«

»

Oct ১১

পাট ও ছত্রাকের ‘জীবন রহস্য’ উন্মোচন সমাচার

জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক সদ্য প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ তার এক নাটকে এক দৈত্যকে নিয়ে এসেছিলেন ঢাকা শহর ভ্রমণে। দৈত্যের গাইড ছিল এক শিশু। শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে তারা যখন পৌঁছুল জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে তখন বিশাল সেই ভবন দেখে সবিস্ময়ে দৈত্য প্রশ্ন  করেছিল, এইটা আবার কি? এত বড় বাড়ি কার জন্যে, কে থাকে এখানে? শিশু গাইড তার তড়িৎ উত্তরে কলকলিয়ে বলেছিল, না না এটা কারো বাড়ি না। এটা হলো ঝগড়া ঘর। এখানে বড়রা বসে বসে ঝগড়া করে।

এহেন ‘ঝগড়া ঘরে’ সম্প্রতি ঘটেছে বেশ ব্যতিক্রমী ঘটনা। দেশের প্রধান মন্ত্রী স্বয়ং বেশ ঘটা করে, বিশেষ আভিজাত্যের সাথে ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের দুই দুইটি আবিষ্কারের (!) কথা। বলেছেন, তার সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একদল বাংলাদেশী বিজ্ঞানী বিশ্বের বুকে প্রথমবারের মত ‘উন্মোচিত’ করতে সক্ষম হয়েছেন পাট ও একটি ছত্রাকের ‘জীবন রহস্য’ !!

দেশী বিজ্ঞানীদের সাফল্য বলে কথা। তাই  সঙ্গত কারণেই পত্রিকাগুলোতে শিরোনাম হয়েছে খবর দু’টো। প্রধান প্রধান পত্রিকাতে সচিত্র ফলোআপ রিপোর্টও হয়েছে অনেক, এখনও হচ্ছে। ঘোষিত ও প্রকাশিত তথ্যগুলো থেকে জানা যাচ্ছে যে দুটো ‘আবিষ্কার’ বস্তুত একই ধরণের। প্রধান বিজ্ঞানী এক। বিজ্ঞানী দলের অন্যান্য সদস্যগণও মোটামুটি অভিন্ন। প্রধান মন্ত্রী যেই আবিষ্কারকে পাট ও ছত্রাকের ‘জীবন রহস্য’ উদঘাটন বলে উল্লেখ করেছেন তাকে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে পত্রিকাগুলো ‘জেনোম সিকুয়েন্স’ বলে উল্লেখ করেছে। বলা আবশ্যক যে শব্দটা ‘জেনোম’ নয় ‘জিনোম’ (Genome)। বিজ্ঞানীরা সাংবাদিকদের কাছে শব্দটার যে উচ্চারণই করে থাকুন না কেন পরিষ্কার ইংরেজিতে লিখা শব্দটার প্রকৃত উচ্চারণ যেনে নেয়া ডিজিটাল এই যুগে কোন কঠিন ব্যাপার ছিল না। বিজ্ঞানীরা কষ্ট শিষ্ট করে জাতিকে যা উপহার দিলো দেশের বাঘা বাঘা পত্রিকাগুলো সেটার সঠিক উচ্চারণও দেশবাসীকে জানাতে পারলো না, ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক।

অতি সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে জিনোম হলো যেন একটা পুঁতির মালা যেখানে ডিএনএ নামক সুতোর মধ্যে গাঁথা থাকে পুঁতি তুল্য অসংখ্য জিন। প্রাণীর প্রজাতি যত উন্নত তার জিনোমও হয় ততই জটিল তথা দীর্ঘতর সুতোর মধ্যে অধিক সংখ্যক জিন। মালা বানাতে পুঁতিগুলোকে হতে হয় সাধারণত একই আকার, প্রকার ও রকমের অর্থাৎ হোমজিনিয়াস (Homogeneous)। কিন্তু জিনোমের মধ্যে সাজানো জিনগুলো একই রসায়নে নির্মিত হলেও সেগুলোর আকার আকৃতিতে থাকতে পারে বিস্তর ফারাক অর্থাৎ জিনোম নামক মালার জিন নামক পুঁতিগুলো হতে পারে কোনটা ছোট্ট কোনটা আবার বেঢপ বড়। দুই জিনের মাঝখানে থাকতে পারে জিন বিহীন শুধুই ডিএনএ তথা কোন রকম পুঁতি বিহীন শুধুই লম্বা সুতো যা কিনা আদর্শ যে কোন মালাতে একেবারেই অসম্ভব।  মালার পুঁতিগুলোর মূল কাজ হলো অনুপম সৌন্দর্য সৃষ্টি করে দর্শকের মন মাতানো তাই সেগুলোর আকার-আকৃতি একই ধাঁচের হওয়াটা খুবই যথার্থ কিন্তু জিনোমের মধ্যে সাজানো জিনগুলোর কাজ করে থাকে দৃষ্টির আড়ালে, নীরবে-নিভৃতে তাই এগুলোর বিবিধ-বিচিত্র আকার-আকৃতিতে কারোরই কিছু যায় আসে না। শুধু কাজ হলেই হলো। কাজে মধ্যেই নিহিত এদের আসল পরিচয়। জিনোমের মধ্যে এমন জিনও থাকতে পারে যার হয়তো আপাত কোন কাজ নেই অথবা কি যে সেটার কাজ তা এখনও অজানা। আবার এমনও হতে পারে যে হয়তো সেটা কোন একটা নির্দিষ্ট কাজ করছিল কিন্তু এখন আর কাজটা করছে না বা করতে পারছে না। একটা জিনের কাজ করতে পারা বা না পারা আবার নির্ভর করে অনেক পরিপার্শ্বিক বিষয় বা ফ্যাক্টরের উপর।

জিনোমের মধ্যে বসে থেকে জিনগুলো কি কাজ করে এবং কিভাবে করে সেটা আর একটু খোলাসা করে বুঝতে সচিবালয়ের  উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মন্ত্রী-সচিবদের এই আলয়ে লম্বা করিডোর জুড়ে ঘরের পর ঘর সাজানো থাকে লাইন ধরে। একেক ঘরে বসেন একেক কাজের মন্ত্রী বা সচিব তাই একেক ঘর থেকে আসে একেক প্রকার কাজের আদেশ, নিষেধ ও নির্দেশ আর তার ভিত্তিতেই চলে কোটি কোটি মানুষের একটা দেশ। একই ভাবে জিনোম নামক সচিবালয়ের লম্বা সুতো জুড়ে বসে থাকে যে সব মন্ত্রী তুল্য জিন তারাও একেক জন একেক কাজের জন্যে নির্দিষ্ট। এইসব মন্ত্রী ও সচিব তুল্য জিনগুলোর নির্দেশ ও নির্দেশনা মোতাবেকই পরিচালিত হয়ে থাকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ তুল্য আমাদের এই শরীর তথা প্রতিটি জীবের দৈনন্দিন কার্যক্রম।

বলাই বাহুল্য যে সচিবালয় কিন্তু ইট-কাঠ, লোহা-লক্কড়ের একটা দালান বৈ কিছুই নয়। মন্ত্রী-সচিবরা সেখানে না থাকলে আর দশটা দালানের মতই সচিবালয়ও একটা সামান্য বাসা-বাড়ি বা দালান মাত্র। কোন মন্ত্রী যদি মন্ত্রণালয়ে না বসে নিজের বাড়িতে বসেন তাহলে সেই বাড়িটাই কিন্তু হয়ে দাঁড়ায় তার কাজের কেন্দ্র। একই ভাবে জিনগুলো বসে আছে বলেই জিনোমের এত গুরুত্ব। কোন জিন যদি জিনোম ছেড়ে বাসা বাঁধে অন্য কোথাও তাহলে সেইখানেই ছুটতে হয় সেটার জন্যে নির্ধারিত কাজের বিষয়াদি জানতে। অনেকটাই ক্ষমতার পেছনে দৌড়ানো মত যার সাথে আমরা সবাই কম বেশী পরিচিত।

সুতরাং আমরা যখন ‘জিনোম সিকুয়েন্স’ হাতে পাচ্ছি তখন মূলত: সচিবালয়ের দালানটার নক্সা তথা নীল নক্সাটাই শুধু জানতে পারছি। সেই নক্সা দেখে আমরা হয়তো বলতে পারছি সেখানে কয়টা ঘর আছে, কোন ঘর কোথায় আছে, কোন ঘরটা কোন মুখী করে বানানো হয়েছে ইত্যাদি। তবে কোন ঘরে কোন মন্ত্রী বসছেন তথা কোন ঘর থেকে কোন নির্দেশ আসছে তা কিন্তু  দালানের এই নীল নক্সা হাতে নিয়ে বলা সম্ভব নয়। সেটা নিশ্চিত করে জানতে হলে প্রয়োজন সরেজমিন সচিবালয় ভিজিট করে আসা।

একই ভাবে জিনোম সিকুয়েন্সকেও সাধারণত ‘বংশগতির নীল নক্সা’ (Genetic Blue print) হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। জিনোমটা যদি কোন উচ্চতর শ্রেণী ভুক্ত প্রাণীর হয় তাহলে শ্রেণীর স্তর অনুযায়ী সেটা হতে পারে জটিল থেকে জটিলতর। এ ধরণের জটিল জিনোমের সিকুয়েন্স করাকে অনেকটা বিশাল কোন রহস্য ঘেরা বাড়ির হারিয়ে যাওয়া নীল নক্সা (Blue print) উদ্ধারের সাথে তুলনা করা যায়। এক্ষেত্রে হারানো ম্যাপ উদ্ধার করাটা লুক্কায়িত ধন-দৌলত উদ্ধারের পথে একধাপ অগ্রগতি হলেও সম্পদের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত সেটা বস্তুত একখণ্ড কাগজ বৈ কিছু নয়। শুধু ম্যাপটা হাতে পেয়েই একথা বলা যাবে না যে পোড়ো বাড়িটার সব রহস্য ভেদ হয়ে গেছে। জিনোম সিকুয়েন্সকে আবার কখনও কখনও একটা শহরের টেলিফোন ডাইরেক্টরির সাথেও তুলনা করা হয়। একটা ডাইরেক্টরি থেকে শহরের কোন কোণায় কোন ব্যক্তির বসবাস, তার হোল্ডিং নাম্বার কত, ফোন নাম্বার কত জানা যায় কিন্তু সেটা থেকে শহরের প্রতিটা লোকের চেহারা-ছবি, স্বভাব চরিত্র জানা সম্ভব নয় কখনই।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে সচিবালয়ের একটা মাত্র কক্ষ অথবা পোড়ো বাড়ির গুপ্তধন পূর্ণ ঘরটা খুঁজে পাওয়ার মতই জিনোমের মধ্য থেকে শুধু একটা দরকারি জিন খুঁজে বের করে সেটার কার্যক্রম বিষয়ে জানতেই অবস্থা হতে পারে ত্রাহি ত্রাহি। মাত্র একটা জিন নিয়ে কাজ করতে করতেই শেষ হতে পারে বিজ্ঞানীর জীবন, পার হতে পারে  বছরের পর বছর। এমতাবস্থায় শুধু জিনোম সিকুয়েন্সের ডাটা হাতে নিয়ে পাট আর ছত্রাকের ‘জীবন রহস্য’ পুরোপুরি আবিষ্কার বা উদ্ধার করার দাবী যে কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন তা বলে বোঝানো দুষ্কর। দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীর এহেন ঘোষণা খুবই হাস্যকর।

বলা আবশ্যক যে লক্ষ মানুষের টেলিফোন ডাইরেক্টরি তৈরি করতে পারাটা কোন ভাবেই হালকা কোন বিষয় নয়। তেমনি কোন গাছ-গাছালি বা জীবের পুরো জিনোম সিকুয়েন্স হাতে পাওয়াটাও কোন ফেলনা বিষয় নয়। তাই জিনোম সিকুয়েন্স করে আমাদের বিজ্ঞানীরা অপরাধ করে ফেলেছেন সেটা কোন ভাবেই বলা যাবে না এবং তেমন কিছু বলাও এখানে উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যতটুকু ডাটার ভিত্তিতে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে যে ভাবে এবং যে ভাষায় কথিত আবিষ্কারের ঘোষণাগুলো করা হয়েছে তা যে কোন বিবেচনাতেই অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি এবং আনাড়িপনা বিশেষ। দেশের কোন বিজ্ঞান সম্মেলনে বক্তব্য আকারে বিষয়টার উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদেরকে ধন্যবাদ দেয়াটাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারতো। সেটাই হতো যথার্থ ও শোভন। তবে সেখানেও এটাকে ‘জীবন রহস্য’ উদঘাটন বলা যুক্তিযুক্ত হতো না। কারণ যে সিকুয়েন্স উদঘাটন করা হয়েছে সেখানে কোন জেনেটিক কোডকে ‘ডি-কোড’ করা হয়নি, কোডগুলো যে ভাবে লিখা রয়েছে ঠিক সেভাবেই সেটাকে পাঠ করা হয়েছে মাত্র। তাই এটাকে ‘জীবনের ছক বা নীল নক্সা পাঠ করা হয়েছে’(Reading of Genetic BluePrint) বলাটাই যে কোন বিচারে অধিক যুক্তি সংগত। জিনোম সিকুয়েন্সে যেহেতু কোন জেনেটিক কোডকে ডি-কোড (Decode) করা বা উন্মোচিত করা হয় না তাই বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরণের অর্জনকে ‘মৌলিক আবিষ্কার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াটাও কষ্টসাধ্য। জিনোম গবেষণায় কোন একটা প্রয়োজনীয় জিনের সিকুয়েন্সসহ যখন সেটার সুনির্দিষ্ট মূল কার্যক্রম উদঘাটন করা সম্ভব হয় তথা নির্দিষ্ট একটা জিনটাকে যখন পুরোপুরি ডি-কোড করা যায়  শুধু তখনই সেটাকে একটা ‘মৌলিক আবিষ্কার’ বলা যেতে পারে। কিন্তু সেটাকেও ‘জীবন রহস্যের’ সম্পূর্ণ উদঘাটন বলার কোনই উপায় নেই। একটা জীবনের পুরো কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত থাকে শত শত, হাজার হাজার জিন তাই দুই, চার, দশটা  জিন ডি-কোড করেও ‘জীবন রহস্য’ উন্মোচনের দাবী কেউ করে না। এমন উদ্ভট দাবী বোধকরি শুধুমাত্র সব সম্ভবের এই বাংলাদেশেই সম্ভব।

উল্লেখ্য বিভিন্ন জিনোম সিকুয়েন্স থেকে এ পর্যন্ত এ রকম অনেক প্রয়োজনীয় জিনের কর্ম ধারা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং সেসব ব্যবহারিক জ্ঞান খুব কার্যকর ভাবে প্রয়োগও করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই। বিশেষ করে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় রোগীর নির্দিষ্ট জেনেটিক গঠনের সাথে ম্যাচ করে ঔষধ নির্বাচন করা এখন খুবই জনপ্রিয়। মূলত একারণেই উন্নত দেশগুলোতে জিন ও জিনোম সিকুয়েন্স করা এখন হয়ে পড়েছে অনেকটা বাণিজ্যিক রুটিন ওয়ার্কের মত। এসব দেশে শহরের অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে জিন সিকুয়েন্স করার প্রতিষ্ঠান। অব্যাহত চাহিদার কারণে সিকুয়েন্স মেশিনগুলোও হয়ে উঠেছে রোবটের মত, এসেছে হাই-থ্রু-পুট-সিকুয়েন্সর (High throughput sequencer)। কয়েক বছর আগেও যেখানে হাজার বেস পেয়ারের (Base pair) একটা জিন সিকুয়েন্স করতে গলদঘর্ম হতে হতো সেখানে এখন তা করা হচ্ছে চোখের পলকে। অনেকটাই ফটো কপি করার মত অবস্থা যেন। তাই হাজারো সিকুয়েন্সের ডাটাতে এখন ভরপুর হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট সব ওয়েব সাইট। চাহিদা মেটাতে গড়ে তোলা হয়েছে সব ধরণের জিন ও জিনোমের বিশাল বিশাল সব রেফারেন্স ডাটাবেস। পৃথিবীর যেখানে যত জিন ও জিনোম সিকুয়েন্স হচ্ছে তা বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে প্রকাশিত হয়ে সাথে সাথেই জমা হচ্ছে ঐ সব ডাটাবেসে এবং পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের ঘরে ঘরে, প্রতিটি কম্পিউটারে। তাই প্রত্যেকেই জানতে পারছে এসব জিন ও জিনোম সিকুয়েন্স। অর্থাৎ যে কোন প্রয়োজনে যে কারোর ব্যবহারের জন্যে সেসব উন্মুক্ত থাকছে সর্বদা। সে কারণেই শুধুমাত্র জিনোম সিকুয়েন্স করাকে এখন আর বিশেষ কোন আবিষ্কার বলে গণ্য করা হচ্ছে না।

সর্বদা উন্মুক্ত ও সহজ লভ্য হলেও জিন নিয়ে গবেষণা করা সবার জন্যে সহজ সাধ্য নয়। এই গবেষণায় দরকার হয় উন্নত মানের প্রচুর পরিমাণ কেমিক্যাল, বায়ো-কেমিক্যাল । প্রয়োজন হয় ল্যাবে তৈরি বিভিন্ন মাত্রা ও মাপের ডিএনএ, আরএনএ খণ্ড। দরকার হয় পিসিআর-এর জন্যে উন্নত মেশিন। মান উন্নত হওয়ার কারণে এগুলোর দাম অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে আকাশচুম্বী। উপরন্তু এসব গবেষণায় কার্যকর ডেটা পেতে সময় লাগে প্রচুর। মাসের পর মাস কাজ করে পৌঁছাতে হয় লক্ষ্যে। সঠিক ডেটা পেতে অনেক ভুল-ভ্রান্তি ও ব্যর্থতার পথ পাড়ি দিতে হয় বিধায় অর্থের শ্রাদ্ধ হয় বিস্তর। এমনতর অন্তহীন অর্থ ও সময়ের ঝুঁকি নিতে পারা এবং চাওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও রসদ-কেমিক্যালের সরবরাহ নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন রাখাতে পারার কারণে এই ধরণের গবেষণা চালিয়ে নেয়া শুধুমাত্র উন্নত দেশগুলোর পক্ষেই সম্ভব। আমাদের মত দেশে এ ধরণের গবেষণার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বস্তুত অসম্ভব। সেজন্যেই সাগর-রুনি মামলার ডিএনএ টেস্টগুলো করাতে হয়েছে আমেরিকায়। ঢাকা মেডিক্যালে যে ডিএনএ ল্যাব আছে সেটা চালাতেও সব কিছু আনতে হয় ডেনমার্ক থেকে।  আইসিডিডিআর,বি পুরোটাই চলে আমেরিকার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও ব্যবস্থাপনায়। জিন টেকনোলজির যাবতীয় কেমিক্যাল ও যন্ত্রপাতির একতরফা সাপ্লাইয়ার হওয়ার কারণে এরা স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এরকম দুই একটা ল্যাব গড়ে তোলে নিখরচায় যা কিনা বস্তুত সম্প্রসারিত করে তাদের রপ্তানি বাজার এবং বাঁচিয়ে রাখে তাদের দেশীয় কোম্পানিগুলোকে। পাট ও ছত্রকের যেই জিনোম সিকুয়েন্স নিয়ে এত হৈচৈ বস্তুতপক্ষে সেসবও করা সম্ভব হয়েছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশগুলোর ল্যাবরেটরি ব্যবহার করেই। এমনকি যে সব বিজ্ঞানী এই প্রজেক্টগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও কোন না কোন উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠিত গবেষক এবং আমাদের দেশের দ্বৈত নাগরিক।

এখানেই শেষ নয়, ঐ সব উন্নত দেশের বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশ হওয়া এবং সেখানকার ডাটাবেসে যুক্ত হওয়া ছাড়া কোন ডিএনএ সিকুয়েন্সই এখন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় না। কোন প্রেসিডেন্ট-প্রধান মন্ত্রীর ঘোষণা বা দাবী সেখানে অচল-মূল্যহীন। আমদের বিজ্ঞানীদের করা সিকুয়েন্স কোন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশের আগেই অন্য কোন দেশের বিজ্ঞানীরা যদি তা প্রকাশ করতে সক্ষম হয় তাহলে আবিষ্কারের কৃতিত্ব যাবে তাদেরই কাছে, আমাদের প্রধান মন্ত্রীর ঘোষণা সেখানে বাড়তি কোন সম্মান পাবে এমন আশা করা বৃথা। পাটের জিনোম সিকুয়েন্সের ঘোষণার সময় প্রজেক্টের প্রধান বিজ্ঞানীও এই দ্রুত পাবলিকেশনের কথাই বলেছিলেন । কিন্তু ছত্রাকের সিকুয়েন্স সম্পন্ন করে সেই বিজ্ঞানীই এখন বলছেন যে পাট ও ঐ ছত্রাক বিষয়ে জানতে বিশ্বকে নাকি অবশ্যই আমাদের কাছেই আসতে হবে। এর দ্বারা তিনি কি পাট ও ছত্রাকের জিনোম সিকুয়েন্সগুলো সিন্দুকে তালা মেরে রাখার কথা বোঝাতে চেয়েছেন কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে পঠিত সিকুয়েন্সগুলোর গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে এগুলোকে যখন সাময়িকীতে প্রকাশ করা হবে তখন যে কোন বিজ্ঞানীই দরকার মত এসব নিয়ে গবেষণা করতে পারবে এবং তাদের যে কোন অর্জন মূলত তাদের কৃতিত্ব বলেই স্বীকৃত হবে। সেক্ষেত্রে মূল জিনোমের ‘প্রথম পাঠক’ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশী গবেষকদের নাম রেফার করাই বৈজ্ঞানিক ধারা আইন অনুযায়ী ঐ গবেষকদের জন্যে যথেষ্ট হবে। শুধু এটুকুই হবে আমাদের পাওয়া আর কিছু নয়।

তবে অন্যরা কিছু করার আগেই এই জিনোমগুলো থেকে যদি সংশ্লিষ্ট দেশী বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় ও উপকারী কোন ‘জিন আবিষ্কার’ করে আমাদের পাট শিল্পকে চাঙ্গা করে তোলার পথ দেখাতে পারেন তবে সেটাই হবে সত্যিকারে উৎসবের উপলক্ষ। একগাদা বিদেশী ল্যাবের সহায়তায় যখন পাটের জিনোম সিকুয়েন্স সম্পন্ন করার ঘোষণা করা হলো তখন ধরেই নিয়েছিলাম যে একই ধারাবাহিকতায় এখন হয়তো সুনির্দিষ্ট জিন আবিষ্কারের দিকে নজর দেয়া হবে। বিদেশী সহায়তা ছাড়া এহেন গবেষণা যখন আমাদের সাধ্যের বাহিরে তখন প্রাপ্ত সহযোগিতা কাজে লাগাতে পারলে পাটের জন্যে প্রয়োজনীয় কিছু জিন হয়তো এই ধাক্কায় আমরা পেয়েও যেতে পারতাম। কিন্তু ঐ লাইনে অগ্রগতির কোন খবর না দিয়েই হঠাৎ-ই ভিন্ন আরেকটা জিনোম সিকুয়েন্স উদঘাটনের ঘোষণা শোনার পর থেকেই পাটের জিন গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বোধ করছি। আশংকা করছি পাটের দরকারি গবেষণা বাদ দিয়ে এখন হয়তো একের পর এক জিনোম সিকুয়েন্স উদঘাটন করে উদ্ভট সব ‘জীবন রহস্য’ উন্মোচনের হুজুগ উঠবে দেশ জুড়ে। এমনতর আবিষ্কারে মূলো হাতে সহজেই প্রধান মন্ত্রীর নজরে আসা যাবে মনে করে এই লাইনে অচিরেই অনেক নতুন সন্ন্যাসীর আগমন যে ঘটবে তা বলা যায় নির্দ্বিধায়। সরকারে থাকা সুবিধা গোষ্ঠীও হয়তো তাই-ই চাইবে কারণ স্বল্প সময়ে বিশাল বাজেট গায়েব করে দেয়ার এই যে নতুন ক্ষেত্র এটা একেবারে আনকোরা বিধায় ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিনিময়ে আমরা যে একেবারেই শূন্য হাত থাকবো তাও হয়তো নয়। এহেন ‘আবিষ্কারের পুরষ্কার’ হিসেবে ডানা কাপ-গোথিয়া কাপ মার্কা কিছু ‘চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি’ হয়তো হতভাগ্য এই জাতির কপালে জুটলেও জুটে যেতে পারে।

 সংশ্লিষ্ট সকলের বোঝা উচিত যে এটা এখন আর পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগের সেই বিশ্ব নেই। শক্তিমত্ত ‘ইনফো-টেক’ আমাদের সকলকেই এখন একটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর বাসিন্দা করে ছেড়েছে। এখানে কোন ভেল্কিবাজিই এখন আর কার্যকর হবার নয়। আর বিজ্ঞান নিয়ে ভেল্কি, সে তো দিবা স্বপ্ন মাত্র।

লস এঞ্জেলস, ইউএসএ

১৪ comments

Skip to comment form

  1. 7
    শামস

    পত্রিকায় যতটুকু পড়েছিলাম, তারা পেটেন্ট এর জন্য আবেদন করেছে। মৌলিক কাজ ছাড়াতো পেটেন্ট হবে না। তার জিনোমকে যেভাবে পাঠ করেছে অন্য যে কেউ সেটা করতে পারে। পেটেন্টটা কি ধরণের মৌলিক কাজ নিয়ে, প্রথম পাঠ নেয়ার মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ?
    ধন্যবাদ।
     

  2. 6
    শামস

    আচ্ছা এই প্রজেক্টে কত খরচ হয়েছে, মূল যোগানদাতা কে? আপনি যেভাবে বললেন তাতে মনে হলো এই জিনোম গবেষণায় তারা বাইরের সাহায্য নিয়েছে, তাহলে ভবিষ্যতে পাট ও ছত্রাকের জিনোম গবেষণার তথ্যের জন্য কেবল দেশী বিজ্ঞানীদের কাছে আসতে হবে কেন, যারা সাহায্য করছে তাদের স্বত্বওতো এখানে থাকার কথা।
    লেখাটি সুখপাঠ্য। আরো লিখুন। ধন্যবাদ।
     

    1. 6.1
      সরোয়ার

      আচ্ছা এই প্রজেক্টে কত খরচ হয়েছে, মূল যোগানদাতা কে?

      এটা সম্পূর্ন সরকারী ফান্ডে চলছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এর চেয়ে বড় কোন ফান্ড বরাদ্দ হয়নি। সাভারে অবস্থিত ন্যাশনাল বায়োটেকনোলজি ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারে বরাদ্দ ছিল ২৭ কোটি টাকা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুধুমাত্র ছত্রাক ও পাটের জিনোম সিকুয়েন্সিং এর জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৬ কোটি টাকা!  জেনোম সিকুয়েন্সিং করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিজ্ঞানীও জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে  জেনোম সিকুয়েন্সিং এর প্রধান বিজ্ঞানীর সাথে   ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সম্পর্কের টানাপোড়ন সৃষ্টি হওয়ার কারণে তাদের মধ্যকার কলাবোরেশন ভেংগে গেছে।

      পাটের জেনোম সিকুয়েন্সিং করার পর দেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এ প্রজেক্টের প্রধান বিজ্ঞানীর ব্যবহারে দেশের বিজ্ঞানীদের সেই উদ্দীপনা আর নেই। শুনেছি, পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠানে  বাইরের কোন বড় বিজ্ঞানীকেও ঢুকতে দেয়া হয় না। এতে অনেকই মনঃক্ষুন্ন। সিকুউরিটি সিস্টেম আমেরিকার আর্মি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মত কড়াকড়ি! বাস্তবতা হচ্ছে সেখানে কোন আহমরী গবেষণা হচ্ছে না। যে রিসার্চ হচ্ছে তা সাধারণ ল্যাবে হয়ে থাকে। তাছাড়া জেনোম সিকুয়েন্স থেকে সুফল ভোগ করার মত সত্যিকারে ইনফ্রাস্ট্রাকচার এখনো দেশে গড়ে উঠেনি।

      পত্রিকার সাক্ষাতকারে পড়েছি যে জেনোম সিকুয়েন্সিং করতে নাকি ৬০০-৮০০ কোটি লাগার কথা কিন্তু উনারা নাকি ৬০+ কোটি টাকায় করেছেন! কঠোর বাস্তবতা হচ্ছে, সিকুয়েন্সিং করা জটিল কিছু নয় এবং তেমন ব্যয়বহুলও নয়। অনেক কোম্পানী আছে যারা টাকার বিনিময়ে সিকুয়েন্সিং করে দেয়। দেশের মানুষের অজ্ঞতা সুযোগে তিনি অনেক কিছু অতিরঞ্জিত করছেন। এনটিভির সাক্ষাতকারে বলা হচ্ছিল যে সিকুয়েন্সিং করে কী লাভ হবে? প্রধান বিজ্ঞানীর জবাব শুনে রীতিমত হতবাক হয়েছি। বায়ো-সায়েন্স গবেষণায় বহুলভাবে ব্যবহরিত এনজাইম (ট্যাক পলিমারেজ, এটা একটি জিন থেকে প্রস্তুত করা হয়)  এর কথা বলে বলা হলো এর মার্কেট ভ্যালু হচ্ছে ৮/৯ বিলিয়ন ডলার।  এই জিনটির দিকে ইংগিত করে তিনি বলেন “আমাদের ছত্রাকের আছে ১৪ হাজার জিন”। তার মানে অর্থ দাঁড়াচ্ছে আমরা শুধুমাত্র ছত্রাকের সিকুয়েন্সিং করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার কমাই করব!!! দেশের মানুষের ইমোশন ও অজ্ঞতার সুযোগে তিনি অতিরঞ্জিত করছেন। বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে রাস্তার পলিটিশিয়ানদের মত আচরণ করলে এতে বরং বিজ্ঞানের অগ্রগতি পশ্চাতমুখী হবে।

      সরকার বিজ্ঞানের জন্য বাজেট দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানীদের উচিত তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা। তা না হলে পরবর্তীতে বাজেট বরাদ্দ কমে যেতে পারে।

      1. 6.1.1
        শামস

        ধন্যবাদ।
         

  3. 5
    সাদাত

    জানলাম। আপনাকে ধন্যবাদ।

  4. 4
    সরোয়ার

    অত্যন্ত সময়োপযোগী লেখা। ধন্যবাদ। পাটের ও ছত্রাকের জিনোম সিকুয়েন্সিং নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা স্পষ্ট নয়। আমার মতে লেখা বিশেষ ফোকাসগুলো হচ্ছে --

    সর্বদা উন্মুক্ত ও সহজ লভ্য হলেও জিন নিয়ে গবেষণা করা সবার জন্যে সহজ সাধ্য নয়। এই গবেষণায় দরকার হয় উন্নত মানের প্রচুর পরিমাণ কেমিক্যাল, বায়ো-কেমিক্যাল । প্রয়োজন হয় ল্যাবে তৈরি বিভিন্ন মাত্রা ও মাপের ডিএনএ, আরএনএ খণ্ড। দরকার হয় পিসিআর-এর জন্যে উন্নত মেশিন। মান উন্নত হওয়ার কারণে এগুলোর দাম অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে আকাশচুম্বী। উপরন্তু এসব গবেষণায় কার্যকর ডেটা পেতে সময় লাগে প্রচুর। মাসের পর মাস কাজ করে পৌঁছাতে হয় লক্ষ্যে। সঠিক ডেটা পেতে অনেক ভুল-ভ্রান্তি ও ব্যর্থতার পথ পাড়ি দিতে হয় বিধায় অর্থের শ্রাদ্ধ হয় বিস্তর। এমনতর অন্তহীন অর্থ ও সময়ের ঝুঁকি নিতে পারা এবং চাওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও রসদ-কেমিক্যালের সরবরাহ নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন রাখাতে পারার কারণে এই ধরণের গবেষণা চালিয়ে নেয়া শুধুমাত্র উন্নত দেশগুলোর পক্ষেই সম্ভব। আমাদের মত দেশে এ ধরণের গবেষণার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বস্তুত অসম্ভব। সেজন্যেই সাগর-রুনি মামলার ডিএনএ টেস্টগুলো করাতে হয়েছে আমেরিকায়।

     

    পাটের জিনোম সিকুয়েন্সের ঘোষণার সময় প্রজেক্টের প্রধান বিজ্ঞানীও এই দ্রুত পাবলিকেশনের কথাই বলেছিলেন । কিন্তু ছত্রাকের সিকুয়েন্স সম্পন্ন করে সেই বিজ্ঞানীই এখন বলছেন যে পাট ও ঐ ছত্রাক বিষয়ে জানতে বিশ্বকে নাকি অবশ্যই আমাদের কাছেই আসতে হবে। এর দ্বারা তিনি কি পাট ও ছত্রাকের জিনোম সিকুয়েন্সগুলো সিন্দুকে তালা মেরে রাখার কথা বোঝাতে চেয়েছেন কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে পঠিত সিকুয়েন্সগুলোর গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে এগুলোকে যখন সাময়িকীতে প্রকাশ করা হবে তখন যে কোন বিজ্ঞানীই দরকার মত এসব নিয়ে গবেষণা করতে পারবে এবং তাদের যে কোন অর্জন মূলত তাদের কৃতিত্ব বলেই স্বীকৃত হবে। সেক্ষেত্রে মূল জিনোমের ‘প্রথম পাঠক’ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশী গবেষকদের নাম রেফার করাই বৈজ্ঞানিক ধারা আইন অনুযায়ী ঐ গবেষকদের জন্যে যথেষ্ট হবে। শুধু এটুকুই হবে আমাদের পাওয়া আর কিছু নয়।
     

    তবে অন্যরা কিছু করার আগেই এই জিনোমগুলো থেকে যদি সংশ্লিষ্ট দেশী বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় ও উপকারী কোন ‘জিন আবিষ্কার’ করে আমাদের পাট শিল্পকে চাঙ্গা করে তোলার পথ দেখাতে পারেন তবে সেটাই হবে সত্যিকারে উৎসবের উপলক্ষ। একগাদা বিদেশী ল্যাবের সহায়তায় যখন পাটের জিনোম সিকুয়েন্স সম্পন্ন করার ঘোষণা করা হলো তখন ধরেই নিয়েছিলাম যে একই ধারাবাহিকতায় এখন হয়তো সুনির্দিষ্ট জিন আবিষ্কারের দিকে নজর দেয়া হবে। বিদেশী সহায়তা ছাড়া এহেন গবেষণা যখন আমাদের সাধ্যের বাহিরে তখন প্রাপ্ত সহযোগিতা কাজে লাগাতে পারলে পাটের জন্যে প্রয়োজনীয় কিছু জিন হয়তো এই ধাক্কায় আমরা পেয়েও যেতে পারতাম। কিন্তু ঐ লাইনে অগ্রগতির কোন খবর না দিয়েই হঠাৎ-ই ভিন্ন আরেকটা জিনোম সিকুয়েন্স উদঘাটনের ঘোষণা শোনার পর থেকেই পাটের জিন গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বোধ করছি।
     

    আশংকা করছি পাটের দরকারি গবেষণা বাদ দিয়ে এখন হয়তো একের পর এক জিনোম সিকুয়েন্স উদঘাটন করে উদ্ভট সব ‘জীবন রহস্য’ উন্মোচনের হুজুগ উঠবে দেশ জুড়ে। এমনতর আবিষ্কারে মূলো হাতে সহজেই প্রধান মন্ত্রীর নজরে আসা যাবে মনে করে এই লাইনে অচিরেই অনেক নতুন সন্ন্যাসীর আগমন যে ঘটবে তা বলা যায় নির্দ্বিধায়।

     
    সরকারে থাকা সুবিধা গোষ্ঠীও হয়তো তাই-ই চাইবে কারণ স্বল্প সময়ে বিশাল বাজেট গায়েব করে দেয়ার এই যে নতুন ক্ষেত্র এটা একেবারে আনকোরা বিধায় ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিনিময়ে আমরা যে একেবারেই শূন্য হাত থাকবো তাও হয়তো নয়। এহেন ‘আবিষ্কারের পুরষ্কার’ হিসেবে ডানা কাপ-গোথিয়া কাপ মার্কা কিছু ‘চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি’ হয়তো হতভাগ্য এই জাতির কপালে জুটলেও জুটে যেতে পারে।

     

    1. 4.1
      মঈনুল আহসান

      ধন্যবাদ সারোয়ার। এই বিষয়ে তোমার লিখাগুলো থেকেই মূলত আমার এই লেখার সূত্রপাত। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি বিষয়টাকে সবার জন্যে খুব সাধারণ ভাবে উপস্থাপন করতে। সেটা করতে গিয়ে উদাহরণের পর উদাহরণের টানতে হয়েছে যে কারণে লিখাটা আকারে হয়ে গেছে বড়সড়। খুব শিগগির লিখটা কোন না কোন জাতীয় দৈনিকে দেখতে পাবে ইনশাআল্লাহ। তোমাকে অগ্রিম ঈদ মোবারক। মাহবুব ভাইকে আমার সালাম দিও।

      1. 4.1.1
        সরোয়ার

        জেনে ভাল লাগল।  দেশে বিজ্ঞানের উন্নতি আমরা সবাই কামনা করি। কিন্তু বিজ্ঞানী কোন বিষয়কে অতিরঞ্জিত করলে তাতে বিজ্ঞানে উন্নতির চেয়ে ক্ষতির আশংকা বেশী থাকে।  

  5. 3
    মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী

    ধন্যবাদ। পড়ে ভাল লাগল।

    এমনতর আবিষ্কারে মূলো হাতে সহজেই প্রধান মন্ত্রীর নজরে আসা যাবে মনে করে এই লাইনে অচিরেই অনেক নতুন সন্ন্যাসীর আগমন যে ঘটবে তা বলা যায় নির্দ্বিধায়।http://www.shodalap.org/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

     

    1. 3.1
      মঈনুল আহসান

      আপনাকেও ধন্যবাদ।

  6. 2
    নির্ভীক আস্তিক

    আপনার লেখাটি পড়ে ভাল লাগল । তবে পাঠক হিসেবে কিছু অনুরোধ । বিষয়বস্তুর সাথে বর্ণনা Compact করলে সেটা আরো Readable হয় । আর কিছু reference কিছু ছবি দিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ করলে ভাল দেখায় । যেমনঃ নিউস পেপার গুলোর সমালোচনা করেছেন তার সাথে  তাদের এই সংবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ২-৩ টি পেজ লিঙ্কও দিয়ে দিতে পারতেন ।  আবার জিনোম এর ভাল ব্যাক্ষা দিয়েছেন, তাঁর সাথে ২-৩ টি ছবি দিয়ে অল্প কথায় আরো সহজে Compact বর্ণনায় নিয়ে আসতে পারতেন ।

    1. 2.1
      মঈনুল আহসান

      অনেক ধন্যবাদ গঠন মূলক বক্তব্যের জন্য। আপনার নির্দেশনাগুলো আগামীতে কাজে লাগাবো ইনশাআল্লাহ।  

  7. 1
    এস. এম. রায়হান

    আপনার লেখাগুলো বেশ বড় হয়। আরেকটু ছোট করা যায় কিনা ভেবে দেখবেন। 

    1. 1.1
      মঈনুল আহসান

      ধন্যবাদ রায়হান ভাই। খুব চেষ্টা করছি আরও কম্প্যাক্ট লিখার। চেষ্টা চলতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। আপনাকে আবারও ধন্যবাদ। ভালো থাকুন, অগ্রিম ঈদ মোবারক।

Comments have been disabled.