের মত। আপনি কোথায় এমন কিছু পাবেন না যে লেখক বলছে আমি ‘এই পক্ষের’ লোক এবং এই উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। বরং তাদের কথা লক্ষ্য করার স্থান হয় তাদের discourse এ, (technically, a discourse is a field in which a subject is spoken in some particular ways). কমেন্টগুলো গুছিয়ে একটা কিছু করলে খুব ভাল হয়, তবে আপাতত একটি ব্লগ তৈরি করেছি এই শিরোনামে, আবহমান কালের বাঙালিয়ানা –পরিশিষ্ট। পরে এর উপর আরো কিছু কাজ করার ইচ্ছা রাখি। প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ।

      1. 16.1.1
        শাহবাজ নজরুল

        লেখা সহ কমেন্টে অনেক বইয়ের নাম এসেছে রেফারেন্স হিসেবে -- আমি সেই বইগুলোর কথাই বলছিলাম। যেমন -- 

        ১. Chowdhury, M. A. (2008).  Buddhism in South Asia. London: London Institute of South Asia, P.30
        ২. প্রাগুক্ত, গোপাল হালদার, ১৯৮০:৬৩

        ইত্যাদি। 

        অর্থাত, আমি পক্ষের বা বিপক্ষের বইয়ের কথা বলছি না -- বরং discourse এর কথাই বলছিলাম। অন্য কথায়, যে কয়টি বইয়ের নাম রেফারেন্স হিসেবে এসেছে তা একসাথে একটি কমেন্টে থাকলে ভালো হত, এই যা।  

        1. 16.1.1.1
          এম_আহমদ

          @শাহবাজ নজরুল:

          ওকে, এবারে বুঝতে পারছি। এক্ষেত্রে, আমি অনেক আগে আরেকটি মন্তব্যে নিম্নোক্ত লিস্ট দিয়েছিলাম,  যেটি এখানের নানান বিষয়াদির ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে (কোনো নির্দিষ্ট বা একক বিষয় হিসেবে নয়)।

          _____  

          আমার স্টাডিতে বাংলায় ইতিহাসের উপর যে কয়টি বই-পুস্তক আছে, তন্মধ্যে যেগুলো সরাসরি ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করে তার উল্লেখ নিচে করেছি। তবে যে সব বই অন্যান্য বিষয়ের প্রেক্ষিত থেকে inter-disciplinary আলোচনায় ইতিহাস নিয়ে এসেছে সেসবের ইনভেন্ট্রি তৈরি করা অনেক সময় সাপেক্ষ। এগুলোর কয়েকটি বই ছাড়া সর্বত্রই এমন এহসাস পাওয়া যায় যে ইতিহাসের ডিসকোর্সটি  ব্রাহ্মণ্য প্রভাবিত মহলের কন্ট্রোলে। আবার একথাও বলা যাবে না যে ‘অমুক’ ব্যক্তি  ইচ্ছা করেই এভাবে লিখে যাচ্ছে, বরং লিখার voice, এবং তার ধারা discourse-ই প্রভাবিত ও নির্ধারণ করে। অনেক গবেষণায় গবেষক নিজেদের অজান্তেই সেই discursive ধারায় চলে যেতে হয়। এর ঊর্ধ্বে উঠতে হলে গভীর প্রয়াসের প্রয়োজন। আমাদের ইতিহাসের ছাত্ররা reactionary পন্থা অতিক্রম করে এবং নৈরাশ্য ত্যাগ করে subject এর গভীরে গিয়ে প্রত্যেকটি biased  ধারণার structural relationship প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা আপনাতেই প্রমাণ করবে যে ইতিহাসের ব্যাখ্যা একটি পক্ষের হাতে যেভাবে সাজানো হয়েছে বাস্তবতাকে অন্যান্য ব্যাখ্যায় আনার অবকাশ রয়েছে। যে কাজটি করতে হবে সেটা হল repressed history –কে সনাক্ত করে পুনঃ ব্যাখ্যা দান। (তবে আগেই বলেছি, এই লিস্টের বইগুলোকে যে marginal উপপাদ্য হিসেবে হাতে তুলে নিতে হবে এমনটা নয়, এটা আমার সংগ্রহ হিসেবে দিচ্ছি।)

           
          ১। নিহাররঞ্জন রায়, (১৪১২ বাংলা), বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, কলিকাতাঃ দে’জ পাবলিকেশন
          ২। রাখাল বন্দ্যোপাধ্যায়, (২০০৮),বাঙ্গালার ইতিহাস, (অখণ্ড সংস্করণ), কলিকাতাঃ দে’জ পাবলিকেশন
          ৩। কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, (২০০০),মধ্যযুগে বাংলা, কলিকাতাঃ দে’জ পাবলিকেশন
          ৪। ড. কিরণচন্ত্র চৌধুরী, (১৯৯৫), ভারতের ইতিহাসকথা, প্রাচীন যুগ (সাম্মানিক সংস্করণ) কলিকাতা: নিউ সেন্ট্রাল বুক এজেন্সি (প্রাঃ) লিমিটেড
          ৫। ড. অতুল সুর, (১৯৮৬), বাংলা ও বাংগালীর বিবর্তন, কলকাতা: সাহিত্যলোক
          ৬। ড. এম, এ, রহীম, (১৯৮২), বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ঢাকা: বাংলা একাডেমী
          ৭। ড. এম, এ, রহীম, (১৯৭৬), বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, (১৭৫৭-১৯৪৭), ঢাকা: নূর জাহান রহীম
          ৮। ড. আহমদ শরীফ (১৯৯২) বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব, কলিকাতা:
          ৯। অজয় রায়, (১৯৭৭), বাঙলা ও বাঙালী, ঢাকা: বাংলা একাডেমী
          ১০। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, (১৯৯৬), ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

          ১১। Chowdhury, M. A. (2008).  Buddhism in South Asia. Lonon: London Institute of South Asia

          ১২। Masood, S. (1981). Victims of Indian Secularism, (The Indian Muslims). London: Indian Muslim Relief Committee.

          ১৩। জয়া চ্যাটার্জী, (২০০৩), বাঙলা ভাগ হল, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ, ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (অনুবাদক, আবু জাফর, অনুবাদ সম্পাদক বদিউদ্দিন নাজির)

          ১৪। ডব্লিউ ডব্লিঊ হান্টার, (১৯৮১), দি ইন্ডিয়ান মুসলমান, ঢাকা: খোশরোজ কিতাব মহল

          ১৫। গুলবদন বেগম, (১৯৭৮), হুমায়ন নামা, ঢাকা: বাংলা একাডেমী (অনুবাদক, মোস্তফা হারুন)

          ১৬। বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর [অনুবাদক], (১৩৬৯ বাংলা), সম্রাট জাহাঙ্গিরের আত্মজীবনী, ঢাকা: বাংলা একাডেমী

          ১৭। আবুল হাসান আলী নাদভী, (২০০৪), ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবদান, চট্টগ্রাম: সেন্টার ফর রিসার্চ অন দ্যা কুরআন এন্ড সুন্নাহ [অনুবাদক,  অধ্যাপক আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন]

          ১৮। বদরুদ্দীন উমর, (২০০৫), বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি,ঢাকা: শ্রাবণ

          ১৯। আবুল মওদুদ, (১৯৮০), ওহাবী আন্দোলন, ঢাকা: আহমদ পাব্লিশিং হাউস

           
          ঐতিহাসিক সমালোচনা/প্রবন্ধ/দর্শন/টেক্সটবুক/সাহিত্য কেন্দিক আলোচনায় ইতিহাস

          ১। এস, মুজ্জিবুল্লাহ (১৯৮১), বিতণ্ডা, ঢাকা: সৈয়দ রহমতউল্লাহ
          ২। আবুল হোসেন ভট্টাচার্য্য, (১৯৮২), মূর্তিপূজার গোড়ার কথা, ঢাকা: ইসলাম প্রচার সমিতি

          ৩। আখতার ফারুক,(১৯৭৬), বাংগালীর ইতিকথা, ঢাকা:জুলকারনাইন পাবলিকেশন
          ৪। বদরুদ্দীন উমর, (২০০৫), সংস্কৃতির সংকট, ঢাকা: মুক্তধারা
          ৫। বদরুদ্দীন উমর, (১৯৮০), সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, ঢাকা: মুক্তধারা

          ৬। মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (১৯৮০), বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলন, ঢাকা: ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ
          ৭। ড. আব্দুল হাই ঢালী, (১৩৯৪ বাংলা), বাংলাদেশ-দর্শন, ঢাকা: এম, এ, ওহাব, মিতা ট্রেডার্স
          ৮। ড. অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, (১৯৮৭), বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, কলিকাতা: শরৎ পাবলিশিং হাউস
          ৯। গোপাল হালদার (১৯৮০), বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা, (প্রাচীন ও মধ্য যুগ) ঢাকা: মুক্তধারা

          ১০। আ.ন.ম বজলুর রশীদ (১৯৭৭) আমাদের সূফী সাধক, ঢাকা: ইসলামী ফাইন্ডেশন
          ১১। কে আলী, (সপ্তদশ সংস্করণ ১৯৮২) বাংলাদেশ ও পাক-ভারতের মুসলমানদের ইতিহাস, ঢাকা: আলী পাবলিকেশন, (Intermediate text book)

          স্থানীয় ইতিহাস থেকে রাস্ট্রিয় ইতিহাস
          ১। অচ্যুৎচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, (২০০৬), শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, ঢাকা: লেখক সমবায়

          ২। দেওয়ান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, (১৯৯৭), জালালাবাদের কথা, ঢাকা: বাংলা একাডেমী
          ৩। সৈয়দ ইসলাহ উদ্দিন আহমদ, (২০০৫), দারিদ্র বিমোচনের সংগ্রাম, ঢাকা: উৎস প্রকাশন
          ৪। মুহাম্মদ আসাদ্দর আলী, (২০০৩), আসাদ্দর রচনা সমগ্র, সিলেট: রেনূ লুৎফা (প্রকাশক) 

          (অপর মন্তব্য নিয়ে আরো কিছু বলব তবে আজ নয়)

  13. 15
    Sk Jony

    আমরা ভাল জিনিস গ্রহন করতে পারি না, পারি শুধু কুফল গুলো গ্রহন করতে.

    1. 15.1
      এম_আহমদ

      @Sk Jony: Jony সাহেব আপনার এক বাক্যের মন্তব্যের জন্য ধন্যবান। তবে এই বাক্যটি চলতি আলোচনায় কোনো অর্থ বহন করে না। করবে, যদি এটাকে বর্ধিত করেন এবং আলোচনায় contexual করেন। সদালাপে নতুন দেখছি, তাই স্বাগতম।

  14. 14
    ফাতমী

    ফেইসবুকে ফরিদ আহমদ (Farid Ahmed) তাঁর স্ট্যাটাসে গতকালকে লিখেনঃ

    বাংলা ভাষার তিন যুগে তিন ধর্মের লোক অবদান রেখেছে। এর প্রাচীন যুগটা পুরোটাই বৌদ্ধদের। তাদের হাত দিয়ে শুরু হয়েছে এই ভাষার সাহিত্যের পথচলা। প্রথম দীপাবলী জ্বালিয়েছে তারা। মধ্যযুগে একে আপন করে নিয়েছে মুসলমানেরা। গভীর ভালবাসা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে এর অস্তিত্ব। আর আধুনিক যুগে একে চরম উৎকর্ষের জায়গায় নিয়ে গিয়েছে হিন্দুরা।

    মুসলমান প্রভাবের পূর্বে বাংলা ভাষা ছিলো অনাদর আর উপেক্ষার ভাষা। বঙ্গীয় চাষারাই শুধু এই ভাষার পৃষ্ঠপোষক ছিলো। পণ্ডিতেরা নস্যাধার হতে নস্য গ্রহণ করে শিখা দুলিয়ে দেবভাষা সংস্কৃত থেকে শ্লোকের আবৃত্তি করতেন। 'তৈলাধার পাত্র' নাকি 'পাত্রাধার তৈল', এই নিয়ে ঘোর বিচারে প্রবৃত্ত হতেন। ইতরের ভাষা বলে বাংলা ভাষাকে পণ্ডিতেরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন। হাড়ি ডোমের স্পর্শ থেকে ব্রাহ্মণেরা যেমন দূরে থাকে, বাংলা ভাষাও তেমনি সুধী সমাজের কাছে অপাংক্তেয় ছিলো। ছিলো ঘৃণা, অনাদর আর উপেক্ষার পাত্র।

    দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন, 'কিন্তু হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভিতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবারীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোন শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিলো।

    মুসলমান বিজয় বাঙ্গলাভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল। গৌড়দেশ মুসলমানগণের অধিকৃত হইয়া গেল, -- তাঁহারা ইরান, তুরাণ যে দেশ হইতেই আসুক না কেন, বঙ্গদেশ বিজয় করিয়া বাঙ্গালী সাজিলেন। আজ হিন্দুর নিকট বাঙ্গলাদেশ যেমন মাতৃভূমি, সেইদিন হইতে মুসলমানের নিকট বাঙ্গলাদেশ তেমনই মাতৃভূমি হইল। তাঁহারা বাণিজ্যের অছিলায় এদেশ হইতে রত্নাহরণ করিতে আসেন নাই, তাঁহারা এদেশে আসিয়া দস্তুর মত এদেশ-বাসী হইয়া পড়িলেন। হিন্দুর নিকট বাঙ্গলা ভাষা যেমন আপনার, মুসলমানের নিকট উহা তদপেক্ষা বেশী আপনার হইয়া পড়িল। বঙ্গভাষা অবশ্য বহু পূর্ব্ব হইতে এদেশে প্রচলিত ছিল, বুদ্ধদেবের সময়ও ইহা ছিল, আমরা ললিত বিস্তরে তাহার প্রমাণ পাইতেছি। কিন্তু বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবেনা।'

    মুসলমান সম্রাটেরা শুনলেন রামায়ন, মহাভারতের কথা। পণ্ডিত রেখে সংস্কৃত শেখার সময় তাদের নেই। হুকুম দিলেন দেশি ভাষায় রামায়ন, মহাভারত আর ভাগবত রচনা করো। হুকুম শুনে পণ্ডিতদের মুখ চুন। ইতরের ভাষায় দেবভাষা অনুবাদ করতে হবে। কিন্তু জানের মায়া আগে। কাজেই সব কিছু অনুবাদ হতে থাকলো দেশি ভাষায়। সাজ সাজ রব পড়লো বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে। মণি-মাণিক্য সব এসে জড়ো হতে থাকলো অকাতরে। মুসলমান কবিরা বড় আদর করে বাংলা ভাষার নাম দিলেন দেশি ভাষা। বিনা দেশি ভাষা পুরে কী মনের আশা।

    মুসলমান কবিদের অনেক পদ শোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বৈষ্ণব সাহিত্যকেও অলংকৃত করেছে। সৈয়দ মর্ত্তুজা, সেক ভিকন, শাল বেগ, গরিব খাঁ, চাঁদ কাজি, আলাওল, অলিরাজা, নাসীর মাহমুদ, এরকম বেশি কিছু মুসলমান কবি রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনা করেছেন। বৈষ্ণবদাসের 'পদকল্পতরু' গ্রন্থে এগারো জন মুসলমান কবির গান রয়েছে। শালবেগের পদগুলো এতোই মধুর ছিলো যে, সেগুলো আজো পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে গাওয়া হয়।

    মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন মুসলমান কবি চাঁদ কাজির লেখা এরকমই একটা গানের নমুনা দেখি আজ।

    বাঁশী বাজান জানে না।
    অসময়ে বাঁজাও বাঁশী মন তো মানে না।।
    যখন আমি বৈসা থাকি গুরুজনের মাঝে।
    তুমি নাম ধরি বাজাও বাঁশী আমি মরি লাজে।।
    ওপার হৈতে বাজাও বাঁশী এপার হৈতে শুনি।
    অভাগীয়া নারী আমি সাঁতার নাহি জানি।।
    যে ঝাড়ের বাঁশের বাঁশী সে ঝাড়ের লাগ পাঙ।
    জড়ে মূলে উপড়িয়া যমুনায় ভাসাঙ।।
    চাঁদ কাজি বলে বাঁশী শুনে ঝুরে মরি।
    জীমু না জীমু না আমি না দেখিলে হরি।।

    লিংকঃ https://www.facebook.com/farid.ahmed.9615/posts/10154899268000183

    @আহমদ ভাই,

    এখানেও দেখেন, মুসলিম লেখকদের লেখা ঠিকই বুঝা যায়, স্পষ্ট রূপে। আপনি এই পোস্টে আলচিত কথাগুলির সারমর্ম নিয়ে নতুন একটি পোস্ট দিতে পারেন।

    -ধন্যবাদ।

    1. 14.1
      এম_আহমদ

      @ফাতমী: ফাতমী ভাই, সালাম। "আজ মীর কাসেম আলীর মন ভাল"! তাই আপনার সাথে অনেক কথা বলব। প্রথমত, যে প্রাসঙ্গিক কথা নিয়ে এসেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ। তবে কবি চাঁদ এত পুরাতন নয় যে তার লেখা বুঝা যাবে না। তার জন্মকাল আনুমানিক ১৬ শো শতাব্দীর মধ্যভাগে (১৫৫৫/৬৫) এদিক থেকে তার প্রাপ্ত বয়সের লেখা ১৬ শো শতাব্দীর একেবারে শেষ দিকের এবং ১৭ শো শতাব্দীর একেবারে প্রথম দিকের হয়ে থাকবে। (এখানে একটা অনুমান দেখুন)। এই কালে তো অবশ্যই বাংলা ছিল, এখানে দ্বিমতের কোনো স্থান নেই। পনেরো ও ষোল শো শতাব্দী মূলত মধ্যযুগ নয় বরং প্রি-মডার্ন, ইউরোপে age of reason  বা যুক্তির যুগও বলা হয়ে থাকে, (কেই কেউ তা টেনে ১৭ শো শতকের শেষ দিক পর্যন্ত টেনে এনলাইটনম্যান্টে যান)। যুগ-বিভাজন নিয়ে আমার কিছু আলোচনা এখানে স্থান পেয়েছে, ‘ইউরোপে আঁধার থেকে আলোর যুগ’।

      আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন যে ইতিহাসের যে অংশে আমাদের কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই সেখানে দৃঢ়তার সাথে কথা বলতে সতর্কতা অবলম্বন করছি। তবে আপনার এই স্ট্যাটাসের অনেক কথা আমাদের মন্তব্যগুলো জুড়ে আছে। বৌদ্ধদেরকে শেষ করে দিতে, অন্যতায়, হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনতে যেসব কৌশল ও বাস্তবতার কথার ৯.১ কমেন্টে উল্লেখ হয়েছে, সে উদ্ধৃতিগুলো দেখুন।

      এই আলোচনা ভাষার আংশিক দিক থেকে হচ্ছে -ভারতে বৌদ্ধদের উত্থান পতন নিয়ে নয়, না হলে ব্রাহ্মণ্যবাদী আচরণের দিকগুলো আরও স্পষ্ট করে আনা যেত। বাংলা যে বৌদ্ধ-মুসলিম এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে গড়ে উঠছিল –এটা সঠিকভাবেই অনুমান করা যেতে পারে। এই ভূখণ্ডে মুসলিমদের আগমনে ও ক্ষমতার উত্থানে অনেক রকমের কল্যাণ ছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদী কৌশল ও ষড়যন্ত্রের প্রবহমান কালে মুসলিমরা বৌদ্ধদের পাশে দাঁড়ানো ছিল মহান ও স্মরণীয় বিষয়। ড. মুনিম চৌধুরী (2008:xiv) বলেন, ‘The irony is that despite this success [of exterminating/returning to Hinduism], Brahminism’s hegemonic dream remained unfulfilled due to the presence of another humanitarian force: The Muslims, whom the Bengali Buddhists had received as the allies.’ তবে

      কেউ যদি দাবী করেন যে প্রাচীন যুগে বৌদ্ধদের হাতে বাংলা গড়ে উঠেছে, তবে তাদেরকে  প্রথমে ‘স্পষ্টভাবে’ সেই যুগটি define করতে হবে এবং ভাষার specimen দিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যদি তা করা যায়, তবে সেই থিওরি গ্রহণ করতে বাধা কীসের? এসব অধ্যয়ন খোলামনে হতে হবে এবং পেশাদারিত্বের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সদিচ্ছার পরও যদি ভুল থেকে যায়, যাক। এটাই ছিল বিদ্যার জগতে মুসলমানদের আচরণ।

      তবে আমরা যেন কোনোভাবেই ব্রাহ্মণ্যবাদী উদ্দেশ্যে এই মর্মে প্রভাবিত  না হই যে বাংলার ইতিহাস ও উদ্ভাবন মুসলিমদের বাইরেই দেখতে হবে। অনেক সময় দ্রষ্টার নানাবিধ repeated প্রচেষ্টা এবং জেদি কর্মকাণ্ডে এক ধরণের ‘ছায়াময়ী’ বক্তব্যধারা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীদের হাতে তা বাস্তব অনুভূত হতে থাকে। 

      মুসলমানদের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে তারা যেখানে গিয়েছে সেই স্থানকে তাদের আপন করে নিয়েছে, ভাষা আত্মস্থ করেছে এবং সাথে রেখেছে তাদের দ্বীন-ধর্ম। এই বিশ্বই তাদের ‘আবাসস্থল’। তাদের কোরান ভাষা-বিদ্বেষ বিবর্জিত। আরবি কোরান নির্দ্বিধায় বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেছে –ভাষা এভাবেই তার সৌন্দর্যে বিকশিত হয়, প্রাচুর্যমণ্ডিত হয়। যেখানে যা শোভা পায় তাতে এলার্জি থাকা জরুরি নয়। (ইসলাম বিদ্বেষী ভাষাতত্ত্বমূর্খরা আরবি কোরানে বিদেশি শব্দ দেখে নাক উঁচু করে বলে, ‘তোমাদের আরবি কোরানে তো বিদেশি শব্দ দেখছি!’ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রকৃতি মূলত সংকর। যে শব্দ ‘অনায়াসে’ ভাষায় ধারিত হয়ে যায়, তা তখন ঐ ভাষার অংশ হয়ে যায়)।

      আবার মুসলিমগণ যেখানে যে জাতিতে জ্ঞান দেখেছে সেখানে তা আহরণ করেছে। বাগদাদে হারুনুর রাশিদের সময় যে ‘দারুল হিকমাহ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে শুধু বিজ্ঞান চর্চাই হত না বরং দর্শনসহ সেদিনের যাবতীয় বিদ্যা। গ্রীকদের হাতে যা কিছু জ্ঞান/বিজ্ঞান হিসেবে গৃহীত ও রচিত ছিল তার অনুবাদের ব্যবস্থা হয়েছিল। কারো কাছ থেকে ভাল জিনিস শিখতে মুসলমানগণ কখনো কাঁচুমাচু করেনি। এই মর্মে হাদিস আছে যে জ্ঞান হচ্ছে মুমিনের [মুমিন এখানে জেনেরিক অর্থে] হারানো সম্পদ, যেখানেই তা পাও গ্রহণ কর। আরও এসেছে, তোমরা জ্ঞানকে (কলা-কৌশলকে/صناعات) কৌশলী পণ্ডিত ও জ্ঞানীদের কাছ (أهل الصناعات) আহরণ কর। ভারতে এসেও সব জ্ঞানে বিচরণ রেখেছে, এমন কি সংগীতেও।

      কালের পরিক্রমায় ব্রাহ্মণগণ তাদেরকে কদর্যেই দেখেছে, তো দেখুক। সেদিন বাংলা ভাষাকে যে তারা হীন দৃষ্টিতে দেখত, অশুদ্ধ ভাষা ভাবত তা উপরে আলোচিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে আপনার কাছে যা ‘অশুদ্ধ’, সুযোগ ও শক্তি পেলে, তাকে ‘শুদ্ধ’ করেই ছাড়বেন –এটাই expected. ইংরেজ যুগে যখন তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হল এবং বাংলার হর্তাকর্তা হল, তখন ‘অশুদ্ধ’ বাংলাকে তারা ‘শুদ্ধ’ করে ছাড়ল। কী দিয়ে? বাংলার কিবলা সংস্কৃতের দিকে ফিরিয়ে। শব্দভাণ্ডারে তৎসম (তার সম অর্থাৎ সংস্কৃতসম) ও তদ্ভবের (তাত্থেকে উদ্ভূত করে অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে) জোয়ার বইল।

      ইংরেজ আমলে মুসলমানরা যখন দাঁড়াবার শক্তি পাচ্ছিল না তখন ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশ নিয়ে চিন্তার সুযোগ ছিল না। ভাষার বিকাশ হয় জনগোষ্ঠীর  সামাজিক নিরাপত্তা ও অবসর (leisure) সময়কে কেন্দ্র করে, (যেমন মুসলিম যুগে বৌদ্ধ, মুসলিম ও অব্রাহ্মণদের হাতে তা’ই এসেছিল)। ঠিক সেটিই এসেছিল ইংরেজ আমলে হিন্দু জমিদারদের হাতে। ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর খেয়ে-ধেয়ে কাজ নাই (জমিদার) –তাই তারা খই ভেজেছে। মুসলমানদেরকে গালি-গালাজ করেছে, তাদের যাকিছু ভাল, তাতে মন্দ ব্যাখ্যা জুড়েছে, তাদের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার করেছে।

      এই সেদিন কালের আবর্তে কাজি পরিবারের এক নিঃস্ব সন্তান (নজরুল) ছনের কুড়ে ঘর থেকে এসে যা রচনা করেছেন তাতেও রয়েছে সমাজের সকল শ্রেণী, সেকি বিমল সৌন্দর্য, সেই বাংলার বিকাশ যুগের এক চমক (তবে আপাতত কোন গভীর আলোচনায় যাওয়ার দরকার নেই)। তার তুলনায় জমিদার রবীন্দ্রনাথের লেখা দেখুন। আপনি সেখানে মুসলিম খোঁজতে হলে ‘লণ্ঠন’ জ্বালিয়ে ঘুরতে হবে (আবার মনে রাখবেন, আমি কারও বিরোধী নয়, বাস্তবতার উল্লেখ করছি মাত্র)। নজরুলকে কতনা নাকানি চোবানি খেতে হয়েছে। (এক ব্যক্তির যে মানসিকতা সে তো সেই আলোকেই লিখবে –সে আর কী করবে?) নজরুল চাপা-আক্রোশে এবং মনে হয় একাই যেন বাংলার সাথে আবার সেই উর্দু ফার্সি, আরবির সংযোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন। কী দাপট দেখুন এখানে, “নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/আম্মা গো! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া!” এমন আরও অনেক কবিতা রয়েছে এবং সার্বিকভাবে বাক্য যেখানে যে শব্দের আগ্রহ প্রকাশ করেছে তিনি তা সেখানে স্থাপন করতে কমই দ্বিধাবোধ করেছেন। (তবে নজরুল যে বিভিন্ন প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন, এটাও নয়, সে আলোচনা ভিন্ন)।

      আজকে আপনাদের যুগ, আমাদের নয়। আমরা যারা দেশ ছেড়ে চলে এসেছি, আমরা এদেশকে (ব্রিটেনকে) আমাদের প্রথা অনুযায়ী গ্রহণ করেছি, যদিও এ-দেশবাসী আমাদেরকে খুব একটা অন্তঃকরণে মেনে নিতে পারেনি আমাদেরও দোষ আছে, সেটাও ভিন্ন কথা)। আমাদেরকে ইংরেজিতে চর্চা করতে হবে, আর আপনারা বাংলায়। কিন্তু কই, এই কয় বছর ধরে যা লিখছি তা তো বাংলায়। এমনটি হঠাৎ হয়ে গিয়েছে। এক্সিডেন্ট বলতে পারেন। আমার এই লেখা থেকে আমার ছেলেমেয়েরা ও তাদের প্রজন্মের কেউ কিছু পাবেনা। আবার যে পর্যায়ে লিখছি –তা সাধারণ পর্যায়, চক্রান্তের শিকার হওয়া বাঙলার মূর্খ ফ্যাসিস্টদের অবস্থা দর্শনে।

      স্পষ্টতই সেদিনের বৌদ্ধদের মত মুসলিম জাতীয় সত্তাটিকে, বৃহত্তর পরিধিতে, পৌত্তলিকতা ও নাস্তিক্যবাদ ছেয়ে নিয়েছে (অনেক কিছু এখনো ‘অদৃশ্য’)। তাদের সত্তা নিয়ে বাঁচা আজ মুস্কিল। এই মাস ডিসেম্বর। তারপর জানুয়ারি, তারপর ফেব্রুয়ারি, তারপর মার্চ। এই মাসগুলো ঘিরে যেসব প্রতীকী কর্ম, ভাষার ব্যবহার, ফিল্ম, নাটক, গান রয়েছে এবং মিডিয়া যেসব ধারণা যেভাবে সম্প্রচার করে, এবং দিনের পর দিন, বৎসরের পর বৎসর, যুগের পর যুগ যেভাবে করছে, সেগুলোর পরতে পরতে যাকিছু মিশে আছে তা কিন্তু সুখের নয় এবং এসবেই বাচ্চারা ইন্ডক্ট্রিনেট হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে ইউনি পর্যন্ত জাতিকে যে মানসিকতায় তৈরি করে তোলা হচ্ছে তাও সুখের নয়।

      একটি জাতি বিত্তশালী হওয়াই শেষ কথা নয়। ইউরোপের অবস্থা দেখুন, এত বিত্তের পর পর সেকি নিরাশা, জাহান্নামের জ্বালা, আর যৌনতার ছড়াছড়ি। আপনার দেশের ছেলে-মেয়েরা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে –একটু দেখুন।  

      বলেছি এটা আপনাদের যুগ, আমাদের নয়। জাতীয় মানসিকতা, সংস্কৃতি, ‘ইতিহাস ব্যাখ্যা’ ফ্যাসিবাদ, বাঙালীনা (বিশেষ অর্থের) –এগুলো হঠাৎ হয়ে যাওয়া কিছু নয়। এগুলো কয়েক দশকে হয়েছে।

      ইউরোপ অতি সামান্য সংখ্যক জায়োনিস্টদের হাতে কব্জাবদ্ধ। ক্ষমতা কব্জাবদ্ধ করতে বিরাট সংখ্যার প্রয়োজন হয় না। মানসিকতা তৈরির উপযোগী শিক্ষা-ব্যবস্থা ও মিডিয়া থাকলে আপনার ‘গোলামগণ’ দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকেও ‘মুক্তির সংগীত’ নেচে-নেচে গাইতে পারে, তাদের অবস্থান যে কত ‘স্বাধীন’ সেই দর্শন ব্যাখ্যা করতে করতে মুখে ফেনা তুলতে পারে।

      আজকে বাংলাদেশের মুসলিম সত্তার টুটি চেপে ধরা হয়েছে।

      অনেক কথা হল। আপনার রাজনৈতিক ধারণায় আমার কোনো কথা খাপ নে খেলে মনে কিছু করবেন না। আমি শুধু আমার কথাই বলে যাচ্ছি। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

      1. 14.1.1
        শাহবাজ নজরুল

        তবে মনে রাখতে হবে আপনার কাছে যা ‘অশুদ্ধ’, সুযোগ ও শক্তি পেলে, তাকে ‘শুদ্ধ’ করেই ছাড়বেন –এটাই expected. ইংরেজ যুগে যখন তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হল এবং বাংলার হর্তাকর্তা হল, তখন ‘অশুদ্ধ’ বাংলাকে তারা ‘শুদ্ধ’ করে ছাড়ল। কী দিয়ে? বাংলার কিবলা সংস্কৃতের দিকে ফিরিয়ে। শব্দভাণ্ডারে তৎসম (তার সম অর্থাৎ সংস্কৃতসম) ও তদ্ভবের (তাত্থেকে উদ্ভূত করে অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে) জোয়ার বইল। 

        এই জায়গাতে "বাংলার কিবলা সংস্কৃতের দিকে ফিরিয়ে" -- এই অংশটুকুর ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়। হিসেবেই তো দেখা যায় প্রায় ৯০ শতাংশ বা তার বেশি শব্দ তত্সম কিংবা তদ্ভব -- এটাকে আপনি কিভাবে অস্বীকার করবেন? আর আধুনিক কালে ভাষাবিদরা তো বাংলা সহ সকল উত্তর ভারতীয় ও নেপালি ভাষাকে সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত বলেই বলছেন। নাকি আপনার অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে? 

        1. 14.1.1.1
          এম_আহমদ

          @শাহবাজ নজরুল:  ভাই সালাম। বর্তমানে কত শতাংশ শব্দ কোন দিক থেকে এসেছে এই হিসেব কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে অনেক বৎসর আগে লণ্ডনের ওয়স্টমিন্টার লাইব্রেরীতে এক বড় আকারের বাংলা অভিধান দেখেছি যেখানে অনেক শব্দের উৎপত্তি দেখানো হয়েছিল। সেখানে সংস্কৃতিতের এত বেশি উপস্থিতি দেখি নি। তবে পরিমাণ যা'ই থাকুক, আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো বিষয়কে ‘অস্বীকার’ করা নয় –মোটেই না। যা আলোচিত হয়েছে তা ভাষা ঐতিহাসিকতার অংশ। এখন ভাষা যেভাবে আছে সেই অবস্থান থেকে ‘শুদ্ধিকরণের’ প্রয়োজন নেই। বরং আরবি, ফার্সি, উর্দু ইত্যাদির উপর যারা ক্ষ্যাপা তাদের ভাষাগত মুর্খামির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের দরকার এবং বাঙালীয়ানার মাধ্যমে (মুসলিমদের অবস্থান কেন্দ্রিক প্রেক্ষিতের মোকাবেলায়) যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাওয়া হচ্ছে সেই ব্যাপারে অবহিত হওয়া।  এক বিশেষ গোষ্ঠী এক সুদীর্ঘ কাল ব্যাপী বাংলা ভাষায় সংস্কৃতমুখী কার্যক্রম চালিয়ে যে বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে এই কাজের উদাহরণ দিয়ে যদি বলা হয় যে বাংলা সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত, তবে এটা গ্রহণীয় কথা হবে না। এই প্রেক্ষিতে কোনো অধ্যয়ণ শুরু হলে (an etymological study with philology and history) প্রথমে ব্রিটিশপূর্ব বাংলা দিয়ে অধ্যয়ন শুরু হবে। আমরা তো প্রাকৃতি ও পালি থেকে বাংলার উৎপত্তি নিয়েই এখানে আলোচনা করেছি। বৌদ্ধ-মুসলিমদের সংস্কৃত বর্জনেই তো এই ভাষার উদ্ভাবনী যাত্রা এবং এই  মর্মে তো অনেক আলোচনা ও উদ্ধৃতি এখানে এসেছে। তবে সংস্কৃত সর্বসাধারণের ভাষা কোনো দিনই ছিল না এবং ব্রাহ্মণগণ এই ভাষা সর্বসাধারণদের শিখতেও দিত না –এমন বাস্তবতাও ছিল। সর্বোপরি ভাষা সংক্রান্ত এসব বিষয়ে আলোচনা ও দ্বিমত সহসা শেষ হয়ে যাবার মত নয়। নতুন নতুন তথ্যের নতুন নতুন কথা (ব্যাখ্যা) আসবে এবং এই আলোচনা চলতেই থাকবে।

  15. 13
    এম_আহমদ

    এখানে ড. তুহিন মালিক সাহেব 'আবহমান কালের সংস্কৃতির' উপর কিছু কথা বলেছেন। [তুহিন মালেক ভিডিও] গভীরভাবে লক্ষ্য করুন কী বলা হচ্ছে। চলতি মাসের ২৫শে নভেম্বর বার্মিংহামে তার ও ফরহাদ মাজহার সাহেবের কিছু আলোচনা  শুনার সুযোগ হয়েছে এবং মনে হয়েছে আল্লাহ নিজেই কিছু মানুষকে তার দ্বীনের কাজ করিয়ে নেয়ার জন্য নির্বাচন করে ফেলেন। তাই তাদের ভাষার মধ্যে এমন কিছু angles সৃষ্টি করে দেন যা সহজেই মানুষের শ্রুতি, মননশীলতা ও যৌক্তিকতার স্থানে পৌঁছে যায়। ইংল্যান্ডে এসে তারা স্বাধীনভাবে যে কথাগুলো বলে যেতে পারছেন সেগুলোর ভিডিও যে যেখানে পান তা খেয়াল করে শুনে নিন।  তবে দেশের অনৈসলামী ও মোনাফেক শক্তির যৌথ মিলনের কারণে যে বাস্তবতা দেখা দিয়েছে তার জন্য নিরাশার প্রয়োজন নেই। এই সংগ্রাম চিরন্তন। আপনার নিজেকে শুধু জিজ্ঞেস করুন আপনি কোন পক্ষে। আর দোয়া করুন, হে আল্লাহ, আমাকে সত্যকে সত্যরূপে বুঝার তৌফিক দেন এবং তার অনুসরণ করার তৌফিক দেন এবং মিথ্যাকে মিথ্যারূপে দেখিয়ে দেন এবং তাত্থেকে সরে থাকতে তৌফিক দেন। তারপর দেখুন, আপনার পিয়ার গ্রুপের লোকগুলো কারা? আপনি কাদের যুক্তির বাহক? তারপর এই মর্মের কোরান হাদিস পাঠ করে নিন। এরপর আর বলার কিছু থাকবে না। 

  16. 12
    sami

    ভাই সালাম। বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে বেশ সময়োপযোগী এবং আগ্রহ জাগানিয় লেখা। লেখাটি মূলত তিনটি বিষয় উপর ফোকাস করে। বাংলা, বাঙালি জাতি, এবং বাঙালী সংস্কৃতি। বাংলাদেশ,বাঙ্গালা জাতি, এবং বাঙালি সংস্কৃতি ইতিহাস ধারা dynastic history র অবর্তমান। হিন্দু মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বিভিন্ন উপজাতির সমন্বয়ে বাংলা,বাঙালি সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে।বাংলা এবং বাঙালি জাতি উদ্ভব,ক্রমবিকাশ নিয়ে নৃতাত্তিকবিদ এবং ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে বাঙালি জাতিসত্তাকে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আলপীয় নৃগোষ্ঠীর সমন্বিত জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যাত করা যায়।আবার কিছু ঐতিহাসিকের অনুমান আর্যপূর্ব বাঙালি জাতিকেই বৈদিক ও সংস্কৃতি সাহিত্যে (হিন্দু পুরাণে) ‘অসুর’ বলে উল্লেখ করা হয়। আবার কিছু ঐতিহাসিক মোঙ্গল জাতির সংমিশ্রণ কথা বলেছেন বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ হাবাট রিজলি মোঙ্গল ও দ্রাবিড় সংমিশ্রণ ধারনাকে সমর্থন করেন।কিন্তু ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হাসান তার “বাঙ্গালার ইতিহাস” বইতে মোঙ্গল ও দ্রাবিড় কে জাতি হিসেবে না স্বকৃতি না দিয়ে শুধু ভাষাগত নাম বলে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে কিছু নৃতাত্তিকবিদ এবং ঐতিহাসিকদের বাঙালি বঙ্গ ও পুন্ড নামে আদিম অধিবাসী আবার অনেক বলেন কোল, ভীল, শবর।আবার কিছু সংখ্যা মতে পামির অঞ্চল থেকে আগত হোমো-আল্পাইন্স নামে জাতি স্থানীয় সংমিশ্রিত হয়ে বাঙ্গালায়ে ব্রাক্ষণ ও কায়স্থ সম্প্রদায়ে উদ্ভুব। বাঙালি জাতির খন্ড ইতিহাস দেখে ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ে তার বাঙ্গাল ইতিহাস বইতে ঐতিহাসিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই উদ্ধৃতি দেন “আমার বিশ্বাস বাঙালি একটি আত্মবিস্মৃত জাতি …বাঙ্গালার ইতিহাস এখনও তত পরিষ্কার হয়নি যে, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন বাঙালি নিনেভা ও ব্যাবিলন থেকে প্রাচীন অথবা চীনা থেকে প্রাচীন অথবা নতুন”।  

    প্রাচীন থেকে প্রাক-মুসলিম যুগ পর্যন্ত বাঙ্গালা বা বাঙ্গালাদেশ বা বঙ্গ নামে কোন দেশ ছিল না।সর্ব প্রথম বঙ্গ শব্দটি “ঐতরেয় আরণ্যকে”গ্রন্থে।রামায়ণ ও মহাভারতে এবং প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যে বঙ্গ শব্দের উল্লেখ আছে।মধ্যযুগ অর্থাৎ মুসলিম শাসন কালে বাঙ্গাল বা বঙ্গ শব্দদ্বয়ের সাথে বাংলা ভূখণ্ডে নামে পরিচিত লাভ করতে থাকে। এবং এর গোঁড়া পত্তন করেন সুলতান ইলিয়াস শাহ নিজেকে “শাহ-ই-বাংলা” উপাধি ধারণ করেন।ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার “আইন-ই-আকবরী” বাঙ্গালা শব্দের উৎপত্তি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছন। তার মতে “এই দেশের প্রাচীন নাম বঙ্গ বা বাং ।পণ্ডিতরা অনুমান করেন যে, বংগ থেকে বাংলা নামের উৎপত্তি হয়েছে।আবুল ফজল বলেন যে, প্রাচীনকালে বাংলার রাজারা দশ গজ উঁচু ও বিশ গজ চওড়া প্রকাণ্ড আল বা বাঁধ তৈরি করতেন।সম্ভবত বহিরাক্রমণ থেকে দেশকে সুরক্ষিত করার জন্য বিশেষ বিশেষ স্থানে মাটির তৈরি ছোট পাহাড়ের ন্যায় দুর্গ-প্রাচীর প্রস্তুত করা হতো।এ সমস্ত বাঁধের পাশে খাল বা নালা মানুষ যাতায়াত করার জন্য সাঁকো নির্মিত হতো। এ কারণ বঙ্গ ও আল এই দুটি শব্দের সংমিশ্নে হয়েছে”।কিন্তু ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তার মতে “বঙ্গ এবং বাঙ্গালা দুইটি পৃথক জনপদ এবং বাঙ্গালা দেশের নাম কালক্রমে সমগ্র দেশের বাংলা এই নামকরণ করা হয়েছে”।  

    বাংলার সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতির একক অবদান নেই বলে চলে। বিভিন্ন ধর্ম যেমন জৈনধর্মে থেকে শুরু করে বৌদ্ধ, হিন্দু,প্রভাব সবচেয়ে বেশি।খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলায় আগমনের পর বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামি সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার হয়।অনেকে পাল যুগের রচিত(বৌদ্ধ সাহিত্যিক দ্বারা তৈরি) ‘চর্যাপদ’কেই  বাংলা সাহিত্যে আদি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রকৃত পক্ষে ‘চর্যাপদ’কেই সাথে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

    1. 12.1
      এম_আহমদ

      @sami:  ভাই, ওয়া আলাইকুমস সালাম। প্রথমে এই সুন্দর মন্তব্যটির জন্য ধন্যবাদ।

      “বাংলাদেশ, বাঙ্গালা জাতি, এবং বাঙালি সংস্কৃতি ইতিহাস ধারা dynastic history র অবর্তমান” –এ কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হাসান’ এর লেখা পড়ার সুযোগ আমার হয় নি। তবে ‘দ্রাবিড়’ বিষয়টি ভাষা হিসেবে আরও অনেকে দেখেছেন। সৈয়দ মাহমুদুল হাসান যদি তাদেরকে জাতি হিসেবে বিবেচনা না করে ভাষাগত নাম বলে মত প্রকাশ করেন তবে এর পক্ষে যুক্তিটা কি হবে? তারপর ভাষাগত বিষয় হলেও, সেই ভাষিক জাতীয় সত্তা থাকবে না –এমন যুক্তির ব্যাপারে তার কি বলার থাকতে পারে সেটাও দেখা দরকার।

      ঐতরেয় আরণ্যকে যে ‘বঙ্গ’ শব্দের উল্লেখ হয়েছে তাতে তেমন কিছু প্রমাণ করে বলে মনে হয় না। এটা কি কোনো ভাষার নাম, বৃহৎ কোনো গোত্রের নাম, কোনো এলাকার নাম, কোন গোত্রের টোটেমে ধারিত প্রতীকী সত্তার নাম –ইত্যাদি কতকিছু হতে পারে। (আর যারা এই অঞ্চলের লোকদেরকে হরহামেশা গালিগালাজ করত তাদের ব্যবহৃত শব্দের কি অর্থ থাকতে পারে  তা বলা মুষ্কিল)। তবে অঞ্চল হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা মুসলিম ঐতিহাসিকগণ এবং পরিব্রাজক ইবন বতুতার ভ্রমণ কাহিনীতে স্থানই এসেছে।

      ভারতের ইতিহাস  রচনায় মুসলমানগণ যে ব্যাপক অবদান রেখেছেন তা আবার অধ্যয়নের প্রয়োজন। প্রাক-মুগল এবং আদি মুগল উৎসে মুসলমানদের স্থানই প্রধান। ডক্টর এম. এ. রহীম তার ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’ (বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত, ১৯৮২) পুস্তকে অনেক আরবি ফারসি পুস্তকের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। আজ বাংলার মুসলমানদের প্রয়োজন ব্রাহ্মণ রচিত ইতিহাসকে সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা (তবে বিদ্বেষভাবি না হয়ে) এবং নিজেদের উৎস থেকে ইতিহাসের পূর্নচর্চা করা। উদার মননশীলতা ও পেশাদারিত্বের সাথে সেই কাজ করা। যেখানে যে দল বা গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও বিকাশ তথ্যবাহিত হবে সেখানে তাদের স্বীকৃতি নির্দ্বিধায় সংযুক্ত করা।

      ‘আল’ কেন্দ্রিক বাঙ্গালা শব্দের উৎপত্তি অনেকের লেখায় স্থান পেয়েছে। তবে কেন যেন এটার দিকে মন তেমন সায় দেয় না।

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য আবারও ধন্যবাদ। তথ্য সম্বলিত মন্তব্য সর্বদাই লেখার অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে যায়।   

  17. 11
    শাহবাজ নজরুল

    বিশিষ্ট ব্লগ বুদ্ধিজীবী শ্রী বিপ্লব পাল এখানে এক অসাধারণ প্রস্তাবনা করে বসেছেন। বাঙালি মুসলমান নাকি কোরান/হাদিসে কখনো উত্সাহী ছিলেন না।  তারা মুহম্মদ (স.) এর বিষয়ে তেমন করে জানতেন না -- জানার ইচ্ছেও ছিল না। অনেকের বাসাতেই নাকি পূজা অর্চনাও করা হত। এই হাস্যকর বিষয়বস্তর একটা প্রত্যুত্তর থাকলে ভালো হত।   ভাবে দেখুন এ নিয়ে কিছু লেখা যায় কিনা?

    1. 11.1
      এম_আহমদ

      @শাহবাজ নজরুল: [New information –সবাইকে পাঠের আহবান রইল]

       বাঙালি মুসলমান নাকি কোরান/হাদিসে কখনো উত্সাহী ছিলেন না।  তারা মুহম্মদ (স.) এর বিষয়ে তেমন করে জানতেন না – জানার ইচ্ছেও ছিল না। অনেকের বাসাতেই নাকি পূজা অর্চনাও করা হত।

      (১) মনে হয় বিচ্ছিন্ন দুই-চারটা ঘটনাকে জেনরেলাইজড করে এমনটি বলা হয়েছে। তদানীন্তন ভারত বর্ষে এবং বিশেষ করে বঙ্গদেশে আরব ব্যবসায়ী এবং সুফি সাধকদের মাধ্যমে ইসলাম এসেছে এবং এই শ্রেণীর মুসলমানগণ এদেশকে নিজেদের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আরবরা তো আরবি জানবেই এবং প্রজন্ম পরম্পরায় আরবি এবং ইসলামীয়াত শেখাবেনই –এই প্রথা ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে প্রচলিত, কিছু কিছু স্থানে কিছু কিছু ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম ছাড়া। আমরা আমাদের বাচ্চাদেরে এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে সেটাই শিখিয়েছি এবং শিখিয়ে যাচ্ছিও। আমরা যেযুগের এবং যাদের কথা বলছি তারা যদি কোরান হাদিস না জেনে থাকবেন তবে এখানে কোন্‌ ধর্ম প্রচার করেছিলেন? ধর্ম প্রচারই তো ছিল কোরান ও হাদিস দিয়ে। তাছাড়া মুসলিম শাসন আমলে মুসলমানদের ঘরে আরবি ফার্সির সয়লাব বইছিল। প্রশাসনের কাজ ও বিচার আদালতে কাজি শারিয়ার আইন ব্যবহার করছেন, এগুলোর মৌলিক বইপুস্তক তো আরবিতেই। অনেক বড় পুস্তক সেদিন আরবিতে প্রণীত হয়েছে যেগুলো এখন আরবরাও পড়ে। এগুলোর পাঠ ও প্রশিক্ষণ ছিল। এই ১৮৫৭ সালে সিপাহি আন্দোলনের পর যখন হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয় এবং হাজার হাজারদের মিন্দানাওয়ে কালাপানিতে পাঠানো হয় তখন তাদের মধ্যে অসংখ্য আলেম ছিলেন। বৃহত্তর দেওবন্দ মাদ্রাসা তো ১৮৬০ এর দশকে  প্রতিষ্ঠিত হয়। সেদিনের (১৮৫৭)  আম্বালা কেসে এক সাথে ১৯০ জন আলেমকে ব্রিটিশ-রাজ হত্যা করে।

      তবে হ্যাঁ, যখন মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে (বা যে কোনো ধর্মে), তখন তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলার মত যথেষ্ট শিক্ষক সর্বত্র পাওয়া যায় না। এটা ইসলামের প্রাথমিক যুগে, মক্কা বিজয়ের পরেও, কিছু কিছু স্থানে হয়েছিল। আপনি একটি দেশের মানুষকে তো একটি জীবন ব্যবস্থা থেকে অপর একটি জীবন ব্যবস্থার যাবতীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে ফেলতে পারবেন না। এটা জেনারেশনের ব্যাপার হয়ে যায়। তবে মুসলমানগণ দেবদেবীর পূজা করে থাকবেন –এটা তো কারো বুঝে কুলিয়ে ওঠবে না। এমন দাবী কেউ করলে তা তো অবশ্যই substantiate করতে হবে। এই ব্যাপার আবার কোনো বিচ্ছিন্ন দুই/এক ব্যক্তি বা পরিবারের উদাহরণের ব্যাপার নয় –এটা সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখাতে হবে। খামাখা কথায় কান দিয়ে কি লাভ?

      আর কিছু লোক কেবল শোনা কথা ছড়িয়ে বেড়ায়। পেট্রোডলারের যুগেই কি বাংলাদেশে মাদ্রাসা গড়ে ওঠতে থাকল? কি আশ্চর্য কথা। আমার বয়স ৫৫। আমি ছোট বেলা থেকে মসজিদ মাদ্রাসা দেখে আসছি। আমার গ্রামের দারুল উলুম মাদ্রাসা ১৯৩৬ প্রতিষ্ঠিত হয়। নদী পাড়ি দিয়ে চার/পাঁচ মেইল দূরের অপরটিও সেই কালের বা কাছাকাছি কালের। ১৯৭০ সালে লোক সংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি এখন ১৭/১৮ কোটি। সেই হারে একটু বেড়েছে। তারপর মানুষ বিদেশমুখী হয়েছে। টাকা পয়সা রোজী করেছে। দ্বীনের খেদমতে প্রতিষ্ঠান গড়েছে। দয়ার দান সারা দেশে কয়টা হতে পারে? সবগুলোই তো নিজেরা বানিয়েছে। আর বড় বড় আলেম ওলামাদের ওয়াজ নসিহত তো আমাদের বাপদাদা চৌদ্দ-গোষ্ঠী শুনে আসছেন। আমার ফুফুরা তো মাসলা মাসায়েলের বই পুস্তক পাঠ করতেন। আমার ৫ম পুরুষ সেই কালে হজ্জ সমাপন করেছেন। এসবের সাথে পেট্রোডলারের কি সম্পর্ক?

      তবে এটাও সত্য যে আগের মসজিদ মাদ্রাসাগুলো টিনের ছানি বা ছনের ছানিতে পল্লীর গাছ-পালা ঘেরা পরিবেশে তেমন দৃষ্টিগোচরে ছিল না। এখন সেগুলো বিদেশি টাকায় (মুসমানদের রোজীর টাকায়, অপর কেউ দিচ্ছে না) সেগুলো দুতলা তিতলা চৌতলায় উপরের দিকে ওঠছে এবং চোখে পড়ার মত হয়েছে। আবার ধর্ম যেহেতু সামাজিক বাস্তবতা তাই কালের সাথে বিভিন্ন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজ আমলে এবং বিশেষ করে ইংরেজদের বিরোধিতা করার কারণে মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানি সরকারের কড়া নজরে ছিল।  মুসলমানগণ লাঞ্ছিত অবহেলিত ছিলেন। ইংরেজ আমলে মুসলমানদের ধর্মীয় তেমন উন্নয়ন হয়নি। পরাধীনতার শিকল উন্মোচন হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুজ্ঞা পালনের প্রতি তাদের অনুরাগ বাড়ে, তারা অধিক ব্রতি হন। তাই কয়েক দশক পর পর তুলনা করলে সেই পরিবর্তনের মাত্রা লক্ষ্য করা যেতে পারে। 

      তবে হ্যাঁ, কিছু হিন্দুয়ানী ধারণা মুসলিম সমাজে এখনো পাওয়া যাও। যেমন ধরুন আমার পাশের বাড়ির এক চাচীর অনেক সন্তান হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। শেষে তাকে কে বা কারা বলেছিল এবারে সন্তান হলে সাধারণ বা তুচ্ছ অর্থের নাম দিয়ে দেখবেন, সন্তান বেঁচে যেতে পারে। পরে আরেকজন ছেলে সন্তান হন, এবং সেরূপ একটি নামও দেয়া হয়। এটা হিন্দুয়ানী ধারণা। শ্রীচৈতন্যের  (মূল নাম বিশ্বম্ভর, সন্ন্যাস-ব্রতে গৃহীত নাম শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য) তার মায়ের ঘরে বেশ কয়েকটি সন্তান জন্মের পর ওরা মারা গেলে বিশ্বম্ভরের নাম রাখা হয় ‘নিমাই’ (নিম গাছের অনুসারে)। তবে মুসলিম সমাজে এসব ধারণা অত্যন্ত বিরল। আবার আমাদের সমাজের বিদআতিদের মধ্যে বেশ কিছু প্রথা এখনো বেঁচে আছে। কিছু কিছু জিনিস সমাজে এভাবেই থেকে যায়। কিন্তু কেউ একদম দেব দেবীর পূজা দিতে শুরু করেছে এমনটি কোথাও শুনি নাই।

      (২) তবে শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণবী আন্দোলন সম্পর্কে দু/চারটি কথা বলা দরকার। তবেই এই চিত্রের অপর দিক ভেসে আসবে।

      ভারতে মুসলমান, বৌদ্ধ ও অপরাপর ছোট/মাঝারি ধর্মীয় সমাজকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরাতে অনেক বার অনেক ধরণের আন্দোলন হয়েছে। যবনদেরকে (অহিন্দুদেরকে) ‘হিন্দুয়ানায়’ ফিরানোর প্রয়াস বেশ পুরানো, বাদশাহ আকবরেরও আগ থেকে, তবে ভিন্ন কালে ভিন্ন আকৃতিতে। আজকের বাঙালীয়ানাতেও (এখানে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করছি) এটিই সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে। (বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও কর্মকাণ্ড দেখুন, মুসলিমদের একাংশের হিন্দুয়ানা দেখুন, সামাজিক অনুষ্ঠানাদি দেখুন, বিভিন্ন বক্তব্যের ধরন-প্রকৃতি দেখুন, মুসলমানদের চরিত্র ও নামের প্রতি লক্ষ্য করুন)। (এ প্রসঙ্গে আহমেদ শরীফ ভাইকে দেয়া আমার এই মন্তব্যও পড়া যেতে পারে)।

      (৩) শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন বৈষ্ণববাদকে যেভাবে innocent হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে ব্যাপারটা সেরূপ নয়। শ্রীচৈতন্যের (১৪৮৬-১৫৩৪) ‘ভক্তি’ আন্দোলনের কার্যক্রম ছিল সংকীর্তন, ‘রাধা-কৃষ্ণের সামষ্ঠিক নৃত্য ও গানে দেশের মাটিকে যবন (অহিন্দু) মুক্ত করা, পবিত্র করা’ ((Chowdhury, M. A. (2008).  Buddhism in South Asia. London: London Institute of South Asia, P.302)। 

      ‘চৈতন্যদেব মুসলমান শাসিত হিন্দু সমাজের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রবক্তা হিসেবে সদাচারী, হিন্দু সমাজধর্মের পক্ষপাতী; জাতিভেদের বিরুদ্ধেও প্রত্যক্ষত দণ্ডায়মান হননি। কিন্তু সামন্তযুগের অনুদার মতাদর্শকে অস্বীকার করেই তিনি প্রচার করলেন –জীবে দয়া, ঈশ্বরের ভক্তি,  বিশেষ করে নামধর্ম, নাম-সংকীর্তন’ (প্রাগুক্ত, গোপাল হালদার, ১৯৮০:৬৩)।

      চৈতন্যের আন্দোলন মুসলিম সমাজকে তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি, বিচ্ছিন্ন কিছু লোক ছাড়া। কিন্তু তা বৌদ্ধধর্মীদের উপর প্রবল প্রভাব ফেলে। আব্দুল মুনিম চৌধুরী (2008:xiv) বলেন, ‘… [T]he last Buddhists in Bengal and Orissa were tricked into the bottom of the Brahminical society via Chaitanya’s Vaishnab movement in the sixteenth century CE, the book shows the disappearance of Buddhism in South Asia not as sudden cataclysmic occurrence but as slow strangulation through a series of Brahman-invented context sensitive stratagems accompanied by a series of redressing of Brahminism itself, which in places and at times were brought to their climax by either outright persecution and/or murderous attack or an over-dose of bhakti’.

      ‘শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেনের মতানুসারে চৈতন্য দেবের আবির্ভাবে বাঙ্গালা দেশের একটি সামাজিক সমস্যা পূরণ হইয়াছিল। হিন্দুধর্ম্মের পুনরুত্থানের সহিত গৌড়ে ও বঙ্গে বৌদ্ধধর্ম্ম হীনবল হইয়াছিল এবং ব্রাহ্মণ-প্রচলিত কঠোর সমাজ-শাসনে, বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিক্ষুণীগণ হিন্দু সমাজে মিশিয়া যাইতে পারেন নাই। নব প্রচলিত ধর্ম্মে বর্ণাশ্রম বিচার ছিল না। পূর্ব্বে সমাজভ্রষ্ট ও জাতিভ্রষ্ট নরনারী প্রবজ্যা গ্রহণ করিয়া বৌদ্ধসঙ্ঘে আশ্রয় লাভ করিত। বৌদ্ধধর্ম লুপ্তপ্রায় হইলে এই সকল নরনারী নিরুপায় হইয়াছিল। ইহারা, খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে ও ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগে বাঙ্গলাদেশে নেড়ানেড়ী নামে পরিচিত ছিল। নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্য্য এই সকল ভিক্ষু ভিক্ষুণীগণকে নবীন বৈষ্ণব ধর্ম্মে দীক্ষিত করিয়া উদ্ধার করিয়াছিলেন’ ((History of Bengali Language and Literature, pp. 446-64 থেকে রাখাল বন্দ্যোপাধ্যায় (২০০৮:১৭৬, বাঙলার ইতিহাস, কলকাতা: দে’জ পাবলিকেশিং) কর্তৃক উদ্ধৃত))।       

           উল্লেখিত নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্য্য বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষক ও নেতা ছিলেন, পরে ধর্মান্তরিত হন। ‘নিত্যানন্দের নেতৃত্বে যারা গঠিত হল তাদের মধ্যে ষোল শত নেড়ানেড়ীও ছিল –যারা বিলুপ্তপ্রায় বৌদ্ধ (সহজিয়া) তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের মানুষ। … শ্রীখণ্ডের বৈষ্ণব মতবাদেও সহজিয়া দেখা যায় যায় আর নিত্যানন্দের নামে তো সহজিয়ারাই বৈষ্ণববাদের এক বৃহত্তম সম্প্রদায় (বৈরাগী) হয়ে ওঠেন’  (গোপাল হালদার, ১৯৮০:৬৭)।  

      সুলতান আলাউদ্দীন শাহ কীভাবে প্রতারিত হন, তা দেখুন। আলাউদ্দীন হোসেন শাহ বিশ্বস্ত বিবেচনায় দু’জন হিন্দু: ‘রুপ ও সনাতনকে  দবীর খাস (private Secretary) করেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না তারা গোপনে চৈতন্যদেবের শিষ্য ছিল এবং গোপনে দেখা সাক্ষাত হত। এক সময় চৈতন্য উড়িষ্যায় চলে গেলে, তারাও তার সাথে চলে যায়। ওখানেই ছিল শ্রীচৈতন্যের  পৈতৃক বংশ যেখান থেকে দুই পুরুষ আগে সিলেটে গিয়ে বসবাস করেছিলেন, তারপর তারা নবদ্বীপে আসেন।  ‘সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন’ (উইকি)। রাজকীয় সাহায্যে ধর্ম ও আদর্শ প্রচারের একটা ঐতিহাসিকতা তো আছেই।

      চৈতন্যের এক শাগরেদের নাম ছিল ‘হরিদাস’। মুসলিম পরিবার থেকে আসা। তার আগের নাম কারো জানা নেই। হরিদাসের কথা কীভাবে আলোচিত হয় -তা দেখুন। ‘ভক্ত হিসেবে হরিদাসের তুলনা নেই। তিনি জন্মেছিলেন মুসলমানের ঘরে কিন্তু এক মুসলমানী জন্ম ছাড়া কোরান-হাদিস-সম্মত আচরণের কোনো চিহ্ন তার ছিল না (গোপাল হালদার, ১৯৮০:৬৬) । [কোরান হাদিসের আলোচনার ঐতিহাসিকতা ও মাপ পাচ্ছেন তো?]

      এবারে আরেকটা কাণ্ড দেখেন। 'বাংলাদেশের রাজশক্তির সঙ্গে বাঙলা সাহিত্যের একটা সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল হোসেন শাহ (১৪৯৮-১৫১৯) ও নুসরৎ শাহের (১৫১৯-১৫৩২) আমলে। সেই রাজশক্তি ছিল অনেকাংশে বাঙালী ভাবাপন্ন আর দেশেও তারা শান্তি স্থাপন করেছিলেন। তাই তাঁদের সহানুভূতিতে তখন বাঙালা সাহিত্যও যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে (গোপাল হালদার, ১৯৮০:৭০), এভাবে হয়ত তাদের নিজেদের অজান্তে মুসলমানদের পক্ষে দু/চারটি কথা চলে আসে। কিন্তু সাহিত্যের কাল periodise করার সময় তা হবে ‘চৈতন্যযুগ’। তারপর বলা হবে, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের দিক থেকে তা বিবেচনা করলে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবকে বাঙালীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ঘটনা বলে মানতেই হবে’ (প্রাগুক্ত, পৃ ৫৯)। মানতেই হবে? কারণ? ‘একটি পঙতি না লিখলেও শ্রীচৈতন্য ইংরেজ-পূর্বযুগের বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রধান পুরুষ’ (প্রাগুক্ত, পৃ ৫৯)। তাবৎ, তাবৎ!

      বাংলা ভাষা ও বাঙালীয়ানাতেও কীভাবে বৈষ্ণববাদ আসে তা হয়ত দেখতে পাচ্ছেন। মুসলমানগণ কোরান হাদিস ছেড়ে “বাঙালী মুচলমান” হলেই লেটা চুকে যায়। আমি মূল ব্লগে কী আলোচনা করে আসছি, তা হয়ত এখন অনেকের খেয়ালে আসতে পারে। আবার দেখবেন নামাজ-রোজা ছেড়ে দেয়া, কোরান হাদিসের ধারে কাছে না-যাওয়া কিছু মুসলিম নামধারী 'বাউল' নিয়ে আজকাল যে বড় আকারের হৈ চৈ হয়, যা ২০/২৫ বছর আগেও হত না, তারও একটা হিসেব পাওয়া যেতে পারে।

      আপনি এই প্রসঙ্গটি নিয়ে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

      1. 11.1.1
        এম_আহমদ

        এই মাত্র  "পরকীয়া প্রেম" শিরোনামে নামে এবনে গোলাম সামাদ সাহেবের একটি প্রবন্ধ পড়লাম যার প্রথম বাক্য এভাবে:  'শ্রীচৈতন্যের প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণব ধর্মের একটি বিশিষ্ট অঙ্গ হলো পরকীয়া প্রেম।' তাই এটাকে এখানে সংযোগ করাটাই যুক্তি সংগত মনে হল।

        “রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর/প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর॥”

        খাইছেরে!  "আর [এসবের] মধ্যেই খুঁজে পেতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির আদিম উৎসকে!" ওরে বাঙালিয়ানারে!

        এগুলো পড়ে হাসি সংবরণ মুষ্কিল হবে, সাবধান।

        1. 11.1.1.1
          সত্য সন্ধানী

           ভারতীয় চ্যানেল গুলিও তো ভাইজান এই গৌড়ীয় বৈষ্ণব বাদ (পরকিয়া) দেদারছে ছড়াচ্ছে, আর বাঙাল  এই জিনিস গো গ্রাসে গিলছে। স্টার জলসা দেখা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর হাতা হাতি হয় খবরে পড়েছি। 

          এই দেশে ইসলামী সংস্কৃতি কে।দূর করে বিজাতীয় সংস্কৃতি কে এতটাই গভীর ভাবে প্রোথিত করা হয়েছে যে আমার মনে হয় না সহসাই মুক্তি আসবে।

          এইসব চ্যানেল দেখেই পাখী ড্রেস থেকে শুরু করে আগের কত রকমের ড্রেস ছিল। এদের দেখেই লেংগিস টাইপের অশালীন কাপড় এদেশে কমন হয়ে গেছে।

          ভাই এইসসব জন্তু জানোয়ারের কালচার চলে আসার কি আর বাকি আছে? অসংখ্য পরিবার আছে যারা মেয়েকে একাধারে নাচ শিখাচ্ছেন আর পাশাপাশি হুজুর রেখে কোরাজ শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন।

          এইগুলা আসলে ইসলামী মুল্যবোধ কে নিয়ে মারাত্বক বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছুই না।ন্তা এই তথাকথিত বাংগালীয়ানাই যে জিতে যাচ্ছে! আল্লাহ কি এসব থেকে আমাদের মুক্ত রাখবেন?

          আমার একটা আড়াই বছর বয়সী ছোট মেয়ে আছে যে আমার প্রথম এবং এখনো পর্সন্ত একমাত্র সন্তান। আমি আজ ভাবছি যে আমার মেয়েটাকে আমি কতখানি ভালভাহে ইসলামী কায়দায় মানুষ করতে পারব? চারিদিকের এইযে অশ্লীলতার প্রবাহ এ থেকে সে কতখানি মুক্ত থাকবে? স্কুল কলেজে দেয়াই লাগবে লেখা পড়া শেখাতে। 

          কিন্তু সেও যে স্রোতের ধারায় মিশে যাবে না এর কি নিসচয়তা এই দেশ আমাকে দিচ্ছে?

          আল্লাহর কাছে দোয়া করি সবসময় যে আমার মেয়েকে যেন আল্লাহ পরহেজগার করে গড়ে তুলেন। আপনাদের কাছেও দোয়া চাই। খুব বিক্ষিপ্ত আমার মন চারপাশের বদলে যাওয়া কালচার দেখে।

          আমার ছেলে বেলায় এইসব অপ সংস্কৃতি আমার চার পাশে ছিল না। তখন তীর্থের কাকের মত বিটিভি খোলার সময়ের দিকে চেয়ে থাকতাম। সেটাই ছিল একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম।

          আজ অবস্থা বদলে গেছে খুব বেশি। আজকালের বিনোদন গুলি এমনই বিভতস যে ছোট ভাই বা বড় ভাইয়ের সামনে বসেই দেখতে লজ্জা লাগে। বাবা মার কথা নাই বা বললাম।

           

  18. 10
    ফাতমী

    আপনি ১৬শতকের কবি আব্দুল হাকিমের কবিতা পড়লেই বুঝবেন, কিন্তু 1882 সালের "বন্দে মাতারাং" গানটার অর্থ ট্রান্সলেশন ছাড়া বুঝেন কি না?

    কবি আব্দুল হাকিমঃ

    যে জন বংগিতে জন্মি হিংসে বংগবানী,

    সে জন কাহার জন্ম নির্নয় ন জানি,

    মাতা পিতা ক্রমে বঙ্গতে বসতি,

    দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।

     

    এবার তুলনা করুনঃ

    বংকিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ঃ বন্দে মাতরম্৷

    সুজলাং সুফলাং

    মলয়জশীতলাম্

    শস্যশ্যামলাং মাতরম্!

    বন্দে মাতরম্৷

    শুভ্র-জ্যোৎস্না পুলকিত-যামিনীম্ 

    ফুল্লকুসুমিত  দ্রুমদলশোভিনীম্,

    সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্

    সুখদাং বরদাং মাতরম্৷৷

    বন্দে মাতরম্

     

    অর্থ্যাত ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ে বাংলা ভাষার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এমন কি ইঞ্জেকশন ও দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রমাণ আঞ্চলিক ভাষার সাথে তথাকথিত শুদ্ধ ভাষার তুলনা করলেই বুঝতে পারবেন।

    1. 10.1
      এম_আহমদ

      @ফাতমী: পাঠ ও মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুন এবং সুস্থ থাকুন, আমীন।

  19. 9
    শাহবাজ নজরুল

    কিছু বিষয়ে আলোচনা করা যাক --

    ১. সার্বিকভাবে, বর্ণ-হিন্দুদের বাদ দিয়ে, এই জনগোষ্ঠীর লোক ছিল অনার্য শ্রেণীর –প্রধানত দ্রাবিড়।

    এর পক্ষে ভাষাগত প্রমান কি? বাংলার সাথে তো দ্রাবিড় ভাষার কোনো মিল নেই। একটু রিসার্চ করে দেখালাম কেবল মালটো ভাষা ছাড়া দ্রাবিড় শাখার কোনো ভাষা/উপভাষা তো বাংলা অঞ্চলে প্রচলিত দেখতে পেলাম না। বাংলাতে যদি দ্রাবিড় জাতির বড় অংশ বসবাস করে থাকেন -- তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে -- কখন থেকে তারা দক্ষিনের দিকে সরে গেল? আর বাংলাতে দ্রাবিড় ভাষার কোনো প্রভাব অবশিষ্ট থাকলোই বা না কেন?

    ২. বাঙালী স্বরূপ নিয়ে যা কিছু বলা যাবে তাতে মুসলমানদের অবদানে প্রতুল। মুসলমানরাই সর্বপ্রথম বাঙ্গালার সমগ্র অঞ্চলকে ‘বাঙ্গালাহ’ বলে অভিহিত করেন। মুঘল আমলে পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলীয় ভূখণ্ড ‘সুবাহ বাঙ্গালাহ’ নামে পরিচিত হয়। শাহজাহান আওরঙ্গজেবের আমল থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত এই অঞ্চল ‘সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ছিল (ব্রিটিশের আমলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীও বলা হত)।  … এর আমলে বাংলা রাজকীয় পৃষ্ঠ-পোষকতা পেয়েছে, বাংলা সমৃদ্ধ হয়েছে। হুসেন শাহের ছেলে ফিরোজ শাহ ছিলেন বাংলার পৃষ্ঠপোষক। পরবর্তী মোঘলদের হাতেও সেই গতি অব্যাহত থাকে।

    হুসেন শাহের আগে আর কারুর কাছ থেকে কি বাংলা'র আঞ্চলিক বা প্রশাসনিক পরিচিতি পাওয়া যায়?      

    ৩. কোন যুগের সাহিত্য দেখে মোটামুটি আন্দাজ করা যেতে পারে যে এটা বাংলা ভাষা -- যা বোধগম্য?

    1. 9.1
      এম_আহমদ

      @শাহবাজ নজরুল:  দ্রাবীড় ও দ্রাবীড়দের ভাষা –এই বিষয়টি ঐতিহাসিক কারণে ও তথ্যের অভাবে এবং তথ্য ব্যাখ্যার অপর্যাপ্ততার কারণে জটিল হয়ে রয়েছে বিধায় দেখতে পাননি। এই উইকি-প্রবন্ধে দ্রাবীড়দের ভাষায় বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা হয়েছে (Dravidian languages)। বাংলায় দ্রাবিড়দের ভাষার মিল পান অথবা পান নি –এই মর্মের কোনো কথাই সহজে বলা যাবে না। যেদিকেই মত প্রকাশ করা হবে তাতে স্পষ্ট প্রামাণিকতার প্রয়োজন। আবার একথা জানা যে অনেক অতীত-বিষয় তথ্যের অভাবে প্রামাণিক নয়। এই কথাগুলো আমার মন্তব্যের শেষের দিকে আবার বলার চেষ্টা করব।

      দ্রাবীড়রা ‘একক’ এবং ভাষাও ‘একক’ এমন কিছুও মনে করি না।  তবে আমরাই যে দ্রাবীড়দের উত্তরসূরী -অনার্য হিন্দু ও অপরাপর অনেক গোষ্ঠীসহ, তাতে সন্দেহ নেই এবং প্রমাণ ছাড়াই ধরে নিতে পারি যে তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষিক ভিন্নতার ছোয়া আমাদের সাথেই আছে কিন্তু এমনসব প্রমাণ পদ্ধতির criteria উত্তীর্ণ করানো মুস্কিল হবে। তা অনেক কারণে। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা (পরে সুবাহে বাংলা) এই অঞ্চল ভিন্ন ভিন্ন দেশে বিভক্ত হলেও আর্যরা বার বার তাদেরকে আক্রমণ করেছে এবং আক্রোষে তাদেরকে অমানুষ বলেছে, দস্যু, অসূর বলে গালি দিয়েছে। সিলেটের জৈন্তা রাজ্য আক্রমণ  মহাভারতের নায়কগণ এসেছিলেন এবং প্রমীলার (রাণী) হাতে মার খেয়ে পরাজিত হয়ে পলায়ণ করেছেন। আবার দেখা যায় মহাভারতীরা বলেন যে  এক সময় প্রমীলা তাদের রাজাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব হচ্ছে আর্যদের আর্যামী। এদেশে কি আর পুরুষ ছিল না রাণী পরাজিত পক্ষকে বিয়ে করার খায়েশ প্রকাশ করবেন? এ কথাগুলোর অর্থ হচ্ছে এই অঞ্চলের অনার্য জনগোষ্ঠী দেখানো। তবে সব অনার্য যে দ্রাবীড় শ্রেণীর –এটা বলাও মুষ্কিল হতে পারে। কেননা এই অঞ্চলে অনেকই এসেছে, বসবাস করেছে। আজকে  কোনজন যে কে তা বলা মুস্কিল।

      তারপর কোন্‌ যুগের সাহিত্য দেখে মোটামুটি আন্দাজ করা যেতে পারে যে এটা বাংলা ভাষা – যা বোধগম্য? এটিও সহজ প্রশ্ন নয়, এজন্য যে আর্য ব্রাহ্মণগণ ব্রিটিশের যুগে থেকে বাংলা সাহিত্যকে নিজেদের মত করে যেভাবে periodization এবং classify করেছেন তাতে তারা অনেককিছু ঘুলিয়ে দিয়েছেন। বিচ্ছিন্নভাবে প্রাপ্ত স্বল্পকিছু টেক্সটের মাধ্যমে, (যেগুলোর সঠিক কাল নির্ণইয় করাও মুস্কিল), সেসবকে ভিত্তি করে একটি সময় বলে দেয়াতে ভুলের সম্ভাবনা থাকতে পারে।  ‘যুগসন্ধিকালের’ একেবারে শেষের দিক থেকে এবং প্রাকচৈতন্য যুগ থেকে মনে হয় ধরা যেতে পারে। চন্ডিদাসের (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন) বলে যা পাওয়া যায় সে সময় নিয়ে সমস্যা থাকে। চন্ডীদাস কয়েকজন। তারপর সেই কাল নির্ণয় নিয়েও মতভেদ আছে। এসব বিষয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট কথা বলতে হলে অনেক সময় নিয়ে দীর্ঘ পাঠের প্রয়োজন। ( বাংলা সাহিত্যে কালকে যেভাবে periodization করা হয়েছে তা হল: যুগসন্ধিকাল (১২০০-১৩৫০), প্রাক-চৈতন্যযুগ (১৩৫০-১৫০০), চৈতন্যযুগ (১৫০০-১৭০০) ও নবাবী আমল (১৭০০-১৮০০)। তারপর তো পূর্ণ-আধুনিক কাল (সময় অর্থে, দার্শনিক অর্থে নয়)।

      সার্বিকভাবে বলব, আমি আপনার সব প্রশ্নের সাথেই বরং একমত -সব কয়টি প্রশ্নই মূল্যবান। বাঙালীয়ানা নিয়ে যেসব কথা আমি এই প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি এই প্রশ্নগুলো সেই আবহমান কালের অনিশ্চয়তাকে আরও ধারাল করে। এ বিষয়টি সামান্য বর্ধিত করলে আপনার ও আমার প্রশ্নস্থিত কিছু বিষয়ের উপর আরও আলোকপাত আসবে এবং জটিলতার স্থান প্রখর হবে। তবে মনে রাখতে ‘বাংলা ও বাঙালী’ প্রশ্নে অনেকের কাছে অনেক ধরণের ‘উদ্দেশ্য’ রয়েছে তাতে অবশ্যই রাজনীতি ধর্ম ও ঐতিহাসিকতা রয়েছেন।

      বাংলা ও বাঙালী বিষয়ে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বলেন, “‘বাঙালী বলতে অরিজিনাল কোনো জনগোষ্ঠী বোঝায় না, ‘বাঙালী এক সংকর জন’ … ‘গঙ্গা-করতোয়া-লৌহিত্যবিধৌত, সাগর-পর্বতধৃত, রাঢ়-পুন্ড্র-বঙ্গ-সমতট এই চতুর্জনপদসম্বন্ধ বাঙলাদেশে প্রাচীন কাল হইতে আরম্ভ করিয়া তুর্কী অভ্যুদয় পর্যন্ত কত বিভিন্ন জন, কত বিচিত্র রক্ত ও সংস্কৃতির ধারা বহন করিয়া আনিয়াছে, এবং একে একে ধীরে ধীরে কে কীভাবে বিলীন হইয়া গিয়াছে ইতিহাস তাহার হিসাব রাখে নাই” (বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৪১২ বাংলা. পৃ. ২৩)। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “কেহ নাহি জানে কার আহবানে কত মানুষের ধারা/দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে সমুদ্রে হল হারা।”

      বঙ্কিম চন্দ্রের হতাশা এভাবে প্রকাশ পায়,‘বাঙালীর ইতিহাস নেই।’ তবে এই মহাশয়ের কথা entertain করতে মন চায় না। আবার মনে রাখতে হবে ব্রাহ্মণগণ যেভাবে ‘নাই নাই’ করেন ব্যাপারটা তেমন নাই নাই নয়। এদের হাতের কুড়োল ভিন্ন। ‘আবহমান’ না পেলেও, ‘বহমান’ কালের কোথায় অবশ্যই বাঙালীদের পাওয়া যায়, এবং যেখানে পাওয়া যায় তাতে অবশ্যই ইতিহাস রয়েছে।

      ড. অতুল সুর (বাঙালা বাঙালীর বিবর্তন, কলিকাতা: সাহিত্যলোক, ১৯৮৬ পৃ ২১) বলেন, “বাংলায় প্রথম অনুপ্রবেশ করে দ্রাবীড়রা। এরা দ্রাবীড় ভাষার লোক ছিল’  … ‘দ্রাবীড় ভাষাভাষী লোকদের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জাতিসমূহের মিল আছে বলে তাদের ‘ভূমধ্যীয়’ বা ‘মেডিটেরেনিয়ান’ নরগোষ্ঠীর লোক বলা হয়। বৈদিক সাহিত্যে এদের ‘দস্যু’ বলে অভিহিত করা হয়েছে’ (পৃ ৪২)। … বৈদিক আর্যরা বাংলাদেশের লোকদের বিদ্বেষপূর্ণ ঘৃণার চোখে দেখত (পৃ ২২)। শেষ পর্যন্ত বাংলায় বসবাস করেও সেই ঘৃণা পোষণ করত, তাই বাংলার কবিরাও তাদের ঠেসা দিয়ে কবিতা রচনার করার নজির আছে (যেমন, বঙ্গে জন্মে যে জন ঘৃণে বঙ্গজনে …)। এবারে হয়ত বাংলা ও বাঙালী নিয়ে নানান জনের নানান কথার কিছুটা আভাষ পাচ্ছেন।

      নীহাররঞ্জন রায় বলেন, “ভারতবর্ষ ও পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দীপপুঞ্জগুলি [এর]… অধিবাসিরা যেসব ভাষায় কথা বলে … সেই ভাষাগুলো একই পরিবারভূক্ত।… [এর] আধুনিক [ভাষায় পরিচিত রূপ] অস্ট্রিক। … এই অস্ট্রিক ভাষা এক সময় মধ্য ভারত হইতে আরম্ভ করিয়া … সমস্ত ভূখণ্ডে বিস্তৃত ছিল। … এই ভূখণ্ডের দক্ষিণেই দ্রাবীড়ভাষী জনপদ এবং তাহার ফলে বলবত্তর দ্রাবীড় ভাষা কোল্ভাশাড় ভূখণ্ডে কোথায় কোথায় ঢুকিয়া পড়িয়াছে। … পরবর্তী যুগে দ্রাবীড় ও আর্যভাষা পশ্চিম দিকে এবং ভোট-বর্মী ভাষা পূর্বদিকে এই ভাষাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া অধিকাংশ স্থলেই ইহাকে গ্রাস করিয়া একেবারে হজম করিয়া ফেলিয়াছে; … আর্যরাই আর্য সভ্যতার ও সংস্কৃতির বাহন। এই আর্যভাষার প্রধান রূপ সংস্কৃত, যা প্রাকৃত জনের মধ্যে প্রাকৃত [bold emphasis is mine]।

      উপরে যেসব উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তাতে অনেক gobbledygook রয়েছে। এগুলোর উপর অসংখ্যা প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। সর্বত্রই স্থান ও কাল সুনির্দিষ্ট নয়। আর্যগণ ভারতের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে pre-Dravidian জনগোষ্ঠী দেখাতে ব্যস্ত থাকেন এবং তা দ্রাবীড়দেরকে তাদের মত বিদেশি দেখাতে, (এ দুনিয়ায় সবাই তো বিদেশি। কিন্তু কে আগের আর কে পরের সেটা তো দেখতে হবে। কে আবার ধ্বংস-যজ্ঞী  হল আসল তাও দেখতে হবে)। কিন্তু প্রামাণিকতা বড় সমস্যা। তবে তারা আগেই বলে দিয়ে থাকেন যে বাঙালীর কোনো সঠিক ইতিহাস নেই।

      আবার লক্ষণীয়, বাংলাপূর্ব অস্ট্রিক ভাষার রূপ দেখাতে মুষ্টিমেয় কয়েকটি শব্দ উদাহরণ হিসেবে টানেন যেমন:  পান, সুপারি, কলা বাঁশ, কুড়ি ইত্যাদি। এটি যদি আদি আস্ট্রিক হয় তবে এই শব্দগুলো গোটা আর্যাবর্তে পাওয়ার কথা। পান সুপারি তো গোটা ভারতে ব্যবহৃত হয় না। তারপর প্রমাণে গেলে প্রথমে অস্ট্রিক ভাষা পেতে হবে এবং সেখানেই এই শব্দগুলো ছিল বলে দেখাতে হবে। কিন্তু কই সেই অস্ট্রিক ভাষা? খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহাবীর রাঢ় অঞ্চলে এলে তার পিছনে চু চু করে কুকুর লেলিয়ে দেয়ার উদাহরণ দেখিয়ে ‘চু চু’ কে অস্ট্রিক বলে উল্লেখ করা করা। কিন্তু এই ধরণের উদাহরণ flimsy মনে হয়।

      উপরে লক্ষ্য করবেন যে নীহাররঞ্জন ‘প্রাকৃত’ ভাষাকে আর্যদের ভাষা বলেছেন। এটাকেই পক্ষান্তরে সংস্কৃত বলেছেন। প্রমাণ? তা তিনি দেন নি। আমার পূর্ব মন্তব্যে উদ্ধৃত আখতার মুকুল বলছেন, “ভাষাবিদদের মতে মাগধী প্রাকৃত ভাষাই হচ্ছে বাংলা ভাষার আদি পুরুষ। এটা খৃষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ৬০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের কথা। … ভাষাবিদদের মতে এসময় গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকার জনগোষ্ঠী কোনো রকমের ব্যাকরণের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে মাগধী প্রাকৃত ভাষার ব্যবহার শুরু করে। [তবে মুকুলের এই ব্যাকরণ বিষয়ক বাক্যটি ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিতে সঠিক হবে না, কিন্ত এই বাক্যটি এক পাশে রাখতে পারি]। ফলে উন্নাসিক অবাঙালী আর্য পণ্ডিতেরা দারুণভাবে বিব্রত হয়। জনসাধারণের যথেচ্ছ ব্যবহৃত এই ভাষাকে আর্য পণ্ডিতদের নামকরণ হচ্ছে ‘মাগধী-অপভ্রংশ’” (১৯৯৯:১৪)। এতে নীরারঞ্জনের প্রাকৃত/সংস্কৃত এক হওয়া খণ্ডিত হয়ে পড়ে।          

      শেষকথা। এই অঞ্চলে অনেক প্রাচীন গোত্র/গোষ্ঠী বাস করেছিল, যাদের কিছু কিছু নাম প্রবন্ধটিতে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু তাদের ভাষা কি কি ছিল? এ বিষয়ে অনেক কিছু বলা হয় কিন্তু নির্দিষ্ট করে কার কার কোন কোন  ভাষা তা বলা মুষ্কিল।

      দ্রাবীড়রা এ দেশে ছিল –এটা তো স্বীকৃত কথা। নিশ্চয় তাদের ভাষা ছিল। কিন্তু তা যে আর্যদের ‘সংস্কৃত’ হবে না, তাও নিশ্চিত বলা যায়।  কিন্তু দ্রাবীড়গণ এক গোষ্ঠী ছিল তাও বলা যাবে না। তারা বিভিন্ন গোষ্ঠী ও শাখায় প্রশাখায়, ভাষায় এবং ধর্ম বিশ্বাসে কালের আবর্তে ছড়িয়ে পড়েছিল –এটাই সত্য হবে। আমি আর্যদের বাদ দিয়ে এই অঞ্চলের অনার্য হিন্দু এবং অনেক আদিবাসিদের অন্তর্ভুক্ত ভাবব। কিন্তু মুকুল সাহেব যখন অনার্যদের ভাষা প্রাকৃত বলেন এবং তাদেরকে মাগধী বলেন তখন সেখানেও প্রশ্ন থাকে। মাগধীরা তো পূর্ব বঙ্গের নয়। মাগধ তো বিহারের পার্শবর্তি কোনো অঞ্চল আর বাংলা তা সেখানে গঠিত হচ্ছিল না। এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য গভীর অধ্যয়নের প্রয়োজন। ধরুন চর্যাপদ প্রকৃতি ও পালির অতি প্রাথমিক পরিবর্তিত রূপ। এখন আমাদেরকে এই ‘বিবর্তন’ দেখাতে হলে প্রকৃত ও পালি ভাষার বেশ কিছু ট্যাক্সট পেতে হবে। সেই দুটি ভাষার উপর যথেষ্ট দখল থাকতে হবে এবং এই অভিজ্ঞতার আলোকে ‘বিবর্তনের’ রূপ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুতরাং সব দিক দিয়েই অতি পূর্বের আবহমান কালের বাংলা ও বাঙালী নিয়ে যে জটিওলতা তা থেকেই যায় –যে আলোচনা আমি এই প্রবন্ধেও করেছি। তবে আমি বাংগালী পরিচিতির বিরোধী নই কেবল তখন বিরোধী যখন অতি-জাতীয়তাবাদের নামে এটা religious zeal দিয়ে deify করা হয়। এই বিষয়ে আরেকটি লেখা দিলে মনে হয় ভাল হয়। দেখা যাক।  

      [অনেক ব্যস্ততার মধ্যে মন্তব্য দিলাম। অনেক কথা এলোমেলো থাকতে পারে। কোথাও এমন হলে পুষিয়ে নেবেন। তবে হুসেন শাহের আগে বাংলার 'আঞ্চলিক' রূপের প্রশ্নের উত্তর যুগসন্ধিকাল (১২০০-১৩৫০) (এর শেষের দিকে) ও  প্রাক-চৈতন্যযুগ (১৩৫০-১৫০০) টেক্সে খোঁজতে পারেন, তবে প্রাকচৈতন্যকে ভাল করেই বিবেচনায় আনা যায়। কিন্তু প্রশাসনিক টেক্সট পাওয়া যাবে না।]

  20. 8
    কিংশুক

    ভালো লাগল।

    1. 8.1
      এম_আহমদ

      @কিংশুক: পাঠ ও ভালো লাগা জানিয়ে যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুন এবং সুস্থ থাকুন, আমীন।

  21. 7
    এম_আহমদ

    এবারে ঐ চর্যার পদের অনুবাদ দেখুন।

    রাগ -পটমঞ্জুরী

    “ভাব হয় না, অভাব যায় না; এরূপ সংবোধ কে প্রত্যয় করে? লুই বলে, বেটা, বিজ্ঞান দুর্লক্ষ্যঃ ত্রিধাতুতে বিলাস করে, আকার ঠাহর হয় না। যাহার বর্ণ চিহ্ন জানা নাই, তাহাকে কেমন করিয়া আগম বেদে ব্যাখ্যা করা যায়? কাহাকে কি বলিয়া আমি পাতি দিব? জলে প্রতিবিম্বিত চাঁদের মত সে সত্য নয়, মিথ্যাও নয়। লুই বলে, আমি ভাবি কিসে? যাহা লইয়া আছি তাহার আভাসও দেখি না যে” ((হালদার, গো. (১৯৮০) বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা, ঢাকা: মুক্তধারা, পৃ. ২০))।

  22. 6
    এম_আহমদ

    [নতুন সংযোজন। পাঠের আহবান রইল।]

    -এক-

    আবহমান কালের যুক্তি ব্যবহারের পিছনে আরেকটি কৌশল রয়েছে। বাংলা মুসলমানদের হাতে গড়েছে, বর্ধিত হয়েছে। মুসলিম শাসনামল এর বড় উদাহরণ। যে কেউ ইতিহাসের পাতা উল্টালেই মুসলিম যুগ পেয়ে যায়। তাই প্রথম কৌশল হয় বাংলাকে যেকোনো উপায়ে মুসলিম যুগের, এবং পারলে, মুসলিম জনবসতির আগের কোনো কালে স্থাপন করা, (এক পক্ষের কাছে বর্ণবাদী আর্যরা যেমন বিদেশি, মুসলিমগণ তো তেমনি বিদেশি)। এক্ষেত্রে কোনো উপায়ে বাংলা শব্দের সাথে কিছু মিল সংযুক্ত কিছু শব্দ পেলেই ধরা হয়ে যায় ‘এটাই বাংলার আদি রূপ’। কিন্তু এই উপমাদেশের ভাষাগুলো এমন যে এদের প্রত্যকেটিকে এমন এমনসব শব্দমালা রয়েছে যে সেগুলোর অনুরূপ বা সামান্য বিকৃতরূপ অন্যগুলোতেও পাওয়া যায়। প্রাচীন ভাষা অনুসন্ধানেও তাই। এজন্য কিছু একটা পেয়ে গেলেই ‘ইউরেকা’ ‘ইউরেকা’ বলে চিৎকার করতে নেই।

    চর্যাপদের উপরও অপর ভাষীদের দাবি রয়েছে। অসমিয়া ও ওড়িয়া ভাষার লেখকগণ এটিকে তাদের ভাষার আদি রচনা বলে থাকেন। হিন্দি ভাষার লেখকগণ সেই একই দাবি করেন। দোহাকা (দোহাকোষ) নামক আরেকটি রচনাকেও তারা হিন্দিভাষী বলেন।

    -দুই-

    আজ ইতিহাস মনে হয় ‘উদ্ভাবিত’ হচ্ছে। উদ্ভাবকগণ আবহমান কালের বাঙালী দেখাতে এই মর্মে ইতিহাস টানেন  যে বর্তমানের বাংলাদেশ ১৯৪৭ সালে বর্ণবাদী আর্যমুক্ত হয়েছে এবং ১৯৭১ সালে আশরাফ-আতরাফওয়ালা পশ্চিম পাকিস্থানী মুক্ত হয়েছে। কিন্তু কথা হল পাকিস্তানীদের মাঝে যে আশরাফ-আতরাফের অনুভূতি পাওয়া যায় তা কি বাঙালীদের মধ্যে পাওয়া যায় না? এক বাঙালী আজ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলে, কাল যে সে পাশের ঘরের কাউকে চিনে না –এটা কি আমরা দেখি না? জাতগত নানান ধারণা ও প্রথা কি ২২/২৩ বছরে পাকিস্তানীরা এদেশে সঞ্চার করেছে? ‘অজানা’ আবহমান কালের বাঙালীরা কি সব ধরণের বৈষম্যমুক্ত এক ‘আদর্শ’ জাতি যাদেরকে কেবল আর্য বাহ্মণগণ ও ‘বিদেশি মুসলিমগণ’ বৈষম্যের শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে? অন্তত শেষোক্ত দাবীর পক্ষে দলিল প্রমাণ কি?  

    কিন্তু ‘কিন্তু’ এখনো শেষ হয়নি। ইতিহাসের এই ধারায় পশ্চিমবঙ্গে নাকি ‘বাঙালী’ নেই। বাঙালী বলতে যা বুঝায় তা হল ‘এই’ বাংলায়, পূর্ব-বাংলায়, আবহমানকালের বাঙালী এখানেই! [এটা কিন্তু সব বাঙালীয়ানাদাবীদের নয়। বাঙালীয়ানাবাদীদের একাংশ বৃহত্তর বাঙালীয়ানার মাধ্যমে আবারঅ ভারতের সাথে মিলতে চায়। সেই অবিভক্ত ‘সোনার বাংলা’ই উদ্দেশ্য।]

    এখানে দেখুন।

    -তিন-

    “পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে অবাঙালী গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলে শক্তির দাপটে বঙ্গীয় এলাকায় আর্য সংস্কৃতিক ও কৃষ্টি ইত্যাদি চালু করার প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাম্র পাত্রবর্ণের স্থানীয় গণমানুষ এসবের তীব্র বিরোধিতা অব্যাহত রাখে। এরপরেই হুনদের আক্রমণে গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সপ্তম শতাব্দীতে আর্য বংশজাত রাজা শশাঙ্ক নরেন্দ্র গুপ্ত মুর্শিদাবাদ এলাকায় রাজধানী স্থাপনপূর্বক আর্য সংস্কার ও সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে সমগ্র পূর্ববঙ্গ দখলের প্রচেষ্টা করে। কিন্তু স্বাধীনচেতা বাঙালী জাতি আর্যদের এই কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে আর্য এবং অনার্যদের এই সংঘাত ও লড়াই প্রায় ১০০ বছর অব্যাহত ছিল। … আর্য পণ্ডিত ও ঐতিহাসিকেরা … উল্লেখতি একশ বছরের সময়কালকে ঘৃণিত শব্দ ‘মাস্যন্যায়’ বলে চিহ্নিত করল। সংস্কৃত ‘মাৎস্যন্যায়’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘জোর যা মুল্লুক তার’। … প্রকৃতপক্ষে এই সময়কাল হচ্ছে বহিরাগত অবাঙালী আর্যদের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের বিদ্রোহের শতাব্দী” ((আখতার মুকুল, এম. আর. (১৯৯৯). ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা। ঢাকা: শিখা প্রকাশনী, পৃ. ১৫)

    “সত্যকারভাবে বলতে গেলে গৌড় পালবংশের পতনের পর নবদ্বীপে অবাঙালি হিন্দু-ব্রাহ্মণ সেন বংশের রাজত্বকাল থেকে শুরু করে (স্থানীয় পাঠান সুলতানি আমলের দু’শো বছর ব্যতিক্রম) দিল্লির পাঠানও মোগলদের রাজত্বকাল এবং দিল্লির ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আর করাচি ও ইসলামাবাদের অবাঙালি মুসলমানদের উপনিবেশবাদের যুগ -এই ১২শ’ বছর ধরেই পূর্ববঙ্গ ছিল পরাধীন” (প্রগুক্ত পৃ. ১৯০)

    মুকুল সাহেব তার লিখায় ইংরেজ আমলের একজন আইসিএস অফিসার শ্রী অন্নদাশংকর রায়ের ‘যুক্ত বাংলার স্মৃতি’, (মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলিকাতা) থেকে এই উদ্ধৃতি দেন, “… তা হলেও এটা মানতেই হবে যে, বাংলাদেশের (অবিভক্ত বাংলা প্রেসিডেন্সি) সত্তা দুইভাগে বিভক্ত। এটা ইংরেজের চক্রান্ত নয়। প্রকৃতির চক্রান্ত। পদ্মার এপার আর ওপার আবহমানকাল ভিতরে ভিতরে বিচ্ছিন্ন। তা না হলে দেশভাগ ১৯৪৭ এমন আচমকা এত সহজ হত না” (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৯)

    “… মোদ্দা ইতিহাস হচ্ছে এই যে ১৯৪৭ সালেই দেশ বিভাগের সময় বাস্তবতাকে স্বীকার করতে না পেরে আর্যদের উত্তরসূরির দাবিদার বর্ণহিন্দুরা দেশ ত্যাগ করেছেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজিত হলে এদের মদতদানকারী ‘শরাফত’ ও ‘খানদানি’ মুসলমানিত্বের দাবিদার অবাঙালি মুসলমানরাও এদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন ( প্রাগুক্ত, পৃ ১৮৫)।

    "কথাটা সোজাসুজি বলাই বাঞ্ছনীয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা মোতাবেক স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখার বাইরে আর কোথাও বাঙালি জাতির বসতি নাই এবং থাকতেও পারে না। যাঁরা রয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাঁরা বঙ্গভাষী; কিন্তু জাতিসত্তায় ভিনদেশীয়। … ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবাংলায় ‘বাঙালি’ বলে যাঁরা আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন, তাঁরা বঙ্গভাষী হলেও আসলে কিন্তু জাতি হিসেবে ‘বাঙালি’ নন। তাদের পাসপোর্ট হচ্ছে ইন্ডিয়ান ‘পাসপোর্ট’। কথাটা আরও বলতে হচ্ছে যে, পশ্চিমবাংলায় বঙ্গভাষী যাঁরা আছেন তাঁদের মাতৃভাষা নিশ্চয় বাংলা -কিন্তু তাঁরা কিছুতেই বাঙালি নন। জাতি সত্তায় তাদের পরিচয় ভিন্ন। তারা হচ্ছেন ভারতীয়" (প্রাগুক্ত,পৃ ১৮৪)।

    এখন অবস্থা দাঁড়াল এই যে পশ্চিমবঙ্গের ব্রাহ্মণ আর্য কবি রবী ঠাকুর in theory আউট, বাঙালীই নন। আর অনার্য নজরুল, পশ্চিমবঙ্গী বিধায় তিনিও আউট হওয়ার কথা। কিন্ত বিচলিত হবেন না, অবলীলাক্রমে তার একই বইয়ে শতাব্দীর (বিংশ শতাব্দীর) শ্রেষ্ঠ ১০ বাঙালীর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং শেখ মুজিবও আছেন (তবে শেষোক্ত ব্যক্তি হাজার হাজার বছরের বা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ হিসেবে নয়, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠদের একজন। তবে অবশ্যই ধীরে ধীরে হাজার বছরের, তারপর হাজার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ হবেন)!  

    -চার-

    অবশেষে, আবহমান কালের বাঙালীয়ানার ধোঁয়ায় রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক অধিকার দাবিয়ে রাখতে যে কয়টি কৌশল রয়েছে বাঙালীয়ার ধোঁয়া হচ্ছে সেসবের একটি। এই প্রবন্ধে সেই আলোচনা হয়েছে। তবে, "সাম্প্রদায়িক", "মৌলবাদী", "বর্বর" "অতীতে পড়ে থাকা",  'অনাধুনিক" মুসলিমদেরকে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে প্রবঞ্চনার আরও যুক্তি রয়েছে যেগুলো আমার অন্যান্য লেখায় স্থান পেয়েছে।  

  23. 5
    সৈয়দ ইকবাল

    (২ গ) এতকিছু কথা বলার পর নিরপেক্ষতা কোথায় এবং কতটুকু থাকল সেটা আমি খুব একটা বুঝে ওঠতে পারছি না। তবে পরের বাক্যে দেখছি নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য একটি প্রশ্নের অবতারণা করা হচ্ছে, এভাবে: “ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিকতার আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কবর দিয়ে মানবতার ধ্বংস নিশ্চিতকরণের মানসেই ‘আবহমান কালের বাঙালি সংস্কৃতি বাস্তবায়নের দাবী’ উঠাচ্ছে ঐ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় -এমন [কথা] বলা কি অনুচিত হবে বলে মনে হয়?”

    কিন্তু এই সন্দেহ প্রকাশে কি আগের নিশ্চিত সব কথার অবস্থানগত রূপ নিমিষে মিলিয়ে যায়? আমার তো মনে যায় না। বরং পাঠককে উলটা প্রশ্ন করার আরেকটি মোক্ষম সুযোগ দেয়। অর্থাৎ, “হায়রে পোড়া কপাল! আপনি নিজেই যখন নিশ্চিত নন, তখন এমন প্রবন্ধে লিখে আপনার সময়ই যে নষ্টই করলেন তাই নয়, বরং এই কাজ করতে গিয়ে কয়েক পক্ষের (“ক”) উপর অপবাদ চাপালেন, আর এখন হলুদ সাংবাদিকের মত অবচেতন পাঠককে বিভ্রান্ত করতে ফালতু প্রশ্নের অবতারণা করছেন। দেশ ও জাতি নিয়ে আপনি এমনসব কথা না লিখলে কি হয় না?”

    @এম_আহমদ 

    আপনার (২ গ) মন্তব্যের জবাবেঃ

    সময় নষ্ট করে না লিখলেও আমি পারতাম সত্য, তবে আপনার একজন ভক্ত হিসেবে আপনাকে কোনো পাঠক ভুল না বুঝোক- এই দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখেছিলাম বটে, কিন্তু আমি তা বুঝাতে পারিনি বলে নিজেই দুঃখিত ও লজ্জিত!  তাছাড়া, আমি কাউকে অপবাদ দিতে কিংবা হলুদ সাংবাদিকের মত অবচেতন পাঠককে বিভ্রান্ত করতে ফালতু প্রশ্নের অবতারণা করতেও চাইনি।  আমি যেহেতু কোনো কট্টর বক্তব্য দিয়ে কাউকে আহত করতে চাই না, বরং প্রশ্ন রেখে পাঠককে ভাববার সুযোগ করে দিতে চাই- তাই এমন মন্তব্য করেছিলাম মাত্র। আমি হয়ত ‘………… সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ বলে কথা শেষ করে দিতে পারতাম এবং ইচ্ছাও ছিলো তাই কিন্তু এটা যেহেতু একটা ব্লগ সেহেতু পাঠকের মন্তব্যকে স্বাগত জানাতেই এমন প্রশ্নের অবতারণা করেছি, কোনো অনিশ্চয়তা থেকে নয়।

    পরিশেষে, আমার মন্তব্যটির কারণে আপনাকে অনেক সময় নষ্ট করে জবাব লেখতে বাধ্য করায় আবারো ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

    1. 5.1
      এম_আহমদ

      @সৈয়দ ইকবাল:

      ইকবাল ভাই, এখানে পাঠকমণ্ডলী একে অপরের লেখার সাথে অত্যন্ত পরিচিত। নির্মূল-ঘরানাসহ। কোথাও কোনো একটি বাক্য ‘অযত্নপূর্ণ’ হলেও প্রাবন্ধিকের অনুরূপ ধারণা অন্যত্র পেয়ে যায়। আবার হাজারো বাক্য পূর্ণযত্নসহকারে প্রকাশ করলেও কেউ কারো ধারণার দিকে ঝোঁকে পড়ে না। এই স্থানটি হচ্ছে এমন যে এখানে প্রায়তই যার যার কথাই বলে যায়। তর্ক-বিতর্ক করে। বিষয়টা এভাবেই।

      আমি আপনার শেষের প্রশ্ন টেনে দেখাতে চেয়েছি যে নির্মূল ঘরানার পাঠক কী বলতে পারে। ওখানে আপনার বক্তব্যকে আমার করে নিয়ে নির্মূল-ঘরানার মতই নিজেকে তীরবিদ্ধ করেছি –ব্যাপারটা স্পষ্ট করতে। প্রাবন্ধিক তো এখানে আমি –সুতরাং কোন কথাই আপনার দিকে যায় না।

      ব্লগ পরিসরে আপনি আর আমি ‘কী’ মনে করে বক্তব্য দেই –সেটা ওদের কাছে ধর্তব্য নয়, বরং তাদেরটাই তারা বলবে। আমার বাক্যে যে  সমস্যা পাবে, আপনার বাক্যেও সেই সমস্যা পাবে –এই কথাই দেখিয়েছি।

      তাছাড়া আপনি একটি বিকল্প উত্থাপন করেছেন মাত্র –এই যা। তবে এতে আমারও তো একটি মত থাকতে পারে। এই স্থানটি তো মতামতের স্থান। আমি কেন তা গ্রহণ করব বা করব না -তাতো বলতে হবে। কিন্তু মূলত এখানে আমিও নেই, আপনিও নেই, আছে শুধু টেক্সট। Roland Barthes এর The Death of the Author প্রবন্ধটি স্মরণ করুন। সুতরাং মন্তব্য করে আপনি অনুতাপ করবেন কেন বুঝতে পারছি না। আমি জানি, আপনি ব্লগ জগতে সময় বেশি কাটান না। এখানের সমাজ, কথাবার্তা একদম ভিন্ন প্রকৃতির।  সদালাপ তো মার্জিত আঙ্গিকের কেননা এটা সচরাচর ব্লগ প্রকৃতির না হয়ে ‘ই-জার্নাল’।

      কারো মন্তব্য আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হলে আমি কেন সময় নিয়ে তা address করতে যাব? আমি সময় নিয়ে যা লিখেছি তা হল কিছু যুক্তির মূল স্থান বিশ্লেষণ করতে। এটা সকলের জন্য। এখানে যেসব যুক্তি স্থান পেয়েছে, আপনি ইন্টারনেট সার্চ করে দেখুন, এমন যৌক্তিকতা আর কোথায় পান কিনা। অর্থাৎ আপনার মন্তব্য সেই দিকগুলো ব্যাখ্যা করার একটা অবকাশ দিয়েছিল।

      আমি জানি, আমার লেখাটি অন্যান্য মহলের কাছে সমাদৃত হোক –এটি ছিল আপনার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ইন্টানেট-মহলে এসব প্লয় (ploy) তেমন কাজ করে বলে বুঝি না। আর ঘটনা এমন হতে পারে যে আজকাল আমরা damn care হয়ে পড়েছি। এটা হচ্ছে ইসলাম বিদ্বেষীগণ ও মোনাফেকদের আচরণের ফলে। তবে মনে হয় সময় এসেছে যে তাদের কারণে আমরা যেন নিজেদেরকে তাদের পর্যায়ে নিয়ে না যাই –সেটা কঠোরভাবে বিবেচনা করার।

      আবারও ধন্যবাদ।  

  24. 4
    সৈয়দ ইকবাল

    ১। টীকাঃ (উপর্যুক্ত প্রবন্ধে উল্লেখিত) ‘আমাদের এক সাহিত্য বৈঠকে’ = ‘বার্মিংহাম সাহিত্য পরিষদ (সাবেক- আড্ডা), ইউকে’র নিয়মিত মাসিক সাহিত্য আড্ডার একটিতে।

    ২। মন্তব্যঃ লেখাটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ, সময়োপযোগী এবং সচেতন পাঠকমনকে ভাবিয়ে তোলার মতো- সন্দেহ নেই। আজকাল আমরা যেভাবে স্রোতে গা ভাসাচ্ছি তাতে এ লেখাটি নিজেদেরকে প্রশ্ন করার দাবী রাখে। কিন্তু শেষের দিকে ইসলামের বিপরীতে দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের উল্লেখ লেখাটির মর্যাদাহানী করেছে বলে আমার মনে হয়। এতে করে কোনো কোনো পাঠক যদি ‘উক্ত সংগঠনদ্বয়ের সপক্ষে সাফাই গাওয়ার নিমিত্তে লেখক এই প্রবন্ধের অবতারণা করেছেন বলে দাবী করেন’- তাহলে কে খণ্ডাবে তা? তারচে বরং লেখাটির ঐ অংশ এভাবে হলে যুক্তিগ্রাহ্য হতো বলে আমার মনে হয়ঃ

    “কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা রাজনৈতিক দল- সংখ্যাগরিষ্ট নাগরিকের ধর্মবিশ্বাস-কেন্দ্রিক কিংবা নৈতিকতার ভিত্তিতে সমাজ বা রাষ্ট্র বিনির্মাণের (যেমনঃ শিক্ষা, আইন ও প্রশাসন) দাবী উঠালেই, পৌত্তলিকতা ও নাস্তিক্যবাদ প্রভাবিত তথাকথিত গণতন্ত্রীরা খড়গ-হস্ত হন তাদের উপর কিংবা বলা যায় ‘হামলে পড়েন’। শুরু হয় নানাভাবে, নানা কৌশলে তাদের দমনের প্রচেষ্টা। সে ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ নিরপরাধই হোক কিংবা কোনো কারণে অপরাধীই হোক না কেনো- তার উপর চলবে ‘সন্ত্রাস নির্মূল’এর নামে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও বৈশ্বিক সন্ত্রাস’। কেননা, বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশ ও তথাকার কর্তাব্যক্তিদের সানুগ্রহ সহানুভূতিই যে তাদের ক্ষমতারোহণের চাবিকাঠি”। ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিকতার আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কবর দিয়ে মানবতার ধ্বংস নিশ্চিতকরণের মানসেই ‘আবহমান কালের বাঙালি সংস্কৃতি বাস্তবায়নের দাবী’ উঠাচ্ছে ঐ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়- এমন বলা কি অনুচিত হবে বলে মনে হয়?”

    ৩। আমার মন্তব্যটি এই প্রবন্ধের লেখক কিংবা পাঠক কারো মনোপুত না হলে বা মনকষ্টের কারণ হলে ‘আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলবেন’- এই অনুরোধটুকু রইলো।

    1. 4.1
      এম_আহমদ

      @সৈয়দ ইকবাল: প্রথমত আপনার পাঠ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখা মাত্রেই দ্বিমতের স্থান থাকতে পারে –এটাই স্বাভাবিক।  

      আপনার মন্তব্যের দুটি অংশ দেখছি। প্রথম অংশে লেখাটির কিছু প্রশংসা ও সমালোচনা এবং দ্বিতীয় অংশে যুক্তিগ্রাহ্যতা নিয়ে একটি প্যারাগ্রাফ। আপনার ধারণায় মূল প্রবন্ধের একটি বাক্য নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। প্যারাগ্রাফটি সেই নিরপেক্ষতা স্থাপন করতে।

      আমি উভয় অংশের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ কোনোভাবেই আমার ঐ বাক্যটির কারণে কোনো স্থানেই যুক্তির কমতি ঘটায় না। বরং আমার বাক্যে যা আছে তা আরও ‘বর্ধিত’ আকারে প্রস্তাবিত প্যারাগ্রাফে এসেছে। আমার বাক্যে শুধু স্টিগমাটাইজড (stigmatised) পক্ষের নাম উল্লেখ হয়েছে –এই যা। আমার প্রতিমন্তব্য নিম্নরূপ:

      (১ক) আপনি প্রথমে বলেছেন, “লেখাটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ, সময়োপযোগী এবং সচেতন পাঠকমনকে ভাবিয়ে তোলার মতো- সন্দেহ নেই। … “তবে শেষের দিকে ইসলামের বিপরীতে দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের উল্লেখ লেখাটির মর্যাদাহানী করেছে বলে আমার মনে হয়।” এক্ষেত্রে আমি প্রথমে সন্দেহের স্থানটি নিয়ে বলতে চাই। ঐ বাক্যকে যদি আমার ‘সাফাই গাওয়া’ অর্থে দেখা হয়ে থাকে, তবে এমন বক্তব্যে আলোচিত দলসমূহ “দোষী” হওয়ার ধারণা নিয়েই তা হয়ে থাকবে। এই আলোচনা অন্য ধরণের। আমি যদি সাফাই গেয়ে থাকি, তবে টেক্সটের পূর্ণ আলোচনায় না গিয়েই বলব, ধরা যাক, গেয়েছি। এবং এতে বরং আমার কাছে ভিন্ন প্রক্ষিতে ঐ স্থানটি আরও যুক্তি-প্রখর বলে অনুভূত হয়। তাই যারা এই দৃষ্টিতে প্রবন্ধ পাঠ করতে চান তারা লেখাটিকে benefit of doubt দেবার দরকার নেই। আমার লেখা তো আমারই লেখা, এটা গ্রহণ/বর্জনে কোনো ধরাবাঁধা নেই। আমার এই লেখাটি ইন্টারনেটের লাখো-কোটি ধ্বনির মধ্যে একটি ক্ষুদ্র ধ্বনি।  

      (১খ) তবে আপনার বাক্যটি নিয়ে আরেকটু আলোচনা করতে চাই, কেননা ঐ বাক্যের “ধারণাটি” মূল সমস্যা। আমি যাদের নাম উল্লেখ করেছি তাদের প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, “শেষের দিকে ইসলামের বিপরীতে দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের উল্লেখ লেখাটির মর্যাদাহানী করেছে বলে আমার মনে হয়।” এই বাক্যটিতে বুঝা যাচ্ছে ‘অন্তত’ জামাত নামক দলটি “ইসলামের বিপরীতে” এবং, এই পাঠ যদি সঠিক হয়, তবে এখানে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘ধর্মতাত্ত্বিক’ (theological) অবস্থান  অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। ‘জামাত ইসলামি’ কোনো ইসলামী দল নয়, এমন ধারণা কয়েক মহলে রয়েছে। এটা “নির্মূল” হওয়া জরুরি –এমনটি রয়েছে। এমন ধারণা যখন আমরা সামাজিক বাস্তবতায় পাচ্ছি তখন এর উপস্থিতি অস্বীকার করে লাভ নেই। রাজনীতি ও ধর্মতত্ত্ব জীবনের অংশ, সামাজিক বাস্তবতারই অংশ। জর্জ ওরয়েলের দৃষ্টিতে কোনো অবস্থানই অরাজনৈতিক নয়।

      (১ গ) বাংলাদেশে যে কয়টি ইসলামী দল আছে সেগুলোর প্রায় সবটির বিপক্ষে পারস্পারিক ‘তাকফীরের’ ফাতোয়া রয়েছে। আপনি একটু ইন্টারনেট সার্চ দিলেই তা পেয়ে যাবেন। আমি কিন্তু এসবের মধ্যে নেই, বরং আমি সকল ইসলামী দলের “পক্ষের” লোক, এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা পুন-প্রতিষ্ঠার পক্ষেরও একজন। অধিকন্তু সকল দলের মধ্যে ঐক্য স্থাপনেরও প্রবক্তা। আগামী দিনের ইসলামী নেযাম প্রতিষ্ঠা এদের সকলের মিলিত অবস্থান ব্যতীত সম্ভব নয়, এটাই মনে করি।

      (১ঘ) আরেকটি দিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভব করি। যেমন ধরুন: জামাতে ইসলাম, খিলাফত মজলিস, ইখওয়ানুল মুসলিমিন, তাবলীগ জামাত এবং অপরাপর ইসলামী দল –এগুলো ইসলামের অংশ, ইসলামের দল কিন্তু Islam per se নয়। অর্থাৎ কেউ তাবলীগ জামাত বা জামাতে ইসলাম করে না বলে সে ইসলাম বহির্ভূত হয় না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এইসব জামাতগুলোতে ‘ইসলাম ধর্ম’ নেই।

      (১ঙ) জামাতে ইসলামের সাথে অংশ গ্রহণ না করলে ইসলাম ছুটে যাবে না, তাই তাদেরকে ‘নির্মূল’ করার বিপক্ষে কেউ কথা বললে তা বুঝি ঐ দলটিকে Islam per se এর মোকাবেলায় ভাবা হয়ে যায়? বাংলাদেশের ‘নির্মূল-ঘরানা’ এই কুযুক্তি সাজিয়ে রেখেছে। আপনি তাদের বিপক্ষে কথা বললেই সে বলে ওঠবে, ‘কই দলটি কি Islam per se? এটা নির্মূল করলে কি ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাবে? আপনি Islam per se এর সাথে এই দলটিকে ঘুলিয়ে ফেলছেন?’ এই যে semantic এটা তারা কৌশলে সর্ব সাধারণে ছড়িয়ে দিয়েছে। But does it lend an argument to the effect that since one particular party does not comprise the total, then the part can be annihilated and anyone opposing will be accused of substitution of the whole for the part? What kind of argument is that? Where is the rationale for it?

      এই বিষয়ের উপর আমার অনেক কথা বলার আছে কিন্তু এখানে বলতে পারব না। আমি অনেক বৎসর থেকে দেখছি এসব আলোচনা ঝগড়ায় পর্যবেশিত হয়, তাই পারতপক্ষে এসব থেকে সরে থেকে নিজের কথাই বলে যেতে চাচ্ছি। আমি শুধু এতটুকুই বলব যে আজকের মুসলিমগণই ইসলামের প্রতিনিধি। আর এই মুসলিমগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন কিন্তু সবাই এখনো ‘এক দেহ’ (হাদিস)। আজকে একজন তবলীগের ‘ঘোর’ বিরোধী হবে, কালকে সে জামাত ‘নির্মূল’ করবে, পরশুদিন সে ‘সালাফি’ মেরে আরবে পাঠাবে, তরশুদিন সে বাকিদের গায়ে হলুদ কাপড় পরিয়ে বৈষ্ণব বানিয়ে রাস্তায় একতারায় বাউলগান গাওয়াবে। আমি তো সবাইকে আমার কথা বুঝাতে পারব না, তবে নিজের কথা তো বলতে পারি। এই প্রসঙ্গে আপনি ভাল থাকুন ও সুস্থ থাকুন। আমার আর কিছু বলার নেই।

      (২) এবারে দেখা যাক নিরপেক্ষ প্যারাগ্রাফটি।

       “কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল- সংখ্যাগরিষ্ট নাগরিকের ধর্মবিশ্বাস-কেন্দ্রিক কিংবা নৈতিকতার ভিত্তিতে সমাজ বা রাষ্ট্র বিনির্মাণের (যেমনঃ শিক্ষা, আইন ও প্রশাসন) দাবী উঠালেই, পৌত্তলিকতা ও নাস্তিক্যবাদ প্রভাবিত তথাকথিত গণতন্ত্রীরা খড়গ-হস্ত হন তাদের উপর কিংবা বলা যায় ‘হামলে পড়েন’। শুরু হয় নানাভাবে, নানা কৌশলে তাদের দমনের প্রচেষ্টা। সে ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ নিরপরাধই হোক কিংবা কোনো কারণে অপরাধীই হোক না কেনো- তার উপর চলবে ‘সন্ত্রাস নির্মূল’এর নামে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও বৈশ্বিক সন্ত্রাস’।

      (২ ক) এই প্যারাগ্রাফের প্রথম বাক্যের উদ্দেশ্য বা কর্তৃপদে (subject) যারা আছেন তারা হলেন, “পৌত্তলিকতা ও নাস্তিক্যবাদ প্রভাবিত তথাকথিত গণতন্ত্রীরা”। ধরুন, এরা “ক”। এদের ক্রিয়াগুলো হচ্ছে হামলে পড়া, খড়গ হস্ত হওয়া, কৌশলে দমন করা। এটাকে “খ” ধরি। যাদের উপর “ক” “খ”-এর মত দারুণ মন্দ কাজগুলো সম্পাদিত করছে (বিধেয়পদ), তারা হলেন এমন “কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা রাজনৈতিক দল- [যারা] সংখ্যাগরিষ্ট নাগরিকের ধর্মবিশ্বাস-কেন্দ্রিক কিংবা নৈতিকতার ভিত্তিতে সমাজ বা রাষ্ট্র বিনির্মাণের (যেমনঃ শিক্ষা, আইন ও প্রশাসন) দাবী [তোলে] তারা। বাক্যের বিধেয় পদের সবাইকে আমরা “গ” বলব।

      (2 খ) দ্বিতীয় বাক্যে বর্ধিত আকারে আরও কিছু কথা সংযুক্ত হয়েছে। তা হল উল্লেখিত “গ” সম্প্রদায়ের কেউ ‘অপরাধী হোক অথবা নিরপরাধী’, এদের উপর “সন্ত্রাস নির্মূলের” নামে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস” ও “বৈশ্বিক সন্ত্রাস” চালানো হয়। কী অদ্ভূত জুলুম! এই কথাগুলো কোনো সন্দেহ-বাক্যে আসে নি। এখানে “ক” ও “গ” এর ব্যাপারে কোনো “নিরপেক্ষতা” দেখা যাচ্ছে না। কোনো অনুসন্ধান চালিয়ে “ক” পক্ষের “খ”-মূলক দুষ্কর্ম প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না। এই জঘন্য কাজগুলো  অপরাধ-নিরপরাধ নির্বিশেষে (দ্বিতীয় বাক্য) “সন্ত্রাস নির্মূলের” অজুহাতে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস” চালাচ্ছে। এই কথাগুলো কিভাবে এত নিরপেক্ষ হয়? কেবল নির্যাতিত পক্ষের নাম এড়িয়ে যাওয়াতে?  "ক" ও "গ" পক্ষের identity কি কালীন বাস্তবতায় অপরিচিত?

      (২ গ) আমরা কিন্তু বাংলাদেশের কথা বলছি। এখানে স্থান/কাল অবশ্যই স্পষ্ট, “সময়োপযোগীতার” বিষয়টি প্রবন্ধের মানের বিবেচনায় আগেই ওঠে এসেছে। তাই “ক” “খ” ও “গ” এর পরিপ্রেক্ষিত এই কালের, এই সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, এবং এটা দেখাতেই ঐতিহাসিকতার অবতারণা করা হয়েছে, প্রবন্ধ রচিত হয়েছে।

      (২ গ) এতকিছু কথা বলার পর নিরপেক্ষতা কোথায় এবং কতটুকু থাকল সেটা আমি খুব একটা বুঝে ওঠতে পারছি না। তবে পরের বাক্যে দেখছি নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য একটি প্রশ্নের অবতারণা করা হচ্ছে, এভাবে: “ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিকতার আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কবর দিয়ে মানবতার ধ্বংস নিশ্চিতকরণের মানসেই ‘আবহমান কালের বাঙালি সংস্কৃতি বাস্তবায়নের দাবী’ উঠাচ্ছে ঐ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় -এমন [কথা] বলা কি অনুচিত হবে বলে মনে হয়?”

      কিন্তু এই সন্দেহ প্রকাশে কি আগের নিশ্চিত সব কথার অবস্থানগত রূপ নিমিষে মিলিয়ে যায়? আমার তো মনে যায় না। বরং পাঠককে উলটা প্রশ্ন করার আরেকটি মোক্ষম সুযোগ দেয়। অর্থাৎ, “হায়রে পোড়া কপাল! আপনি নিজেই যখন নিশ্চিত নন, তখন এমন প্রবন্ধে লিখে আপনার সময়ই যে নষ্টই করলেন তাই নয়, বরং এই কাজ করতে গিয়ে কয়েক পক্ষের (“ক”) উপর অপবাদ চাপালেন, আর এখন হলুদ সাংবাদিকের মত অবচেতন পাঠককে বিভ্রান্ত করতে ফালতু প্রশ্নের অবতারণা করছেন। দেশ ও জাতি নিয়ে আপনি এমনসব কথা না লিখলে কি হয় না?”

      (২ ঘ) মূল প্রবন্ধে আমার বাক্যটিতে “গ” পক্ষের নাম উল্লেখ হয়েছে কিন্তু “সরকার” শব্দটি উল্লেখ করিনি যেটি এখানে এসেছে। আপনার প্যারাগ্রাফের যাদের নাম (“গ” পক্ষ) উল্লেখ হয়নি তারা এমন কোনো ‘কাল্পনিক’ পক্ষ নন যারা এখন হামলা দমন ও নির্যাতনের শিকার ("গ" পক্ষ) । এদের পরিচিতি (identity) আছে। তাছাড়া  “ক” পক্ষেরও পরিচিতি আছে। সুতরাং কি বলব, আমি ওখানে নিরপেক্ষতা দেখানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না -বাস্তিবতা যেখানে স্পষ্ট। আবার আমি বাংলাদেশের সুশীলই নই, মুসলমানদের দুর্দিনে ফেন্সে (fence) থাকতে চাইও না।

      অবশেষে পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। আমার কথাগুলো মনের খুলুসিয়্যাত থেকে এসেছে। নিশ্চয়ই আপনি খুলুসিয়্যাতের সাথে আমার প্রবন্ধের মান বৃদ্ধির জন্য আলোচনা করেছেন। আল্লাহ আমাদের উভয়কে পুরষ্কার দান করুন। আমীন। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। 

  25. 3
    মুনিম সিদ্দিকী

    আজ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নামে বাংলাদেশে পৌত্তলিকতার প্রাচীন ভিত্তি সুদৃঢ় হচ্ছে। শাসন প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ সরানো হচ্ছে। ‘গণতান্ত্রিক পথ বেয়ে’ সমাজে শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনকে নৈতিক ভিত্তির উপর সাজাতে  যে রাজনৈতিক দলটি কাজ করছে সেটিকে গণতান্ত্রিক পরিসর থেকে “নির্মূল” করা হচ্ছে। 

    আহমেদ ভাই উপরের বর্ণিত চিত্রটি শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়, তা বৈশ্বিক বাস্তবতাই বটে! আপনি দেখুন কি মুসলিম দেশ আর কি অমুসলিম দেশ। ঐ সব দেশে বৈরাগী ইসলাম আর মাজারী ইসলামকে শুধু মৌখিক সহানুভূতি প্রদর্শন নয় অর্থ বিত্ত প্রশাসনিক ছাতা দেয়া হয়। কিন্তু দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েমের দলের প্রতি চরম বৈরিতা করা হয়। এই সব দলকে ছলে বলে কৌশলে দমন করে রাখা হয়।

    ইসলামী হুকুমত কায়েমের আন্দোলন সহজ সরল হতে দেবেনা। তা যেমন দেবেনা অমুসলিম বিশ্বশক্তি তেমন দেবেনা মুনাফিক মুসলিমগণ। তবে যত বেশী কারবালার ঘটনা ঘটবে ইসলাম তত জোরে মানুষের মনে জিন্দা হতে থাকবে। এই ভাবে যত কুরবান হবে তত বিভিন্ন চেতনায় বুধ হয়ে থাকা নতুন প্রজন্মরা দলে দলে ইসলামী হুকুমত কায়েমের কাফেলায় শরীক হবে, ইনশাল্লাহ!

    1. 3.1
      এম_আহমদ

      @মুনিম সিদ্দিকী:

      ইসলামী হুকুমত কায়েমের আন্দোলন সহজ সরল হতে দেবেনা। তা যেমন দেবেনা অমুসলিম বিশ্বশক্তি তেমন দেবেনা মুনাফিক মুসলিমগণ। তবে যত বেশী কারবালার ঘটনা ঘটবে ইসলাম তত জোরে মানুষের মনে জিন্দা হতে থাকবে। এই ভাবে যত কুরবান হবে তত বিভিন্ন চেতনায় বুধ হয়ে থাকা নতুন প্রজন্মরা দলে দলে ইসলামী হুকুমত কায়েমের কাফেলায় শরীক হবে, ইনশাল্লাহ!

      ঘটনা এভাবেই। যতই নির্যাতিত হচ্ছে ততই ঐক্যের প্রয়োজন অনুভব করছে। যাদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে সেটাও ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে। যারা নিজেদের কুটিরে আবদ্ধ তারা কেবল একে অন্যকে ঘায়েল করা থেকে বিরত থাকলেও -এটাও হবে একটা অর্জন। আশা করা যায় ধর্ম জ্ঞান যতই বাড়বে ততই ঐক্যের সম্ভাবনা ততই বৃদ্ধি পারে। এটা লক্ষ্য করে থাকবেন যে যেসব দলে কিটকিটে ধর্মীয় মানসিকতা ওখানেই কোন্দল ও ফাতোয়াবাজি বেশি। 

      পাঠ ও মন্তব্যে জন্য ধন্যবাদ।

  26. 2
    মহিউদ্দিন

    আজ বাঙালীয়ানার নামে যা হচ্ছে তা হল কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার অবস্থা। মুসলমানদের অবদান নিজ হাতে তোলে নিয়ে মুসলিম ইন্টারেস্ট ক্ষুণ্ণ করা। এসব হচ্ছে চর দখলদারির মত।

    তবে এ কাজটি এক শ্রেণীর মুসলিম নামধারী তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা-বাদীরাই কিন্তু এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
    লিখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আসলেই এ লিখাটির নির্যাস চিন্তাশীলদের মুগ্ধ হবার কথা।
    তবে শিরোনামটা আরো সংক্ষিপ্ত হলে হয়তবা ভাল হত। 

     

    1. 2.1
      এম_আহমদ

      ধন্যবাদ। এখানে স্টাইলের কিছু ভিন্নতা এসেছে। শিরোনামে সব কথা বলে দেবার প্রবণতা খুব ভাল দেখায় না, কিছু কিছু ব্যতীক্রম স্থান ছাড়া। এখানে ভাবলাম যখন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে লিখছি, তখন দেই বড় করে –মূল কথাটি শিরোনামেই বুঝা যাক।   আমার মনে হয়, এই ফেসবুকের যুগে, মানুষ শিরোনাম ও দু/একটি প্যারাগ্রাফ ছাড়া তেমন কিছু পড়ে না। ব্লগ পাঠ তো মনে হয় অনেক ডাউন। 

  27. 1
    শাহবাজ নজরুল

    যথারীতি আপনার প্রথাবিরোধী লেখা চিন্তার উদ্রেক করে। অনেক প্রসঙ্গ এসেছে। এসেছে বাঙালিয়ানার ইতিহাস, তথ্যভিত্তিক তত্ত্ব নির্মান ও যৌক্তিকতার নিরিখে আমাদের 'আবহমান' পরিচিতির নিরীক্ষণ ও পর্যালোচনা। কেউ যদি বলে বাঙালিয়ানার মধ্যে 'মুসলিম' ধারা নেই -- সেকথা সর্বাংশে ভুল। সময়কাল ও তত্কালীন বাংলার যে নমুনা দিলেন তাতে এখথা নির্দিধায় বলা যায় যে বাংলাতে মুসলিম-দের আগমন আর বাংলা ভাষার উত্সমুখ যুগপদ। তাই বাংলার ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হচ্ছে 'ইসলামী' বা 'মুসলিম' ধারা -- আর এটাকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে অজ্ঞ বলেই জাহির করার নামান্তর। তাই 'আবহমানতার' ছলাকলা দিয়ে 'ইসলামী' মূল্যবোধকে এই উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বহিরাগত বলে চালাবার যে অপকৌশল চলছে -- তার বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতেই হবে।  'আবহমানতার' সংজ্ঞা দিলে 'ইসলামী' ধারাও নির্দিধায় এদেশে 'আবহমান'।

    তবে লেখার শেষে ইসলামকে 'জামাতে ইসলামের' সাথে এক করে ফেলাকে ভালো লাগেনি। ইসলাম আর জামাতে ইসলাম এক কথা নয়। তবে বরাবরের মত আপনার লেখার নির্যাসে মুগ্ধ হলাম।

     

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      [Revised comment] ভাই, সালাম। অনেক দিন পর কথা। আপনার মন্তব্য পড়ে প্রথমে একটা মন্তব্য করেছিলাম। সেটা পড়ে থাকলে মনে কিছু করবেন না। "আজ মীর কাসেমের মন খারাপ" -এই ধরণের একটা কিছু। তারপর মন্তব্যটি আরও কয়েকবার পড়লাম এবং বুঝতে বুঝলাম সত্যিই মন খারাপ। আমার কথাই বলছি। যাক, এবারের মন্তব্য হচ্ছে এই যে আপনার সব কথাতেই একমত কেবল জামাত ও ইসলাম ছাড়া, এই স্থানটি ঠেসা দিয়েছিল। আপনার মন্তব্য পড়ে আমি লেখাটির সেই অংশটি আবার চেক করে দেখেছি। সেখানে এমন কিছু নেই। আমি যদি জামাত ও ইসলামের মধ্যকার পার্থক্য না বুঝে থাকি, তাহলে, তাহলে বলার কিছু নেই। আজকাল দেশে বিদেশে 'জামাত-নির্মুল -এর  বিপক্ষে কথা বলাতে সমস্যা হচ্ছে। এর সমাধান নেই।   তবে, আপনি বাক্যটিকে স্বতঃসিদ্ধ না ভেবে, অব্জারভেশন ও পরিস্থিতির ‘একটি’ দৃষ্টিকোণ হিসেবে নিতে পারেন।  ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। দোয়া রইল।

      1. 1.1.1
        শাহবাজ নজরুল

        আপনার সাথে আলোচনা করতে সবসময় ভালো লাগে। প্রতিবারই কিছু না কিছু শিখি। তবে আপনি আর আমি দু'জনেই জানি কিছু ব্যপারে আমাদের দ্বিমত আছে। তাই বলে কি আলোচনা করব না? সব কিছুতেই কি একমত হতে হবে? অবশ্যই না। আপনার নিজের অবস্থান আপনার নিজের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত প্রসূত। এই অধিকার আপনার নিজের। সেই অধিকারের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আর এই দ্বিমত টুকু মেনে নিয়ে আলোচনাকে সামনে নিয়ে যাওয়াই আমার উদ্দেশ্য। তবে অন্য মন্তব্যে যেভাবে বললাম -- কিছুটা ব্যস্ততাতে পড়ে গিয়েছি। ২/৪ দিন পরে আবার আসব ইনশাল্লাহ। তবে সার্বিকভাবে বলে রাখি -- এটি একটি অসাধারণ লেখা। খুব ভালো লেগেছে লেখাটা পড়ে। 

    2. 1.2
      এম_আহমদ

      @শাহবাজ নজরুল: এখানে আরও দুটি কথা বলতে চাই, to compensate for what hadn't been said. এই প্রবন্ধে যে  আলোচনাটি করেছি তার অনেক প্রেক্ষিত রয়েছে। আমি শুধু বাঙালীয়ানার দোহাই দিয়ে যা হচ্ছে তাই প্রসঙ্গ করেছি।  লক্ষ্য করে থাকবেন যে বাঙালীয়ানা ও বাঙালিয়ানার ‘নামে’ কিছু করা -এই দুইয়ের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রয়েছে।  এই পার্থক্য সামনে রেখেই বাকি কথা বলছি।

      বাংলা ভাষা মুসলমানদের হাতেই গড়ে ওঠেছে। বর্ণ হিন্দুদের কাছে বাংলা ছিল ‘পাখির কিচির মিচির’, ইতর জনের ভাষা। কিন্তু কালের আবর্তনে অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। আর্যরা ভারতে সিন্ধু সভ্যতা (হরপ্পা/মোহেঞ্জদারো) ধ্বংস করেছিল কিন্তু আজকাল তাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে সিন্ধু সভ্যতার অংশ ভেবে থাকেন। বাংলাকে আর্য বর্ণবাদীরা ‘ইতরের’ ভাষা ভাবলেও কালের সেকি বিধান, তারা ধীরে ধীরে এই ইতরের ভাষাকে শুধু গ্রহণই করেননি বরং ইংরেজ আমলের দৌরাত্মে এর মা-বাপ সেজে বসেছেন। গো-চেনা ও গোবর খাইয়ে এটাকে সংস্কৃতবাহি করার প্রয়াস চালিয়েছেন। আজকেও সেই প্রয়াস অব্যাহত।

      আজকে বাংলাদেশে এমন এক শ্রেণী তৈরি হয়েছে যারা বাংলার ব্যবহার থেকে আরবি, ফারসি, উর্দু তাড়াতে মরিয়া হয়ে লেগেছে। সংস্কৃত ঘেঁষা শব্দের replacement করলেই বুঝি তা আবহমান কালের বাংলা হয়ে যায়? ভাষার বৈশিষ্ট্য এরূপ নয়। আমরা কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে absorbed হওয়া শব্দ ও ব্যবহারের বিপক্ষে নই যদিও তা বিদেশি বা সংস্কৃত ঘেঁষা হয়েও থাকে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে, বিদ্বেষ-প্রসূত এমনসব কাজের বিপক্ষে। এতে ভাষার সমৃদ্ধি হয় না বরং ভাষা তার সঞ্জীবনী হারায়।

      গত ক’ বছর আগে এক সাহিত্য মজলিসে একজন কমিউনিস্ট-মার্কা যুবক যখন আমাদের আলোচনায় আসা “পাঞ্জেরি” কবিতার উল্লেখ হয়, তখন সে এই শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি করে। এটা বুঝি বাংলায় ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, এটা বাংলা শব্দ নয়!

      বাঙালী স্বরূপ নিয়ে যা কিছু বলা যাবে তাতে মুসলমানদের অবদানে প্রতুল। মুসলমানরাই সর্বপ্রথম বাঙ্গালার সমগ্র অঞ্চলকে ‘বাঙ্গালাহ’ বলে অভিহিত করেন। মুঘল আমলে পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলীয় ভূখণ্ড ‘সুবাহ বাঙ্গালাহ’ নামে পরিচিত হয়। শাহজাহান আওরঙ্গজেবের আমল থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত এই অঞ্চল ‘সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ছিল (ব্রিটিশের আমলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীও বলা হত)। মোঘল যুগে একই নামে অঞ্চলটি নির্ণীত হলেও যাতায়াতের কারণে পূর্ণ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল না। আসাম সব সময়ই বাইরে ছিল। কিছু কিছু অঞ্চল ছিল নামসার (নামমাফিক কর্তৃত্বে)। কিন্তু সামগ্রিক রূপ মুসলমানদের হাতেই হয়েছে। হুসেন শাহ (১৫ শো শতাব্দী) এর আমলে বাংলা রাজকীয় পৃষ্ঠ-পোষকতা পেয়েছে, বাংলা সমৃদ্ধ হয়েছে। হুসেন শাহের ছেলে ফিরোজ শাহ ছিলেন বাংলার পৃষ্ঠপোষক। পরবর্তী মোঘলদের হাতেও সেই গতি অব্যাহত থাকে।

      আজ বাঙালীয়ানার নামে যা হচ্ছে তা হল কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার অবস্থা। মুসলমানদের অবদান নিজ হাতে তোলে নিয়ে মুসলিম ইন্টারেস্ট ক্ষুণ্ণ করা। এসব হচ্ছে চর দখলদারির মত।

      1. 1.2.1
        শাহবাজ নজরুল

        আপাতত থাম্বস আপ দিয়ে রাখছি -- অসাধারণ এক মন্তব্য।  আরো আলোচনার ইচ্ছে রইল, তবে বেশ ব্যস্ততায় পড়ে গিয়েছি। ২/৪ দিন পরে দেখি আবার আড্ডা দিতে আসব ইনশাল্লাহ।

        1. 1.2.1.1
          এম_আহমদ

          @শাহবাজ নজরুল: ঠিক আছে। সময় করে আসবেন। ধন্যবাদ।

      2. 1.2.2
        আহমেদ শরীফ

        আজ বাঙালীয়ানার নামে যা হচ্ছে তা হল কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার অবস্থা। মুসলমানদের অবদান নিজ হাতে তোলে নিয়ে মুসলিম ইন্টারেস্ট ক্ষুণ্ণ করা।

         

         

        মর্মান্তিক সত্য।

         

        আমি ব্যক্তিগতভাবে শাহবাগি ও সমজাতীয়-সমমনা মুসলিম নামধারী আত্মবিস্মৃত গর্দভদের করুণা করি এ কারণেই যে তারা মুশরিকদের সুকৌশলি সাম্রাজ্যবাদি সাংষ্কৃতিক-সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের ট্রোজান হর্স হিসেবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত  বুদ্ধিদাসত্ব গ্রহণ করে টিস্যু পেপারের মত নিজেদের ব্যবহৃত হতে দিয়েছে, দেশপ্রেমের মিথ্যা ঐকতানে নিজেদের মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, মুসলিম হিসেবে নিজের আত্মার সাথেও নিষ্ঠুরতম প্রতারণা করেছে।

         

        কাল ক্বিয়ামতের দিন যখন তাদের অনেকে মুশরিকদের মাঝে নিজেদের আবিষ্কার করে কঠিন আজাবের মুখোমুখি হবে _ মর্মন্তুদ আজাব থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য উচ্চস্বরে নিজেদের মুসলিম দাবি করা সত্ত্বেও নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে, তখনই হয়তো তাদের প্রকৃত আত্মোপলব্ধি হবে। কোন পর্যায়ের নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল চক্রান্তকারী মুশরিকদের সঙ্গে অপবিত্র-জঘন্য ভ্রাতৃঘাতি সেই আঁতাত _ হাড়ে মজ্জায় তারা তখন অনুভব করতে বাধ্য হবে। যদিও সেই উপলব্ধি অনুতাপ-আফসোস-ভোগান্তি শতগুণে বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোন ফলাফল বয়ে আনতে সমর্থ হবে না।

        1. 1.2.2.1
          এম_আহমদ

          @আহমেদ শরীফ:

          আমি ব্যক্তিগতভাবে শাহবাগি ও সমজাতীয়-সমমনা মুসলিম নামধারী আত্মবিস্মৃত গর্দভদের করুণা করি এ কারণেই যে তারা মুশরিকদের সুকৌশলি সাম্রাজ্যবাদি সাংষ্কৃতিক-সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের ট্রোজান হর্স হিসেবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত  বুদ্ধিদাসত্ব গ্রহণ করে টিস্যু পেপারের মত নিজেদের ব্যবহৃত হতে দিয়েছে, দেশপ্রেমের মিথ্যা ঐকতানে নিজেদের মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, মুসলিম হিসেবে নিজের আত্মার সাথেও নিষ্ঠুরতম প্রতারণা করেছে।

          কিয়ামতের কথা বলেছেন, কিন্তু ওরা তো কিয়ামতের ধার ধারে বলে মনে হয় না। “উদারতা প্রদর্শনীতে” বিশ্বাস ও ধর্মকেও জলাঞ্জলি দেবে। সাজের-মুসলিম ইসলামকে উদার দেখাতে ইসলামের নামে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতেও লাজলজ্জা হবে না। আরবির ‘মুতাআলিম’ (متعالم)  শব্দটিই এদের ব্যাপারে একদম প্রযোজ্য। পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

        2. 1.2.2.2
          আহমেদ শরীফ

          কিয়ামতের কথা বলেছেন, কিন্তু ওরা তো কিয়ামতের ধার ধারে বলে মনে হয় না।

           

          অন্ধ হলেই যেমন প্রলয় বন্ধ হয় না তেমনি ক্বিয়ামতের ধার না ধারলেও একদিন হিসাবের ময়দানে আসামীর বেশে হাজির হতেই হবে। নিস্তার নেই। পরীক্ষার্থী পরীক্ষার ব্যাপারে উদাসীন অমনোযোগী হলেও ফলাফল তার নিজেকেই ভোগ করতে হয়।

          যথাসময়ে ঠিকই এক কল্পনার অতীত রুঢ়, মর্মন্তুদ উদ্ভূত বাস্তবতার মুখোনুখি আকস্মিকভাবে তাদের হতে হবে _ যার ব্যাপারে তারা মিথ্যারোপ করত।

      3. 1.2.3
        শাহবাজ নজরুল

        আজকে বাংলাদেশে এমন এক শ্রেণী তৈরি হয়েছে যারা বাংলার ব্যবহার থেকে আরবি, ফারসি, উর্দু তাড়াতে মরিয়া হয়ে লেগেছে। 

        এই বিজ্ঞ জনগোষ্ঠির কাছে আমার আবেদন নিচের বাক্যটিকে বাংলাতে অনুবাদ করে দিতে --            "এই শীতের মৌসুমে কাঁচের মিস্ত্রির খবর কোথায় পাবি?"  

    3. 1.3
      মুনিম সিদ্দিকী

      আহমদ ভাই, আপনার এই ব্লগ এক অনবদ্য ব্লগ হয়েছে। ভাই নিজের লাইন গুলো সরিয়ে ফেললে ভালো হবে, কারণ সব মতের লোক এখান থেকে কিছু না কিছু চিন্তার খোরাক পাবে বলে আমার বিশ্বাস। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.