«

»

Jul ১৮

নারীত্ব, মাতৃত্ব এবং শিশুর অধিকার

এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সন্তান জন্ম দেয়া। যিনি মা হয়েছেন একমাত্র তিনিই জানেন দুঃসহ এই কষ্ট ও বেদনার ব্যপকতা। সময় সাপেক্ষ এই প্রক্রিয়ার জন্য নারী দেহকে তৈরী হতে হয় বছরের পর বছর ধরে। সে দেহে পরিবর্তন সাধিত হয় প্রতি মূহুর্তে, প্রতি সপ্তাহে, প্রতিটি মাসে। পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের সেই ধাপগুলোও আবার একেকটা একেক রকম। জটিল থেকে জটিলতর। ব্যথাতুর থেকে ব্যথাময়। এমন ব্যপক প্রস্তুতিযজ্ঞের পর নিজের মাঝে সুপ্ত প্রাণকে ধারন করে তাকে তিলে তিলে বড় করে তুলতে যে তীব্র যাতনাময়, অতি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করতে হয় তাতে শুধু গর্ভাশয়ই নয় বরং অংশ নিয়ে থাকে মায়ের দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণুও। সন্তানের বীজ বা ভ্রুনের সূচনা যেখানেই হোক না কেন মাতৃদেহে প্রতিস্থাপন ছাড়া সেটাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া অসম্ভব। শুধুমাত্র আদিমতম যুগল ছাড়া আর যে-ই জন্মেছে এই ভূবনে তাকেই এখানে আসতে হয়েছে মায়ের জঠর হয়ে। শুধু গর্ভ ধারনেই শেষ নয়, জন্ম লাভের পরপরই সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আবাস হিসেবে মাতৃক্রোড়ও অত্যাবশ্যক ও অবসম্ভাবী বলে স্বীকৃত। মায়ের কোলের নিরাপদ শান্তিময় উষ্ণতা সন্তানের জন্য নিঃসন্দেহে এক অবিশ্বাস্য ও অনবদ্য সৃষ্টি। মায়ের দুধের মতই মায়ের কোলও নবজাতকের জন্য বিকল্পহীন। তাই যদি বলা হয় নারীর মাঝেই আমাদের এই সভ্যতার জন্ম ও বিকাশ তবে সম্ভবতঃ খুব একটা ভুল বলা হবে না। ঘুরিয়ে বললে কথাটা দাঁড়ায় নারী বিনা সভ্যতা অসম্ভব তথা মানব সভ্যতার বিস্তারে নারীই মূখ্য।

মানব শিশু জন্মায় অসহায়। মুষ্ঠিবদ্ধ ক্ষুদ্র দু’টি হাত শূন্য ছুঁড়ে চিৎকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষমতা থাকে না তার। অধিকার প্রকাশের কোন ভাষা থাকে না মুখে। মাথা তুলতে পারে না, চোখও খুলতে পারে না অনেক সময়। ক্ষুৎ-পিপাসা, ঠান্ডা-গরম কিছুই বুঝাতে পারে না। তবুও তার কোন চাহিদা অপূর্ণ  থাকে না। গর্ভের ভেতর নাড়ী দিয়ে যেমন সে মায়ের দেহ থেকে আহরন করে তার খাদ্য। তেমনি জন্ম মাত্রই সে আশ্রয় ও খাদ্য পেয়ে থাকে সেই মায়ের দেহ থেকেই। বস্তুতঃ জঠরে প্রতিস্থাপনের সাথে সাথেই মায়ের দেহ-মনে প্রতিষ্ঠিত হয় সন্তানের অধিকার। এটা এমনই এক অধিকার এবং তা এতটাই সুসংরক্ষিত ও সুসংহত যে কোন ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা চাওয়া-পাওয়ার হিসেব তাতে ব্যত্যয় ঘটাতে পারে না। এই অধিকার বলেই সীমহীন অসহায়ত্ব নিয়ে জন্মের পরও নবজাতক তার মায়ের কাছ থেকে পূরণ করে নিতে পারে তার প্রতিটি চাওয়া।  শিশুর প্রতিটি নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাঠ করতে বাধ্য থাকে তার মা। মায়ের উপর সন্তানের এই অধিকার স্থান, কাল, পাত্র নির্বিশেষে সর্বব্যাপী এবং সর্বত্র একই ভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। তাই জন্মমাত্রই নাড়ীর বন্ধন কেটে ফেলা হলেও মায়ের সাথে সন্তানের আত্মার বাঁধন ছেঁড়ে না কখনই। সেই বাঁধনের টানেই গভীর নিশীথে শিশু নড়ে উঠলেও মা বুঝে ফেলে তার প্রয়োজন। গর্ভ কালের মতই জন্মের পর নবজাতককে বড় করে তোলার নীবিড় পরিচর্চা কালেও মায়ের অন্তর, আত্মা, মস্তিস্ক থেকে শুরু করে দেহের প্রতিটি লোমকুপ পর্যন্ত ত্রস্ত ও তৎপর থাকে সর্বক্ষণ। শিশুর জন্ম ও বিকাশের সুকঠিন এই চক্র পূরণ করতে গিয়ে যমে-মানুষে টানাটানির ঘটনা প্রযুক্তির এই চরম উন্নতির যুগেও অপরিচিত কোন বিষয় নয়। শ্বাসরূদ্ধ সেই পরিবেশ-পরিস্থিতিতে যে সব শিশু হয় মাতৃহারা তাদের জন্য বিকল্প মা হিসেবে অতি আবশ্যিক ভাবেই বেছে নেয়া হয় অন্য একজন নারীকেই, কোন পুরুষকে নয়। নবজাতক পালনের গুরু দায়িত্বে পুরুষকে যোগ্য বিবেচনা করা হয় না কখনই। এর অন্যতম কারণ হলো শিশুর জন্যে স্নেহপূর্ণ নিরাপদ মায়ের কোল একান্ত ভাবে শুধুমাত্র মেয়েদেরই সম্পদ এটা কোন পুরুষের থাকে না।

তাই যে কোন বিবেচনাতেই একথা বলা চলে যে, একমাত্র না হলেও, সন্তান ধারন ও পালনই একজন নারীর পবিত্রমত প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, প্রতিটি মাংসপেশী শুধুমাত্র সন্তান ধারন ও পালনের সুনির্দিষ্ট সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বিশেষ ভাবে সৃষ্ট। এই দেহ থেকে পাওয়া যে কোন ধরনের ব্যক্তিগত সুখ-সম্ভোগ নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী এবং সেটাও মূলতঃ ঐ সন্তান ধারনের লক্ষ্যেই নিবেদিত ও সেই প্রক্রিয়ারই অনিবার্য অণুসংগ মাত্র। মেয়েদের এই সুস্পষ্ট জন্মগত দায়িত্ব, অধিকার ও বিশেষত্বের জন্যেই ‘সন্তানহীনা নারীর জীবন অসম্পূর্ণ’ কথাটা এখনও হয়ে আছে বিশ্বজনীন। স্মরণাতীত কাল থেকে বিশ্বের আপামর নারী সমাজ তাদের সমস্ত নারীত্ব ও দেহ-মনকে এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে অকৃপণ ভাবে উৎসর্গ করেছেন বলেই পৃথিবী আজ মুখরিত হয়ে উঠতে পেরেছে শত সহস্র কোটি আদম সন্তানের পদাচারনা এবং সমৃদ্ধ মানব সভ্যতায়।

এহেন অনন্য সৃষ্টি যে নারী তাকে পণ্য হিসেবে হাটে-মাঠে, টিভি-সিনেমা-বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনে বেচাকেনা করা, আর্ট-কালচার বা স্মার্টনেসের নামে তাকে উন্মুক্ত প্রদর্শন করা অথবা মূল কাজের বাহিরে তাকে ফালতু কাজে ঠেলে দেয়া শুধু মহা অন্যায়ই নয় বরং বিশ্বের সমস্ত নবজাতকের সংরক্ষিত অধিকারের উপর তা অবৈধ হস্তক্ষেপ তথা সমগ্র মানব জাতির সাথে নির্বিচার বেঈমানীও বটে। অথচ বিশ্ব বিবেক এ ব্যপারে আজ কি নিদারুন ভাবেই না নির্লিপ্ত।

আমাদের মহিলা প্রধানমন্ত্রী যখন প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় সভায় দেশের নারী সমাজকে উপদেশ দেন পোশাক-পরিচ্ছদে উগ্রতা পরিহারের জন্য তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এটা এখন আমাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় সমস্যা। তারুণ্যের ‘কথিত ফ্যাশন’ স্বর্বস্ব্য উত্তেজনা আর উন্মাদনায় আজ যারা পাতলা, স্কীন টাইট অথবা সংক্ষিপ্ত পোশাকের আড়ালে নিজেদের ‘প্রাইভেট অর্গান’গুলোকে  ‘পাবলিকলি’ প্রদর্শন করতে ব্যগ্র তাদেরকে বুঝতে হবে যে এর দ্বারা তারা বস্তুতঃ ‘দূর্গন্ধময় ময়লা আবর্জনার ট্রাক’ খোলা অবস্থায় পথে-ঘাটে চালানোর মতই ‘পাবলিক নূইসেন্সের’ সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলছেন নিজেদের অজান্তেই যা কিনা সাধারন নাগরিক জীবনকে অত্যাচারিত ও দূর্বিসহ করে তোলার নামান্তর বিশেষ।  তাদেরকে এটাও মনে রাখতে হবে যে এসব একান্ত নিজস্ব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের  উপর রয়েছে তাদের অনাগত সন্তানদের জন্মগত দাবী, প্রয়োজন ও অধিকার। ভবিষ্যতের ‘সেই তারা’ আসবে বলেই আজকের ‘এই প্রজন্ম’ হতে পেরেছে এইসব প্রত্যঙ্গের মালিক। তাই এগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও যথার্থ ব্যবহারের জন্য প্রতিটি প্রজন্মের প্রত্যেকে তাদের পরবর্তি প্রজন্মের কাছে ব্যক্তিগত ভাবে দায়বদ্ধ। এ বিষয়ে যে কোন মুহুর্তের যে কোন ধরনের ভাবাবেগময় শৈথিল্য বা স্বেচ্ছাচারিতা নিজের ভবিষ্যত শিশুদের কাছে ক্ষমার যোগ্য না হওয়ার সম্ভবনাই বেশী।

আগামীতে আপন শিশুর প্রশ্নবাণ ও রোষানল থেকে বাঁচতে প্রত্যেককে তাই সতর্ক হওয়া উচিত এক্ষুনি। পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দের ব্যপারে নিজের উপর আস্থা না থাকলে সাহায্য নেয়া যেতে পারে আজকের শিশুদের। সমাজে একমাত্র ‘অবুঝ শিশুরাই’ পারে চরম সত্য কথা অকপটে বলতে। তাই তাদেরকে জিজ্ঞেস করে খুব সহজেই জেনে নেয়া যেতে পারে আমাদের আজকের পরিধেয় পরিচ্ছদের গ্রহণযোগ্যতা। এতে নিজের অযাচিত নোংরা উপস্থাপনা থেকে আমরা যেমন বাঁচতে পারি তেমনি রক্ষা পেতে পারি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার হাত থেকেও।

লস এঞ্জেলস, ইউএসএ

৪ comments

Skip to comment form

  1. 3
    আবদুস সামাদ

    মইনুল সাহেব, আপনার লেখাটা খুবই সুন্দর হয়েছে। পোষাকের ব্যপারে, আমরা বিদেশে বর্তমানে যা দেখি, তাহল, মায়ের মুখের ভাষা যেমন বাচ্চা রপ্ত করে, তেমনই তার আচার আচরণ, পোষাকও নকল করে। একমাত্র খোদাভীরুতাই পারে আমাদের সঠিক রাখতে। এবং বাচ্চাকেও সেই মত অভ্যাস করাতে হবে। ধন্যবাদ।

  2. 2
    মঈনুল আহসান

    শ্রদ্ধেয় রায়হান ভাই
    মানতেই হবে যে অতি অসাধারণ আপনার সূক্ষ্মদৃষ্টি। আমি অবশ্যই মনে রাখবো এবং মেন চলবো আপনার সদুপদেশ। বারাবরের মত আপনাকে আবারও অনেক ধন্যবাদ আপনার সতর্ক, সুন্দর, মূল্যবান এবং মননশীল বক্তব্যের জন্য।

    1. 2.1
      এস. এম. রায়হান

      লজ্জা দিলেন ভাই। আমার লেখার সাহিত্যিক মান বেশ দুর্বল হওয়াতে অন্যান্য বিষয়গুলোতে একটু বেশী গুরুত্ব দেই বলতে পারেন। সত্যি বলতে আপনার লেখাতে সাদা চোখে ভুল ধরার মতো কিছু নাই তথাপি সব দিক দিয়ে পারফেক্টনেস নিয়ে আসার জন্য আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস আরকি -- যেহেতু আপনার লেখার সাহিত্যিক মান, শব্দ চয়ন, এবং উপস্থাপনা যথেষ্ট ভাল মনে হয়েছে।

  3. 1
    এস. এম. রায়হান

    আপনার প্রতিটি লেখা-ই দারুণ হচ্ছে। বিষয়বস্তু এবং উপস্থাপনা নিয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। তবে নিচের শব্দগুলোতে ‘ন’ এর স্থলে মনে হয় ‘ণ’ হবে। মনে রাখার সহজ একটি উপায় হচ্ছে ‘র’ বর্গের পর চোখ বন্ধ করে ‘ণ’ বসিয়ে দেয়া! শতভাগ ক্ষেত্রে না হলেও প্রায় কাছাকাছি পর্যন্ত কাজে দেয়।

    [ধারন, ধরন, ভ্রুনের, আহরন, পদাচারনা, নিদারুন, সাধারন]

    কিছু তুচ্ছ টাইপো: 

    [মানব শিশু জন্মায় অসহায়। মুষ্ঠিবদ্ধ ক্ষুদ্র দু’টি হাত শূন্য [শূন্যে] ছুঁড়ে চিৎকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষমতা থাকে না তার।]      

    [এই অধিকার বলেই সীমহীন [সীমাহীন] অসহায়ত্ব নিয়ে জন্মের পরও নবজাতক তার মায়ের কাছ থেকে পূরণ করে নিতে পারে তার প্রতিটি চাওয়া।]

    [গর্ভ কালের মতই জন্মের পর নবজাতককে বড় করে তোলার নীবিড় পরিচর্চা [পরিচর্যা] কালেও মায়ের অন্তর, আত্মা, মস্তিস্ক থেকে শুরু করে দেহের প্রতিটি লোমকুপ [লোমকূপ] পর্যন্ত ত্রস্ত ও তৎপর থাকে সর্বক্ষণ।]

Leave a Reply

Your email address will not be published.