«

»

Oct ০৩

মুক্তচিন্তক -না প্রভাবিত?

মুক্তমনাদের ধারণা যে তারা স্বাধীন চিন্তার লোক, শাব্দিক অর্থে যেমন তেমনই: মুক্তমনা। এই  অস্তিত্বের ধারায় তাদের স্বাধীন চিন্তা ও বিবেচনাবোধই মূল সম্বল।  তাদের ধারণা যে সৃষ্টির দিক থেকে এখানে ধর্মীয় চিন্তার কোন স্থান নেই, কেননা আমরা বিগব্যাং (Big Bang) থেকে ধরলে মূলত Cause and Effect এর বিষয় প্রধান পাই। অর্থাৎ এক বা একাধিক বস্তু (বা বস্তুতান্ত্রিক নিয়ম পদ্ধতি) আরও এক বা একাধিক বস্তুকে প্রভাবিত করে গড়ে তুলছে, না হয় চুরমার করছে। এখানে ধর্মীয় ধারণার কিছু নেই -ধর্মীয় ধারণা, অতি সংক্ষেপে, পূর্ববর্তীতায় প্রভাবিত -'অবৈজ্ঞানিক' তো বটে।

ঠিক আছে, আমরা ধর্মীয় ধারণা বাদ দিয়ে মুক্তচিন্তার স্থানটি দেখি।

হ্যাঁ, যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে যখন দেখানো হয় এই জগত, ক্রমধারায়, একটা বস্তুর বা বস্তুর কার্যকারণের প্রভাবে (effect) অন্য আরেকটি বস্তু প্রভাবিত হয়ে অস্তিত্বে আসছে, বা তার অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখছে, তখন আমরা এই কোজেল থিওরিতে কী পাই? আমরা কী অস্তিত্বের ধারায় “স্বাধীন” মর্মের কিছু পাই, না “প্রভাবিত”, পরাধীন মর্মের? এই ধারণাটি কী মুক্তচিন্তার অবকাশকে তুলে আনে, না পারস্পারিক প্রভাবিত চিন্তাধারার?

আমরা বিষয়টি বর্ধিত করলে দেখতে পাই যে আমাদের এই পৃথিবীটি অন্যান্য গ্রহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আছে। আমরা সূর্য ও চন্দ্রের কথা প্রথমে চিন্তা করতে পারি। আমাদের এই পরিবেশটিও সেভাবে। এখানে কোন কিছুই স্বাধীন “পছন্দিতার” ভিত্তিতে আসছে না, বরং ইচ্ছা বা পছন্দিতার বাইরে থেকে।  মানুষ হিসেবেও আমরা কেউ এখানে নিজ ইচ্ছায় অস্তিত্বশীল হই নি। আমাদের নিউরোলজিক্যাল ডেভেলপম্যান্ট মাতৃগর্ভে যখন শুরু হয়, তখন আমাদের ‘ইন্টেলিজেন্স’কেমন হবে -এমন বিবেচনা করার কোন স্বাধীনতা বা পছন্দিতাও  থাকেনি। যে পরিবারে আমাদের জন্ম, যেখানে আমাদের মানসিক কালচার রূপায়িত হয়েছে, এবং অনেকটা ডিটারমিনড ও প্রভাবিত হয়েছে, সেখানে কী এমন কোনো পছন্দিতা ছিল?

কোন এক ব্যক্তি যখন নিজেকে মুক্তচিন্তক/মুক্তমনা বলেন, তখন এর অর্থটা কী দাঁড়ায়? তিনি কী অন্যদের চিন্তায় প্রভাবিত নন, অন্যদের লিখা বইপুস্তকের  প্রভাব-প্রতিফলন থেকে মুক্ত?  যদি না হয়, তাহলে তিনিও প্রভাবিত, তিনিও স্বাধীন ধারার পরিবর্তে অন্যান্যদের দেখা ও দর্শন-ধারায় চালিত। এখানে মুক্তচিন্তক কথাটি খুব একটা শুদ্ধ বলে মনে হয় না।  আমাদের এই মানব জাতি ছোট-বড় গোষ্ঠীতে পারস্পারিক প্রভাব ধারায় চালিত।  কেউ হয়ত বলতে পারেন মানুষের চিন্তাগুলো ক্রমধারায় “বিবর্তিত”।  কিন্তু এতে “মুক্ত” বা “স্বাধীন” এর তাৎপর্য পাওয়া যায় না। বরং মায়ের পেট থেকে এখন পর্যন্ত “প্রভাবের” গল্পই প্রবলভাবে কার্যকর দেখা যায়।

যে বস্তুটি প্রভাব ধারায় অস্তিত্বশীল সেটি স্বাধীনভাবে আসে নি।  ‘স্বাধীনতা’ ও ‘প্রভাব’ পারস্পারিকভাবে অসামঞ্জস্যশীল (incompatible)। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, এক ব্যক্তি “মুক্তমনা” বললেই পারিপার্শ্বিক ও ঐতিহাসিক সকল প্রভাব-ধারা থেকে মুক্ত বিবেচিত হয়ে যান না। ধার্মিকগণ যেভাবে প্রভাবিত তারাও সেভাবে। এখানে মুক্ত-ধারণা মুখের উচ্চারণ মাত্র।

আমরা এই অস্তিত্বে শুধু যে প্রভাবিত তা’ই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে যেখানে আপাতত স্বাধীনতা প্রয়োগ করার বিষয় রয়েছে সেখানেও, স্বাধীনতা প্রকাশের জন্য, প্রভাব ধারার পূর্ব উপকরণ থাকতে হয়। আপনার একটি জটিল রোগ হয়েছে এবং আপনার অনেক টাকা।  আপনার চিকিৎসা করার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা আছে, কিন্তু পূর্ববর্তী প্রসেস ধারায় যদি উপযুক্ত এনালিটিক্যাল যন্ত্রের আবিষ্কার না হয়ে থাকে এবং উপযুক্ত ঔষধ না থাকে, তাহলে সেই স্বাধীনতার মূল্য নেই।

সবদিক থেকে বিবেচনা করলে অষ্টাদশ শতাব্দীতে “মুক্তচিন্তা” নামে যে শব্দটি এসেছিল সেটি এখন সেকেলে।

Publication date: Feb ৬, ২০১৮

Archive date: 03/10/2017

________________

অন্যান্য লেখা:

(1) মুক্তমনা ও নাস্তিক মিলিট্যান্সি

(2) কলমের ভাঁওতাবাজিতে সামাজিক বিপর্যয়

(3) ক্রুসেডের যুদ্ধ

(4) নব্য-ক্রুসেডের অন্তরালে নাস্তিক মিলিটেন্সি

(5) আপনি কি সত্যিই শান্তি চান ও নিজেকে বিজ্ঞানমনষ্ক ভাবেন?

(6) পার্থক্যের অস্তিত্বে মানুষ ও বিশ্বাস -১ম পর্ব

(7) ঐশী বাণী: বিশ্বাস অবিশ্বাস ও নাস্তিকতা (২য় পর্ব)

১ comment

  1. 1
    এম_আহমদ

    এই লেখায় যেকয়টি  কথা বলেছি তা আমার অন্যান্য লেখায় আরও বিশদভাবে, অন্যরূপে, এসেছে।  এখন বসে বসে পূর্ব চিন্তার একটি অংশকে ছোট্ট আকারে ভিন্ন রূপ দিয়েছি, যাতে করে নতুন একটি পাঠ্য আসে -এতটুকুই।

Comments have been disabled.