«

»

Dec ০১

ইতিহাসের যে শিক্ষা মুসলিমেরা ভুলে যাচ্ছে

ফরাসি ইতিহাসবিদ  ও সমালোচক আর্নেস্ট রিনান (Renan) প্রায় এক শতাব্দী আগে বিশ্ব নবী  মুহাম্মদ (স:)এর জীবন ইতিহাস গবেষণা করতে গিয়ে যে বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ বক্তব্য দেন  তা হচ্ছে, " মোহাম্মদই শুধু একমাত্র  ধর্মীয় নেতা যিনি বাস করে গিয়েছেন  সম্পূর্ণ ইতিহাসের আলোকে"  অন্য কথায় তিনি যা বুঝাতে চেয়েছেন তা হল  মুহাম্মদ (স:) এর বিস্তারিত চিত্তাকর্ষক  জীবনী  এসেছে আরব সাহিত্যে, ধর্মীয় গ্রন্থে ও বিভিন্ন জীবনী বৃত্তান্তে ( (biographical accounts) ইত্যাদিতে।  নবী (স:) জীবনের প্রতিটি কাজ কর্ম  লিপিবদ্ধ ছিল যেন এক উন্মুক্ত গ্রন্থ  যার বর্ণনা পাওয়া যায়  ধর্মীয় গ্রন্থে, জীবনী লিপিতে, ইতিহাস চর্চায় এবং আরো অনেক কিছুতে। তবে  মুহাম্মদ (স:) এর জীবন সম্পর্কে তথ্য পরিপূর্ণ  বর্ণনা থাকায় তার সমালোচকেরাও সুযোগ নিয়েছে  নবীর খ্যাতি জন্য ক্ষতিকর বক্তব্য রাখার কিংবা বদনাম করার আর তাদের এ অপচেষ্টা অবশ্যই সুস্থ মানসিকতার মানুষের মনে শুধুমাত্র নবীর প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা (credibility)আরো বৃদ্ধি করা ছাড়া কমে নাই। ঐতিহাসিক আর্নেস্ট  রিনানের সে বিখ্যাত বিবৃতি ডেনিয়্যল পাইপও সহ ইসলাম বিদ্বেষী ওরিয়্যন্টিলিষ্ট বুদ্ধিজীবীদেরকে ক্ষেপীয়ে তুলেছে এতে কোন সন্দেহ নাই। ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী ডেনিয়্যল পাইপের এক ব্লগ  প্রবন্ধে সে দিন দেখলাম আর্নেস্ট রিনানের সে বিখ্যাত বিবৃতিকে ভিন্ন খাতে প্রবহিত করতে কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হয়েছেন!

 

আসল কথায় আসা যাক, প্রচণ্ড শীতের দেশ কানাডাতে বাস করি। শীতের এই ভোরে আরামের ঘুম ছেড়ে মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়তে অনেকের মত আমারও মন চায়না তবু মহান প্রভুর মেহেরবানীতে মাঝে মধ্যে মসজিদে যাওয়ার মানসিকতা জাগে সে জন্য সমস্ত প্রশংসা আমার প্রভু মহান আল্লাহর। এমনি আজ রবিবার ভোরে সে সৌভাগ্য হয়েছিল মসজিদে যাওয়ার ।  নামাজ শেষে ইমাম সাহেব জানালেন,আজকে সবার জন্য নাস্তার আয়োজন আছে সবাই যেন নাস্তা খেয়ে যান। একথা বলে  ইমাম সাহেব দশ মিনিটের সংক্ষিপ্ত একটি বক্তব্য রাখলেন। আমার আজকের ব্লগটি সে প্রেক্ষাপটে লিখা। এ ঘটনা সাধারণত সবারই জানার কথা তবু আলোচনা করতে চাই হয়তবা আমাদের ঈমানকে আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে সে আশায়। 

আজ থেকে ১৪শত বছর আগের ঘটনা মদিনায় হিজরতের পর  মোহাম্মদ (স:) যখন স্বপ্নে দেখেছিলেন আল্লাহ তাকে হজ করতে মক্কার কাবা শরিফে যাওযার হুকুম করছেন এবং তিনি কাবা ঘর তওয়াফ করছেন। তখন রাসুল (স:) এ স্বপ্নের কথা মদিনার মুসলিমদেরকে জানালে তাঁরা রাসুলের সঙ্গে হজ করতে রওয়ানা দেন। মক্কা তখনও অমুসলিম কুরাইশদের দখলে। রাসুল যখন মুসলিমদেরকে নিয়ে মক্কার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান তখন কাফিররা বাধা দেয়। যদিও মুসলিমরা তাদেরকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন যে তাদের এ যাত্রা শুধুমাত্র হজ তথা ধর্ম পালন ছাড়া মক্কা দখলের বা অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিলনা এবং তার প্রমাণ, তারা কোন অস্ত্রশস্ত্র বা তেমন কোন সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও আসেন নাই তথাপি কুরাইশরা তাঁদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেয় নাই।

অনেক আলাপআলোচনার পর কাফিররা তাদের মত পরিবর্তন না করায় রাসুল (স:) তাঁর সাথিদেরকে ফিরে যেতে  নির্দেশ দেন। মুসলিমদের কাছে এরকম এক পরিস্থিতির মোকাবিলা ছিল আবেগপূর্ণ এক মহা কঠিন ও দু:খের সময়। অনেক আশা নিয়ে তাঁরা এসেছিলেন বিশেষকরে যারা মুহাজির তাদের কাছে এ যাত্রা  ছিল আরো আবেগের ব্যাপার কতদিন পর তারা তাদের মাতৃ ভূমিতে যাচ্ছেন তাই মুসলিমরা যখন একদিকে হতাশ ও দু:খ ভারাক্রান্ত তখন তাদেরকে আরো কনফিউজড করার জন্য মুনাফিকেরা বলতে লাগল "রাসুল (স:)  আল্লাহর নবী নন"  যদি তাই হতেন তা হলে তার স্বপ্ন কেন বৃথা হল? তিনি তো স্বপ্ন দেখেছিলেন মক্কায় গিয়ে কাবাহ ঘর তোয়াফ করছেন ইত্যাদি নানা কথা বলে মুসলিমদের মনে সন্দেহ  জাগাবার অপচেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু এরকম এক কঠিন সময়ে নবী (স:) মনে ছিল অন্য বিষয় তিনি চেয়েছেন কিভাবে এ মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে শান্তি অর্জন করা যায়। তাই তিনি মক্কার কুরাইশদেরকে মুসলিমদের সাথে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করাতে সক্ষম হন। ইতিহাসবিদেরা বর্ণনা করেন শান্তিকালীন সে সময়ে ইসলাম সব চেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল আরবের সর্বত্র এবং মুসলিমদের সমর্থকও বাড়তে থাকে দ্রুত গতিতে। মুসলিমদের শক্তিও বাড়তে থাকে দ্রুত। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি সে চুক্তিতে  "মোহাম্মদ রাসুল আল্লাহ" লিখা থাকায় কাফিররা আপত্তি তুলে তখন রাসুলের সম্মতিতে "মোহাম্মদ আল্লাহর রাসুল"  কথা বাদ দিয়ে লিখা হয় "আব্দুল্লাহর পুত্র মোহ্ম্মদ"। আমরা জানি সেই চুক্তি ইতিহাসে হুদাইবিয়ার চুক্তি নামে প্রসিদ্ধ।

প্রথমত সেই  চুক্তি কুরাইশদের এক তরফা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দর্শনে এবং মুসলমানদের জন্য চুক্তির কিছু শর্তাবলী গুরুতর ছিল তাই  হজরত উমর (রা:) এ চুক্তিকে অপমানকর হিসেবে মনে করে খুবই উত্তেজিত ছিলেন এবং হজরত আবুবকর (র:) কাছে ছুটে যান যাতে নবীকে এ চুক্তি স্বাক্ষর না করতে অনুরোধ করেন। জবাবে আবুবকর বলেন,"আমরা যা জানি নবী তা আমাদের চেয়ে অনেক বেশী জানেন। মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় নবী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার সমালোচনামূলক না হয়ে বরং দৃঢ়তার সাথে নবীর সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।" ওমর অপেক্ষায় ছিলেন নবীর উপর এব্যাপারে ওহী নাজিল হওয়ার।

প্রশ্ন হচ্ছে আজকের বিশ্বে মুসলিমদের চলমান অবস্থার প্রেক্ষাপঠে এ ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে আমরা মুসলিমরা কি শিক্ষা লাভ করতে পারি?

১) প্রথমেই মুনাফিকদের প্রশ্ন "তার স্বপ্ন কেন বৃথা হল?

আল্লাহর প্রদত্ত ওয়াদা কখনও অপরিপূর্ণ বা বৃথা হতে পারে না এ বিশ্বাস থাকতে হবে এবং আল্লাহর ওয়াদা পুরন হবেই কিন্তু টাইম ফ্রেইম বা সময় সীমা আমাদের প্রত্যাশিত সময়ে নাও হতে পারে । সময় সীমা কি হবে আল্লাহ জানেন আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নাও হতে পারে। মাত্র দু বৎসর পরই তো মুসলিমরা তার বাস্তব প্রমাণ পেয়েছে মক্কা বিজয়ের মাধ্যামে। তাই নয় কি? একি ভাবে আমরা যদি সুরা রোমে আল্লাহর প্রদত্ত রোমানদের বিজয় ও মুসলিমদের বিজয়ের ভবিষ্যতবানীর কথা দেখি সেখানেও দেখতে পাই কিভাবে  আল্লাহর কথা সত্যি হয়!

২) যে মক্কার কোরাইশরা মোহাম্মদ (ষ:) আল্লহর নবী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে চায়নি তারাই শেষ পর্যন্ত তাকে মানতে বাধ্য হয়। আর আল্লাহ নিজেই কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে মোহাম্মদ (স:) যে আল্লাহর নবী তা  ঘোষণা দিয়েছেন্ এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে অতীতে যখনই নবীদেরকে অবিশ্বাসীরা বিভিন্ন অপবাদ দিয়েছে নবীরা তার প্রতিবাদ করেছেন কিন্তু মোহাম্মদ (স:) এর ব্যাপারে আল্লাহ নিজেই দ্রুত ওহী নাজিল করে তার নবুওতের সমর্থনে আয়াত নাজিল করেছেন! কোরআন ঘাঁটলেই এর প্রমাণ পাবেন।

৩) শান্তির পথ হিংসাত্মক পথ  থেকে অনেক উত্তম। সব কিছুরই জন্য একটি সুনির্দিষ্ট স্থান ও কাল আছে, সঠিক সময় সঠিক পথ গ্রহণ করলে বিজয় সুনিশ্চিত।

৪) বাহ্যত কোন কিছু সাময়িক অপমানকর ও পরাজয় মনে করলেও তা আসলে পরাজয় নয় বরং অবশেষে তা বিজয় আনতে পারে। সে দিন মহানবী সবইকে  আশ্বস্ত  করেন এই বলে যে, তিনি যে কাজ করেছেন তা যাই হোক না কেন আল্লাহর হুকুমেই করেছেন এবং তখন যা মুসলমানদের স্বার্থ বিরুদ্ধে  মনে হচ্ছিল তাই ভবিষ্যতে মুসলিমদের বিজয়ের পক্ষে হবে। আর বাস্তবে তাই হয়েছিল ইতিহাস স্বাক্ষী।  

হজরত আবুবকর হুদাইবিয়ার চুক্তির ব্যাপারে নিম্নের কয়েকটি অতি মূল্যবান কথা বলেন যা মুসলিমদের চিন্তা ভাবনাকে  চিরদিন প্রজ্বলিত করে রাখার কথা। 

"হুদাইবিয়ার সন্ধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ন কোন বিজয় ইসলামের নাই । মানুষ সবসময়ই সবকিছু দ্রুত পেতে চায় কিন্তু আল্লাহ মানুষকে পরিপক্ষ করেই তা প্রদান করেন। পূর্বে মুসলিম ও অমুসলিম মানুষের মাঝে ছিল এক  দেয়াল, যখনই একে অন্যের সাথে মিলিত হয়েছে তা যুদ্ধ দিয়েই শুরু হত।  পরবর্তীকালে শত্রুতা চাপা পড়ে এবং তার উপর নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থা স্থান পায়। এমনকি যখনই সহনীয় বুদ্ধিসম্পন্ন  প্রতিটি মানুষের কাছে ইসলামের জ্ঞান পৌছেছে তারা আমাদের সাথে  যোগদান করেছেন এবং ২২ মাসের সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়ে ইসলাম ধর্মে যোগদানের সংখ্যা বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। মানুষের মধ্যে ইসলামী বিশ্বাস বিস্তৃত লাভ করে সর্বত্র "

নিচের ভিডিওটা দেখার জন্য বিশেষ অনুরোধ করছি।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=WwgtOWApFeg]

 

রেফারেন্স:

Treaty of Hudaibiya
[Al-Hudaybiya and] Lessons from the Prophet Muhammad's Diplomacy by Daniel Pipes
The Biography of Muhammad: Nature and Authenticity

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=7FvfFSIQZnI]

 

১৭ comments

Skip to comment form

  1. 9
    abdullah al noman

    https://www.youtube.com/watch?v=WwgtOWApFeg

    Can anyone tell me what is the `Fathum Mubin' according to the video !

    1. 9.1
      মহিউদ্দিন

      অসাধারন একটি ভিডিও লিংক দিয়েছেন, রিয়েলি এমে্জিং!  আমি এটাকে আমার পোষ্টে এম্বেড করে দিলাম।

      ~~অশেষ ধন্যবাদ।

    2. 9.2
      আবুল আসাদ

      ফাতহুম মুবিন’ বা মক্কা বিজয়ের মহামুহূর্হটি সমাগত। দশ হাজার মুসলিম সৈন্যে বাহিনী সেদিন গভীর রাতে মক্কার উপকণ্ঠ মাররুজ-জাহরান উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছল এবং সেখানেই রাত যাপনের সিদ্ধান্ত নিলো। মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ও আরও কয়েকজন রাতে মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। মাররুজ্-জাহরান উপত্যকায় হাজার আলোর সারি দেখে স্তম্ভিত হলো আবু সুফিয়ান। রহস্য উদ্ধারের জন্যে আবু সুফিয়ানকে অতি সন্তর্পণে এগুলো ঐ উপত্যকার দিকে। হঠাৎ আবু সুফিয়ান বন্দী হয়ে গেলো হযরত উমর (রা)-এর হাতে। হযরত উমর (রা) আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী দিকটা। হযরত উমর (রা) আবু সুফিয়ানকে মহানবীর সামনে হাজির করে বললেন, সত্যের শত্রুদের সমূলে উৎপাটিত করার শুভমুহূর্ত সমাগত। আবু সুফিয়ান বন্দী। প্রতিশোধ গ্রহণ ও প্রতিফল দানের সময় উপস্থিত। মহানবী (সা) এ প্রসঙ্গে না গিয়ে আবু সুফিয়ানকে সন্বোধন করে বললেন, আবু সুফিয়ান, এখনও তুমি সেই করুণা-নিধান ‘ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু’ কে চিনতে পারোনি? আবু সুফিয়ানের বিমর্ষভাবে আমতা করে বললো, ‘তা, এখন পারছি বৈ কি। আমাদের ঠাকুর কেউ থাকলে আমাদের পানে তাকাতো।’ আবু সুফিয়ানের উত্তরে উৎসাহিত হয়ে মহানবী (সা) আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা আবু সুফিয়ান, আমি যে আল্লাহর প্রেরিত সত্য নবী, এ ব্যাপারে এখনও কি তোমার সন্দেহ আছে?’ আবু সুফিয়ান বললো, ‘এখনও কিছু কিছু সন্দেহ আছে?’ মহানবী (সা) বন্দী আবু সুফিয়ানের কথায় বিন্দুমাত্রও ক্রুদ্ধ হলেন না এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ  কররেন না। শুধুমাত্র মহানবী (সা) আবু সুফিয়ান  যখন ফিরে যাবার জন্যে উত্যত হলেন, তখন তাকে আদেশ করলেন সকাল পর্যন্ত থেকে যেতে। মহানবী (সা) রোধ হয় চেয়েছিলেন আবু সুফিয়ান ফিরে গিয়ে গোঁট পাকাবার কোন সুযোগ না পাক।

       

  2. 8
    নুরুল ইসলাম

    "হুদাইবিয়ার সন্ধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ন কোন বিজয় ইসলামের নাই । মানুষ সবসময়ই সবকিছু দ্রুত পেতে চায় কিন্তু আল্লাহ মানুষকে পরিপক্ষ করেই তা প্রদান করেন। পূর্বে মুসলিম ও অমুসলিম মানুষের মাঝে ছিল এক  দেয়াল, যখনই একে অন্যের সাথে মিলিত হয়েছে তা যুদ্ধ দিয়েই শুরু হত।  পরবর্তীকালে শত্রুতা চাপা পড়ে এবং তার উপর নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থা স্থান পায়। এমনকি যখনই সহনীয় বুদ্ধিসম্পন্ন  প্রতিটি মানুষের কাছে ইসলামের জ্ঞান পৌছেছে তারা আমাদের সাথে  যোগদান করেছেন এবং ২২ মাসের সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়ে ইসলাম ধর্মে যোগদানের সংখ্যা বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। মানুষের মধ্যে ইসলামী বিশ্বাস বিস্তৃত লাভ করে সর্বত্র "

    The history of Islam confirmed that globally it’s expansion, establishment, advancement, and achievement were occurred during the time of peace- not during the time of war.

    Unfortunately all over the Islamic world, hostile and war-like situation is easily visible; dis-unity and sectarian quarrels and fighting are essential part of all so called Islamic sectarian-groups.

    Most importantly entire Islamic world is targeted by and voluntarily submitted under new Imperialism’s trickery practices. In new imperialistic trickery cage all Islamic states, governments and leaders are dancing and killing  each other In various issues- the issues made of and implanted by anti-Islamic forces.

    Now it is seems that the wars in Muslim world is endless for infinite time. Recent history shows- Iran-Iraq war, 1st gulf war second gulf war, Afgan war Libya war, Syria war and presently ISIS war. All these wars were supported, financed and actively participates by Muslim rich and powerful states.

    ISIS? Young Muslims from all over the world especially young Muslims, who were the father and mothers of Arab-spring, and well establish and well-educated young Muslim in western countries are gathering and joining with ISIS. It is easily understood that the anti-Islamic imperialist forces giving then safe transit-routes to go there and gather in a common place. It is easy to destroy them where they are all crowded in a same place. It is a traditional policy of contacting a war.

    If ISIS’s Mujahideen are obliterated once; the Arab states will never see any spring at least in next one hundred year.

    However, so many issues are being manufactured by the new-imperialist think tank to keep war continually celebrated in the Muslim world- the war is- of the Muslim by the Muslim for their Western-Masters.

    A hostile, belligerent warlike situation is not fertile-land for the interest of Islam. Islam preaches peace and maintains peace during the time of calm and peace not during the war.

  3. 7
    মজলুম

    কন্টিনিউ, আগের মন্তব্য হতে,

    ইতিমধ্যে, এ চুক্তির ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে প্রচন্ড অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরী হয়। তাদের এ ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ভেতর দিয়েই আল্লাহর রাসুল (সাঃ) সুহাইল ইবন আমরের সাথে এ চুক্তি সম্পাদন করেন। মুসলিম শিবিরে দানা বেঁধে উঠা এ প্রচন্ড উত্তেজনা ও ভয়ানক অসন্তোষের মধ্যে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-কে রেখে সুহাইল মক্কায় ফিরে যায়। যুদ্ধ করার জন্য মুসলিমদের এতো ব্যাকুলতা ও চুক্তি স্বাক্ষরের পর তাদের চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ভেতরে ভেতরে খুবই মর্মাহত হন এবং প্রচন্ড অসহায় বোধ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত, তিনি (সাঃ) তাঁর স্ত্রী উম্ম সালামাহ (রা.) এর কাছে তাঁর অন্তরের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট ও হতাশার কথা খুলে বলেন। উম্ম সালামাহ (রা.) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল! মুসলিমরা কখনোই আপনার অবাধ্য হবে না। তারা তো শুধু তাদের দ্বীন, আল্লাহর উপর তাদের অবিচল ঈমান ও আপনার আনীত বাণীর ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর। আপনি আপনার মাথা কামিয়ে ফেলুন এবং হাদীর পশুগুলোকে জবাই করে ফেলুন। দেখবেন, মুসলিমরাও সাথে সাথে আপনাকে অনুসরণ করবে। তারপর তাদের নিয়ে আপনি মদীনায় ফিরে যান।”

     

    উম্ম সালামাহ (রা.) এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসুল (সাঃ) তাঁবু থেকে বেরিয়ে তাঁর মাথা মুড়িয়ে ফেলেন এবং উমরাহ এর আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত করে মানসিকভাবে প্রশান্তি ও তৃপ্তি বোধ করেন। আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-কে এ অবস্থায় দেখে মুসলিমরাও শেষ পর্যন্ত নিজ নিজ পশু জবাই করার জন্য ছুটে যায় এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলে। এরপর রাসুল (সাঃ) মুসলিমদেরসহ মদীনার পথে যাত্রা করেন। প্রায় অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর আল্লাহ তা’আলা সুরা ফাতহ নাযিল করেন। আল্লাহর রাসুল সদ্য নাযিলকৃত এ সুরার পুরোটাই সাহাবীদেরকে তিলাওয়াত করে শোনান। শুধুমাত্র তখনই মুসলিমরা সত্যিকারভাবে বুঝতে পারে যে, হুদাইবিয়া সন্ধির মাধ্যমে আসলে মুসলিমদেরই চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে।

     

    মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পরপরই রাসুল (সাঃ) এবার খায়বারের ইহুদীদের সাথে চুড়ান্ত বোঝাপড়া করে আরব ভূ-খন্ডের বাইরে ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি (সাঃ) ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকেও শক্তিশালী করার চিন্তা করেন। হুদাইবিয়া সন্ধিকে কার্যকরী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে তিনি (সাঃ) একদিকে বর্হিবিশ্বের সাথে সম্পর্ক তৈরীর চেষ্টা করেন। আবার, অন্যদিকে এ সন্ধির মাধ্যমেই তিনি (সাঃ) আরব ভূ-খন্ডে দাওয়াতী কার্যক্রমের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানো কিছু ক্ষুদ্র প্রতিরোধ বলয়কে ভেঙ্গে দেন। অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা থেকে হজ্জ্ব পালন করার উছিলায় আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছিলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সে পুরো পরিকল্পনাই তিনি (সাঃ) শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করেন। লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক বাঁধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও, এ চুক্তির সুবাদেই তিনি (সাঃ) পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর প্রতিটি উদ্দেশ্য হাসিল করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর এসমস্ত সাফল্য পরবর্তীতে সন্দেহাতীত প্রমাণ করে দেয় যে, হুদাইবিয়া সন্ধি প্রকৃত অর্থেই মুসলিমদের জন্য বিজয়ের বার্তা বহন করে এনেছে। রাসুল (সাঃ) এর অর্জিত কিছু সাফল্য হলঃ

     

    ১. হুদাইবিয়া প্রান্তরে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) সাধারণভাবে সমস্ত আরবের মধ্যে এবং বিশেষ করে কুরাইশদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপারে জনমত তৈরী করতে পেরেছিলেন। যা প্রকৃত অর্থে, আরবদের দৃষ্টিতে মুসলিমদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করেছিল এবং কুরাইশদের মর্যাদাকে করেছিল ক্ষুন্ন।

    ২. এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের ঈমানের দৃঢ়তা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিলেন। বস্তুতঃ হুদাইবিয়া সন্ধি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছিল যে, মুসলিমদের ঈমান ইস্পাত কঠিন ও অনমনীয়। এছাড়া দ্বীন রক্ষার খাতিরে তাদের দুঃসাহসী পদক্ষেপ ও স্বতঃস্ফুর্ত আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তও বিরল।

    ৩. এ ঘটনা থেকে মুসলিমরা এ শিক্ষাও লাভ করেছিল যে, ইসলাম প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে দক্ষ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক চাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।

    ৪. এর ফলে মক্কায় অবস্থানকারী মুসলিমরা আসলে শত্রুবুহ্যের ভেতরে থেকেই ইসলামী দাওয়াতের ছোট ছোট কেন্দ্র তৈরী করেছিল।

    ৫. এছাড়া এ চুক্তির মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয়েছিল যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গৃহীত সকল পদ্ধতিই একই উৎস, সত্যবাদীতা ও ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে হতে হবে। তবে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ও প্রজ্ঞার মাধ্যমেই লক্ষ্য অর্জনের পথ নির্ধারন করতে হবে। এক্ষেত্রে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কৌশল হিসাবে, শত্রুপক্ষের কাছে লক্ষ্য অর্জনের উপায় ও প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখা যাবে।

    http://time2revive.blogspot.ae/2014/07/blog-post_1746.html

  4. 6
    মজলুম

    হুদাইবিয়ার সন্ধিকে নারিকেল তরকারির মতো সব কিছুর সাথে মিশিয়ে নিজস্ব উদ্দেশ্য সার্ভ করার চেষ্টা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। ওরা আসলে হুদাইবিয়ার সন্ধির এক সাইড দেখায়।
    হিজরী ৬ সালের যিলকদ মাসে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুসলিমদের মোট লোকজন ছিলো ১৪০০ জন পুরুষ। এই চুক্তির কারনে আরবের বিশ্বের গোত্র গুলো দেখলো যে  শক্তিশালী আরবের কুরাইশরা অন্যান্য গোত্রদের সাথে নিয়ে মুসলিমদের মক্কা হতে মেরে তাড়িয়ে মদিনায় পাঠিয়েছে। মদিনার ক্ষুদ্র মুসলিম গোষ্ঠীকে মারতে তারপর বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ব পরিচালিত করেছে খোদ মদিনায় গিয়ে। কিন্তু সবকিছুতে হেরে এখন সর্বশেষ খোদ মক্কায় সেই মুসলিমদের সাথে কুরাইশরা চুক্তি ও করছে!!!!  তার মানে কুরাইশদের সেই আগেরকার দাপট আর নেই বা যুদ্ব করার মতো আর সাহস নেই এই কুরাইশদের। এই ভেবে এবার  আরবের কাফিররা মুসলিম হতে থাকে। এই সন্ধির মাত্র ২১ মাস পরেই  মানে হিজরী ৮ সালে হয় মক্কা বিজয়, সেই মুসলিমদের সংখ্যা হয়ে যায় ১০ হাজার। তার মাত্র দুই বছর পর হিজরী ১০ সালে রাসূল (সঃ)  বিদায় হজ্জ করেন ১ লাখের ও বেশী মুসলিমদের নিয়ে। কেন এই ব্যবধান?

    রাসূল (সঃ) প্রায় ১৪ বছর দাওয়াতি কার্যক্রম করে হিজরী দ্বিতীয় সালে বদর যুদ্ধ করার সময় মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩ জন।  তার এক বছর পর হয় ওহুদের যুদ্ব, মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১০০০। তারও তিন বছর পর খন্দকের যুদ্ব, মুসলিমদের নারী পুরুষের সংখ্যা সর্বমোট মিলিয়ে ৩০০০।

    কিন্তু হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয়ের পর কেন এত মানুষ ইসলামের ভিতর প্রবেশ করে?  
    কারন সাধারন মানুষেরা  দেখলো আরবের শক্তিশালী গোত্রগুলো মুসলিমদের সাথে যুদ্ব করতে করতে নিজেরাই দূর্বল হয়ে গেছে, বিপরীতে মুসলিমরা শক্তিশালী হয়েছে।

    আর এখন দুর্ভাগ্য জনক ভাবে হুদাইবিয়ার সন্ধিকে যেখানে সেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিএনপির সাথে জামাতের জোটবদ্ধ তাকে জামাত প্রচার করছে হুদাইবিয়ার সন্ধী,হুদাইবিয়ার সন্ধী, আমেরিকার সাথে সৌদি জোটবদ্ধ তাকে অনেক পেট্রোডলার আলেম বলে হুদাইবিয়ার সন্ধি, কয়েকদিন আগে দেখলাম তিউনেশিয়ার ইসলামিক পার্টি আল-নাহদার নেতা রশীদ গানুশীও নির্বাচনে সেক্যুলারদের কাছে হেরে বলছেন এটা হুদাইবিয়ার সন্ধি।     

          সবাই বিস্তারিত নিচে পড়ুন, তাহলে পুরো  ঘটনা বুঝতে পারবেন।

    হুদাইবিয়ার সন্ধি

     

    এভাবে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) মদীনায় হিজরতের পর একে একে ছয়টি বছর পার হয়ে যায়। ইতিমধ্যে রাসুল (সাঃ) মদীনায় ইসলামী সমাজের সার্বিক সুসংহত অবস্থা এবং শত্রু মুকাবিলায় তাঁর সৈন্যবাহিনীর শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যান। আর ইসলামী রাষ্ট্রও সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে অন্যতম শক্তি হিসাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসুল (সাঃ) তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারে নতুন নতুন পদক্ষেপের কথা চিন্তা করতে থাকেন, যাতে একই সাথে ইসলামের আহবানও হয় প্রতিনিয়ত শক্তিশালী, আর শত্রুপক্ষ হয় আরও দূর্বল।

     

    এর মধ্যে রাসুল (সাঃ) এর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে, খায়বার ও মক্কার লোকেরা একত্রিত হয়ে আবারও মুসলিমদের আক্রমণ করার ফন্দি আঁটছে। এ খবর শোনার পর, মক্কার লোকদের নিবৃত করার জন্য তিনি (সাঃ) একটি চমৎকার পরিকল্পনা করেন। এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল খায়বারের ইহুদীদেরকে তাদের মিত্র কুরাইশ গোত্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং একই সাথে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যাতে সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে রাসুল (সাঃ) এর দাওয়াতী কার্যক্রমের পথ মসৃণ হয়ে যায়। এ লক্ষ্যে তিনি (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের সহ পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করার উদ্দেশ্যে মক্কা যাবার পরিকল্পনা করেন। তিনি (সাঃ) জানতেন যে, যেহেতু আরব গোত্রগুলো পবিত্র মাসে যুদ্ধ করে না, সেহেতু তাঁর জন্য এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। এছাড়া তিনি (সাঃ) এটাও জানতেন যে, ইতিমধ্যে কুরাইশদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে এবং মুসলিমদের সম্পর্কে তাদের মনে যথেষ্ট পরিমাণ ভীতিও জন্মেছে। সুতরাং এ পরিস্থিতিতে, মুসলিমদের ত্বড়িৎ বেগে আক্রমণ করার আগে তারা অবশ্যই দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে। এ সমস্ত কিছু চিন্তা-ভাবনা করেই তিনি (সাঃ) হজ্জ্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ যদি কুরাইশরা তাঁকে উমরাহ করতে বাঁধা দেয়, তাহলে তিনি (সাঃ) এটাকে কুরাইশদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন। আর এর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের আহবানকেও জনসাধারনের কাছে অনেক গ্রহনযোগ্য করতে পারবেন।

     

    এ সমস্ত সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যুল কা’দার পবিত্র মাসে হজ্জ্ব করার ঘোষনা দেন এবং আরবের অন্যান্য গোত্রগুলোকেও তাঁর সাথে শান্তিপূর্ণ এ সফরে অংশ নিতে আহবান করেন। বস্তুতঃ তিনি (সাঃ) যে এবার শুধু হজ্জ্বের উদ্দেশ্যেই মক্কা যাচ্ছেন, আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে নয়, এ বার্তা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্যই তিনি (সাঃ) আরব গোত্রগুলোকে তাঁর সাথে এ পবিত্র কাজে শরীক হতে আহবান করেন। এমনকি যারা তাঁর দ্বীনের অর্ন্তভূক্ত নয় অর্থাৎ অমুসলিম গোত্রগুলোকেও তিনি (সাঃ) তাঁর সঙ্গী হতে আহবান জানান। যাতে সকলেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে যে, তাঁর যুদ্ধ করার কোন অভিপ্রায় নেই।

     

    এ সফরে রাসুল (সাঃ) নিজে তাঁর মাদী উট কুসউয়া’র পিঠে চড়ে নেতৃত্ব দেন এবং ১৪০০ সাহাবী ও ৭০ টি উটসহ মদীনা ত্যাগ করেন। আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবা সফরের এই শান্তিপূর্ণ মনোভাব সকলকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে তিনি (সাঃ) ইহরাম বাঁধা অবস্থায় যাত্রা শুরু করেন। মদীনা থেকে ছয় বা সাত মাইল দূরত্বে যুল হালিফাহ নামক জায়গায় পৌঁছালে অন্যান্য সাহাবীরাও ইহরাম বাঁধেন এবং ইহরামের কাপড় পড়েন। তারপর তারা আবার মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কুরাইশরা পূর্বেই শুনেছিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে আসছেন। কিন্তু তারা এটা ভেবে ভীত হয় যে, হয়তো মক্কায় প্রবেশের জন্য এটা মুহাম্মদদের নতুন কোন চাল। এ সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে না পেরে তারা শেষ পর্যন্ত মক্কা প্রবেশকালে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বাঁধা দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।

     

    এ কাজে কুরাইশরা খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ ও ইকরামাহ ইবন আবি জাহল এর নেতৃত্বে দুইশত দুর্দান্ত অশ্বারোহীর একটি দলকে নিযুক্ত করে। মুশরিকদের এ দলটি মদীনা থেকে আগত হজ্জ্বযাত্রীদের বাঁধা প্রদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। যী-তুওয়া নামক স্থানে পৌঁছে তারা যাত্রা বিরতি করে এবং হজ্জ্বযাত্রীদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এদিকে রাসুল (সাঃ) উসফান গ্রামে প্রবেশ করলে কুরাইশদের প্রেরিত এ বাহিনী সম্পর্কে খবর পান। এ গ্রামের কা’ব নামের এক ব্যক্তিকে রাসুল (সাঃ) কুরাইশদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় যে, “কুরাইশরা আপনার আগমনের সংবাদ পেয়ে, বাঘের চামড়া পরিধান করে দুগ্ধবতী উটের পিঠে আপনাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তারা যী-তুওয়ায় যাত্রা বিরতি করে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে এবং প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তাদের সাথে মুকাবিলার আগ পর্যন্ত তারা আপনাকে কোনভাবেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। তাদের অশ্বারোহী দলের সাথে রয়েছে খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ, যাকে তারা আগে থেকেই কুরা’ আল ঘামিম এলাকায় পাঠিয়ে দিয়েছে।” উসফান থেকে কুরা’ আল ঘামিম এর অবস্থান ছিল আট মাইল দূরত্বে।

     

    একথা শোনার পর রাসুল (সাঃ) বললেনঃ “ধ্বংস হোক কুরাইশরা! যুদ্ধ তাদেরকে আসলে গ্রাস করেছে। কি তাদের এমন ক্ষতি হত, যদি তারা আমাদের ও অন্য গোত্রগুলোকে আমাদের হালে ছেড়ে দিত? তাদের অন্তরের অভিলাষ হল, যদি তারা আমাকে হত্যা করতে পারত! যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে বিজয়ী করেন, তাহলে তারা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করবে। আর যদি তারা তা না করে, যতদিন তাদের শক্তি থাকে, তারা আমার সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। সুতরাং, কুরাইশরা কী ধারনা করে? আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা’আলা যে কাজের জন্য আমাকে নিযুক্ত করেছেন, তার জন্য আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছপা হব না। হয় আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব।”

     

    এরপর আল্লাহর রাসুল (সাঃ) তাঁর পূর্ব পরিকল্পনার উপরই অটল থাকলেন এবং গভীরভাবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কারণ এবারে তাঁর কৌশল ছিল শান্তিপূর্ণ এবং যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি নিয়েও তিনি (সাঃ) আসেননি। কিন্তু তাঁর যুদ্ধ করার ইচ্ছা না থাকলেও কুরাইশদের উদ্দেশ্য যুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যেই তারা দলবল পাঠিয়েছে। সুতরাং তিনি (সাঃ) ভাবতে লাগলেন তাঁর কি মদীনায় ফিরে যাওয়া উচিত, নাকি পূর্ব পরিকল্পনা বাতিল করে যুদ্ধ করা উচিত? তিনি (সাঃ) মুসলিমদের ঈমান সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন। তিনি (সাঃ) এটাও জানতেন যে, যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন পথ যদি তাঁদের জন্য খোলা না থাকে, তাহলে মুসলিমরা নির্দেশ পাওয়া মাত্র যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে এতটুকু পিছপা হবে না।

     

    যাই হোক, অনেক চিন্তা-ভাবনার পর রাসুল (সাঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর আশঙ্কা অনুযায়ী যদি তাঁকে হজ্জ্ব করতে বাঁধা দেওয়াও হয়, তবুও তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়েই সমস্ত ব্যাপারটি ফয়সালা করবেন। এ ব্যাপারে তিনি (সাঃ) কুরাইশদের সাথে কোনরকম সংঘর্ষে যাবেন না বা বিরূপ পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক হজ্জ্বও করবেন না। কারণ এবার তিনি (সাঃ) কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বেরও হননি বা আক্রমণ করার কথা চিন্তাও করেননি। এছাড়া, এবার তাঁর শান্তিপূর্ণ এই পরিকল্পনার প্রকৃত উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামের আহবানের মহানুভবতা ও সৌন্দর্যকে কুরাইশদের কাছে তুলে ধরা এবং ইসলামের পক্ষে মক্কায় জনমত তৈরী করা। আর কুরাইশদের নির্বোধ গোয়ার্তুমি, পথভ্রষ্টতা ও ভয়ঙ্কর আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকে ইসলাম যে কতো উপরে, সেটাও মক্কার সমাজের মানুষের কাছে তুলে ধরা। কারণ ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকে সঠিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু তাই নয়, সমাজে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরীর মাধ্যমেই ইসলামী দাওয়াতের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে, ফলে ইসলাম বিজয়ী শক্তি হিসাবে আর্বিভূত হয়। তিনি (সাঃ) ভেবে দেখলেন যে, তিনি (সাঃ) যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে মক্কায় ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরীর পরিকল্পনাটা ভেস্তে যেতে পারে। সুতরাং তিনি (সাঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কোন অবস্থাতেই তিনি (সাঃ) কোনরকম সংঘর্ষে যাবেন না এবং তাঁর শান্তিপূর্ণ পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করবেন।

     

    এ পর্যায়ে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) গভীরভাবে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে রাসুল (সাঃ) এর দক্ষতা ও বিচক্ষনতা ছিল অতুলনীয়। এ বিচক্ষনতা ও দূরদর্শিতা থেকেই তিনি (সাঃ) তাঁর শান্তিপূর্ণ পূর্ব পরিকল্পনায় অটল থাকতে চাচ্ছিলেন। তিনি (সাঃ) কোনভাবেই চাচ্ছিলেন না তার পরিকল্পনা ভেস্তে যাক কিংবা জনমত তৈরী করার চমৎকার এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাক। কারণ তাঁকে যদি কোন কারণে যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে তাঁর পরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে তাঁর কাছেই ফিরে আসবে। তখন কুরাইশরা এ চমৎকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত আরবে ভয়ঙ্কর প্রচারনা চালাবে। পরিণতিতে জনমত চলে যাবে তাঁর বিপক্ষে। তিনি (সাঃ) মুসলিমদের ডাকলেন এবং বললেনঃ “কেউ কি আছে যে আমাদের এমন এক রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, যে রাস্তায় কুরাইশ বাহিনীর সাথে মুকাবিলা হবে না?” মুসলিমদের মধ্য হতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে এগিয়ে এল এবং তাদেরকে পাহাড়ের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ন পাথুরে গিরিপথের ভেতর দিয়ে নিয়ে চললো, যে পর্যন্ত না তারা হুদাইবিয়া নামে মক্কার নিম্নবর্তী এক উপত্যকায় পৌঁছাল। এখানেই রাসুল (সাঃ) তাঁর দলবলসহ অবস্থান নিলেন। খালিদ ও ইকরামাহ এর সৈন্যদল মুহাম্মদ (সাঃ) এর দলবলকে হুদাইবিয়া প্রান্তরে দেখে আতঙ্কিত হয়ে মক্কা রক্ষায় দ্রুত সেখানে ফিরে গেল। মুসলিম বাহিনীর এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ দেখে পৌত্তলিকদের মেরুদন্ডে যেন আতঙ্কের স্রোত প্রবাহিত হয়ে গেল। তারা নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না, কিভাবে মুসলিমরা এতো দক্ষতা ও চতুরতার সাথে তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের অরক্ষিত সীমান্তে এসে উপস্থিত হল। এই পরিস্থিতিতে, কুরাইশরা মক্কার ভেতর সুদৃঢ় অবস্থান নিল আর রাসুল (সাঃ) তাঁর বাহিনী নিয়ে অবস্থান নিলেন হুদাইবিয়ার প্রান্তরে। দুইপক্ষ এভাবে মুখোমুখি অবস্থায় দিন পার করতে থাকল এবং প্রত্যেকেই ভাবতে লাগলো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা। মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবল যে, কুরাইশরা তাদের কোন অবস্থাতেই হজ্জ্ব পালন করতে দেবে না, বরং তাদের সাথে যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নেবে। তারা ভেবে দেখল যে, এ অবস্থায় তাদের আসলে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ ব্যতীত কোন পথ খোলা নেই। তাই তাদের উচিত শত্রুপক্ষের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়া, তারপর হজ্জ্ব পালন করা। এর ফলে কুরাইশদেরকে চরম একটা শিক্ষা দেয়া যাবে।

     

    ইতিমধ্যে কুরাইশরাও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার স্বপ্নে বিভোর হল। এমনকি যদি তারা যুদ্ধ করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তবুও। কিন্তু খুব শীঘ্রই তাদের এসব সুখ-স্বপ্ন বুদবুদের মতো মিলিয়ে গেল। কারণ তারা জানত মুখোমুখি হবার জন্য মুসলিমরা হচ্ছে সবচাইতে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ। তাই তারা শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের পক্ষ থেকেই প্রথম পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।

     

    প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ইহরাম বাঁধা অবস্থায় পূর্ব পরিকল্পনার উপরই অটল থাকলেন। হুদাইবিয়ার প্রান্তরে তিনি (সাঃ) শুধু দৃঢ়তার সাথে অবস্থান গ্রহন করলেন। অপেক্ষা করতে লাগলেন কুরাইশদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। তিনি (সাঃ) এটা খুব ভাল করেই জানতেন যে, কুরাইশরা তাঁর ভয়ে অত্যন্ত ভীত এবং খুব শীঘ্রই তারা তাঁর সাথে হজ্জ্ব পালন বিষয়ে দেন-দরবার করার জন্য প্রতিনিধি পাঠাবে। সুতরাং তিনি (সাঃ) ধৈর্য্য সহকারে কুরাইশদের প্রতিনিধি দলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এরপর কুরাইশরা প্রথমে খুযায়া’ গোত্রের কিছু লোকসহ বুদাইল ইবন ওরাকাকে রাসুল (সাঃ) এর কাছে পাঠায়। প্রতিনিধি দল এসে জানতে চায় যে, রাসুল (সাঃ) আসলে কি জন্য মক্কায় আগমন করেছেন। কিছুক্ষন কথাবার্তার পরই তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মুসলিমদের মক্কা আক্রমণ করার আসলে কোন উদ্দেশ্য নেই। বরং তারা পবিত্র কাবাঘরের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্যই মদীনা থেকে যাত্রা করেছে।

     

    প্রতিনিধি দল কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে ঘটনা বর্ণনা করে এবং পুরো ব্যাপারটি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কুরাইশরা তাদের কথা অবিশ্বাস করে এবং বলে যে, তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর কথায় প্রভাবিত হয়ে গেছে। কুরাইশরা এরপর আরেকটি প্রতিনিধি দল পাঠায়, তারাও তাদের কাছে এসে একই কথাই বলে। এরপর কুরাইশরা আল-আহবাস (আবিসিনিয়ার অধিবাসী) গোত্রের প্রধান আল-হুলাইসকে রাসুল (সাঃ) এর সাথে দেন-দরবার করার জন্য পাঠায়। কুরাইশরা একরকম নিশ্চিত ছিল যে, আল-হুলাইস মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিবৃত করতে পারবে। আসলে রাসুল (সাঃ) এর বিরুদ্ধে হুলাইসকে ক্ষেপিয়ে তোলাই ছিল তাদের হুলাইসকে পাঠানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য। তারা ভেবেছিল, হুলাইস যখন রাসুলুল্লাহর সাথে কোন মীমাংসায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে, তখন মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি তার ঘৃণা আরও বেড়ে যাবে। ফলে মুহাম্মদ (সাঃ) এর আক্রমণ থেকে মক্কা রক্ষা করার ব্যাপারে তার মনোভাব আরও দৃঢ় হবে। যাই হোক, মুহাম্মদ (সাঃ) যখন হুলাইসের আসার কথা শুনলেন তিনি (সাঃ) তাদের কুরবানীর পশুগুলোকে মুক্ত করে দিতে বললেন, যেন সে বুঝতে পারে মুসলিমরা হজ্জ্বের জন্যই এসেছে, যুদ্ধের জন্য নয়।

     

    আল-হুলাইস উপত্যকার পাশ থেকে আগত কুরবানীর পশুগুলোকে তার পাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখল। সে আরও দেখল উমরাহ করার জন্য প্রস্তুত মুসলিমদের। সে দেখল মুসলিমদের তাঁবুগুলো হজ্জ্বের মতো পবিত্র ইবাদতের আমেজে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। তাদেরকে দেখে মনেও হচ্ছে না যে, তারা যুদ্ধ করতে এসেছে। এসব কিছু দেখে সে এতো অভিভূত হল যে, সে নিশ্চিত হয়ে গেল, মুসলিমরা যুদ্ধ করতে নয় বরং হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যেই এসেছে। এমনকি সে মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ না করেই কুরাইশদের কাছে ফিরে গেল এবং তাদেরকে সবকিছু বিস্তারিত বর্ণনা করল। শুধু তাই নয়, ফিরে এসে সে কুরাইশদের ধমক দিয়ে বলল, যেন তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এবং কা’বার মাঝে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। আর মুসলিমদের নির্বিঘ্নে হজ্জ্ব পালন করতে দেয়া হয়। এর ব্যতিক্রম হলে, সে তাঁর সৈন্যদল প্রত্যাহার করে নেবে। কুরাইশরা তাদের উদ্যত স্বরকে নমনীয় করে হুলাইসকে শান্ত করল। তারা হুলাইসের কাছে আরও ভাল কোন প্রস্তাবের জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিল। হুলাইস এতে সম্মতি দিলে তারা উরওয়া ইবন মাস’উদ আল-ছাকাফিকে পরবর্তী প্রতিনিধি হিসাবে পাঠাল এবং তারা ছাকাফিকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করল যে, তারা তার দেয়া সিদ্ধান্তকেই মেনে নেবে। উরওয়া ইবন মাস’উদ রাসুল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে তাকে হজ্জ্ব না করে মদীনার ফেরত যাবার অনুরোধ করল। কিন্তু তার সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল।

     

    একই সাথে এটাও স্বীকার করল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) এর অবস্থানই সঠিক। তারপর সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বললোঃ “হে কুরাইশরা! আমি খসরুর দরবারে গিয়েছি, কায়সারের দরবারেও গিয়েছি, গিয়েছি নাজ্জাশীর দরবারেও। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও আমি এমন কোন বাদশাহ দেখিনি, যিনি মুহাম্মদের চাইতে বেশী তাঁর সঙ্গীদের ভালোবাসা পেয়েছেন। যখন তিনি ওজু করেন, তখন তাঁর সাহাবারাও সাথে সাথে তা করার জন্য দৌড়ে যায়। যদি তাঁর একটা চুলও পড়ে যায়, তবে তারা তা কুড়াবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটে যায়। আমার ধারণা, তারা কোন অবস্থাতেই মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করবে না। সুতরাং তোমরা কি করবে, তা তোমরা নিজেরাই ঠিক কর।”

     

    কিন্তু উরওয়া ইবন মাস’উদের এ দ্বিধাহীন বক্তব্য শুধু মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি কুরাইশদের বিদ্বেষ, ঘৃণা আর প্রতিহিংসাই বৃদ্ধি করল। তাদের অন্ধ গোঁয়ার্তুমি ও মিথ্যা অহঙ্কার পরবর্তী মধ্যস্থতার সকল পথকে রুদ্ধ করে দিল। তাদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার আর কোন মূল্যই থাকল না। এরপর রাসুল (সাঃ) তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি (সাঃ) ভাবলেন, হয়ত কুরাইশ প্রতিনিধিরা তাঁর সাথে আলোচনা করার ব্যাপারে আতঙ্ক বোধ করছে। তাই তিনি (সাঃ) তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠালেন এবং আশা করলেন হয়ত সে কুরাইশদের সাথে মধ্যস্থতা করতে সমর্থ হবে। কিন্তু কুরাইশরা রাসুল (সাঃ) এর প্রতিনিধিকে বহনকারী উটের পায়ের রগ কেটে ফেলল এবং দূতকে হত্যা করতে উদ্যত হল। সৌভাগ্যবশতঃ আল-আহবাসের সেনাদল তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসল। মুসলিমদের প্রতি কুরাইশদের বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তারা এক পর্যায়ে মুসলিমদের তাঁবুতে পাথর নিক্ষেপ করার জন্য তাদের বখাটে ছেলেদের লেলিয়ে দেয়। কুরাইশদের এ হীন আচরনে মুসলিমরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু রাসুল (সাঃ) তাদেরকে শান্ত করেন। পরদিন কুরাইশরা মুসলিমদের ছাউনী ঘেরাও করে তাদের প্রহার করার জন্য ৫০ জনের একটি দল পাঠায়। কিন্তু মুসলিমরা তাদের বন্দী করে রাসুল (সাঃ) এর কাছে নিয়ে যায়। রাসুল (সাঃ) তাদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের ছেড়ে দেবার নির্দেশ দেন।

     

    মুহাম্মদ (সাঃ) এ মহানুভব আচরন মক্কাবাসীদের প্রচন্ডভাবে নাড়া দেয় এবং এরপর তাদের মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাবীর ব্যাপারে আর কোনই সন্দেহ থাকে না। তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মুহাম্মদ (সাঃ) আসলে প্রথম থেকে সত্য কথাই বলে আসছেন। এ ঘটনা তাদের পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) আসলে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যেই এসেছেন, যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে নয়। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে, মুহাম্মদ (সাঃ) মূলতঃ মক্কার জনসাধারনের জনমত তাঁর নিজের পক্ষে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন। এর ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, তিনি (সাঃ) যদি তাঁর দলবল নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে চান আর কুরাইশরা যদি তাদের মক্কা প্রবেশকালে বাঁধা দিতে চায়, তবে মক্কার জনগণ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলোই মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং মুসলিমদের সমর্থন করবে। সুতরাং এ পর্যায়ে কুরাইশরা তাদের উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনা থেকে নিজেদের বিরত করল এবং খুব গুরুত্বের সাথে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে মনোযোগ দিল। রাসুল (সাঃ) এরপর আরেকজন দূতকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরাইশদের নিকট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তিনি (সাঃ) উমর ইবন খাত্তাবকে মক্কার যাবার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু উমর (রা.) তাঁকে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল! আমি কুরাইশদের কাছে আমার জীবননাশের আশঙ্কা করছি। কারণ এখন আমাকে নিরাপত্তা দেবার জন্য বনু আদি ইবন কা’ব আর মক্কায় নেই। আর আপনি কুরাইশদের সাথে আমার শত্রুতা এবং তাদের প্রতি আমার রূঢ় ব্যবহার সম্পর্কেও জানেন। আমি এক্ষেত্রে আমার পরিবর্তে উসমান ইবন আফফানের নাম প্রস্তাব করতে চাই, যাকে পাঠানো আমার থেকেও বেশী ফলপ্রসু হবে।”

     

    উমর (রা.) এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে রাসুল (সাঃ) উসমান ইবন আফফানকে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেন। উসমান (রা.) মক্কায় গিয়ে আল্লাহর রাসুলের বার্তা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেন। তারা তাঁকে কাবাঘর তাওয়াফ করার প্রস্তাব দিয়ে বলেঃ “‘তুমি যদি কাবাঘর প্রদক্ষিন করতে চাও, তবে তা করতে পার।’ উত্তরে উসমান (রা.) বলেনঃ ‘আমি ততক্ষন পর্যন্ত তা করব না, যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহর রাসুল (সাঃ) তা করেন।’” উসমান এরপর কুরাইশদের সাথে শান্তিচুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন, কিন্তু প্রথম পর্যায়ে কুরাইশরা তা পুরোপুরি প্রত্যাখান করে। শান্তিচুক্তির বিষয়ে এই আলোচনার ক্ষেত্র ছিল ব্যাপক এবং সে সময়ে তা ছিল অত্যন্ত কঠিন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা শান্তিচুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখানের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে এবং এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়ায় যাতে উভয়পক্ষের কাছেই তা গ্রহনযোগ্য হয়। একসময় তারা উসমান (রা.) এর সাথে আলোচনা করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে থাকে এবং তাঁর সাথে একত্রে বসেই অনেক বাকবিতন্ডার পর অবশেষে জটিল এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজে বের করে। যার ফলশ্রুতিতে, মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে তাদের যুদ্ধাবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে।

     

    এদিকে উসমান (রা.) যখন মক্কায় তাঁর অবস্থানকে দীর্ঘায়িত করেন এবং মক্কার রাস্তাঘাটের কোথাওই তাকে দেখা যায় না, তখন মুসলিম শিবিরে রটে যায় যে, কুরাইশরা তাঁকে হত্যা করেছে। এ সংবাদ শোনার পর, মুসলিমরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যায় এবং কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। এ পর্যায়ে রাসুল (সাঃ) আবার নতুন করে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেন। আপাতঃ দৃষ্টিতে তাঁর কাছে মনে হয়, দূত হিসাবে মক্কায় গমনের পরও পবিত্র মাসে উসমানকে হত্যা করে কুরাইশরা তাঁর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এ কারণে তিনি (সাঃ) ঘোষনা দেনঃ “শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা এ স্থান ত্যাগ করব না।” তিনি (সাঃ) সাহাবীদের সকলকে নিয়ে একটি গাছের নীচে দাঁড়ান এবং এ স্থানেই তাদের সকলের কাছ থেকে বাই’আত গ্রহন করেন। আমৃত্যু লড়ার শপথ করে তারা রাসুল (সাঃ) এর নিকট বাই’আত করেন। বাই’আত গ্রহন সম্পন্ন হলে, রাসুল (সাঃ) তাঁর এক হাত দিয়ে আরেক হাত শক্ত করে ধরে উসমান (রা.) এর পক্ষে এমনভাবে বাই’আত করেন যে, মনে হয় যেন উসমান (রা.) তাঁদের সাথেই আছেন। এ বাই’আত পরবর্তীতে বাই’আত আল-রিদওয়ান নামে পরিচিত হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেনঃ

     

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ ঈমানদারদের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন যখন তারা গাছের নীচে তোমার নিকট বাই’আত করেছিল। তিনি জানতেন তাদের হৃদয়ে কি আছে এবং তিনি তাদের জন্য (তাদের অন্তরে) সাকীনাহ (প্রশান্তি ও স্বস্তি) দান করলেন এবং বিজয়কে নিকটবর্তী করে তিনি তাদের পুরস্কৃত করলেন।” [সুরা ফাতহঃ ১৮]

     

    যখন বাই’আত গ্রহন সম্পন্ন হল এবং মুসলিমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল, এ সময়ে মুসলিম শিবিরে খবর পৌঁছাল যে, উসমানকে (রা.) হত্যা করা হয়নি। এর পরপরই উসমান (রা.) ছাউনীতে ফিরে আসেন এবং কুরাইশদের প্রস্তাব সম্পর্কে রাসুল (সাঃ)-কে অবহিত করেন। এরপর আবারও মুহাম্মদ (সাঃ) এবং কুরাইশদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়। এরপর কুরাইশরা সুহাইল ইবন আমরকে দুই শিবিরের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য রাসুল (সাঃ) এর নিকট দূত হিসাবে প্রেরণ করে। কুরাইশদের দূত সেই সাথে মুসলিমদের হজ্জ্ব এবং উমরাহ পালন বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করে। আলোচিত দ্বিতীয় বিষয়টিতে তাদের শর্ত ছিল যে, মুসলিমদের এবার হজ্জ্ব না করেই ফিরে যেতে হবে, কিন্তু পরবর্তী বছরে তাদের হজ্জ্বের অনুমতি দেয়া হবে।

     

    আল্লাহর রাসুল (সাঃ) তাদের এ সমস্ত চুক্তি মেনে নিয়েই তাদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। কারণ তিনি (সাঃ) বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি (সাঃ) যে উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, ইতিমধ্যে তা অর্জিত হয়ে গেছে। সুতরাং তিনি (সাঃ) এবার পবিত্র ঘর তাওয়াফ করেন বা না করেন, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। প্রকৃতপক্ষে, তিনি (সাঃ) খায়বারের বিশ্বাসঘাতক ইহুদী গোত্রগুলোকে পুরোপুরি কুরাইশদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের পথকে মসৃণ ও বাঁধামুক্ত করতে এবং ইসলামের সুমহান বাণী আরবের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কারণ ইহুদী আর কুরাইশদের এই মৈত্রীই প্রকৃত অর্থে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারের পথে বিরাট বাঁধা সৃষ্টি করেছিল আর ইসলাম প্রচার-প্রসারের পথকে করেছিল রুদ্ধ। এ লক্ষ্যেই তিনি (সাঃ) কুরাইশদের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে উদগ্রীব ছিলেন, যেন কুরাইশদের পক্ষ থেকে কোন ধরনের আক্রমণের আশঙ্কা না থাকে। আর হজ্জ্ব কিংবা উমরাহ পালন করা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ সেটা তিনি (সাঃ) পরবর্তী বছরই করতে পারতেন।

     

    যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং এর শর্তাবলীর ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) সুহাইল ইবন আমরের সাথে দীর্ঘ সময় যাবত সুক্ষাতিসুক্ষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আসলে এই আলোচনা ছিল খুবই ব্যাপক এবং একটা সমঝোতার জায়গায় এসে দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার বিষয়টিও ছিল খুবই কঠিন কাজ। একেক সময় মনে হচ্ছিল আলোচনা ফলপ্রসু হবে না এবং পুরো ব্যাপারটিই ভেস্তে যাবে। আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) প্রচন্ড পরিমান রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা না থাকলে হয়তো পুরো ব্যাপারটি ভেস্তেও যেত। মুসলিমরা খুব কাছ থেকেই পুরো ব্যাপারটি পর্যবেক্ষন করে এবং তারাও ভাবে যে, রাসুল (সাঃ) উমরাহ করার বিষয়েই দেন-দরবার করছেন। কিন্তু রাসুল (সাঃ) এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন করা। যে জন্য চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে মুসলিমরাও বিরক্ত হলেও আল্লাহর রাসুল (সাঃ) তাঁর অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে এটাকেই আল্লাহর রহমত মনে করেন। ফলে তিনি (সাঃ) চুক্তির প্রতিটি শর্ত ও স্বল্পমেয়াদী সুযোগসুবিধার দিকে লক্ষ্য না করে, সুহাইলের ইচ্ছা অনুযায়ীই আলোচনা চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত কিছু নির্দিষ্ট শর্তাবলীর ভিত্তিতে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

     

    চুক্তির শর্তাবলী মুসলিমদের অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও রাগান্বিত করে। তারা অপমানজনক এ চুক্তি প্রত্যাখান করে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করাকেই শ্রেয় মনে করে এবং এ জন্য রাসুল (সাঃ)-কে বারবার অনুরোধও করে। চুক্তির শর্ত দেখে উমর (রা.) লাফিয়ে উঠে যায় এবং আবু বকর (রা.) এর কাছে গিয়ে বলেনঃ “কেন আমরা এমন সব শর্ত মেনে নিচ্ছি, যা আমাদের দ্বীনকে হেয় প্রতিপন্ন করছে?” উমর (রা.) তাঁর সঙ্গে রাসুল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে এ চুক্তি বাতিলের দাবীতে আবেদন করার জন্য আবু বকরকে (রা.) জোর করতে থাকেন। আবু বকর (রা.) তাঁকে এ ধরণের প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখার নিষ্ফল চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত উমর (রা.) একাই রাসুল (সাঃ) এর কাছে যান এবং চুক্তির ব্যাপারে তাঁর ক্রোধ ও উষ্মা প্রকাশ করেন। কিন্তু এসব কোন কিছুই রাসুল (সাঃ) এর সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করতে পারে না। বরং তিনি (সাঃ) ইস্পাত কঠিন সংকল্প ও প্রচন্ড মানসিক দৃঢ়তার সাথে তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি (সাঃ) উমরকে (রা.) স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ “আমি আল্লাহর রাসুল ও তাঁর অনুগত দাস। আমি অবশ্যই তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করে কোন কাজ করব না এবং অবশ্যই তিনি আমাকে অপমানিত ও ক্ষতিগ্রস্থ করবেন না।”

     

    চুক্তিপত্র তৈরী করার জন্য রাসুল (সাঃ) আলী ইবন আবু তালিবকে নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে লিখার নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ “‘লিখ! শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু।’ এ সময় সুহাইল বাঁধা দিয়ে বলেঃ ‘থামো! আমি “পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু” একথা মানতে দিতে রাজী নই। বরং তুমি লিখঃ ‘তোমার নামে, হে প্রভু!’।’ রাসুল (সাঃ) আলীকে (রা.) তাই লিখার নির্দেশ দিলেন। তারপর তিনি (সাঃ) বললেনঃ ‘লিখ! এটা হচ্ছে সেই চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ ও সুহাইল ইবন আমরের মধ্যে।’ এ পর্যায়ে সুহাইল আবারও বাঁধা দিয়ে বললোঃ ‘থামো! যদি আমি স্বীকারই করে নিতাম তুমি আল্লাহর রাসুল, তাহলে তোমাদের আমাদের মধ্যে কোন বিরোধই থাকত না। বরং তুমি তোমার নাম ও তোমার বাবার নাম লিখ।’ রাসুল (সাঃ) আলীকে (রা.) বললেনঃ ‘লিখ! এটা হচ্ছে সেই চুক্তিপত্র, যা মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ, সুহাইল ইবন আমরের সাথে স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছে।’” শুরুতে এ বাক্যগুলি লিখার পর নিম্নোক্ত শর্তাবলীর ভিত্তিতে উভয়পক্ষের মধ্যে সন্ধিপত্র লিখা হয়ঃ

     

    ১. যুদ্ধবিরতি সময়কালে উভয়পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা কোনরকম আক্রমণাত্মক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবে।

    ২. যদি কুরাইশদের মধ্য হতে কেউ ইসলাম গ্রহন করে এবং গোত্র প্রধানের অনুমতি ব্যতীত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট পালিয়ে যায়, তবে তিনি (সাঃ) তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট থেকে যদি কেউ কুরাইশদের কাছে গমন করে, তবে তারা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।

    ৩. আরব গোত্রসমূহের মধ্য থেকে যে কেউ যদি স্বাক্ষরিত এ চুক্তির পক্ষে মুহাম্মদ (সাঃ) এর মিত্র হতে চায়, তবে তা তারা পারবে। আবার যদি কেউ কুরাইশদের মিত্র হতে চায়, তবে তাও তারা পারবে।

    ৪. মুহাম্মদ (সাঃ) ও মুসলিমদের এবার হজ্জ্ব না করেই মদীনায় ফিরে যেতে হবে। সামনের বছর তাদের মক্কায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কোন বাঁধা থাকবে না। তবে তখন তারা মাত্র তিনদিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবে। এ সময় তারা কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারবে না।

    ৫. এই চুক্তি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এবং এ সময়কাল হচ্ছে স্বাক্ষরিত হবার সময় থেকে পরবর্তী দশবছর।

     

    ইতিমধ্যে, এ চুক্তির ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে প্রচন্ড অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরী হয়। তাদের এ ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ভেতর দিয়েই আল্লাহর রাসুল (সাঃ) সুহাইল ইবন আমরের সাথে এ চুক্তি সম্পাদন করেন। মুসলিম শিবিরে দানা বেঁধ

  5. 5
    শাহবাজ নজরুল

    সুন্দর লেখা মহিউদ্দিন ভাই। বেশ ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে। 

    1. 5.1
      মহিউদ্দিন

      শাহবাজ ভাই,
      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 

  6. 4
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    চমৎকার বিশ্লেষন। ভাল লাগলো। 

    ধন্যবাদ।

    1. 4.1
      মহিউদ্দিন

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  7. 3
    কিংশুক

    ভালো লাগলো।

    1. 3.1
      মহিউদ্দিন

      কিংশুক ভাই,
      আপনাকে ধন্যবাদ।

  8. 2
    Zelal

    নামাজ শেষে ঈমান সাহেব জানালেন,আজকে সবার জন্য নাস্তার আয়োজন আছে সবাই যেন নাস্তা খেয়ে যান। একথা বলে  ঈমান সাহেব দশ মিনিটের সংক্ষিপ্ত একটি বক্তব্য রাখলেন। আমার আজকের ব্লগটি সে প্রেক্ষাপটে লিখা।

    "ঈমান সাহেব"-কে "ইমাম সাহেব" করে দিলে ভাল হয়।

    1. 2.1
      মহিউদ্দিন

      টাইপো খেয়াল করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
       

  9. 1
    এম_আহমদ

    নবীর (সা:) হজ্জে যাওয়ার স্বপ্নের বিষয়টি নিয়ে দুটি কথা সংযোগ করতে চাই।

    ব্যাপার হচ্ছে কী আমরা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আর নবী-রাসূলদের অন্তর্দৃষ্টি  (বাসিরাহ/بصيرة) এক নয় –এখানে আসমান জমিনের পার্থক্য। নব্যুওয়াত এক বিরাট পার্থক্য সূচিত করে। তাদের স্বপ্নও আর আমাদের মত থাকে না। তবে কিছু কিছু স্বপ্ন এমন হত যে, তা যদিও সত্য, কিন্তু বাস্তবের ক্ষেত্রে স্থান অথবা কাল বা উভয়ই exact ভাবে দেখানো হত না। ইউসূফের (আ:) স্বপ্ন (১২:৪) তার পিতাকে বললেও তাদের কারো কাছে সেই exact স্থান ও কাল নির্ণীত হয়নি। তবে এটা যে বাস্তবে রূপ লাভ করবে তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। ইউসূফের (আ:) ভাইগণ তাঁর মৃত্যু সংবাদ দিলেও হযরত ইয়াকুব (আ:) তা মানতে পারেননি –কেননা এটা তো হতেই পারে না।  এই সত্য বাস্তবায়িত হতে প্রায় ৪০ বৎসর লেগেছিল এবং যখন তা বাস্তবে রূপ লাভ করল তখন ইউসূফ (আ:) তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, হে পিতা, এই’ই হচ্ছে আমার সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা (১২/১০০) বা বাস্তব রূপ। হজরত ইব্রাহীম (আ:) যখন নিজ পুত্র ইসমাঈলকে (আ:) স্বপ্নে কয়েকবারই কোরবানী করতে দেখলেন (৩৭:১০২), তখন তিনি এই বিষয়টি তাঁর ছেলেকে বললেন। ছেলে, ইসমাঈল (আ:) তাঁর পিতাকে সেই আদেশ কার্যকর করতেই উৎসাহিত করলেন। কারণ ২/৩ বার দেখার পর আর অন্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনা ছিল না। 

    আমাদের নবী (সা:) হজ্জ করার স্বপ্ন দেখলেন। তারপর সবাইকে বলেন। তাদের অনেকের ধারণা ছিল এটা এই বৎসর হতে যাচ্ছে। কিন্তু যখন হজ্জ না করেই আসতে হল, তখন হযরত ওমর এ বিষয়টি সহজে সয়ে ওঠতে পারছিলেন না। তিনি এক সময় নবীর (সা:) পিছন দিক থেকে তাঁর জামা টেনে বলেছিলেন, ‘আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন?’ (অর্থাৎ কই, আমরা হজ্জ না করেই ফিরে যাচ্ছি অথচ আপনি তো হজ্জ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন!)। তখন নবী (সা:) তাঁকে দৃঢ়তার সাথে এবং প্রশান্ত চিত্তে বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল! … আমি কি বলেছিলাম আমরা ‘এই’ বৎসরই হজ্জ করব? আমরা ‘অবশ্য’ই হজ্জ করব।

    ওমর (রা:) তাঁর বাকী জিন্দেগীতে এই ঘটনার জন্য আক্ষেপ করতেন। আর বলতেন, হায়, ওমর যদি এই কাণ্ডটি না করত!

    মূলত নবীদের স্বপ্ন ও দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ‘আগাম’ বস্তু বাস্তবে রূপ করার মধ্যে যে সত্য নিহিত থাকে এরই প্রেক্ষিতে আমরা পরকালের সত্যতার উপর আরও একটি অতিরিক্ত সত্য হৃদয়ঙ্গম করি।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হুদাইবিয়াকেই ‘ফাতহাম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়/clear victory) বলে উল্লেখ করেছেন (৪৮:১)। আর সেই স্বপ্নের ব্যাপারে বলেছেন, “আল্লাহ তাঁর রসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন যা তোমরা জান না। এছাড়াও তিনি দিয়েছেন তোমাদেরকে একটি আসন্ন বিজয়” (৪৮:২৭)।   

    একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। এই যে মদিনা থেকে আসা নিরস্ত্র মুসলমানগণকে পৌত্তলিকগণ পবিত্র মাসে সশস্ত্র হয়ে হেরেমের ঢুকার আগেই মেরে ফেলতে উদ্যত হল, এই যে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে হজ্জ করতে দেয়া হল না; তাদের উপর অন্যায় শর্তসমূহ চাপানো হল; অধিকন্তু গোটা মাক্কী জীবনে মুসলমানদেরকে নির্যাতন করল, হত্যাও করল, দেশ ছাড়া করল –এসব নিয়ে আমাদের সমাজের ইসলাম বিদ্বেষী খবিস পৌত্তলিক ও নাস্তিকগুলোকে কোনো কথা বলতে শুনেছেন?

    1. 1.1
      মহিউদ্দিন

      লিখাটির বিষয় সম্পূরক তথ্য ও ব্যাখ্যা সহ মন্তব্যের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। 

    2. 1.2
      মহিউদ্দিন

      মূলত নবীদের স্বপ্ন ও দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ‘আগাম’ বস্তু বাস্তবে রূপ করার মধ্যে যে সত্য নিহিত থাকে এরই প্রেক্ষিতে আমরা পরকালের সত্যতার উপর আরও একটি অতিরিক্ত সত্য হৃদয়ঙ্গম করি।

      আহমেদ ভাই আপনার এ চমৎকার বাক্যটি একটি  অনিবার্য সত্যের দিকে একজন উদাসীন ব্যক্তির অবচেতন মনে সাড়া জাগেনোর জন্য যথেষ্ট মনে করি। 

      আসলেই যারা আল্লাহর রাসুলের উপর বিশ্বাস আনে তারই তো সে অনিবার্য সত্যের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে।  তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, " ……….তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যাহা হইতে নির্গত হয় কিশলয়, অত:পর ইহা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যাহা চাষী জন্য আনন্দদায়ক। এই ভাবে আল্লাহ মু'মিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তরজ্বালা সৃষ্টি করেন। যাহারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে আল্লাহ তাহাদিগকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন মহা ক্ষমা ও পুরষ্কারের। " (সুরা ৪৮: ২৯) ।

      আল্লাহ আমাদেরকে সে অবস্থায় পৌছার জন্য সাহায্য করেন সে দোয়া করি সবার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.