«

»

Jun ০৮

পরকালীন জীবন সুনিশ্চিত!

পরকালীন জীবন সুনিশ্চিত!

মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে যে পদ্ধতিতে আমাদের এই পৃথিবীর জীবন সম্ভব হয়েছে, মৃত্যুর পরে পরকালীন জীবনও ঠিক একইভাবে অবশ্যম্ভাবী।

মনে করুন আপনার বর্তমান বয়স ৩০ বছর। আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করি যে, আপনি কি আপনার ৩০ বছর ৩ মাস আগের শারীরিক অবস্থাটি স্পষ্টভাবে কল্পনা করতে পারেন? সে অবস্থাটি কি আপনার বর্তমান পার্থিব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না? হ্যাঁ, সেটি ছিল আমাদের বর্তমান জীবনের ঠিক পূর্ববর্তী অবস্থা। অথচ তা আমাদের বর্তমান জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আপনার মাতৃগর্ভের জীবন এবং পৃথিবীতে বর্তমানে যাপিত জীবন- দু'টি আলাদা জীবন। মাতৃগর্ভের জগতে আপনার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আপনি পৃথিবীর জীবনে অস্তিত্ব লাভ করেছেন।

আপনার মাতৃগর্ভের জীবন আর পার্থিব জীবনের মধ্যে যেরূপ সম্পর্ক, আপনার পার্থিব জীবন আর পরকালীন জীবনের মধ্যে একইরূপ সম্পর্ক। মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে একবার ভূমিষ্ঠ হলে আপনি যেমন আর মাতৃগর্ভে ফেরত যেতে পারেন না, একইভাবে মৃত্যুর পর পরকালীন জীবনে পৌঁছে গেলে আপনি আর ইহজীবনে ফেরত আসতে পারেন না। আবার, মাতৃগর্ভে অবস্থানকালীন সময়ে আপনি যেমনভাবে পর্থিব জীবনের অস্তিত্বের শর্তাবলী (Conditions/Factors) সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন না একইভাবে আপনি পার্থিব জীবনে অবস্থান করে পরকালীন জীবনে বেঁচে থাকার শর্তাবলী সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন না। সুতরাং, যৌক্তিকভাবে বলা যায় যে, মাতৃগর্ভের জীবন বনাম ইহকালীন জীবন ও ইহকালীন জীবন বনাম পরকালীন জীবনের মধ্যে মিল রয়েছে।

কেমন ছিল আমাদের মাতৃগর্ভের জীবন?

মাতৃগর্ভে আমাদের জীবন কাটে জরায়ুর মধ্যে বিশেষ ধরনের তরলে ভাসমান অবস্থায়। গর্ভফুল বা শিশুর নাভীতে যুক্ত নাড়ীর মধ্য দিয়ে শিশু মায়ের শরীর থেকে পুষ্টি পায়। মায়ের হৃদপিন্ড থেকে রক্ত পাম্প হয়ে শিশুর শরীরে সঞ্চালিত হয়। সবদিক থেকে বিবেচনা করলে শিশুর অবস্থানের জন্য এটি একটি পরিপূর্ণ জগত এবং আদর্শ একটি স্থান।

এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। মনে করুন, আপনার বর্তমান বয়স ৩০ বছর। তাহলে ৩০ বছর ৩ মাস আগে মাতৃগর্ভে আপনার বয়স ছিল ৭ মাস। ধরে নিন, আপনি কোনোভাবে ৩০ বছর ৩ মাস আগের মাতৃগর্ভের শিশুটির সাথে যোগাযোগ করতে পারলেন। শিশুটিকে আপনি বললেন,

(১) তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি এ জগত (মাতৃগর্ভ) ছাড়তে হবে।

(২) এখান থেকে বের হয়ে তুমি পরবর্তী (পার্থিব) জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ এবং সেই জগতটি (পার্থিব জগত) এই জগতের (মাতৃগর্ভ) চাইতে কমপক্ষে ৬০০ কোটি গুণ বড় (পৃথিবীতে আনুমানিক ৬০০ কোটি লোকের বাস। পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, মরূভূমি ইত্যাদির কথা বাদ দিলাম)

(৩) তুমি মুখে খাবার খাবে এবং নাকের ফুটো দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করবে।

(৪) পরবর্তী সেই জগতের কোনো কোনো ফল তোমার বর্তমান জগতের আয়তনের সমান হবে (কাঁঠালের কথা ধরলে- সেটি মাতৃগর্ভের প্রায় সমান অথবা তার চাইতে বড়)।

(৫) তুমি পরবর্তী জগতে দৌড়ঝাঁপ করতে ও হেঁটে চলে বেড়াবে।

শিশুটিকে আপনি উপরের তথ্যগুলো জানালে সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে আপনার মনে হয়? (ধরে নিচ্ছি, শিশুটি আমাদের মত করে যুক্তি সহকারে চিন্তা করতে পারে)। উপরের তথ্যের আলোকে তার যুক্তিবাদী ভাবনায় নিচের সিদ্ধান্তগুলোই আসবে কারণ এ সিদ্ধান্তগুলো আসলে আপনার নিজেরই সিদ্ধান্ত। তবে, এ সিদ্ধান্তগুলো মাতৃগর্ভের জগতের শর্তাবলীর আওতায় গৃহীত। ধারাবাহিকভাবে সিদ্ধান্তগুলো বিবেচনা করা যাক:

(১) আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাকে এ জগত ছাড়তেই হবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ দিন দিন এটি আমার শরীরের পক্ষে ছোট হয়ে আসছে। এটা আমাকে চারদিক থেকে চেপে ধরছে। আমি যদিও লাথিগুঁতো দিয়ে এটিকে বড় করার চেষ্টায় আছি। কিন্তু বিশেষ কোনো সুবিধা করতে পারছি না। আমার অবস্থানের পক্ষে এ জগত বড়ই সংকীর্ণ হয়ে উঠছে। যাওয়ার মত অন্য কোনো স্থানও আমার নেই। সম্ভবতঃ আমার আয়ু শেষ হয়ে আসছে। আমি ধ্বংস হতে চলেছি।

(২) আপনার (১) নং বক্তব্যটি সঠিক। আমাকে এ জগত ছাড়তে হবে। তবে, আমি পরবর্তী জগতে বেঁচে থাকব মর্মে আপনি যে তথ্য জানাচ্ছেন তা সঠিক নয়। এখান থেকে বের হলে আমার পুষ্টি সাধনের নাড়ীটি (গর্ভফুল) ছিঁড়ে যাবে। এটি ছিঁড়ে যাওয়ার পরও আমি বেঁচে থাকবো- আপনি কি আমাকে একথা বিশ্বাস করতে বলছেন? এখানে এক ধরনের তরল পদার্থ আমাকে বেষ্টন করে রেখে আমার শরীরকে সুরক্ষা দিচ্ছে। আমি তো পরের জগতের ধারকপাত্রটি দেখতে পাচ্ছি না। সেখানে কেউ আমাকে সুরক্ষা প্রদান করবে তারও কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। আর ৬০০ কোটি গুণ বড় কোনো পরবর্তী জগত সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। আমার ৬০০ কোটি গুণ বড় জগতের প্রয়োজন নেই বরং পারলে আমার এই বর্তমান জগতটিকেই (মাতৃগর্ভ) আমার শরীরের মাপে একটু বড় করার ব্যবস্থা করুন যাতে আমি বেঁচে যেতে পারি।

(৩) মুখে খাবার খাওয়া আর শ্বাস গ্রহণ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। আমার কাছে এটি একটি অযৌক্তিক, উদ্ভট, বানোয়াট কথা বলে মনে হচ্ছে। কারণ, নাড়ীর মাধ্যমে যখন পুষ্টি সাধন হয় তখন মুখে খাওয়ার ব্যাপারটির কী অর্থ থাকে? শ্বাসগ্রহণ ছাড়াই আমি যদি এখানে বেঁচে থাকতে পারি তাহলে শ্বাস গ্রহণের কথাটি কি বানোয়াট নয়?

(৪) আমার নিজের শরীরের মাপের একটি খাওয়ার জিনিস সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে আমার হাসি পাচ্ছে। ওটা দিয়ে কী করা হবে? আর ওরকম বড় বড় জিনিসের দরকারই বা কি? তাহলে আপনার কথিত পরবর্তী জগতে কি সব দৈত্যরা বাস করে?

(৫) আপনি কেন এই স্পষ্ট সত্যটি অস্বীকার করে চলেছেন যে, আমার গতিবিধি আমার নাভীর সাথে যুক্ত নাড়ীটির সাথে সম্পর্কিত। আপনি যত যুক্তিই দেখান না কেন আমার দৌড়ঝাঁপ এই নাড়ীটির সীমানা ছাড়াবে না কখনও আমার গতিবিধি এই নাড়ীর দৈর্ঘের সীমানায়। সুতরাং, দৌড়ঝাঁপ আর হাঁটাচলার প্রশ্নই আসে না। আপনার কথিত পরজগত সম্পর্কে আমাকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিন।

এখন আপনি শিশুটিকে বুঝাতে শুরু করলেন এভাবে, তোমার কাছে মনে হচ্ছে তোমার জগতের চারপাশের দেয়ালটি তোমাকে চাপ দিয়ে পিষে মারতে চাইছে। আসলে এটি তোমার পরের জগতে স্থানান্তরের স্বাভাবিক ও জরুরি প্রক্রিয়া মাত্র। এ চাপের ফলেই তুমি পরবর্তী জগতে যেতে পারবে। এ জগতে তোমার নাভীর নাড়ীটি যুক্ত থাকা যতটা জরুরি, পরবর্তী জগতে তা কেটে ফেলা ততটাই জরুরি। এ জগতে তোমার ফুসফুসে কোনো কিছু ঢুকে না পড়াটা যতটা জরুরি, পরের জগতে তোমার ফুসফুসে বাতাস ঢোকাটা ততটাই জরুরি। ইত্যাদি ইত্যাদি……

কথাগুলো শিশুটির কাছে নবীসুলভ বয়ানমাত্র বলে মনে হবে। এসব কথায় কোনো যুক্তি সে খুঁজে পাবে না।

কিন্তু কি আশ্চর্য! দেখুন আপনিই সেই শিশু। আপনিই এখন পরবর্তী জগতে স্থানান্তরিত হয়েছেন অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে। আপনার যুক্তি অনুযায়ী মাতৃগর্ভের জগতে আপনার মৃত্যু হয়েছে। অথচ কি আশ্চর্য! আপনি পরের জগতে বেঁচে উঠেছেন।

মাতৃগর্ভে প্রাপ্তব্য তথ্যের আলোকে মাতৃগর্ভের ভিতরের অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়- একটি শিশু যে কিনা পরিপূর্ণ একটি জগতে বেঁচে ছিল, ১০ মাসের আয়ুস্কাল শেষে, সে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর তার নাভীর সাথে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ নাড়ীটি কাটা অবস্থায় পাওয়া গেল। যুক্তির আলোকে দেখা যায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। কারণ পুষ্টিসাধন ও রক্ত সঞ্চালনের নাড়ীটি কাটা পড়েছে। জলজ্যান্ত শরীরটির আর কোনো চিহ্নমাত্র নেই। শুধু কাটা নাড়ীটি রয়ে গেছে। অতএব, মাতৃগর্ভের ভিতরের অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে শিশুটির নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে। এটিকে শুধু মৃত্যু বললে ভুল হবে। বরং বলা যায় শিশুটি অনস্তিত্বে চলে গেছে। এটি এমন এক মৃত্যু যেখানে লাশটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

কিন্তু না। পরবর্তী জগত সম্ভব হয়েছে। শিশুটি পার্থিব জগতে বেঁচে রয়েছে।

এবার আপনার পার্থিব জগতের নিরিখে পরকালীন জীবন সম্পর্কে ভাবতে থাকুন। আপনার কাছে অবিশ্বাস্য, অসম্ভব মনে হতে পারে, নিজেকে দিশেহারা বলে মনে হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ মাতৃগর্ভে অবস্থানকালেও আপনার বর্তমান পার্থিব জীবনকে আপনার নিকট অবিশ্বাস্য আর অসম্ভব বলেই মনে হতো।

এবার ভাবুন, এই পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকা অবস্থায় ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া, দূর্বল হয়ে পড়া, শরীরের শক্তি কমে আসা ইত্যাদি সবই পরবর্তী জীবনে স্থানন্তরের জন্য স্বাভাবিক জরুরি প্রক্রিয়ামাত্র। ইহজগতে আপনার মৃত্যুর পর শরীর ধ্বংস হয়ে যাবে- একথা ঠিক। মাতৃগর্ভের মৃত্যুর সময় আপনার লাশটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু সেই আপনি ঠিকই বেঁচে রয়েছেন। ইহজাগতিক মৃত্যুতে তবু লাশের অস্তিত্ব থাকে। ফলে দৃশ্যমান ধ্বংসই শেষ কথা নয়। এটি একটি বিনির্মাণ প্রক্রিয়া। একদিক থেকে দেখলে যেটাকে ধ্বংস বলে মনে হয় অপরদিক থেকে বিবেচনা করলে সেটি আসলে সৃষ্টির প্রক্রিয়া। এভাবেই ধ্বংসের অপর পিঠে সৃষ্টি নিয়েই স্বাভাবিক নিয়মে আমরা পারলৌকিক জীবনে পৌঁছে যাবো। সে জীবনে বেঁচে থাকার শর্ত কেমন হবে তা যদিও আমরা ইহজীবনের জ্ঞান ও তথ্যের আলোকে প্রমাণ করতে পারবো না। যেমনভাবে সত্যিকার অর্থে মাতৃগর্ভের কোনো শিশু পার্থিব জীবন সম্পর্কে কোনো কিছু প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু আমরা একথা প্রমাণ করেছি যে, আমাদের এই জীবন-জগত আমাদের ব্যবহারিক জ্ঞানের সীমানার অনেক অনেক বাইরে এবং তা বহুবিচিত্রতায় ভরা। একটু ভেবে দেখলে এখানে অসম্ভবই সম্ভব। আমরা আসলে জাদুবাস্তবতায় বাস করছি। কিন্তু এ বাস্তবতাটি উপলদ্ধি করতে পারি না আমাদের সীমিত যুক্তিজ্ঞানের কারণে। আমাদের এই অস্তিত্বটি আমাদের মৃত্যুতে ধূলায় মিশে যাওয়ার মত অতটা তুচ্ছ নয়। আমাদের অস্তিত্ব বহমান। এটি উচ্চতরক্রমে রূপান্তরশীল।

৫ comments

Skip to comment form

  1. 5
    রাহাত

    অসাধারণ বলেছেন ভাই। ওরা আসলে মূর্খ যারা ভাবেনা

  2. 4
    মহাজাগতিক

    মন্তব্যের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

  3. 3
    হাসান মাহমুদ

    অসাধারণ যুক্তি ও চমৎকার উপস্থাপন

  4. 2
    abu bakkar

    বাহ । বেশ চমৎকার ।

  5. 1

    সুন্দর হয়েছে । একটা সুন্দর যুক্তির উপরে লেখা ।

    কথাগুলো শিশুটির কাছে নবীসুলভ বয়ানমাত্র বলে মনে হবে।

    হুম । 

    চালিয়ে যান এমন লেখা।

     

     

Leave a Reply

Your email address will not be published.