«

»

Nov ২৮

গল্প শুনুন, আয়োডিনযুক্ত বাংলা গল্প-৪

ভাই গল্প শুনেন। না না, গল্প শুনতে চাই না। নিজের জীবনটাই তেঁতো গল্পে ভরে আছে; নীজের জীবনের নাটক-সিনেমার শেষ নাই, অন্যের গল্প-নাটক-সিনেমা দেখা বা শুনার ইচ্ছা নাই। আজাইরা প্যাচাল থেকে দূরে থাকা ভাল। নিন ভাই চা-বিস্কুট খান আর গল্প শুনেন। চা-বিস্কুটের দরকার নেই। যেই গল্প শুনাতে চান তার কি কোন বিশেষত্ব আছে? জ্বি আছে; মুদ্রার এক পিঠে গল্পটি, অন্য পিঠটি সারমর্ম চিন্তাশীলদের জন্য। তাঁরা ঠিকই সারমর্মটি বোঝে নিবেন। ঠিক আছে, বলেন শুনি কি গল্প বলতে চান। আপনি যেভাবে আশা ও আগ্রহ নিয়া গল্প শুনাতে চান, এমন আশা নিয়ে ফকিররাও ভিক্ষা করে না। জীবন থেকে না হয় ৫/৭ মিনিট আপনার জন্য নষ্ট করলাম। শুরু করা যাক।  

 

১৯৯৬ সাল। বছরের শুরুর দিকে কোন এক সকাল বেলা। যাচ্ছি কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ-এর আবাসিক হোটেল সুপার ষ্টারে। উদ্দেশ্য- একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের সহিত সাক্ষাত। বাবা অসুস্থ বিধায় তার হয়ে আমাকে যেতে হল। রিসিপশন থেকে রুম নাম্বার জেনে সেই বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের দরজায় নক করি। একজন লোক দরজা খোলে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। আরেকজন খোলে দেওয়া দরজার লোকের সাথে এসে দাঁড়ালেন। দুইজনের একজন জিজ্ঞেস শুরু করলেন, কে আপনি? কি পরিচয়? কেন এসেছেন? এখন কেন এসেছেন?… অনেক প্রশ্ন। প্রশ্নকারীর কথা বলার ধরণ ছিল খুব কঠিন। আরেকজন কিছুই বলছেন না, কঠিন চোখে স্ক্যান করছে আমার আপাদমস্তক। কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই। আমার বয়স ছিল কম। অনেক প্রশ্নবাণে বিচলিত হই। আবু হুজাইফা(রা) কূফায় শাসক হয়ে যাওয়ার পর উপস্থিত সকলকে অনেক কথা বলেন এবং যার একটি ছিল “তোমরা ফিতনা স্থান থেকে দূরে সরে থাক”। লোকেরা জিজ্ঞেস করেন “ফিতনা স্থান কোনটি”? হুজাইফা (রা) বলেন, “শাসকের বাসা ও অফিসের দরজাসমূহ ফিতনার স্থান”। আর আমরা দেখি চামচারা বন্দুক-কামান নিয়ে নেতাদের দরজায় সর্বদা উপস্থিত। আবু হুজাইফা(রা) কেন ফিতনা স্থান থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, তা প্রবৃত্তি পূজারীদের বোঝে আসবে না। যাইহোক, পরিচয় দেওয়ার পর ভিতরে ঢুকি। একটু পর সেই বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ গোছল শেষ করে রুমে এলেন। খালি গায়ে শুধু লুঙ্গী পরিধান করা। একটা ভিজা গামছা কাধে। সরাসরি আমার কাছে এলেন। পরিচয় পাওয়ার পর ডান হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তার এই আন্তরিকতা আমায় মুগ্ধ করে। তারপর আমার হাত ধরে নিয়ে ছোফায় তাঁর পাশে বসালেন। ছোফার সামনের টেবিলে পরটা, মুরগীর তরকারি, সবজী ভাজি। তার সকালের নাস্তার সাথে যোগ দেওয়ার জন্য বললেন কিন্তু বাসা থেকে নাস্তা করে এসেছি বলে তাঁকে ‘না’ করি। চামচাগুলা একটু আগে আমাকে প্রশ্নের তীর দিয়ে আক্রমন করেছেন তারা এখন শান্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। মানুষের রুপ বদল হতে সেকেন্ড দেরী হয় না। আমার পিতা এবং এই বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এক সাথে ছাত্র জীবন এবং রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের সম্পর্ক ছিল অনেক ভাল। এই বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ।

 

২০০০ সাল। মার্চ মাসের শুরুর দিকে কোন এক বিকেল বেলা। দাঁড়িয়ে আছি একটি কালভার্টের উপর আর মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছি প্রকৃতি। সবুজ ফসল আর নীল আকাশ দিগন্তে একসাথে মিশে আছে। এক অপূর্ব দৃশ্য। ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরলে একই দৃশ্য দেখা যায়। অনেক দূরে কয়েকটি গ্রাম খুব ছোট দেখা যায় যা সবুজ ঘাস(ফসল)-র সাথে মিশে আছে। মেঘমুক্ত নীল আকাশের সাথে সবুজের মিশে যাওয়া দুনিয়ার এক অপূর্ব মনোরম দৃশ্য যা নায়াগ্রা বা সুইজারল্যান্ডকে ম্লান করে দেয়, অন্তর এক প্রশান্তির অনুভুতি পায়। এই দৃশ্য শুধুমাত্র হাওড় অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। বাংলার বা দুনিয়ার মানুষ জানে না এই মনোরম দৃশ্য সম্পর্কে। একই জায়গা থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায় হাওড়ের যে কোন জায়গা থেকে। হাওড়ের মানুষজন জানে না এই সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা শহরের মানুষজনের কাছে এখন ব্যাপক বিনোদনের অংশ; তারা জানে না ঢাকার মানুষজন এই দৃশ্য দেখতে টাকা খরচ করে কুয়াকাটায় গমন করে। দৃশ্যের ভিতরে অন্তর নিবদ্ধ করে আছি, হঠাৎ পায়ের শব্দে পিছনে তাকাই। ৪/৫ জন লোক একসাথে, সবাইকে চিনতে পারি। দলনেতার নাম অজু মিয়া। হাসির মাধ্যমে কুশল বিনিময় করি। দেখতে পাই, তার হাতে বড় নোটের ৫টি টাকার বান্ডিল। জিজ্ঞেস করি, কোথায় যাচ্ছেন? জানালেন গ্রামের ক্ষমতাধরের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন। উনারা চলে যাওয়ার পর আবার প্রকৃতির ভিতরে নিজেকে মেলে ধরি।

 

এই অজু মিয়ার সাথে একই গ্রামের প্রাত্তন চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দিনের সাথে দা-কুড়াল সম্পর্ক নদী নিয়ে। অজু মিয়া এই বৎসর নদীর হিজারা পেয়েছেন। এতদিন জিয়াউদ্দিন এই নদীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। অজু মিয়া হঠাৎ অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছেন। জিয়াউদ্দিন চেয়ারম্যান কোনভাবেই নদী অজু-কে দিতে নারাজ। ২ পার্টির মধ্যে চরম উত্তেজনা। যে কোন সময় দুই দলের মধ্যে দাঙ্গাহাঙ্গামা/খুনাখুনি হয়ে যাবে। গ্রামে এই ইস্যু নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। কখন কি ঘটে যায় তা নিয়ে সকলের ভিতরে চাপা উত্তেজনা। থানার পুলিশ কোন সমাধান দিতে পারছে না। ঢাকার অনেক থানা-পুলিশের ঘটনা শুনেছি, শত্রুতা বশত পুলিশদের হাত করে টাকার বিনিময়ে এলাকার একজন আরেকজনকে মশল্লার কেসে ফাঁসিয়ে দেয়। পুলিশ প্রথম পক্ষের টাকা খেয়ে কায়দা করে মশল্লার কেইসে ফাঁসিয়ে ঐ পক্ষর কাছ থেকে আবার মোটা অঙ্কের টাকা দাবী করে। যদি টাকা না পায় জীবনের একটা বড় সময় ধরে চালাতে থাকে হয়রানি ও ভোগান্তি। কিছু দিন পর পর এরেষ্ট করে জেলে ঢুকায় তারপর টাকা খেয়ে আবার ছেড়ে দেয়। তারপর আবার এরেষ্ট। এইভাবে চলে এরেষ্ট বানিজ্য। তারাই ভাল জানে কিভাবে এই বানিজ্যের ব্যবসা চালাতে হয়। এই বানিজ্য জুয়া খেলার বউ বাজী রেখে অন্যের বউ জিতার চেয়েও মজাদার। যারা খেলে তারাই এই খেলার স্বাদ জানেন। পুলিশ, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সব রকমের খেলার বানিজ্যের কথা তুলে ধরলে শ’খানেক মহাভারত যথেষ্ট নয়।        

 

এই দেশে এখন যদি কোন সরলতার রাজনীতিবিদ চিহ্নিত করি, তবে আব্দুল হামিদ হবেন সেই ব্যক্তি। উনি শুধু সরলতা এবং সাধাসিধেই নন, সৎ এবং নৈতিক পরায়নও। এই দেশের রাজনীতিবিদ-দের মধ্যে স্বার্থপরতার অনুশীলন এবং ক্ষমতা ও অর্থের লোভ কার কি রকম এই প্রশ্ন জিজ্জেস করা হয়, ধারনা করি সবচেয়ে যথাযথ সঠিক উত্তর দিতে পারবেন আমাদের এরশাদ কাকু। উনি ক্ষমতায় থাকা কালীন এবং ক্ষমতা ছাড়ার পর এই দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের যে মনমানসিকতা এবং লোভীদের পরিচয়, জ্ঞান ও উপলদ্ধি অর্জন করেছেন তা নিঃসন্দেহে যে কোন ব্যক্তি থেকে অনেক বেশী। কাকুজান অনেক রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লোভের বেল্টে ফেলে নিজ দলে ভিড়াতে পারলেও আব্দুল হামিদ-কে কিছুতেই টলাতে পারেন নি। আব্দুল হামিদ-কে লোভনীয় অফার দিয়েছিলেন। কিছু ঘটনা জানতে পারি তাঁর স্ত্রী জোছনা নানীর মাধ্যমে। মাঝেমধ্যে আমাদের বাসায় আসতেন কাকুজানের রাজত্বকালে। তখন কিছু গল্প শুনার সুযোগ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিজের ভিতরে ধরে রেখেছিলেন। লোভের কাছে নিজের আদর্শকে বিক্রি করে দেননি।

 

আমার ভাগ্য ফেভারে নেই, হামিদ সাহেব প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আর সাক্ষাত পাই নি। যদি সাক্ষাতের সুযোগ পেতাম তাঁর সাথে তাহলে দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে, গণতন্ত্র নিয়ে, দেশের সিস্টেম নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে, যাতায়ত ব্যবস্থা নিয়ে, দেশের মানুষদের মৌলিক প্রয়োজনটুকু নিয়ে কথা বলতাম।

 

২০১০ সালের শেষের দিকে। আমার অফিস গুলশানে। ১০৮ নম্বর বাড়ির দু’তালায়। তখন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিল্লুর রহমান।  ২য় তলায় এক পাশে আমার অফিস আরেকপাশে প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের বাসা। একই বিল্ডিং এর ৬ তালায় থাকেন নাজমুল হাসান পাপন। যেহেতু তখন তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন তাই নিজের বাসায় থাকতেন না। হঠাৎ কোন কোন সময় ভিজিট করতে আসতেন। যেদিন আসতেন সেদিন আর রেহাই নেই। বাড়ির গেট থেকে দুতালায় অফিসের দরজা পর্যন্ত আসতে ৩টি সিকিউরিটি এলার্ম গেইট। একেকটি গেইট একেক গ্রুপের। একটি পুলিশের, একটি সেনাবাহিনীর, একটি র‍্যাবের… তারপর শারীরিকভাবে চেক। হাত দিয়ে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ স্পর্শের মাধ্যেমে চেক। দুই কদম করে সামনে বাড়লেই চেকিং চলতো। ল্যাপটপ সাথে থাকলে আরো নাজেহাল। কাগজের লিস্টে আমাদের নাম আছে কিনা তার সাথে আইডি কার্ড মিলিয়ে দেখে নেওয়া হত। অফিস চলাকালীন সময়ে অফিসের ভিতরে এসে চেকিং চলত তবে ব্যক্তি পর্যায়ে না তখন চেক করত অফিসে বোমা আছে কিনা, কোন বিস্ফোরক আছে কিনা? প্রেসিডেন্ট বাসায় আসবে শুনলে অফিসের অনেকেই আগেই ছুটি নিয়া নিতেন। প্রেসিডেন্টের এত আরাম, এত সিকিউরিটি দেখে চিন্তিত হই। একবার চেকিং করার সময় এক পুলিশ অফিসারকে বলেই ফেলি “প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা দিতে যদি এতই জোরদার হয় তাহলে সেই প্রেসিডেন্ট দেশ ও দেশের জনগনের কি নিরাপত্তা দিবে এবং কি সেবা করবে”? সেই অফিসার এমন বিস্ফোরিতভাবে তাকালেন, কেউ তার বউ এর ইজ্জ্বত নিয়া টান দিলে এইভাবে বিস্ফোরিতভাবে তাকাতেন না। তার তাকানোকে স্মরণ করি। তার ২ চোখ ছিল ২ কামানের গোলা। আমাকে রিমান্ডে নিয়া পিটানি দেই নাই, ইহাই ভাল। তবে আমি আরো বেশী ভিতরে বিস্ফোরিত হয়েছিলাম এই পুলিশ অফিসারের নৈতিকতাবোধ দেখে।

          

এই দেশ সুন্দর হোক, শান্তিময় হোক, সুস্হ হোক ইহাই কামনা। দোয়া, এই দেশ বিশ্বে সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করুক।

৩ comments

  1. 2
    আতিক

    “এই দেশে এখন যদি কোন সরলতার রাজনীতিবিদ চিহ্নিত করি, তবে আব্দুল হামিদ হবেন সেই ব্যক্তি। উনি শুধু সরলতা এবং সাধাসিধেই নন, সৎ এবং নৈতিক পরায়নও।“

    সালাম তাজুল ভাই,

    আপনার উপরের কথাগুলোর সাথে একমত হতে পারলাম না। হয়ত আপনার বাবার সাথে পরিচিতি, একসাথে রাজনীতি করা, এবং আপনার সাথে ভাল ব্যবহার করার জন্য আপনি উনার প্রতি মুগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু উনি “সৎ এবং নৈতিক পরায়ণ”! বর্তমানের আওয়ামী রাজনীতি করে সৎ এবং নৈতিক পরায়ণ থাকা কিভাবে সম্ভব? বর্তমানে দেশের ক্রান্তিলগ্নে উনি কি করেছেন? আওয়ামিরা সংবিধান পরিবর্তন করে যাতে আজীবন ক্ষমতাই থাকা যাই- সেই ব্যবস্থা করেছেন। উনি “সৎ এবং নৈতিক পরায়ণ” হলে সেই ক্ষমতার স্বাদ নিতেন না। দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে যা হচ্ছে- উনি কি করছেন?  “সৎ এবং নৈতিক পরায়ণ” মানুষ কি এই রকম পদে থেকে চুপ থাকতে পারেন? আমার মতে উনি আর সব আওয়ামী রাজনীতিবিদের মতই একজন- ভিন্ন কিছু না। 

    1. 2.1
      মোঃ তাজুল ইসলাম

      ভাই, ওয়ালাইকুমুস সালাম।

      মুদ্রার এক পিঠে গল্পটি, অন্য পিঠটি সারমর্ম চিন্তাশীলদের জন্য। তাঁরা ঠিকই সারমর্মটি বোঝে নিবেন।

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  2. 1
    লাভ টু লার্ন

    এই দেশ সুন্দর হোক, শান্তিময় হোক, সুস্হ হোক ইহা মোদেরও আশা। এগিয়ে যাক সবুজে দেশ বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published.