«

»

May ১৪

জিরো পয়েন্ট ফিল্ড ও আল্লাহতে বিশ্বাস

ভূমিকা

গত বৎসর এক ভাই “সুবহানাল্লাহ অর্থাৎ শূন্যই আল্লাহ”, এই মর্মের একটি লেখা পড়তে অনুরোধ করেন। লেখাটির লিঙ্ক এখানে । ওখানে বলা হয়েছে, “সুবহুন মানি শূন্য (void) এবং সুবহান আল্লাহ মানে শূন্যই আল্লাহ”। মাআযাল্লাহ!

এই ধারণাটি ভুল এবং একটু দীর্ঘ বিশ্লেষণে গেলে এমন বিষয়কে পৌত্তলিকতায়ও দেখা যেতে পারে। লেখাটির বিভিন্ন পর্যায়ে স্ববিরোধীতা রয়েছে। শব্দ ও বাক্যের ব্যবহারের দিকে তাকালে তা লক্ষ্য করা যাবে। এই প্রেক্ষিতে আমি একটি লেখা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু অপরিপূর্ণ অবস্থায় রেখে অন্য বিষয়ে ব্যস্ত হয় যাই। ইদানীং, সেই লেখাটির কথা মনে হল। তাই এর প্রধান অংশের সাথে আরও কিছু সংযুক্ত করে তা পরিপূর্ণ করেছি।

শুরুতে আমি সেই লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি নিচ্ছি। তবে স্কয়ার বন্ধনীতে ‘[]’ আমার কথা সংযোজন করেছি এবং ইটালিক এর ব্যবহারও আমার।

কুয়ান্টাম ফিজিক্সের কোয়ান্টাম যেমন শূন্য নয় … এই শূন্যের ভিতরে শক্তি আছে … তেমনি আল্লাহও শূন্য নন, [?] কারণ আল্লাহ কোন তথ্য নন। Non information … [বাক্য গঠনের দিক দিয়ে এখানে যুক্তির ছেদ পড়েছে, আল্লাহ কোন তথ্য নন –এই অংশে।] আল্লাহর প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না [না জেনে কীভাবে উপরের ধারণায় যাওয়া হয়? তিনি information অথবা non-information, এটা কোন ধরণের information এর সংজ্ঞায় ব্যক্ত হয় এবং এটা কোন ধারণায় ‘অর্থ’ প্রকাশ করে এবং কোন উৎসে স্থাপিত?]। এ কারণেই শূন্য [তাহলে তিনি শূন্য? আগে কী বলা হল?]। ওয়ালাম ইয়াকুন লাহু কুফুয়ান আহাদ। তিনি কারোর মতোই নন [প্রথমের যেমনতেমনের তুলনার দিকে লক্ষ্য করুন]। … তিনিই আলফা তিনিই ওমেগা, তিনি গুপ্ত গোপনীয় অপ্রকাশিত মিশরীয় গড আমুন, তিনি সর্বশক্তিমান কাহ্হার গ্রীক এপোলো, তিনিই ধ্বংসকারী শিব, তিনিই তাও …[তাহলে তিনি এগুলোও?]।

উপরের কথাগুলো এলোপাথাড়ি, তা দেখলেই বুঝা যায়। তাছাড়া অপর ধর্মের পৌত্তলিক নিক্তিতে ধারিত দেবনামগুলো অনেকটা একাকার অর্থে উল্লেখিত। তবে সর্বতোভাবে লেখাটিতে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের জিরো পয়েন্ট এনার্জির ধারণায়, তুলনায় এবং উপমায়ই সুবহানাল্লাহকে “শূন্যই আল্লাহ” বলা হয়েছে। আমরা কেবল এই শেষের কথাটি নিয়েই আলোচনা করব কেননা সবকিছুর আলোচনা সম্ভব নয়।

আমি এখানে সর্বাত্মক চেষ্টা করব যাতে লেখককে এক পাশে রেখে, বস্তুনিষ্টভাবে, কেবল তার লেখাকেই আলোচনা করা যায়। এখানে বিতর্কের কোন মনোভাব নেই। আক্রমণের কোন মনোভাব নেই। তাওহীদের ব্যাপারে কোন ধারণা যদি কোথাও অস্পষ্ট থাকে, তবে তা স্পষ্ট করে দেখাতে পারলে সকল তাওহীদবাদী পক্ষের জন্যই উত্তম হয়। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যাতে আমার কথাগুলো সঠিক হয়।

প্রথমত, ‘সুবহানাল্লাহ’এর অর্থ কখনই ‘শূন্যই আল্লাহ’ নয়। আল্লাহ কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক জিরো পয়েন্ট ফিল্ডের সাথে “তুলনীয়” কোন সত্তা নন। এই ফিল্ডটি সৃষ্ট। আর আল্লাহ বস্তুর কোন স্তরে, কোন পর্যায়ে, কোন রূপে, কোন গুণে সত্তাগতভাবে সম্পর্কিত নন। তিনি আমাদের এই বস্তু জগতের স্রষ্টা এবং তার আরও অনেক সৃষ্টি রয়েছে যা আমরা দেখি না এবং সেসবের মর্মও ভেদ করতে পারি না। সর্বোপরি তিনি বস্তুর ঊর্ধ্বে, (transcendental), সৃষ্টিলোকের ঊর্ধ্বে কিন্তু এই ‘ঊর্ধ্ব’ শব্দটি ‘উপর’ অর্থে নয় যা নিচের প্রতিকূলে।

আমরা যদি লেখকের ‘সুবহ’কে শূন্য বলে ধরেই নেই, তবুও তা ‘শূন্যই আল্লাহ’ হয় না। যদিও বাংলায় ‘সুবহানাল্লাহ’ একই শব্দে লেখা হয় কিন্তু আরবিতে ওখানে দুটি শব্দ রয়েছে –সুবহানা আল্লাহ। ব্যাকরণের দিক থেকে ’সুবহান’ এবং ‘আল্লাহ’ -এই শব্দদ্বয় অধিকারের বা কর্তৃত্বের সম্বন্ধবাচক অর্থে গঠিত হয়েছে যাকে আমরা ইংরেজিতে possessive case এবং আরবিতে ইদাফাহ (الإضافة) বলি। যেমন ধরুন, যায়েদের কলম, আরবিতে ‘কালামু যাইদ’(قلم زيد), ইংরেজিতে Zaid’s pen হয়। কিন্তু এর অর্থ কখনো ‘কলমই যায়েদ’ হয় না। ঠিক সেভাবে ‘সুবহানাল্লাহ’এর অর্থ কখনো ‘শূন্যই আল্লাহ’ হয় না। মাআযাল্লাহ!

এই লেখাটির পরে আমি আরেকটি প্রবন্ধ রচনা করব যেখানে সুবহান শব্দটির ধাতু, ক্রিয়ারূপ, এবং ‘সুবহানাল্লাহ’ এর বৈয়াকরণিক রূপ উল্লেখ করে এর সঠিকই অর্থ উপস্থাপন করতে চেষ্টা করব। তবে যেহেতু কোয়ান্টাম ফিজিক্সের জিরো পয়েন্ট ফিল্ডকে আল্লাহর সাথে তুলনা করা হয়েছে তাই প্রথমে এই বিষয়টি দেখা দরকার। আমি পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র নই তবুও এ বিষয়ে যতটুকু বুঝি সেই বিনম্র (humble) ধারণার আলোকে তা দেখব।

জিরো পয়েন্ট ফিল্ড

বারনার্ড হেইশ (Bernard Haisch) তার ‘দ্যা গড থিওরি –ইউনিভার্স, জিরো পয়েন্ট ফিল্ডস, এণ্ড হোয়াট বিহাইন্ড ইট অল’ (THE GOD THEORY –Universes, Zero-Point Fields, And What’ Behind It All. San Francisco: Weiser Books, 2009:69-77) পুস্তকে এ বিষয়টিকে সহজভাবে বুঝাতে দেয়াল ঘড়ির দোলকের সাথে কোয়ান্টাম বস্তুর (quantum object) তুলনা দেন। ঘড়িতে চাবি দিতে ভুলে গেলে এক সময় উদঘর্ষণ বা ফ্রিকশন (friction) তার দোলককে স্থির করে দেবে। কিন্তু ক্ষুদ্র জগতের সেই কোয়ান্টাম বস্তুটি কখনো সেভাবে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যায় না। হেইশ বলেন যে হাইজেনবার্গ-অনিশ্চিত-তত্ত্ব (Heisenberg Uncertainty Principle) এই মর্মে ধারণা দেয় যে কোন কোয়ান্টাম বস্তু কখনো ‘সম্পূর্ণভাবে’ স্থির হতে পারে না। এতে সর্বদাই কিছু এলোপাথাড়ি মৃদু ঝাঁকি (বা residual random jiggle) অবশিষ্ট থাকে -এটা কোয়ান্টাম ফ্লাকচ্যুয়েশন (quantum fluctuations) বা অস্থিতির কারণেই হয়। এটা এক সাধারণ নিয়ম যে কোয়ান্টাম থিওরিতে হাইজেনবার্গ-অনিশ্চিত-তত্ত্ব ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গে (in electromagnetic wave) প্রয়োগ হয়, কেননা ইলেকট্রিক ও ম্যাগনেটিক ফিল্ড শূন্যতা (space) ভেদ করে অসিলিয়েট (oscillate) বা আন্দোলিত হয় –দুলে, যেমন দোলক আন্দোলিত হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক সম্ভাব্য ফ্রিকোয়েন্সিতে একটু ক্ষীণ পরিমাণ ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ঝাঁকি (বা jiggle) সব সময়ই চলতে থাকে। এই বিরামহীন ঝাঁকি বা অস্থিরতার (ceaseless fluctuations) সমষ্টি একত্রিত করলে এক সাগর পরিমাণ আলোর পটভূমি পাওয়া যাবে যার শক্তি (energy) হবে বিরাট। এটি হচ্ছে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক জিরো পয়েন্ট ফিল্ড। এই ফিল্ডটি হচ্ছে শক্তির সর্বনিম্ন অবস্থা (the lowest possible energy state)। অপরাপর শক্তি এই জিরো পয়েন্ট শক্তির ঊর্ধ্ব থেকে কার্যকরী হয়। হেইশ বলেন:

Take any volume of space and take away everything else –in other words, create a vacuum –and what you are left with is the zero point field. … The vacuum as condition of complete emptiness, as an absolute void, does not exist. Rather the laws of quantum mechanics posit the seat of zero point filed as state both paradox and possibility –a seething sea of particle pairs, energy fluctuation and force perturbations popping in and out of existence. … The quantum vacuum is, therefore, in reality a plenum, but in keeping with tradition I will continue to use the term quantum vacuum (Haisch, 2009:70).

যেকোনো আয়তনের স্থানকে ধারণ করে তার মধ্য থেকে সকল কিছু বের করে নিয়ে আসেন, অর্থাৎ তাতে শূন্যতা সৃষ্টি করেন –অতঃপর এটাই হবে জিরো পয়েন্ট ফিল্ড। (তবে) … শূন্যতা (vacuum) একদম পরিপূর্ণ শূন্যতার শর্ত হিসেবে বা পরম-শূন্যতার (absolute void) শর্ত হিসেবে অস্তিত্বশীল নয়। বরং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কার্যকরী নিয়ম জিরো পয়েন্ট ফিল্ডের স্থানকে এমন এক অবস্থা হিসেবে স্থাপন করে যা একদিকে আপাতবৈপরিত্যতার (paradox) এবং অন্য দিকে সম্ভাব্যতার (possibility) অবস্থান হয় –এতে থাকে জোড়া পার্টিকলের (of particle pairs) উলট-পালটের সাগর, শক্তির উঠা-নামা (energy fluctuation) ও শক্তির অস্থিরতার আসা-যাওয়া (অস্তিত্বে আসা ও বিলীন হওয়া)। … সন্দেহ নেই যে হাইজেনবার্গ-প্রিন্সিপল এই অনুজ্ঞা অর্পণ করে যে সকল শূন্যতাই (all of space) জিরো পয়েন্ট এনার্জি দ্বারা পরিপূর্ণ হতে হবে, তবে আমি প্রথাগতভাবে ‘কোয়ান্টাম শূন্যতা’ পরিভাষা ব্যবহার করব।

এখানে আমরা যা পাচ্ছি তা হল কোয়ান্টাম জাগতিক পদার্থেরই ব্যাখ্যা –পদার্থের সর্বনিম্ন শক্তির এক অবস্থান। হেইশের দোলকের উপমা আমার মনে হয় খুব একটা যথার্থ হয় নি তবে আমরা ব্যাপারটি বুঝতে পারছি, তিনি নিছক ‘দোলনের’ ব্যাপারটি বুঝাতে উপমা ব্যবহার করেছেন। অতঃপর, যদিও তাতে শূন্যতার পরিভাষা আরোপ করা হয়েছে তথাপি তাতে এক প্রকার শক্তিও অবশিষ্ট রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে –নাই নয়। হাইজেনবার্গ-প্রিন্সিপল অনুযায়ী জিরো পয়েন্ট এনার্জি দ্বারা তা ‘পরিপূর্ণ’।

এখানে পদার্থের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে এর প্রেক্ষিতে ‘এটাই আল্লাহ’ (নায়ূজুবিল্লাহ) বা অনুরূপ কিছু বলার অবকাশ নেই। এই জগতে মানুষ অনেক চৌকশ বস্তু দেখেছে, তারপর পূজাও দিয়েছে। আবার চৌকশ কিছু পেলে তাতে দৈবিক কিছু আবিষ্কার করতেও চেয়েছে। এটাই ছিল পৌত্তলিকতা। কেউ গাছ-পালা বের করে পূজা দিয়েছে আর কেউ নিজ হস্তে মূর্তি তৈরি করে মন্ত্রপাঠ করত: তাতে (তাদের বিশ্বাসে) দেবপ্রাণ এনে, সেটাকে ‘প্রতিমা’ আখ্যায়িত করে, তাদের বিশ্বাসের সার্থকতা ঘটিয়েছে। খোদাকে স্থান-কালে নির্দিষ্ট করতে পারলেই পৌত্তলিকতার দুয়ার খুলে। আমাদের বিশ্বাস কখনো বস্তুকেন্দ্রিক নয়, হোক তা বস্তুর অতি মৌলিক অবস্থা, তার প্রকৃতি বা রূপ। আমরা কেবল বস্তুর স্রষ্টাতেই বিশ্বাসী।

অন্যদিকে, এই জগত শূন্যতা থেকে অমনি অমনি বেরিয়ে এসেছে বলে যে থিওরি বিরাজ করছে তাতেও অনেকের দ্বিমত রয়েছে। ইউরোপিয়ান অনেক নাস্তিকও আছেন যারা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে এই ধারণাটি হচ্ছে বিব্লিক্যাল ধারণার নিছক প্রতিস্থাপন: বাইবেলে ছিল খোদা বিশ্ব জগতকে শূন্যতা থেকে অস্তিত্বে এনেছেন, এখন তা হয়ে পড়েছে শূন্যতাই বিশ্ব জগতকে অস্তিত্বে এনেছে। আগে ছিল খোদার অলৌকিকতা, এখন তা শূন্যতার অলৌকিকতা! খোদার অলৌকিকতাকে শূন্যতায় প্রতিস্থাপন করাতেই বিষয়টি বিজ্ঞান হয়ে গিয়েছে! (নিচের বাক্যের পরে একটি ভিডিও লিঙ্ক দিচ্ছি যেখানে জিম হল্ট (Jim Holts) এর ভাষায় উল্লেখিত ধারণা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ভিডিওতে অংশগ্রহণকারী প্যানেলিস্টরা নাস্তিক, তবে লরেন্স ক্রাউসকে মিলিট্যান্ট নাস্তিক হিসেবেও অনেকে পরিচয় করেন। ভিডিও লিঙ্ক।)। জিম হল্টস ‘প্রাকৃতিক নিয়ম’ (natural laws) সম্বলিত ব্যাখ্যারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে নিউটোনিয়ান পদার্থ বিদ্যা নিয়মানুবর্তিতার এক সারসংক্ষেপ (a summary of regularity) দেয় যেমন গ্রহাদি সূর্যকে আবর্তন করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই নিয়ম তাদের উপর কোন শক্তি প্রয়োগ করে। এদিক থেকে বিশ্ব জগতের অস্তিত্ব এই প্রাকৃতিক নিয়ম দিয়ে একান্ত ব্যাখ্যা করা যায় না, কেননা এই নিয়ম অস্তিত্বে-আসা বস্তুর অন্তর্নিহিত (inherent)। এই নিয়মটি ‘কেন’ (why) প্রশ্নের উত্তর দেয় না। থিওরি কেন্দ্রিক ‘স্বয়ংক্রিয়বাদে’ (নিজে নিজে সৃষ্টি হয়ে যাওয়া বা অমনি অমনি সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার) যে ধারণা রয়েছে তাতে বস্তুজগত কীভাবে (how) আছে -এই প্রশ্ন জরুরি হয়, প্রথম প্রশ্নটি নয়।

তবে শূন্যতা থেকে মহাবিশ্বের থিওরিতে ‘চক্রাকার বিশ্বতত্ত্ব’ (cyclical cosmology) দ্বিমত পোষণ করে। এই থিওরির বক্তব্য হচ্ছে জগত এক সময় লয়প্রাপ্ত হয়, তারপর সেখান থেকে আবার শুরু হয়। কথাটা এভাবে যে এই জগত ধীরে ধীরে সংকোচিত বা ক্ষুদ্রতর হয়ে আসতে থাকে। তারপর অতিকায় এই ক্ষুদ্র বস্তু থেকে বিগ-ব্যাং হয় –এই অবস্থানেরই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ। সুতরাং এদিক থেকে পরম শূন্যতা কখনোই থাকতে পারে না, সর্বদাই কিছু না কিছু থাকে।

এই বিশ্বের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানে, দর্শনে ও ধর্মে অনেক মত রয়েছে। এমন আলোচনার জের অতি পুরাতন। ‘এই জগত চিরন্তন’: এটা আগেও ছিল, এখনো আছে এবং আগামীতেও থাকবে, এমন চিন্তা মানুষ আগেও করেছে। আবার এই জগত ও জগতের মালিক ওতপ্রোতভাবে জড়িত (pantheism) -এমন ধারণাও অতীতের। এই জগত আর জগতের মালিক উভয়ই আলাদা আলাদা বিষয় (transcendental belief) এমনটাও আগে ছিল –এখনো আছে।

এই অস্তিত্ব জগত সম্পর্কিত যত ব্যাখ্যা এবং এর চেইন অব কজেশনকে (chain of causation) যতভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন সেই ব্যাখ্যার স্থান থেকে আল্লাহর ধারণা সরিয়ে দেয়া চিরন্তনভাবে (infinitely) অসম্ভব। পূর্বকালে অতি প্রাথমিক কোজেল (causal/ কারণিক) ব্যাখ্যায় স্রষ্টাকে যেভাবে দেখা হত, অতি কমপ্লেক্স ব্যাখ্যা ও থিয়োরিতেও সেই ধারণা সেইভাবেই থেকে থাকে –ব্যাখ্যার মাত্রাগত রূপ ভিন্ন হয় মাত্র। সব সময় মনে রাখতে হবে যে বস্তুকে কেন্দ্র করে যে ব্যাখ্যা সৃষ্টি হয়, তাতে মানুষের বস্তুভিত্তিক মস্তিষ্ক কাজ করে -অর্থাৎ প্রকারান্তরে বস্তুই বস্তুর ব্যাখ্যা দিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমাদের ধর্মীয় ‘বিশ্বাস’ ভিন্ন। আমাদের বিশ্বাস আমরা ওহীর মাধ্যমে পেয়েছি: সম্মানিত রাসুলদের মাধ্যমে পেয়েছি, জিব্রাঈলের (আ) মাধ্যমে পেয়েছি। এই স্থান থেকে চোখ সরালেই অবিশ্বাস এসে চিন্তার দিগন্ত আচ্ছন্ন করবে।

মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞানের অঙ্গনে নতুন কিছু দেখলেই দ্রুত ধর্ম প্রমাণের প্রয়োজন নেই। প্রথমে দেখতে হবে জিনিসটি কী, কারা কী বলছে। এক শ্রেণীর নাস্তিক, ধর্মীয় এবং নানান সামাজিক কাল্টের মত, নিজেদের শ্রেণীতে ‘কেরামতি’ বই বিক্রি করেন। চৌকশ কথার মাধ্যমে বই বিক্রির বিজ্ঞাপনী কায়দা অবলম্বন করেন এবং তাদের সমর্থক মিডিয়া-বাহিনী তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দেখা যাবে, বই বের হবার আগে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলা হচ্ছে, ‘খোদা এই বিশ্ব জগতের স্রষ্টা নন’। অথবা কেউ প্রচার করছে, ‘ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রাণের সঞ্চার করা হয়েছে’। কিন্তু শেষে দেখা যাবে, ঢোল-পিটানো স্থানটির পরিধিকে খড়কুটা দিয়ে প্রশস্ত করা হয়েছে। এই যে শূন্য থেকে মহাবিশ্ব –এটাতেও অনেক ফাও কাজ করছে। এই শূন্যতার বিষয় নিয়ে এখনো অনেক কিছু জানার বাকি রয়েছে। এই স্থানটি অবলোকনের (observation এর) আওতাভুক্ত নয় (হেইশ, ২০০৯:৭১)। বিষয়টির কিছু জটিলতা বুঝতে এই এই ভিডিও দেখুন।

সারাংশ

আমাদের কথার শুরু ও শেষ এটাই যে আল্লাহ কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ‘জ্ঞাত’ শূন্যতা নন। তিনি এভাবে ‘জ্ঞাত’ হবার মত কোন সত্তা নন। তিনি বস্তুর অংশ নন, বস্তুতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রাথমিক অবস্থাও নন। তিনি এমন ধারণায় সংশ্লিষ্ট হওয়া থেকে পবিত্র এবং এভাবে ধারিত চিন্তা থেকে দূরত্বে।

সুবহানাল্লাহ হচ্ছে মহিমান্বিত (sublime, তানজিহী, تنزيهي) ও প্রশংসাসূচক ধারণা প্রকাশের এক অভিব্যক্তি (expression)। বস্তু জগত থেকে স্রষ্টাকে ঊর্ধ্বে দেখাতে এবং সৃষ্ট বস্তুর সীমাবদ্ধতা ও সংশ্লিষ্টতা থেকে তার পবিত্রতা কীর্তন করতে এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়। আল্লাহ যাবতীয় তুলনার ঊর্ধ্বে। এটা এই অর্থেও যে আমরা তাকে যেভাবে ভেবে থাকতে পারি তিনি অবিকলভাবে (exactly) আমাদের অর্থ জগতের তেমন কেহ নন, তিনি মহিমান্বিত, ঊর্ধ্বে। আমাদের জ্ঞানের সীমা বস্তু জগত থেকে অর্জিত -আর তিনি ‘অতুলনীয়’, অসাদৃশ্য। কথাটি আবার বলা হোক: তিনি বস্তুতে নেই (বস্তুত নির্মিত দেবদেবীসহ যাবতীয় বস্তু) এবং বস্তুর সম্পর্কেও নেই (তিনি কারও পিতামাতা নন, তার কোনো সন্তান নেই ইত্যাদিসহ) এবং সৃষ্ট কোন ফিল্ডেও নন। তাকে ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক জিরো পয়েন্ট এনার্জি ফিল্ড বলা, তুলনা করা, এই নিক্তিতে দেখা -সবই ভুল ধারণা, পৌত্তলিকতার সমার্থক। সুতরাং কেউ যদি ‘শূন্যই আল্লাহ’ ‘শূন্যতাই আল্লাহ’ (নায়ূযুবিল্লাহ) এমন কিছু বলে থাকেন, তবে তা সম্পূর্ণ ভুল হবে। এমন ধারণা থেকে বেঁচে থাকা তাওহীদবাদীদের জন্য প্রয়োজন। এমনটি শুনলে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে, বলতে হবে ‘সুবহানাল্লাহ’, মাআযাল্লাহ।

আমার পরবর্তী লেখায় সুবহানাল্লাহ –এর শাব্দিক ও বৈয়াকরণীক ব্যাখ্যা এবং এই উক্তির তাৎপর্য নিয়ে কোরানি আয়াত ও হাদিসসহ বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব –ইনশাল্লাহ।

-প্রথম পর্ব সমাপ্ত-

১৫ comments

Skip to comment form

  1. 7
    এম_আহমদ

    আরেকটি কথা সংযোগ হোক। উপরে মিলিট্যান্সির ব্যাপারে কেবল প্রকৃতিগত (natural) এবং পরিবেশগত (environmental) কথা বলেছি, কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তির তার আপন ফিল্ডের বিনম্রতা নিয়ে কিছুই বলা হয় নি। আইনস্টাইন বলেছিলেন, The more I learn, the more I realize how much I don't know. তবে এই কথাটি আসলে এরিস্টটলের যা আইনস্টাইন নিজের করে উদ্ধৃত করেছিলেন। জ্ঞানী ও মিলিট্যান্টের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে জ্ঞানী তার আপন অবস্থানের সীমা, সম্পর্ক ও পারিপার্শ্বিকতা বুঝে কিন্তু মিলিট্যান্ট সীমা অতিক্রম করে আদর্শিক পরিমণ্ডলে পদার্পণ করে। এবং এই leaping এর মধ্যেই nature ও environment কার্যকরী হয়।

  2. 6
    এম_আহমদ

    ভিডিওটি দেখলাম। চমত্কার লাগলো। এই নাস্তিকতার মধ্যে  humbleness আছে, humility আছে, মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে simple স্বীকারোক্তি আছে। মিলিট্যান্ট নাস্তিকতায় যেটা নেই।

    এই মন্তব্যটি নিয়ে বেশ কিছু কথা বলার ছিল কিন্তু সময় খুব কম এবং ব্যস্ততা খুব বেশি। অত্যন্ত সংক্ষেপে কথাটি হচ্ছে এই যে মানব সমাজ নানান আদর্শে বিভক্ত এবং আদর্শ সর্বদাই বিশ্বাস কেন্দ্রিক। Simplistic বিশ্বাস মানুষকে কখনো কখনো মিলিট্যান্ট করে। ধর্ম যুদ্ধের ‘উষ্ণদের’ মধ্যেও একই নীতি কাজ করে। বিজ্ঞানী আস্তিক হতে পারে এবং নাস্তিকও। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই সে বিশ্বাসী। অণু-পরমাণু আপনাতেই কিছু বলে না। আপনার ব্যাকগার্ডেনের পরিধি-প্রশস্ততা নিয়ে আপনার গার্ডেন কিছুই জানে না। এগুলো আমাদের জন্য আমাদেরই জ্ঞান। এসব জ্ঞান নানান ভিন্নতায় সাজানো। পদার্থ বিজ্ঞানীও মূর্তিপূজা করতে পারে, একত্ববাদেও বিশ্বাসী হতে পারে। আবার উভয় অঙ্গনে আদর্শভিত্তিক মিলিট্যান্সিও ঢুকতে পারে। মিলিট্যান্টদের আশে পাশে মিলিট্যান্ট থাকে। সামাজিক পরিসরই দীর্ঘ দিনে তাদেরকে গড়ে। তবে এক শ্রেণীর মানসিকতায় মিলিট্যান্ট প্রকৃতি জড়িত –এরা যে অঙ্গনে যাবে সেই অঙ্গনে যদি মিলিট্যান্ট কিছু পায়, তবে তাতেই আকৃষ্ট হবে। ফুটবল সমর্থক হলে, দলের পক্ষে তা’ই করবে। কিন্তু temperamentally অন্যরা সেভাবে নয়। এই বৈশিষ্ট্য ধর্ম, বিজ্ঞান, সমাজ রাজনীতি ও অন্যানেও প্রকাশ পায়। কেউ হয়ত কোন কারণে আল্লাহতে বিশ্বাস করতে পারছে না কিন্তু সে যদি মিলিট্যান্ট প্রকৃতির না হয়, তবে তার অবিশ্বাস তাকে সেই পথে টানবে না। অতঃপর আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যারা ইসলামকে ধ্বংস করার যুদ্ধ করতে নাস্তিকতা অবলম্বন করেনি এমন লোকদের ব্যাপারে ভিন্ন মতও রয়েছে -যে বিষয়টি নিয়ে কোরান ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। আমি নিজেই আলোচনা করতাম কিন্তু সেই সময় বের করা সম্ভব হচ্ছে না, আবার এমনসব বিষয় নিয়ে ভিন্ন তর্ক শুরু হোক তাও চাই না, কেননা আমি চাই এই যুগে সবাই ঐক্যমতে আসুক এবং ঐক্যের প্লাটফর্ম তৈরি হোক, পারস্পারিক সৌহার্দ গড়ে উঠুক, প্রতিষ্ঠানাদিতে বৈশ্বিক স্টাডি সংযোগ হোক, দেখার অঙ্গনটি সমৃদ্ধ হোক, এবং, তা হলে তারাই এগুলো দেখতে পাবে এবং তারাই লিখবে। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

  3. 5
    Sajib Ahmed

    আসসালামু আলাইকুম। অসাধারণ হয়েছে। 

    1. 5.1
      এম_আহমদ

      @Sajib Ahmed: পাঠ ও মন্তব্যের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

  4. 4
    মুনিম সিদ্দিকী

    পড়েছি! তা জানিয়ে গেলাম। ধন্যবাদ।

     

    1. 4.1
      এম_আহমদ

      মুনিম ভাই, সালাম। পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  5. 3
    মাহফুজ

    (কৃষ্ণগহ্বর এবং শিশু মহাবিশ্ব অন্যান্য রচনা)- অধ্যায় -(মহাবিশ্বের ৎপত্তি)- সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্ব যখন উত্তর মেরুর মতো একক বিন্দু ছিল তখন এর কোন অন্তর্বস্তু ছিল না। আক্ষরিক অর্থে সৃষ্টির শুরু হয়েছিল শুন্যতা থেকে। কিন্তু এখন মহাবিশ্বের যে অংশ আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাতে রয়েছে অন্তত ১০৮০ সংখ্যক (১০ কে ১০ দিয়ে ৮০ বার গুণ করলে যত হয় তত সংখ্যক) কনিকা। এই সমস্ত কনিকা এল কোথা থেকে? উত্তরটা হল:- অপেক্ষবাদ এবং কণাবাদী বলবিদ্যা শক্তি থেকে বস্তু সৃষ্টি অনুমোদন করে।

     

  6. 2
    মাহফুজ

    সালাম,

    এবার পোষ্টের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাতেই আসা।

    যেহেতু এসেই পরেছি, তাই বিষয় সম্পর্কে আমার যৎসামান্য জ্ঞানের আলোকে কিছু না বলে পারলাম না। আশাকরি কিছু মনে করবেন না।

     

    বিজ্ঞান-

    (কৃষ্ণগহ্বর এবং শিশু মহাবিশ্ব অন্যান্য রচনা)- অধ্যায়-- -(মহাবিশ্বের ৎপত্তি)- সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্ব যখন উত্তর মেরুর মতো একক বিন্দু ছিল তখন এর কোন অন্তর্বস্তু ছিল না। আক্ষরিক অর্থে সৃষ্টির শুরু হয়েছিল শুন্যতা থেকে। কিন্তু এখন মহাবিশ্বের যে অংশ আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাতে রয়েছে অন্তত ১০৮০ সংখ্যক (১০ কে ১০ দিয়ে ৮০ বার গুণ করলে যত হয় তত সংখ্যক) কনিকা। এই সমস্ত কনিকা এল কোথা থেকে ? উত্তরটা হল:- অপেক্ষবাদ এবং কণাবাদী বলবিদ্যা শক্তি থেকে বস্তু সৃষ্টি অনুমোদন করে।

     

    আল-কোরআন-

    (০২:১১৭) অর্থ- যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে (অস্তিনাস্তি অবস্থা হতে) অস্তিত্বে আনায়ন  (শুরু/ আরম্ভ/ প্রকাশিত) করেন এবং যখন তিনি কিছু করবার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শুধু বলেন হও, আর তা হয়ে যায়।

    (২১:৩০) অর্থ:- যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে, তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?

    (২৪:৩৫) অর্থ:- আল্লাহ্ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর জ্যোতি; ——- জ্যোতির উপর জ্যোতি;

    (২৯:১৯) অর্থ- ওরা কি লক্ষ্য করেনা, কিভাবে আল্লাহ সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান (শুরু/ আরম্ভ/ প্রকাশিত) করেন, অতঃপর তা পূণরায় সৃষ্টি করেন? নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য সহজ।

    (২৯:২০) অর্থ:- বল, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান (শুরু/ আরম্ভ/ প্রকাশিত) করেছেন? অতঃপর আল্লাহ্ পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।

    (৫০:৩৮) অর্থ- আমরা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে, আমাদেরকে “কোন ক্লান্তি স্পর্শ করে নাই।”

    (৫১:৪৭) অর্থ- এবং আমরা (আল্লাহ- সম্মান সূচক) আকাশ নির্মাণ করেছি ক্ষমতাবলে এবং আমরা (আল্লাহ- সম্মান সূচক) অবশ্যই মহাসমপ্রসারণকারী।

    (০২:২৯) তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন যা কিছু পৃথিবীতে রয়েছে তার সমস্তই। অতঃপর তিনি মনোনিবেশ করলেন আকাশের প্রতি এবং তিনি তা সপ্ত আকাশমণ্ডলে সুবিন্যস্ত করলেন; আর তিনি সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।

     

    বজ্ঞানের মতে সৃষ্টির শুরুতে এই মহাবিশ্ব ক্ষুদ্র একক বিন্দুর মত ছিল এবং কোন অন্তর্বস্তু ছিল না, অর্থাৎ সৃষ্টির শুরু হয়েছিল পর্যবেক্ষণজাত বস্তুহীন অবস্থা থেকে। তাই বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই অন্তর্বস্তুহীনতা অর্থাৎ পদার্থ কণিকাহীন অবস্থাকে চরম শুন্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (২:১১৬), (২:১১৭) ও (২১:৩০)  ইত্যাদি আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে এই ইংগিত পাওয়া যায় যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এর মাঝে যা কিছু আছে সবই সর্বশক্তিমান আল্লহতায়ালার অসীম শক্তির মাঝে বিলীন ছিল এবং তাঁরই একান্ত অনুগত ছিল। (৫১:৪৭) নং আয়াতে দেয়া তথ্য অনুসারে যেহেতু সকল শক্তির আধার আল্লাহ মহান স্রষ্টা, সুতরাং শক্তি থেকেই যে সৃষ্টির শুরু হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর বিজ্ঞানও অর্থাৎ অপেক্ষবাদ এবং কণাবাদী বলবিদ্যা শক্তি থেকে বস্তু সৃষ্টি অনুমোদন করে। মহান আল্লহতায়ালা যখন সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনার (শুরু/ আরম্ভ/ প্রকাশিত করার) ইচ্ছা করেন তখন থেকেই অর্থাৎ বিজ্ঞানের ভাষায় পর্যবেক্ষণ করার মত পদার্থ কণিকাহীন সেই অসীম শুন্যতা বা বস্তুহীন পরিবেশে কোন এক অজ্ঞাত ক্ষণে সৃষ্টিকালীন সময়ের (১ম ইয়াওম বা দিনের) সূচনা ঘটে। বিজ্ঞান সেই অবস্থাকে শুন্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, আল-কোরআনে সরাসরি এরূপ কোন ইংগিত নেই। বরং (৫১:৪৭) নং আয়াতে 'সামা- আ' বলতে এমন এক আকাশকে বোঝান হয়েছে, বিজ্ঞানের ভাষ্যমতে যে আকাশ শুধুমাত্র বলবাহী মৌল-কণিকা দ্বারা ভরপুর ছিল এবং ডাইমেনশন বা মাত্রাগত পার্থক্য না থাকায় সেই আদি একক আকাশে কোন স্তর-ভেদ ছিল না। ফলে বর্তমানের এই বাস্তব সপ্ত-আকাশ ও পৃথিবী- মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি পর্যায়ে শক্তিতে ভরপূর 'একক আকাশ রূপে' একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল।

     

    বিজ্ঞান-

    [স্টিফেন ডব্লু হকিং-এর "A Brief History of Time"- "কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস"-অধ্যায়-৫-(মৌলকণা ও প্রাকৃতিক বল) -- বলবাহী কণিকাগুলিকে কণিকা অভিজ্ঞাপক যন্ত্রে বাস্তব (real) কণিকার মতো প্রত্যক্ষভাবে সনাক্ত করা যায় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব আমরা জানতে পারি, তার কারণ তাদের একটি মাপন যোগ্য অভিক্রিয়া রয়েছে। তারা পদার্থ কণিকাগুলির অন্তর্বর্তী বল সৃষ্টি করে।]

     

    আমরা হয়ত সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনার ক্ষণটি অর্থাৎ ভরবাহী মৌল পদার্থ কণিকা গঠনের ক্ষণটিকে সঠিকভাবে খুঁজে পাবার সামর্থ রাখি। কিন্তু মহাবিশ্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণজাত বস্তুহীনতার অর্থাৎ বিজ্ঞানের ভাষায়া চরম শুন্যতার একটা পর্যায় ছিল এবং সেই অসীম শুন্যতায় শুধু বলবাহি কণিকা বাহিত অসীম শক্তি বিরাজমান ছিল। এভাবে যে কতটা সময় অতিবাহিত হয়েছে তা সঠিকভাবে নিরুপণ করা কখনই সম্ভব নয়। কারন আমাদের জীবন ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা স্থান ও কালের যে মাত্রা বা ডাইমেনশনের বেড়াজালে আবদ্ধ, সৃষ্টিকালীন আদি বা প্রাথমিক পর্যায়টি ছিল সেই মাত্রা বা ডাইমেনশন বহির্ভূত ঘটনা। যেহেতু বিজ্ঞানের মতে, বলবাহী কণিকাগুলিকে কণিকা অভিজ্ঞাপক যন্ত্রে বাস্তব (real) কণিকার মতো প্রত্যক্ষভাবে সনাক্ত করা যায় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব আমরা জানতে পারি, তার কারণ তাদের একটি মাপন যোগ্য অভিক্রিয়া রয়েছে। সুতরাং মহাবিশ্ব সৃষ্টির সেই আদি অবস্থাকে বস্তুহীনতা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, কিন্তু তাই বলে চরম শূন্যতা বা অনস্তিত্ব অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবেনা, বরং প্রকৃত অর্থে (২:১১৭) অস্তিনাস্তি অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করাই শ্রেয়।  কারণ তখন স্থানের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও মাপনযোগ্য অভিক্রিয়াজাত বলবাহি কণিকা বাহিত শক্তির উপস্থিতি অর্থাৎ অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। পরবর্তীতে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর অসীম ক্ষমতাবলে (০২:২৯) অর্থাৎ শক্তি থেকেই পৃথিবীতে বিরাজমান সকল ধরনের বস্তুসামগ্রী সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় মৌল পদার্থ কণিকা সমূহ সৃষ্টি করেন। সুতরাং মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি পর্যায়ের ঘটনাচক্র ও আদি কাল বা সৃষ্টি শুরুর সময় সম্পর্কে আমরা অনুভবের আলোকে কিছুটা ব্যাখ্যা করতে পারলেও পূংখ্যাণুপূংখভাবে বিশ্লেষণ করা সত্যিই অসম্ভব।

    মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ব বিষয়টি ব্যপক বিধায় মন্তব্যে সব বলা সম্ভব নয়। তাই কারো ইচ্ছা হলে এখানে আসতে পারেন- আল-কোরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি-

    1. 2.1
      এম_আহমদ

      ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ঠিক আছে। এই আকাশ তো সব সময় মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে না। যখন এসেছেন তখন আপনার কথাগুলো দেখা যাক।

      প্রথমত ‘কৃষ্ণগহ্বরের’ প্যারাগ্রাফে সৃষ্টির সূচনালগ্নের ‘একক বিন্দুর’ স্থান থেকে ধরে কোরানের যে ডেইটা-সেট তৈরি করেছেন সে বিষয়ে আমার মিশ্র এবং কমপ্লেক্স অনুভূতি রয়েছে। এখানে অনেক কথা কিন্তু কোথা থেকে কীভাবে শুরু করব সেটাও বুঝতে পারছি না।

      এক্ষেত্রে ধরুন আপনার প্রথম আয়াত ২/১১৭। আল্লাহ হচ্ছেন বাদী‘ (بديع) যিনি পূর্বের কোন আকার আকৃতির অনুসরণ ছাড়া নিজেই রূপদান করেন। এখন সেই বিন্দুর ক্ষেত্রে কিভাবে এটা প্রযোজ্য হবে, বা হবে না, সেই নির্ধারণীতে কীভাবে যাওয়া হবে? এই বিন্দুটি ক্ষুদ্র হলেও শক্তি সম্বলিত বা সম্ভাব্যতা নিয়েই “ছিল”। আমরা এটি “ছিল” বলে উল্লেখ করছি, অবস্থা যাই হোক –তা অস্তিত্বের আঙ্গিণাতেই ছিল। এর কি কোন পূর্বাবস্থা ছিল, যদি থেকে থাকে তাহলে এই অবস্থা থেকে অন্য কিছু সৃষ্টি কি ইবদা‘ (إبداع) অর্থের সৃষ্টি হবে যে অর্থে ২/১১৭ আয়াতে আল্লাহ হচ্ছেন বাদী‘(بديع)? এই সৃষ্টি জগত অস্তিত্বের প্রাথমিক পর্যায়ে আসতে যেসব স্তর অতিক্রম করে এসেছে সে সম্পর্কে কি আমাদের জানার বিষয় ফাইনাল হয়ে গিয়েছে? আমাদের জানার বাইরের কত পর্যায়ের সৃষ্ট উপাদান অতিক্রম করে সৃষ্টি জগত তার প্রাথমিক পর্যায়ে এসেছে তার সবকিছু আমারা এখনো জানি না। ‘তিনি এমন জিনিস সৃষ্টি (খালাকা) করেন যা তোমরা জান না’ (১৬/৮)। বিজ্ঞান এই অস্তিত্ব সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা জানে তা ফাইনাল নয়।

      ২১/৩০ আয়াতকে আমরা কীভাবে সেই বিন্দুর অবস্থায় টানব যেখানে আসমান ও জমিন সংযুক্ত থাকার ধারণা রয়েছে। আমি মনে করি (তবে ভুল তো হতেই পারে), এটি সৃষ্টির অনেক পরের এক পর্যায় যখন পৃথিবীর উপাদানসমূহ ক্ষুদ্রাংশে আকাশের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এতে আমরা আকাশ ও পৃথিবীর ধারণা পাই। দুধের চা হতে হলে দুধও থাকতে হবে চাও থাকতে হবে। উপরের ‘একক বিন্দুর’ অবস্থানে আকাশ ও পৃথিবীর শব্দদ্বয়ের ধারণাই হয় না। আপনার ভাষ্যে ‘একক বিন্দুতে’ আকাশ (سماء) যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সেটা আমার চিন্তায় appeal করে নি। তবে এই না করাতে কিছুই যায় আসে না, কেননা, আমি পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র নই। অমনি নিজ ধারণাকে প্রশস্ত করছি মাত্র।

      আমি আপনার প্রত্যকেটি আয়াতকে বিবেচনা করেছি। এবং সেখানে, পদ্ধতিগতভাবে, সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ে, কোথায় কোনটি বসতে পারে সেটা মনে হয় আরও স্পষ্ট হতে হবে। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল, সন্দেহ নেই।

      সৃষ্টির ধারণা সম্বলিত বেশ কয়েকটি শব্দ কোরানে ব্যবহৃত রয়েছে  যেমন ফাতারা (فطر),  বাদা’আ (بدأ), আবদা‘আ (أبدع), খালাকা (خلق), বারা’আ (برأ), জাআলা (جعل), বানা (بني), আহসানা (أحسن), আনশাআ (أنشأ) ইত্যাদি। ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গেলে প্রায় সবখানেই creation হয়ে যায় অথচ মূলে তা নয়। এগুলোর মধ্যে অর্থের পার্থক্য রয়েছে। অন্য সময় দেখব সেই পার্থক্য নিয়ে কিছু আলোচনা করা যায় কি না।

      ধন্যবাদ। ভাল থাকুন। সুস্থ থাকুন।

      1. 2.1.1
        মাহফুজ

        //২১/৩০ আয়াতকে আমরা কীভাবে সেই বিন্দুর অবস্থায় টানব যেখানে আসমান ও জমিন সংযুক্ত থাকার ধারণা রয়েছে। আমি মনে করি (তবে ভুল তো হতেই পারে), এটি সৃষ্টির অনেক পরের এক পর্যায় যখন পৃথিবীর উপাদানসমূহ ক্ষুদ্রাংশে আকাশের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এতে আমরা আকাশ ও পৃথিবীর ধারণা পাই। দুধের চা হতে হলে দুধও থাকতে হবে চাও থাকতে হবে। উপরের ‘একক বিন্দুর’ অবস্থানে আকাশ ও পৃথিবীর শব্দদ্বয়ের ধারণাই হয় না। আপনার ভাষ্যে ‘একক বিন্দুতে’ আকাশ (سماء) যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সেটা আমার চিন্তায় appeal করে নি। তবে এই না করাতে কিছুই যায় আসে না, কেননা, আমি পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র নই। অমনি নিজ ধারণাকে প্রশস্ত করছি মাত্র।//

        ………………

        হাঁ, ঠিকই বলেছেন, 'ভুল তো হতেই পারে'। আর এই ভুলকে ভয় পেলে চলবে না, ভুলের পথ মাড়িয়েই সঠিক পথে এগোতে হবে।

        আমারও যে ভুল হয় তা আমি মানি, তাই ভুলের জন্য সব সময় মহান স্রষ্টার কাছে ক্ষমা চাই। ভুলকে সুধরে নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকি। তাছাড়া আমার মতের সাথে সবাইকে একমত হতেই হবে এমনটিও আমি ভাবি না। তবে মারাত্মক অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে পরছি কিনা সে ব্যাপারে সব সময় সজাগ থাকার চেষ্টা করি।

        (২১:৩০) অর্থ- যারা কুফ্‌রী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে; তবুও কি ওরা বিশ্বাস করবে না?

        (৫১:৪৭) অর্থ- এবং আমরা (আল্লাহ- সম্মান সূচক) আকাশ (একক) নির্মাণ করেছি ক্ষমতাবলে এবং আমরা (আল্লাহ- সম্মান সূচক) অবশ্যই মহাসমপ্রসারণকারী।

        আমার কাছে মনে হয়েছে এই (২১/৩০ ও ৫১/৪৭) আয়াত দুটিতে সৃষ্টির আদি/ প্রাথমিক পর্যায়ের বিষয়ে  ইংগিত দেয়ার পাশাপাশি সৃষ্টির অনেক পরের এক পর্যায়ের বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে। তাই আমি আমার দেয়া লিংকের (১ম ও ৫ম দিন/ইয়াওম/ সৃষ্টিকালীন ৫ম পর্ব বা নির্দিষ্ট সময়) পর্যায়ে এই আয়াত দুটির বিষয়ে বলার চেষ্টা করেছি।

        আমার মনে হয়েছে এখানে (২১:৩০) 'আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকার' বিষয়টি খুব সম্ভবত সৃষ্টিকে মৌল পদার্থ কণিকা হেসেবে অস্তিত্বে আনার পূর্বের ঘটনা, যখন শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্থাৎ শক্তির (বল বাহিত কণিকাসমূহের) প্রাধান্য ছিল। ফলে বাস্তব আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় মৌল পদার্থ কণিকাসমূহের বৈশিষ্ট্যের মাঝেও পার্থক্য করার মত অবস্থা ছিলনা। বিজ্ঞানের ভাষায় যেটিকে quark-gluon plasma/ hot, dense plasma হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সৃষ্টিকালীন প্রাথমিক পর্যায়ে কল্পিত বলবাহী মৌল কণিকাগুলো অপবর্জন নীতি বিবর্জিত অবস্থায় উত্তপ্ত, ঘনিভূত ও তরলিত (hot, dense plasma) শক্তিরূপে 'একটি নির্দিষ্ট গন্ডির' মধ্যে আবদ্ধ ছিল এবং তখন (১১:০৭) সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (আরশ) সেই স্যুপ অর্থাৎ উত্তপ্ত, ঘনিভূত ও তরলিত গন্ডিবদ্ধ শক্তির (পানির) উপর নিবদ্ধ ছিল। আর সেই নির্দিষ্ট গণ্ডিকেই আমি (৫১:৪৭) 'আদি একক আকাশ' হিসেবে ব্যক্ত করতে চেয়েছি যার মাঝে শুধুমাত্র ক্ষমতা/ শক্তি বিরাজিত ছিল।

        আমার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য মহান স্রষ্টা যেন আমায় ক্ষমা করেন।

        ধন্যবাদ-

        1. 2.1.1.1
          এম_আহমদ

          আপনার ৫১/৪৭ আয়াতকে সম্প্রসারণের (expanding universe) অর্থে দেখাতে আমি কোন অসুবিধে দেখি না। তারপর সংকোচনের বিষয়টি ১০/৪, ১০/৩৪ ইত্যাদি আয়াতসমূহ সহমতে উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু পূর্ব ও পরবর্তী এমন অনেক স্তর রয়েছে যেখানে কোন আয়াত কোন সূক্ষ্ম প্রেক্ষিতে বিবেচিত হবে সেটাই প্রশ্ন। আমার কাছে সৃষ্টিলগ্নের বিষয়টি ২/১১৭, ২১/৩০ দ্বারা তেমন যেন মিল খায় না। আমি একটু ব্যাখ্যায় যাই।

          ২/১১৭ আয়াতের মূল শব্দ বাদা‘ (بدع) মানি নতুন কিছু করা, বানানো, শুরু করা। আমরা যখন বিদআত (بدعة) বলি তখন এই মূলের শব্দটির কথাই বলি। অর্থাৎ কেউ ধর্মে নতুন কিছু শুরু করেছে। কিন্তু অন্য দিক দিয়ে তা একান্ত নতুন নাও হতে পারে। আমর বিন লুহাই মক্কায় পৌত্তলিকতার বিদআত শুরু করলেও পৌত্তলিকতা অন্য ধর্মে ছিল। আজকে যারা কবর পূজার বিদয়াত করে তারা আমাদের ধর্মে বিদআত করলেও আসল ঘটনার উৎস অন্যত্র থাকতে পারে। এই বাদা‘ (بدع) শব্দ থেকে বাবে-ইফআলে এসে আবদা‘আ (أبدع) হয়ে ক্রিয়াসম্পাদক (active participle) بديع হয়েছে যার অর্থ এমন স্রষ্টা যিনি পূর্বের কোন আকার আকৃতির অনুসরণ ছাড়া নিজেই রূপদান করেছেন। এভাবে ফাতারা (فطر) শব্দটির অর্থও রয়েছে। এটা সূচনা করা অর্থের শব্দ। এর বিভিন্ন মাত্রা সম্বলিত প্রায় ৬/৭টি সূক্ষ্ম পার্থক্যের অর্থ রয়েছে। আল্লাহ বলেন,  فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ (১৪:১০), যেভাবে পূর্বের ২/১১৭ আয়াতে বলা হয়েছে بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ।

          ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে তিনি ফাতির শব্দের অর্থ বুঝেন নি। একদিন তিনি দুই বেদুইন ব্যক্তিকে পানির কুয়া নিয়ে ঝগড়া করতে দেখেন। তাদের একজন বলল, আনা ফাতারতুহা, আমি এটার সূচনা করেছি বা আমিই প্রথমে শুরু করেছি। তখন তিনি এটাকে সূচনার অর্থে বুঝে নেন। কিন্তু যে ব্যক্তি কুয়ার কাজ শুরু করল সে শুরু করলেও ‘কুয়ার’ পূর্ব ধারণা তার ছিল। আপনি কোন এলাকায় গিয়ে একখানা নতুন গৃহ তৈরি করলেও গৃহের ধারণা আপনার নতুন নয়। আপনার ৫১/৪৭ আয়াতে সৃষ্টির ক্ষেত্রে বানা (بني) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এই শব্দটি আরবি থেকে আমরা বাংলায় ধারণ করেছি একই অর্থে। আপনি ঘর বানালেও পূর্ব উপাদানের মাধ্যমেই তা বানিয়েছেন এবং ঘরের পূর্ব ধারণার ভিত্তিতে। আল্লাহ বলেন, ‘আমরা আকাশকে নিজ হাতেই বানিয়েছি’ (৫১/৪৭), এটি কোন এক পূর্ব অবস্থার পরের ঘটনা হবে। আপনি যদি কোন একটি জিনিস তৈরি করে এর নাম দেন ‘আকাশ’ তবে এটি এক কথা। আর আপনি যদি বলেন, আমি ‘আকাশ’ তৈরি করেছি, তবে সেটি অন্য ধরণের কথা।  দ্বিতীয়টিতে পূর্বধারণা অনুভব করা যায়। এদিক থেকে আল্লাহ এমন আকাশ হয়ত অনেকবার তৈরি করে থাকতে পারেন, এমন ধারণা গ্রহণের অবকাশ রয়েছে।

          কিন্তু সৃষ্টির 'প্রথম' বলতে নিশ্চয় কিছু থেকে থাকতে হবে। সেই জিনিসটি আমার কাছে লাগে যেন আমাদের আত্মার রহস্যের মত। মূল সৃষ্টি হচ্ছে আল্লাহর ইরাদা-কেন্দ্রিক, তার নির্দেশ বাক্য: কুন (كن), হয়ে যাও।  তারপর এই কুন শব্দ ও পরবর্তী শব্দের প্রতি লক্ষ্য করুন। বলা হয়েছে কুন ফা ইয়াকুন (يكون)। 'ইয়াকুন' শব্দ বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ধারণা বহন করতে পারে এমন ক্রিয়াশব্দ। আমি যদি ইংরেজিতে এটাকে অনুবাদ করি তবে এভাবে করব, Be! So, it starts into being, অথবা অনুরূপ অর্থে। আরবির ফা এবং সুম্মা -এর সংযুক্তিতে আসা বাক্যিক অংশগুলোতে কালের দীর্ঘতা থাকতে পারে। হয়ে যাও আর হয়ে যাওয়াতে এক সুদীর্ঘ কালের ব্যাপার থাকতে পারে। হয়ে যাও –এটা চলন্ত (continuous) অর্থেও হতে পারে এবং হয়ে যাওয়ার প্রসেসও চলন্ত (continuous) হতে  পারে।  আমাদের আত্মা কি –এমন প্রশ্নের জবাবে এসেছে ‘বলুন, এটা আমার প্রভুর নির্দেশ’ (imperative)।   

          এসব বিষয় দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে। এমন আলোচনা ব্লগে করাও মুস্কিল। কারণ মৌখিকভাবে যত কথা বলা যায়, তা লিখতে গেলে অনেক সময় লাগে এবং এই সময় আমাদের হাতে প্রায়ই থাকে না।  এখানে খালাকা নিয়ে কিছু কথা বলতে পারলে হয়ত ভাল হত, কিন্তু সময় নেই।

          ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

           

        2. মাহফুজ

           

          আপনি সৃষ্টি সম্পর্কিত বিভিন্ন শব্দকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সে ব্যাপারে আমার মতের খুব একটা পার্থক্য নেই বলেই মনে হয়। আর আমি তা মাথায় রেখেই বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে তা বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। শব্দ ভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলে ভাল হত কিনা জানিনা, তবে প্রথমত পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতির বিষয়টিকে মাথায় রেখে মৌলিক বিষয়কে হাইলাইট করেতে চেয়েছি। এরপর যারা আরও বিস্তারিত জানতে চান তারা যেন তাদের সাধ্যমত জেনে নিতে পারেন।

          অনেকের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে- এই ধরনের আয়াত নিয়ে আমার এত মাথা ব্যথার কারণ কি? এই উত্তরে আমি বলব, আমার কাছে মনে হয়েছে যে, মহান স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মটি অত্যন্ত বিজ্ঞানময় এবং তাঁর মহান সৃষ্টিকর্ম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য মহান স্রষ্টাই বার বার আহ্বান করেছেন। আর আমি এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছি মাত্র। সৃষ্টিকর্মের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় আছে যা এখনও বিজ্ঞান ও মনন দ্বারা অনুভব করা গেলেও সেগুলোকে চর্মচক্ষুতে বাস্তবে প্রমাণ করে দেখানোর মত যোগ্যতা অর্জন করতে হলে মানুষকে আরও সময় দিতে হবে ও সাধনা করতে হবে। তারপরও কিছু কিছু বিষয় হয়ত আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে।

          জী, ঠিকই বলেছেন- //২/১১৭ আয়াতের মূল শব্দ বাদা‘ (بدع) মানি নতুন কিছু করা, বানানো, শুরু করা।//

          আর সে কারণেই আমি এই আয়াতটির অনুবাদ এভাবে করার চেষ্টা করেছি-

          (০২:১১৭) অর্থ- যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে (অস্তিনাস্তি অবস্থা হতে) অস্তিত্বে আনায়ন  (শুরু/ আরম্ভ/ প্রকাশিত) করেন এবং যখন তিনি কিছু করবার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শুধু বলেন হও, আর তা হয়ে যায়।

          [(بَدِيعُ) অর্থ যিনি অনস্তিত্ব হইতে কোন কিছুকে অস্তিত্বে আনায়ন করেন- আল-কুরআনুল করীম- ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বংলাদেশ- ২৯ পৃষ্ঠা- ফুটনোট ৮২।]

          [আল-কাওসার-আধুনিক আরবী- বাংলা অভিধান- মদীনা পাইলকেশান্স- (বাদী'উন) অর্থ- নবাবিষ্কৃত বস্তু, নতুন বস্তু উদ্ভাবক]

          আপনি বলেছেন- //কিন্তু সৃষ্টির 'প্রথম' বলতে নিশ্চয় কিছু থেকে থাকতে হবে।//

          হাঁ, কিছু তো অবশ্যই ছিলই। আর তাই ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের অনুবাদে ‘অনস্তিত্ব হইতে কোন কিছুকে অস্তিত্বে আনায়ন’ করার কথা বলা হলেও আমি বিষয়টিকে ‘অনস্তিত্বের’ স্থলে ‘অস্তিনাস্তি’ হিসেবে ব্যক্ত করতে চেয়েছি। সেইসাথে বিজ্ঞান এ সম্পর্কে কি বলে সেটাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি-

          আমার কাছে মনে হয়েছে, (২১:৩০) নং আয়াতে 'আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকার' বিষয়টি খুব সম্ভবত সৃষ্টিকে মৌল পদার্থ কণিকা হেসেবে অস্তিত্বে আনার পূর্বের ঘটনা, যখন শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্থাৎ শক্তির (বল বাহিত কণিকাসমূহের) প্রাধান্য ছিল। আর সেই ‘আদি একক আকাশ (سماء)’ নির্মাণ করার ক্ষেত্রে যে ক্ষমতা অর্থাৎ শক্তির বিশেষ ভূমিকা ছিল- (৫১:৪৭) নং আয়াতে সেই ইংগিতও রয়েছে। সেই ‘আদি একক আকাশকে’ একক বিন্দু, শূন্য, Dot, Drop, Sky, Space, Heaven কিংবা জান্নাত, স্বর্গ  ইত্যাদি যেভাবেই ব্যক্ত কার হোক না কেন। অতঃপর সেই একক বিশেষ অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের মধ্য থেকে (২১:৩০)নং আয়াতে উল্লেখিত ‘উভয়কে পৃথক করে দেয়ার’ এবং (৫১:৪৭) নং আয়াতে উল্লেখিতমহাসমপ্রসারণ করার’ বিষয়টি যে সৃষ্টি শুরুর খানিকটা পরের ঘটনা তা আমি আমার লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে ‘আদি একক বিন্দুটি’ হুবহু আমাদের পার্থিব চোখে দেখা বিন্দুর মত ছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন জাগতেই পারে, যেমন সমগ্র মাহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের এই পৃথিবীটা এতই ক্ষুদ্র যে, বলতে গেলে তা একটা বিন্দুরই মতন। আবার আমার আপনার চোখে যা সিন্ধু নদ, স্রষ্টার কাছে তা হয়ত এক ফোঁটা বা বিন্দুবৎ পানি অপেক্ষাও ক্ষুদ্র। সুতরাং সেই আদি একক বিন্দুটির বৈশিষ্ট্য ও আকার যে কিরূপ ছিল তা ভাববার বিষয় বৈকি। তবে বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ‘quark-gluon plasma/ hot, dense plasma’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সৃষ্টিকালীন প্রাথমিক পর্যায়ে কল্পিত বলবাহী মৌল কণিকাগুলো অপবর্জন নীতি বিবর্জিত অবস্থায় উত্তপ্ত, ঘনিভূত ও তরলিত (hot, dense plasma) শক্তিরূপে 'একটি নির্দিষ্ট গন্ডির' মধ্যে আবদ্ধ ছিল এবং তখন (১১:০৭) সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (আরশ) সেই স্যুপ অর্থাৎ উত্তপ্ত, ঘনিভূত ও তরলিত গন্ডিবদ্ধ শক্তির (পানির) উপর নিবদ্ধ ছিল। আর সেই নির্দিষ্ট গণ্ডিকেই আমি (৫১:৪৭) 'আদি একক আকাশ' হিসেবে ব্যক্ত করতে চেয়েছি যার মাঝে শুধুমাত্র ক্ষমতা/ শক্তি বিরাজিত ছিল। ফলে তখন বাস্তব আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় মৌল পদার্থ কণিকাসমূহের বৈশিষ্ট্যের মাঝেও পার্থক্য করার মত অবস্থা ছিলনা। বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে এখনও ‘নবাবিষ্কৃত বস্তু’ বা ‘নতুন উদ্ধাবিত বস্তু’ হিসেবে সরাসরি উল্লেখ করা না হলেও এর বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে পানি জাতীয় তরলের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং অস্তিত্বেই থাক বা অস্তিনাস্তি (state of existence or non-existence) অবস্থাতেই থাক, কিছু যে অবশ্যই ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রকৃত জ্ঞান তো মহান স্রষ্টারই কাছে।

          Difference of opinion থাকতেই পারে। যদিও ব্লগে অল্প কথায় বিস্তারিত আলাপ সম্ভব নয়। তারপরও অন্তত এ ব্যাপারে আপনার ও আমার চিন্তার মাঝে খুব বেশি ফারাক নেই বলেই মনে হয়। বাকিটা মহান আল্লাহ চাইলে পরবর্তীতে কখনো সাক্ষাতে সমাধা করার চেষ্টা করা যাবে- ইনশাল্লাহ।

          ধন্যবাদ ও শুভকামনা- ভাল থাকবেন।

  7. 1
    শাহবাজ নজরুল

    আহমেদ ভাই।  সালাম নেবেন। আপনার তুলনা আপনিই। অসাধারণ লেখাটি এক নিঃশাসে পড়ে ফেললাম। আমার কিছু পয়েন্ট। 

    ১. ফারুক ভাই সারা জীবনই কোয়ান্টাম স্টেটেই থাকলেন -- তাই হাইসেনবার্গের নীতি অনুসারে উনার প্রকৃত অবস্থান আমাদের পক্ষে কখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। অনেকে এই অবস্থানকে "কোথাও নেই আবার সবখানেই আছি" -- নামক সুবিধাবাদ হিসেবে দেখেন। বিষয়টা তাই'ই। 

    ২. আপনি যেভাবে বললেন সৃষ্টি আর সৃষ্ট এর মৌলিক ও সহজ পার্থক্যকে আলাদা ভাবে দেখতে না পারার ফলে এই সমস্ত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞান দিয়ে আল্লাহ স্বরুপকে প্রতিপাদন করার জন্যে নিজ থেকে ব্যাখ্যা দেয়া "শুন্যই আল্লাহ" চিরায়ত প্যান্থীয়িযম বা লালন সাই এর মতবাদ বলেই মতে হয়। ইসলামের ইতিহাসেও তাত্ত্বিক আদলে "আসারি" মতবাদে এমনতরো ধারণার মিশ্রণ দেখা যায়। এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্ক। আপনি যেভাবে বললেন -- "তাতে মানুষের বস্তুভিত্তিক মস্তিষ্ক কাজ করে -অর্থাৎ প্রকারান্তরে বস্তুই বস্তুর ব্যাখ্যা দিয়ে যায়।"

    ৩. আপনার লেখাতে Why ও How এর প্রেক্ষাপট এসেছে। লরেন্স ক্রাউস সহ মিলিট্যান্ট নাস্তিকেরা আজকাল বিজ্ঞানের পরিধি থেকে Why প্রশ্নটি ঝেটিয়ে বিদায় করতে চান -- কেননা Why প্রশ্নটির উত্তর নাকি অবধারিত ভাবে কোনো সমস্যার মধ্যে ঈশ্বরের প্রকল্প Inherently টেনে আনে। আমরা সারাজীবন শুনেছি বিজ্ঞান এগিয়েছে Question Everything -- এই মৌলিক দর্শনের প্রণোদনায়। তাই আজকাল'কার বিজ্ঞানের মধ্যে দর্শনের স্থান নেই বলে দাবি করা এই নব্য নাস্তিকদের আবদার ও বিজ্ঞানের দর্শনে revisionist principle খুঁজে বেড়ানোর পায়তারা দেখে বেশ কৌতুকবোধ করি।   

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      শাহবাজ ভাই, ওয়া আলাইকুমুস সালাম। লেখাটি পড়া ও মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। ফারুক সাহেবের অবস্থানকে একদম সঠিকভাবে নির্ণয় করেছেন, “কোথাও নেই আবার সবখানেই আছি”। আগামী কাল তার ‘আকবর’ শব্দ বর্জন নিয়ে তার ‘নামাজ’ ব্লগে মন্তব্য করব, ইনশাল্লাহ, এখন tired, না হয় এখনি দিতাম। সময় করতে পারলে দেখে নেবেন।

      হ্যাঁ, আপনার একথাও ঠিক যে ইসলামের ইতিহাসে তাত্ত্বিক আদলে মিশ্র ধারণার লোক ছিল, তবে তারা এখনো আছে। এ নিয়ে লেখারও দরকার আছে, দেখব চেষ্টা করে পারা যায় কীনা। তবে শিরকের ধারণা কালের প্রবাহে নানান-রূপে renovate হয়ে আসে। শয়তান তো আর আনএমপ্লয়ড হতে পারে না। তবে কোন কোন শিরকের কাজ এতই বিস্ময়কর দেখায় যে ভাবতে অবাক লাগে।

      Why question. মাথা ধরে টান দিলে যেভাবে দেহ বেরিয়ে আসে সেভাবে why প্রশ্ন, (ঠিকই বলেছেন), “ঈশ্বরের প্রকল্প Inherently টেনে আনে”। তবে বিজ্ঞানের কমিউনিটিতে অবস্থানগত পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়ে উঠছে। এই বিশ্ব জগত নিয়ে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে যে ভাবনা-ধারা ও ব্যাখ্যা চালিয়ে আসছে, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও সেই ধারার ‘আরেকটি’ মাত্র, এবং তাও পরিবর্তনশীল –চলন্ত ব্যাখ্যা। এই সত্যটি অনেক বিজ্ঞানী এখন entertain করেছেন।

      বিশ্বাস ও বিশ্বাসের ধারা তো থাকবেই তবে মিলিটেন্সি মনে হয় বেশি কাল ঠিকবে না। অনেক নাস্তিক বিজ্ঞানী ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করছেন। এখানে একটি আলোচনা রয়েছে, না দেখে থাকলে দেখবেন। প্রফেসর ডেভিড আলবার্টের কথা-বার্তা বেশ মানানসই। প্যানেলিস্টারা নাস্তিক হলেও (তবে প্রফেসর নীল ট্যারোকের বিশ্বাস হয়ত নাস্তিক না হয়ে এগ্নোস্টিকও হতে পারে) তাদের এপ্রোচ শালীন ও সুন্দর। সৃষ্টির অরিজিন প্রশ্নের উত্তরের এক পর্যায়ে প্রফেসর ডেভিড আলবার্টের এই কথাটি ‘what the Hell do I know’ জ্ঞানের বিনম্র অবস্থাকে সুন্দর করে তোলে। The Origins of the Universe: Why is There Something Rather than Nothing? https://www.youtube.com/watch?v=tznxK3etagE

      1. 1.1.1
        শাহবাজ নজরুল

        ভিডিওটি দেখলাম। চমত্কার লাগলো। এই নাস্তিকতার মধ্যে  humbleness আছে, humility আছে, মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে simple স্বীকারোক্তি আছে। মিলিট্যান্ট নাস্তিকতায় যেটা নেই। আমাদের মুক্তমনাদের মধ্যে যারা আসলেই নাস্তিক (কেননা বেশিরভাগই ভাদাপন্থী ইসলাম বিদ্বেষী ছুপা উগ্র হিন্দু) তারা বেশির ভাগই নিয়েছে মিলিট্যান্সির তরিকা -- যেখানে ধর্ম আর নিধর্মে সংঘাত proactively যাঁচা হয়। হ্যারিস, ডকিন্স, হিচেন্স, ডেনেট আর ক্রাউস দের এই মিলিট্যান্ট তরিকা ধর্মবাদীদের আরো উস্কে দেয়। সমস্যা বাঁধে এখানেই। 

        নীল্ টুরকের বক্তব্য গুলো সবচেয়ে আকর্ষী। তবে এসব বক্তাদের মত আমাদের মুক্তমনা নাস্তিক'রা হলে সমাজে সংঘর্ষ হতনা -- বরং ধনাত্মক আলোচনার মাধ্যমে সমাজ হয়ত কিছুটা সামনের দিকেই এগুতো। 

        ধন্যবাদ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.