«

»

Jan ২৫

বৈষম্য নিরসনের ধারায় যাইনাবের (রা) বিবাহ

ভূমিকা

ইসলামপূর্ব আরব সমাজ একটি বড় আকারের পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিল। আর এ জন্য প্রয়োজন ছিল এক বলিষ্ঠ ও উন্নত মানের নেতৃত্বের –একজন বিরল প্রতিভাবান লোকের। মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সেই বিরল প্রতিভা –এমন কাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মাত্র ২৩ বছরের সীমায় পারস্পারিক যুদ্ধংদেহী গোত্রসমূহকে তিনি একটি অভূতপূর্ণ একক প্লাটফর্মে স্থাপন করেন; তাদের বিশ্বাস, প্রথা ও আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন, এবং সাম্য ও সুনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। সেখান থেকে শুরু করে এই বিশ্ব মানবের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত অনুকরণীয় এক জীবন পদ্ধতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এগুলো ছিল আল্লাহর ইচ্ছায়। আর তিনি ছিলেন তার অনুগত দাস, তার একনিষ্ঠ মাধ্যম।

তিনি আইন থেকে প্রথা পর্যন্ত যত পরিবর্তন সাধন করেন সবগুলো মানবতার কল্যাণে সিক্ত ছিল। ভূমিকা-স্বরূপ আমরা উল্লেখ করতে পারি বিবাহ-প্রথার কয়েকটি মন্দ দিক। একজন আরব তার বিধবা বিমাতাকে বিবাহ করতে পারত এবং পিতার তালাকপ্রাপ্তাকেও। তিনি তা পরিবর্তন করেন। কেউ যদি তার স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলত, ‘তোমার পিঠ আমার মায়ের (পিঠের) মত’ -তাহলে সেই স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যেত! তিনি এটা পরিবর্তন করেন। কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে ওপরের হাতে দিয়ে ওর স্ত্রীকে কিছু দিনের জন্য যৌন-সাথী করত। তিনি এটাকেও পরিবর্তন করেন। এক ব্যক্তি তার মেয়েকে অন্যের সাথে বিয়ে দিয়ে ওর মেয়েকে বিয়ে করে  আনত। এটাকেও করেন। প্রকৃতিগত দুঃসময় ও অনাবৃষ্টিতে ধনী লোক গরীব মহিলাদের যৌন-সঙ্গিনী করত। এটাকেও। 

তিনি মদ, সূদ, জুয়া, ব্যভিচার, জুলুম, নির্যাতন, অন্যায়-বেইনসাফকে নিষিদ্ধ করেন। ব্যক্তি ও সামাজিক বৈষম্য দূর করেন। সবই আল্লাহর ইচ্ছায় ও নির্দেশে।

তিনি সকল কঠোর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রথমে অন্যকে না ঠেলে,  নিজেকে সামনে এনেছেন; সামনে এনেছেন তাঁর নিজ পরিবারের লোকদেরকে। এভাবেই ছিল নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত। তিনি জীবন ও জগতকে নিরাবরণ ও উষর রূপ থেকে দেখেছেন। তিনি অনুপায়, অনাশ্রয় দেখেছেন। দেখেছেন নিরাপত্তাহীনতা। তিনি ছিলেন মাতৃ-হারা, পিতৃ-হারা: এতিম। বাল্যকাল থেকে কাজের বিনিময়েই জীবন যাপন করেছেন: মেষ ও উটের রাখালি করেছেন। তিনি এতিমদেরকে নিগৃহীত হতে দেখেছেন। দাস-দাসীর প্রতি অন্যায় দেখেছেন।  কিশোর বয়সে ফুজ্জারের যুদ্ধ দেখেছেন –বিভীষিকা দেখেছেন। বাচ্চাদের এতিম হতে দেখেছেন, নারীদেরকে বিধবা হতে দেখেছেন। গোত্রীয় ঔদ্ধত্য, অহংকার ও কবিদের অন্ধ-আবেগের ইন্ধন দেখেছেন। ব্যবসা-কাফেলায় কাজ করেছেন, নীরবে গোটা অঞ্চল দেখেছেন, কথা-কাহিনী শুনেছেন। গরীব ও ধনীর অবস্থান দেখেছেন। বৈষম্য ও অবিচার দেখেছেন এবং এসবে আইন ও প্রথার সম্পর্ক বুঝেছেন। এমন ব্যক্তির হাতেই এসেছিল সেই সংষ্কারের দায়িত্ব, কঠিন নেতৃত্ব।

আমাদের লেখাটি প্রধানত বৈষম্য প্রথার পরিবর্তন নিয়ে। যদিও বৈষম্যের উচ্ছেদ মানব কল্যাণ ও সাম্যের এক অনুকূল অগ্রযাত্রা, তদুপরি ইসলাম বিদ্বেষী কিছু নিন্দুক যারা নিজেদেরকে প্রথার মোকাবেলায় মুক্তচিন্তক ভাবেন, তারা যখন আরবের প্রাচীন বৈষম্যপূর্ণ পৌত্তলিক প্রথার সমর্থনে যাইনবের বিয়ে নিয়ে নবীর বিরূপ সমালোচনা করেন তখন তাদের অবস্থানগত স্ববিরোধ প্রকাশ পায়। অধিকন্তু বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তাদেরকে কোরেশদের বৈষম্য প্রথা ও পৌত্তলিক ধর্মের সমর্থক দেখা যায়। আমরা চেষ্টা করব সামাজিক যে প্রেক্ষিতে সেই প্রথা এক শ্রেণীর মানুষকে বৈষম্যের শিকারে পরিণত করত সেই স্থানগুলো দেখানো এবং কেন এই প্রথা  পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। যাইদ (রা) একদিকে ছিলেন একজন পালক-পুত্র এবং অন্যদিকে ছিলেন একজন মুক্তদাস। এই দুয়ের প্রতি কোরেশের অভিজাত বৈষম্য ছিল এবং অভিজাত কোরেশিনী যাইনাবের (রা) বিয়েতে তা দেখার মত হয়ে উঠেছিল। তারপর মুহাম্মদ (সা) যাইদের পালক-পিতা হওয়ায় সেই প্রথার শ্লেষাত্মক (ironical) রূপটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এই প্রথাটি সাম্য ও সুনীতি ধারণ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই উৎখাত হতে হয়, কিন্তু নিন্দুক-পক্ষ কেবল বিদ্বেষবশত বৈষম্য-প্রথার সমর্থক হয়ে নবীর বিরুদ্ধে তাদের অপপ্রচারের যুদ্ধ করেন। আমরা আরবের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রথাটি দেখব এবং এরই মধ্যে যাইনাব, যাইদ (রা) ও মুহাম্মদের (সা) দুর্যোগপূর্ণ বেষ্টনীবদ্ধতাও দেখব। এই লেখাটিতে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনের চেষ্টা করা হবে, তাই এর পরিধি একটু দীর্ঘ হবে। আমরা শুরুতে দত্তক-প্রথার কথা বলব, তারপর যাইনাব ও যাইদের (রা) বিয়ে, তারপর নবীর সাথে যাইনাবের (সা) বিয়ে -এই ধারায়।

দত্তক-প্রথার সামাজিক সমস্যা

আরবের দত্তক-প্রথার দিকে তাকালেই বুঝা যাবে যে এই প্রথায় পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। তারপর, মুক্তদাসের প্রতি তাদের আচরণের বিষয়টিও: এগুলোতে তিক্ত বৈষম্য কাজ করত। মুক্তদাস ও পালিত-সন্তান সামাজিকভাবে নিগৃহীত হতেন। দত্তক-প্রথায় পালিত সন্তানের পৈত্রিক পরিচিতি বিলীন হত। তাকে পালক-পিতার নামে ডাকা হত। কিন্তু পিতৃ-পরিচয় বিলুপ্ত মানুষের মর্মমূলে হাহাকার ও বেদনা বিরাজ করত (আজও করে)। সেদিন বিয়ে-শাদিসহ অনেক সামাজিক আচরণে পালিত-সন্তানের চোখে বৈষম্য ধরা পড়ত এবং তারা এর বিষ-বেদনা অনুভব করত। পালিত সন্তান অপরাপর সন্তানের মত সম্পদে সমান ভাগ পেত না, বরং ওসীয়ত থাকলে সম্পদের তৃতীয়াংশ বা তার থেকে কম পেত। উত্তরাধিকার বিতরণে অনেক সময় বিবাদ দেখা দিত। পালিত-সন্তান সমাজ ও গোত্রের ভিতরে থেকেও আচরণগতভাবে ‘বাহিরের লোক’ (outsider) হয়ে থাকত। বৈষম্য চারিধার ঘিরত।

পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি লক্ষণীয় যে অনেক প্রচলিত প্রথা প্রায়ই এক ব্যবস্থা থেকে অন্য ব্যবস্থায় পরিষাণ (migrate) করে। দত্তক প্রথাটিও সেভাবে তার যাবতীয় সমস্যাসহ ইসলামে চলে আসে, অধিকন্তু ইসলামে এসে আরও সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিম্নরূপ:

ইসলাম পরবর্তী অবস্থা

  • ইসলামে উত্তরাধিকারী আইন পূর্ব-প্রথার রক্ত-সম্পর্ক ও ওসিয়তের ভিত্তিতে চালিত হওয়ায় দত্তক প্রথার পূর্ব-সমস্যা আগের মত থেকে যায়
  • ইসলামে বিয়ে-শাদি ও শরিয়া-সম্মতভাবে কে মুহরাম আর কে নন, তাও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মধ্য-পথে এসে দাঁড়ায়

ইসলামে দত্তক-প্রথায় পরিবর্তন

  • ইসলাম দত্তক প্রথা পরিবর্তন করে। সন্তানের প্রকৃতিগত পরিচয়কে (identity) তার অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ সন্তানের রক্ত-সম্পর্ক বা তার বায়োলজিক্যাল পিতার নামে 'পরিচিতি' প্রতিষ্ঠা করে। এটা তার মানবিক অধিকার হয়
  • কোনো লোক মানবিক বা অন্য কারণে অন্যের সন্তানকে লালন-পালন করলে তার মূল পরিচিতিকে (identity) নির্বাসন (ostracize) করা অবৈধ হয়

এই পরিবর্তনটি প্রবর্তন করতে মুহাম্মদ (সা), যাইদ (রা) ও যাইনাবকে (রা) সামাজিক পরীক্ষার  সম্মুখীন হতে হয়।

আরব দেশে, এবং বিশেষ করে, কোরেশ বংশে আভিজাত্য-বৈষম্য অধিক ছিল, এজন্য কোন দাস মুক্ত হলেও কোন কোরেশিনীকে বিয়ে করতে পারত না। বহির্গোত্রের পালিতপুত্র হলেও না। এই বৈষম্য প্রথার পরিবর্তন যাইনাবের (রা) বিয়ের মাধ্যমে আসে।  যাইনাব (রা) ছিলেন মুহাম্মদের (সা) আত্মীয়: ফুফাতো বোন। আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশে তাঁকে নিজ ইচ্ছার বিপরীতে যাইদকে (রা) বিবাহ করতে হয়। যাইদ (রা) ছিলেন উত্তর আরবিয় নজদ থেকে ছিনতাই-হওয়া লোক: স্বাধীনতা থেকে দাসত্বে আসা। তিনি ছিলেন মুহাম্মদের দাস। মুহাম্মাদ (সা) তাঁকে মুক্ত করে সন্তান হিসেবে ঘোষণা দিলে তিনি হন মুহাম্মদের পালক-পুত্র, এবং ধারণাগতভাবে মুক্তদাস। তাঁকে কোন অভিজাত নারী বিয়ে করার মানি হল একই সাথে ‘মুক্তদাসের স্ত্রী’ হওয়া এবং ‘পালিত-পুরুষের স্ত্রী’ হওয়া –দুদিক থেকেই অভিজাত্য অবমাননা (double whammy)। এবারে সামাজিক অবস্থান বুঝতে আমাদেরকে যাইনাবের (রা) সংক্ষিপ্ত পরিচয় পেতে হবে।

যাইনাবের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

  • যাইনাব ছিলেন নবীর পিতা আব্দুল্লাহর বোন উমাইমার কন্যা
  • যাইনাবের (রা) জন্ম ৫৮৮ সালে, মতান্তরে ৫৯০ সালে অর্থাৎ নবীর জন্মের ১৮/২০ বছর পরে। মোহাম্মদের (সা) চোখের সামনেই তাঁর বড় হয়ে উঠা, বিয়ে-শাদি হওয়া
  • ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়েই যাইনাব (রা) ও তাঁর পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেন
  • ৬২২ সালে যাইনাবের (রা) প্রথম স্বামীর মৃত্যু হলে তিনি বিধবা হন
  • যাইনাব অত্যন্ত ধর্মপয়ারণ ছিলেন। তিনি বেশি বেশি নামাজ-রোজা করতেন এবং মদিনার নতুন শহরে জীবিকা নির্বাহের জন্য চামড়া-শিল্পের কাজ করতেন, এবং বাড়তি টাকা-পয়সা গরীব-দুখীদের মধ্যে ও ইসলামের কাজে ব্যয় করতেন
  • ৬২৫ সালের দিকে নবীর পালক-পুত্র যাইদের (রা) সাথে নবী (সা) তাঁকে বিয়ে দেন। এই বিয়ে না ঠিকলে, ৬২৭ সালে নবীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়, তখন যাইনাবের বয়স ৩৭/৩৯
  • যাইনাব এই মর্মে গর্বিতা ছিলেন যে আল্লাহই তাঁকে রাসূলের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন
  • ৬৪১ সালে যাইনাবের মৃত্যু হয়, তখন তাঁর বয়স ৫১/৫৩

যাইনাবের (রা) মত প্রথম সারির একজন ইসলাম গ্রহণকারিণী, হিজরতকরা, নিবেদিত মহিলা-সাহাবি মুক্তদাস ও দত্তকসন্তান-ঘিরা অভিজাত বৈষম্য দূর করতে ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু যে প্রথা আবেগের পাহাড় নিয়ে মনের গহীনে স্থান করে নিয়েছে সেটি ভাঙ্গা প্রত্যাশিত হলেও আপন মনে কলঙ্ককর (stigmatic) ছায়াপাত করতে পারে। যাইনাব (রা) একজন অভিজাত কোরেশিনী। ‘মুক্ত-দাসের স্ত্রী’, বা ‘পালিত-পুত্রের স্ত্রী’ –এগুলো আভিজাত্যের বিপরীত। এমন একটি প্রথা স্থিরসংকল্পের পরিপক্ব লোকদেরকেও হিমশিম খাইয়ে ছাড়তে পারে।

অন্যদিকে, নবীর (সা) পালিতপুত্র ইসলামের এক অসাধারণ পুরুষ। তাঁর মূল পিতৃ-পরিচিতিতে তিনিও ছিলেন অভিজাত ঘরের সন্তান, কিন্তু সামাজিক অনাচার, অবিচার তাঁর জীবনকে উলট-পালট করে দেয় এবং কোরেশের বৈষম্য-প্রথা তাঁকে ঘিরে ফেলে। এই অবস্থান বুঝতে আমাদেরকে যাইদের (রা) সংক্ষিপ্ত পরিচয় জেনে নিতে হবে।

যাইদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

  • ৫৮১ সালের দিকে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার গোত্র বানু কালব (মূল-গোত্র কুদা'আ) এবং মাতার গোত্র তাই ( طيء ) এর উপগোত্র মা'আন (এটা ইতিহাসের সেই কিংবদন্তী পুরুষ 'হাতিম তাই' এর গোত্র)
  • তাঁর জীবনের প্রথম কৈশোর বা কৈশোর-পূর্ব কালে মায়ের সাথে মাতুলালয়ে গেলে সেখানে কাইন-গোত্র মাআন গোত্রের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে এবং তাদের তাঁবু লুণ্ঠন করে। সাথে যাইদকে হরণ করে এনে মক্কার নিকটবর্তী ওকাজ বাজারে বিক্রি করে। এটা ছিল আরবের  এক করুণ সামাজিক চিত্র। যুদ্ধ, ছিনতাই এগুলো  ছিল জীবনের এক চরম হিংস্র দিক। পরবর্তীকালে মোহাম্মাদ নবী হলে বলেন, এই ভূখণ্ডে এমন নিরাপত্তা আনা হবে যে ইয়ামানের সানআ থেকে একজন নারী একাই হাদরামাউথ পর্যন্ত ভ্রমণ করবে, কিন্তু তার নিরাপত্তাকে কেউ হরণ করতে সাহস করবে না, এবং তাঁর হাতে সেই নিরাপত্তা একদিন এসেছিল
  • ওকাজ বাজার থেকে হাকিম বিন হিজাম ৪০০ দিনারের বিনিময়ে ক্রয় করে তার ফুফু খাদিজা বিনত খুয়াইলিদকে (রা) দান করেন এবং পরবর্তীতে খাদিজা (রা) মোহাম্মাদকে (সা) বিয়ে করলে, তিনি যাইদকে (রা) মোহাম্মদকে দান করেন। যাইদ ও নবীর জীবনে অনেক মিল ছিল। যাইদের মাতা-পিতা জীবিত থাকলেও তিনি ছিলেন 'এতিম', আর মোহাম্মদ তো এতিমই ছিলেন। উভয়েই জীবনে অনেক সামাজিক বিপর্যয় ও করুণ বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছেন এবং নিজেরা অনেক নিগ্রহ, বৈষম্য, চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়েছেন
  • যাইদকে (রা) মোহাম্মাদ (সা) অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তাঁকে বলা হত 'হিব্বু মোহাম্মদ', মোহাম্মদের প্রেমাস্পদ।
  • পরবর্তীকালে, (মোহাম্মদের নবুয়্যতের পূর্বে), যাইদের পিতা হারিসা তাঁর অবস্থানের সন্ধান পেয়ে মক্কায় আসেন এবং মোহাম্মদের (সা) কাছ থেকে তাঁকে ক্রয় করে  নিতে প্রস্তাব করেন।  মোহাম্মদ (সা) বলেন, এখানে ক্রয়ের কোন প্রয়োজন হবে না। বরং যাইদকে তার স্বাধীন সিদ্ধান্তে ছেড়ে দিতে হবে। সে যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, তবে টাকার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সে যদি আমার সাথে থাকতে চায় -তাহলে কোন জোরাজুরি নেই। এই প্রস্তাব তাদের কাছে অতি উত্তম বিবেচিত হয়। অতঃপর যাইদকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি মোহাম্মদের সাথেই থাকতে চান। তিনি বলেন, মোহাম্মদ এখন আমার মা-বাবার মর্যাদায়, তার মোকাবেলায় আমি কাউকে গ্রহণ করব না। একথা শুনে যাইদের পিতা ও তার চাচা বিস্মিত হন। অতঃপর মোহাম্মদ যাইদকে নিয়ে কাবার চত্বরে আসেন এবং সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'যাইদ এখন  আমার পুত্র: সে আমার উত্তরাধিকারী এবং আমি তার উত্তরাধিকারী।' যাইদের পিতা ও চাচা এতে খুশি হয়ে দেশে ফিরে যান
  • মোহাম্মদ (সা) নবী হলে যাইদ (রা) প্রথমেই ইসলাম গ্রহণ করেন, এবং তাঁর পালক-পিতার সাথে জীবন বাজি রেখে ইসলামের কাজ করেন। তায়েফে যখন নবীকে (সা) পাথর মেরে রক্তাক্ত করা হয়, তখন যাইদ একাই তাঁর পাশে
  • আল-মুরাইসি যুদ্ধের সময় (৬২৭ খৃ) রাসূল (সা) যাইদকে (রা) মদিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে রেখে যান। যাইদ একজন ভাল যোদ্ধা ও দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। তিনি বড় বড় সব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। আয়েশা (রা) বলেন, 'যাইদ (রা) যদি বেঁচে থাকতেন, তবে রাসূল তাকে খিলাফতের দায়িত্ব দিতেন' (লিঙ্ক)। নবী তাঁকে রোমানদের বিপক্ষের প্রথম যুদ্ধে (৬২৯ খৃ) মোতায় প্রধান সেনাপতি করে পাঠান এবং এই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। পরে তাঁর ১৮ বৎসর বয়সী ছেলে ওসামাকে (রা)  রোমানদের সাথে দ্বিতীয় যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি করে পাঠানোর সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই বাহিনীতে ওমরের (রা) মত অনেক প্রবীণ নেতা ছিলেন এবং তাদের কেউ কেউ আপত্তি করেন। ওমর (রা) এক সময় বলেই ফেললেন, একটা বাচ্চা ছেলেকে আমাদের উপর নেতৃত্ব দেয়া হয়ে গেছে। এই কথা নবীর (সা) কানে গেলে তিনি বলেছিলেন, 'তার নেতৃত্বে যদি তোমরা আপত্তি তোলে থাক, তবে তার পিতার নেতৃত্বেও সেটি তুলেছিলে। আল্লাহর শপথ, নেতৃত্বের জন্যই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে' (লিঙ্ক)। ইত্যবসরে নবীর (রা) ওফাত হলে আবু বকর (রা) ওসামার অধীনেই সেই বাহিনী পাঠান। পরবর্তীতে ওমরের (রা) খেলাফতকালে একবার বাইতুল মালের টাকা বিতরণের সময় তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহকে (রা) যা দিলেন তার দ্বিগুণ দিলেন যাইদের পুত্র ওসামাকে (রা)। তিনি এমন বিতরণে আল্লাহ-রাসূলের দেয়া অবস্থান, ও ব্যক্তির ধর্মীয় অবদানের হিসেব মনে রাখতেন। আব্দুল্লাহ (রা) তাঁর পিতার বণ্টনে সন্তুষ্ট হতে না পেরে বলেন, ‘আপনি ওসামাকে আমার উপর প্রাধান্য দিলেন, অথচ আমি রাসূলের সাথে থেকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পেরেছি, কিন্তু সে তো পারে নি।’  ওমর (রা) বললেন, ‘ওসামা নবীর কাছে তোমার চেয়ে অধিক প্রিয় ছিল, এবং তার পিতাও রাসূলের কাছে তোমার পিতার চেয়ে অধিক প্রিয় ছিলেন’

  • একমাত্র যাইদের (রা) নাম ব্যতীত আর কোন সাহাবির নাম কোরানে উচ্চারিত হয় নি, যদিও সর্বনাম ও ইঙ্গিত-আকারে  কয়েকজনের কথা এসেছে। এটি সাধারণ কথা নয়

আরবের যুদ্ধংদেহী সমাজের একটি চিত্র যাইদের (রা) কাহিনীতে এসেছে। গোত্রীয় সার্বভৌমত্ব, গোত্রীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা, ক্ষমতার দাপট ও পূর্বপুরুষ নিয়ে অহংকার তাদের ভূখণ্ডকে দ্বান্দ্বিকতায় জড়িয়ে রেখেছিল। ব্যক্তি ও দুর্বল গোত্রের নিরাপত্তাহীনতা, জীবনের উলট-পালট, স্বাধীনতা থেকে দাসত্ব –এগুলো ছিল সেকালের স্বাভাবিক বাস্তবতা। এগুলো কালান্তরে চলে আসছিল। কেউ কোথাও কোন উপায়ে মুক্তি পেলেও, সামাজিক অদৃশ্য শিকল অতিক্রম করা মুষ্কিল হত। আল্লাহর নির্দেশে এমন বাস্তবতা পরিবর্তন করতে নেমেছিলেন মুহাম্মদ (সা) এবং যাইদ (রা) ছিলেন সেই পরিবর্তনের পথে এক নিবেদিত প্রাণ। এখানে নবীর (সা) উদারতা ও বিভেদ-বিহীন আচরণের রূপও প্রকাশ পেয়েছে।   

যাইনাব ও যাইদের (রা) বিয়ে

সামাজিক পরিবর্তন ও আইনি সংষ্কার মদিনাতেই শুরু হয়। এসব মক্কাতে সম্ভব ছিল না, কেননা মক্কায় রাসূলের হাতে কোন 'শক্তি' ছিল না, আর শক্তির অভাবে আইন নিরর্থক। তাই মক্কায় কোরানের আইনি কোন আয়াতও নাজিল হয় নি। সেদিন মক্কা থেকে হিজরত-করা লোকদের কাছে মদিনা শহর নিরাপত্তার দিক দিয়ে “বিদেশের মত” ছিল। মক্কার তুলনায় মদিনা যৌন-সংস্কৃতিতে অনেকটা মুক্ত-প্রকৃতির ছিল। তাই মক্কানরা এখানে বিয়ের বয়সের মহিলাদেরকে দ্রুতই বিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিতেন, যাতে তারা স্বামীর নিরাপত্তায় থাকেন।

যাইনাবের (রা) প্রথম স্বামী মারা গেলে তাঁর পরিবারের ইচ্ছে ছিল মোহাম্মাদ (সা) তাঁকে বিয়ে করবেন। যাইনাবের (রা.) পরিবার শুরু থেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাদের জান-মাল দিয়ে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মোহাম্মদ তাদেরই এক নিকট  আত্মীয় এবং তখনকার পর্যায়ে অভিভাবকদের মধ্যেও একজন। সেদিন কোনো কোনো বিবাহ সম্পর্ক, এবং বিরল ক্ষেত্রে আজও, অতি মর্যাদার বিষয় ছিল: পরিবার, গোত্র, সমাজ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে।

কিন্তু নবীর ইচ্ছা ছিল তাঁর পালিত-পুত্র যাইদের (রা) সাথে যাইনাবের বিয়ে দেবেন। বাংলাদেশের প্রথায় কেউ মনে করতে পারেন যে হয়ত এতে যাইদকে (রা) 'জাতে তোলার' বিষয় থাকবে, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তা ছিল উঁচু-নীচু-প্রথার মূলে কুঠারঘাত। যাইদ একজন মুক্তদাস ও পালক-পুত্র। এই বিয়ে সার্থক হলে আগামীতে আরও সার্থকতা আসতে পারে -এটাই ছিল আশা। সালমান ফার্সি (রা) ইসলামের একজন মহান কর্মী হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোরেশিনীকে বিয়ে করা সম্ভব হয় নি।

যাইনাব-পরিবারের আশার প্রতিকূলে সেদিন মোহাম্মদ (সা) যাইদের (রা) জন্য যাইনাবের (রা) বিয়ের প্রস্তাব দিলে যাইনাব (রা) ও তাঁর পরিবার এ প্রস্তাবে রাজি হতে পারেন নি। একটি প্রথা সামাজিক-মানসিককতার কত গভীরে যেতে পারে –তা এখানে দেখার মত। পরবর্তীতে মুহাম্মদের (সা) জন্য তা অন্যভাবে বড় হয়ে দেখা দেবে। এখানে প্রথা ও সামাজিক বাস্তবতার প্রকৃতিগত ঘন-নিবেশ রয়েছে। যারা সামাজিক পরিবর্তনের কাজ করবেন তাদের জন্য এগুলো শিক্ষণীয় উদাহরণ।

কিন্তু এই বিয়েটি জরুরি ছিল এবং এই কাজ নবীর পরিবার থেকেই হওয়া জরুরি ছিল। যাইনাব (রা) ও তাঁর পরিবারের অবস্থাগত বিষয়ের নিরসন করতে কোরানের আয়াত নাজিল হয় এবং তা এই মর্মে:

আল্লাহ ও তাঁর রসূল যখন কোন বিষয়ে নির্দেশ দান করেন, তখন কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর সে ক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছার ইখতিয়ার প্রয়োগ করার অবকাশ থাকে না। আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশের অবাধ্য হবে, সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হবে (৩৩:৩৬)।

কোরান নাজিল হওয়ার পর আর কারো কিছু বলার থাকেনি। সুতরাং মনঃকষ্ট ও কিছু কান্নাকাটির পর যাইনাব (রা) ও তাঁর পরিবার রাজি হন। যাইনাব (রা) নিজেই নবীকে জিজ্ঞেস করেন, এতেই কি আল্লাহ ও রাসুলের ইচ্ছে? নবী বলেন, হ্যাঁ। তখন বিয়ে ছাড়া আর কিছু বাকি থাকে নি। এভাবেই ছিল ইসলাম। কিন্তু এ বিয়েটি সুখের হয়নি। মাত্র দেড়-দুই বছরের মধ্যেই ভেঙ্গে যায়। কিন্তু ভেঙ্গে গেলেও, বাহির-গোত্রের পালকপুত্র ও মুক্তদাসও যে একজন কোরেশিনীকে বিয়ে করতে পারেন -এটা প্রতিষ্ঠিত হয়।

মোহাম্মদের সাথে যাইনাবের বিয়ে

যাইনাবের (রা) সাথে যাইদের (রা) সমস্যা হচ্ছে -এ নিয়ে যাইদ (রা) প্রায়ই নবীর (রা) কাছে অভিযোগ করতেন। নবী (সা) তাঁকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে দিতেন। কিন্তু সময়ের এক পর্যায়ে ইসলামি সমাজে দত্তকপ্রথার সাংঘর্ষিক প্রবণতার (disposition) প্রেক্ষিত থেকে মুহাম্মদ (সা) নবুয়্যতি ইঙ্গিতে বুঝতে পারেন যে এই প্রথা পরিবর্তিত হবে ও পালিত সন্তানদের পরিচতি তাদের নিজ রক্তধারায় স্বীকৃত হবে। এই বিয়েটি হয়ত ঠিকবে থাকবে না, অতঃপর, হয়ত তাকেই যাইনাবকে (রা) বিয়ে করতে হবে, অন্য বর্ণনায় জিব্রিলের মাধ্যমে এসব অবগত হন। পালক-পুত্রের তালাক-প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করে উদাহরণ স্থাপনের মত ক্ষেত্র অপ্রতুল ও বিরল এবং এক্ষেত্রে মোহাম্মদই (সা) এই বিরল বিষয়ের উপযুক্ত পাত্র। আল্লাহর নির্দেশ হলে তাঁকেই হয়ত এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এই প্রথা অভঙ্গুরভাবে জিতে গেলে যাইনাবকে আর কে বিয়ে করবে? কিন্তু নবী এতে ভয় পেয়ে যান: লোকভয়। মুহাম্মদ (সা) একজন মানুষই, সমাজেরই সন্তান।  যে কেউই তার নিজেকে মুহাম্মদের (সা) স্থানে দাঁড় করিয়ে বুঝতে পারেন লোকভয় কত কঠোর হতে পারে।

কেউ সমাজপতি হোন অথবা নবী, সকলেরই 'সীমার' স্থান থাকে। এক সময় নবী আয়েশাকে (রা) বলেছিলেন, আয়েশা, তোমার জাতি বিদ্রোহ করবে, এমনটি না হলে আমি হাতিমকে কাবার অংশ করে নিতাম। নবীর ইচ্ছে ছিল কাবাঘর ইসমাইল (আ) এর সময় যেভাবে ছিল সেভাবে করা: বর্তমানের হাতেমের অংশকে কাবার অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু তা করতে পারেননি। কোরান পাঠ করলে বিভিন্ন নবীর দুর্বল মুহূর্ত খুঁজে পাওয়া যায়। যাইনাবকে (রা) বিয়ে করার এই বিষয়টি নবীর জন্য একটি দুর্বল স্থান ছিল। একজন নবী আল্লাহকেই ভয় করবেন, পরিস্থিতি যতই নাজুক হোক না কেন। প্রথা পরিবর্তনের সাথে এটাও ছিল আরেকটি উদ্দেশ্য।

নবী (সা) যাইদের (রা) বিয়ে সম্পর্কিত জটিলতা আঁচ করতে পারার পর থেকে যাইদ (রা) যখনই যাইনাবের (রা) ব্যাপারে অভিযোগ নিয়ে আসতেন, তিনি ভয় পেতেন। তিনি বলতেন, 'যাইদ, তুমি স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না, আল্লাহকে ভয় করো।' কারণ, যাইদ যতদিন তার স্ত্রীকে তালাক না দেবেন, ততদিন সমস্যাটি হয়ত অন্যভাবে প্রকট হবে না। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছে অপ্রতিরুদ্ধ -তা কার্যকর হতেই হয়: প্রত্যেককে তার আপন স্থানে খোদাভীতিতে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক স্তর। আমরা এভাবেই দেখি।

নবীর (সা) লোকভয়কে নিয়ে কোরানের আয়াত নাজিল হয়:

আর স্মরণ করুন!  [আপনি] তাকে বলেছিলেন, যার প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন ও যার প্রতি আপনিও অনুগ্রহ করেছেন, ‘তোমার স্ত্রীকে তালাক দিও না, আল্লাহ্‌কে ভয় করো।’ আর আল্লাহ্ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন যা আপনি অন্তরে লুকিয়েছিলেন: আপনি মানুষকে ভয় করছিলেন [লোকনিন্দার ভয়]। অথচ আপনি আল্লাহ্‌কেই বেশি ভয় করবেন -এটাই অধিক হক।

অতঃপর যাইদ যখন যাইনাবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমরা তাকে [যাইনাবকে] আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে তাদের [মুমিনদের] কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হতেই হয় (৩৩:৩৭)।

অতঃপর আল্লাহর নির্দেশেই নবী (সা) যাইনাবকে (রা) বিয়ে করেন। এই বিয়ের মাধ্যমে বৈষম্য-তাড়িত প্রথাটি যে শেষ হয়ে গিয়েছে এবং নতুন প্রথার আচরণ কার্যকর হয়ে গিয়েছে -এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়। দত্তকপ্রথা আর নেই। যাইদ (রা) হারিসার পুত্র। তাঁকে আরবের প্রথা সাম্যের স্থান দিতে পারে নি: ইসলাম দিয়েছে। তিনি তাঁর নিজ পরিচয়ে ইসলামি সমাজের একজন সদস্য। আল্লাহর নির্দেশেই তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যাইদের (রা) তালাক-প্রাপ্তা স্ত্রীর পরবর্তী বিবাহকে পূর্ব-প্রথার বৈষম্যনীতি নির্ধারণ করতে পারে না। একমাত্র আল্লাহর আইনই মানুষের অধিকার নির্ধারণ করবে এবং লোকভীতি কখনো খোদাভীতির স্থান দখল করতে পারবে না। নবী (সা) নিজেই আল্লাহর নির্দেশে নতুন আদর্শ স্থাপন করেছেন।

নবী (সা) তাঁর ২৩ বছরের দায়িত্বের আঞ্জামে নিজেই প্রথমে এগিয়েছেন, এবং কঠিন মুহূর্তে তাঁর পরিবারকেও সম্মুখে এনেছেন। বদরের যুদ্ধে মল্ল-আহবান আসলে তিনি সেই জীবন-মৃত্যুর মোকাবেলায় তাঁর আপন চাচা হামজা (রা) ও চাচাত ভাই, এবং জামাই, আলীকে (রা) দাঁড় করিয়েছেন। নেতৃত্ব এভাবেই হয়। বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠা যদি মানবিক প্রত্যাশা ও অধিকারের বিষয় হয়, তবে মুহাম্মদের (সা) সাথে যাইনাবের (রা) বিয়েতে কারো আপত্তির কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি নেই।

সারসংক্ষেপ

দত্তক প্রথায় পরিবর্তন একটি আধুনিক বিষয় ছিল। পালিত-সন্তান তার আপন পরিচিতি ও অধিকারের ভিত্তিতে সমাজের সন্তান হবে –এটাই যুক্তি ও মানবতার দাবি। এর অনুপস্থিতিতে একজন মানুষের মানসিক অস্তিত্ব ক্ষত-বিক্ষত হতে পারে। আজও একজন পালিত-সন্তান তার বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতাকে খুঁজে বের করতে সকল প্রস্তর উলট-পালট করে। আজও তারা হয়রানীর শিকার হয়। সেদিন এসব আরও বেশি হত। সমাজ তাদের প্রতি বৈষম্য দেখাত, 'অপাত্র' করে রাখত। ইসলাম সেদিন যে কাজটি করেছিল তা ছিল এক সুমহান পদক্ষেপ। সুতরাং এমন কাজের বিপক্ষে অপপ্রচার করা মানবতার বিপক্ষেরই সমতুল্য।

মোহাম্মাদ (সা) নবী না হলে, এবং সুযোগ সন্ধানী হলে, যাইনাবকে (রা) বিয়ে করার ঝুঁকি নিতেন না। এমন বিরল ঘটনাতে সাধারণ বিবেক ও যুক্তি স্তম্ভিত হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন নবী। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যুদ্ধংদেহী পৌত্তলিক সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তনে দাঁড়িয়েছিলেন; আরবদের সুন্দরী মেয়ে, ধন-মাল ও ক্ষমতার আসনে বসানোর প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়ে নিজ লক্ষ্যে অটল ছিলেন; তায়েফ থেকে জখমি হয়ে ফিরলে, নিরাপত্তার শক্তি নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মত যখন কেউ ছিল না, সেই করুণ মুহূর্তে মেরাজের ঘটনা ঘটেছিল। সাধারণ দৃষ্টিতে এমন ঘটনা প্রকাশ করা মোটেই যৌক্তিক ছিল না, কিন্তু তাঁর দায়িত্বে যা এসেছিল তিনি তা দৃঢ়তা, সৎসাহস ও নিষ্ঠার সাথে করে গিয়েছেন; তিনি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে বলেছেন, আমি নবী, আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ। তিনি কোথায় সত্য গোপন করেননি।

যাদের পাঠের স্কীল আছে ও উপযুক্ত সাহিত্যে প্রবেশাধিকার আছে (কথাগুলো তির্যার অর্থে নয়), তারা এই বিষয়ের গভীরে অনুসন্ধান চালাতে পারেন। দেখতে পারেন, আরবের বৈষম্য-প্রথা, দানাদানি-হানাহানি, গোত্র-বংশের আস্ফালনী-যুদ্ধ-বিগ্রহ, গোত্রীয় কবিদের যোগানো ইন্ধন আর এসবে মানবতার হাহাকার। এসবের পরিবর্তন ছিল দুষ্কর। এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ছিল একজন অনন্য বৈশিষ্ট্যের বিরল ব্যক্তিত্বের, আর মোহাম্মাদ ছিলেন সেই অনন্য পুরুষ, বিশ্ব মানবের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহ সঠিক পাত্রেই নবী নির্বাচন করেন।

একেবারে শেষ হল কথা এই: যাইনাবের (রা) সাথে নবীর (সা) বিয়ে নিয়ে যারা অপপ্রচার করেন তারা সুষম চিন্তা ও ঐতিহাসিক সামাজিক বিবেচনা তাড়িত নন, বরং বিদ্বেষ ও উগ্রতা-তাড়িত। কোন এক ব্যক্তি আস্তিক হোন অথবা নাস্তিক, তিনি মানবতার পক্ষের লোক হলে কোন অপপ্রচারে নিজেকে জড়াতে পারেন না। কারণ এসব কাজ মানুষে মানুষে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায়। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে মানুষ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। একশ্রেণীর লোক উগ্র ও সংকীর্ণ হয়: এটা প্রকৃতিরই অংশ, আস্তিক হলেও যেমন, নাস্তিক হলেও তেমন। এই উগ্র, সংকীর্ণ-মনা শ্রেণীকে নিয়ে আমাদের মানবতা কীভাবে শান্তি লাভ করবে –এটাই হচ্ছে এক বড় চিন্তা।

 

Publication date 25/01/2018

Archive date:25/01/2014

_________________________________________

দ্রষ্টব্য: এই বিষয়ের উপর মুনিম সিদ্দিকী সাহেবের একটি লেখা: “যায়নাব (রা.) কে নিয়ে সব রটনার প্রকৃত ঘটনা” রয়েছে। লেখাটিতে উপযুক্ত তথ্যসহ বিষদ আলোচনা হয়েছে। বিস্তারিত জানার জন্য এই লেখাটি পড়া যেতে পারে। আমার এই লেখাটি অন্য আঙ্গিকের।

৬ comments

Skip to comment form

  1. 3
    মজলুম

    চতুর্দিকের পার্সপেক্টিভ সুন্দর করে তুলে বিয়েটা ব্যখ্যা করেছেন, প্র‍ত্যেকটা এঙ্গেল আর সাইডটা দেখলেই বুঝা যায় রাসূল(সঃ) এর সব বিয়ে কেনো হয়েছিলো।  ইসলাম বিদ্বেষীদের কাজ হলো কিছু স্মোক স্ক্রিন সৃষ্টি করে বিভ্রান্ত করা। ওরিয়েন্টালিজমের ভিত্তির উপর দাড়ানো ইসলাম বিদ্বেষ সব সময় একই রকমের ছিলো। পোষ্টের জন্যে ধন্যবাদ

    1. 3.1
      এম_আহমদ

      ইসলাম বিদ্বেষীদের কাজ হলো কিছু স্মোক স্ক্রিন সৃষ্টি করে বিভ্রান্ত করা। ওরিয়েন্টালিজমের ভিত্তির উপর দাড়ানো ইসলাম বিদ্বেষ সব সময় একই রকমের ছিলো।

      মজলুম ভাই, সালাম। পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

      বাংলা ভাষায় ধর্ম সমালোচনার কোন সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়নি। যারা নাস্তিক হয়েছেন তারা এমনসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন যেগুলোর সাথে আদতে নাস্তিকতার কোন সম্পর্কই নেই, তাও আবার উত্তেজনা-সহকারে, অশালীন ও আক্রমণাত্মক ভাষায়।  ফলত, all parties talk past one another. বস্তুনিষ্ঠভাবে আলোচনা-সমালোচনার কোন অঙ্গন গড়ে উঠে নি যেখানে আস্তিক-নাস্তিক সবাই একে অন্যের অবস্থান বিবেচনা করতে পারেন। এখানে আলোচনার পজিশন হচ্ছে binary us/them. এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

  2. 2
    Kamal

    পালক পুত্রের প্রাক্তন বউকে বিয়ে করা এতই জরুরী হয়ে গেল? রুচিতে আটকাল না? ভালই।
    জয়নাব(আপনার ভাষায় যাইনাব) পালক পুত্রকে বিয়ে করতে চায় নি, তাকে জোর করিয়ে ধর্মীয়ভাবে ব্ল্যাকমেইল করে এই বিয়েতে রাজী করানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইসলামে মানব অনুভূতির কোন মূল্য নেই, কট্টরভাবে ধর্ম পালন করাটাই আসল। এটা জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা।

    সামাজিক অনাচার দূর করার স্বার্থে আপনাকে বাংলাদেশে এসে কাজের বুয়া বিয়ে করার আহ্ববান জানাচ্ছি(তা আপনার যত বয়সই হোক না কেন)।

     

    1. 2.1
      এম_আহমদ

      মনে হচ্ছে আপনার “রুচি” যেন কোন সার্বজনিন ও বৈশ্বিক রূপের বিষয় -আপনার রুচিতে যা ধরবে না তা’ই সকলের জন্য সমস্যার কিছু হবে। তবে আপনার “রুচি” যে পৌত্তলিক কোরেশের বৈষম্যে জর্জরিত দত্তক-প্রথার রুচি, সেটা বলার কায়দা থেকেই দেখা যাচ্ছে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও আপনি চান না পালিত-সন্তানের আপন পিতৃ-পরিচয় তার মানবিক অধিকারভুক্ত হোক। যদি চাইতেন, তবে দেখতে পেতেন সেই মহান পরিবর্তনটি যাইদকে (রা) তাঁর আপন পিতৃ-পরিচিতিতে সাম্যের স্থানে এনেছে, এবং তখন মুহাম্মদের (সা) নামে পিতৃ-পরিচয় তিরোহিত হয়েছে। অধিকন্তু যাইনাবও (রা) যাইদকে বিয়ে করার কারণে মুহাম্মদকে, অথবা প্রাক্তন প্রথার taboo-সম্পর্কের কাউকে, বিয়ের করার অধিকার বঞ্চিত হন না। এখানে কেন taboo সৃষ্টি হবে এবং কে করবে –এই অধিকার কার? আপনার? পূর্ব প্রথার taboo যদি থেকেই গেল, তবে পরিবর্তন হল কোথায়?

      আপনার রুচির কথাটি হয়ত এভাবে আনতে পারতেন যে হয়ত মুহাম্মদেরও (সা) রুচিতে এই বিয়েটি বেঁধে থাকতে পারে, তিনিও সকলের মত মানুষ ছিলেন। এতে আপনার কথা গ্রহণীয়তার সীমায় থাকত। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে সমাজ ও প্রথা  পরিবর্তন হেয়ালি-ভাবাপন্ন লোকের কাজ হয় না। এমন কাজে অনেক রুচিকে ভাঙ্গতে হয়, অরুচিকে গ্রহণ করতে হয়। সমাজ পরিবর্তনের ধারায় এগুলো প্রায়ই হয়।

      যাইনাব (রা) কোরানের বাণীর প্রেক্ষিতেই তার “সম্মতি” দিয়ে যাইদকে (রা) বিয়ে করেছিলেন।  এখানে আপনার ‘ব্লাকমেইল’ কথাটি ‘অসঙ্গত’ ও ‘অশুদ্ধ’। কোরানের বাণীতে সাড়া দিয়ে মুমিন/মুসলমানরা অনেক বৃহত্তর ত্যাগ স্বীকার করেন –এগুলো ব্ল্যাকমেইল হয় না। আপনার কথা থেকে বুঝা যাচ্ছে আপনি যে অঙ্গনের লোক সেই অঙ্গন থেকেই আসছে আপনার ‘রুচি’, ‘ব্ল্যাকমেইল’, ‘কট্টরধর্ম’, ‘জবরদস্তি’। এসব বিষয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই, কেননা কিয়ামত পর্যন্ত তর্ক করলেও শেষ হবে না। আর এখন এমন কাজে নষ্ট করার মত সময় নেই, ইচ্ছেও নেই।

      মুহাম্মদ (সা) তাঁর সময়ে তাঁর কাজ করে গেছেন। সামাজিক বিভেদ-বৈষম্য দূর করা সকলের কাজ। আপনি কি কোন “বুয়া” বিয়ে করেছেন?  আপনার কাজ আপনি করতে পারেন, কিন্তু সাধারণভাবে বুয়াদের দায়িত্ব নিয়ে তাদেরকে বিয়ে করার জন্য বার্ধক্য-বয়সের সকল মানুষকে আহবান করার দায়িত্ব কিভাবে আসে? আমরা বাংলাদেশে উলটোটা দেখি। কোনো বিদেশি বৃদ্ধ দেশে গিয়ে বিয়ে করতে চাইলে মুন্ডা শ্রেণীর অতি-সভ্য ageists-গণ (those who discriminate on the basis of age) ওদেরকে প্রিটেক্সট করে ইসলাম আক্রমণ করে। এই লোকেরা কিন্তু গরীব-বুয়া শ্রেণীতেই বিয়ে করতে যায়।

       

  3. 1
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    "ইসলাম বিদ্বেষী কিছু নিন্দুক যারা নিজেদেরকে প্রথার মোকাবেলায় মুক্তচিন্তক ভাবেন, তারা যখন আরবের প্রাচীন বৈষম্যপূর্ণ পৌত্তলিক প্রথার সমর্থনে যাইনবের বিয়ে নিয়ে নবীর বিরূপ সমালোচনা করেন তখন তাদের অবস্থানগত স্ববিরোধ প্রকাশ পায়।"

    >>সুন্দর বলেছেন।

    "যে কেউই তার নিজেকে মুহাম্মদের (সা) স্থানে দাঁড় করিয়ে বুঝতে পারেন লোকভয় কত কঠোর হতে পারে।"

    >> মহা মুল্যবান অনুভূতির কথা।

    "পরিখার যুদ্ধে মল্ল-আহবান আসলে তিনি সেই জীবন-মৃত্যুর মোকাবেলায় তাঁর আপন চাচা হামজা (রা) ও চাচাত ভাই, এবং জামাই, আলীকে (রা) দাঁড় করিয়েছেন। নেতৃত্ব এভাবেই হয়।"

    >> সুন্দর দৃষ্টান্ত।  
    যুদ্ধটি ছিল বদরের, পরিখার যুদ্ধ নয়।(আমি ভুল হতে পারি)

    "আল্লাহ সঠিক পাত্রেই নবী নির্বাচন করেন।"

    >> ইহা সত্য, মহাসত্য।

    আহমেদ ভাই,

    আসসালামু আলাইকুম।
    Excellent. গভীর বিশ্লেষণী লিখা। অনেক ধন্যবাদ লিখাটি উপহার দেওয়ার জন্য। এই বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজন আমায় জিজ্ঞেস করেছেন, আপনার এই লিখাটি প্রিন্ট করে দিয়ে দিব। আমার কাজটি সহজ করে দিলেন। আল্লাহ্‌ আপনাকে উত্তম প্রতিদান করুন।
    ভাল থাকুন, ভাই।

    1. 1.1
      এম_আহমদ

      সালাম তাজুল ভাই। হ্যাঁ, ওটা বদর যুদ্ধ হবে, কেননা পরিখায় প্রকৃত অর্থে কোন যুদ্ধই সংঘটিত হয় নি। ভুলটি দৃষ্টিগোচর করার জন্য ধন্যবাদ। এটি পরিবর্তন করে দিয়েছি। পাঠ ও মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।  ওয়াসসালাম।

Comments have been disabled.