«

»

Jul ২৫

হজ্জ্ব আর আমাদের সমাজে এক শ্রেনীর মুসলিমদের কাছে তার মূল্যায়ন

জিয়াউল হক ভূঁইয়া। পরেহেজগার মানুষ। ১ ফুটের কাছাকাছি লম্বা সাদা দাঁড়ি। সাদা চামড়ার নুরানী চেহারা। নম্রতার জ্যাতি তার চেহেরায় ফুটে আছে। বয়স ৬৫+ কিন্তু বার্ধক্যের ছাপ চেহারায় অনেকটা দেখা যাচ্ছে না। উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যে কেউ তার সাথে কথা বললে মনে হবে, এক পীর/ওলী-র সাথে কথা বলছে। ভাল মানুষের সাথে কথা বললে একটা পবিত্রতা ভাব আসে, এই মানুষটা সেই রকমের। কথার ভিতরে সরলতার ছাপ। কিন্তু যখনই কেউ তার অতীতের কর্মজীবন ও জীবন বৃত্তান্ত জানতে পারে তখন সবাই ভিতরে একটা ধাক্কা খায়। এক জীবনে ২ মেরুর ভিন্ন সমীকরন মিলাতে পারে না। উনি পুলিশ বিভাগে এস আই হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং এই অবস্থাতেই রিটায়ের্ড করেছেন। বিয়ে করেছেন ২-টি। সেই ২ বউ-র ঘরে ৫-টি সন্তান। ২ বউ-র ছোটজন ছিলেন একজন মডেল, তার চলাফেরা ও খরচাপাতিও ছিল মডেল ক্যাটাগরির। ৫ সন্তানের ২-টিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। একজন এস আই কত বেতন পান? ঢাকা শহরে ৫ সন্তান সহ ২ টি পরিবারকে খরচা দিয়ে চালাইতে কত টাকার প্রয়োজন হয়? উনি যেমন সৌখিন বাসায় ভাড়া থাকেন, তাতে তো তার বেতনে ১ পরিবারের বাসা ভাড়া দেওয়া সম্ভব না। জানা গেল, ঢাকা এবং নিজে দেশে উনার বিশাল সম্পদ রয়েছে। অনুমান করা যায়, উনার মাসিক আয়ের পরিমান কত ছিল।

এস আই চাকুরী থেকে রিটায়ের্ডের পর এই জিয়াউল হক সস্ত্রীক মক্কা গেলেন হজ্জ্ব করতে। আর হজ্জ্বের আদায় করার পর থেকে উনি এখন বুজুর্গী মানুষ। নুরানী চেহারাময় এবং আল্লাহওয়ালা মানুষ।

জনাব কামরুজ্জামান একজন বন বিভাগের কর্মকর্তা। কঠিন এবং রুক্ষ স্বভাবের মানুষ। বেটার মুখে কখনও হাসি দেখা যায় নি। কেউ তাকে হাসতে দেখেনি। তার সন্তানেরা এবং স্ত্রী কিভাবে তার সাথে জীবনযাপন করেছেন তা গভীর চিন্তার বিষয়। স্বামী এবং বাবা যদি প্রভুত্ব ভাব নিয়ে সংসারে বিরাজ করেন তাহলে সময়ের ব্যবধানে সেই সংসারের ব্যাল্যান্স থাকে না। বাবার স্নেহমমতা/আদর-ভালবাসা সন্তানেরা বঞ্চিত হলে, সেই বাবা বার্ধক্যে সন্তানদের কাছ থেকে আক্রমণের শিকার হওয়াই স্বাভাবিক। সন্তান বড় হলে, তাদের মতামত ও ইচ্ছা প্রতিটি বাবা-মার উচিত শুনা এবং ভালমন্দ আলোচনা করা আর সেই অনুযায়ী কার্যাদী করা উচিত। কিন্তু সমাজের বেশিরভাগ মা-বাবাই নিজের ইচ্ছা ও খেয়ালখুশি সন্তানদের উপর অনেকটা জোড় করে চাপিয়ে দেয়। সমাজের বেশির ভাগ সন্তানরাই বিপথগামী আর এই বিপথগামীতার কারন অনেকাংশেই পিতামাতা দায়ী।

ইব্রাহীম(আ) যখন তার সন্তান ইসমাঈল(আ)-কে পর পর ৩ দিনের স্বপ্নের কথা জানালেন, ইসমাঈল তাঁর পিতাকে স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য বললেন। আর আমরা মুসলিমরা কোরবানীর সময় মসজিদে মোল্লাদের কোরবানীর টুনাটুনির গল্প শুনে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। আর বর্তমানে কোরবানী সামাজিক স্ট্যাটাস ছাড়া আর কিছু না। আমরা কি অনুধাবন/চিন্তা করি, পিতা-পুত্রের ভালবাসার সম্পর্ক কত উচু হলে পরে, সন্তান তাঁর পিতার কাছে নিজেকে কোরবানীর জন্য উৎসর্গ করে? এই পিতাপুত্রের ভালবাসা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- তা আজ পর্যন্ত কোন মোল্লাকে বয়ান করতে শুনিনি, আর সাধারন মানুষ দূরে থাক। সমাজের সাধারন মানুষজন যদি ইব্রাহীমের(আ)-র মত সবাই নিজ নিজ সন্তানদের স্বপ্নের মাধ্যমে কোরবানীর কথা জানায়, তাহলে নিঃসন্দেহে যা হবে তা হল- সন্তানেরাই বাবার কল্লা ফালায়া দিবে। জনাব কামরুজ্জামানের ৬ সন্তানের কমন বাক্য, তারা কেউই বাল্যকাল-কে স্মরণ করতে চায় না কারন তারা মানষিক ও শারীরিক আক্রমণের শিকার এবং অত্যান্ত কঠোরতার জীবন নির্বাহ করেছে।

কামরুজ্জামান সাহেব সারাজীবনে ঈদের নামাজ ছাড়া আর কখনও তাকে মসজিদে দেখা যায় নি। বনের কাঠ কেটে উজার করেছেন আর সে টাকায় ঢাকায় আজ তার ৬ তলা বাড়ী। এখন রিটায়ার্ড। রিটায়ের্ডের টাকায় এখন তিনি হজ্জ্ব করে পরেহেজগার হয়ে গেছেন; দাড়ীওয়ালা এবং আল্লাহ্‌ওয়ালা হয়ে গেছেন। এখন তার হাতে সবসময় তজবীহ থাকে এবং তা সর্বদা নড়তে থাকে। । তিনি খাঁটি মুসলমান।

সমাজে জিয়াউল হক ভূঁইয়া এবং কামরুজ্জামান মার্কা মুসলমানের সংখ্যা অনেক। ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হালাল রোজগার। সমাজের বেশির ভাগ মুসলিম ইহা বোঝে না আর বোঝলেও ইহার কোন মুল্যায়ন করে না। সমাজের কতজন নামাজি মুসলিম আছেন যারা সুদমুক্ত জীবন যাপন করেন? যারা হজ্জ্ব পালনে গমন করেন, তাদের কতজন নিজের ইনকাম নিয়ে চিন্তা করেছেন?

প্রভাংসু, গৌরব… নামক হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরা যারা অতীতে জিয়াউল হকের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছে, অর্থ-সম্পদ হারানোর শিকার হয়েছে- তারা বর্তমান নূরানী চেহারাময় জিয়াউল হকের সাথে সাক্ষাৎ হলে কি মনে করবে? ভিতর থেকে ঘৃণার এক থু থু নূরানী চেহারায় নিক্ষেপ করবে। প্রশ্ন আসে- এই ঘৃনার থু থু কি জিয়াউল হকের চেহারায় নিক্ষেপ করেছে নাকি ইসলামের চেহারায়? জিয়াউল হকের পরেহেজগারী দেখে প্রভাংসু, গৌরবেরা স্বভাবতই বলবে- এই ইসলাম? ইসলাম তোদের এই শিক্ষা দেয়? ভিন্ন ধর্মের লোকেরা ইসলাম-কে জানে এবং শিখে জিয়াউল হক ভুঁইয়ার মত মুসলমান নামক মানুষদের কাছ থেকে। এরকম উদাহারন লক্ষ-লক্ষ।

পৃথিবীর সকল দেশের মানুষ হজ্জ্ব করতে আসে অল্প বয়সে/জোয়ান বয়সে আর বাংলাদেশের মানুষ হজ্জ্ব করতে যায় জীবনের শেষ বয়সে। আমাদের দেশ ও সমাজের বেশির ভাগ মানুষ হজ্জ্ব করে সামাজিক স্ট্যাটাসের জন্য আর মনে করে হজ্জ্ব করলে সারাজীবনের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ভুমিষ্ট শিশু নিষ্পাপ হয়ে যেমন জন্মায়, হজ্জ্ব করলে অনেকটা সেই রকম শিশু হয়ে যায় সকল হাজীরা। আর এটা আমাদের দেশের মানুষদের সকলের অন্তরে গেতে আছে। এর জন্য প্রধান দায়ী আমাদের সমাজের মোল্লারা। ভাড়াওয়ালা মোল্লারা। প্রফেশনাল কাদুনে মোল্লারা।

জান্নাতবাসীরা জান্নাতী হবে আখলাক বা চরিত্রের কারনে, হজ্জ্বের জন্যে না। কার অন্তর কতটুকু পবিত্র? সেই পবিত্রতার স্কেল নির্নয় করে দিবে- কে কতটুকু আল্লাহর নৈকট্যশীল হবে। “প্রেম” এক সাংঘাতিক ব্যপার। যারা আল্লাহ্‌র সাথে প্রেমে আবদ্ধ, তারাই পবিত্রতার সর্বোচ্চ স্তর। যারা এই প্রেমের রাস্তা কাউকে দেখাতে পারেন- তারাই শিক্ষক, তারাই ঈমাম, তারাই পীর এবং তারাই ওলী।

৯ comments

Skip to comment form

  1. 5
    মজলুম

    হুক্কুল্লাহ এবং হুকুকাল ইনসান হলো ইসলামের মূল স্তম্ভ। হুক্কুল্লাহ হলো আল্লাহর হক। আর হুকুকাল ইনসান হলো বান্দার হক বা মানবাধিকার। আল্লাহর হক যেমন নামাজ, রোযা, হজ্জ, যাকাত এগুলা। বিচারের দিন আগুলা থাকবে আল্লাহর হাতে। তিনি ইচ্ছে করলে ক্ষমা করতেও পারেন আবার নাও করতে পারেন। তবে মহান আল্লাহ অনেক দয়াবান, তিনি ক্ষমা করে দিবেন এগুলো। কিন্তু যারা বান্দার হক নস্ট করেছে, মানে ঘুষ খেয়েছে, চুরি করেছে, ডাকাতি করেছে, খুন করেছে, ধর্ষন করেছে। এদের আল্লাহ বলবেন এগুলো মার হাতে নাই। যার হক নস্ট করছো, এগুলো তাদের হাতে, তারা ক্ষমা না করলে আমি কিছুই করতে পারবোনা। আখেরাতের কারেন্সি হলো নেকি আর গুনাহ। তখন ঐ লোকের কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে সে বলবে আমাকে তোমার কাছ হতে নেকি দিতে হবে এতো, তাহলো ক্ষমা করবো। সেদিন কেউই ফ্রিতে কিছু দিবেনা, এমনকি নিজের মা বাবা ও না। আর যদি ঐ লোকের নেকিও না থাকে তাহলে এই লোকের কাছ হতে গুনাহ নিতে হবে। সো কারো হক মেরে  খেয়ে লাভ নাই, প্রত্যেক অনু পরিমানের হিসাব করা হবে।

    1. 5.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      মূল্যবান কথাগুলোর জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  2. 4
    Ivan

    চমৎকার লেখা।

    আমাদের বাংলাদেশীদের সমস্যাটাই এটা যে ব্লেমগেম খেলতে পছন্দ করি। বাসের পাশের সীটে বসে থাকা ভদ্রলোক নীতিবাক্য ঝাড়তে ঝাড়তে হয়রান, দেশে এটা হলে ভালো হতো, ওমুকটা করে সরকার খারাপ করেছে ইত্যাদি। অথচ এই ভদ্রবেশি লোকটাই বাসে উঠেছে লাইন ভেঙ্গে। রাস্তার মোরে বেচারাম চেহারা করে বসে থাকা রিকশাওয়ালাকে রেগুলার দিনে দয়া করে ৫টাকা বেশি দিলাম; সেই লোকই বৃষ্টি/ঠান্ডা অথবা গরমের সময়ে ১০টাকার ভাড়া ৩০টাকা আদায় করে ছাড়বে।

    বাংলাদেশের সামগ্রিক চরিত্র বৈশিষ্ট্য এটাই। টপ টু বটম বেশিরভাগই এক; দূর্নীতিগ্রস্থ। সুযোগের অভাবে থাকা কিছু সৎ? লোক লেকচার ঝারছে। ছোটখাট সুযোগেও সে একই পথের পথিক। যেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যেই মানবিক গুণাবলী নেই সেখানে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে কিভাবে তা আশা করা যায়?

    কথাতেই তো আছে যে দেশের জনগণ যেমন সে দেশের রাষ্ট্রনায়ক-ও তেমন।

    সুতরাং এভাবেই বাংলাদেশ চলছে, চলবে। তবে বেশিদিন না। ভালোর অর্থের হোক অথবা প্রচন্ড খারাপের জন্যও হোক; পরিবর্তন আসবেই।

    1. 4.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      বাস্তবতা, ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, ধর্মীয়জীবন দিয়ে যখন কোন কিছু বিচার করা হয়, তখন তার সমালোচনার মুল্যবোধ পরিবর্তন হয়। আর সকল ব্লেমগেম-কে এক দৃষ্টিতে দেখা বোকামি।অনেক ব্লেমগেম অনেকের উপকার এবং অনেক কিছু উম্মোচন করে দেয়। যাদের বোঝে আসে না, তাদের চুপ থাকাই ভাল। “উত্তম চরিত্র” ব্যতীত জান্নাতে যাওয়া অসম্ভব। কেউ যদি সৎ হয়, সে নিজের ভালর জন্যই করবে, আর কেউ সুযোগের অপেক্ষায় থাকলে, তার ফল তারই উপর বর্তাবে। বিচার দিবসে কারো পালানোর পথ নেই।

      আর ব্যক্তি পরিবর্তন হলে যদি রাষ্ট্র পরিবর্তনে প্রভাব ফেলত, তাহলে এই বাংলাদেশ অনেক আগেই স্বর্ণ হয়ে যেত। রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করতে হলে, রাষ্ট্রপ্রধানকেই করতে হবে। এছাড়া রাস্তা নেই। যদি থাকে, তাহলে এই বিষয়ে লিখা দিন, সবাই জানুক, আমিও জানি।

      ধন্যবাদ।

  3. 3
    শামস

    আমাদের বর্তমান মুসলিম সমাজের সার্বিক চিত্রটা এরকমই!

     

  4. 2
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    এই বিষয়গুলো বাস্তবতা এবং কঠিন বাস্তবতা। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে রাখুন। ধন্যবাদ। 

    1. 2.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      জিয়া ভাই,

      আসসালামু আলাইকুম। দোয়া, আল্লাহ্‌ আমাদের সকলকে সঠিক পথে রাখুন। ধন্যবাদ পাঠ ও মন্তব্যের জন্য।

  5. 1
    এম_আহমদ

    এই উদাহরণগুলো সামাজিক মানসিকতার নিফাককে উন্মোচন করে। লিখতে থাকুন, বলতে থাকুন –এছাড়া আর কোন উপায় নেই।

    ওয়াস সালাম।

    1. 1.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      ওয়ালাইকুমুস সালাম আহমেদ ভাই।

      আল্লাহ আপনাকে সুস্থ্য রাখুন। পাঠ করার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.