«

»

Dec ০৩

মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে এক নতুন বেশ্যা

ভূমিকা

এই লেখাটি মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বলতা ও ধর্ম-অধর্ম নিয়ে লেখা। আধুনিক উগ্র নাস্তিকতা একটি অধর্ম, এবং এটি মানুষের দুর্বল দিকটি ব্যবহার  করে ভুল আশ্বাসের আহবানে সমাজে এক নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। লেখাটি ৪টি ছোট ছোট অনুচ্ছেদে বিভক্ত। প্রথম অনুচ্ছেদে সকল ধর্ম ও ধার্মিকের জীবন সাধারণী মাত্রায় এসেছে: মানুষ কেন ধর্ম-অধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয় সেই দিকটির কথা, এবং মূল ধর্মের মহৎ উদ্দেশের কথা।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ধর্ম গ্রন্থের পটভূমিগত কিছু সমস্যার কথা বলা হয়েছে যা অনভিজ্ঞ পাঠক ও, বিশেষ করে, উগ্রনাস্তিকদের ব্যাপারে প্রায়ই সমস্যা হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। এই সাথে ধর্মীয় কিছু জটিলতার কথাও আনা হয়েছে। কোনো সমস্যা বুঝা ও তা স্বীকৃত হলে সমাধানের চিন্তা আসতে পারে। আরও বলা হয়েছে যে কিছু সমস্যা মানব প্রকৃতির সাথে জড়িত। তাই এর সার্থক ও সামগ্রিক উত্তরণ নেই।

তৃতীয় অনুচ্ছেদে মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতার দিকটি উল্লেখ করে উগ্র-নাস্তিকতার আহবান নিয়ে আলোচনা হয়েছে।  অতীতের অধর্মগুলো যেভাবে মানুষের দুর্বলতাকে পুঞ্জি করে ময়দান সরগরম করেছিল, এবং এখনো করছে,  ঠিক সেভাবে মানবতার মুক্তির নামে এই নতুন “ধর্ম” মানুষকে বিভ্রান্ত করছে –এই আলোচনা।  

চতুর্থ অনুচ্ছেদে উগ্র-নাস্তিক্যবাদের স্পন্সররা কীভাবে বিশ্বে বিপর্যয় ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং কীভাবে একটি চামচা বাহিনী গঠন করে তাদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করছে সেই আলোচনা এসেছে। অবশেষে সকল আস্তিক সম্প্রদায়ের ঐক্যভিত্তিক পদক্ষেপের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

এই লেখাটি বক্তৃতার বৈশিষ্ট্যে রচিত।

-এক-

এই বিশ্বের বিভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত মানুষের ধর্ম ও বিশ্বাস বিবেচনা করলে কিছু মৌলিক বিষয় অনুধাবন করা যাবে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপ ইত্যাদির কথা চিন্তা করা যেতে পারে। তবে এই বিবেচনার জন্য সময়-সীমাকে অন্তত দেড়-দুই হাজার বছর পর্যন্ত পিছিয়ে নিতে হবে। এসব দেশের সকল বিশ্বাসের পিছনে অশরীরী সত্তার উপর বিশ্বাস পাওয়া যাবে; আত্মায় বিশ্বাস পাওয়া যাবে; এক খোদার ধারণা পাওয়া যাবে। আবার এই জগত পরিচালনার কার্যে কিছু অধস্তন দেব-দেবীও। মানুষের জীবন দেখা যাবে খোদায়ী ধারণা ঘিরে: সুখে, দুখে, ব্যথা-বেদনায়।

মানুষ এক অসহায় সত্তা। তার অসহায়ত্বকে ঘিরেই দেখা যাবে ধর্ম ও অধর্ম সবই চালিত: কেই রোগে ভুগছে –আরোগ্য চায়; কারো বাচ্চা মরছে –বাঁচাতে চায়; কারো বিপদ –উদ্ধার পেতে চায়। এভাবে অসংখ্য প্রয়োজন। মানুষ তার দুর্বলতার সীমা বুঝে; প্রয়োজনে সেই সীমা অতিক্রম করতে চায়। আপনি একটি সুন্দরী মেয়ে দেখেছেন –বিয়ে করতে চান, কিন্তু সে আপনাকে চায় না, বা তার পরিবার রাজি হবে না। এখন তাবিজাত-পথ ধরবেন, বা যাদুর। আপনি খেলায় জয়ী হতে চান, তাই যাদু-বুড়ির কাছে যাওয়া। এসব হচ্ছে ক্ষমতার ‘সীমা’কে ঘিরে –আপনার দুর্বলতাকে লাঘব করতে। একটি দুর্বল সত্তার চাহিদা যে মিটিয়ে দেবে সে তার কাছে যাবেই –সোজা কথা। কিন্তু চাহিদা মেটানো আর চাহিদা মেটানোর “আশ্বাস” নিয়ে খেলা –এই দুটি জিনিস কখনো এক নয়। ধর্ম ও অধর্মের খেলা এখানেই। অনেক বস্তুতান্ত্রিক ব্যবসায়ও এই সূত্রে প্রথিত –দুর্বলের অসহায়ত্ব ঘিরে।

ধর্ম হচ্ছে মানুষ মানুষকে প্রতারণা করা থেকে বিরত রাখতে, অপরকে না ঠকাতে; জুলুম নির্যাতন না করতে। প্রাচীন সমাজ এগুলো করত। আজকের সমাজও তাই করে। বরং এখন তা চরম রূপে। ইসলাম ধর্মের নবী (সা) বলেন, ধর্ম হচ্ছে “নসিহত”। প্রাচীন আরবিতে ‘নাসাহা’ ক্রিয়ার অর্থ হচ্ছে কোন কিছু নিষ্কলুষ হওয়া, পবিত্র হওয়া। এই শব্দটি মধু সংগ্রহ থেকে ধারিত। যখন মৌমাছি তাড়িয়ে গৃহীত মধুকে অনাঙ্ক্ষাখিত বস্তু থেকে পবিত্র করা হত তখন সেই মধুর বিশেষণ হত ‘নাসিহা’, আর  কার্যটি হত ‘নাসাহা’। এই রুপকালঙ্গার থেকে  গৃহীত ধারণা হল আপনি আপনার অন্তরকে পবিত্র করবেন: প্রথমে নিজেকে, তারপর যা নিজের জন্য ভাল তা অন্যের জন্য কামনা করবেন। এই উদ্দেশ্য আপনার সামগ্রিক জীবনকে বেষ্টন করবে –ব্যক্তি থেকে আর্থ-সামাজিকতা পর্যন্ত। এটাই ধর্ম। নসিহত আবার উত্তম পরামর্শ দানও –এটাও সেই কল্যাণের অর্থ থেকে আসা।

-দুই-

ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ, তাকে বাঁচানো, কিন্তু ধর্মীয় টেক্সট সময়ের বিভিন্ন ও করুণ প্রেক্ষিতে, এবং নাজুক ঘটনাসমূহের আলোকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, এমনভাবে সজ্জিত হয়ে গিয়েছে যা পরবর্তীতে, প্রেক্ষিত অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ায়, তার মূল ভাব ও অর্থ অনভিজ্ঞ পাঠকের কাছে অর্বাচীন হয়ে পড়েছে। সময়ের ধারায় অনেক ধর্মযাজকও ধর্মকে এমন ভাব ও আবেগে ব্যক্ত করেছেন যা কালের সাথে সম্পর্কিত হয়ে পরবর্তী কালের জন্য ‘ধর্মান্তরায়’ হয়ে গিয়েছে: অনেক কিছু মিশ্রিত হয়ে ধর্মের আহবানকে সমস্যা বহুল করেছে।

আরও কিছু জটিলতা -কোনটি ‘ধর্ম’, কোনটি ‘অধর্ম’: বাজারে নির্ভেজাল তেল থাকলেও ভেজালও আছে। জটিলতার স্বীকৃতির প্রয়োজন। আমি যদি ‘ধর্ম-ব্যবসায়’ জড়িত থাকি, তবে আমার কাছে আমার ‘অধর্ম’ কখনো প্রতিভাত হবে না, কারণ আমার অধর্ম ‘ধর্ম’ হিসেবে ‘সত্য’ হয়ে প্রতিষ্ঠিত। আমি হয়ত স্কুল খুলে আছি, বংশ ও ঘরানা পরম্পরায় পাঠ্য সিলেবাস তৈরি করে পড়িয়ে যাচ্ছি; সার্টিফিকেট বিতরণ করে সেটিকে সত্য-ধর্মের আঙ্গিকে চালিয়ে নিচ্ছি –নিষ্ঠার সাথেই। কিন্তু এখানে স্বার্থ যে সুপ্ত স্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছে সেটি খেয়ালে আসার মত নয়: প্রায় অসম্ভব। এভাবেই চলে প্রাতিষ্ঠানিক সত্য। তবে, নিছক কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া, প্রায় সব সত্যই প্রাতিষ্ঠানিক –বস্তুবাদসহ। পরিবার, গোত্র, সহপার্টি, নির্বাচিত সাহিত্য, নির্বাচিত যোগাযোগ মাধ্যম, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায় ইত্যাদিই সেই সত্যের বাহক ও স্থাপক। আস্তিক-নাস্তিক সবার। বর্ষবরণ, জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস, বিশেষ সংগীত, ম্যারেজ-এনিবার্সারি, মাদার্স-ডে, ফাদার্স-দে, ভ্যালেন্টাইন্স-ডে, ইত্যাদিও ‘ধর্মীয়-রূপী’ সেক্যুলার আনুষ্ঠানিকতা। সকলের সত্যের ‘আদর্শ’ রয়েছে; আদর্শ স্বপন দেখাচ্ছে, আশ্বাসের যোগান দিচ্ছে; শান্তি লাভের এহসাস সঞ্চার করছে:  বৈপরীত্যও সাথে থাকছে। এইডস রোগে আক্রান্ত একজন নাস্তিককেও নানান হাতুড়ে চিকিৎসকদের দারস্ত হতেও দেখবেন, কারণ সে মানুষ, সে দুর্বল, সে ‘আশ্বাসে’ প্রভাবিত –দোষের কিছু নেই।

মানুষ যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন ধর্ম-অধর্মের খেলাও থাকবে –এটা নিশ্চিত, কেননা, বিষয়টি হচ্ছে মানবের প্রকৃতি ঘিরে: তার অসহায়ত্ব, তার আত্মকেন্দ্রিকতা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, লোভ-লিপ্সা। বিভিন্ন বিশ্বাসের সমন্বয়ে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু একান্ত সরানো সম্ভব কীনা সন্দেহ।

-তিন-

আপনি যখন চরম নিরুপায় হবেন, তখন পতিতা হতে পারেন, পতিতার খদ্দের হতে পারেন, ‘তকদীরের’ কথা বলতে পারেন, অথবা ‘কপালের’ও। তারপরও, বিশ্বাসও করবেন, ‘আশ্বাসে’ থাকবেন, এসবে তাত্ত্বিক দোষের কিছু নেই –আছে মানবিক দুর্বলতা আর অসহায়ত্ব।

এই অসহায় মানুষকে মুক্তির “আশ্বাস” দিতে কত মিথ্যাচার হয়েছে, আরও কত যে হবে কে জানে। আপনি ১০ টাকায় সর্বরোগের মহৌষধ বিক্রি করেন –আপনি একা। চামচা-চাটুকার পেলে ধর্মীয় জোব্বায় পীরাকী চালাতে পারেন। কোম্পেনী হলে বীমা বিক্রি করবেন, রাষ্ট্রীয় স্বপ্ন হলে “এই-তন্ত্র”, সেই-তন্ত্র” করবেন। এভাবে এক প্রজন্মের প্রতারক ও প্রতারিতরা নিঃশেষ হয় বটে, কিন্তু এই ‘আশ্বাসের’ শেষ নেই: নতুন প্রতারক আসে, আর নতুন প্রজন্মে চালিয়ে নেয়। এভাবেই চলছে। 

আধুনিক উগ্র-নাস্তিকতা একটি চরম প্রতারণা। এই নতুন বেশ্যাটিকে নামানো হয়েছে বিশ্ব মানবতার আহবানে –নতুন ‘আশ্বাসে’। এটি নাকি ধর্ম নির্মূল করবে; বিশ্ব মানবতাকে একত্রিত করবে; ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে; সকল বিভেদ দূর করবে। একটু শান্ত হোন। এগুলো কি নতুন কিছু? নতুন আশ্বাস? এই নবীনাকে নামিয়েছে যায়োনবাদী বৈশ্বিক ধনতান্ত্রিক শক্তি। ঊর্ধ্বতন চালিকা শক্তি ধনাঢ্য হলেও এর কর্মী বাহিনী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসা: এরা ‘শহুরে প্রাণী’ (urban animals)। এরা জীবনের চরম অসহায়ত্ব উপলব্ধি করেনি, বিচ্ছিন্ন উদাহরণ ভিন্ন। মানব জীবনের দুর্বলতা কোথায়, এই বিশ্ব-মানবতা কোন কারণসমূহের কারণে প্রতারিত বাস্তবতায় আসে, মানুষ কেন একে অন্যকে ঠকায়, কেন তারা শক্তি প্রয়োগ করে, কেন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালায়? এসবের সাথে মানব প্রকৃতি কীভাবে সম্পর্কিত হয়? ধর্ম নির্মূল করলেই কি মানব প্রকৃতি ভিন্ন হয়ে পড়বে? জগত স্বর্গ হয়ে যাবে? এটা ধাপ্পার স্বর্গ, না  বোকার?

-চার-  

মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বাণিজ্য করছে, তারা তা কেন করছে?  কেন এই বাণিজ্য-লীলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন অবলীলায় হারিয়ে যাচ্ছে? কেন লক্ষ কোটি বাড়ি-ঘর আধুনিক বোমার ভূমি-কম্পে ধূলিসাৎ হচ্ছে? কেন লক্ষ লক্ষ নিরীহ প্রাণ দেশান্তর হচ্ছে? যারা বন্দুক আর গোলাবারুদ তৈরি করতে জানে না, যারা জঙ্গলি দাড়ি আর আদিম-বস্ত্র পরে পাথরের ঢিল-মিরাক্কেলে আধুনিক জঙ্গি-বিমান উড়ানোর ঈমানের আস্ফালন দেখায়, তাদের হাতে যারা অস্ত্র তুলে দিয়ে যুদ্ধ-বাণিজ্য চালাচ্ছে এরা কারা? কাদের মুনাফার যুদ্ধ এটা? কারা বিশ্বকে করায়ত্ত করতে চায়? কারা নিজেদের কুকর্ম আড়াল করতে প্রোপাগাণ্ডা শ্রেণী তৈরি করছে? এই বিশ্রি বিকট দৈত্য কীভাবে চাটুকার বাহিনী তৈরি করে তার নিজের চেহারা মায়াবিনী করে তুলছে? এই কর্মগুলোর সাথে কী মানব প্রকৃতির কোনো সম্পর্ক নেই? মোহ,পাশবিকতা নেই?

চিন্তা করুন, চোখের সামনে এই সত্যগুলো উদ্ভাসিত থাকা সত্ত্বেও সেগুলো না দেখে যারা হাজার বছর আগে কে কয়টি বিয়ে করেছিল সেই কাহিনীর প্রোপাগান্ডায় জড়িত হয়ে নিজেদের পেট-বাণিজ্য চালাচ্ছে তারাই বুঝি বিশ্ব-মানবতায় শান্তি আনার ‘আশ্বাস’ দেবে? ওরে তোরা কে কোথায় রে, এক গেলাস বিষ এনে দেয়, খেয়ে মরি!

বলেছি, এই মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা ঘিরেই চলে প্রতারণা, এই আশ্বাস, সেই আশ্বাস: ১০ টাকার বড়ি বিক্রি, কোটি টাকার সুদী কারবার, বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র-ব্যবসা সবই এক, কিন্তু মাত্রার তফাৎ আকাশ পাতাল। কে ফতোয়া দিয়ে কার মুখ বন্ধ করল সেটা দেখবেন বটে, কিন্তু কারা অন্যদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ বানিয়ে তাদেরকে ও তাদের বাড়িঘর বোমায় উড়িয়ে দিয়ে নির্বাক করল, সেটা দেখবেন না? হায়রে চান্দু! তোমরা সব সময়ই চামচা থেকে যাও –কারণ একটিই: মানবিক দুর্বলতা, লিপ্সা। এই কয় যুগ আগ পর্যন্ত মুসলিমদের মধ্যে কোন সন্ত্রাস ছিল না, আজ এল কোথা থেকে?

ধর্মের অঙ্গনে মূল চিন্তা কী? ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতার সমাধান খুঁজে। আপনি আইন করে সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। মানুষের ঘরে ঘরে পুলিশ মোতায়েন করতেও পারবেন না। আইন বাহ্যিক বিচারের একটি বিধান মাত্র। কেবল খোদাতে বিশ্বাসেই মানুষের ভিতর থেকে সেই তদারকি আসতে পারে। মানুষ, প্রধাণতভাবে, বিনিময়ের ভিত্তিতেই কর্মে সাড়া দিয়ে থাকে: পরকালে সে পুরষ্কৃত হবে, স্রষ্টার সন্তুষ্টি পাবে –এই বিশ্বাস তাকে উত্তম কর্মে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তার মন থেকে সাড়া আসতে পারে। এভাবেই ধর্মের কাজ। এ সংসারে সব লোক ধার্মিক না হলেও নৈতিকতার জগতে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে –এটাও উদ্দেশ্য।

আমার পূর্বের লেখায় বলেছি যে আজ বিভিন্ন জাতি-ধর্মের লোক, যে কারণেই হোক, অনেক পাশাপাশি হয়েছে। … আজ তারা চাইলে তাদের ধর্মীয় বাণীসমূহকে, নিজ নিজ ধর্মে থেকেও, পারস্পারিক সৌহার্দে এক নতুন সমাজ গড়ার ব্যাখ্যায় আনতে পারেন। এই কাজটি জরুরি। কেননা, বিষয়টি যেন মার্টিন নীমোলারের ‘তারা প্রথমে এলো’ কবিতার মত না হয়। আজ মানব জাতির ঐতিহ্যের একটি বিশেষ দিক ধ্বংসের মুখামুখি।

৮ comments

Skip to comment form

  1. 4
    সত্য সন্ধানী

       আহমদ ভাই, আসসালামু আলাইকুম। প্রথমেই চমৎকার 

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

    আর সাথে ৩ নং পয়েন্টের কিছু অংশ নিয়ে নিজের কিছু মতামত। আসলে যারা ধর্ম কে বিশেষ করে ইসলাম কে নির্মুল করতে চাচ্ছে এরা কিন্ত আসলে ফেলনা নয়,ইতিমধ্যে  কিছু ধর্মের খোল নলচে এরা বদলে দিয়েছে যেমন খৃষ্টান ধর্ম, আর এই জোশ থেকেই এরা ইসলামের পিছনে লেগেছে। 

    সাময়িক আর 

    আংশিক সফলতা তারা পেয়েছে মানুষের মধ্যে ইসলামী  মুল্য বোধ কে ভোঁতা করে দেবার ব্যাপারে সেটা আমরা চোখের উপরেই দেখছি।

    এবার আসি নির্মুলের ব্যাপারে। এই খানেই তারা ধরা খেয়েছে যেহেতু তারা ঐশীবানীর মর্যাদা আর ধারাই বোঝে না।

    খৃষ্টান ধর্ম মুলত আইন ছাড়া একটা ধর্ম ( এসব অবশ্যই আপনি জানেন), নতুন নিয়মের কিছু বিকৃত জিনিসের অন্যতম হল পুরাতন নিয়ম এর আইন কানুন সব বাতিল হয়ে গেছে, যিশু এসেছেন মানুষকে নতুন নিয়ম দিয়ে উদ্ধার করতে, তাই ইশ্বর কে পেতে হলে, মুক্তি পেতে হলে বাহ্যিক আচারের কোন দরকার নাই,মনে মনে ইশ্বর কে ধারন করুন, মুক্তি পান নিজের মর্যাদার (salvation by grace) দ্ব্বারা ইশ্বর সেবা করে!!

    এখানেই শুভংকরের ফাঁকিটা নিহিত আছে। যেহতু আইনই দরকার নাই,তাই যেসব কথা সরাসরি নতুন নিয়মে নাই সেসব না মেনেই ইশ্বর কে পাওয়া যায়! তাই শালীনতা থেকে শুরু করে,জীবনের সব জটিল দিক গুলি এই ধর্মের মুলে একেবারেই অনুপস্থিত যেটা আবার ইহুদী ধর্মে আছে।

    কাজেই যাদের মধ্যে মর্যাদা বোধই নেই বা মর্যাদার সংগা টাই জানে না, বা যেখানে সংগা নিজে নিজে বানিয়ে নেয়ার সুযোগ আছে নিজের মত, সেখানে ধর্মের ছায়ায় অধর্ম আমদানী করাও সহজ।

    আর ইসলাম ধর্মকে তারা খ্রিষ্টান ধর্মের মত কিছু একটা ভেবেছে আর সমস্যা টা এখানেই।

    এদের বোঝা উচিত যে, ' ধর্ম পবিত্র, পবিত্র ধর্মকে রাজনীতির উর্ধে রাখাই যুক্তিযুক্ত, না হলে ধর্মের পবিত্রতা নষ্ঠ হয়' এসব ছেলে ভুলানো কথা বলে আর রাজনীতি কে কদর্য আখ্যা দিয়ে ধর্ম কে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার পদ্ধতি এটা আসলে খৃষ্ট ধর্মের সেই বিশেষ কথা যেটা জিশুর মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে, "আমার পিতার রাজ্য এই দুনিয়াতে নয়,স্বর্গে' এই টাইপ কিছু একটা, এই সব বাজে কথা ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

    চড় খেলে আরেকগাল এগিয়ে দেয়া না(যদিও ইতিহাস স্বাক্ষী যে খৃষ্টান রা চড় না খেয়েই  তলোয়ারই চালিয়েছে) , আত্মরক্ষাই যে ইসলামের আইন, এটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    কাজেই এইসব ছেলে ভুলানো কথা যা ইসলামের শিক্ষা থেকে অনেক দূরে, সেগুলা দিয়েই এরা ইসলামের বিরুদ্ধে লাগে।

    যাদের ধর্ম শিক্ষা নাই এদের বিরুদ্ধ সাফল্য এলেও বাকি দের বেলায় ধরাই খাবে।

    তাই এবার ধর্ম শিক্ষা নিয়েই নানা বানী শুরু হয়েছে। এই বই করা হয়েছে হেফাজত কে খুশী করতে, এইটা অমুক করতে এইসব।

    এখন দেখা যাক আমরা এদের বিরুদ্ধে কেমন সফল হই।

    দেশে আজকাল যা শুরু হয়েছে সেগুলো না থামলে কোথায় গিয়ে পরিস্থিতি দাঁড়াবে আল্লাহই জানেন।

    1. 4.1
      সত্য সন্ধানী

       কাজেই আসলে ধর্ম বা ধর্মীয় শিক্ষা তারা নির্মুল করতে চাচ্ছে পুঁজিবাদের নারী ব্যবসা পুরোপুরি সফল করতে! আর যদি ইসলাম শিক্ষাতেই বাধা দেয়া হয় রাষ্ট্রিয় ভাবে সেখানে পুঁজিবাদী এই আক্রমন কিভাবে ঠেকানো যায় সেটা ভাবা আসলেই মুশকিল।

      এই যে সকল মানুষকে এক করবে এই ধাপ্পাবাজিই যেখানে আসলে মানুষকে আত্ম মর্যাদা  ভুলিয়ে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে শুধু নিজেদের স্বার্থে!

      1. 4.1.1
        সত্য সন্ধানী

        দুঃক্ষিত ২য় মন্তব্য পুরা আসেনি। যাক সেই জন্যেই এরা আসলে নানা ধর্মের মানুষকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন কায়দায়, সেখানে নানা ধর্মের লোক কাছাকাছি এলেও, কতদিন থাকবে সেটাই ভাইজান দেখার বিষয়!

        কারন সেই ছদ্ম নাস্তিকতার বিরুদ্ধে যে অনেক salvation by grace জাতীয় ধর্মগুলো অসহায়!

  2. 3
    এম_আহমদ

    আজ দুদিন পরে লেখাটি আবার পড়ে মনে হল এর একটি ভূমিকা থাকলে ভাল হত। তাই এখন একটি ভূমিকা সংযোজন করলাম। ভূমিকাটি নিম্নরূপ:

    ভূমিকা

    এই লেখাটি মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বলতা ও ধর্ম-অধর্ম নিয়ে লেখা। আধুনিক উগ্র নাস্তিকতা একটি অধর্ম, এবং এটি মানুষের দুর্বল দিকটি ব্যবহার  করে ভুল আশ্বাসের আহবানে সমাজে এক নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। লেখাটি ৪টি ছোট ছোট অনুচ্ছেদে বিভক্ত। প্রথম অনুচ্ছেদে সকল ধর্ম ও ধার্মিকের জীবন সাধারণী মাত্রায় এসেছে: মানুষ কেন ধর্ম-অধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয় সেই দিকটির কথা, এবং মূল ধর্মের মহৎ উদ্দেশের কথা।

    দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ধর্ম গ্রন্থের পটভূমিগত কিছু সমস্যার কথা বলা হয়েছে যা অনভিজ্ঞ পাঠক ও, বিশেষ করে, উগ্রনাস্তিকদের ব্যাপারে প্রায়ই সমস্যা হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। এই সাথে ধর্মীয় কিছু জটিলতার কথাও আনা হয়েছে। কোনো সমস্যা বুঝা ও তার স্বীকৃত হলে সমাধানের চিন্তা আসতে পারে। আরও বলা হয়েছে যে কিছু সমস্যা মানব প্রকৃতির সাথে জড়িত। তাই এর সার্থক ও সামগ্রিক উত্তরণ নেই।

    তৃতীয় অনুচ্ছেদে মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতার দিকটি উল্লেখ করে উগ্র-নাস্তিকতার আহবান নিয়ে আলোচনা হয়েছে।  অতীতের অধর্মগুলো যেভাবে মানুষের দুর্বলতাকে পুঞ্জি করে ময়দান সরগরম করেছিল, এবং এখনো করছে,  ঠিক সেভাবে মানবতার মুক্তির নামে এই নতুন “ধর্ম” মানুষকে বিভ্রান্ত করছে –এই আলোচনা।  

    চতুর্থ অনুচ্ছেদে উগ্র-নাস্তিক্যবাদের স্পন্সররা কীভাবে বিশ্বে বিপর্যয় ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং কীভাবে একটি চামচা বাহিনী গঠন করে তাদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করছে সেই আলোচনা এসেছে। অবশেষে সকল আস্তিক সম্প্রদায়ের ঐক্যভিত্তিক পদক্ষেপের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

    এই লেখাটি বক্তৃতার বৈশিষ্ট্যে রচিত।

  3. 2
    Md Amir

    আমি যদি ‘ধর্ম-ব্যবসায়’ জড়িত থাকি, তবে আমার কাছে আমার ‘অধর্ম’ কখনো প্রতিভাত হবে না, কারণ আমার অধর্ম ‘ধর্ম’ হিসেবে ‘সত্য’ হয়ে প্রতিষ্ঠিত।

    >> > আসলে এরা এদের প্রবৃত্তিকেই খোদা মনে করে।

    "আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে  উপাস্যরুপে

     গ্রহণ করে ? সুরা আল ফুরকান : ৪৩

    1. 2.1
      এম_আহমদ

      ঠিক বলেছেন, তবে এ বিষয়ে জটিলতাও আছে।  পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  4. 1
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    " আপনি আইন করে সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। মানুষের ঘরে ঘরে পুলিশ মোতায়েন করতেও পারবেন না। আইন বাহ্যিক বিচারের একটি বিধান মাত্র। কেবল খোদাতে বিশ্বাসেই মানুষের ভিতর থেকে সেই তদারকি আসতে পারে।"

    >> হক কথা। এই অনুভুতি এবং বোঝশক্তি ইসলাম বিদ্বেষীদের নেই আর থাকলেও না বোঝার ভান করে কুতর্ক শুরু করে।

     

    "১০ টাকার বড় বিক্রি, কোটি টাকার সুদী কারবার, বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র-ব্যবসা সবই এক, কিন্তু মাত্রার তফাৎ আকাশ পাতাল। কে ফতোয়া দিয়ে কার মুখ বন্ধ করল সেটা দেখবেন বটে, কিন্তু কারা অন্যদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ বানিয়ে, তাদেরকে ও তাদের বাড়িঘর বোমায় উড়িয়ে দিয়ে, নির্বাক করল সেটা দেখবেন না! "  

    >> নাস্তিককুল এবং ইসলাম বিদ্বেষীর ভাল করেই আপনার কথাগুলো জানে তারপরেও তারা ইসলাম একটি সন্ত্রাসী ধর্ম, অশান্তির ধর্ম বলার জন্য মুখে ফেনা তুলতেছে অবিরাম আর লিখে যাচ্ছে দুনিয়ার সকল ব্লগগুলোতে। আল্লাহ্‌ তাদের ছেড়ে দিয়েছেন নিজেদের আত্মপ্রসাদের ভিতরে। লাফাঙ্গারা লাফাইতে থাকুক। দোযখেরও জ্বালানী দরকার। দেখে বিস্মিত হই, তারা প্ল্যান করে কিভাবে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেশ ধ্বংস করে। ISIS লিডার বাগদাদীর ডকুমেন্টারী দেখে অবাকই হয়েছিলাম, কিভাবে এই বিশ্ব-কুলাঙ্গারকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ইরাক-সিরিয়া কে গুঁড়িয়ে দিল। হিলারীর ISIS-র কাছে অস্ত্র বিক্রি অনেক আগেই প্রকাশ পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সকল তেলের দেশগুলো ধ্বংস হবে। তবে একটি ব্যাপার, মুসলমান ভাইবোনেরা কেন ISIS-র ফাঁদে পা দিয়ে এতবড় সর্বনাশ করল এবং নিজেদেরও ধ্বংস করল, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। 

     

    আহমেদ ভাই, আসসালামু আলাইকুম।

    সুন্দর লিখা আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনার লিখা সর্বদাই শিক্ষনীয় এবং চিন্তার দরজা খোলে দেয়। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

     

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      তাজুল ভাই, সালাম। আপনার পাঠ ও বিস্তারিত মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। তবে আরেকটি কথা বলা হয় নি আর তা হল উগ্র-নাস্তিকতা মূলত একটা একটি মিশনারি ধর্ম। অর্গেনাইজড ধর্মের কর্ম ও বৈশিষ্ট্যের সাথে এর অনেক মিল রয়েছে। তারা তাদের "দাওয়াতি কাজ" করে যাচ্ছে, মৌলিক কিছু বাক্য ও ধারণা বার বার আওড়িয়ে যাচ্ছে এবং যাবেই। এত্থেকে বিরত হওয়া মানি ধর্মচ্যুত হওয়া, নিষ্ক্রিয় হওয়া। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.