«

»

Feb ১৯ ২০১২

গুরুমুখী প্রথায় হাদিস শাস্ত্র: সংগ্রহ ও চর্চা

ভূমিকা

সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে যখন নবী মুহাম্মদ (সা.) এঁর প্রতি ওহী নাজিল হয় তখন মক্কা ও পার্শবর্তী এলাকাগুলোতে প্রধানত লেখা-পড়া না জানা এক জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তবে লেখা পড়া একেবারে ছিল না এমনটিও নয়। আবার লেখা-পড়া সভ্যতার মাত্রা নির্ণয়ের একমাত্র নির্দেশকও নয়। সভ্যতা ধরে রাখার অন্য প্রথা বা মাধ্যম থাকতে পারে। সেই মাধ্যমেই তাদের ঐতিহ্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য ধারিত হতে পারে।  লেখাপড়ার সংস্কৃতি না থাকলে সেখানে স্মৃতির ফলক হতে পারে সেই সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি ব্যবস্থা। এভাবে আরবরা নিকট ও দূরের অতীতকে স্মৃতির ফলকেই ধারণ  করত। অতীত যখন অতি দূরে পদার্পণ করত, যখন কিছু তথ্য প্রয়োজন হারাত, তখন সংক্ষিপ্তাকারে সেইসব তথ্য রূপকতায় চলে যেত। হাজার হাজার বছরের অনেক রূপক কাহিনী রূপকীয় শিক্ষায় জ্ঞানের প্রয়োজন মেটাত। আমরা যখন আদমের কাহিনী পড়ি, তখন ভুলে যাই যে এই কাহিনী স্থান ও কালকে অতিক্রম করছে। এটা এক সুদূর অতীতকে স্মরণ করছে, এটাতে কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই, নির্দিষ্ট কাল নেই। আছে শুধু শিক্ষা, শুধু দূর অতীতের স্মৃতি। আছে ধ্যান ও চিন্তার উপকরণ। এটাই ‘মৌখিক সভ্যতার’ নিদর্শন, তার শক্তিশালী দিক। মৌখিক সভ্যতায় শো/দুই শো বছর তেমন কিছু নয়। তবে তা নির্ভর করে তথ্যের গুরুত্বের উপর।

ইসলাম নাজিলের যুগে আরব সমাজ লিখিত সভ্যতার প্রয়োজন ভিন্নভাবে অনুভব করে। তাদের মধ্যে লিখা-পড়া আগ্রহ সৃষ্টি হলেও সমাজ তখনো মুখস্থের উপর অভ্যস্ত ছিল, এরই উপর নির্ভরশীল ছিল। আমাদের অবস্থা বিবেচনা করুন। আমরা যারা লিখা-পড়ার যুগে বড় হয়েছি, তাদের কেউ কেউ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তথ্য সংরক্ষণে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, ক্ষেত্র বিশেষে শান্তিও পাইনা। ইমেইল, ইউজার নাম্বার, পাসওয়ার্ড ইত্যাদিতে আটকা পড়ে যাই। পুরাতন খাতা না হলে কাহিল হয়ে পড়ি। এভাবে মৌখিক সভ্যতা উত্তরণের ক্রান্তি লগ্নে ইসলাম ধর্ম শুরু হলেও তার অনুসারীরা পূর্ববর্তী ধর্মের মত মুখস্থতেই স্বস্তি পেত। সেই কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত, এই দেড় হাজার বৎসর সমাজ-সভ্যতার নিরিখে তেমন বিরাট কোন কাল নয়। আর আজও যে মৌখিকতা একদম নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে তাও বলা যাবে না।

আমার এই প্রবন্ধে হাদীস শাস্ত্রের সূচনা লগ্নে হাদিসের হেফাজত, শিক্ষা ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে মৌখিক প্রথা যে ভূমিকা রেখেছিল তা নিয়ে কিছু আলোচনা করব। প্রথমেই বলব, মৌখিকতা ইসলামের তাথ্যিক শক্তি সমৃদ্ধ করেছে। তথ্য সংরক্ষণে এই প্রথা সুদৃঢ় ভূমিকা পালন করেছিল। এই দৃষ্টান্ত অন্যান্য সভ্যতায় হারিয়ে গেলেও ইসলামে এখনো অনেকটা সমুজ্জ্বল আছে।

এই প্রবন্ধে যে নিচের কয়টি আলোচিত হবে:       

* হাদিস মুখস্থকরণ, শিক্ষা ও প্রচার
* মৌখিক তথ্যের সংস্কৃতি
* সরকারী উদ্যোগে হাদিস সংগ্রহ
* ওরিয়ান্টেলিষ্টদের মিথ্যাচার
* কোরান অনলি

আগেই বলে রাখি যে লেখাটি একটু বড় আকারের হবে। দুই বা তিন পর্বে বিভক্ত করলে হয়ত ভাল হত। কিন্তু ভাগাভাগিতে রেফারেন্সিং এর ক্ষেত্রে এবং পরে ব্লগের লিঙ্ক অন্যদেরে পাঠাতে বাড়তি সমস্যা আসে। তাই একত্রেই প্রকাশ করলাম। যেহেতু লেখাটি এই ব্লগে অনেক দিন থাকবে, ইনশাল্লাহ, তাই গোটাটা এক সাথে পড়ার দরকার নেই। সামান্য সামান্য করে পড়লেই হয়। আমি এতে বিরতির ব্যবস্থাও রেখেছি।

হাদিস মুখস্থকরণ, শিক্ষা ও প্রচার

ইসলাম ধর্মে কোরান, হাদিস হচ্ছে দুটি মৌলিক উৎস। প্রথম উৎস দ্বিতীয় উৎসের উপর বেশী নির্ভরশীল।  রাসূল (রা.) ব্যতীত কোরান নিরর্থক, এই অর্থে বলছি যে রাসূলের উপর কোরান নাজিল হয়েছিল, তাঁর অন্তরাত্মায় ওহীর দৃশ্য ও রূপ ফুটে উঠেছিল, তাঁর কাছেই জিবরাঈল এসেছিলেন; বাস্তব ক্ষেত্রে কোরানের অর্থ কী হয় তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, দেখিয়ে দিয়েছিলেন, কর্মের মাধ্যমে রূপায়িত করেছিলেন। এর ফলেই সেই অদেখা, অদৃশ্য খোদার বাণী মানবিক অর্থে আমাদের কাছে ‘অর্থায়িত’ হতে পেরেছে। অন্যতায় যে সত্তা যেমন তার অস্তিত্ব তেমন, তার সৃষ্টি তেমন, তার বাণীও তেমন –এগুলো কিছুই মানবিক অর্থ লাভ করত না, বুঝা যেত না, বুঝার কোন উপায়ও থাকত না। মানব-রাসূল তা বুঝিয়েছেন, মানবিক অর্থের জগতে। তিনি সেই অর্থ বুঝের জগতে নিয়ে এসেছেন, ব্যাখ্যার স্থান দেখিয়েছেন। সাহাবিগণ সেই ধারায় সেই অদেখা খোদার বাণীকে বুঝতে পেরেছেন এবং রাসূলের (রা.) শিক্ষার আলোকে কোরানকে ব্যাখ্যা করেছেন। এটাই হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যের এক বড় দিক।

আরব উপসাগরীয় জাতিতে মানব ও খোদার সম্পর্ক জুড়েছে ‘ওহী’ যা শেষে রূপ লাভ করেছে লিখিত ‘কিতাবে’। কিতাবের মূল অর্থ বই নয় বরং প্রাপ্ত বাণীর একত্রীকরণ (compilation in memory)। এগুলো প্রথমত মুখস্থ করা হত। তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল মুখস্থ বিদ্যা ছিল (আল-কাওয়ার, ২০০২:১৪)।

[সেকালের বড় বড় কবিরাও মুখস্থ সংস্কৃতির লোক ছিলেন, তারা বড় আকারে মুখস্থ বিদ্যার অধিকারী ছিলেন। সেদিনের কবিতা সংগ্রহকারীর অন্য নাম ছিল ‘ক্বারী’, (‘ক্বারা’ শব্দের অর্থও হয় ‘জামাআ’, একত্রীকরণ)। নবীকে যখন বলা হয়েছিল, ‘পড়ুন’ (ক্বিরাত শুরু করুন)’, তিনি বলেছিলেন ‘আমি তো ক্বারী নই’ (আমি কিছু সংগ্রহ করি নি, আমার স্টোকে কিছুই নেই)]।

সুতরাং ঐশী বাণীর প্রথাটাই ছিল মুখস্থ ভিত্তিক।  এই মুখস্থকরণই ছিল তথ্য সংরক্ষণের এক শক্তিশালী ব্যবস্থা। পরে ধীরে ধীরে (symbolic method of written communication) শব্দ ও বাক্য একত্রীকরণের মাধ্যমে তা হয়েছে লিখিত সভ্যতার কিতাব। কিন্তু আজও সেই প্রথা মুসমাওন্দের মধ্যে বেঁচে আছে।

সভ্যতা ধরে রাখতে যেসব মৌলিক উপাদান জরুরি ছিল তা ছিল গুরুমুখী শিক্ষার সংস্কৃতি। যুগের পর যুগ ধরে সেই অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা বংশ পরম্পরায় ও গুরু-শিষ্য পরম্পরায় কালান্তরিত হত। আজও পাক-ভারতীয় সংগীতে ‘গুরুমুখী’ প্রথা প্রচলিত। এখানে বিদ্যাকে কালান্তরিত করার এক প্রাচুর্যপূর্ণ সংস্কৃতি রয়েছে। এখানে কোন নালায়েক যদি সংগীত বিদ্যার শুরুমুখী প্রকৃতি, তার ধারাবাহিকতা, তার সংস্কৃতি  না বুঝে বর্তমানের কোন গুরুকে প্রশ্ন করে যে ‘আপনার চতুর্থ বা পঞ্চম গুরু থেকে যা বলছেন, তা শুদ্ধ আমি মনে করি না, কেননা আপনি ও আপনার গুরুর মধ্যে ৮০ বৎসরের ফাঁক, এর ভিতরে কিছু লিখিত নেই, গুরুও কিছু লিখে যাননি’। এমন বক্তব্যের উত্তরে তিনি হয়ত বলতে পারেন, ‘তুমি কি মনে কর কী না তা দিয়ে আমি কি করব, তুমি কে রে বাপ?’ এমনিভাবে, হাদিস শাস্ত্রের ব্যাপারে কিছু অনেক ‘কেউ-কেটাদেরকে’ অনুরূপ প্রশ্ন করতে দেখা যায়।

ইসলাম ধর্মে হাদিসের সংকলন, তার শাস্ত্রীয় রূপ: তার রিজাল বিদ্যা (علم أسماء الرجال),তার মতন (علم المتن),উসূলী জ্ঞান ইত্যাদি বিদ্যার জগতে  এবং বিশেষ করে মানব সভ্যতায় যে মাত্রার সংযোজন করেছে তার জুড়ি মেলা ভার। এই শাস্ত্রের পণ্ডিতবর্গ রেয়াতের সত্য-মিথ্যা, সম্ভাব্য-অসম্ভাব্যতা, বর্ণনারগুণাগুন, বর্ণনার অবস্থান, বর্ণনার আংশিকতা ইত্যাদি নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে যেসব কাজ করেছেন এবং যে মাত্রাসমূহ সামনে রেখে পাঠের অর্থ নির্ধারণের (textual analysis)নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন -তা নিঃসন্দেহে এই বিদ্যায় এক বিস্ময়।

বই পুস্তক পড়েই পণ্ডিত হতে হয় বটে, কিন্তু কিছু কিছু বিদ্যায় যেখানে গুরুমুখী প্রকৃতি ও সংস্কৃতির রূপায়ন হয়েছে সেখানে গুরুর সাহচর্য ব্যতীত অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিকতার সাহায্য ব্যতীত অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। সংগীতে কিছুদিন হারমোনিয়াম চর্চা ও পরে স্বরলিপি দেখে পণ্ডিত হওয়া দূরের কথা, মামুলী গায়কও হওয়াও দুষ্কর হতে পারে। 

কিতাবি জ্ঞানের মোকাবেলায় গুরুমুখী জ্ঞানের একটি শক্তিশালী ও মাধুর্যপূর্ণ দিক রয়েছে। একটি বর্ণনা শুধু যে এক স্মৃতির ফলক থেকে অন্য ফলকে ট্রানজিট করে তা নয়, বরং বর্ণনাগুলো অন্যান্য বর্ণনার আলোকে ব্যাখ্যা লাভ করে,  বিদ্যার পরিমণ্ডলে এক ধরনের বাছিরাত (بصيرة অন্তর্দৃষ্টি) সৃষ্টি করে। ব্যাখ্যায় নানান মাত্রার সংযোগ করে। এদিক থেকে এই বিদ্যা, কিতাবি বিদ্যার চেয়ে মোটেই কম নয়, বরং শিক্ষার এক উন্নত মাধ্যম।

BREAK TIME. [আমরা এখানে সামান্য বিরতি নিতে পারি। যে ভিডিওটি এখানে স্থাপন করছি, তা এই আলোচনাকে সামান্য স্পর্শ করলেও তার অন্য বিশেষত্ব রয়েছে। প্রফেসর স্টেইনার আমাদের সময়ের একজন দার্শনিক এবং সাহিত্য সমালোচকও।  তার আলোচনাটি ‘স্মরণ রাখার’ অন্যন্য কিছু দিক আলোচনা করে যা পাঠকের চিন্তায় নাড়া দিতে পারে। আমি এটাকে শুধু পাঠকী মনকে একটু অন্য দিকে নেবার জন্য স্থাপন করেছি।] 

মৌখিক তথ্যের সংস্কৃতি

কোরান এমন এক সম্প্রদায়ের উপর নাজিল হয়েছিল যারা কিতাবি লোক ছিল না, কিন্তু কিতাবের ব্যাপারটি বুঝতে পারত। একদিন তাদের কাছে ঐশী বাণী আসবে –তারা এরই অপেক্ষায় ছিল। সেদিন জরুরি বিষয় মুখস্থ করার কথা বলতে হত না। তাই কোরান নাজিল হওয়ার সাথে সাথে তা মুখস্থ করে ফেলা হত। মদিনায় সকাল সন্ধ্যায় ছোট-বড়দের কণ্ঠ থেকে কোরান মুখস্থের আওয়াজ শুনা যেত, যেমনি আজও কলকাতার রাস্তা থেকে ভোর বেলায় সংগীত চর্চা ও সাধনার আওয়াজ কর্ণে গোচরিত হয়। (এটা আমার কথা নয় বরং কলকাতার এক সংগীতজ্ঞের, আমি কলকাতা দেখিনি)। এই ছিল গুরুমুখী সংস্কৃতির তথ্য হেফাজতের পন্থা ও পদ্ধতি।

আমাদের ধর্মীয় জরুরি বিষয় স্মৃতি ফলকে ধারণ করা অতি সওয়াবের কাজ। এটা আখেরাতের নাজাতের এক মাধ্যম এবং এই হেফাজতের পরিণতিতে এটাই হতে পেরেছে যে গোটা কোরানও যদি ‘ছাগলে খেয়ে ফেলে’ তবুও কোন ক্ষতির আশংকা নেই।  

বিরাট বিরাট ঘটনায় মানুষ প্রত্যক্ষ দর্শীর কথা শুনতে আগ্রহী হয়। আজ বাংলাদেশে বড় বড় মুক্তি যোদ্ধাদের ইন্টার্ভিউ বার বার নেয়া হয়। তাদের কথা শুনা হয়, কেননা, তারা স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছেন। তাদের তুলনায় সেদিনের সাহাবিদের (সা.)  যে সে কি মর্যাদা! তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের সে কী উদ্যম, সে কী উৎসাহ! নবী (সা.) এঁর পর তাঁর এই সাহাবীরা (রা.) অনেক পরিবর্তন দেখেছেন, অনেক সমস্যা দেখেছেন, অনেক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করেছেন। অনেক পরিস্থিতির মোকাবেলায় রাসূলের (রা.) বিষয়ে কথা বলতে হয়েছে, স্মৃতিচারণ করতে হয়েছে, রাসূলের (রা.) সুন্নাহর আলোকে সমাধান দিতে হয়েছে, মন্তব্য দিতে হয়েছে, এবং সর্বোপরি কোরান ও সুন্নাহকে পরবর্তিদেরে শেখাতে হয়েছে। নব্য বিজিত দেশে, নব্য মুসলিমদের শিক্ষা দিতে তাদেরকে জীবন ব্যয় করতে হয়েছে। দূর-দূরান্তে যেতে হয়েছে, কেননা তাঁদের সুমহান শিক্ষক বলেছেন, ‘আল্লাহ সমুজ্জ্বল করবেন তাকে যে আমার কথা শুনল, মুখস্থ করল, (হাফিজাহা, সংরক্ষণ করল, বা হেফজ করল), হৃদয়ঙ্গম করল, তারপর পৌঁছে দিল তার কাছে যে শুনতে পারে নাই’ [জায়েদ বিন সাবেত/তিরমিযী, উদ্ধৃতি করেছেন: আব্দুর রহীম (১৯৮০:১৪৩-৪৪)]। এই মর্মার্থের আরও অসংখ্য হাদিস বোখারী, তিরমিজি, মুসলিম, বাইহাক্বী, মুসনাদে আহমদ ইত্যাদিতে আছে (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪৩-১৫১)।

আরেকটি উদাহরণ নেয়া যাক। হযরত আনাস থেকে বর্ণিত: “আমরা রসূলের নিকট হাদীস শ্রবণ করিতাম, তিনি যখন মজলিস হইতে উঠিয়া যাইতেন, তখন আমরা বসিয়া শ্রুত হাদীসসমূহ পরস্পর পুনরাবৃত্তি করিতাম, চর্চা করিতাম পর্যালোচন করিতাম। আমাদের এক একজন করিয়া সবকয়টি হাদিস মুখস্থ শুনাইয়া দিত। এ ধরনের প্রায় বৈঠকেই অন্তত: ষাট-সত্তর জন অবশ্যই উপস্থিত থাকিত। এ বৈঠক হইতে আমরা যখন উঠিতাম, তখন আমাদের প্রত্যেকেরই সবকিছু মুখস্থ হইয়া যাইত” (প্রাগুক্ত, আল-মাজমা থেকে উদ্ধৃত, ১২১ পৃষ্ঠা)।

মুহাম্মদ আব্দুর রহীম (১৯৮০:১৫২-৬১) এমন ধরনের আরও অনেক হাদিসের উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন সূত্র থেকে। এগুলো দীর্ঘায়ত করার তেমন কোন প্রয়োজন নেই, কেননা যে সভ্যতার যে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, সেই প্রেক্ষিতগত আলোকে তারই প্রতিফলন ঘটবে তাতে বিতর্কের তেমন কিছু নেই।

প্রাথমিক যুগে হাদিস মুখস্থের প্রথাতেই ছিল। খুব বেশী লিখা হয় নি। নাদভী (২০০৫:১৪) আল-সিবায়ী মুস্তফার (আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাহরীর আল-ইসলামী, পৃ. ৫৮-৬৬) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘যদিও কিছু সংখ্যক সাহাবী (রা.) হাদিস লিপিবদ্ধ করেন, এবং তাদের নিজেদের সংগ্রহও ছিল, তবে অধিকাংশ (many), বিশেষ করে ওমর ইবন খাত্তাব (রা.) এ কাজে অত্যন্ত অনিচ্ছুক ছিলেন।’ তবে বলতে হয় যে সেদিন তো ‘অধিকাংশ’ অমনিতেই লেখাপড়া জানতেন না, মুখস্থ করা ছাড়া উপায় ছিল না। আল-কাওয়ার (২০০২: ২০) বালাজুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, যে যুগে ইসলাম নাজিল হচ্ছিল সেযুগে কোরেশ সম্প্রদায়ে মাত্র সতের জন পুরুষ লেখা পড়া জানতেন। তবে মহিলাদের মধ্যেও আরও কিছু সংখ্যক রয়েছেন যারা লেখাপড়া জানতেন। আনসারী মহিলাদের মধ্যেও অনেকে লেখা পড়া জানতেন যা তারা ইয়াদীদের কাছ থেকে শিখেছিলেন। আমরাহ বিনত আব্দুর রহমান নামক এক আনসারী মহিলার কাছে একখানা লিখিত হাদিস সংগ্রহ ছিল যার প্রতি বিশেষ নজর দিতে ওমর বিন আব্দুল আজীজ (র:) আবু বকর ইবন মুহাম্মদ ইবন আমর ইবন হাজমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন (নাদভী, ২০০৫:১৭)।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে ব্যক্তিগতভাবে যারা হাদিস লিপিবদ্ধ করতেন বলে নাম পাওয়া যায় তারা হলেন, আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা.), আলী বিন আবী তালিব (রা.), আনাস (রা.), আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ (রা.), আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.)। তাদের লিখিত সংগ্রহকে ‘সহিফাহ’ বলতেন। তবে সব ধরণের লিখার সমষ্টিকেও সহিফা বলা হত। আবু হুরাইরাহ (রা) এঁর ছাত্র হাম্মাদ বিন মুনাব্বিহ (রা.) তাঁর কাছ থেকে শুনে একখানা সহিফাহ প্রণয়ন করেন। তবে একথা বলে রাখা উচিৎ যে যখন রাসূলুল্লাহর নিকট ওহী নাজিল হত, তখন সেই পরবে (ওহীর নাজিল ও লিপিবদ্ধের সময়ে) হাদিস লিখার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল, যাতে আল্লাহ বাণীর সাথে তা মিশ্রিত না হয়। কেহ কেহ বলেন এই নিষেধ কেবল ওহী লিপিবদ্ধকারিদের উপর ছিল। আল্লাহই অধিক জানেন।

 সরকারী উদ্যোগে হাদিস সংগ্রহ

নবীর (সা.) ওফাতের অনেক বছর পর হযরত ওমর (সা.) যখন খলিফা তখন একবার তিনি সরকারীভাবে হাদিস সংগ্রহের কথা বিবেচনা করেন। তিনি এ ব্যাপারে অন্যান্য সাহাবীদের পরামর্শ চান। তারা বলেন, এ কাজে কোন বাধা দেখেন না (নাদভী, ২০০৫:১৬)।  কিন্তু পরে ওমর (রা.) তা করতে যান নি। তাঁর সন্দেহ ছিল সরকারী উদ্যোগ এলে এতে যে প্রাধান্যতা আসতে পারে তা হয়ত আল্লাহর কালাম শিক্ষায় ভাটা ধরাতে পারে, বা কোরানের সাথে কোন মিশ্রণ ঘটাতে পারে। তবে এই সরকারী উদ্যোগ কিছু কাল পরে আসে ওমর (রা.) এঁর দৌহিত্র ওমর ইবন আব্দুল আজীজ (র. ৬৮২-৭২০) এঁর খিলাফত কালে। তিনি বিভিন্ন গভর্নরদেরকে হাদিস সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন। লিপিকার ও সংগ্রাহকদের জন্য বেতন ধার্য করেন। কেহ তা গ্রহণ করেন, আবার কেহ এ কাজে বেতন নিতে অনাগ্রহ দেখান। এতে করে হাদিস সংগ্রহে সরকারী উদ্যোগ সংযোগ হয়। কিন্তু হাদিস শিক্ষা তার আগের গুরুমুখী প্রথাতেই থেকে যায়, ছাত্র-শিক্ষক পরম্পরায় হাদিসের ধারা চলতে থাকে –যা আজো আছে।

এখানে যে জিনিসটি স্পষ্ট করা হল তা হল সাহাবীগণ নবীর কথা শিখে রাখতেন কেননা নবীর কথা কোরানকে ব্যাখ্যা করত, নবীকে পাঠানো হয়েছিল মানুষের কর্মপন্থা ও বিশ্বাসকে সংশোধন করতে, পবিত্র করতে, তিনি শিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন। তাই তার শিক্ষা ধারণ করার প্রয়োজন ছিল। যা জরুরি তা মুখস্ত-সভ্যতা  মুখস্থ করে রাখত। বিরলভাবে কেউ কেউই লিখেও রাখতেন, একথা বলা হয়েছে। আবার কোরানের বাণীর সাথে যাতে কেউ কোথাও নবীর বাণীর মিশ্রণ করে না ফেলেন, সেই সতর্কতায় লিখাকেও কেউ কেউ নিরুৎসাহিত করেছেন, যেমন হযরত ওমর (রা.), এমন কথাও উল্লেখ হয়েছে। ওমর (রা.) মূলের দিক থেকে লেখার প্রয়োজনীয়তার একান্ত বিপক্ষে ছিলেন না যা তাঁর খেলাফত কালের উদ্যোগ থেকে বুঝা যায়। রাসূল্লাহর জীবদ্দশায় তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে বিভিন্নস্থানে, বিশেষ করে যে সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদেরকে ইসলাম শিক্ষা দিতে পাঠাতেন, যারা সেখানে গিয়ে কোরান শেখাতেন, নবীর ব্যাখ্যা শেখাতেন, নবীর কথা যা শুনে গিয়েছেন তা প্রচার করতেন। অর্থাৎ নবীর (সা.) বাণীও একই সাথে জীবন্ত ছিল, জরুরি ছিল। নবীর (সা.) বাণী বাদ দিয়ে ইসলামের সম্ভাবনাই ছিল না। সেদিন নবীর সাহাবাগণ (সা.) যে শিক্ষার ধারাবাহিকতা শুরু করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা আজও আছে। আপনি আমাদের যে কোনো মাদ্রাসার বড় মুহাদ্দিসের কাছে যান, তিনি তার নিজ থেকে শুরু করে তার শিক্ষকদের সিলসিলা নবী পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। ইসলামের দুশমনগণ চাচ্ছে আল্লাহর রাসূলের হাদিসের উপর সন্দেহ শংসয় সৃষ্টি করে  ইসলামকে ধ্বংস করতে, কেননা হাদিস সরে পরলে কোরান যেভাবে সেভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে।            

 ওরিয়ান্টেলিষ্টদের মিথ্যাচার

সার্বিকভাবে ইউরোপীয় ওরিয়েন্টেলিষ্টরা কোরান হাদিসে আক্রমণ চালালেও শিক্ষাঙ্গনে গোল্ড জিহারই  (১৮৫০-১৯২১) প্রথমে হাদিস নিয়ে মিথ্যাচার শুরু করেন এবং পরবর্তীতে জোসেফ সাচ (১৯০২-১৯৬৯)। এদের কেউই কোন প্রতিষ্ঠানে হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়ন করেননি। 

আরবিতে কিছু প্রবাদ আছে। লি কুল্লি ফান্নিন রিজাল (لكل فن رجال) –অর্থাৎ প্রত্যেক বিদ্যায় বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। তারপর ই’লামুস সিনাআত মিন আহলিহা (اعلموا الصنعات من أهلها) -অর্থাৎ প্রত্যেক বিদ্যা তার গুরুদের কাছ থেকে শিখে নাও। (দ্বিতীয়টিকে কেউ কেউ হাদিস বলে থাকেন)। ইসলামের দুশমনদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, ‘মুহাম্মাদ  নামক কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন কি না সন্দেহজনক!’ হাদিস দূরে থাকুক।

গোল্ড জিহার একজন হাঙেরিয়ান ইসলাম বিদ্বেষী ইয়াহুদী। তিনি গোটা হাদিস শাস্ত্রকে বানোয়াট বলে প্রচারণা চালান, যদিও তার বিদ্যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্জিত হয়ে আসে নি। তিনি এক সময়  মিশরের কোন এক মসজিদে কয়েকদিন বক্তৃতা শুনেছিলেন। তবে সেই বক্তৃতাগুলো কোন বিষয়ে তাও জানা যায় নি। তিনি নিজে নিজেই হাদিসের পণ্ডিত হয়েছেন, যেমন ‘বদ্ধমনাতে’ কিছু লোক ইসলামের উপর রাতারাতি শিক্ষিত হয়ে কোরানে যে পরিমাণ আয়াত রয়েছে তার চেয়েও বেশী পরিমাণ বৈপরীত্য খুঁজে  পায়। এই ধরনের খেলাতে চাতুর্য রয়েছে, টাকা রয়েছে। জিহার ও সাচের ধারণায় গোটা হাদিসের বিষয়াদি উমাইয়্যাহ বংশের রাজনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়া হিসেবে বানানো হয়েছে। অবশ্য পরে তাদের সস্তা মিথ্যাচার পরবর্তী ওরিয়াণ্টলিষ্টদের মধ্যেই কিছুটা অচল হয়ে পড়ে। বারটন (1994:xii) বলেন, ‘গোল্ড জিহারের লেখা হাদিস সমালোচনার পথ খুলে দিলেও যেখানে (তার সমালোচনার স্থান) বয়সের চিহ্ন দেখাচ্ছে (showing sign of age!) তা হল তার উমাইয়্যাহ বিষয়ক লেখা।’ জোসেফ সাচের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, ‘তার উমাইয়্যাহ প্রশাসন অথবা লোকপ্রিয় আচরণ/রীতি বিষয়ক অভিসন্দর্ভ নিছক স্থূল, ক্ষেপা উক্তি’ (Burton, 1994:xxii)।

সাচ গোল্ড হিজারের থিসিসকে সামনের দিকে এগিয়ে নেন। এদের বিদ্বেষী মিথ্যাচারের পূর্ণ জবাব প্রফেসর মুহাম্মদ মুস্তফা আল-আজমী তার On Schacht's Origins of Muhammadan Jurisprudence –এ দেন। একটু দেরীতে হলেও তাদের মিথ্যাচার ও ভুলের স্থানগুলো ধরিয়ে দেয়া হয়।

ওরিয়েন্টেলিষ্টদের ইসলাম অধ্যয়নের নিজস্ব একটি মানসিকতা রয়েছে। তারা একে অন্যের কাজকে সমর্থন দিয়ে যান, এমনকি আমাদের উল্লেখিত বারটনকে সহ (১৯৯৪)। এক বিদ্বেষী অন্য বিদ্বেষী থেকে উদ্ধৃতি টানেন। একজনের লেখা অন্যজন পর্যায়ক্রমিকভাবে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করেন এবং এতে করে তাদের মধ্যেই গড়তে উঠতে থাকে লিখার এক ভাণ্ডার। কোনো একটি বিষয়ে যখন তাদের কেউ তাদেরই দশ জন থেকে উদ্ধৃতি দেন, তখন পাঠকের কাছে তা ‘বিরাট’ হয়ে দেখা দেয়। এগুলো হচ্ছে জ্ঞানের জগতে জায়োনিষ্টদের এক বড় ধাপ্পাবাজি। তাদের এই Inter and cross referential textual chain –এর স্তূপীকৃত মিথ্যা পাঠ অনেক সাধারণ মুসলমান ধোঁকা প্রাপ্ত হন। এই মিথ্যার সম্ভার গড়াই ছিল তাদের প্রফেশন (profession)। তারা বেতন ভোগী হয়ে কাজ করেছেন। একের পর একেকজন সেই  মিথ্যার প্রসাদকে বর্ধিত করেন এবং এভাবেই তাদের কাজ চলছে।

এগুলোর জবাব দিতে হলে অনেক টাকার দরকার, অনেক লোকের প্রয়োজন। এই বিস্তৃতি সাধারণ পাঠক বুঝবেন না। সাধারণ পাঠকের সামনে জায়োনিষ্টদের অর্থায়নে বিষয়টি আসে না। ইসলাম বিদ্বেষীদের পিছনে  কী পরিমাণ আর্থিক সমর্থন ঢালা হয় তা বিবেচনায় আনলে বিস্মিত হতে হয়। অনেক গবেষণা-ডিপার্টম্যান্ট জায়োনিষ্টদের টাকায় চলে –একথা অনেকের জানা নেই। নাস্তিক্যবাদ, বির্তনবাদ,জায়োনবাদ কীভাবে টাকার জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এভাবেই  তাদের পুস্তকরাজি 'গবেষণা' ও পুস্তক প্রণয়ন যুগ যুগ চলছে।

তবে একথা মনে রাখতে হবে যে, বিদ্যার সকল অঙ্গনেই দ্বিমত ও পার্থক্যের স্থান থাকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে  সবলতা/দুর্বলতা থাকতে পারে। হাদিস শাস্ত্রে এক সময় কিছু জাল হাদিসের সম্বয় ঘটে। তাই এগুলো বাচ-বিচার করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আজও যদি কেউ কোন হাদিস জাল বলে আলোচনা করতে যায় এবং সিস্টেমেটিক পদ্ধতিতে সে আলোচনার যোগ্যতা রাখে,তবে তা করতেই পারে। কিন্তু ব্যতিক্রম ধর্মী কোন কিছু পাওয়া গেলেই গোটা হাদিসের ভাণ্ডার উড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা হবে কুটিলতার বিষয়।
 

BREAK TIME. [আমরা এখানে সামান্য বিরতি নিতে পারি। যে ভিডিওটি এখানে স্থাপন করছি, তা এই আলোচনাটি সামান্য সম্পর্ক রাখে। আমি এটাকে শুধু পাঠকী মনকে একটু অন্য দিকে নেবার জন্য স্থাপন করেছি। এর সাথে কোন বিশ্বাস জড়িত থাকলে সেটা আমার নয়। মার উদ্দেশ্য বিনোদন] 

কোরান অনলি

যারা সুন্নাহকে অস্বীকার করেন আর এই ধর্মে নবী মুহাম্মদের (সা) কোন প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন না, এমন অবস্থান আমাদের দৃষ্টিতে মুহাম্মদের (সা) ধর্ম হতে পারে না। বরং এমন কিছু হবে নতুন বিষয়। ইসলাম তার প্রথম যুগ থেকে অনেক ফিরকা দেখেছে। অনেক ফিরকা কালের ধারায় দেখে আসছে। এখনো দেখছে এবং ভবিষ্যতেও দেখবে। যে দলটি এখন ‘কোরান অনলি’ বলে প্রচার করে তারা একটি ফিরকা। তবে কারো সাথে বাদাবাদি করার দরকার নেই। তাদের ধর্ম তারা করবে, আমাদের ধর্ম আমরা করব।  এটা লাকুম দীনুকু ওয়ালিয়া  দ্বীনের মত।  অপ্রয়োজনে বাক-বিতণ্ডায় কেবল সময় নষ্ট হয় এবং সমস্যা বাড়ে। হেদায়াত কেবল আল্লাহর হাতে।  বিপথগামীতাও। কিছু লোক এখন বলতে শুরু করেছে যে তারা কেবল মাক্কী কোরান মানতে রাজী, মাদানী নয়, কেননা মাদানীতে রাজনীতি রয়েছে!

শুরুতে একথাও বলেছি, কোরান বুঝতে হলে নবীকে বুঝতে হবে, নবীর বাণী বুঝতে হবে, তার সাহাবীদেরকে (সা.) বুঝতে হবে, তাদের পদ্ধতি বুঝতে হবে। এই পয়েন্টি হচ্ছে ভাষা-বিজ্ঞানের ব্যাপার। বিশেষ করে, ভাষা (শব্দ/বাক্য) কীভাবে ‘অর্থ’ প্রকাশ করে –সেই মর্মের আলোচনার বিষয়।

তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বাদ দিয়ে, তার সাহাবাদেরকে বাদ দিয়ে, তার যুগকে অতিক্রম করে, কোরান কোন অর্থবহ বই থাকে না। কোরানে অনেক লোকের নামের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ‘মুহাম্মদ’ নামক একটি শব্দ আছে, কিন্তু তিনি কে, কোন দেশে তার বাড়ী, কোন শহরে তার জন্ম, কোন যুগে তার বিচরণ, তাছাড়া, কোরান নামক বইটিকে কী ‘মুহাম্মদ’ নামক শব্দের সাথে জুড়ে পড়া হবে, না অন্য নামেও পড়া যাবে, এধরনের অনেক সমস্যা আসবে। এই ধারায় যেসব কথা উল্লেখ করা হল সেসবের কোনো নির্দিষ্টতা কোরানে নেই। হাদিস ব্যতীত কোরানে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, কিছুই তেমন কোনো সুষ্টুভাবে পাওয়া যাবেনা। মক্কা নামে কোন শহরের উল্লেখ কোরানে নেই। মদিনা শব্দ আছে, তবে সে মদিনা কোন দেশে, বা মহাদেশে –তারও কোন দাড়াদিশা নেই। যারা ‘কোরান অনলি’ তারা আমাদের দৃষ্টিতে, অর্থ-বিদ্যায় (semantic) অনবিজ্ঞ। তাদের সাথে আলোচনা হবে নিরর্থক।

এবারে ভাষার ব্যাপারে আরও দুটি উদাহরণ দেই।  ভাষা হচ্ছে একটি সামাজিক কনভেনশন। ভাষার অর্থ তার সমাজেই নিহিত। সমাজের ঊর্ধ্বে ভাষা ‘অর্থবহ’কোন জিনিস নয়।

১৯৮৭ ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মারগেট থ্যাটচার একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে এক ছাত্রীকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি পড়ছ, মেয়ে?’ সে বললো, ‘ইতিহাস’।  তিনি বললেন, ‘What a luxury’ (cited in Esthope, 1991:3)! প্রধান মন্ত্রীর এই কথার অর্থ কোথায় নিহিত? তা কী তার বাক্যের ভিতরে? না। এখানে বরং বক্তার বিষয়ভিত্তিক আচরণেই প্রকাশ পাচ্ছে তার অর্থ। এই অর্থ তার রাজনৈতিক টরি দলের শিক্ষা বিষয়ক আইডিওলজির (educational ideology) সাথে জড়িত। অর্থাৎ পাঠ্য বিষয় ছিল ইতিহাস। আর ইতিহাস পড়তে গিয়ে সরকারের যে টাকা খরচ হচ্ছে (সেদিন সরকারী গ্রান্টের ব্যবস্থা ছিল) তার ফাইনেন্সিয়্যাল রিটার্নটা কোথায়? একটি 'অনর্থক' বিষয়ে পড়া যেন luxury. কিন্তু এত ব্যাখ্যা তার সংক্ষিপ্ত বাক্যে নেই। আমরা তা পাচ্ছি আমাদের সমাজ থেকে, টরী দলের আদর্শ থেকে। স্থান ও কাল থেকে বাক্য বিচ্ছিন্ন করলে তা অর্থহীন হয় পড়ে।

যেকোনো  প্রাচীন কালের বই পুস্তক পড়তে হলে এবং বুঝতে হলে কিছু জটিল পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে তা যে কেবল ধর্মীয় পুস্তকাদির বেলায় প্রযোজ্য, এমন নয়টি নয়। বরং সেক্যুলার পুস্তকাদির বেলাও প্রযোজ্য। একটি উদাহরণ নেয়া যাক।

ধরুন হোমারের ইলিয়াড। আমরা কেবল অনুবাদ দেখলেই চলবে না। অনুবাদ দিয়ে বইটিকে accessই করা যাবে না। বরং মূল পাঠের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদেরকে সেই সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা, সেই রেষারেষির অবস্থাদি বুঝতে হবে। বইটির কাল বুঝতে হবে, setting বুঝতে হবে। তারপর কবি যে শুধু জয়/পরায়ের বিষয় আনেন নি বরং সার্বিকভাবে যুদ্ধ, সমাজ, সামাজিক নৈতিকতা, বিজেতা/পরাজিতের অবস্থা ইত্যাদি এনেছেন। আমাদেরকে এসবের পরিমণ্ডল দেখতে হবে। ইলিয়াড নামক বইটি লেখার কারণ, রাজনীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বুঝতে হবে। সেদিনের যুদ্ধ বুঝতে হবে –এগুলো ভাল করে অধ্যয়ন না করলে সেই বাস্তবতার সাথে আমাদের সময়ের বাস্তবতা বুঝা যাবে না।

 ইলিয়াডের তুলনায় ধর্মগ্রন্থাদি, হোক তা কোরান অথবা বেদ অথবা বাইবেল হোক –এগুলোতে আরও টেকনিক্যাল জটিলতা থাকে। এদের অর্থ স্থানে স্থানে ‘পিয়াজের’ মত হয়, layer এর পর layer থাকে। অর্থের গভীরতা থাকে। যে বাক্য আপাততদৃষ্টে সহজ মনে হবে, তার আসল অর্থ সহজ নাও হতে পারে। ধর্মগ্রন্থ এক ধরনের কালীন ও ‘গ্রন্থিয় tradition’ বহন করে। অনেক সময় অনেক কিছু সহজে accessible হয় না। এর জন্য persevere করতে হয়। কোরানের ব্যাপারটা আরেকটু আলাদা। যে সমাজে এই গ্রন্থ নাজিল হয় –সে সমাজ literate ছিল না। ওটাকে আরবি সমাজ বিজ্ঞানে বলা হয় আল-হাদারাহ আস-শাফাহিয়্যাহ (الحضارة الشفاهية), স্মৃতি বা মৌখিক পদ্ধতিতে তথ্য সংরক্ষণের সভ্যতা, যা তখন লিখিত পদ্ধতিতে উত্তরণ করছিল। এর লিখিত রূপ, বাণীর পদ্ধতি, style, সেকালের মৌখিকতা, কাব্যিক রূপ, এবং পূর্বকালের ঐশী বাণীর আচরণের সাথে দেখতে হয়, যদিও তার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এর পর আসে ব্যাকরণ, অলংকার, proverbial, রূপকতা ইত্যাদি। কেননা কোরান বলছে এটা আরবি কোরান, অর্থাৎ আরবি ভাষায় যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার সবই ওখানে সমন্বিত। ২৩ বৎসরের নানান যুদ্ধ, নানান সংগ্রাম, নানান পরিস্থিতির দীর্ঘ পরিসরে এর প্রায় সাড়ে ছয় হাজার আয়াত নাজিল হয়েছে। এসব আয়াতের নানান প্রেক্ষিত রয়েছে, এক আয়াত অন্য আয়াতের মধ্যে কখনো মাস থেকে বছরের দূরত্ব রয়েছে। এই আয়াতগুলোর আইনি, সামাজিক, নৈতিক ও আন্দোলনী নির্দেশনার প্রেক্ষিতে হয়েছে। কখনো কোন আয়াতের আইনি দিক অন্য আয়াতের দ্বারা রহিত হয়েছে, কখনো বর্ধিত হয়েছে –এটা ছিল একটি জীবন্ত পুস্তক। আমাদেরকে সেই ‘জীবনকে’ অনুধাবন করতে হবে।

এখন এতসব সমস্যা ও জটিলতা সামনে রেখে কোনো এক ব্যক্তি যদি সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে বলে সে ‘কোরান অনলি’ হয়ে পড়েছে, সে এখন বিতর্ক করতে চায়, অথবা আপনাকে কোরান শিখিয়ে দিতে চায়, তখন কী করা উচিত হবে? আমার মনে হয় তার মজলিস ছেড়ে পলায়ন করা উচিৎ। আমরা এই আখেরী জমানায় এসেছি। 

>>________________________________>>
কোরান-অনলিদের ব্যাপারে এই ধারায় আমার অপরাপর ব্লগ:

এম_আহমদ: ভণ্ডের ধর্ম –কোরান অনলি

এম_আহমদ: কোরান-অনলি ভণ্ডরা অমুসলিম

এম_আহমদ: রিসালাত, সাহাবা ও সুন্নাহ -পর্ব ১

এম_আহমদ: ফারুক সাহেবের ব্লগ: মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি  

এম_আহমদ: ফারুক সাহেবের ব্লগ – বিবর্তনবাদ

এম_আহমদ: যৌনদাসী – ইসলাম বিদ্বেষী ও ‘কোরান অনলি’-দের একটা প্রোপাগাণ্ডা

এম_আহমদ: জাহেলী যুগের যৌন সম্পর্ক ও ইসলাম 

References

_________________

1. আব্দুর রহীম, মুহাম্মদ, (১৯৮০), হাদীস সংকলনের ইতিহাস, ঢাকা:ইসলামিক ফাউণ্ডেশন

2. Al-Kawwaz, Muhammad Abdul Karim, (2002). Kalamullah, al-Janib ash-shafahiyyah min az-Zahirah al-Quraniyyah, (Arabic) London: Dar Al-Saqi

3. Burton,John, (1994).An Introduction to Hadith, Edinburgh: Edinburgh University Press

4. Easthope, Anthony, (1991). Literary into Cultural studies. London: Routledge

5. Kamali, Mohammad Asim, (1991), Principle of Islamic Jurisprudence. Cambridge: The Islamic Text Society.

6. Nadwi, Sayyed Abul Hasan Ali, (2005). Hadith Status & Role, an introduction to the Prophets tradition. Leicester: UK Islamic Academy 

 

১০ comments

Skip to comment form

  1. 8
    এম_আহমদ

    @ শাহবাজ ও সরোয়ার ভাই। ব্যস্ততায় আপনার মন্তব্যের ব্যাপারে কিছু বলতে পারিনি। আপনারাদের ধারণা ঠিকই আছে, শিরোনাম একটা বড় আকর্ষণ। ব্লগটি দুই বা তিন অংশে ভাগ করে ২/৩ শিরোনামে দিলে হয়ত অন্যরূপ প্রকাশ পেত। কিন্তু সব সময় চিন্তা একভাবে আসে না। অনেক সময় অনেক কথা আসে, তবে তা hindsight-এর।

    ব্লগ পড়া ও মন্তব্যের জন্য সব পাঠক ও মন্তব্যকারীদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  2. 7
    সরোয়ার

    অসাধারণ পোষ্ট … তবে কোনো কারণে হিটের সংখ্যা অনেক কম।

    লেখার শিরোনামের উপর হিট অনেকাংশে নির্ভর করে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা। হিট কম হলেও এগুলো অনলাইনেই থাকবে ইনশাল্লাহ। গুগুল সার্চে অনেকে সন্ধান পাবে।

  3. 6
    শাহবাজ নজরুল

    অসাধারণ পোষ্ট … তবে কোনো কারণে হিটের সংখ্যা অনেক কম। ছোটো ছোটো করে মূল বিষয়গুলো নিয়ে কী আবার লিখবেন। যেমন প্রাচীন গুরুমখী বিদ্যার উদাহরণ, হাদীস শাস্ত্রের পরম্পরার প্রমাণ … ইত্যাদি?

  4. 5
    এম_আহমদ

    এই ব্লগে হাদিস ও সুন্নাহর মধ্যকার পার্থক্যটাও প্রথমে এনেছিলাম, তারপর ব্লগটি দীর্ঘ হওয়ায় কেটে ফেলেছিলাম। কিন্তু বিষয়টি আবার বিবেচনায় আসায় তা এখানে সংযোগ করছিঃ

    হাদিস/সুন্নাহ
    সুন্নাহ হল রাসূলের (সা:) বাস্তব কর্মনীতি। আর হাদিসটা হচ্ছে বর্ণনা/বর্ণনার স্থান, যেখান থেকে সুন্নাহ নির্ধারণ করা হয়। এখানে পার্থক্য আছে।  পার্থক্যের ধারায় বিশেষজ্ঞতাও রয়েছে। যেমন সুফিয়ান সাওরী (র:) হাদিসের ইমাম কিন্তু আল-আওজায়ী হচ্ছেন ‘সুন্নাহর’ ইমাম। (আব্দুর রাহীম, [১৯৮০:১৯] )  তাছাড়া হাদিসে তাঁর ব্যক্তিগত অনেক কাজ কর্ম আসে, কথাবার্তা আসে। তবে স্থানভেদে বিশেষজ্ঞদের কাছে, (তাত্ত্বিক আলোচনায়), কোথায় সমার্থবোধক  অর্থ (synonymic sense) আসতে পারে যা তাদের কাছে বোধগম্য।  আব্দুর রাহীম (প্রাগুক্ত: ১৭) ইমাম রাগেব থেকে উল্লেখ করেন, “‘সুন্নাতুন্নবী’ বলিতে সে পথ ও রীতি-পদ্ধতি বুঝায়, যাহা নবী করীম (সা:) বাছাই করিয়া লইতেন ও অবলম্বন করিয়া চলিতেন।”  কামালী (১৯৯১:৪৭) আইনের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য এভাবে এনেছেন, ‘হাদিস সুন্নাহ থেকে অর্থগত আলাদা রূপ ধারণ করে এই অর্থে যে হাদিস হচ্ছে রাসূলুল্লাহ আচার/আচরণের বর্ণনা, সুন্নাহ হচ্ছে সেই নিয়ম-পদ্ধতি যা হাদিস থেকে নির্ধারিত হয় (যেমন আইনের ক্ষেত্রে)।

  5. 4
    এম ইউ আমান

    স্মৃতি বিদ্দ্যা, গুরুমুখী বিদ্যা, হাদিস সঙ্কলন ও সংগ্রহে তার প্রয়োগ সম্পর্কে একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ। কোরাণ ও হাদিস প্রসঙ্গে লেখক যে বার্তা দিতে চেয়েছেন সেটি খুব সম্ভবত এই যে, কোন কিছু বোঝার জন্য (উপলব্ধি আরো পরের ব্যাপার), সে সময়কার অবস্থা বোঝা জরুরী। এবিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার তেমন কোন অবকাশ নেই।

    ইসলাম ধর্মে কোরান, হাদিস হচ্ছে দুটি মৌলিক উৎস। প্রথম উৎস দ্বিতীয় উৎসের উপর বেশী নির্ভরশীল।  

    প্রথমটি উৎস। বাকী সব কিছুই, তা সে ইসলামী ইতিহাস হোক, হাদিস হোক, ইন্টারপ্রিটেসন হোক, তা প্রথমটিকে বোঝার/উপলব্ধির নিমিত্তে, ফলে খুব সম্ববত সেগুলিকে ইসলামের মৌলিক উৎস বলা যাবেনা। অন্ততঃ ধর্ম গ্রন্থের সাথে একই কাতারে রাখা যাবেনা। একই কাতারে রাখার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

    1. 4.1
      এম_আহমদ

      প্রথমটি উৎস। বাকী সব কিছুই, তা সে ইসলামী ইতিহাস হোক, হাদিস হোক, ইন্টারপ্রিটেসন হোক, তা প্রথমটিকে বোঝার/উপলব্ধির নিমিত্তে, ফলে খুব সম্ববত সেগুলিকে ইসলামের মৌলিক উৎস বলা যাবেনা। অন্ততঃ ধর্ম গ্রন্থের সাথে একই কাতারে রাখা যাবেনা। একই কাতারে রাখার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
       

      প্রথমত আপনাকে ধন্যবাদ। হাদিস, বরং বলি সুন্নাহ উৎস নয় –এমন কথাতে আমি আপনার সাথে দ্বিমত পোষন করছি।
       
      কোরান ও সুন্নাহ আমাদের ধর্মের উৎস। এটা আমার নিজের কথা নয় বড় বড় আলেম/উলামাদের কথা। কোরানের মাধ্যমে যেমন হারাম হালাল এসেছে হাদিসের মাধ্যমে অনেক স্থানে এসেছে। মাওলানা আজিজুল হক সাহেব (মুহাদ্দিস, বুখারীর শরীফের শিক্ষক) একটি হাদিস এই মর্মে দেখান যে ভবিষ্যতে একদল লোক আসবে যারা কেবল   কোরানের হারাম হালাম মানবে, আদেশ/নির্দেশ মানবে, কিন্তু সুন্নাহরটা মানবে না। তিনি হাদিসটির শেষাংশ এভাবে অনুবাদ করেন, “হুশিয়ার আমি সতর্ক করিয়া যাইতেছি –তোমরা নিশ্চিতরূপে জানিয়া-বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়া রাখ যে –আল্লাহর রসূল অর্থাৎ আমি যে বস্তুকে হারাম বলিয়া ঘোষণা করিব উহাও ঐরূপ হারামই গণ্য যাহার হারাম হওয়ার ঘোষণা কোরান শরিফে আছে। (কোরান আল্লাহর বাণী এবং রসূল যাহা বলিবেন তাহাও স্বয়ং আল্লাহর তরফ হইতেই অহী মারফত প্রাপ্ত যেমন) আমি ঘোষণা দিতেছি, গৃহপালিত গাধা এবং হিংস্র জন্তু (খাওয়া) হারাম (আবু দাউদ শরীফ)” [1] এখানে আপনি হারাম/হালাম নবীর (সাঃ) বাণীতে পাচ্ছেন এবং এটাও আসছে আল্লাহর ‘ইঙ্গিতে’।
      কোরান ও সুন্নাহ –এই দুইটিই মৌলিক উৎস, কেবল কোরান নয়। এটা রাসূলেরও কথা, তারাকতু ফিকুম আমরাইন, কিতাবুল্লাহ ওয়া সুন্নাতু রাসূলিহি। ইসলামী শরীয়াতে চারটি উৎস বলা হয়েছেঃ কোরান, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস। তবে ইজমা হতে হয় কোরান/সুন্নাহর আলোকে, তাই এই সৌর্স্টটি প্রাথমিক দুটি সৌর্সের দিকে ধাবিত হয়। কিয়াসও অমনিতে হয় না। তাও কোরান/সুন্নাহর আলোকে হয়, তাই এ দিক থেকে কিয়াসও সেই প্রাথমিক দুই সৌর্সে নিপতিত হয়। এখানে (এই সাধারণ প্রবন্ধে) আমি যে তাত্ত্বিক দিক exhibit করেছি, তা অত্যন্ত confidently করেছি, এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মত। তবে আপনি হাদিসকে/সুন্নাহকে সোর্স মনে না করে থাকলে আপনার অভিমতের স্থানটা জানতে পারলে ভাল হত। এতে এই ব্লগে আলোচনার একটা নতুন ধারার সংযোগ হবে এবং ব্লগও সমৃদ্ধ হবে। তবে আলোচনাটি শুরু হতে হবে সৌর্স ডেফিনেশন থেকে এবং সেই ডেফিনেশন অনুযায়ী হাদিস কীভাবে সৌর্স হবে না –তা দিয়ে। যদি তা সৌর্স না হয়, তাহলে ইসলামী শারিয়ার প্রিন্সিপল ধারণায় কোন বিঘ্নতা আসবে কী না, তাও দেখতে হবে।

      মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। 

      Note: 1. মাওলান আজিজুল হক, (১৯৮২), বোখারী শরীফ (বাংলা অনুবাদ), ঢাকা: হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১০

  6. 3
    সদালাপ কর্তৃপক্ষ

    যে দলটি এখন নিজেদেরকে ‘কোরান অনলী’ বলে প্রচার করে, বা যারা হাদিস অস্বীকার করে তারা আমাদের দৃষ্টিতে মুসলমান নয়।

    অনুগ্রহ করে এই বাক্যটি লেখা থেকে বাদ দিন। এই বাক্যটি সদালাপের নীতি পরিপন্থী।  

    1. 3.1
      এম_আহমদ

      It has been updated in compliance with the regulation. Thank you.

  7. 2
    মুনিম সিদ্দিকী

    বহু মূল্যবান কথা আছে । পড়ে অনেক কিছু জানা হলো। ধন্যবাদ।

  8. 1
    এস. এম. রায়হান

    বড় হলেও লেখাটি বেশ সুপাঠ্য হয়েছে।

    যে দলটি এখন নিজেদেরকে ‘কোরান অনলী’ বলে প্রচার করে, বা যারা হাদিস অস্বীকার করে তারা আমাদের দৃষ্টিতে মুসলমান নয়।

    সবই ঠিক আছে, তবে সদালাপে কাউকে বা কোন গ্রুপকে 'অমুসলিম/কাফের' ঘোষণা দেওয়াকে উৎসাহিত করা হয় না। এমন ঘোষণা না দিয়েও তারা যে ইসলাম থেকে বিচ্যুত কিংবা বিভ্রান্তকারী, তা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.