«

»

Apr ২৯

সিদ্ধার্থ গৌতমের ‘বৌদ্ধ ধর্ম’: বিবেকের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন

সিদ্ধার্থ গৌতম স্রষ্টা সম্পর্কে কোনো ধারণা দেননি। এসম্পর্কে গোটা ত্রিপিটক খুঁজে একটা বাক্যও পাওয়া যায়নি। স্বয়ং গৌতমের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কিন্তু এর কারণ কী? তবে কি তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না? পৃথিবীটা সৃষ্টি করার জন্য; বরং তার জন্মের পেছনেও যে কোনো শক্তি কাছ করছে- তা তিনি মনে করতেন না?

হাঁ, সিদ্ধার্থ কোনো স্রষ্টা বা ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু সহজাতভাবেই এই পৃথিবীটা ও এর সবকিছু যেহেতু একজন ঈশ্বর ছাড়া হতে পারে না- সে কারণে তাঁর অনুসারীরা পরবর্তীতে তাকেই ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে দেন। উপাসনার জন্য কোনো ঈশ্বর না পেয়ে তার উপাসনা শুরু করেন।

একজন ধর্মপরায়ণ বৌদ্ধকে প্রতিদিনই শরণ গ্রহণ করতে হয়। বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের আশ্রয় নেয়ার নামই হলো ‘শরণাগমন’। এজন্য তাকে ‘ত্রিরত্ন’ এর শরণ নিতে হয়। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে ও পরে তাকে বলতে হয় ‘বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি, ধম্মং শরনং গচ্ছামি, সংঘং শরনং গচ্ছামি…’ অর্থাৎ একজন বৌদ্ধকে প্রতিদিন গৌতম বুদ্ধের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। আর তাতে লাভ কী? লাভ হলো- ত্রিশরণগ্রহণকারীদের দেবতারা রক্ষা করেন। ত্রিশরণ গ্রহণ করলে স্বর্গ সুখ লাভ করা যায়। নরক-যন্ত্রণা হতে রক্ষা পাওয়া যায়। একইভাবে পঞ্চশীল, অষ্টশীল পালনের মাধ্যমেও স্বর্গে যাওয়া যায়।

কিন্তু ত্রিপিটকের কোথাও লেখা নেই যে, গৌতম বুদ্ধ কোথাও স্বর্গ বা নরক সৃষ্টি করেছেন। তাহলে নিশ্চয়ই তা অন্য কেউ সৃষ্টি করেছেন। সেখানে সমস্ত সুখ ও দুঃখও অন্য কেউ রেখে দিয়েছেন। তাহলে সেই তিনি কে? আর কেনই বা তাকে ছেড়ে প্রতিদিন আমি ‘গৌতম বুদ্ধ’ এর কাছে আশ্রয় নিবো? যিনি মারা গেছেন আরও দুই হাজার পাঁচশ’ বছর আগে! কথাতো ছিল ত্রিশরণ পড়লে এভাবে পড়বো, ‘ঈশ্বরং শরনং গচ্ছামি’- সেই ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় নিচ্ছি যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। যিনি স্বর্গ
-নরক ও আমাদের বানিয়েছেন। যিনি দেব ও মানবের শান্তি বিধানের জন্য পৃথিবীতে সিন্ধার্থ গৌতমকে ‘বুদ্ধ’ করে পাঠিয়েছেন।

বলা হয়, ত্রিশরণ গ্রহণ করলে দেবতারা আমাদের রক্ষা করবেন। দেবতাদের কে সৃষ্টি করেছেন। ত্রিশরণের ভেতরে আমরা তো দেবতাদের নাম নিচ্ছি না। নাম নিচ্ছি বুদ্ধের। তাহলে দেবতারা কেন রক্ষা করবেন? আর বুদ্ধের আগে যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তারা তো ত্রিশরণ কী জানতেনও না। তাদের অবস্থা কী হবে? হায় তাদের কে রক্ষা করবেন? বুদ্ধের মা মহামায়া মারা যান তার জন্মের সাত দিন পরে। তিনি তো ত্রিশরণ জানতেন না। তবে নরক থেকে তাকে কে রক্ষা করবে? বুদ্ধের দাদা-পূর্ব-পুরুষ তাদের কী অবস্থা হবে?

একই কারণে (ঈশ্বর না পেয়ে) একজন বৌদ্ধকে ত্রিরত্ন বন্দনা করতে হয়। জীবদ্দশায় বুদ্ধের ধ্যান ও ধর্ম প্রচারের স্থানগুলোর পূজা করতে হয়। যেসব জিনিস তিনি ব্যবহার করেছেন সেই ব্যবহৃত জিনিসগুলোর পূজা করতে হয়। এগুলো কী জিনিস? সারা জীবন বুদ্ধ ধ্যানে বসে কাকে যেন খুঁজে গেছেন। আর আজ একজন বৌদ্ধকে ধ্যানে বসে ‘বুদ্ধ’কেই খুঁজতে হচ্ছে? হায় পরিহাস! বুদ্ধ তো একজন মানুষ ছিলেন। শুদ্ধোধনের ঔরসে মহামায়ার উদর হতে তিনি এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। তবে তাকে কেন আমি ধ্যান করবো? পূর্ণিমার দিনে বিহারে গিয়ে বুদ্ধ পূজা কেন করবো? যিনি বুদ্ধকে পাঠিয়েছেন তিনি কে? পূর্ণিমা আর আমাবষ্যা যিনি ঘটান তিনি কে? ত্রিপিটকে মাতা-পিতাকে ব্রহ্মার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, সেই ব্রহ্মা কে?

সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মের আগে তাঁর মাকে বিভিন্ন স্বপ্নের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, যেই পুত্রসন্তান তিনি জন্ম দিতে যাচ্ছেন তিনি হবেন মানুষের ভেতরে এক বরণীয় মানুষ। তবে কে তাকে সেই স্বপ্ন দেখিয়েছিল? কপিলবাস্তু ও দেবদহ নগরের মধ্যবর্তী লুম্বিনী উদ্যানে মায়ের উদর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। সাত কদম হেঁটে গিয়ে বললেন, জগতে আমি জ্যেষ্ঠ। আমিই শ্রেষ্ঠ। সে-ই তিনিই আবার পরবর্তীতে ‘বোধি’ আর ‘নির্বাণ’ এর খোঁজে কেন ঘর ছেড়েছিলেন?

পুষ্পপূজা বৌদ্ধধর্মের অন্যতম অনুষঙ্গ। পুষ্পপূজা করতে গিয়ে এটাও বলা হয়, পূজেমি বুদ্ধং কুসুমেন তেন, পুঞঞেন মে তেন চ হোতু মোক্খং……। তারপরেও সেই পুষ্প পূজা করতে হয় এবং পরিশেষে সেটা বুদ্ধের চরণে উৎসর্গ করতে হয়। পুষ্পগুলো যিনি এত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন, তার কথা একবার মনেও পড়ে না।

আমাদের জাতীয় পাঠক্রমের তৃতীয় শ্রেণীর ‘বৌদ্ধধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ গ্রন্থে কোমলমতি সন্তানদের পড়ানো হচ্ছে, আজ থেকে দুই হাজার পাঁচশত বছর পূর্বে ‘ভগবান’ বুদ্ধের আবির্ভাব হয়। যিনি সারাজীবন কোনোদিন কোনো ভগবানে বিশ্বাস করেননি। গোটা ত্রিপিটক তন্ন তন্ন খুঁজলেও যার আদর্শ বাণীতে ভগবান শব্দটি পাওয়া যায় না। শুদ্ধোধনের ঔরসে আর মহামায়ার উদর থেকে যিনি লুম্বিনীর শালবনে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন আজ তিনিই হয়ে গেলেন ‘ভগবান’! তবে এই পৃথিবী আর বুদ্ধের বাবা-মা সহ সবাইকে যিনি সৃষ্টি করলেন সেই সত্তার অপরাধ কী? তাকে কেন আমরা ভুলে গেলাম?

৮ comments

Skip to comment form

  1. 6
    অতৃপ্ত

    Assa apnake jhodi ask kora hoy "SRISTI KORTA"Ke ke sristi korecen er Answer ki apni dite parben????? kokhonoi na, a Question korata jotuta bokami er answer khujte jaoyata tar ceye aro bokamir kaj, R buddha dhormo bujte hole onek knowledge er proyojon, buddho dhormo anusarira dheyan (sadhina) kore Trisna koy korar jonno r chittoke domon korar jonno, oh hhe buddho dhormo somporke jante hole tripitok valo kore porun r bujun…..

  2. 5
    সুমন

    এই পৃথিবী আর বুদ্ধের বাবা-মা সহ সবাইকে যিনি সৃষ্টি করলেন সেই সত্তার অপরাধ কী? তাকে কেন আমরা ভুলে গেলাম?

    সৃষ্টিকর্তা হিসেবে পরিচিত সত্ত্বাটির অপরাধ হল এটাই যে, তার কাছে প্রার্থনা করলে তা পূরণ করে না বা বিপদে ডাকলে সে সাহায্য করে না। ফলে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ মোকাবেলা করার শক্তি এবং সামর্থ্য অর্জন করে ফেলেছি এবং নিজেদের চাওয়া পাওয়াও এখন আমরা নিজেরাই পূরণ করতে পারি কঠোর পরিশ্রমের বলে। কাজেই, এখন আর সেই সত্ত্বাকে আমাদের কোন প্রয়োজন নাই। এইজন্যই আমরা তাঁকে ভুলে গেলাম। কেমন ?

    উত্তর পেয়েছেন ? হ্যাপী ?  

    1. 5.1
      মরুঝড়

      জ্বি ভাই আমি আপনার সাথে একমত। আমি একবার আল্লাহর কাছে বদনা চাইলাম। কি হল জানেন-আল্লাহ আমার এই প্রার্থনাটিও শুনলো না। ধ্যাত ।

      ফলে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ মোকাবেলা করার শক্তি এবং সামর্থ্য অর্জন করে ফেলেছি এবং নিজেদের চাওয়া পাওয়াও এখন আমরা নিজেরাই পূরণ করতে পারি কঠোর পরিশ্রমের বলে।

      জ্বি আবার আপনি ঠিক বলেছেন। তারপর আমি কঠোর পরিশ্রম করে আকিজ নামের একটা বদনা কিনলাম। আর আল্লাহ কে বললাম -হল তো?

      এখন আর সেই সত্ত্বাকে আমাদের কোন প্রয়োজন নাই। এইজন্যই আমরা তাঁকে ভুলে গেলাম। কেমন ?

      জ্বি বদনা পাবার পরে আমাকে আর পায় কে? আল্লাহ কেও আমি ডাটু মানে বুড়ো আঙ্গুল দেখালাম। কেমন লাগল? হ্যাপি তো?

      বিঃদ্রঃ ধর্ম বলদ দের জন্য না। কারন এরা বদনা চেয়ে না পেলেও আল্লাহ কে ছেড়ে দেয়। আমি আবার বলদা দের সাথে আলোচনা করিনা। সরাসরি মেরে দিই। হেইয়ো।

       

  3. 4
    মাসুদ

    ভাল লাগল 

  4. 3
    mdmasumbillah

    সারা পৃথীবিতে পবিত্র কুরআন নিয়ে এত লেখা লেখি কিন্তু অন্য ধর্মে এমনটা দেখিনা এর কারণটা একটু জানাবেন

    1. 3.1
      মীযান হারুন

      @mdmasumbillah

      অন্য ধর্মগুলো নিয়ে যে একদম লেখালেখি হচ্ছে না- তা নয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষের ধর্ম ইসলাম হওয়ায় ও আমরা বাংলা ভাষাভাষী হওয়ায় ইসলামের ব্যাপারটিই আমাদের কাছে বেশি স্পষ্ট। উদাহরণত বৌদ্ধধর্মের কথা ধরুন। শ্রীলংকা, চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়াতে নিজ নিজ ভাষায় বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে কিন্তু অনেক লেখা হচ্ছে। আমরা সেটা হয়তো জানি না। একইভাবে খ্রিস্টধর্ম নিয়েও লেখালেখি হচ্ছে।  কিন্তু আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন হলো ইসলাম। আল্লাহ তাআলা ইসলামকে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবেন। আর সে কারণে মুসলমানদের আমরা দেখি (অনেকে নিজে পুরোপুরি ইসলামের অনুসরণ না করলেও) নিজ ধর্মের সম্মান ও প্রচার-প্রসারে ব্যাপক সক্রিয়। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদের দিয়ে দীনকে সংরক্ষণের কাজ নিচ্ছেন।  আর হয়তো সে কারণেই পৃথিবীতে ইসলাম ও পবিত্র কুরআন নিয়ে এত লেখালেখি। এটাই এর একমাত্র কারণ নয়। এর রয়েছে বহু কারণ। স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো কখনো ইনশা-আল্লাহ। আপনিও বিষয়টি নিয়ে ভাবুন। অনেক কারণ দেখতে পাবেন। 

  5. 2
    মীযান হারুন

    আপনার লেখাগুলো আমার বেশ পছন্দনীয়। আপনার লেখা ও এর মন্তব্যগুলো আগে পড়ার সুযোগ হয়েছে। আচ্ছা একটি প্রশ্ন করি। আমি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে সাধারণত আরবি ও ইংরেজি বইগুলোর আশ্রয় নিয়ে থাকি। আপনার কাছে এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় কি কোনো গ্রন্থ সংকলন আছে (হার্ডকপি কিংবা ই-বুক আকারে)। থাকলে আমাকে লিংক দিয়ে সহায়তার অনুরোধ রইলো। 

    পাশাপাশি নাস্তিক্যবাদ এর বিপরীতে ইংরেজি বা বাংলায় কোনো গ্রন্থ থাকলে লিংক দেয়ার  প্রত্যাশা করছি। ভালো থাকুন। লেখা চালিয়ে যান। 

  6. 1
    এস. এম. রায়হান

    লেখাটি সুন্দর হয়েছে। বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে আমার একটি লেখা আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.