«

»

Oct ০৪

আধ্যাত্মিকতা

আধ্যাত্মিকতা!! আধ্যাত্মিকতা হল ‘আমি’-কে জানার একটি সহজবোধ্য প্লাটফর্ম। ধর্মের ডাইমেনশনে প্রবেশ করতে হলে আমি কে এবং কি এই প্রশ্নের উত্তর জানা আবশ্যক। এই প্রশ্ন সমাধান না করে, কারো পক্ষে সন্দেহমুক্ত এবং নিষ্টার সাথে ধর্মকে পালন করা সম্ভব হবে না। আমার দেহ, আমার ব্রেইন, আমার ভালবাসা, আমার আনন্দ, আমার দুঃখ, আমার টাকা, আমার সম্পদ, আমার সন্তান …… সব কিছুই আমার কিন্তু কোনকিছুই আমি নই। তাহলে আমি কোথায়? আমরা মুসলিমরা প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে দেখছি, এই ক্ষেত্র তৈরী না করতে পারলে নামাজে একাগ্রতা আনা কখনই সম্ভব নয়। বুযূর্গী/ওলীগন নামাজের সেজদায় গেলে, কখনও মাথা উঠাতে চাইতেন না, কারন তারা নামাজের শান্তির স্বাদ গ্রহণ করেছেন। তাহলে আমি কিভাবে আমার ‘আমি’-কে জানব?

 

নিজ-কে আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই, কারন আমাদের(মানুষ জাতির) চিন্তাশক্তির সীমাবদ্ধতা। সেই স্তরটি হল, ঘুম এবং জাগ্রত-র মাঝখানের অবস্থা। অর্থাৎ সেই স্তরে আপনি ঘুমেও থাকবেন না আবার জাগ্রতও থাকবেন না। আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে জাগ্রত এবং জাগ্রত থেকে ঘুমাতে যাই এবং সবসময় এই আধ্যাত্মিক স্তরটি পার হচ্ছি। কিন্তু আমরা কখনই এই স্তরকে বুঝতে পারি না কারন ইহা অতীব ক্ষুদ্রাংশ সময়। ঘুম ও জাগ্রত মাঝের এই সুক্ষ সময়টাতে নীজে-কে ধরে স্থির রাখতে হয়। মানুষ সাধনার মাধ্যমে এই স্তরে উন্নিত হয় আবার খুব নগন্য সংখ্যক আকষ্কিকভাবে এই স্তরে উপস্থিত হয়ে যায়। যিনি আপনাকে সাধনার মাধ্যমে এই আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার রাস্তা দেখাতে পারেন, উনিই হলেন পীর এবং ওলী।

 

যখন কেউ আধ্যাত্মিক স্তরে নিজ-কে ধরে রাখে, তখন সে সত্যকে দেখতে এবং বুঝতে পারে। নীচে আধ্যাত্মিক স্তরের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলঃ

১। যখন কেউ আধ্যাত্মিক স্তরে প্রবেশ করে, তখন সে ২-টা ‘আমি’ একসাথে দেখতে পায়। অর্থাৎ এই দুনিয়ার ‘আমি’(এই বর্তমান আমি যা আমার মস্তিষ্ক অবস্থান করে বা জী-স্বত্তা) দেখতে পায় তার আসল উৎস-কে, যেখান থেকে সে তার নিজের অস্তিত্ব তৈরী হয়েছে। সেই উৎস হল ‘পরম স্বত্তা’। একটা উদাহারনের মাধ্যমে আরোকটু স্পষ্ট করা যায়। আয়নায় আমি আমার চেহারা দেখি। আমি জানি, আয়নায় যে আমি দেখতে পাই তা আমার একটা কপি। আমি যা করছি, আয়নায় আমার কপি তাই করছে। আমি আসল, আর আয়নার আমি নকল। ঠিক একই রকম, যখন কেউ নিজ পরম স্বত্তার সাথে মিলিত হয়, তখন সে বুঝে ফেলে পরম সত্তাই আসল ‘আমি’, আর এই দুনিয়ার ‘আমি’ একটা বিভ্রান্তি এবং নকল। এই যে খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, আকাঙ্ক্ষা পূরন করছি, মজা করছি, পরিবারের সাথে ভালবাসা, দয়া, মায়া শেয়ার করছি, চাকরী করছি, বাস্তবতার তিতা গ্রহণ করছি, সদালপে এই লিখাটি পড়ছি… তা পুরোটাই একটা আপেক্ষিক এবং বিভ্রান্তি। বাস্তবতায় অর্থাৎ এই দুনিয়ায় আমি যে নকল এবং বিভ্রান্তি তা আমি বুঝতে পারছি না। ইহা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্‌ তায়ালার এক সৃষ্টির কারিশমা।

২। এই স্তর, টাইম এবং স্পেস ডাইমেনশনের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

৩। এই স্তর এবং পরম স্বত্তার কোন আকার বা রঙ নেই।

৪। এই স্তরে সন্তান, অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা/সম্মান, কামনা-বাসনা… কোন কিছুই আমি (দুনিয়ার আমি)-কে মায়ার জালে মোহগ্রস্ত বা আকর্ষিত করে না।

আরো বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা শেয়ার করা ঠিক হবে না। যদি পৃথিবীর সকল লোক আধ্যাত্মিক স্তরের স্বাদ গ্রহন করিতে পারত বা বুঝতে পারত, তাহলে দুনিয়াতে নাস্তিক বলে কেউ থাকত না। আল্লাহ্‌-র ইবাদত করবে নাকি করবে না, সেটা পরের ইস্যু, কিন্তু কেউ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করতে পারত না। যারা যুক্তি নিয়ে লাফালাফি করে, সে বুঝতে পারত তার নিজের অস্তিত্বই এক মহা-যুক্তিহীন।

 

দুনিয়ার আমি(বর্তমান আমি) ৪-টি entity-র সমন্বয়ে তৈরী। জী-স্বত্তা(যা মস্তিষ্ক-কে পরিচালিত করে), অন্তর, মন এবং দেহ(আধ্যাত্মিক স্তরে 'দেহ'-কে হিসেবে আনা হয় না)। অন্তরের রয়েছে অনেক শ্রেনী, শাখা-প্রশাখা এবং ইহা অত্যান্ত জটিল। আধ্যাত্মিক গুরু ঈমাম গাজ্জালী অন্তর সম্পর্কে ‘কিমিয়ায়ে সাআদাত’ এবং ‘মিনহাজুল আবেদীন’ গ্রন্থে অল্প কিছু উপস্থাপন করলেও, এর রহস্য উম্মোচন কারো পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। আধ্যাত্মিক জ্ঞ্যানের সাথে বাস্তবতার জ্ঞ্যান সমন্বয় না করিতে পারিলে অন্তরের জ্ঞ্যান অর্জন উম্মোচিত হবে না। এই জ্ঞ্যান প্রত্যেকে নিজ প্রচেষ্টায় অর্জন করতে হয়, আর এই প্রচেষ্টার ধরনের উপর নির্ভর করবে, কে সরল পথ প্রাপ্ত হবে! যারা অর্থ-সম্পদের মাধ্যমে ভোগ-বিলাসিতায় রয়েছে  এবং যারা সংসার ত্যাগ করেছে, তাদের জন্য অন্তরের জ্ঞ্যান অর্জন অত্যান্ত দুষ্কর বা সম্ভবপর হবে না। গাছ যেমন মাটির উপর দাড়িয়ে থাকে, জী-স্বত্তা তেমনি অন্তরের উপর দাড়িয়ে থাকে। জী-স্বত্তা যখনই অন্তরের সংস্রব ছাড়ে, তখনই আমরা ঘুমের স্তরে চলে যাই। ‘মন’-র প্রধান ফাংশান জী-স্বত্তা ও অন্তরের সম্পর্কস্থাপনকারী। মনের ফাংশান বিচিত্র। আর এই অন্তর-ই ইহ-জীবনের আমলনামার(সকল কর্মের) নিয়ন্ত্রক। 

 

বি দ্রঃ উপরে “আমি” সম্পর্কে যা আলোচিত হল তা মহাসমুদ্রের তুলনায় আঙ্গুলের এক ফোটা পানি।

“তোমাকে উহারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, ‘রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত এবং তোমাদের জ্ঞ্যান দেওয়া হইয়েছে সামান্যই'।" (১৭:৮৫)

৩ comments

  1. 2
    মাহফুজ

    সুরম্য অট্টালিকা, হিরে-মতি, সোনার গহনা,

    প্রতাপ, প্রতিপত্তি, অহঙ্কারী উন্মাদনা,

    আরও যে কত কি!

    নাইবা পেলাম এতসব, তাতে কি;

     

    প্রেমের পিদিম জ্বেলে

    শান্তির ছাউনি তলে ইমানী আশ্রয় দিলে।

    ভোগে নয়, ত্যাগের পথে চলে

    তোমাকে খুঁজে পেলে পরম প্রাপ্তি মেলে।

    সুখে-দুখে, শান্তি ও যুঝায়, তুমি আশা তুমিই ভরসা,

    তোমার নূরের অমোঘ ছোঁয়ায়, দূর হয়ে যায় সব দুরাশা।

     

    শিঙ্গার ফুঁৎকারে শেষ দিবসের টান

    সর্বক্ষণ প্রতিক্ষায় তব এ বান্দার প্রাণ,

    পাপী-তাপী সবে ক্ষমাভিক্ষা চাই

    তুমি বিনা মোর অন্য প্রভু নাই।

     

  2. 1
    Masud Rahman

    We had to wait a very long time but it was worth the wait. Because this was an excellent write-up. We always surrender our spiritual relation with our spirits when practical life forces us to our spirit to get more and more. As a result, our spirit becomes a slave of our daily life, never gets chance to connect with spiritual life, never gets chance to know – who we really are. 

    Again, Mr. Tajul Islam did an excellent job explaining in this articel. Hope there’s more to come from Mr. Tajul Islam in the near future.

    1. 1.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      Many thanks Mr. Masud Rahman for your inspiration & comment.

      অনেকটা সংকোচ ও দ্বিধার মধ্যে ছিলাম এই আর্টিকেল লিখার আগে কারন, আধ্যাত্মিকতা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। যদিও বিস্তারিত কিছু লিখিনি, শুধু একটা ধারনা দিলাম। আর ব্লগে আধ্যাত্মিকতা আলোচনা করা কষ্টদায়ক।  আল্লাহ্‌ সহায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.