«

»

Nov ১৫

গীবতের কুফল সম্পর্কে একুশ শতকীয় বিশ্লেষণ : কুরআন ও হাদীসের আলোকে

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “গীবত কী তা কি তোমরা জান?” লোকেরা উত্তরে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “গীবত হলো তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে।” জিজ্ঞাসা করা হলো, “আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তবে এটাও কি গীবত হবে?” রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলেই সেটা হবে গীবত আর তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে সেটা হবে বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ।” (মিশকাত- পৃ ৪১২)

এই হাদীসটিতে নবীয়ে পাক (সাঃ) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে অথচ স্পষ্টভাষায় গীবতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং গীবত করা কতখানি ঘৃণ্য একটি ব্যাপার উম্মতের বুঝবার জন্য তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। গীবত হচ্ছে কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ অন্যের নিকট বলা- যদিও সকলেই জানে যে সেই ব্যক্তি আসলেই দোষী। মোটকথা, একজন দোষী ব্যক্তির প্রমাণিত দোষ সম্পর্কে তার অনুপস্থিতিতে অন্যের নিকটে বলাবলি করাই গীবত। কেউ একজন একটা দোষ করেছে যা সকলেই জানে তারপরও বিনা কারণে শুধুই কিছুটা মজা কিম্বা ঠাট্টা করার জন্য দোষী ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ সম্পর্কে বলাবলি করা গীবত। চিন্তা করে দেখুন নবী (সাঃ) বলেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণিতভাবে দোষী হয় তবেই কেবল তার দোষ সম্পর্কে তার অসাক্ষাতে অন্যকে বললে তা হবে গীবত আর যদি তার দোষ ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়ে না থাকে অথবা সত্যিকার অর্থে যদি ঐ ব্যক্তি দোষী না হয়ে থাকে তবে তার দোষ সম্পর্কে বলা হবে মিথ্যা অপবাদ দেয়া যা গীবতের চেয়েও ঘৃণ্য এবং গীবতের চাইতেও কঠিন গুনাহের কাজ।

আমাদের সমাজে বিবেক বিবেচনা সম্পন্ন কোনো ভদ্রলোক সাধারণতঃ বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ দেয়ার কাজটি করেন না। তবে আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরা, উঠাবসা ও কথাবার্তায় অসাবধানতাবশতঃ গীবতের মত ঘৃণ্য অপরাধটি আমাদের অনেকের দ্বারা প্রায়ই সংঘটিত হয়ে থাকে। তাই গীবতের গুনাহ থেকে হেফাজত থাকতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই গীবতের সংজ্ঞাটি ভালভাবে বুঝে নিতে হবে। নবীয়ে পাক (সাঃ) কতই না সুন্দরভাবে ও পরিস্কার বর্ণানায় গীবতের সংজ্ঞা দিয়েছেন অথচ তা বুঝতে আমাদের যেন কষ্ট হয়। কারণ আমরা আসলে এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে চাই না। অথচ সৃষ্টিকূলের সেরা প্রাণী হিসেবে আমাদের এ বোধটি থাকা উচিত যে, একজন মানুষ তার মানবিক দূর্বলতা থেকে এক মুহুর্তের প্ররোচনায় কোনো দোষ করে থাকতেই পারে। আমার মধ্যে যে ঐ ধরনের মানবিক দূর্বলতা নেই তা নয়। হতে পারে আমিও ঐরকম পরিস্থিতিতে পড়লে ঐ একই রকমের দোষ করে ফেলতে পারতাম। তাই আমি যখন অন্যের নিকট কোনো দোষী ব্যক্তির দোষ অকারণে বলি বা শুনি তখন আমার লজ্জা পাওয়া উচিত। গীবত বলা বা শোনার ব্যাপারে এই প্রকারের লজ্জাবোধ যার আছে কেবল সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান এবং সত্যিকারের ভদ্রলোক।

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। “আর তোমরা একজন অন্যজনের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের অসাক্ষাতে নিন্দা করো না। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? প্রকৃতপক্ষে তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী পরম দায়ালু।” (সুরা হুজুরাত ৪৯ : ১২)

গীবত কতখানি ন্যাক্কারজনক একটি ব্যাপার তা বুঝতে আমরা এই আয়তের দিকে মনোযোগ দেই। এখানে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। লক্ষ্য করুন, এখানে আল্লাহ তায়ালা গীবতের ব্যাপারে কত শক্তিশালী ও পরিস্কার তুলনা দিয়েছেন বান্দার বুঝবার জন্য। প্রথমতঃ কথা হলো আদম সন্তান পরস্পর ভাই-ভাই। রক্তের সম্পর্কে না হোক আচার-আচরণ ও প্রকৃতিগত দিক থেকে সকল মানুষ একই মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। লোভ, ঘৃণা, হিংসা, সুবিধাবাদীতা ইত্যাদি মৌলিক প্রবণতা সব মানুষের মধ্যেই কমবেশী রয়েছে। সেই হিসেবে সব মানুষই ভাই-ভাই। দোষী ব্যক্তি যেরকম রক্তমাংসের তৈরী মানুষ, গীবতকারীও তেমনই রক্তমাংসের তৈরী মানুষ। মূহুর্তের দূর্বলতায়, পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাবে, শয়তানের প্ররোচনায় যে কেউ কোনো একটি অপরাধ করে থাকতে পারে। ঐরকম অবস্থায় পড়লে কিম্বা ঐরকম সুযোগ পেলে গীবতকারীও যে সেই অপরাধটি করত না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই স্বভাবগত দিক থেকে অপরাধকারী আর গীবতকারী একই বৈশিষ্টের অধিকারী। স্বভাবগতভাবে তারা ভাই-ভাই। তাই কেউ একজন যখন অন্য একজন অনুপস্থিত দোষী ভাইয়ের নামে গীবত করে তখন সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খায় বটে। এখানেও আল্লাহ তায়ালার তুলনাটা কত সুন্দর ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে লক্ষ্য করুন। এখানে “মৃত” বলতে “অনুপস্থিত” বুঝাচ্ছে। একজন “মৃত” ব্যক্তির শরীর থেকে গোশত খুলে নিলেও মৃতব্যক্তি যেমন কোনো প্রতিবাদ করতে বা বাধা দিতে পারে না তেমনি একজন “অনুপস্থিত” ব্যক্তির নামে হাজারটা সত্য/মিথ্যা দোষের কথা বর্ণনা করে গেলেও অনুপস্থিত থাকার কারণে সে ঐসব কথার কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না কিম্বা নিজের স্বপক্ষে বক্তব্য দিতে পারে না। অথচ ঐ একই কথা তার সাক্ষাতে বলা হলে সে নিশ্চয়ই আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু না কিছু বলতে চাইত।

তাছাড়া দোষী ব্যক্তির দোষ তার সাক্ষাতে বলাই সভ্য জগতের নিয়ম। সে কারণেই সভ্য সমাজের আইন-আদালতে দোষী ব্যক্তির বিচার চলাকালে কেবলমাত্র আসামীর উপস্থিতিতেই মামলার শুনানী বা আসামীর দোষ পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে। আসামী পলাতক থাকলে কিম্বা গরহাজির থাকলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে তাকে শুনানীতে উপস্থিত থাকার জন্য পরপর নোটিশ প্রদান করার নিয়ম রয়েছে। নোটিশ প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা শেষেই কেবল কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামীর অনুপস্থিতিতে তার দোষ পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে। অতএব দেখা যাচ্ছে, সভ্য সমাজের নিয়ম-কানুন ও বিধিবিধানের আওতায় কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ নিয়ে পরচর্চা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর সর্বোত্তম বিধান হচ্ছে আল-কুরআন। আল-কুরআনে তাই কেবলমাত্র আইন আদালতের কাঠগড়াতেই নয় বরং দৈনন্দিন সামাজিক পরিসরেও অনুপস্থিত ব্যক্তির নামে কোনো অভিযোগ বা দোষ অন্যের সামনে বলার ব্যাপারটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ আল-কুরআন কোনো জাগতিক সভ্যতার অবদান নয় এটা হচ্ছে মহাজাগতিক সভ্যতার ধারক এবং পরম করুণাময়ের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য প্রেরিত সার্বজনীন কল্যাণের আইন। তাই পবিত্র কুরআনে সার্বজনীন এই বিধান বর্ণিত হয়েছে যে, আদালতের বিচারকার্যের সময় তো বটেই, এমনকি দৈনন্দিন সামাজিক কথাবার্তাতেও কেউ যেন দোষী ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা না করে। কারণ সেক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিটি আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। হতে পারে সেই ব্যক্তি অপরাধী কিন্তু তারও নিজের পক্ষে কিছু বলার থাকতে পারে। তাই দোষী ব্যক্তির “অনুপস্থিতিতে” তার দোষ সম্পর্কে বলাবলি করা আর “মৃত” ভাইয়ের শরীর থেকে গোশত খুলে নেয়া একই কথা। বর্ণিত আয়াতটিতে আরও অগ্রসর হয়ে গীবত করাকে “মৃত” “ভাইয়ের” গোশত “খাওয়া বা ভক্ষণ করা”র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা কতই না দরদী এক অভিভাবকের মত তাঁর অবুঝ বান্দাদেরকে মৃদু তিরস্কারের মাধ্যমে গীবত থেকে ফিরিয়ে রাখতে চাচ্ছেন স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, একজন মুসলমান হিসেবে ও ভদ্রব্যক্তি হিসেবে গীবত বলা বা শোনার মত অভিরুচি কোনো মুসলমানের থাকা উচিত নয়। কারণ গীবত করার অর্থ কেবল “মৃত” “ভাইয়ের” শরীর থেকে গোশত খুলে নেয়ার ব্যাপার নয় বরং গোশত খুলে নিয়ে তা “খাওয়া” বা “ভক্ষণ করা”র মত ঘৃণ্য একটি ব্যাপার। নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মত রুচি কেবল অসভ্য জংলী মানুষদেরই হয়ে থাকে। সভ্য মানুষের সমাজে মানুষ হয়ে মানুষের গোশত খাওয়ার কথা শোনা যায় না। বনজঙ্গলে বসবাসকারী কিছু জংলী, অসভ্য, বর্বর মানুষের কথা শোনা যায় যারা “ক্যানিবাল” বা “নরমাংসভক্ষণকারী”। সভ্য, ভদ্র, সুশীল ও সামাজিক মানুষের পক্ষে যেমন নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া কোনো স্বাভাবিক আচরণ নয় তেমনি গীবত বলা বা শোনা কোনো মুসলিম ভদ্রলোকের পক্ষে স্বাভাবিক আচরণ নয়। উল্লিখিত আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী গীবত চর্চা করা একটি অসভ্য আচরণ। বর্ণিত আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা খুবই দরদের ভাষায় এবং গায়ে হাত বুলিয়ে বুঝানোর ভঙ্গিতে বান্দাকে গীবত করার মত অসভ্য আচরণ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, গীবতকে একটি হালকা এবং গুরুত্বহীন ব্যাপার বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা বিপুল ক্ষতিকারক একটি বিষয়। এটা তাগুতী শক্তির একটি মারাত্মক অস্ত্র। আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, দুষ্ট লোকজন কীভাবে গীবতকে ব্যবহার করে ছোট-বড় সামাজিক দূর্ঘটনা ও কোন্দল সৃষ্টি করে এবং সেসব দূর্ঘটনা ও কোন্দল থেকে অবশেষে নিজেরা ফায়দা উদ্ধার করে। আপনার নিজের দেখা এমন অসংখ্য উদাহরণ আপনি স্মরণ করতে পারবেন।  অতএব, আমরা সকলেই গীবত বলা থেকে তো বটেই এমনকি গীবত শোনা থেকেও সাবধান থাকব ইনশা আল্লাহ। কোনো গীবতকারীকে আমরা প্রশ্রয় দেবনা। একথা নিশ্চিত যে, যেই ব্যক্তি আপনার সামনে অন্যের দোষ সম্পর্কে বলে থাকে, কোনো সন্দেহ নেই সেই ব্যক্তি আপনার অনুপস্থিতিতে অন্যের সামনে আপনার দোষও বলাবলি করে থাকে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে গীবত বলা ও শোনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

৫ comments

Skip to comment form

  1. 3
    Dulal

    আমার মামিকে দেখছিলাম অনেক গীবত করে এবং তিনি নামাজও পরে। আমি তাকে গীবত সম্পকে বলি। কিন্তু এতে কোন কাজ হয়নি। তার নামাজ কি কবুল হবে।।।।।।

  2. 2
    ফাতমী

    আপনার মহাজাগতিক নামের ব্যাক্ষা কি? মহাজাগতিক নামের এক মানুষের একটা ভিডিও দেখেছিলাম বিদায় হজ্বের ভাসনের উপর যেখান তিনি ভাষনে যা নাই, বা দুর্বল প্রমানিত বা অপ্রমাণিত হাদিস ব্যাবহার করেছিলেন। যেটা ছিল অত্যান্ত দুঃখজনক।

    1. 2.1
      মহাজাগতিক

      ধন্যবাদ ফাতেমী। সেই মহাজাগতিককে আমি চিনি না। আসলে ভার্চুয়াল জগতে ছদ্মনাম ব্যবহার করাটা চালু একটা ব্যাপার। আমি যে ধরনের লিখি তা আসরে নিজ নামে লিখতে কোনোই বাধা নেই। মহাজাগতিক নামটা আমার পছন্দ অন্য কারণে। আমি মনে করি আামদের এই জীবনটা একটা মহাজাগতিক অবস্থিতি। জন্ম মৃত্রূ হাশর নশর এগুলো এক একটা মঞ্জিল মাত্র কিন্তু মহান আল্লার সূত্রে আমাদের জীবনটা মহাজাগতিক সুতায় বাধা। জাজাকাল্লাহ।

  3. 1
    ফাতমী

    একটা প্রয়োজনীয় বিষয় নির্বাচন করেছেন, মহান আল্লাহ পাক আপনাকে রহমত দান করুন। আমিন।

    1. 1.1
      মহাজাগতিক

      @ফাতমী সময় নিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.