«

»

Oct ১১

ঐশী বাণী: বিশ্বাস অবিশ্বাস ও নাস্তিকতা (২য় পর্ব)

[আগের অংশ পড়লে ধারাবাহিকতা বুঝা যাবে, তবে না পড়লেও অসুবিধে নেই।]

ভাষিক বাণী ও ভিন্নতা

আগের পর্বে পার্থক্য ও ভিন্নতার কথা বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হয়েছে। এবারে শুধু এতটুকুই:  পার্থক্য যেমন দৃশ্যজাত বস্তুতে থাকে তেমনি নৈর্বস্তুক বিষয়েও। এই কথাটি মনে রেখে নবী রাসূলের বাণীর দিকে মনোনিবেশ করা যাক। নবীদের বাণী ও তাদের ওহীতে প্রাপ্ত বাণী ভাষার বাহনে চালিত। আর এই ভাষাতেও পার্থক্যের প্রকৃতি রয়েছে। মোখিকভাবে ব্যক্ত অথবা লিখিত কথায় ভিন্ন ভাবার্থের স্থান খোঁজা যেতে পারে। একটি সরল কথাকেও গরল অর্থে নেয়ার অবকাশ তৈরি করা যেতে পারে (হোক তা ন্যায্য অথবা অন্যায্য, সেটা ভিন্ন কথা)।

ওহীর বাণীকে একটি বাগানের মত অথবা একটি দীর্ঘ কবিতার মত ধরা যাক। কোন গাইড বা শিক্ষক ছাড়া যারা ওখানে ঢুকবে তারা নিজেদের “অবস্থান” ও ভিন্ন “প্রকৃতির” কারণে নিজেদের দেখাই দেখবে। তারা তাদের নিজেদের ভিন্নতাই বাণীর গায়ে প্রতিফলিত হতে দেখবেন। নবী রাসূলের বাণী যেহেতু প্রচলিত অনেক বিশ্বাস ও আচরণের প্রতিকূলে ছিল, তাই সেখানে প্রতিক্রিয়ার উদ্ভব হয়েছে, দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর ভিন্নতা প্রকাশ পেয়েছে। অবিশ্বাসীদের প্রথা ও মূল্যবোধ তাদের ‘অর্থ’ গ্রহণের স্থানকে "আত্ম-কেন্দ্রিক" (self-centric, centripetal) করেছে, এবং নবীদের বাণীকে ‘বহির্ভাবাপন্ন’ (Other, centrifugal/oppositional) করেছে। এতেই এসেছিল "নিজ/পর সাংঘর্ষিকতা" (বিশ্বাস ও আদর্শের প্রেক্ষিতগত সাংঘর্ষিকতা/ the 'self' and the ‘Other’ dichotomy – কেবল এই স্থানটি নিয়ে আলাদা একটি প্রবন্ধ রচনা করা যায়।

কোন টেক্সটের পাঠেই সকলের অবস্থান সমান হবে না –এটাই স্বাভাবিক। এই ওহীর বাণী বৃষ্টির পানির ন্যায় ছিল। ওখানে কারো ছিল পৌষ মাস, আর কারো সর্বনাশ। তারপর, যার ঘটি যেমন ছিল, সে সেই পরিমাণের পানিও পেয়েছিল। কোন বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, কোন বীজ হয় নি, কোথাও পানি জমাট হয়েছে, কোথাও হয় নি। এই পানির উপমা সরাসরি কোরান থেকে নেয়া যাক।

তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে নিজ নিজ পরিমাণ অনুযায়ী। অতঃপর স্রোতধারা স্ফীত ফেনারাশি উপরে নিয়ে আসে। এবং অলঙ্কার অথবা তৈজসপত্রের জন্যে যে বস্তুকে আগুনে উত্তপ্ত করে, তাতেও তেমনি ফেনারাশি থাকে। এমনিভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেন। অতএব, ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন। যারা পালনকর্তার আদেশ পালন করে, তাদের জন্য উত্তম প্রতিদান রয়েছে, এবং যারা আদেশ পালন করে না, যদি তাদের কাছে জগতের সবকিছু থাকে এবং তার সাথে তার সমপরিমাণ আরও থাকে, তবে সবই নিজেদের মুক্তিপণ স্বরূপ দিয়ে দেবে। তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর হিসাব। তাদের আবাস হবে জাহান্নাম। সেটা কতইনা নিকৃষ্ট অবস্থান। যে ব্যক্তি জানে যে, যা কিছু পালনকর্তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে তা সত্য সে কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে অন্ধ? তারাই বোঝে, যারা বোধশক্তি সম্পন্ন (কোরান, ১৩:১৯)।

বিষয়টি এভাবেই ছিল –এই বাণী কারো প্রাণ স্পর্শ করেছে, কারো কর্ণকুহরে প্রবেশই করে নি। কিন্তু যারা প্রাণবন্ত হয়েছিলেন, এর অর্থের গভীরতা অনুভব করেছিলেন, তারপর যখন শিক্ষকের (নবী/রাসূল) সাথে বসেছিলেন তখন তাদের সেই অর্থের সাথে আরও অর্থের দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল ((আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের জ্যোতি, তাঁর জ্যোতির উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি, যাতে আছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাঁচপাত্রে স্থাপিত, কাঁচপাত্রটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ্য। তাতে পুতঃপবিত্র যয়তুন বৃক্ষের তৈল প্রজ্বলিত হয়, যা না পূর্বমুখী, আর না পশ্চিমমুখী। অগ্নি স্পর্শ না করলেও তার তৈল যেন আলোকিত হওয়ার নিকটবর্তী। জ্যোতির উপর জ্যোতি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ দেখান তাঁর জ্যোতির দিকে (২৪:৩৫))। অতঃপর  এই স্নিগ্ধ আলোয়ে অন্তরাত্মা উদ্ভাসিত হলে বিশ্বাসীদের আর ফিরার কোন পথ ছিল না। যে সত্য তারা দেখেছিলেন, সেই সত্যের জন্য জীবন বাজী রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত হন নি।

অপরদিকে এই বাণীকে সমাজপতিরা তাদের মত করে দেখেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন। রাসূলদের (আ) মোকাবেলায় তারাও এই বাণীর পালটা ব্যাখ্যায় শিক্ষকের ভূমিকায় নেমেছেন। তাদের অনুসারীগণ তাদের ব্যাখ্যায় আস্থা স্থাপন করেছেন, এবং এজন্য যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত হয়েছেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষ বিনা-গাইডে বা বিনা-শিক্ষকে সেই বাগান বা বাণীতে ঢুকলে কিছু জিনিস দেখতে পান, এবং শিক্ষক বা গাইডের ব্যাখ্যায় সেই দেখা বা পাঠের বর্ধিতরূপ অনুভব করেন। আসলে, মানবকুলের বৃহত্তর অংশ অপরের দেখানো বা বুঝানো ব্যতীত কোন গভীর ভাবার্থ ভেদ করতে পারেন না। তারা ব্যাখ্যাবিদদের পিছনে থাকেন। তবে ব্যক্তির সুপ্ত প্রকৃতির সঞ্চালনে তার মনের সায় থাকে। এখানেই আস্তিক, নাস্তিক, কাফির, মুনাফিক। কেউ আত্মপথের এদিকে, কেউ সেদিকে গিয়ে শ্রেণীভুক্ত হয়, যার প্রকৃতির টান যেখানে, অন্তরের সায়ও সেখানে –ব্যাপারটা অনেকটা এভাবেই।

তোষের অনলে যা জ্বলে

আবারও সেই বাগান ও কবিতার উপমায় আসা যাক। আপনি বাগানে ঢুকে কী কী দেখেছেন বা কোন কবিতা পাঠ করে কোন কোন বিষয় অনুভব করেছেন এবং কোন কোন বিষয় এড়িয়ে গিয়েছেন -এসবের সাথে রয়েছে আপনার শিক্ষা, আপনার মানসিক সত্তার প্রকৃতি ও গঠনের সম্পর্ক। মানসিক প্রকৃতি মাতৃ-গর্ভ থেকে গোটা ব্যক্তি-ইতিহাস পরিব্যাপ্ত। দেখতে হবে আপনার জন্ম, আপনার পরিবার, পরিবারের অবস্থান কোন সমাজের কোন শ্রেণীতে। দেখতে হবে কোন আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও ‘জ্ঞানগত’ সুযোগের প্রেক্ষিতে আপনি বড় হয়েছেন, শিক্ষা লাভ করেছেন, এবং পরবর্তীতে কাদের সাথে উঠা-বাসা করার সুযোগ হয়েছে, এবং কাদের সাথে পিয়ারিং (peering) হয়েছে। শেষের কথাটি অত্যন্ত জরুরি। আপনি জীবনের যে অঙ্গনে থাকার কারণে যেসব বই পড়েছেন, যাদের প্রবন্ধ পাঠ করেছেন, যাদের সাথে কথাবার্তায় সময় কাটিয়েছেন, আপনি তা’ই হয়েছেন যা এই পরিসরে ছিল। আপনি যে ধর্মীয় এটিটিউড (attitude) অর্জন করেছেন, তা কী এক দিনে, দু’দিনে হয়েছে? এগুলো অবশ্যই চিন্তার বিষয়।

মুক্তমনা-স্বাধীন?

কেউ স্বাধীন, মুক্তমনা, মুক্তচিন্তক বললেই স্বাধীন বা মুক্তচিন্তক হয়ে যায় না। সে দাবী করতে পারে বটে কিন্তু দাবীর পরে সে কোন নতুন কথাটি বলতে পেরেছে যা অতীতের মানুষ শুনে নি, কোন দেখাটি দেখেছে যা অতীতের লোক দেখে নি, অথবা কোন আলোচনা করেছে যা আলোচিত হয় নি? সে যদি আবহমান কালের চলমান আলোচনাতেই সংযুক্ত হয়ে থাকে, অন্যের কথা নিজের করে বলে, তবে সে কীসের মুক্তচিন্তক? যে গানে সে কণ্ঠ দিচ্ছে সে গানের অতীত রয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকতা রয়েছে, সংস্কৃতি রয়েছে। যদি তা’ই হয়, তবে সে কী বলছে? মূলত, এই গানগুলো পুরাতন; এই জগত পুরাতন; আর এই চন্দ্র, এই সূর্য। আপনি নিজের পায়ের নিচ থেকে একটি পাথর তুলে জিজ্ঞেস করুন তার বয়স কত। আপনি চলে যাবার পরও সে থাকবে। তাই আপনার মাথায় যদি হঠাৎ এক টন বুদ্ধি এসে ভর করে, তবে তা কোন ভাল লোকের সাহায্যে নামিয়ে রাখুন। না হলে, পরকালে, আপনার চরম সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।

আস্তিক নাস্তিক -অন্তরের কাজ

বিশ্বাস অন্তর থেকেই আসে। জন্মসূত্র বাদে, তা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আসে। আস্তিক নাস্তিকতায় আকস্মিকভাবে তেমন কিছু হয় বলে মনে হয় না। অর্থাৎ কেউ হঠাৎ করে আস্তিকও হয় না, নাস্তিকও হয় না। তবে অস্বাভাবিক ঘটনা ছাড়া। এখানে তাদের চিন্তার ইন্দ্রজাল, রেখা ও রন্ধ্রের ভিতরে তাদের প্রকৃতি, ব্যক্তি-গঠন, মানসিকতা নীরবে নীরবে কাজ করে যেতে থাকে। ‘অন্তরের কাজ’ অন্তরকে অনেক আগ থেকে অথবা বহুকাল আগ থেকেই করে আসতে পাওয়া যেতে পারে। কোন নির্দিষ্ট তারিখের নিরিখে কোন গৃহীত সিদ্ধান্ত হয় সেই ধারার পূর্ণ পরিণতি মাত্র। 

কোরানে করীমে হেদায়াতের ক্ষেত্রে ‘অন্তরের’ বিষয়ই প্রধান হিসেবে দেখা হয়। কালব (قلب), ফুয়াদ (فؤاد) ও লাব্ব (لَبٌّ) –এই তিন স্থানের কার্য বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রেক্ষিতে কাজ করে থাকে [এ কথাটি নিচের টীকায় খানিক বর্ধিত করা হয়েছে।]। এগুলোই বক্ষস্থিত হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন বৃত্তির (function) স্থান। কোরানে হেদায়াত সম্পর্কিত বিষয় কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর –এই ধারায় উল্লেখ হয়। আল্লাহ বলেন, “وَاللَّـهُ أَخْرَ‌جَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ‌ وَالْأَفْئِدَةَ ۙ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُ‌ونَ -আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন। তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর দিয়েছেন, যাতে তোমরা অনুগ্রহ স্বীকার কর” (১৬:৭৮)। এখানে মানবসত্তার ক্রিয়াসম্ভাবের ঘনত্ব ও পরিমাণের মাত্রার ধারা অবলম্বিত হয়েছে বলে মুফাসসিরগণ মনে করেন। মাতৃগর্ভ থেকেই আমরা শুনতে শুরু করি। আমাদের চোখের পাতি (পাতা) রয়েছে, ইচ্ছে করলে চোখ বন্ধ করতে পারি। কিন্তু কান সব সময়ই খোলা থাকে, ঘুমালেও অতি ক্ষীণভাবে কান শুনেই যায়। মাতৃগর্ভ থেকে শুরু হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত কান খোলাই থাকে। চোখের কাজ কানের চেয়ে কম। আর হৃদয়ের ‘হৃদয়ঙ্গম’ কাজ সবচেয়ে কম। তাই কম লোকই হেদায়াতের উপর থাকে। ধর্মের নামেও পথভ্রষ্ট থাকতে পারে।

মানুষ প্রধানত তা’ই দেখে যা সে দেখতে চায়; যদি ‘মনের’ আগ্রহ হয়, তবেই মনোনিবেশ করে। শুনার ব্যাপারেও তাই। যখন ‘মন’ বসে না, তখন শুনেও শুনে না। নবীর (সা) মজলিসে বসেও অনেক মুনাফিক নবী (সা) কী বলেছেন, তা খেয়াল করতে পারত না, পরে অন্যদেরকে জিজ্ঞেস করত। আল্লাহ বলেন, “আর তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা আপনার কথা শোনে, তারপর তারা যখন আপনার কাছ থেকে বেরিয়ে যায় তখন যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদের বলে, ''সে (নবী) এইমাত্র কী বললে!’’ এরাই তারা যাদের হৃদয়ের উপরে আল্লাহ্ মোহর মেরে দিয়েছেন, আর তারা নিজেদের খেয়ালখুশিরই অনুসরণ করে” (৪৭:১৬)।

আমাদের প্রকৃতি ও বিশ্বাস

আমরা আবেগ-অনুভূতি সম্পন্ন প্রাণী: এখানে আবেগের পরিধি ব্যাপক অর্থের। এতে ভাব, আসক্তি, নিরাসক্তি, কোন বস্তুর প্রতি ইতিবাচক-নেতিবাচক মনোভঙ্গি ইত্যাদির সমন্বয় বিবেচিত হবে। অনেক বিষয় আমরা অনুভূতিতে পরশ করি। পরে তা ভাষায় সজ্জিত করি। যখন ন্যায্যতা দেখাই তখন ন্যায্যতা দেখানোর হাতিয়ার ব্যবহার করি (অর্থাৎ ভাষিক যুক্তিতে দেখাই)। এদিক থেকে ধর্মের ময়দানেও যৌক্তিক ভাষায় সাজানোর অনেক বিষয় রয়েছে। এটা এভাবে না হলে ধর্ম সুদূর থেকে এই ঐতিহাসিক পথ পাড়ি দিয়ে আসত না। 

আজকের আস্তিক, নাস্তিক, কাফির, মোনাফেক যাদেরকে যে হিসেবে চেনেন, তাদের কথাবার্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন। তারপর কোরান খোলুন। দেখবেন, সেই যে হাজার হাজার বছর আগ থেকে নবী, রাসূলদের পক্ষে বিপক্ষে যেসব যুক্তি ও আলোচনা হচ্ছিল আজও সেই ভাষা, সেই যুক্তি পরিবাহিত হচ্ছে। এখানে কেউ আস্তিক হয়ে বদ্ধদ্বারে আবদ্ধ হয় নি, আর কেউ নাস্তিক হয়েও মুক্তচিন্তক হয় নি। বলেছি, এই দুনিয়া পুরাতন। তার আকাশ পুরাতন। তার চন্দ্র-সূর্য পুরাতন। আমরা এক বিস্ময়কর অস্তিত্বে এসেছি। যদিও আমরা কালের প্রবাহে ক্ষুদ্র বিন্দু। এই চার পাশের লক্ষ কোটি বছরের বিদ্যমান অস্তিত্ব সম্পর্কে আমি আর আপনি কতটুকু জানি আর বুঝি?

মুক্ত না প্রভাবিত?

বলেছি যে মানুষ তার নিজের ব্যাপারে যেকোনো কিছু দাবী করে বসতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা  অন্য কিছু হতে পারে। কেবল আলোচনার গভীরে গেলেই মূল জিনিসটি কী -তা বুঝা যাবে। আলোচ্য ক্ষেত্রে কারও ধারণার ঐতিহাসিকতা এবং প্রভাব বিবেচনার প্রয়োজন হবে। যা যুক্তিপূর্ব, তাও দেখতে হবে। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে, অন্তর বা অন্তরস্থ প্রকৃতির প্রবণতা কোন স্থানে ছিল, কোন ‘অনুভূতির’ বিষয় কী থেকে কী হয়ে ভাষায় সজ্জিত হয়ে এসেছে এবং তাতে কোন ধরণের পূর্ববর্তীতা, পূর্ব ইতিহাস, পাঠ ও পাঠ্য প্রভাব সজ্ঞায় কাজ করে গিয়েছে তাও বিবেচনা করতে হবে। এভাবে, কোন সিদ্ধান্তে ব্যক্তির পূর্বজ্ঞান, তার শিক্ষা, তার পরিবেশ, তার পিয়ারগ্রুপ ইত্যাদির সংযোগ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেই বুঝা যাবে কোথায় মুক্তচিন্তা আর কোথায় স্বাধীনতা। কোন একটি পয়েন্টকে যৌক্তিকভাবে সাজানোর কাজ হচ্ছে ভাষার কনভেনশনের একটি রূপ বা অংশ মাত্র। এটা সমাজ ও শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত। অনেক দার্শনিক এটাকে নিছক ‘হাতিয়ার’ (tool) মনে করেন। তবে আমি এখানে যুক্তিকে (reason per se) অস্বীকার করছি না। বরং যুক্তির আগে মনের সুপ্ত অনুভূতির প্রভাবের ভিত্তিতে সজ্জিত বস্তু যুক্তির আকৃতিতে রূপায়নের কথা বলছি। চিন্তার প্রভাব ও পূর্ববর্তীতার কথা বলছি। তাছাড়া যে সীমাবদ্ধ উপাদানের আওতায় প্রকৃত যুক্তি সংগঠিত হয় তাও ব্যক্তি ইতিহাসের সীমিত পরিধির প্রেক্ষিতে প্রিডিক্টেবল একটি রূপ মাত্র। যার মানসিক উপাদানের সমষ্টি (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা) X তার সিদ্ধান্ত Y এর প্রেক্ষিতে A to D স্কেলের ভিতরেই থাকবে। মুক্তচিন্তক বললেই প্রিডিক্টেবল সীমার বাইরে আচমকা কিছু হয়ে যাবার মত নয়।

এবারে শেষ কথা। আবার সেই বাগান ও কবিতার উপমা। রাজকীয় বাগান, বড় লোকের বাগান, আর কুড়ে ঘরের বাগান এসবে পার্থক্য রয়েছে। দৃষ্ট বস্তুর প্রকৃতি ও প্রকারভেদ রয়েছে। এসবে দ্রষ্টার যোগ্যতা ও প্রকৃতির ভিন্নতা রয়েছে। কবিতায়ও তার জোনরা (genre) বা প্রকারভেদ রয়েছে। এখানে কে কী দেখে, কে কী দেখে না,  এসব আলোচনা আপনি আর আমি চলে যাবার পরও চলবে। এ আলোচনা হাজার হাজার বছরের আলোচনা। কে কোন স্থানে দাঁড়িয়ে কী দেখেছে, কীসের ভিত্তিতে দেখেছে, কী বুঝেছে –তার বুঝই বা কী, আর তার দেখাইবা কী? কালের বহমান স্রোতে দ্রষ্টা আর দৃষ্টবস্তুর ওলটপালটে কোনটির প্রকৃতিতে কী ভাসছে? এই চলন্ত ধারায় আমরা যা-কিছু দেখতে ঢুকেছি তা বুঝার আগেই কিন্তু বেরিয়ে পড়ছি। আল্লাহ আমাদের যে জ্ঞান দিয়েছেন তা অতি অল্প (১৭:৮৫)। যারা বোঝার দাম্ভিকতা প্রদর্শন করছে্ন, আর যারা এই বিশ্বের বিরাজিত বিস্ময় দেখে দীনতাভরে আল্লাহতে আত্মসমর্পণ করছেন –এই দুই পক্ষের মধ্যকার পার্থক্য এক বিরাট, বিরাট পার্থক্য।

________________________________________

টীকা:

[১] আলেমগণ অন্তর ভিত্তিক তিন স্তরকে সাতটি স্তরে বিভাজন করেন। যেমন, সাদর (صدر), কালব (قلب), শাগাফ (شغاف), ফুয়াদ (فؤاد), হাব্বাতুল কালব ( القلب حبة), সুওয়াইদাউল কালব (القلب سويداء) ও মহাজ্জাতুল কালব (القلب مهجة)।

সদর হচ্ছে ইসলাম গ্রহণ/বর্জনের অভিপ্রায়ের স্থান (৬:১২৫), কালব  হচ্ছে ঈমান ও প্রজ্ঞার স্থান, শ্রুতি ও অন্তদৃষ্টির স্থান (৪৯:১৪); ফুয়াদ হচ্ছে সত্যাশ্রয়ী অনুভূতির স্থান, সত্য অনুভব, অন্তরদৃষ্টি (vision), স্থির দৃষ্টির স্থান (১১:১২০, ২৮:১০)। শাগাফ হচ্ছে যেখানে দুনিয়াবী প্রেম-ভালবাসা অতিমাত্রায় স্থান পায়, বা যা দুনিয়াবী বস্তুতে আকৃষ্ট এবং যা পর্দায় কালব থেকে আলাদা হয়ে থাকে সেই স্থান। ইউসূফ আলাইহিস সালামের প্রেমে জোলাইখার যে অবস্থা হয়েছিল সেটিই ছিল শাগাফের একটি উদাহরণ (১২:৩০)। হাব্বাতুল কালব হচ্ছে সত্যের উপলব্ধি ও ভালবাসার স্থান; সুওয়াদাউল কালব হচ্ছে দ্বীনি জ্ঞানের স্থান; এবং মাহাজ্জাতুল কালব হচ্ছে গুণের বৈশিষ্ট্য ধারণ ও বিকাশের স্থান।

[২] এই লেখাটি কারও পছন্দ হলে তাদের ফেসবুকে লিঙ্ক করতে পারেন যাতে চিন্তার স্রোতটি প্রসারিত ও প্রশস্ত হয়।

[৩] আস্তিক, নাস্তিকতা যুক্তি ইত্যাদি প্রসঙ্গ ঘিরে আরও কিছু লেখা দেখা যেতে পারে:

যুক্তি, বিশ্বাস ও কোরান

Rationality and Religion

আধুনিক সমাজের শান্তি -না বিশ্বাসে, না অবিশ্বাসে

আত্মহত্যা ও বিশ্বাস

আলো-আঁধারের খেলা

আপনি কি সত্যিই শান্তি চান ও নিজেকে বিজ্ঞানমনষ্ক ভাবেন?

‘কুসংস্কারের’ গর্তে নাস্তিকের শেষকৃত্য -বিনোদন

মুক্তমনা ও নাস্তিক মিলিট্যান্সি

কলমের ভাঁওতাবাজিতে সামাজিক বিপর্যয়

অভিজিৎ হত্যা

সশস্ত্র নাস্তিকের হাতে ৩ জন নিরীহ মুসলিম খুন

১ comment

  1. 1
    Abu Billa

    সুবহান আল্লাহ্, বাংলা ভাষায় এমন সাইটও আছে তা আগে জানতামনা । আমি মুগ্ধ,আপ্লুত ! সদালাপকে আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে শুভ কামনা যানাচ্ছি । ক্রমান্নয়ে  সদালাপ আরো উন্নতি করবে, ভাষাগুলি আরও সাবলীল হবে এবং একইভাবে সকলবে আলোর পথ দেখিয়ে যাবে সেই কামনা রইল ।…………..

Leave a Reply

Your email address will not be published.