«

»

Jun ২২

“ঈদ” বনাম “ইদ” প্রসঙ্গে দু’টি কথা

‘ইদ’ আর ‘ঈদ’ নিয়ে যা শুরু হয়েছে তাতে মনে হয় ঈ(ই)দটাই😬 পণ্ড হবে এবার! এরপর যদি "ইমান" এর প্রসঙ্গ আসে তাহলে তো মনে হয় একটা "ঈমানী" লড়াই হয়ে যাবে! বেশকিছু দিন ধরেই দেখছি আর ভাবছি ব্যাপারটা বোধ হয় মিটে গেল ….. কিন্তু না। আসলে ভাষা যে, মানুষের রক্তে আর চেতনায় মিশে থাকে এই 'ইদ'-'ঈদ' এর দ্বন্দ্বই সেকথার দ্বিতীয় প্রমাণ। প্রথম বিশ্বজনীন প্রমাণ হলো ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি । অনেকে তো বুকের রক্ত দিয়ে দিতে চাচ্ছেন "ঈদ" করার জন্য। তাঁরা বলেন অতশত বুঝি না চিরকাল যে বানান শিখে এসেছি সেটাই ঠিক রাখতে চাই। কারণ "বানান" শেখার সাথে তার শৈশবের পরিশ্রম, বাবা-মা'র আদরে আদরে শেখার স্মৃতি সবই মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। অবশ্যই ভাষার বানান বদলাতে মনে কষ্ট হয়। কারণ এই বানান আমার বাবা-মা, শিক্ষক, গুরুজনরা আঙ্গুলে ধরে ধরে শিখিয়েছেন। আমরাও আমাদের সন্তানদেরকে একই বানান শেখাতে চাই। আমার জীবদ্দশাতেই আমার সন্তান বলবে "ইদ" আর আমি মনে পুষে রাখবো "ঈদ"। হায় পোড়াকপাল! ঈদের আনন্দটাই মাটি!

 

বানানের সূত্রে আমার পূর্ব প্রজন্ম আর উত্তর প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন বজায় থাক- এ একটা বিরাট চাওয়া। যেটির অনুভূতি আমাদের সবাইকে জারিত করে। কিন্তু এরই মধ্যে আবার কেউ কেউ ভাবছেন কর্তারা বুঝি বেছে বেছে ইসলামী শব্দগুলোই বদলাতে চাচ্ছেন। একথা ঠিক যে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে (স্কুল কলেজের লেখাপড়া, অফিস আদালতের কাজ, ইত্যাদি) ভাষার আনুষ্ঠানিক সংস্কারও যে প্রয়োজন হতে পারে সেটি বুঝে নেয়ার জন্য ব্যয় করার মতো পর্যাপ্ত সময় অনেকের নাও থাকতে পারে। ফলে, এই পরিবর্তন দরকার কেন সেই নীতিগত আলোচনা কিন্তু কেউ অতটা মাথায় নিতে চাচ্ছেন না। সামষ্টিক সুবিধা বা ভবিষ্যত প্রজন্মের লেখাপড়া/ বানান শেখা/ ভাষা ব্যবহারের সুবিধার জন্যও যে শব্দের বানানে পরিবর্তন দরকার হতে পারে এই নীতিগত কথাটি কারোই মনে আসছে না। এই দরকারি কথাটি আবেগের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। যারা বানান পরিবর্তনের পক্ষে না তারা প্রথমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন যে কর্তারা কাউকে নাখোশ বা আহত করার জন্য কিংবা কোনো অসদুদ্দেশ্যে বানান পরিবর্তনের কাজে হাত দেননি। তাহলেই মনের বিষাদভাব দূর হয়ে যাবে।

 

এবার ভেবে দেখুন তো ছোটবেলায় "ঈদ" আর "ইবাদত" শব্দদুটি শিখতে গিয়ে আপনার শিক্ষককে প্রশ্ন করেছিলেন কিনা- "দু'টোর উচ্চারণই তো "ই" তাহলে "ঈ" লিখব কেন?" হতে পারে বাবা-মা আপনাকে বলেছিলেন, "ওটা ওরকমই হয় সোনা। ঈদ হয় "ঈ" দিয়ে আর ইবাদত হয় "ই" দিয়ে এটাই মনে রাখবে।" তেমন কড়া শিক্ষক হলে আপনাকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন, "বস মর্কট! যা বলেছি তা-ই লেখ। বড় পণ্ডিত এসেছেন। সব বানান মনে রাখবি।" ল্যাও ঠ্যালা। আপনি কি অত ছোট বয়সে জানতে পেরেছিলেন যে, আরবী শব্দের টান-টুন ঠিক রাখার জন্য ঈ আর ই-তে পার্থক্য হয়? সেটি তো আপনি জানলেন অনেক পরে, যখন আপনার মগজের ধারণক্ষমতা বেড়ে গেছে এবং গলদঘর্ম পরিশ্রমে যুক্তিছাড়াই "ঈ" দিয়ে "ঈদ" আর "ই" দিয়ে "ইবাদত" লেখার ব্যাপারটি ততদিনে আপনার মজ্জাগত হয়ে গেছে।। আপনি যখন শিশু ছিলেন তখন "ঈ" আর "ই" মনে রাখার যে অসুবিধার উদাহরণটি দিলাম সেটি বাস্তব ছিল। হয়ত এমন হতে পারে যে, আপনি কোনোদিনও আপনার বাবা-মা বা শিক্ষককে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করেননি। আপনি ইন্টোভার্ট বা অন্তর্মুখী স্বভাবের হয়ে থাকলে আপনার এই "ঈদ" এর "ঈ" আর "ইবাদত" এর "ই" নিয়ে আপনার শিশুমনের প্রশ্নটিকে চেপে গিয়েছিলেন। হয়ত মনে ভেবেছেন, "কী দরকার এ প্রশ্ন করে শিক্ষকের ধমক খাওয়ার আর অন্যদের সামনে বোকা সাজার? তার চেয়ে কষ্ট করে মুখস্ত করে নিই।" যদি বলেন শিশু বয়সেই আরবীর টান-টুন শিখিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু বাংলা ভাষা শেখাতে গিয়ে যদি আরেকটি ভাষার টান-টুনও শেখাতে হয় তাহলে তো একসাথে দুই ভাষা শেখার চাপ শিশুরা নিতে পারবে না। ওতে অযথা শ্রম ও মেধা ব্যয় হবে। তাছাড়া ব্যাপার ওই একই হলো- "রমাকান্তকামার"। শিশুকে আপনি বলবেন, "আরবীতে ঈদ এর ঈ দীর্ঘ টান আছে তাই "ঈ" হয়। এতো শিশুর জন্য আরেক ল্যাঠা। আরবীতে ঈ আছে কিন্ত আরবীতে তো আবার ছোট টানের বেলায় "ই" -ও আছে? তো আমি কীভাবে বুঝবো কোনটি দীর্ঘ টান আর কোনটা ছোট টান। সেই সূত্র শেখাতে গেলে তাকে আরবী গ্রামার শেখাতে হবে। ফলে সেই একই- "রমাকান্তকামার"। না বুঝে মুখস্ত করা। আজ আপনি হয়ত কম্পিউটারে নেট চালানোর মতো সামর্থবান হওয়ার পরে কোথায় "ঈ" হয় আর কোথায় "ই" হয় সেই মুখস্তবিদ্যা নিয়ে গর্বিত। ওটি আপনার কাছে পনিভাত মনে হয়। কিন্তু একটা শিশু যে কিনা অত ছোট বয়সে বানান শিখছে। মুখের কথা যে লিখে প্রকাশ করা যায় সে ব্যাপারটাই তার কাছে এক বিস্ময়। তার উপরে যত কম ঝামেলা চাপানো যায় ততই মঙ্গল- শিশুর জন্য, শিশুর পিতামাতার জন্য, বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য। এ-ই হলো “নীতিগত সিদ্ধান্ত”র ব্যাপার। “ভাষা শিক্ষা শিশুর জন্য সহজ করবো, সবার জন্য ভাষা ব্যবহার সহজ করবো” এই নীতিটি আপনি মানেন কিনা- আগে সেকথা বলুন। যদি তা মানেন এখন আসেন এই নীতি বাস্তবায়নে ব্যকরণের কী কী নিয়ম পরিবর্তন করা যায় সে প্রসঙ্গে। এই প্রসঙ্গে আপনার হাজারটা পরামর্শ থাকলে দিন।

 

তর্কের খাতিরে যদি কেউ বলেন, “তাহলে আর অত নিয়মকানুনের দরকার নেই। যে যেভাবে ইচ্ছা বানান লিখুক। এটাই তো সবচেয়ে সহজ”। এ তো হলো হতাশাবাদীর কথা। যত কথাই বলিনা কেন। একটা মানভাষার দরকার অবশ্যই আছে। মানভাষা বহাল থাকার পরেও আইনের বইয়ের লেখাগুলো কী অর্থ প্রকাশ করে তাই নিয়ে আদালতে দু’পক্ষের উকিলদের মধ্যে শুধু হাতাহাতি হতে বাঁকী থাকে। আর মাঝেমাঝে একই বইয়ের লেখাজোকার দুই ধরনের ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে জজ সাহেবদের মগজ দু’ভাগ হয়ে যায়। সেখানে মানভাষাকে ‘বাজার’ এর উপর ছেড়ে দিলে (এই বিশ্বায়নের কালে আমি ‘বাজার’ ই বলবো) কিছুদিন পর আমরা কেউ কাউকে চিনতেই পারবো না। একেবারে তরুণ প্রজন্মের কেউ না হয়ে থাকলে এখনকার এফএম রেডিও স্টেশনগুলোর ৮০ ভাগ কথা বুঝতে আপনাকে নতুন করে পড়ালেখা শিখতে হবে। হতাশ হয়ে যদি মানভাষাকে বাদ দেওয়ার কথা বলেন তাহলে আপনি যে বাংলিশ প্রজন্মকে তিরস্কার করবেন সে অস্ত্রটাও তো আপনার হাতে থাকছে না। বাংলিশ প্রজন্ম যতই খিচুড়ি ভাষা বলুক এরা তো আপনার আমারই সন্তান। এরা তো হাওয়া খেয়ে বাঁচবে না। এরা এই ফুরফুরে দায়িত্বহীন জীবন ছেড়ে একসময় কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসা বাণিজ্যে, অফিস-আদালতে অবশ্যই কাজ করবে। তখন ওরা অফিসের নথিতে কিংবা ব্যবসার মেমো/ডকুমেন্টে নিশ্চয় নিজেদের খিচুড়ি ভাষা লিখতে পারবে না। মানভাষা লিখতে বাধ্য হবে। আইনকানুনের বইপুস্তকও কোনো কালেই খিচুড়ি ভাষায় পরিবর্তিত হবে না। সুতরাং আমরা হতাশাবাদী হলে পরের প্রজন্মমের প্রতি অবিচার করা হবে। তাই বৈচিত্রকে স্বীকার করে নিয়েও আমাদেরকে একটা মানভাষা লালন করতে হবে। কিন্তু সেই মানভাষারও আবার যুগোপোযোগি সংস্কার করতে হবে। আর দশটা ক্ষেত্রের সংস্কারের মতোই সেই যুক্তিসংগত সংস্কারকে সহজভাবে গ্রহণ করে নিতে হবে। একারণেই “ভাষা শিক্ষাকে “যথাসম্ভব” সহজীকরণ করা”র এই নীতির আওতায় কিছু নিয়ম গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে একটি নিয়ম হলো বিদেশী শব্দে “ঈ” বর্জনের নিময়। এতে বিদেশী শব্দের বাংলা বানানকে একটা কাঠামো বা ছকের মধ্যে ফেলা গেল।

 

বিদেশী শব্দের ক্ষেত্রে যেহেতু বানানের পরম্পরাগত কোনো ইতিহাস বা সূত্র পাওয়া যায় না; যেহেতু সেটিকে শুধুই উচ্চারণ অনুসারে মনের আন্দাজে “ই” বা “ঈ” বসাতে হয় তাই এটা একটা অসুবিধা। একথা ঠিক যে, বানান তা দেশিই হোক আর বিদেশিই হোক শিশুকে সেটি প্রথমত “মুখস্ত”ই করতে হয়। কিন্তু শিশু যখন কোনো শব্দের বুৎপত্তি জানার আগ্রহ দেখাবে কিংবা তা জানার বয়সে পৌঁছবে তখন সে তৎসম, তদ্ভব, অর্ধ তৎসম, দেশী শব্দগুলোর বানানের ব্যাপারে কমপক্ষে “পরম্পরাগত” একটা সূত্র খুঁজে পাবে, আগের ইতিহাস পাবে। কিন্তু বিদেশী শব্দের বেলায় শুধুই “কানের দক্ষতা”র উপর নির্ভর করে উচ্চারণানুগ হয়ে “আন্দাজে” একটা বানান লিখতে হয়। এমন যদি হয় যে, কোনো বিদেশী বানানের বেলায় উচ্চারণটি দীর্ঘ নাকি হ্রস্ব তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না; এক পণ্ডিতের শ্রবণে হ্রস্ব আরেক পণ্ডিতের শ্রবণে দীর্ঘ শোনা যাচ্ছে (তর্কের খাতিরে)। তাহলে এই দুই পণ্ডিতের বিরোধ নিস্পত্তি কে করবে? বিদেশী শব্দের, বিশেষ করে আরবী-ফারসীর উচ্চারণ মাফিক বানান লেখার ব্যাপারে লক্ষণীয় ভিন্নতা আছে, তা স্বীকার করতেই হবে। আরবী-ফারসীর বানানগুলো কিন্তু অনেকের অগোচরে বেশ বিবর্তিত হয়েছে। বিবর্তনের ধারাবাহিকতা হয়ত মিলবে না তবুও কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন: আগে ব-ফলা সহ ‘ক্বুরআন’ লেখা অনেক চোখে পড়ত, এখন তা হয়ে গেছে- কুরআন, কোরআন কোরাণ ইত্যাদি। “মাদ্রাসা” নাকি “মাদরাসা” নাকি “মাদ্ রাসা”? এ নিয়েও বিতর্ক আছে। এগুলোর জন্য নিয়ম বের করাই যেখানে কঠিন সেখানে যদি কমপক্ষে “ঈ” কার বর্জনের একটা নিয়ম কাজে লাগানো যায় তাতেই বা ক্ষতি কী? যদি বানানে বিদেশি শব্দের বেলায় এই ঝামেলা এড়িয়ে সকল বিদেশী শব্দকে একই নিয়মের আওতায় আনা হয় তাতে “ঝামেলা” কিছুটা তো কমলো! ব্যাকরণ বলি আর বিজ্ঞানসম্মত যেকোনো নিয়মের কথাই বলি না কেন- সকল “নিয়ম” এর লক্ষ্য হলো বৈচিত্রের মধ্যে সঙ্গতি এনে “ঝামেলা কমানো”।

 

যাহোক, বিদেশি শব্দের মধ্যে ঘটনাক্রমে আরবী ফারসী’র বেলাতেই এই “ঈ” বর্জনের বিষয়টি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ইংরেজির বেলায় কিন্তু এই “ঈ”-“ই” এর ঝামেলা নেই। তাতে মনে হতে পারে মুসলমানদের ব্যবহৃত শব্দগুলোই শুধু বদলানো হচ্ছে। ব্যাপারটা সেরকম নয়। তর্কের গোড়ায় গেলে, ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজলে অনেকদূরই যাওয়া যায়। বিদেশী শব্দে “ঈ” বর্জনের এই নিয়ম প্রণয়নের লক্ষ্য কি “আরবী-ফারসী”কে প্রকটভাবে বিদেশি করে তোলা? আরবী-ফারসী যে বিদেশী শব্দ- নতুন প্রজন্মকে সে ব্যাপারে সচেতন করে তোলা? কিংবা বাংলা ভাষার উৎপত্তি যে সংস্কৃত, তৎসম, তদ্ভব থেকে হয়েছে সে বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে, বাংলা ভাষায় আরবী-ফারসী শব্দের আত্তীকরণের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে অস্বীকার করা?

 

এ নিয়ে নতুন তর্ক ওঠানোর আগে, আমার মনে হয়, প্রযুক্তিনির্ভর ফাস্ট লাইফ যাপনকারী আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য “ভাষা শিক্ষা সহজীকরণ” নীতিটির বাস্তবায়নকে অগ্রধিকার দিতে যা যা করা দরকার তা সবই করা উচিত।

পরিশেষে কথা হলো, ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রচলিত বানান মেনে “ঈদ”ই করবো। আমার সন্তানদের “ভাষাশিক্ষা সহজীকরণে”র জন্য ওরা “ইদ” করবে। বাংলা একাডেমি বলেছে, ঈদ/ইদ দুটোই শুদ্ধ। 'ইদ' বাংলা একাডেমির “সংগততর কিন্তু অপ্রচলিত” বানান। অর্থাৎ ‘ইদ’ বানানটি নতুন নিময় অনুযায়ী যুক্তিসংগত কিন্তু এখনও তা প্রচলিত হয়নি। প্রচলিত বানান হচ্ছে 'ঈদ'। অভিধানে “ইদ” সম্পর্কে “সংগগতর অপ্রচলিত বানান” নোট দেওয়া আছে। অর্থাৎ এটা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য। একটা “ট্রানজিশন পিরিয়ডের” পর হয়ত “ইদ” বানানের সাথে এ নোটটাও আর থাকবে না। তখন “ইদ” হয়ে যাবে প্রচলিত বানান। আমাদের সন্তানরা যখন আজকের “ঈদ” কে তাদের “ইদ” হিসেবে জানবে। অভ্যস্ততায় তাদের কাছে “ইদ” ই সহজ আর আনন্দময় হয়ে উঠবে।

 

“ইদ” নিয়ে অনেক আপত্তিই তোলা যায়। আরবীতে দুই হরফের মাঝখানে “ইয়া” থাকলে উচ্চারণ দীর্ঘ হয়। সেকথা আমলে নিলে- আরবী ব্যাকরণের নিয়মগুলোকেও বাংলা ব্যাকরণের নিয়মের তালিকায় তুলে দিতে হয়। কাজেই প্রজন্মান্তরের এই বেদনাকে মনে হয় মেনে নিতেই হবে। একসময় আমাদের সন্তানের “ইদ” এর আনন্দ হয়ত আমাদেরকেও ছুঁয়ে যাবে। আমরাও হয়ত “ইদ”কে আপন করে নিতে পারব- সময়ের প্রেক্ষিতে। অনেকেই বলছেন, “ইদ” দেখতে “ইঁদুর” এর মতো। ভাবতে আশ্চর্য লাগে বানানের চেহারা বা নকশাটিও কীভাবে আমাদের চেতনায় মিশে থাকে। “বৌ” বানানকে “বউ” করার বেলাতে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো বোদ্ধা মানুষও “বৌ” এর “নকশা/ছবি” হারনোতে খেদ প্রকাশ করেছিলেন। যাহোক, “ঈদ” বানানের “ঈ” যে আরবী ভাষার ع কে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপিত করে তা-ও কিন্তু নয়। আরবী ভাষার “ঈদ” এর ع অক্ষরটি গলার ভিতর থেকে যেভাবে বের করতে হয় সেই কৌশল হয়ত অনেকের জানাই নেই কিন্তু “ঈদ” এর ব্যাপারে দুর্বলতা ঠিকই আছে। ع এর উচ্চারণ আরবী ভাষার নিজস্ব মেকানিজম। ওটিকে আমরা নিরুপায়ের উপায় হিসেবে এতদিন “ঈ” দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছিলাম। ফলে, “ইদ” হয়ে গেলে যারা অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন সেটি অমূলক। আসল ব্যাপার হলো ভাষা আমাদের চেতনা আর রক্তে মিশে আছে ফলে সেটির বানান, নকশা, চেহারা ইত্যাদির যেকোনো পরিবর্তন আমাদেরকে ভীত, সন্তস্ত্র ও অরক্ষিত করে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে, বিশ্ব ভাষা সম্প্রদায়ের কাছে বাংলা ভাষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুবিধার কথা ভেবে শুধুমাত্র একটা অন্তর্বতীকালীন সময়ের (ট্রানজিশন পিরিয়ড) জন্য নিজেদের এই ভীতি আর অনিশ্চয়তা সামলে নেয়ার মধ্যে একটা মহত্বও আছে বটে।

 

অতঃপর একটি প্রস্তাবনা:

বিদেশী বানানে “ী” কার বর্জনের নিয়মে “আওয়ামী লীগ” হয়ে যায় “আওয়ামি লিগ”। “আওয়ামী” কথাটা এসেছে আরবী “আম” থেকে। হতে পারে এই “আওয়ামী” শব্দটি আরবী ভাষা থেকে উর্দু ভাষায় আত্তীকৃত হয়ে ঐতিহাসিক পরম্পরায় আবার বাংলা ভাষায় আত্তীকৃত হয়েছে। শুধু আত্তীকৃতই না বাংলাদেশের ইতিহাসকে ধরে রেখেছে। যাহোক, আমি উর্দুর তত্ত্বতালাশ করতে যাইনি যেহেতু “আম” শব্দটি এর আদি উৎস আরবীতেই “সাধারণ” “সর্বসাধারণ” “জনগণ” ইত্যাদি অর্থ প্রদান করে। যেমন: “আম-জনতা”। এখানেও “আম” অর্থ “সাধারণ”। আমি searchtruth.com ও dictionary.reverso.net নামের দু’টি আরবী-ইংরেজি ডিকশনারী (লিংক দ্রষ্টব্য) থেকে “আম” শব্দের অর্থ পেয়েছি “common, general, public, universal, historical” ইত্যাদি। এই আরবী শব্দ “আম” থেকেই এসেছে (আম/আওম+ই) “আওয়ামী” যার অর্থ (জনসাধারণ+এর) “জনসাধারণের” বা “জনগণের”। আর ইংরেজি লিগ (League) শব্দের অর্থ “সংহতি” “সংঘ” ইত্যাদি। এবার এই দুই (২) টি বিদেশী শব্দের (আরবী+ইংরেজি) মিশেল নিয়ে তৈরি হয়েছে “আওয়ামী লীগ” দল বা “জনগণের সংহতি” দল বা “জনসংহতি” দল। দেখুন নামের মধ্যেই কি চেতনার স্ফূরণ! বাংলা একাডেমি নিশ্চয়ই “আওয়ামী লীগ” কে “জনসংহতি”-তে বদলে দিতে কিংবা ন্যূনপক্ষে “আওয়ামি লিগ” করতে পারবে না, এমনকি ভোটাভুটি করলে সারা বাংলার কেউই “আওয়ামি লিগ” এর পক্ষে ভোট দিবে না। কিন্তু “ফুটবল লিগ” ঠিকই “ফুটবল লিগ” থাকবে।

 

এর মানে হলো, বাংলা একাডেমি ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত অনেক শব্দই পরিবর্তন করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে সেগুলোর জন্য “ব্যতিক্রমই নিয়ম” বিধিতে হোক কিংবা যেকোন একটা নিয়ম বের করে হোক আদি বানান বহাল রাখবে। বাংলা একাডেমির উচিত সেই একই নিয়মে– যে বিদেশী শব্দগুলো মানুষ শুধু খাতাকলমে “ব্যবহার” করে না বরং উত্তরাধিকার সূত্রে “যাপন” করে সেই বিদেশী শব্দগুলোর জন্য নতুন বানান প্রচলন না করে আগের বানান বহাল রাখা, যেমন: “ঈদ”। এরকম কিছু করা গেলে সেটাই হবে উত্তম, সংগত এবং মানুষের যাপিত জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখার পন্থা। সর্বোপরি ভাষা তো মানুষেরই জন্য। “মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো”- এ কথার উপযুক্ত প্রয়োগের এটাই তো জায়গা। আশা করি বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে ভেবে দেখবে।

অভিধানের লিংক:

http://www.searchtruth.com/dictionary/arabic_english_dictionary.php?word=%D8%B9%D8%A7%D9%85&translate=atoe&word_option=1

http://dictionary.reverso.net/arabic-english/%D8%B9%D9%8E%D8%A7%D9%85%D9%91/forced

২ comments

  1. 2
    AsifKhanAK

    Eta niye eto bistor alochona korar jonno ebong amader jonno koshto kore likhar jonno apnake oneek dhonnobad 🙂

  2. 1
    সত্য সন্ধানী

    ঈদের দিনে সুন্দর একটা লেখা ধন্যবাদ। ঈদ মোবারাক ভাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.