«

»

Sep ১০

১১ সেপ্টেম্বর ২০০১

[এক]

ঝকঝকে নাতিশীতোষ্ণ এমন দিন আমেরিকার মিড ওয়েষ্টার্ণ ষ্টেট নেব্রাস্কায় (Nebraska) এক কথায় বিরল। চরমপন্থীদের চরম মেজাজের মত এখানকার আবহাওয়াও সাধারণত চরমভাবাপন্ন। হয় গরম নয়তো ঠান্ডা অথবা ভয়াল টর্নেডোর চরম উচ্ছৃঙ্খলতা। আর শীতকালের তুষার ঝড় তো রীতিমত দুঃস্বপ্ন। অথচ নাইন-ইলেভেনের সেই মঙ্গলবার সকালটা ছিল পুরোপুরি বাসন্তী। এমন দিনে ইউনিভার্সিটির পথে বাসা থেকে বেরিয়ে সবচেয়ে বেশী মনে হচ্ছিল আমার রুমানীয়ান ল্যাবমেট ববির কথা। মনের হাসি চেপে রাখতে পারছিলাম না তার কথা ভেবে। সবার কাছে ‘ফানি বয়’ বলে পরিচিত এই বেচারাকে আজ আর ল্যাবে রাখা যাবে না। এমন মিষ্টি রোদেলা দিনগুলোতে যেনতেন প্রকারে বসের ঠান্ডা চোখ ফাঁকি দিয়ে হলেও ববি বের হয়ে থাকে ‘চিকস হান্টিং’-এ। তাকে আজ ঠেকানোর কোন উপায় নেই।

সকাল সোয়া আটটার ল্যাব তখনও জন-মানবহীন। ডটকম  সভ্যতার এই যুগে অন্যসব কর্মজীবীর মত আমারও অভ্যাস দিনের কাজ শুরু করার আগে ই-মেইলে চোখ বুলানো। কম্পিউটার রুমে ঢুকে দেখি আমি নই, আমারও আগে এসে হাজির রাশিয়ান নাতাশা। তার পাশের কম্পিউটার দখল করে বসতেই অতি বিস্মিত কন্ঠে নাতাশা জানতে চাইলো, ‘তুমি কি জানো যে টুইন টাওয়ারে প্লেন ক্রাশ করেছে’।  তার দিকে না তাকিয়েই জানতে চাইলাম, ‘কিভাবে হলো, পুরো শহরেই আগুন লেগেছে নাকি’? নাতাশা জানালো সে অতশত কিছুই জানে না, ঘর থেকে বের হওয়ার মুখে একটা টিভি ফুটেজ দেখেছে মাত্র।

ঘড়িতে তখন সকাল আটা বেজে বিশ মিনিট। সেন্ট্রাল টাইম। নিউ ইয়র্ক থেকে এক ঘন্টা পেছনে। ই-মেইল ফেলে ক্লিক করলাম এমএসএন কভার পেজে। তারপর সিএনএন। নাহ, দুর্ঘটনার কোন খবরই নেই। স্কৃনের কোণায় একটা নিউজ পেজ খোলা রেখেই ফিরে গেলাম ই-মেইল একাউন্টে। নতুন একটা ম্যাসেজে ক্লিক করে নিউজ পেজে চোখ ফেরাতাই দেখলাম পাল্টে গেছে হেড লাইনঃ প্লেন ক্রাশড অন টুইন টাওয়ার। পর মূহুর্তেই হেড লাইনে পাশে ছবি- ধুমায়িত টুইন টাওয়ারের উর্ধ্বাংশ। নিউজ থেকে ফিরতে হলো ই-মেইলে। সম্ভাব্য নতুন চাকরির বার্তা নিয়ে মেইল এসেছে ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি থেকে। বায়োটেকের এক অধ্যাপক আমার ইন্টারভিউ নিতে চান ফোনে। জানতে চেয়েছেন ফোন করার যথোপযুক্ত সময় ও নাম্বার। উত্তরে ল্যাবের নাম্বার দিয়ে অনুরোধ করলাম সকাল দশটা নাগাদ ফোন করার জন্য। ইন্টারভিউ-এর সময়টাতে ফ্রি থাকতে হবে। তাই কিছু কাজ গুছিয়ে রাখতে হবে তার আগেই। ব্যস্ত হয়ে ঢুকলাম ল্যাবে। দেখলাম সেখানেও কম্পিউটার মনিটরে চোখ রেখে অন্য দুই ল্যাবমেট জানার চেষ্টা করছে প্লেন ক্রাশের ঘটনাটা। আমাদের ল্যাবের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, সদা ব্যস্ত সিনিয়র সায়েন্টিস্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিউজ পড়া এড়াতে ছেড়ে দিল রেডিও। সেখানে তখন চলছে প্লেন ক্রাশের সরাসরি ধারা বিবরণী। ভাষ্যকারেরা ধীরে সুস্থে বলে চলেছেন কি ঘটেছে, কি ভাবে ঘটেছে, উদ্ধার কাজ কিভাবে শুরু হচ্ছে ইত্যাদি। বিবরণীতে কান রেখেই শুরু করেছি দিনের কাজ। মাথায় তখন সারা দিনের রিসার্চ প্ল্যান। সেই সাথে সমাগত ফোন ইন্টারভিউ-এর জন্য মাথা ভর্তি প্রশ্নোত্তর চিন্তা।

হঠাৎই মনে হলো ঘরের মধ্যে যেন একটা বজ্রপাত হলো। শোনা গেল রেডিও ভাষ্যকারদের চরম অবিশ্বাস ভরা ভয়ার্ত চিৎকার। তাদের কথার সোজা অর্থ, ‘অসম্ভব-অবিশ্বাস্য, এই মুহুর্তে আরো একটা প্লেন অন্য টাওয়ারটাতে আঁছড়ে পরলো। নিঃসন্দেহে এটা আত্মঘাতী’। তৎক্ষনিক ভাবে স্তব্ধ হয়ে গেল সমস্ত ল্যাব। জীবনে প্রথমবারের মত উপলব্ধি করলাম শিরদ্বার বেয়ে নেমে যাচ্ছে বরফ শীতল এক সরীস্রীপ। অশ্রুতপূর্ব বিস্ময় আর চোখে মুখে চরম অবিশ্বাস নিয়ে হঠাৎ ইলেন্ট্রিক শক খাওয়া রোগীর মতো ফ্যাল ফ্যাল করে আমরা সবাই তাকিয়ে থাকলাম রেডিও দিকে। অতঃপর সব কাজ বন্ধ। যেখানে যত কম্পিউটার ছিল খুলে দেয়া হলো সব। শুরু হলো ডজন খানেক মনিটর জুড়ে বিবিধ চ্যানেলের সচিত্র ধারা বর্ণনা। জানা গেল আরো দুটো প্লেন তখনো নিখোঁজ। বলা হলো পরবর্তি ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে সব ফ্লাইট। আমেরিকার প্রক্ষাপটে, যেখানে দিনের প্রতিটা মুহুর্তে প্রায় চার হাজার প্লেন উড়ন্ত অবস্থায় থাকে আকাশে, সেখানে অনির্দিষ্ট কালের জন্য সব ফ্লাইট বন্ধের ঘোষণা ছিল অসম্ভব, অভাবিত। সে এক অবিশ্বাস্য অবস্থা। অধিক শোকে পাথর হওয়ার মতো ঘটনার আকস্মিকতায় আর চরম বিস্ময়ে আমরা সবাই বাকরূদ্ধ। বিস্ময় রূপ নিল আতংকে যখন ভাষ্যকারেরা বললো, ‘এই মুহুর্তে খবর পেয়েছি তৃতীয় একটা প্লেন আঘাত করেছে পেন্টাগনে। অন্য আরেকটি প্যাসেঞ্জার প্লেন এখনো গন্তব্যচূত্য। ধারনা করা হচ্ছে সেটাও হাইজ্যাক করা হয়েছে এবং যে কোন সময় আঘাত হানতে পারে হোয়াইট হাউজে’। কম্পিউটার মনিটগুলোতে ততক্ষণে ভেসে উঠেছে লাল রং-এর ব্যানার হেড লাইন ‘আমেরিকা আন্ডার এ্যটাক (America Under Attack)’। শ্বাসরূদ্ধকর সেই ক্ষণগুলোতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন মহাপ্রলয়ের নিকটবর্তী। আতংক আর উত্তেজনায় নিজের হূদস্পন্দনও যেন শুনতে পাচ্ছিলাম স্পষ্ট। উত্তেজিত ভাষ্যকারেরা ভয়ার্ত কন্ঠে বারবার একে অপরকে প্রশ্ন করছিল, ‘প্রেসিডেন্ট কোথায়? ভাইস প্রেসিডেন্ট কি করছেন? তারা কি নিরাপদ আছেন?’

অবশেষে জানা গেল যে চতুর্থ প্লেনটা ভেঙ্গে পড়েছে পেন্সিলভেনিয়ার বিরাণ প্রান্তরে। ফ্লোরিডা সফররত প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ান উড়ে গেছে অজ্ঞাতলোকে। আর ভাইস প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে হোয়াইট হাউজের সুরক্ষিত পাতালপুরীতে। সব অজানাকে যেনে কিছুটা যেন থিতিয়ে এলো ভাষ্যকারদের উদ্বেগাকুল কন্ঠগুলো। তাই স্বভাব মত তারা তখন পুরোদমে শুরু করে দিল ‘উইচ হান্টিং’। ‘কার এত দুঃসাহস, কারা করলো এই সাঁড়াশি লোমহর্ষক আক্রমণ, কোথায় ছিল সুপার পাওয়ার আমেরিকার সুপার-ডুপার সব ওয়ার হেডস’ ইত্যাদি।

[দুই]

প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে আমরাও ততক্ষণে ফিরে পেয়েছি দম নেয়ার কিছুটা সময়। বুঝতে অসুবিধা হলো না যে সন্দেহের সব আঙ্গুলগুলো এখন নির্দশিত হবে মুসলমানদের দিকে। দ্রুত চিন্তা করলাম করণীয়। সবচেয়ে চিন্তা স্কুলের বাচ্চাকে নিয়ে। যদিও এখানকার স্কুলগুলো সুরক্ষিত তবুও ওয়েষ্টার্ণ ‘হেইট ক্রাইম’ মানে না কোন স্থান-কাল-পাত্র। উপরন্তু এই চরম উত্তেজনার সময় বাচ্চাকে আনাতে গেলে পথেও ঘটতে পারে বিপদ। ফোন করলাম স্কুলে। জানতে চাইলাম এমন পরিস্থিতে বাচ্চাদের নিরাপত্তার বিবেচনায় আগাম ছুটির কোন সম্ভবনা আছে কিনা। অমায়িক স্কুল স্টাফ দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠেই আশ্বস্ত করলো আমাকে। বললো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সঙ্গে এও বললো যে এরপরও অনেকেই বাচ্চা নিয়ে গেছে, চাইলে আমিও নিয়ে আসতে পারি আমার বাচ্চাকে। তবে তাদের পক্ষ থেকে আগাম স্কুল ছুটির কোন সম্ভবনা নেই। একটু থেমে আরো ভারী গলায় আস্তে আস্তে স্পষ্ট করে বললো, ‘এটা ভয়ানক দুঃখের একটা ঘটনা। আশা করি এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর ঘটবে না। উত্তরে বললাম, ‘আমারও সেই একই প্রার্থনা’।

স্কুলের পরিস্থিতি নিশ্চিত হয়ে একটু যেন স্থির মনে হলো নিজেকে। বাসায় ফোন করলাম স্ত্রী রুমাকে। মায়ের মন যদি টানে তাহলে হয়তো শত নিরাপত্তার পরও ছেলেকে ফেরত আনবো। কিন্তু লাইন এনগেজ। দশ পনেরো মিনিট পর আবারও রিং করলাম তাও লাইন বিজি। মহা মুশকিলে পড়লাম। ল্যাব ছেড়ে বের হতেও পারছি না লোকজনের অযথা আগ্রহ হতে পারে ভেবে। উপরন্তু বেলা দশটার ইন্টারভিউ কলেরও বেশী বাঁকি নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম আগে বাসায় কথা বলবো তারপর যা হয় করবো। কারণ এমন পরিস্থিতিতে কখন কোথায় যাচ্ছি, কি করছি তা স্ত্রীকে অন্তত জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। এদিকে ল্যাবমেটদেরকে দেখলাম ছোট ছোট জটলা পাকিয়ে আলাপ করতে। অথচ আমি কাছে এগুলেই থেমে যাচ্ছে সবাই। মহা অস্বস্তিকর সেই অবস্থা। অথচ সবার প্রিয় পাত্র না হলেও সবাই জানে যে আমি ল্যাব জমিয়ে রাখি বিস্তর কথা আর আড্ডা দিয়ে। তাই কোন আলাপে আমাকে পেলে কাউকে কখনও অখুশী অন্তত হতে দেখি নি। পরিবর্তিত সেই পরিস্থিতি সাপেক্ষে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে আমরা আবারও সন্দেহের তালিকায়। মুসলমানদের টার্গেট করতে কোন সাক্ষ্য-প্রমাণের যেন দরকার নেই। দ্রুত অবস্থা ব্যাখ্যা করার তাগিদ অনুভব করলাম স্ত্রীকে। কারণ বিকেলে তাকে মেইন রোডের উপর দাঁড়াতে হবে স্কুল ফেরত বাচ্চাকে বাস থেকে বুঝে নেয়ার জন্য। এছাড়াও তাকে আরো বলা দরকার ফোন লাইন যেন ফ্রি রাখে, আজকের ঘটনা বিষয়ে ফোনে যেন বেশী আলাপ না করে। কিন্তু বলি কিভাবে ! তার লাইন সেই প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ এনগেজ। বুঝলাম আজকের দিনটা আমার ইচ্ছামত চলবে না। টুকটাক কিছু কাজ করার চেষ্টা করলাম যদিও কাজ করার কোন অবস্থাই সেদিন ছিল না। সময় কাটানোর জন্য কাজ করার ভান করলাম মাত্র।

অবশেষে ফোনে পেলাম রুমাকে। আমি কিছু বলার আগেই সে শুনিয়ে দিল অনেক নামের লম্বা এক লিষ্ট। আটলাণ্টা থেকে শ্যালিকা লুনা, শিকাগো থেকে ছোট বোন শিউলী, নেব্রাস্কার কলম্বাস থেকে আমাদের আরেক ছোট বোন তৃণা এবং আশেপাশের সমস্ত ভাবীরা একের পর এক লাগাতার ফোন করেছিল। বুঝলাম এদের এই সব ম্যারাথন ফোন আলাপের পরে যে কোন সতর্কবাণীই এখন বৃথা, যা হবার সব হয়েই গেছে। তবু তাকে দ্রুত কিছু করণীয় বললাম। বললাম ফোন লাইনটা যথা সম্ভব ফ্রি রাখতে, বাচ্চাকে আনতে যাওয়ার সময় সতর্ক থাকতে। তবে ছেলেকে স্কুল থেকে আগেভাগে ফিরিয়ে আনতে সেও নিষেধ করলো। ছুটোছুটি করে লোকজনের মনে অযথা আগ্রহ সৃষ্টি করার চেয়ে যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক থেকে পরিস্থিতি বুঝে চলার সিদ্ধান্ত নিলাম।

এদিকে আমাদের ল্যাবসহ পুরো ফ্লোর জুড়ে আর যেন কোন শব্দ নেই শুধুই শোনা যাচ্ছে বিরতিহীন-অবিরল ধারাভাষ্য। এখানে-সেখানে ছেলেমেয়েদের জটলা। চলছে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য সব সম্ভবনা নিয়ে বিস্তর আলাপ। অনুভব করছিলাম সন্দেহের অনেক চোরা চোখ আর তীক্ষ্ণ চাহনি ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে। কারণ ঠিক ঐ মুহুর্তে তাদের সামনে আমিই ছিলাম একমাত্র মুসলিম। এমন সময় ‘ফানি বয়’ ববির ডাক, ‘মঈনুল তোমার ফোন’। বেচারার আজ আর ‘চিকস হান্টিং’-এ যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

ফোন করেছেন ফ্লোরিডা ইঊনিভার্সিটির সেই অধ্যাপক। যদিও সকাল বেলাতেই ই-মেইলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এই ইন্টারভিউ-এর তবুও ভেবেছিলাম নিদারুন এই অনিশ্চিত সময়ে সন্দেহের এক নম্বরে যখন আমরা তখন হয়তো অধ্যাপকের মন চাইবে না একজন মুসলিম চাকরি প্রার্থীর সাথে কথা বলতে। হয়তো ‘পরে আলাপ হবে’ বলে এক লাইনের একটা ই-মেইল করেই এড়িয়ে যাবেন দায়িত্ব। কিন্তু যথা সময়ে তার ফোন পেয়ে বুঝলাম কাজের জায়গা ঠিক থাকলে এবং কাউকে নিজের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মনে হলে আমেরিকানরা যে কোন সময় যে কাউকে কাছে টানতে দ্বিতীয়বার ভাবে না। মনে মনে বাহবা দিতে ভুললাম না এদের এহেন কর্তব্য নিষ্ঠাকে। খুবই স্বাভবিক ভাবে, পুরো দস্তুর প্রফেশনাল ঢংয়ে একটি ঘন্টা ধরে আমার ইন্টারভিউ নিলেন তিনি। সেটা ছিল আরেকটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। এই মহাপ্রলয়ের মুখে এমনিতেই সবার প্রশ্নবোধক দৃষ্টি যখন আমাকে ঘিরে এবং ফোন যখন সবারই দরকার ঠিক তখনই তা দখল করে আলাপ করছি ঘন্টা হিসেবে। কিন্তু প্রফেসর সাহেব ছিলেন নাছোড়বান্দা। শেষমেষ তিনি যখন সেলারি পর্যন্ত আলোচনায় আনলেন তখন বুঝলাম চাকরিটা আমার হয়ে গেছে। বিস্মিত হলাম আরেকবার। কারণ আমি সুনিশ্চিত অন্য কোন দেশ হলে ঐ অবস্থার প্রেক্ষাপটে সন্দেহ তালিকাভুক্ত যে কোন শ্রেণীর প্রার্থীকেই যেনতেন প্রকারে হলেও প্রত্যাখ্যান করা হতো।

এদিকে সংবাদ ভাষ্যগুলো তখনও চলছে পুরো দমে। সাংবাদিকরা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জানাচ্ছিলেন নতুন নতুন সব তথ্য। জানা গেল বিমান বাহিনীর প্রহরায় প্রেসিডেন্ট তখন মহাশূন্যের কাছ থেকে নেমে এসেছেন মর্ত্যলোকে। শুধু মর্ত্যে এসেই ক্ষান্ত হননি, এসেছেন একেবারে আমাদের এই অখ্যাত নেব্রাস্কাতেই। আশ্রয় নিয়েছেন আমাদের দোরগোরায় অবস্থিত এয়ার ফোর্স বেসের সুরক্ষিত সুড়ঙ্গে। এ যেন গরম তেলে পানি পরার মত অবস্থা। সবার উৎকন্ঠা বেড়ে গেল শতগুণ। আমাদের এক সহকর্মী ছাত্র, সে ছিল আবার সাবেক তাইওয়ানীজ আর্মি অফিসার, কোন ভণিতা না করে সবার সামনে বলেই ফেললো, ‘এমনিতেই আছি বিপদে তার উপর ‘তিনি’ এসে জুটেছেন এখানে। ‘তিনি’ এখানে কেন? বের করে দাও ‘তাকে’ এখান থেকে’। উপর্যুপরি ঘটনার ঘনঘটায় তখন সে রকমই মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল প্রেসিডেন্টও সম্ভবতঃ তাদের টার্গেট। সংবাদ ভাষ্যগুলোও সেই আশংকাতেই যেন ঘি ঢালছিল বারবার।

উত্তেজনা অবশিষ্ট ছিল বিকেলে বাসায় ফেরার পথেও। ঘরে ত্রস্ত ছিল স্ত্রী-পুত্র। রাস্তায় কিছু ঘটে কিনা এই শংকায়। নির্বিবাদে ঘরে ফিরে মনে হলো একবার মসজিদে যেতে পারলে ভাল হতো। এমন একটা দিনে সমগোত্রীয় সকলের মতামত ও পরামর্শ অত্যাবশ্যক মনে হচ্ছিল। ফোনে আলাপ করাটাকে কেউই নিরাপদ মনে করত পারছিলাম না। যেই ভাবা সেই কাজ। মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য রওনা হলাম মসজিদে। রুমা অবশ্য ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল যথাসাধ্য। তার বক্তব্য ছিল এই অবস্থার মধ্যে আজকে কেউই আর মসজিদ মুখো হবে না। মসজিদে পৌঁছে দেখলাম রুমার ধারনা ভুল। নিয়মিত মুসল্লিদের প্রায় সবাইকেই পেলাম সেখানে। অবশ্য অন্যদিনের চেয়ে সবাইকেই দেখলাম বেশ চুপচাপ আর গম্ভীর, শুধু সউদীরা ছাড়া। আমরা যেখানে বলার মত কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না সেখানে সউদী বন্ধুরা কথা বলছিল অনর্গল। হেসে কলকলীয়ে গড়িয়ে পড়ছিল একজন আরেক জনের উপর। তাদের এই স্বভাবটাকে আমার কাছে অনেকটাই মনে হয়েছে চায়নীজদের মত, কয়েকজন স্বদেশী একত্র হলেই স্থান-কাল-পাত্র ভুলে কন্ঠস্বর সপ্তমে তুলে আলাপ জুড়ে দেয় ভোরের পক্ষীকুলের মত।

সেদিন নামজে ইমামতি করলো মসজিদের ট্রেজারার পাকিস্থানী সাঈদ। সে এমনিতেই কম কথার গম্ভীর প্রকৃতির লোক। নামাজের পর আমাদের দিকে ঘুরে বসতেই তার মুখটাকে আরো গম্ভীর মনে হলো, যেমনটা হয়ে থাকে গুরুতর কোন সমস্যার কথা বলার আগে। সাঈদ শুরু করলো, ‘আপনারা সকলেই জানেন কি ঘটেছে। আমি বিশ্বাস করি আমরা এখনকার কেউই এই কাজের সাথে জড়িত নই…’। পারিবারিক ভবে যা ভেবেছিলাম সেই একই উপদেশ দেয়া হলো মসজিদ থেকেও- স্বাভাবিক থাকুন, চোখ-কান খোলা রাখুন, যে কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সবার সাথে আলাপ করুন, দরকার হলে পুলিশকে বলুন। নিরাপত্তার কথা ভেবে সিদ্ধান্ত হলো মসজিদের প্রধান দরজা সব সময় বন্ধ রাখার।

[তিন]

চূড়ান্ত অমঙ্গলময় সেই মঙ্গলবারের আতংক আবার ফিরে এলো দুই দিন পরে শুক্রবারে। বিশেষতঃ গিন্নীদের মাঝে। রুমা সাফ জানিয়ে দিল জুমায় যাওয়া যাবে না। ‘হেইট ক্রাইম’ আন্দাজ করার ক্ষেত্রে নারীদের ইনটিউশন বোধকরি প্রখর হয়ে থাকে সব সময়ই। মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার অবধি দিনগুলো গড়ানোর সাথে তাল মিলিয়ে ঘরে ঘরে গিন্নীরা জমিয়ে ফেলেছিল আমেরিকাব্যাপী মুসলিম বিদ্বেষী হামলার সব ফিরিস্তি। সেগুলোর খাতিয়ান দিয়ে রুমা বললো নির্ঘাৎ মসজিদে মসজিদে হামলা হবে আজকের জুমায়। গিন্নীর সব বক্তব্য নীরবে শুনে ল্যাবে এসেছি। শুক্রবারগুলো উইক ডে বিধায় ল্যাব থেকেই মসজিদে যেতে হতো জুমার নামাজ পড়তে। জুমার দিনগুলোতে আমার নিত্যসঙ্গী ছিল আরেক বাংলাদেশী, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের টিনএজ ছাত্র ইমাদ। কুয়েতে বড় হওয়ার সুবাদে কয়েকবার ওমরহ ও হজ্জ করা সদ্য কিশোর উত্তীর্ণ এই তরুনের ইস্পাত কঠিন চরিত্র তাকে মসজদমুখী করে রাখতো সব সময়। নিজের গাড়ী না থাকায় মসজিদের পথে ইমাদ সঙ্গী হতো আমার। প্রতি জুমার মত সেদিনও ল্যাবে ইমাদের ফোন পেলাম যথারীতি বেলা এগারটায়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘নামাজে যাবে’। ত্বড়িৎ জবাব দিল ইমাদ, ‘অবশ্যই’। বললাম, ‘যদি কিছু হয়’। ইমাদের সরল উত্তর, ‘মসজিদে মারা গেলে আলহামদুলিল্লাহ’। ঠিক হলো তাকে তুলে নেব সিটি ক্যাম্পাসের ইউনিয়ন বিল্ডিংয়ের সামনে থেকে। ইমাদের ফোন রাখতেই পেলাম গিন্নীর ফোন। সাধারনতঃ নামাজে বের হওয়ার আগে আমিই তাকে ফোন করে বলে যাই। আজ আমার আগেই সে ফোন করেছে। কোন ভূমিকা না করেই রুমা বললো, ‘শিউলী, লুনা, তৃণা ফোন করেছিল’। বুঝলাম সে এখন ছোট বোনদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি করবে। হলোও তাই, বললো, ‘শিউলী, তৃণা তোমাকে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছে আর লুনা বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেছে অন্ততঃ কিছু দিনের জন্যে হলেও ক্লিন সেভ করে থাকতে’। তাদের সরল বক্তব্য হলো এই মহা দুর্যোগের সময় জুমা-মসজিদ-দাঁড়ি সব কেটে ছেঁটে ক্লিন করে ফেললেও আল্লাহ পাক কিছুই মনে করবেন না। গিন্নীকে কোন রকম সাত-পাঁচ বুঝিয়ে ফোন রেখেই ছুটলাম ইমাদকে তুলে মসজিদের দিকে। মসজিদ সোজা নর্থ ফার্ষ্ট ষ্টৃটে ঘুরতেই চোখে পড়লো গাছপালার আড়ালে পুলিশের গাড়ী। মসজিদের ড্রাইভওয়েতে ঢোকার মুখেও দেখলাম উল্টো দিকে পুলিশ। বুঝলাম পুলিশ কর্ডন করে রেখেছে পুরো মসজিদ এলাকা। অবশেষে সবার সব আশংকা ভুল প্রমাণ করে আমরা নামাজ পড়লাম নির্বিঘ্নে যদিও অন্য জুমার তুলনায় সেদিন মসজিদে মুসল্লি ছিল অর্ধেকেরও কম। তবে সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম মসজিদের লবিতে বিশাল ফুলের তোড়া দেখে। তোড়ার সাথে ছিল একটা চিরকুট তাতে লিখা ছিল, ‘আমরা তোমাদের প্রতিবেশী, তোমাদের শুভাকাঙ্খী, অতীতের মত আগামীতেও আমরা পাশাপাশি থাকবো শান্তির সাথে এটাই আমাদের আশ্বাস, বিশ্বাস ও প্রার্থনা’।

ঐ তিন দিনে প্রায় পঞ্চাশটা ম্যাসেজ রেকর্ড হয়েছিল মসজিদের টেলিফোনে। তার একটা ছিল চরম বিদ্বেষময়, অশ্লীল গালিতে পূর্ণ। করিৎকর্মা পুলিশ দেরী করেনি,  দ্রুত ধরে জেলে পুরেছিল ম্যাসেজ দাতা মাতাল যুবককে। বাঁকি ঊনপঞ্চাশটি ম্যাসেজই ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য, অচিন্তনীয়। ঐ ম্যাসেজগুলোর মূল কথাই ছিল ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব আর সহযোগিতার আগ্রহ। এমনকি কোন কোন ম্যাসেজে এমনও বলা হয়েছিল যে, ‘যদি তোমরা দোকানে-বাজারে যেতে ভয় পাও তবে সংকোচ না করে আমাদেরকে বলো, আমরা করে দেবো তোমাদের হাট-বাজার’।

সব মোটামুটি ঠিকঠাক থাকলেও সেই ‘ফানি বয়’ ববি কিন্তু আমাকে ছাড়ে নি। আমাদের ইতিহাস পাল্টে দেয়া সেই নাইন-ইলেভেনের পর ঘটনার কথিত নেতার নামের অদলে আমার নাম পাল্টে, আমারই শেখানো আধো আধো বাংলায় ববি আমাকে প্রায়ই বলতো, ‘কেমন আছ তুমি মিস্টার মঈনুল মোহামেদ আতা’।।

লস এঞ্জেলস, ইউএসএ


৪ comments

Skip to comment form

  1. 4
    সদালাপ কর্তৃপক্ষ

    বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে চমৎকার একটি লেখা উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। আমেরিকার বেশীরভাগ মানুষের সহনশীলতা, ও মহানুভবতা আপনার লেখায় সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। বস্তুতঃ বিদেশীদের দিকে তাকিয়ে, আমেরিকান পিপলদের মত হাসি-মাখা মুখে অভ্যর্থনা জানাতে পারে, এরকম জাতি বিরল। তবে এগুলি সব আমেরিকার ভিতরে। আমেরিকার বাইরে আমেরিকা কেমন সেটি এখন আলোচনার বাইরেই থাক।  

  2. 3
    সরোয়ার

    অসাধারণ! বর্ননা যে এত জীবন্ত হতে পারে তা এই লেখাই প্রমাণ করে। পড়ছিলাম আর মনে হচ্ছিল যে আমি ঘটনার সাক্ষী! আপনাকে স্যালুট। আরো বেশী বেশী লেখা চাই।

  3. 2
    এস. এম. রায়হান

    ৯/১১ নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আপনার লেখা মানেই বলা যায় একেকটি ছোট মাস্টারপিস। আপনি লিখা থামাবেন না।

    ৯/১১ ঘটনা নিয়ে আমার একটি পোস্ট ছিলঃ http://www.shodalap.org/?p=180

  4. 1
    আবদুস সামাদ

    আপনাকে ধন্যবাদ।প্রথমে আমিও বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে বেশ কিছুদিন এখানে(টরোন্টয়)আমরাও ভয়ে অস্থির ছিলাম।আসল ঘটনা আজও অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.