«

»

Feb ০৭

আলো-আঁধারের খেলা

২৫ অক্টোবর ২০১০। আজ সকালে এক বন্ধু আমাকে টেলিফোন করে বললেন টোনি ব্লেয়ারের শ্যালিকা লোরেন বোথ (Lauren Booth) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আমি বললাম আমার নিজের চোখে না দেখলে, আর নিজ কানে না শুনলে, আমার পক্ষে তা মানা সম্ভব নয়, (কেননা অনেক মিথ্যা কথা অনেক সময় রটানো হয়)। শেষে এর সত্যতা অবশ্য যাচাই করেছি। তার দুই ঘণ্টা পর, মটরওয়েতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ টেলিফোনের সেই আলোচনাটি মনে পড়ল। সাথে সাথে কোরানের আয়াতটিও:  إِنَّكَ لاَ تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَآءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِٱلْمُهْتَدِينَ "আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে (চাইলেই) হেদায়েত দিতে পারবেন না। একমাত্র আল্লাহ চাইলেই যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দিতে পারেন। তিঁনিই হেদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে সম্যক অবগত।" ঈমান আত্মার জগতে এক ধরনের ‘রিজক’। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে সেই রিজক দান করেন -এতে অন্য কারো যুক্তি-টুক্তি নেই।

আমার এই সামান্য জীবনে অনেক লোককে ‘বিপথগামী’ হতে দেখেছি, আবার অনেককে ‘হেদায়াতপ্রাপ্ত’ হতেও দেখেছি। হেদায়াত ও বিপথগামীতা মনের জগতের ব্যাপার; আধ্যাত্মিক জগতের ব্যাপার (যদিও এর বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে ঘটে থাকে)। এখানে প্রায়তই যুক্তি অক্ষম, জাগতিক প্যাঁচ-প্যুঁচ অক্ষম। এখানে মনের দিগন্তে কোথায় গিয়ে কার জন্য হঠাৎ কী যে খুলে যায়, তা বলা মুস্কিল। কা’বা যদিও একটি কিন্তু তার প্রবেশ পথ অনেক। ধর্মের অনেক গিট হাজার চেষ্টার পরও হয়ত নির্মুক্তই থেকে যেতে পারে। আবার হঠাৎ কোন অসম্ভাবনীয় স্থানে, অন্য কিছু পাঠ করতে গিয়ে বা ঘটতে দেখে তারই আলোকে কিছু অনুভূতি লাভ করা যেতে পারে যার আলোকবর্তিকা সেই নির্গূঢ় গিটটি খুলে দিতে পারে। এমন কত কিছু নিজের জীবনে দেখেছি। কখনো দর্শনের মার-প্যাঁচে কোলাকোলি করতে গিয়ে ধর্মের অনেক প্যাঁচ খুলতে অনুভব করেছি। কখনো প্রাচীন কালের ইতিহাস পড়তে গিয়ে, কখনো অন্য ধর্মের বই-পুস্তক পড়তে গিয়ে, কখনো নিরলে নিভৃতে, চিন্তায়, অনেক ধরনের সমাধান দেখেছি। আবার কখনও পথ চলাতে, নিজের অজান্তে, চিন্তার আলোর প্রক্ষেপণ কোথায়ও গিয়ে পড়েছে, আর তারই সূত্রধারায় জটিল কোন অনুভূতি সামনে এসে হাজির হয়েছে; আর সাথে সাথে তার সমাধানও।

যাদের জন্য সে দুয়ার খোলা হয়নি, তাদের অনেককে দেখা যায় সামান্য জিনিস নিয়ে প্যাঁচা-প্যাঁচি করছেন, তাদের ভিতরের জ্বালা প্রকাশ করছেন। কখনো মনে হয় তারা মূলত বিশ্বাসী, কিন্তু কারণ বশত: বিশ্বাস করতে না পারায়, জ্বালা প্রকাশ করছেন। আবার এসবের কোন কিছুই যুক্তিতে আলোচনা করার মত নয়। তবে আমরা কখনো (নিজেদের/মানব জাতীয়) স্বার্থকেন্দ্রিক যুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে ‘অস্তিত্বের’ বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারলে, কিছু কিছু গিট খোলার সম্ভাবনা আসে। কিন্তু উলটো স্বার্থের যুক্তি আসলে, সে সম্ভাবনা থাকে না। অর্থাৎ আল্লাহ আমাকে ও আমার পরিবারকে বিপদমুক্ত করে বাঁচিয়ে রাখলে আমার ‘বিশ্বাস’ আছে, আর না রাখলে, তিনি আবার কীসের মহান? অথবা তিঁনি যদি ভূমিকম্প ও সুনামির মোকাবেলায় ‘আমাদের’ হাজার হাজার মানুষকে না বাঁচান, তবে তিঁনি আছেন কেমনে? তিঁনি কীসের করুণাময়ী? এখানে ‘আমি’ ও ‘আমরা’ বাঁচলেই বিশ্বাস আর না বাঁচলে নাই –এই হচ্ছে মূল কথা, মূল যুক্তি (?)। কখনো দেখা যাবে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে (সব গ্রন্থের কথা বলছি), কটর মটর, তেনা-প্যাঁচানোতে অনেকেই আটকা পড়ে আছেন। অথচ তেনা-প্যাঁচানোর পদ্ধতিগত স্বরূপ থেকে বুঝা যাবে ধর্মগ্রন্থের ভাষার প্রকৃতি বুঝার যে আলোকবর্তিকা বা যে নির্দেশনার প্রয়োজন তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেখানে দেখা যাবে ধর্মগ্রন্থই তাদের জন্য ‘ফিৎনা’হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জটিলতা দৃষ্টে মুসা নবী (আঃ) বলেছিলেন, ‘এ সবই তোমার (প্রক্ষেপিত) ‘ফিৎনা’ (পরীক্ষা)। এ দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে পথ ভ্রষ্ট করো। আর যাকে ইচ্ছা সরল পথ দেখাও। তুমি আমাদের রক্ষক; আমাদেরকে ক্ষমা করো আমাদের উপর করুণা বর্ষণ করো। তুমি সর্বাধিক ক্ষমাশীল (৭:১৫৫)।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহ ‘আমাদের টার্মে' ও 'আমাদের সৃষ্ট যুক্তিতে' ধরা দিলে তাকে মানা হবে, আর না দিলে নাই -এমন মনোভঙ্গি নিয়ে তাকে বুঝা মুস্কিল। বরং এই মনোভঙ্গিকে surrender করে 'ঈমান' দিয়েই তাকে ধরতে হয়। আর এক অর্থে এই surrendering-ই হচ্ছে ইসলাম।

কোরানের কোনো বিষয় এমন যে তা প্রতিপক্ষের বিপথগামীতার পথকে প্রশস্ত করতে পারে। ‘আল্লাহ অনেককে এ দিয়ে বিপথগামী করেন, এবং অনেককে সরল/সঠিক পথও প্রদর্শন করেন’ (২:২৬)। আল-কোশাইরীর (মৃঃ ৪৬৫ হিঃ) মতে এই পুস্তক এক সম্প্রদায়ের জন্য (আত্মার) নিরাময় ও প্রশান্তি এবং আরেক সম্প্রদায়ের জন্য (আত্মার) ফিৎনা ও অভিযোগ। এখানে পথভ্রষ্টদের ব্যাপারে ইবন আরাবীর (মৃঃ ৬৩৮হিঃ) মত এই যে তারা ক্বালবের মাক্বাম থেকে বেরিয়ে নফসের মাক্বামে উপনীত হয়েছেন; তারা আত্ম-বৈষয়িক ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট।

লরেন বোথের জন্য দোয়া করি। এ পথে অনেক জটিলতা আছে। এগুলো অতিক্রম করতে হয়। তবে এখানে যারা মুক্ত প্রাণ নিয়ে আসেন ( إذ جاء ربه بقلب سيلم) আল্লাহ তাদের দুর্গম দ্বার অপ্রত্যাশিতভাবে  সুগম করে দেন। ‘وَٱلَّذِينَ جَاهَدُواْ فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلْمُحْسِنِينَ ‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ দেখিয়ে দেই। (যারা ভাল নিয়তে) সৎকাজ করেন আল্লাহ তাদের সাথেই থাকেন’ (২৯:৬৯)। এখানে ‘সাধনায় আত্মনিয়োগ’ বলতে ‘জিহাদ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ইবন আরবী এটাকে আত্ম-পথের যাত্রা হিসেবে উল্লেখ করেন।

আল্লাহর এ পথটি কেবল তিঁনি ছাড়া আর কেউ দেখাতে পারেন না, কোন নবী রাসূলগণও নন। আল্লাহ বলেন: 

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَـٰكِنَّ اللَّـهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ  [28:56]

"আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে (চাইলেই) হেদায়েত দিতে পারবেন না। একমাত্র আল্লাহ চাইলেই যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দিতে পারেন। তিঁনিই হেদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে সম্যক অবগত।"

এবারে একটি ভিডিও দেখতে পারেন।

rel=”nofollow”>Loren Booth speaks about her journey in Islam

৭ comments

Skip to comment form

  1. 5
    সত্য সন্ধানী

    আসসালামু আলাইকুম ভাই, প্রথম বারের মত আপনার এই পুরাতন লেখাটি দেখলাম আর পড়লাম। খুব ভাল লেগেছে। সাথে নতুন খবর জানলাম লরেন বুথের ইসলাম গ্রহনের খবর! (আমি বিদেশের খবর তেমন একটা রাখি না)! ধন্যবাদ আপনাকে!

    সেই সাথে ঈদ মোবারক!

  2. 4
    শামস

    তবে আমরা কখনো (নিজেদের/মানব জাতীয়) স্বার্থকেন্দ্রিক যুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে ‘অস্তিত্বের’ বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারলে, কিছু কিছু গিট খোলার সম্ভাবনা আসে। কিন্তু উলটো স্বার্থের যুক্তি আসলে, সে সম্ভাবনা থাকে না। অর্থাৎ আল্লাহ আমাকে ও আমার পরিবারকে বিপদমুক্ত করে বাঁচিয়ে রাখলে আমার ‘বিশ্বাস’ আছে, আর না রাখলে, তিনি আবার কীসের মহান? অথবা তিঁনি যদি ভূমিকম্প ও সুনামির মোকাবেলায় ‘আমাদের’ হাজার হাজার মানুষকে না বাঁচান, তবে তিঁনি আছেন কেমনে? তিঁনি কীসের করুণাময়ী? এখানে ‘আমি’ ও ‘আমরা’ বাঁচলেই বিশ্বাস আর না বাঁচলে নাই –এই হচ্ছে মূল কথা, মূল যুক্তি (?)। কখনো দেখা যাবে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে (সব-গ্রন্থের কথা বলছি), কটর মটর, তেনা-প্যাঁচানোতে অনেকেই আটকা পড়ে আছেন। অথচ তেনা-প্যাঁচানোর পদ্ধতিগত স্বরূপ থেকে বুঝা যাবে ধর্মগ্রন্থের ভাষার প্রকৃতি বুঝার যে আলোকবর্তিকা বা যে নির্দেশনার প্রয়োজন তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

    খুব সুন্দর বলেছেন।

  3. 3
    মুনিম সিদ্দিকী

    আপনার ভাষা আপনার বোধ আপনার যুক্তি অবাক করার মত! দোয়া করি এই ভাবে যেন মানুষের চেতনা বিকাশের চেষ্টা চালিয়ে যান। ধন্যবাদ।

    1. 3.1
      এম_আহমদ

      ভাই প্রশংসা নয়, বেশী বেশী দোয়াই চাই। পড়ার ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  4. 2
    আবদুস সামাদ

     আপনার লেখা পড়ে ভাল লাগল। যে যে পথে চলতে চায় আল্লাহ তার সেই পথকে সুগম করে দেন। তাই যে হেদায়েত চায় তাকেই হেদায়েত করেন। আরও লিখুন। ধন্যবাদ।

    1. 2.1
      এম_আহমদ

      ধন্যবাদ, চেষ্টা করব, দোয়া করবেন।

  5. 1
    এম_আহমদ

    লেখাটি ২৬ অক্টোবর ২০১০, আমুতে ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.