«

»

Mar ০৫

অভিজিতের লিখা আর খালামনির গল্প

সকাল ৮ টা। মোবাইলে রিং হচ্ছে। ঘুম ভেঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ফজরের নামাজের জন্য ঘুম ভাঙ্গতে যত কষ্ট, তার চেয়ে বেশী কষ্ট ফজরের পরে হঠাৎ ঘুমিয়ে আবার জেগে উঠতে। রিসিভ করলাম। ঐ পাশ থেকে, “মাসুদ, শুনছিস।” জ্বি, শুনছি। “অভিজিত-কে গতকাল রাতে মেরে ফেলেছে। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।" কথাগুলো স্পষ্ট এবং উদ্বিগ্নময়। কথাটা শুনে, ৩-টা চিন্তা এবং অনুভূতি আমার ভিতরে মূহুর্তেই উপস্থিত হল। (১) যাক, পৃথিবী থেকে এক ইসলাম-বিদ্বেষী বিশ্বলাফাঙ্গার বিদায় হয়েছে। (২) এই ইসলাম-বিদ্বেষী ইসলাম বিকৃত করে যা লিখেছে এবং যেভাবেই লিখুক, তার লিখার উপস্থাপন ছিল সুন্দর। (৩) এই পয়ন্টটি লিখার শেষে উল্লেখ করব।

“মাসুদ, তুই কি এই খবর শুনিসনি?” না খালামনি শুনিনি। “তুই কি টিভির সংবাদ দেখিসনি?” না, আমার টিভি দেখা খুব একটা হয় না। “বলিস কি?” উনি এই কথার মাধ্যমে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেন। খালামনি-কে বলি, একজন মানুষ আরেকজন মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করবেন, তাই স্বাভাবিক। একজন মানুষ খুন হয়ে যাবে, ইহা কোন সাধারণ মানুষের কাম্য নয়, আর একজন মুসলমান হিসেবে তো অবশ্যই নয়। আজ আরজ আলী মাতব্বর-কে খুন করা হলে, আমি অবশ্যই তার পক্ষ হয়ে এই খুনের বিচার চাইতাম কিন্তু এই বিদ্বেষী-কুলাঙ্গার অভিজিৎ সম্পর্কে শুধু চুপ থাকব না, শুকরিয়া আদায় করব। ধর্ম সম্পর্কে কিভাবে মন্তব্য করতে হয়, আরজ আলী মাতাব্বর নাস্তিকদের একজন মডেল। আর আপনাকে আগেও বলেছি, এই অভিজিৎ বিভিন্ন ছদ্মনামে ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাইত, ইসলাম-কে বিকৃত করত। এরা নামে মুক্তমনা কিন্তু মুখোশের আড়ালে এরা বিদ্বেষীমনা, মিথ্যামনা, বিকৃতিমনা, ভণ্ডমনা।

খালামনি সম্পর্কে অল্প দুটি কথাঃ ছোট বেলা থেকেই দেখছি খালামনি নামাজ আদায় করেন, রোজা করেন, হাজী মানুষ। জীবনে অনেকবার উমরা-হজ্জ্ব করেছেন। খালামনির ৩ ছেলেমেয়ে। ৩ জনেই বুয়েট থেকে পাশ করা এবং সকলেই লেখাপড়ায় জিনিয়াস এবং নাস্তিক। কট্টর নাস্তিক। উনার বড় ছেলের পীর হলেন রিচার্ড ডকিন্স। ডকিন্সের সব বই তার আলমারীর সেলফে রাখা। তার মতে, ডকিন্সের মত জ্ঞ্যানী মানুষ এই পৃথিবীতে নেই। ডারউইন তার নবী। খালুজান বাড্ডার নক্সবন্দিয়ার এক পীরের মুরিদ এবং সেই পীর বাবা-কে তিনি তার রামপুরার একটি ফ্ল্যাট দান করে দিয়েছেন। খালুজান নিশ্চিত উনি নিজে জান্নাতি। উনার পীর বাবা উনাকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। খালুজান ১০০% নিশ্চিত। পীর বাবা খালুজানকে জান্নাতের টিকিট দিলেও, তার ৩ ছেলেমেয়েকে আস্তিক বানাতে পারেননি। খালুজানও বুয়েট থেকে পাশ করা। মেট্রিকে কুমিল্লা বোর্ডে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করা। শেষে বলি, খালুজানের পীর-কে উনার বাড্ডার নিজ বাসায় জবহ করা মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে (দৈনিকে ইহা প্রচারও হয়েছে)। কয়েকজন লোক গেরেজ ভাড়া নিবেন বলে ভিতরে ঢুকে পীর বাবাকে জবেহ করে গেলেন। পরে জানা গেল, জবেহ করে খুন করার কারণ ছিল, ধর্ম(মতবাদ) সম্পর্কে মতের অমিল। যেই লোক নীজের সম্পর্কে কিছু জানে না, সে অন্যকে কিভাবে বেহেস্তের টিকিট দেয়? পীর বাবা খুন হয়ে গেলেও খালুজান এখনও তার বিশ্বাসে অটল। উনার সাথে তার পীর বাবা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, তর্ক হয়েছে কিন্তু তারে তার অবস্থান থেকে নাড়ানো যায় নাই। মানুষ পাগল হইলেই শুধু এই অবস্থা হয়। লিখা দীর্ঘ হবে বিধায় আলোচনার ইতি টানলাম।

খালামনির বাসা থেকেই আরজ আলী মাতাব্বর, প্রবীর ঘোষ, হুমায়ুন আজাদের বই পড়া শুরু করি। মোটামুটি তাদের সব বই সেলফে রাখা। খালামনিকে আমীর আলীর ‘দ্যা স্প্রিরিট অফ ইসলাম’, ঈমাম গাজ্জ্বালীর ‘কিমিয়ামে সাহাদাত (৪ খন্ড)’ বই দিই। উনি তেমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। যখন অভিজিতের ‘বিশ্বাস ও বিজ্ঞান’, ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’সহ অনেক আর্টিকেল এবং আকাশের ‘যে সত্য বলা হয়নি’ প্রিন্ট করে দিলাম, তখন উনার উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। উনি আরো চান। আরো প্রিন্ট দিলাম। খালামনি সংশয়ের মাঝে ধর্মকর্ম করেন। সন্দেহ থাকে সবসময়। যুক্তি খোঁজেন। কোরানের অনেক আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। বলি, আপনি খালুজানের কাছে জিজ্ঞেস করেন, আপনার সব সংশয় উনি ক্লিয়ার করে দিবেন। আর উনি না জানলেও উনার পীর তো অবশ্যই জানবেন। যিনি বেহেস্তের টিকিট দিতে পারেন, তিনি এইসব প্রশ্নের উত্তর জানবেন না, এটা কেমন করে হয়? খালামনি খালুজানের সাথে এই ব্যপারে কথা বলতে চান না। এর কারণ আমি নিজেও জানি না। হয়ত ঝগড়াঝাটি এর একটি কারণ।

খালামনি-কে জিজ্ঞেস করি, “আমি” জিনিষ-টা কি? খালামনি স্বীকার করেন, “দেহ”-টা “আমি”-র পোষাক। “আমি”-টা কি এবং কোথায়? আর এগোতে চান না। কারণ, চিন্তা ও অনুভূতির সীমাবদ্ধতা। বলি, “আমি”-র ফয়সালা না করা পর্যন্ত ধর্মের ডাইমেনশনে প্রবেশ করা, আপনার জন্য ঠিক হবে না। নয়ত অভিজিৎ এন্ড গ্যাংদের মত মুদ্রার একপিঠ দেখবেন, অন্য পিঠ দেখবেন না। আপনাকে তার লিখা পড়তে দেই, তার কারণ  মিথ্যার ভিতর থেকে সত্যকে জানার জন্য, ইসলামকে জানার জন্য। ৬ বছরের আয়েশাকে বিয়ে, পালক পুত্রের বউ-কে বিয়ে, নারীদের শস্যক্ষেত্র বানাইছে, দাসী রাখছে, কুরাইজা গোত্রের সকল পুরুষদের কতল করছে, ১৩টা বউ আছিল, গনীমতের মাল লুট করছে, ২৭টা যুদ্ধ করছে………… এইসব নির্বোধ প্রশ্ন অভিজিৎ এন্ড গ্যাংরা করে। রাত ৩-টার সময় প্রচণ্ড শীতের রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার জন্য বিছানা ছাড়তে কেমন অনুভূতি লাগে, তা যারা করে, তারা জানে। নাস্তিকরা ইসলামের যে সব দুর্বলতা তুলে ধরে তারচেয়ে অনেক শক্ত যুক্তি একজন মুসলিম তুলে ধরতে পারে। আমরা মুসলিম। আমরা অনুশীলন করি। আর তারা ইতিহাস পড়ে, তারপর বিকৃত করে। আমরা তাদেরটা জানি, কিন্তু তারা আমাদেরটা জানে না।

খালামনি অভিজিতের লিখা পছন্দ করতেন এবং তার যুক্তিগুলো তুলে ধরতেন অন্যদের কাছে। অভিজিত মারা যাওয়ার সংবাদ সহজে নিতে পারেননি, কারন আর তার লিখা পাবেন না। খালামনি আমায় জিজ্ঞেস করেন, আমি আহত হয়নি কেন? আমি বলি, ভাত রান্না করার সময়, ভাত ফুটছে কিনা তা ২/১ টা টিপে দেখলেই হয়, সব টিপার প্রয়োজন হয়না। এই নির্বোধ বেচে থাকলে, ভবিষ্যতে আর কি লিখত, তা আমার জানা। আর আবু জাহেল মরলে দঃখ পাওয়ার কি আছে? এর মত কত মানুষ আমাদের চারপাশে মরছে, তার কয়টা খবর রাখি?

দেহকে "আমি"-র পোষাক হিসেবে স্বীকার করলেও, নিজ সত্ত্বাকে নিয়ে গবেষণা করতে নারাজ। যুক্তি নিয়ে তার জীবন পরিচালিত করতে পছন্দ করতেন। কিন্তু এখন করেন না। তার ৩ ছেলেমেয়ে ৩ দেশে। সন্তানরা মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগও কম। এই বয়সে খালামনি-খালুজানের নাতিদের নিয়ে খুশীতে জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করা কথা। বার্ধক্যের দরুন, কবরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। সন্তানের জন্য অন্তর নিংড়ানো কষ্ট তার অন্তর চেপে ধরেছে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা। গর্ভের সন্তান যখন বেঈমানি করে, তার তীব্রতা শুধু তারাই জানে। বুঝতে পারে, ভিতরে আরেক জগত আছে। এই কঠিন বাস্তবতার সব প্রশ্নের সমাধান নেই, উত্তর নেই। সব কিছু যুক্তি দিয়ে হয়না। যুক্তি দিয়ে জীবন চলে না।

পেটে যখন ভাত থাকে না, ক্ষুধায় চোখ অন্ধ হয়ে আসে, সন্তানরা ক্ষুধায় কান্না শুরু করে তখন পৃথিবীর কোন যুক্তিই কাজ করে না, লজ্জ্বা-শরম চিরতরে অন্তর থেকে বিদায় নেয়। দুনিয়ার কারো মাথাই কাজ করে না। এই স্টেজে শুধুমাত্র শক্তিশালী ঈমানদারগন ব্যতীত দুনিয়ার কারো পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব না। লাফাঙ্গারা লাফাবেই, তাদের লাফাইতে দেন। মহান সৃষ্টিকর্তা 'লাফানি' এটা পুর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।

(৩) অভিজিৎ যেদিন মারা যান, তার আগেরদিন বই মেলা থেকে “দ্যা গড ডিলুউশান” বইটি ক্রয় করি। আর এর পরদিন তার জীবনের শেষদিন। তার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, ফেইসবুকে ইসলাম গ্রহনের জন্য দাওয়াত দেই, আর সে আমায় ব্লক করে। আজ সে ঐপারে চলে গেছে, এখন সে কেমন আছে? জানবে কি তার শিষ্যরা তার বর্তমান অবস্থা? সে ভেবেছিল, এমনি এমনি দুনিয়ায় এসেছে এবং তার কর্মের হিসাব দিতে হবে না। তার খেয়ালখুশী কর্ম সম্পর্কে কখনই চিন্তা করেনি। নিজেকে নিয়ে ভাবেনি। দেহ, মন, ইনফর্মেটিভ এই ৩-র সমন্বয়ে “আমি” তৈরী, এইরকম মনগড়া নিজের “আমি”-কে সংজ্ঞায়িত করলে, কার কি করার থাকতে পারে? যে নিজের সাথে নিজে বেঈমানি করে, তারে কেউ বুঝানোর ক্ষমতা রাখে না। সৃষ্টিকর্তার সাথে তামাশার খেলা করার পরিনাম সে এখন ভাল করে বুঝতেছে। তার মুরিদেরা তারে স্মরণ করে, এই স্মরণে তার কি উপকারে আসবে???

অহংকারীরা, কুযুক্তিবাদীরা, সীমালঙ্ঘনকারীরা, কুপ্রবৃত্তির অনুসারীরা কখনই সত্য-কে দেখতে পায় না, জানতেও পারে না।

৫ comments

Skip to comment form

  1. 5
    Rafiq

    Nice post

  2. 4
    কিংশুক

    নাস্তিকরা কোনও এক মহাশক্তির পরিকল্পনা ব্যতীত একটা নারী ও পুরুষের শারীরিক ভিন্নতার মাধ্যমে পুরুষ নারীর যৌনতা, সামান্য বীর্যের ভিতরের প্রোগ্রাম ও তা থেকে মাতৃগর্ভ নামক যন্ত্রে পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু তৈরি হওয়া এমনকী একটি জীব কোষের নিখুঁত গঠনের পর্যন্ত সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবেনা। ডারউইনবাদ তো রুপকথা।যে মানুষ নিজের জীবনেরই কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারে না তার বৃথা আস্ফালন হাস্যকর ব্যপার।

  3. 3
    anondo

    hmmmm

  4. 2
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    @সদালাপ কর্তৃপক্ষ:
    ধন্যবাদ, গল্পের শিরোনাম চেঞ্জ করার জন্য। যার জন্য লিখা তার সমঞ্জস্য করে আবার চেঞ্জ করে দিলাম।

    @শাহরিয়ার ভাই, মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  5. 1
    shahriar

    Alhamdulilla..
    Very well said..

Leave a Reply

Your email address will not be published.