«

»

Nov ০৩

“বিসমিল্লাহ”র যুগান্তকারী ব্যাখ্যা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। প্রতিটি কাজ শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ইসলামী সংস্কৃতিতে বহুচর্চিত একটি ব্যাপার। আরবী ‘বে’- ‘ইসম’ – ‘আল্লাহ’ এই তিনটির একত্র উচ্চারণের রূপ হলো ‘বিসমিল্লাহ’। ‘বে/বি’ অর্থ ‘সাথে/সহিত’। ‘ইসম’ অর্থ ‘নাম’। তাই ‘বিসমিল্লাহ’র সহজ বাংলা অর্থ ‘আল্লাহর নামের সাথে’ বা ‘আল্লাহর নামে’। যেহেতু কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হয় তাই পূর্ণাঙ্গ অর্থে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে বুঝায় ‘আল্লাহর নামে শুরু করলাম’। উল্লেখ্য যে, শরীয়তের সীমার মধ্যেই বিসমিল্লাহর ব্যবহার। কাজেই কেউ কোনো খারাপ কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলে তার কোনো লাভ নেই কিম্বা ‘বিসমিল্লাহ’র কোনো ক্ষতি নেই। অন্যপক্ষে ‘প্রত্যেক ভাল কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করতে হয়’- এমন বক্তব্যেরও আসলে কোনো ভিত্তি নেই। কারণ শরীয়তের সীমার মধ্যে কোনো মুসলমানের জন্য খারাপ কাজ করার অনুমতি নেই। আবার শরীয়তের সীমার বাহিরে ‘বিসমিল্লাহ’র ব্যবহার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্যই নেই। অতএব ‘বিসমিল্লাহ’ ইসলামী সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ যেখানেই কল্যাণকর কোনো ফল অর্জনের আশা করে সেখানেই ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে।

‘বিসমিল্লাহ’ বলে কাজ শুরু করার উপকারীতা সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কাজ শুরু করা অসংখ্য মুসলিমের জীবনে একটা নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’র উচ্চারণ দ্বারা অগণিত মুসলিম প্রতিদিন মনের প্রশান্তি, কাজে সফলতার আত্মবিশ্বাস আর পলে পলে মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য উপভোগ করে চলেছেন। ‘বিসমিল্লাহ’র ফজিলত সম্পর্কে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা প্রচূর হয়েছে। আমরা সকলেই কমবেশী তা শুনেছি জেনেছি। আজ একুশ শতকের দ্বারপ্রান্তে এসে আধ্যাত্মিক আলোচনার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান-দর্শনের আলোকে ‘বিসমিল্লাহ’র প্রয়োজন ও গুরুত্বকে উপলব্ধি করার সময় এসেছে বটে। আমরা একটু পেছন থেকে আলোচনা শুরু করতে চাই।

জগতস্থিত প্রাণীকূলের মাঝে মানুষ এক মহান সৃষ্টি। আমরা জানি, মানুষ একসময় পশুপাখির সাথে বনজঙ্গলেই বাস করত কিন্তু সে শুধুমাত্র তার বুদ্ধি, মমনশীলতা ও উচ্চাঙ্গের কল্পনাশক্তি দ্বারাই বনজঙ্গল থেকে বের হয়ে এসে সভ্যতা নির্মাণ করেছে। মানুষের আছে কল্পনাশক্তি যা পশুপাখির নেই। মানুষ বনজঙ্গলের পরিবেশে একটু অবসরের সময়ে নির্জনে বসে কল্পনার পাখা মেলে নিজেকে দেখতে চেয়েছে উন্নততর কোনো অবস্থায়। সে নিজের দিব্যচোখে নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবনায় লিপ্ত হয়েছে, মগ্ন থেকেছে বনজঙ্গলের চাইতে উন্নততর কোনো পরিবেশে নিজেকে স্থাপন করার চিন্তায়। এভাবে দেখা যায় মানুষ তার কল্পানশক্তি ও মননশীলতার দ্বারা বনজঙ্গলের সংকীর্ণ, সীমাবদ্ধ পরিসরকে ছাড়িয়ে আরও বড়, মুক্ত এবং আদর্শমানের কোনো পরিসরে স্থানান্তরিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তার সেই স্বপ্নই তাকে বর্তমান সভ্যতা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে এসেছে। জঙ্গলের মানুষের স্বপ্ন বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে আজকের চোখ ধাঁধানো, গতিময় আর প্রাণবন্ত জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে। সভ্যতা আজ এত অগ্রসর হয়েছে যে, আজকের মানুষের বসবাসের গণ্ডি আর কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নেই। আজকের প্রতিটি মানুষ হয়ে দাড়িঁয়েছে বিশ্বমানব। উচ্চগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা পৃথিবীকে এনে দিয়েছে আজকের মানুষের হাতের মুঠোয়। ফলে আজকের মানুষ চিন্তাভাবনায় আন্তুর্জাতিক হয়ে উঠছে। প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব গণ্ডি পৃথিবীময় ছড়িয়ে গেছে যেন। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে নিয়ে পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। মানুষ তার প্রাগৈতিহাসিক বুনো জীবন পেরিয়ে, গোত্রবদ্ধতা ছাড়িয়ে, জাতীয়তার সংকীর্ণতা এড়িয়ে আজকে আন্তর্জাতিক গণ্ডিতে পা ফেলেছে। মানুষের এই অপ্রতিরোধ্য গতির পরবর্তী গণ্ডি কোনটি? আমরা কি তা ভাবতে পারি? এখানেই ‘বিসমিল্লাহ’র একটি দর্শনগত বিবেচনা রয়ে গেছে।

পৃথিবী আর এর মানবগোষ্ঠি যুগে যুগে বিভিন্ন পথে বিভিন্ন গতিতে চলে আসছে। আর এসবের মাঝে কোনো কোনো গোষ্ঠি অন্তুরের নিভৃতে জাতীয়তা-আন্তুর্জাতিকতা ইত্যাদি সমস্ত কিছুরই ঊর্দ্ধে এক চিরন্তন গণ্ডিতে বসবাস করে এসেছে এবং আসছে। আর সেটাই হচ্ছে ‘বিসমিল্লাহ’র গণ্ডি। সেটা মানব অস্তিত্বের এমন এক মহাজাগতিক অবস্থান যেখানে পৌঁছানো অনেকের পক্ষে অচিন্ত্যনীয়। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা সেই মহাজাগতিক অবস্থানে বসবাস করে নীরবে নিভৃতে একটি ভিতরবাসী জীবন যাপন করে চলেছেন। মহাজগতের সীমানা কানায় কানায় পূর্ণ করে জীবনের রস আস্বাদন করে চলেছেন। যাদেরকে বস্তবাদী ভোগের পাল্লায় মাপতে গেলে হয়ত গণনার মধ্যে ধরা যায় না। অথচ তারাই হচ্ছেন চিরকালের সুপারহিউম্যান। তারা জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা ইত্যাদির ঊর্দ্ধে উঠে মহাজগতের সীমানায় নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারেন। নিজের এই পার্থিব জীবন যাপনকে এক চিরকালীন অখণ্ডতায় উপলদ্ধি করতে পারেন।

‘বিসমিল্লাহ’ বলে প্রত্যেক কাজ শুরু করার ফলে ব্যক্তিমানুষের জীবনের প্রতিটি খণ্ড খণ্ড কাজ আল্লাহর সূত্রে এক চিরন্তন ঐক্য লাভ করে। বিষয়টি সহজ ভাষায় ব্যাখা করা যাক। পৃথিবীতে যাপিত আমাদের ব্যক্তি-জীবন খণ্ড খণ্ড ঘটনার সমষ্টিমাত্র। আমরা স্থান ও কালের দূরত্বে থাকার কারণে আমরা দৈনন্দিন প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে পারি না। তা করা সম্ভব নয়। একই ব্যক্তি একই সঙ্গে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকতে পারে না। একজন মানুষ যখন বাড়ী ছেড়ে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে কাজ সেরে পুনরায় বাড়ীতে ফেরে তখন মধ্যবর্তী যে সময়টুকু সে বাড়ীতে ছিল না সেই সময়টুকুর মধ্যে বাড়ীতে ঘটিত ঘটনাবলীর সাথে তার কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ থাকে না। এভাবে প্রতিদিনই তার বাড়ীতে ঘটিত ঘটনাবলীর কিছু অংশের সাথে তার সংশ্রব ঘটে মাত্র। একইভাবে বাজারে গেলে প্রতিদিনই বাজারে ঘটিতব্য খণ্ড খণ্ড কিছু ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের সংযোগ ঘটে মাত্র। এভাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা খণ্ড খণ্ড ঘটনার সাক্ষী হিসেবে বেঁচে থাকি। সে হিসেবে আমাদের জীবনটাকে আমাদের নিকট খণ্ড খণ্ড ঘটনার জোড়াতালি হিসেবে মনে হওয়ার কথা। অথচ সবসময় দৃশ্যপট বদল হয়ে চলা সত্বেও বাস্তবপক্ষে আমাদের মনে আমাদের নিজেদের জীবনটাকে একটা গল্প বা উপন্যাসের মত নিরবিচ্ছিন্ন বলেই মনে হয়। এর কারণ কী?

একটি গল্প বা উপন্যাসের একজন লেখক বা স্রষ্টা থাকেন। একজন গল্প বা উপন্যাসের লেখক কী করেন? তিনি জীবনের খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলিকে এবং সবসময় বদলে যাওয়া দৃশ্যপটকে একটি পরিণতির দিকে চালিত করার চেষ্টা করেন। কোনো গল্পের পিছনে যখন একজন ভাল গল্পকার বা লেখক বা গল্পস্রষ্টা থাকেন কেবল তখনই আমরা একটি ভাল গল্প আশা করতে পারি। একজন ভাল গল্পকার বা লেখক বা গল্পস্রষ্টার সূত্রেই আমরা ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যপট বদলে যাওয়া খণ্ড খণ্ড ঘটনার জোড়াতালিকে একটি অখণ্ড ও ধারাবাহিক বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। গল্পটির শুরু থেকে শেষ পরিণতি পর্যন্ত একটি যৌক্তিক মাত্রা টেনে দিতে পারি। অতএব, বলা যায় একজন ভাল লেখক একটি ভাল গল্পই উপহার দিবেন। বিপরীতভাবে বলা যায়, একটি ভাল গল্পের পিছনে অবশ্যই একজন ভাল লেখক বা গল্পস্রষ্টা থাকবেন। এক্ষণে প্রশ্ন, আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অসংখ্য খণ্ড খণ্ড ঘটনাকে, প্রতিক্ষণে বদলে যাওয়া দৃশ্যপটকে আমরা কীভাবে গল্প বা উপন্যাসের মত একটি অখণ্ড বিবরণ হিসেবে বিশ্বাস করে থাকি? কারণ ব্যক্তিমানুষ হিসেবে আমি অন্তরের গভীরতম প্রদেশে এটাই বিশ্বাস করে থাকি যে আমার জীবনের একজন গল্পকার বা স্রষ্টা রয়েছেন। আমি যদি আমার জীবনকে একটি ভাল গল্প বা উপন্যাস হিসেবে মানি তবে অবশ্যই আমাকে মানতে হবে যে, আমার জীবনের খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলিকে এবং প্রতিক্ষণে বদলে যাওয়া দৃশ্যপটগুলিকে যৌক্তিক মাত্রা টেনে দিয়ে অখণ্ডতা প্রদান করার জন্য সেখানে একজন রয়েছেন যিনি আমার জীবন এবং এই দৃশ্যমান জগতের স্রষ্টা। একারণেই আমার জীবনের প্রতিটি খণ্ড কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার দ্বারা আমি গল্পকারকে (স্রষ্টাকে) স্মরণ করি। এর দ্বারা আমি সচেতনভাবে আমার খণ্ড কাজটিকে চিরকালীন অখণ্ডতার সীমানায় পৌঁছে দেই। আর আমি যদি আমার যাপিত জীবনকে একটি ভাল গল্প হিসেবে না মানতে পারি। তখন আমার জীবনকে আমার কাছে খাপছাড়া, নিকৃষ্ট, শতধাখণ্ডিত, পরম্পরাহীন একটি ফেলনা জিনিষ বলে হয় এবং তখনই আমার কাছে স্রষ্টার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। আর আমি যদি আমার জীবনকে সুখ-দুঃখ মিলিয়ে একটি ভাল গল্প হিসেবে মনে করতে পারি কেবল তখনই আমি একজন সৃজনশীল, গঠনমূলক চিন্তাসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে জগতে বেঁচে থাকতে পারি। সেক্ষেত্রে আমার জীবনে অবশ্যই স্রষ্টার প্রয়োজন রয়েছে। আর আমি যদি নিজেকে কোনো গঠনমূলক ও সৃজনশীল চিন্তার প্রাণী হিসেবে মূল্য দিতে না পারি, যদি নিজের যাপিত জীবনকে নিজের কাছে তুচ্ছ ও ফেলনা বলে মনে হয়, তবে বুঝতে হবে আমি পাপের চাকুতে কেটে কেটে নিজের জীবনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। আমার পরম্পরাহীন খণ্ড খণ্ড কাজকর্ম আমার সত্তাকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে এবং আমার জীবন একটি পরিপূর্ণ গল্পের আকার নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি আমার জীবনের কোনো গল্পকারকে/স্রষ্টাকে খুঁজে পাব না। সেক্ষেত্রে আমাকে আমার শতখণ্ডিত অস্তিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে আমার ফালতু জীবনের ভার বয়ে বেড়াতে হয়। তখনই আমি হয়ে উঠি হতাশাবাদী নাস্তিকের দলের একজন।

কাজেই এটা পরিস্কার যে, মানুষ হিসেবে আমি যদি আশাবাদী, জীবনমুখী, সৃষ্টিশীল এবং ইতিবাচক হয়ে থাকি তবে অবশ্যই আমার জীবনের খণ্ড খণ্ড কাজগুলিকে অখণ্ডতায় ও চিরকালীন ঐক্যে গ্রথিত করে রাখার জন্য একটি চিরন্তন সূত্র খুঁজতে হবে। আর সেই চিরন্তন সূত্রই হচ্ছে ‘বিসমিল্লাহ’। প্রতিটি খণ্ড কাজের শুরুতে ‘আল্লাহর নামে শুরু করলাম’- একথা বলার দ্বারা আমি সচেতনভাবে আমার খণ্ড কাজটিকে অখণ্ড সময়প্রবাহের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে দিই।

পরিশেষে বলা যায় আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া খণ্ড খণ্ড ঘটনাকে আমরা মেনে নিতে পারি কারণ আমাদের মনের গভীরে এক স্থান-কাল নিরপেক্ষ কোনো একজন দ্রষ্টা বা দর্শকের উপস্থিতি রয়েছে। এই স্থান-কাল নিরপেক্ষ দর্শকই হচ্ছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। মহান আল্লাহ তায়ালা সর্বস্থানে ও সর্বকালে একইসঙ্গে একইসময়ে বিরাজিত থেকে সকল ঘটনা নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রত্যক্ষ করে চলেছেন। তাঁর সূত্রেই আমরা আমাদের শতখণ্ডিত জীবন ও বিচ্ছিন্ন সব অভিজ্ঞতাকে অখণ্ডতায় উপলদ্ধি করতে পারি। স্থানের দূরত্বে এবং সময়ের দূরত্বে থাকার কারণে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনামালা সম্পর্কে আমরা নিরবিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি না এটা ঠিক। তবে আমরা স্থান-কালের ঊর্দ্ধে বিরাজিত মহান স্রষ্টা ও দ্রষ্টা মহামহিম আল্লাহ তায়ালার ওয়াস্তে ঘটনাসমূহের ব্যাপারে একটি ঐক্যের ধারণা লাভ করে থাকি। চিরকালীন মানব মন এই যুক্তি অবলম্বন করে যে, ব্যক্তিসত্তা হিসেবে আমি যদিও ঘটনা সম্পর্কে নিরবিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি না কিন্তু স্থান-কালের ঊর্দ্ধে বিরাজিত মহান এক সত্তা রয়েছেন যিনি প্রতি মূহুর্তের প্রত্যেক ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রত্যক্ষ করে চলেছেন। আমি স্থান-কাল নিরপেক্ষ সেই মহান সত্তাকে বিশ্বাস করি। ফলে আমি আমার জীবনের খণ্ড খণ্ড ঘটনামালাকে তাঁর সূত্রেই একক এবং অখণ্ড হিসেবে গ্রহণ/বিবেচনা/বিশ্বাস করতে পারি।

প্রকৃতপক্ষে উপরে বর্ণিত মানসিক অবস্থাটি জগতস্থিত সকল মানুষের মনেরই একটি সাধারণ অবস্থা (Common State)। কিন্তু মনের এই গতি বা অবস্থাটি সম্পর্কে জগতের সকল মানুষ সমানভাবে সচেতন নয়। বেশীরভাগ মানুষ তাদের মনের এই অবস্থাটি লালন করে মনের গভীরতম প্রদেশে, একেবারে অবচেতনার তলদেশে যেখানে সে নিজেই নিজের খবর রাখেনা। বস্তুগত শিক্ষায় যতই পারদর্শী হই না কেন আমাদের অনেকেরই মনের পরিশীলন মহাজাগতিক পর্যায়ে উর্ত্তীণ হয়নি। জাগতিক অর্থে শিক্ষিত অথচ অপরিশীলিত ও আনকালচার্ড মন তার নিজের খবর নিজেই রাখে না। ফলে মানব মনের এই অবস্থাটিকে মনের সচেতন স্তরে ধারণ করার মত মনের গভীরতা খুব কম মানুষেরই রয়েছে। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে প্রত্যেক কাজে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার চর্চা করার দ্বারা মানুষের মহাজাগতিক অবস্থিতির ভাবটিকে মনের সচেতন স্তরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা বাতলে দিয়েছেন। তাই বিসমিল্লাহর চর্চার মাঝে ব্যক্তি-মানুষের এবং মানব সভ্যতার বহু কল্যাণ রয়েছে।

আমরা জানি, বনজঙ্গলের মানুষ আজ সভ্যতা নির্মাণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ আজ বনজঙ্গলের সীমা ছাড়িয়ে, গোত্রবদ্ধতার হীনতা দূরে সরিয়ে, জাতীয়তার সংকীর্ণতা এড়িয়ে, আন্তর্জাতিকতার সীমানায় পা রেখেছে। মানুষ আজ আর কোনো নির্দিষ্ট ‘দেশ’ বা গণ্ডিবদ্ধ স্থানের বাসিন্দা নয়, মানুষ আজ পৃথিবী নামক এই গ্রহের বাসিন্দা হয়ে উঠতে চাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানুষের পরিচয় পেতে যাচ্ছে। কিন্তু এরও চেয়ে একধাপ এগিয়ে কিছু কিছু মানুষ তাদের মহাজাগতিক পরিচয়কে উপভোগ করে চলেছে শুধুমাত্র ‘বিসমিল্লাহ’র কল্যাণে। তারা প্রত্যেক কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলার দ্বারা জীবন চলার পথে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে একটি ঐক্য গঠন করে নেন। আর এই ঐক্যের সূত্র হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। মহান আল্লাহই হচ্ছেন মহাজগতের চূড়ান্ত উদ্দিষ্ট। ঘটিতব্য সকল ঘটনার পরেও যে উদ্দিষ্ট বাকী থাকবেন তিনিই মহান আল্লাহ। তিনিই পরম উদ্দিষ্ট। ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব ও কাজকর্ম যেহেতু পরম উদ্দিষ্টকে লক্ষ্য করে তাই তার কোনো একটি কাজ যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তার খণ্ড খণ্ড কাজগুলির মাঝে একটি ঐক্য রয়েছে। এই ঐক্যের বোধ মনের সচেতন স্তরে ধারণ করার জন্য মুসলিম ঐতিহ্যে প্রতিটি কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ উচ্চারণ করা হয়ে থাকে। এই উচ্চারণ মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজকেও মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। ঐ কাজের গুরুত্ব ও পবিত্রতা সর্বোচ্চ মাত্রায় অনুভূত হয়। এভাবে দেশ-কাল, জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা ছাড়িয়ে মানুষের মনোজাগতিক অবস্থানটি চিরকালীন অখণ্ডতার রাজ্যে, মহাজগতের সীমানায় মুক্তি লাভ করে। বিসমিল্লাহর উচ্চারণ একজন মানুষের চিন্তা ও কাজের ঐক্যকে সংস্থিত করে। আমাদের ইহজীবনের খণ্ড খণ্ড কাজগুলি যদি এক একটি ফুল হয় তবে বিসমিল্লাহ হচ্ছে মহাজাগতিক সুতা বা সূত্র। আমাদের সুন্দর সুন্দর কাজের ফুলগুলি বিসমিল্লাহর সুতায় গেঁথে অমরত্বের মালা তৈরী হয়। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ, আমাদের প্রেম-ভালবাসা, আমাদের এই প্রিয় সংসারযাপন মহাকালের আবর্তনের মাঝে অর্থহীন বুদবুদের মত হারিয়ে যায় না। বিসমিল্লাহর সুতায় গেঁথে আমাদের জীবন হয়ে উঠে অর্থপূর্ণ। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পিছনে, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের পিছনে, প্রতিটি কর্মফল লাভের পিছনে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ইশারা রয়েছে। তিনিই আমাদেরকে এই জীবন, চলাফেরার শক্তি, চিন্তাভাবনা করার শক্তি ও অনুভূতি দান করেছেন। তিনিই জীবনের নিগূঢ় সত্য। কেবল তাঁরই স্মরণে আমাদের ইহজাগতিক অবস্থিতিটি একটি মহাজাগতিক ও চিরন্তন রূপ পেতে পারে। অতএব ‘বিসমিল্লাহ’ শুধু একটি ধর্মীয় আচারমাত্র নয় এটি একটি উচ্চাঙ্গের দর্শন। আমাদের অনেকের ধারণা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ-অযোগ্য বিলাসী ভাবনাচিন্তাই হচ্ছে দর্শন। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ দর্শন সম্পর্কে আমাদের এই ধারণাকে খণ্ডন করে। ইসলামের সমস্তটাই উচ্চাঙ্গের দর্শন কিন্ত তা কোনো অকেজো দর্শন নয়। ইসলামের দর্শন মঙ্গলময় জীবনে বিকল্পহীনভাবে অনুশীলনযোগ্য বটে। আমীন।

১০ comments

Skip to comment form

  1. 5
    সাদাত

    একটা কথা বলবো কি-না অনেক ভাবলাম। শেষে ভাবছি বলেই ফেলি।
    ব্যাখ্যাটা কি আপনার?
    উত্তর হ্যাঁ হলে, নিজের ব্যাখ্যাকে নিজেই যুগান্তকারী বলাটা কেমন দেখায়? বলতে পারেন ‘অন্যরকম’ ব্যাখ্যা।
    উত্তর না হলে, ব্যাখ্যাটা কোথা থেকে পেলেন, সেটা বললে ভালো হতো।

    1. 5.1
      মহাজাগতিক

      @সাদাত: আপনার কাছে ব্যাখ্যাটা যুগান্তকারী মনে হয়নি বোধ হয়। এটাকে যুগান্তকারী বলেছি এজন্য যে, আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন, নৃতত্ত্ব সবকিছুকে সমন্বয় করে বিসমিল্লাহকে বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে বিবেচনা করার এমনধারা এ প্রবন্ধেই প্রথম চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমার ধারণা। “যুগান্তকারী” অর্থ “পূর্ববর্তী যুগ হতে ভিন্ন”। সে হিসেবে বর্তমান যুগের আলোকে “বিসমিল্লাহর” এই ব্যাখ্যাটি যুগান্তকারী হওয়া সম্ভব।
      যাহোক আপনার পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। আমি অতটা সিরিয়াস অর্থে “যূগান্তকারী” শব্দটি ব্যবহার করিনি।
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

  2. 4
    আব্দুস সামাদ

    এস বি ব্লগে আপনার এ লেখা পড়েছি। আপনাকে ধন্যবাদ।

    1. 4.1
      মহাজাগতিক

      @আব্দুস সামাদ: অনেক ধন্যবাদ।

  3. 3
    সাদাত

    সদালাপে স্বাগতম!

    1. 3.1
      মহাজাগতিক

      @সাদাত: আমার পোস্টে আপনাকেও স্বাগতম।

  4. 2
    সরোয়ার

    ভাল লেখা। সদালাপে স্বাগতম।

    1. 2.1
      মহাজাগতিক

      @সরোয়ার: পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এখানে একটা ভাল পরিবেশ পাব বলে আশা করি।

  5. 1
    এস. এম. রায়হান

    সদালাপে স্বাগতম। ভাল ভাল বিষয়ে নিয়মিত লিখুন।

    1. 1.1
      মহাজাগতিক

      @এস. এম. রায়হান: ধন্যবাদ। লেখার ইচ্ছা আছে। দোয়া করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.