«

»

Jun ১৭

কালেমা তাইয়্যিবাতে ‘নাস্তিকতা’র ব্যবহার

কালেমা তাইয়্যিবা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”। এ পবিত্রবাক্যটিতে নাস্তিকতাকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সে ব্যাপারে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান আর সরল ভাবনাজাত কথাগুলো শেয়ার করবো ইনশাআল্লাহ। আজ প্রধানত “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অংশটুকু নিয়েই কথা বলবো। “ইলাহ” শব্দটির ভাবব্যঞ্জনা বাংলায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায়না তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শব্দটির অর্থ করা হয় “উপাস্য”। মূল কথাগুলো বলার আগে নিশ্চিত করতে চাই যে, এ নিবন্ধটি কালেমা তাইয়্যিবার কোনো “তাফসীর” বা ব্যাখ্যা নয়। এটি শুধুই কালেমা তাইয়্যিবা বা পবিত্রবাক্যটির গঠনগত দিক নিয়ে আলোচনা। প্রথমে কালেমা তাইয়্যিবার গঠনগত দিক নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলো দেখে নিই:

 

আল্লাহ তায়ালায়ার রবুবিয়তের উপর জোর প্রদানের জন্য গৃহীত স্টাইল:

‍“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। “কোনো উপাস্য নেই আল্লাহ ছাড়া”- এভাবে ঘুরিয়ে না বলে সহজভাবে বলা যেত “আল্লাহই একমাত্র/অদ্বিতীয় উপাস্য”। তা না বলে বাক্যটিকে শুরু করা হয়েছে সকল “উপাস্য”কে খারিজ করার মাধ্যমে। এরপর আল্লাহর রবুবিয়তকে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে। বিষয়বস্তুর উপর জোর প্রদানের জন্য প্রায় সব ভাষাতেই এই স্টাইলটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: ইংরেজিতে “None but ….” কিংবা “There is no ..” দিয়ে বাক্য শুরু করলে তা “Only …”-র অর্থ প্রদান করে। তারপরও “None but ….” “There is no …”-তে যেই ফোর্স বা জোরটি পাওয়া যায় “Only …”-তে এসে তা যেন পানসে, ঘরোয়া আর অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়ে। তাই আল্লাহর রবুবিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই “লা ইলাহা” বা “কোনো উপাস্য নেই” কথাটির ব্যবহার বিষয়বস্তুর উপর জোর প্রদানের এমন একটি স্টাইল যা মানবিক ভাব প্রকাশের জন্য কমবেশি সব ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়।

 

মারেফতি ধারার ব্যাখ্যা:

কালেমা তাইয়্যিবার গঠনগত দিক নিয়ে মা’রেফতি ধারার বহুবিচিত্র ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। মা’রেফরেত পরিভাষা ব্যবহার না করে সাধারণভাবে বলা যায়, “লা-ইলাহা” হলো মানব অন্তরে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত “রব” এর ধারণাগুলি খারিজ করার প্রক্রিয়া। আর “ইল্লাল্লাহ” হলো “বাতিল রব” এর স্থলে আল্লাহর “রবুবিয়ত” এর অধিষ্ঠান ঘটানো। একটা কলসীকে বিশুদ্ধ পানি দ্বারা পূর্ণ করতে চাইলে এবং সেই পানিকে ব্যবহারযোগ্য, পানযোগ্য ও বিশুদ্ধ আকারে সংরক্ষণ করতে চাইলে আগে দেখে নিতে হবে কলসীর মধ্যে দূষণকারক কিছু আছে কিনা। কলসীতে যিনি বিশুদ্ধ পানি ভরবেন, কলসী “দূষণমুক্ত” হওয়া নিশ্চিত করার দায়িত্ব তারই। সুতরাং, “লা ইলাহা” দ্বারা অন্তররূপ কলসীকে “শূন্য”, “খালি” বা “দূষণমুক্ত” করা হয়। আর তারপর এর মধ্যে “কাওসার” বা “বিশুদ্ধ চেতনার ঝর্ণা”-র অধিকারী ‘মুহাম্মদ (সাঃ)’ এর মাধ্যমে উৎসারিত “ইল্লাল্লাহ” এর অমৃতবারি বা বিশুদ্ধ পানি রাখা হয়। “লা ইলাহা” দ্বারা “যাকিছু” খারিজ বা বাতিল করা হয় সেগুলোর মধ্যে অনেককিছুই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমতঃ রয়েছে “Pagan belifes” বা “লৌকিক ও পুরাণভিত্তিক দেবদেবীর বিশ্বাস” বা শির্ক। তাই, “লা ইলাহা” দ্বারা প্রথমতঃ লৌকিক ও পুরাণভিত্তিক দেবদেবীর বিশ্বাসকে খারিজ করা হয়। বিষয়টিকে বিমূর্তভাবে বুঝতে হবে। ইসলাম প্রচলিত কোনো দেব-দেবীর সাথে কিংবা অন্য কোনো ধর্মের সাথে ঈর্ষা, বিদ্বেষ কিংবা বিরোধবশতঃ তাদেরকে খারিজ করেনা। ইসলাম এটি করে থাকে তার একান্ত নিজস্ব মতাদর্শগত কারণে, আল্লাহর ওয়াহাদানিয়াত বা ‘একত্বের’ ধারণা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। আর সৃষ্টিকর্তার “অখন্ডতা” বা “ওয়াহাদানিয়াত”ই হলো ইসলামের সাথে অন্য সকল ধর্মের মূল পার্থক্য। ইসলামের সাথে লৌকিক ও পৌরাণিক দেব-দেবীর ধারণায় সংঘাত এখানেই যে, লৌকিক ও পৌরাণিক দেব-দেবীর ধারণাতে আল্লাহর “জাত-পাক” বা “পবিত্র সত্ত্বা”কে খন্ডিত আকারে উপস্থাপন করা হয়। ইসলাম কখনই সৃষ্টিকর্তার “পবিত্র সত্ত্বা”র খন্ডিত উপস্থাপন সমর্থন করে না। আল্লাহর “জাত-পাক” বা পবিত্র সত্ত্বা সৃষ্টজগত থেকে আলাদা, সৃষ্টজগত নিরপেক্ষ এবং সকলকিছুর উর্দ্ধে। তাঁর “সিফত” বা গুণবাচক বৈশিষ্ট্যগুলিকে আমরা “খন্ডিতভাবে” স্মরণ বা জিকির করতে পারি। যেমন: “আল-আদিল” বা পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারক, “আল-খালিক্ব” বা সৃষ্টিকর্তা, “আল-ওয়াজিদ” বা অফুরন্ত ভান্ডারের অধিকারী। কিন্তু তাঁর “সিফত” বা গুণবাচক বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতিমূতি তৈরি করে সেই “সিফতগুলো”কে “জাত” বা “সত্ত্বা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। যেমন: “আল-আদিল” বা “পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারক” এর জন্য “থেমিস”, “আল-খালিক্ব” বা “সৃষ্টিকর্তা” এর জন্য “বিষ্ণু” কিংবা “আল-ওয়াজিদ” বা “অফুরন্ত ভান্ডারের অধিকারী” এর জন্য “লক্ষ্মী” মূর্তির প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলিকে ভিন্ন ভিন্ন “জাত” বা “সত্ত্বা” হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। শুধুমাত্র উদাহরণ দেওয়ার সুবিধার জন্য “থেমিস” “বিষ্ণু” আর “লক্ষ্মী”র উদাহরণ দিলাম। আসলে দুনিয়াজুড়ে লৌকিক বা পৌরাণিক মূর্তি বা বিগ্রহগুলো আল্লাহ তায়ালার “সিফত”গুলোকে “জাত” বা “সত্ত্বা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সেগুলোর পূজা করে। ইসলাম এখানেই মতাদর্শগতভাবে দ্বিমত পোষণ করে। ইসলাম আল্লাহ তায়ালার “পাক-জাত” বা পবিত্র সত্ত্বাকে একক ও অখন্ড হিসেবে উপস্থাপন করে এবং তাঁর “সিফত”গুলোকে “জাত” হিসেবে উপস্থাপনের অনুমোদন দেয় না। যাহোক, এতো গেল “লা-ইলাহা” দ্বারা Pagan beliefs খারিজ করার বিষয়। এছাড়াও, অনেক সময় আমাদের জীবনে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় “টাকাপয়সার” বিপুল প্রতাপ দেখে কেউ কেউ “টাকাপয়সা”কে জীবনের “সবকিছু” বলে মনে করে থাকি। এমন মানুষ জগতে বিরল নয় যারা “টাকাপয়সা”, “ক্ষমতা” ইত্যাদিকেই জীবনের মূল চালিকাশক্তি ভেবে থাকি। সেগুলোকেই মনে মনে “প্রভূ” মানি। “লা-ইলাহা” দ্বারা মন থেকে এসব “প্রভূ”কেও খারিজ করা হয়। এরপর “ইল্লাল্লাহ” দ্বারা পরম, পবিত্র, একক ও অখন্ড “আল্লাহ”র ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

 

এখন আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ও ভাবনায় একুশ শতকীয় প্রেক্ষাপটে কালেমা তায়্যিবার গঠনগত দিকটি আলোচনা করতে চাই।

 

ইসলামের কালেমাতে নাস্তিকতার ব্যবহার:

একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে ইসলামের পবিত্রবাক্য কালেমা তায়্যিবাকে আরও একটু অগ্রসর হয়ে মুক্তমন নিয়ে পাঠ করলে এর আসল শক্তির জায়গাটি খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমার ধারণা, আল্লাহই ভালো জানেন, “লা ইলাহা” দ্বারা সত্যিকার অর্থেই এবং আক্ষরিকভাবেই “কোনো উপাস্য নেই” বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কালেমার “প্রথম পাঠ” ই হচ্ছে প্রকৃত “নাস্তিকতার” পাঠ। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় এই কালেমাটি কত বিপুল শক্তি ধারণ করে। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পণ্ডিত অনেকেই পি.এইচ.ডি ডিগ্রী নেয়ার পর বুঝতে পারেন যে, “সৃষ্টা বলে কোনোকিছু নেই” কিংবা “কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই” কিংবা “কোনো উপাস্য নেই”। আরে, এটাই তো মুসলমানের কালেমার “প্রথম পাঠ”!! কি আশ্চর্য!! “সৃষ্টা বলে কোনোকিছু নেই” কিংবা “কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই” কিংবা “কোনো উপাস্য নেই”- এই কথাটুকু বুঝতে অনেকেরই লাইব্রেরি ভরা বই পড়ে শেষ করতে হয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিতে হয় অথচ মুসলমানের কালেমার শুরুতেই এই জ্ঞান রয়ে গেছে, “লা ইলাহা”। কি আশ্চর্য!! এটি কি একটি বিরাট মু’জিজা বা অলৌকিক ঘটনা নয়? সারা পৃথিবীর সকল মুসলমান এই ‘নাস্তিকতা’র পাঠ পায় শিশু শ্রেণিতে অথচ কেউ কেউ এই “পাঠ” পায় তার সারা জীবন সাধ্য-সাধনা, জ্ঞান গবেষণা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ডিগ্রীটি নেয়ার পর।

বিশ্বজগতের মহান সৃষ্টা আল্লাহ তায়ালা জানেন যে, তিনি মানুষকে, তার বান্দাকে যেসব কলকব্জা দিয়ে তৈরি করেছেন তাতে প্রথমেই যে জ্ঞানটি ধরা পড়বে তা হলো- “লা ইলাহা”, “কোনো উপাস্য নেই”। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার জগতে বান্দাকে পাঠিয়েছেন পঞ্চইন্দ্রিয় সম্বল করে। মানুষ যাকিছু ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করে তা এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক) বা দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ এগুলোর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে এই পাঁচটি সম্বল করেই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তাই তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন যে, বান্দার কাছে যে সম্বল বা হাতিয়ারটুকু দেয়া হয়েছে তাতে প্রথমেই যা ধরা পড়বে তা হলো “লা ইলাহা” “কোনো উপাস্য নেই”। অর্থাৎ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের জ্ঞান থেকে প্রাপ্ত বিচার, রায় বা সিদ্ধান্তই হলো ‘নাস্তিকতা’র সিদ্ধান্ত অর্থাৎ “লা ইলাহা”। আর ইসলাম যেহেতু ফিতরাতের ধর্ম তাই আল্লাহ তায়ালাও ফিতরাতের ব্যতিক্রম ঘটান না। ‘ফিতরাত’ বা ‘স্বাভাবিকতা’র বিষয়টি মনে রেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, “লা ইলাহা” দ্বারা আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে প্রকৃত অর্থেই ‘নাস্তিক্য’র ধারণাটি অতিক্রম করতে বলছেন। তাই তিনি বান্দার অভিজ্ঞতায় প্রথমেই ‘নাস্তিকতা’কে বা “লা ইলাহা” কে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। সত্যিই তো, আমার ‘চোখ’ কোনো স্রষ্টা বা ‘উপাস্য’ কে দেখতে পায়না, আমার ‘কান’ কোনো ‘উপাস্য’র প্রত্যক্ষভাবে বাণী শুনতে পায়না, আমি ‘নাক’ দিয়ে কোনো ‘উপাস্য’র গন্ধ পাইনা, ‘জিহ্বা’ তে কোনো ‘উপাস্য’র স্বাদ পাওয়া যায়না, ‘ত্বক’ দিয়ে কোনো ‘উপাস্য’র স্পর্শ অনুভব করতে পারি না। অতএব, বান্দাকে জ্ঞান অর্জনের যাকিছু হাতিয়ার (পঞ্চ ইন্দ্রিয়) দেয়া হয়েছে ‘ফিতারাত’ এর হিসেবে সেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বিচার বা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে এটাই বলতে হবে যে, “লা ইলাহা”, “কোনো উপাস্য নেই”। এটিই হলো কালেমার প্রথম পাঠ – যা এক হিসেবে ‘নাস্তিকতা’র ই পাঠ।

এরপর আসছে “ইল্লাল্লাহ” এর পাঠ। এটি আবার এমন এক পাঠ যা সকলের নসীবে ঘটে না। ওই যে বললাম লাইব্রেরি ভরা বই পড়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ডিগ্রী নেয়ার পরও অনেকে কালেমা শরীফের প্রথম অংশ “লা ইলাহা”-তেই আটকে থাকে। তাদের পাঠ আর আগায় না। যাদের নসীবে আল্লাহর মেহেরবানী থাকে তাদের পক্ষেই কেবল “ইল্লাল্লাহ”র পাঠ গ্রহণ সম্ভব হয়। তারাই কেবল মহান আল্লাহর অনুগ্রহে “নাস্তিক্যবাদ” এর পাঠগ্রহণ শেষ করে পরের শ্রেণী “ইল্লাল্লাহ” তে উত্তীর্ণ হতে পারে। আর এখানেই চলে আসছে প্রাণী হিসেবে মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। পঞ্চ ইন্দ্রিয় তো সব পশু প্রাণীরই আছে- তাহলে মানুষ আলাদা হলো কীভাবে? মানুষ যদি জগতের সকল প্রাণী থেকে উচ্চ মর্যাদার দাবী করে তাহলে তাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের জ্ঞানমাত্র সম্বল করে বসে থাকলে চলে না। তার রয়েছে বোধ বা চেতনা। তার সেই বিশুদ্ধ চেতনা এমন একটি আয়না যেখানে সত্য ‘প্রতিফলিত’ হয়, যুক্তির দরকার হয়না। সেই সত্য ধরার জন্য একটু সজাগ থাকলেই হয়। সেই চেতনা যদিও পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের তথ্যগুলিকেই গ্রহণ করে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় এই মহাজাগতিক অবস্থিতি, চিরন্তন সময়, জন্ম-মৃত্যুর রহস্যাদি, তার নিজের অলঙ্ঘনীয় অজ্ঞানতা ইত্যাদিকে বিবেচনায় নেয়। ফলে, আপনি যখন আপনার অস্তিত্বের এই গভীরতম প্রদেশের কাছে, আপনার গূঢ় চেতনার কাছে আপনার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দেয়া বিচার বা সিদ্ধান্ত “লা ইলাহা” “কোনো উপাস্য নেই” কথাটি উপস্থাপন করেন তখন আপনার অস্তিত্বের গভীরতম প্রদেশে থাকা সেই ‘চেতনা’ই প্রতিবাদ করে ওঠে “ইল্লাল্লাহ”- অর্থাৎ আপনার ‘চেতনা’ আপনার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের “লা ইলাহা” সিদ্ধান্তটিকে হুবহু গ্রহণ করে না, বরং কিছু modify বা সংশোধন করে নেয় এভাবে: “হে আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় তোমাদের বিচার আমি গ্রহণ করছি। তোমাদের দেয়া “লা ইলাহা” বিচার বা রায়টি সঠিক তবে কোনো উপাস্য না থাকলেও ‘একজন’ আছেন আর তিনিই হলেন আল্লাহ”। এভাবে ইসলামের কালেমা তাইয়্যিবা একটি মনোজাগতিক মেকানিজম। এটা একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো কাজ করে। এক্ষুণি একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আপনি আপনার মনকে এভাবে বলুন: “হে আমার মন আমি তো কোনো স্রষ্টা বা উপাস্যকে দেখতে পাইনা, তার কথা শুনতে পাই না, তার কোনো গন্ধ পাইনা, তার কোনো স্বাদ পাইনা কিংবা তাকে স্পর্শ করতে পারি না। অতএব, হে আমার মন তুমি মেনে নাও যে, “লা ইলাহা” “কোনো স্রষ্টা নেই””। এখন দেখুন আপনার ‘মন’ বা আপনার ‘অন্তরের গভীরতম অঞ্চল’ থেকে উচ্চরিত হবে: “হে আমার পঞ্চইন্দ্রিয়, হে আমার চোখ, কান, নাক, জিহ্বা আর ত্বক তোমরা তো একসময় বিনষ্ট হয়ে যাবে, মারা যাবে। কিন্তু এই যে আমি, যে কিনা অন্তরের গভীর প্রদেশে বাস করি আমি জানি যে, তোমাদের সামর্থ্যের বাইরেও জ্ঞানের কিছু আওতা আছে যেখানে তোমাদের কোনো কার্যকারিতা নেই। হে আমার পঞ্চইন্দ্রিয় তোমরা তো যেকোনো কিছুর বিবেচেনা কর সাময়িক প্রেক্ষাপটে কিন্তু আমি বিচার গ্রহণ করি আমার অস্তিত্বের এই মহাজাগতিক অবস্থান, চিরন্তন সময়, জন্ম-মৃত্যুর রহস্য, আমার অলঙ্ঘনীয় অজ্ঞানতা এসবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে। তাই আমি জানি “কোনো স্রষ্টা না থাকলেও একজন অবশ্যই আছেন যিনি আল্লাহ”- “ইল্লাল্লাহ”।

এভাবেই এই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালেমাটি মানবমনের উপর যাদুমন্ত্রের মতো কাজ করে। এটিকে তুলনা করা যায় এসিডে পুড়িয়ে সোনা খাঁটি করার সাথে। আপনি যখন আপনার ‘চেতনা’র দিকে আপনার পঞ্চইন্দ্রিয়ের বিচার বা সিদ্ধান্ত বা ‘নাস্তিক্য’র ধারণা “লা ইলাহা” ছুড়ে দিবেন তখন আপনার ‘চেতনা’য় এক ধরনের ‘অস্বস্তি’ বা ‘জ্বালাপোড়া’ তৈরি হবে। আর আপনার ‘চেতনা’ স্বতস্ফূর্তভাবে বলে উঠবে “ইল্লাল্লাহ”। এখানে “লা ইলাহা” হলো ‘এসিড’ আর ‘ইল্লাল্লাহ’ হলো আপনার ‘অন্তর’ বা ‘চেতনা’ নামক ‘স্বর্ণালঙ্কার’ এর ময়লা দূর হয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা।

প্রক্রিয়াটিকে আবার একটা স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের সাথেও তুলনা করা যায়। আপনার ‘মন’ বা ‘চেতনা’কে জ্বালানীভর্তি একটা ইঞ্জিন হিসেবে ধরে নিন। এখন, “লা ইলাহা” হলো ইঞ্জিনের ‘ইগনিশন প্লাগ’ যা আগুনের ফুলকি ছড়ায়। আগুন সবকিছুকে পুড়িয়ে দিতে ও ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু আপনার ‘মন’ বা ‘চেতনা’ নামক ইঞ্জিন ‘ইগনিশন প্লাগ’ এর দেয়া নাস্তিক্যবাদ “লা ইলাহা” নামক সেই নিয়ন্ত্রিত আগুনকে ব্যবহার করে আপনার ইঞ্জিনে থাকা জ্বালানিকে পুড়িয়ে দেয় এবং জ্বালানীর বিশুদ্ধ অংশ আগুনের সাথে ক্রিয়া করে আপনার ‘মন’ বা ‘চেতনা’ নামক ইঞ্জিনে “ইল্লাল্লাহ”র গতি সঞ্চার করে আর জ্বালানীর অপ্রয়োজনীয় ও দূষিত অংশ (শির্ক) কে সাইলেন্সার পাইপ দিয়ে বের করে দেয়। এভাবে আপনার মনের ইঞ্জিন উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়।

এটিকে আবার গ্রীক দর্শনের “ক্যাথারসিস” বা “মোক্ষণ” কিংবা হোমিওপ্যাথির “Like cures like” “সমবিধান” চিকিৎসার সাথেও তুলনা করা যায়। অর্থাৎ কুফরি কালাম দিয়ে মনের কুফরি দূর করা। “লা ইলাহা” এই নাস্তিক্যবাদী কথা দ্বারা ‘মন’ বা ‘চেতনা’র উপর উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা। দুনিয়ার মোহ ও নানা জাগতিক দায়াদয়িত্বের ফাঁদে পড়ে ছোটবড় অন্যায় আর পাপ করতে করতে মন যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে সরে যায়। মনে যখন আল্লাহ ছাড়া “অন্য কোনোকিছুর” প্রভূত্ব এসে গেড়ে বসে তখন তা দূর করতে এই “মোক্ষণ” কিংবা “সমবিধান” চিকিৎসায় কাজ হয়।

 

শেষ কথা: কাফির কিন্তু অবিশ্বাসী নয়, অস্বীকারকারী

নাস্তিক হওয়া কি আসলে সম্ভব? সম্ভব নয়। টি.এস এলিয়ট সুন্দর কথা বলেছেন: “I shall show you fear in a handful of dust”. “একমুঠ ধূলা দেখিয়ে আমি তোমায় ভয় ধরাবো”। তুমি কতবড় নাস্তিক এই দেখ একমুঠ “ধূলা”- এই দেখো তোমার অস্তিত্বের শেষ পরিণতি? এই পরিণতি কি তুমি মানতে পারো? “একমুঠ ধূলা”ই যদি হয় মানব অস্তিত্বের সারৎসার তাহলে এই সভ্যতা আর মানব অর্জনগুলোর কী অর্থ থাকে? কবির আবেগ আমাদের মনকে অবশ্যই নাড়া দেয়।

যাহোক, মানুষ শুধুই ইন্দ্রিয়সর্বস্ব প্রাণী নয়। যা চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায় পঞ্চ ইন্দ্রিয়ে ধরা যায় তার বাইরেও অনেক কিছুকে মানুষ ‘মূল্য’ দেয়। নিজেকে দিয়ে বিচার করলেই বোঝা যায়। ধরুন আপনার সন্তান ভীষণ অসুস্থ। সন্তান খাওয়াদাওয়া করছে না। শহরের সেরা ডাক্তারকে দেখিয়েছেন। ডাক্তার বলেছে কিছুদিনের মধ্যেই সেরে যাবে। আপনি কি আপনার সেই অসুস্থ সন্তানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে পারবেন, “লা ইলাহা” “কোনো উপাস্য নেই”? বলতে পারবেন, কিন্তু সেই অবস্থায় আপনার ভিতর থেকে উত্তর আসবে, “ইল্লাল্লাহ”। কিংবা ধরুন আপনার বাবার বা মায়ের মৃত্যুশায্যার পাশে দাড়িয়ে, যত বড় নাস্তিকই আপনি হোন, বলতে পারবেন “লা ইলাহা”-“কোনো স্রষ্টা নেই”? পারবেন, তবে আপনার ভিতর থেকে উত্তর আসবে “ইল্লাল্লাহ”- “একজন আছেন, তিনি আল্লাহ”। এটাই ইসলামের কালেমা তায়্যিবার যাদু। একারণেই ‘কাফির’ বা নাস্তিক বলতে “অবিশ্বাসী” বুঝায় না। আমার মতে, ‘কাফির’ কথাটির বাংলা “অবিশ্বাসী” ব্যবহার করা ভুল। কারণ “অবিশ্বাসী” হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ‘একমাত্র স্রষ্টা’ তে বিশ্বাস মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এটা মানুষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কিছু কিছু মানুষ বিভিন্ন কারণে বিভ্রান্ত হয়ে, দুঃখ বা ঘৃণাজনিত কারণে নিজের ‘স্রষ্টায় বিশ্বাস’কে গোপন করে। অর্থাৎ সে ‘স্রষ্টায় বিশ্বাস’ করে কিন্তু নিজেকে প্রবোধ দেয় যে, সে তা করেনা। কিংবা সমাজের দশজনের কাছে বলে থাকে যে, সে স্রষ্টায় বিশ্বাস করে না। মোটকথা, সে “স্রষ্টাকে” অবিশ্বাস করতে পারে না বরং তার “স্রষ্টায় বিশ্বাস করার বিষয়টিকে” গোপন বা অস্বীকার করে। এ কারণে ‘কাফির’ শব্দের অর্থ হলো ‘গোপনকারী’, ‘অবিশ্বাসকারী’ নয়। স্রষ্টায় ‘অবিশ্বাস’ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। ‘কাফির’ দ্বারা ‘কৃষক’কেও বুঝায়। কৃষক যেমন মাটির নিচে ‘বীজ’ লুকিয়ে রাখে বা গোপন করে রাখে। সেই কারণে আরবীতে ‘কাফির’ শব্দটি দ্বারা ক্ষেত্রবিশেষে ‘কৃষক’ও বোঝায়। একইভাবে যে ব্যক্তি তার ‘ঈমান’ বা বিশ্বাসের কথা গোপন করে সে-ই ‘কাফির’ বা ‘গোপনকারী’ বা ‘অস্বীকারকারী’ অর্থাৎ সে ঈমানের কথা মুখে স্বীকার করে না, সে হিসেবে ঈমানের শর্ত লঙ্ঘন করে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং সকলকে কালেমা তায়্যিবার পরিপূর্ণ বরকত দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.