«

»

Jun ০৫

আসুন একটু ভেবে দেখি

ভূমিকা : পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আজ ১৪৩৮ হিজরি অর্থাৎ ২০১৭ সালের এই রমজান মাসে কোরআন তেলায়ত করতে গিয়ে কেন যেন মনে হচ্ছে আমারা আসলেই কোরআনকে বুঝতে চাই না। আমাদেরকে বলা হয়েছে কোরআন পড়া পুণ্যের কাজ তাই পড়ে যাচ্ছি। আমরা সবাই জানি কোরআন আল্লাহ প্রদত্ত বার্তা কিন্তু সে কথাটি কয়জনই বা বুঝতে চেষ্টা করি? আল্লাহ কোরআনকে সর্ব যুগের সকল জাতীর মানব কল্যাণে নাজিল করেছেন অর্থাৎ "হুদাল্লিন নাস" যা কোরআনেই বলা আছে। কিন্তু কোরআন যদি সঠিক পথের নির্দেশনা বা সাফল্যের রাস্তা হয়ে থাকে তাহলে মানুষ বিশেষকরে কোরআনে যারা বিশ্বাসী বলে দাবী করেন সেই মুসলিমরাই তো কোরআনকে বুঝে অনুসরণ করতে চায় না! প্রশ্ন হচ্ছে কেন?

আমি মনে করি এর প্রধান কারণ আমরা যে যুগে বাস করছি সেই যুগের সাথে রিলেট করে কোরআনকে বুঝতে বা বুঝাতে না পারায় কোরআনের আকর্ষণ মুসলিমদের মনে সৃষ্টি হচ্ছে না। তাই কোরআন যে "হুদাল্লিন নাস" অর্থাৎ মানুষের জন্য সঠিক পথ নির্দেশনা হতে পারে সে বিশ্বাস অনেকের মন থেকে বিলীন করা হচ্ছে।

আবার কোরআনকে বিশ্বাস করেন যারা তাদের ব্যর্থতা হল তারাও তাদের বিশ্বাসের যুক্তিযুক্ততা ব্যাখ্যা করতে পারছেনা এবং সে বিশ্বাসের অনুসরণে তাদের কাজে ও কর্মে এমন কোন প্রভাব ফেলতে পারছেনা যে সাধারণ লোক তাদেরকে সঠিক রোল মডেল হিসাবে গ্রহণ করতে পারে। তাই আজকের মুসলিম সমাজে বিশেষকরে যুব সমাজের মাঝে কোরআন বিমুখতার পিছনে এটিও একটি অন্যতম কারণ তা অস্বীকার করা যায় না।

আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ যদি আমাকে ৭তম শতাব্দীর চশমা দিয়ে কোরআন বুঝাতে চাইতেন তাহলে নিশ্চয় সে যুগে আমাকেও জন্ম দিতেন। কোরআনের বানীকে বর্তমান যুগের মানুষের কাছে বুঝাতে হবে বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে তথা প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে। আর তা না পারলে কোরআন সর্ব কালের ও সর্ব যুগের উপযোগী বলা যাবে কিনা ভাবতে হবে। আবেগ দিয়ে কিছু দাবী করলেই তো আর সবকিছুর সত্যতা প্রকাশ হয়ে যায় না। ফলে দেখা যায় সমাজ গঠনে কোরআনের নির্দেশ ও আদর্শকে একটি বিশেষ মহল তথা তাগুতি শক্তি পুরানো দিনের উপাখ্যান বা "কিসসা গাদিম" হিসাবেই প্রমাণ করার চেষ্টা করে। বলা হয় শরিয়া আইনের উৎপত্তি কোরআন থেকে কিন্তু সেটি তো আজ আতঙ্কের বিষয় অনেকের মনে! প্রশ্ন হচ্ছে কেন?

যারা আল্লাহর আইন চালু করার স্বপ্ন দেখেন বা বলেন তারা কি কখন কোন গবেষণা, স্টাডি বা অনুসন্ধান করেছেন কেন মানুষ সেটিকে ভয় পায় ? "ওরা কাফির ওরা অবিশ্বাসী ওরা কেন আল্লাহর আইন চাইবে" ইত্যাদি বলে অমুসলিমদেরকে গালি দেয়া সহজ কিন্তু যারা মুসলিম বলে দাবী করে তারাই তো সেটি চায় না! তখন কি বলবেন?

অতীতের বিজ্ঞ সাহাবীরা ও তাবে-তাবাইন বা জ্ঞানী গুণীরা তাদের সময়ের প্রেক্ষাপটেই কোরআন বুঝেছিলেন। আবার আজ আমারা এখন যা দেখছি আমাদের আশেপাশে এ সবের অনেক কিছু অতীতের সে জ্ঞানী গুণীদের দৃষ্টি গোচর ছিল না এবং জানাও সম্ভব ছিল না। অতএব সে প্রেক্ষিতে তাদের সকল চিন্তা চেতনাকে বর্তমান যুগের বাস্তবতার সাথে কিভাবে সমন্বয় করা যায় ভাবতে হবে।

তবে সাহাবীদের ও তাবেতাবাইনদের বা অতীতের জ্ঞানী গুণীদের ঈমানের গভীরতা, বিশ্বাসের যুক্তিযুক্ততা ও তাদের আন্তরিকতা বুঝতে হলে তাদের কথা শুনার গুরুত্ব অপরিসীম। জ্ঞান অনুসন্ধানের জন্য তাদের দৃঢ়তা ও অক্লান্ত পরিশ্রম অবশ্যই অনুকরণীয়। কিন্তু আকিদা বিশ্বাসে তাদের জ্ঞানকে সাথে নিয়ে বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতার নিরিখে কিভাবে এ যুগের মানুষের মনে ইসলামের বীজ বপন করবেন মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষাপট সামনে রেখে তা নিয়ে কি ভাবার দরকার নাই?

একদিন আমার এক বন্ধুর সঙ্গে ইসলাম বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর করুণ দুরবস্থার ব্যাপারে আলাপ প্রসঙ্গে তিনি রূপক অর্থে অতি পুরানো এক বট বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছিলেন। দীর্ঘ দিনের পুরানো গাছটি সময়ের সাথে সাথে তার প্রচুর ডাল পালা ও লতা পাতাসহ অনেক আগাছার সমারোহে আজ অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। সেথায় ভিড় জমেছে প্রচুর মানুষের কেউ আছে আগাছা বিক্রির ধান্দায় কেউবা আছে লতা পাতা বিক্রির ধান্দায় কারো সময় নাই গাছটিকে সেবা করার বা কে কি করছে তা দেখার বা বুঝার! সবাই আছে নিজের ধান্দায় ব্যস্ত! এর কারণ হচ্ছে ধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এমন এক পর্যায়ে ধর্মের বিষয়গুলোকে বাক্সবন্দী করে রাখা হয়েছে যে এর থেকে বাহির হওয়ার কোন উপায় নাই বা কোন বিকল্প নাই।

মুসলিম ঐক্যের গুরুত্ব ও ইসলামের সার্বজনীন আবেদনকে বাদ দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করাই হচ্ছে এখন মুখ্য উদ্দেশ্য। এর ফলে ধর্ম বিষয়ক অনেক বিষয়ে যে চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন আছে তার কোন গুরুত্ব নাই ধর্মীয় নেতৃত্বের কাছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের আর্থিক স্বার্থ, নাম জৌলুস ও ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এমনভাবে জড়িত যে সে চিন্তা করার দরকার নাই। অতএব সুদূর ভবিষ্যতে মুসলিম সমাজে কোন পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা খুবই কঠিন।

প্রশ্ন হচ্ছে ইসলামকে যদি আমরা একটি সার্বজনীন জীবন ব্যবস্থা বলে মানি তাহলে সেটি কি এতই হালকা যে তা বন্ধী হয়ে থাকতে হবে কারো খানকা বা সংকীর্ণ মানসিকতার খাঁচায়?

আসলে কোরআনকে বুঝতে বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপট সামনে না রেখে বুঝার অপারগতা, অনিচ্ছা এবং মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনের গুরুত্ব না বুঝার কারণে ইসলাম পালনে আজ সবাই তার নিজের মত করে একটি অবস্থান গড়ে তুলতে ব্যস্ত। আর সেই বাক্সে বন্ধী হয়ে শুধু মাত্র তার মতের বা দলের লোক ছাড়া অন্য কিছুতে এমন কি কমন ইস্যুতেও অন্য দলের সাথে এক সঙ্গে বসতে রাজি নয়। আবার এই মানসিকতা থেকে বাহির হয়ে আসার কারো কোন ইচ্ছাও নাই। অথচ কোরআনের কথা ছিল "‘ওয়াতাসিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়া’। "তোমরা শক্ত করে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না"(وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا) আলে ইমরান-১০৩ ।

তাই অনেক চিন্তাশীলদেরকে বলতে শুনি,

মুসলিম মিল্লাতকে এক দেহে লীন না হওয়া পর্যন্ত তদের সমস্যা সমাধানের জন্য কোন বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণ সম্ভব নয়। আমাদের অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ‘ওয়াতাসিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়া’-এর শিক্ষা গ্রহণ করার ফলেই এই পৃথিবীতে আমরা একটি সোনালি অধ্যায় সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। আজও আমাদের সে অভিন্ন রূপটি ফুটিয়ে তোলা ব্যতীত মুক্তির কোন প্রত্যাশা করতে পারি না। আল্লামা ইকবালের ভাষায় বলব : ‘আমাদের লাভ ও ক্ষতি এক, আমাদের নবী এক, আমাদের দীন ও ঈমান এক, আমাদের কেবলা এক, আমাদের স্রষ্টা এক, আমাদের কিতাবও এক। কিন্তু আমরা মুসলমানরা যদি এক হতে পারতাম তবে কতই না উত্তম হতো!’ মুসলিম উম্মাহকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আবার যেন সে তৌফিক দান করেন। আমিন।

এখানে আরেকটি বিষয় আলাদা করে রাখতে চাই তা হল মোহম্মদ (স:) এর প্রতি বিশ্বাস ও আস্তার ব্যাপারে মুসলিমের মনে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। কেননা আমরা সাক্ষী দেই যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই এবং মোহম্মদ (স:) আল্লাহর প্রেরিত শেষ নবী আর নবী তাঁর জীবনের কর্ম ও অর্জন দিয়ে তা প্রমাণিত করে গেছেন।

মহা পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর এ বিশাল মহা বিশ্বের অজস্র বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির মাঝে তারই সৃষ্ট এ পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে কত অসংখ্য মানুষ যুগ যুগ ধরে বাস করে আসছে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির অনুসরণে। তাদের সাথে আল্লাহ কি সিদ্ধান্ত নিবেন সেটি আল্লাহ ভাল জানেন আমাদেরকে তাদের সাথে সহবস্থান করে এ পৃথিবীকে কিভাবে একটি শান্তিময় বাসস্থান করা যায় সে চিন্তা করতে হবে। তাদের সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর কোন এক প্রান্তের জন গুষ্টির চলা ফেরা, লাইফ স্টাইল ও আচরণ দিয়ে একটি ধর্মকে সার্বজনীন বলে গ্রহণ করানো কি এত সহজ?

মাঝে মাঝে আমার মনে প্রশ্ন জাগে নবী কেন এক মাত্র কোরআন ছাড়া তাঁর নিজস্ব কথাকে লিখতে বারণ করেছিলেন। যেমনি তিনি তাঁর চেহারার ছবি আঁকতে বা রাখতে হারাম করেছিলেন। যদিও অনেকে বলে থাকেন যে কোরআনের সাথে তার কথা মিশে যাত্তয়ার আশংকা ছিল সে জন্য তিনি লিখতে নিষেধ করেছিলেন তবে এ যুক্তিও খুব একটা দূরে যাবে না কেননা আমরা যখন সাহাবীদের বিচার বিবেচনা ও মর্যাদা এত উপরে স্থান দেই যে তাদের সমালোচনা করাও যায় না তাহলে তাদের দ্বারা এমন ভুল হতে পারত মেনে নেয়া যায় না!

তবে আমার ভুল হতে পারে যখন মনে হয় নবীর অনেক কথা ছিল সদ্য জাহেলী যুগ অতিক্রম করে আসা ৭তম শতাব্দীর একটি বিশেষ সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে যার সব কিছু পরবর্তী যুগের মানুষের জন্য দরকার হবে কিনা তা ভেবে হয়তবা লিখতে বারণ করে ছিলেন। এখানে হাদিসের ব্যাপারে চিন্তা পরিবর্তিত বা আগ্রহ শিথিল করার কথা হচ্ছে না বরং আসল কথা হল কোন বিষয়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে এবং অন্তর্নিহিত অর্থের মর্ম না বুঝে কিংবা কোন বিশেষ যুগের কোন ব্যাখ্যা বা interpretation কে সর্বযুগের সকল ক্ষেত্রে প্রযোয্য হতে পারে কিনা তা বুঝতে না পারলে সমস্য হওয়ারই কথা।

তাই সমস্যা হদিসে নয় বরং সে হাদিসের Text এর ব্যাখ্যা বা interpretation। Paradigm shift বলে যে বাস্তবতা সেটি বিবেচনায় আসছে কি না দেখতে হবে।  তাই দেখা যায় ইসলামের বাধ্যতামূলক আদেশ পালনের চেয়ে ঐচ্ছিক (Optional) বিষয় হয়ে গিয়েছে আজ সবচেয়ে গুরুত্বের ব্যাপার।

অতএব কোরআন বা হাদিসের অনেক কথা ও কাহিনী যে সদ্য জাহেলী যুগ থেকে বাহির হয়ে আসা প্রিমিটিভ একটি জন গুষ্টির অবস্থা তথা তখনকার স্পেসিফিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সামনে রেখেই নাজিল হয়নি তা কি আমরা বলতে পারি? কোরআনের কোন আয়াতের শানে নাজুল দেখে আমরা কি দেখতে পাই? তাই তখনকার যুগের সেই মানুষদেরকে বলা সকল কথা এখনও হুবহু প্রযোয্য হবে কিভাবে বা কেন সে চিন্তা করারও প্রয়োজন আছে বলে যদি আমরা স্বীকার না করি তা হলে অবস্থা কি দাঁড়াল? কোরআনকে "হুদাল্লিন নাস" তথা বিশ্বজনীন সকল মানুষের জন্য একটি জীবন ব্যবস্থা হিসাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলাম নয় কি?

এবাদতের মৌলিক আকিদাগত সাধারণ বিষয় ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের তখন আর এখন এর মাঝে যে বিরাট তফাৎ থাকতে পারে সে ব্যাপারটি বিবেচনার কি দরকার নাই? তাই সেই সপ্তম শতাব্দীর চিন্তা ভাবনার সবকিছুকে ২১ শতাব্দীর এ যুগের মানুষের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করাতে সতর্ক হতে হবে। আর এ বিষয়টি বুঝতে হলে আধুনিক দর্শন, সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন, শিল্প বিপ্লব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ কিভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে তা বিবেচনা করার যোগ্যতা অর্জন একান্ত জরুরী। আর এ অবস্থা বুঝার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে আমার বন্ধুর দেয়া মুসলিম উম্মার সেই বট বৃক্ষের উদাহরণ! অতএব উপরোক্ত প্রেক্ষাপট সামনে রেখে আসুন আমার শুরু করি কোরআন বুঝা।

পরিশেষে, খুশীর খবর হচ্ছে শিক্ষিত মুসলিম সমাজের নতুন প্রজন্মের মাঝে এসব বিষয়ে এখন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।
নিচে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্র সংস্থার আয়োজিত "ইসলামী সংস্কারের পুনর্বিবেচনা" শীর্ষক একটি সেমিনারে আধুনিক ইসলামী স্কলারদের কথা শুনলে বুঝা যায় পরিবর্তনের প্রত্যাশায় তাদের মনেও চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। তাই আশা করি হয়তবা সুদূর ভবিষ্যতে আমরা সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দেখতে পাব।

 

৩ comments

  1. 2
    মহিউদ্দিন

    এ প্রসঙ্গে পাঠকদের উদ্দেশ্যে আরো কিছু অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে চাই:
     

    বিশ্বাস এক জিনিষ আর ধর্ম বুঝা আরেক জিনিস এই দুয়ের সমন্বয়ে কেউ হতে পারে বিশুদ্ধ চরিত্রের সঠিক ধার্মিক। তবে কেবল বিশ্বাস কাউকে করতে পারে ধর্মান্ধ বা ফ্যানাটিক ! আবার বিশ্বাস ছাড়া শুধু ধর্ম বুঝার প্রয়াস করতে থাকলে কেউ হয়ে যেতে পারেন অজ্ঞানবাদী।

    খোদাকে চিনতে হলে অবশ্যই বিশ্বাস বা ঈমানের দরকার সে ক্ষেত্রে ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমাম গাজ্ঝালির তোলনায় বিশ্বাসে বাগদাদের সেই বৃদ্ধা মহিলা হতে পারেন উত্তম।

    আবার ধর্মের নিয়ম নীতি বা নির্দেশ বুঝার ক্ষেত্রে পাড়া গায়ের সেই পুকুর পারের ইমাম সাহেবের বুঝা ধর্ম নীতি আর ইমাম গাজ্ঝালির বুঝা তো এক হতে পারেনা।

    বানর যখন কাউকে ঢিল ছুড়তে দেখে সেও ঢিল ছুড়ে সেটিকে বলা হয় নাবুঝে অনুকরণ (just imitation) আর ধর্ম পালন যখন এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখনই শুরু হয় ধর্মান্ধতা যা সমাজ বা ধর্মের কোন কাজে আসেনা। অর্থাৎ ধর্মের নির্দেশের অন্তর্নিহিত মর্ম না বুঝে অনুসরণ করাকে আসল ধার্মিকতা বলা যাবে না।

    এবার আসি ইসলামে জিহাদ ফরজ নিয়ে কিছু কথা বলা। আমরা জানি জিহাদ ইসলামের একটি জরুরী নির্দেশ যা পালন করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য যদিও জিহাদের অর্থ হচ্ছে কোন কিছু অর্জনের জন্য সংগ্রাম করা যা শুধু শত্রুর সাথে সামরিক যুদ্ধ বুঝায় না। নিজের নফসের সাথে জিহাদও হচ্ছে বড় জিহাদ যা কোরআন হাদিসে বলা আছে।

    তবে জিহাদ মানে যদি শত্রুর সাথে যুদ্ধকেই বুঝায় তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে ৭ম শতাব্দীর সে জিহাদের যে স্বরূপ ছিল সেটি কি ২১ শতাব্দীতে সমান হতে হবে?

    মনে করেন রাসুল (স:) এর যুগে মুসলমানদের অবস্থা ছিল বর্তমান যুগের প্রযুক্তিতে পারদর্শী তখন শত্রু হত্যা করতে যদি ওহুদের ময়দানে সশরীরে না গিয়ে ড্রোন আবিষ্কার করে ঘরে বসে শত্রুকে আঘাত করতে পারত তাহলে সেটিকে কি বলা হত মুনাফেকি? সেটি কি জেহাদ হত না?

    জিহাদের জন্য যদি এতই জজবা থাকে তাহলে আগে বিশ্বাস ও ধর্ম নির্দেশের অন্তর্নিহিত মর্ম বুঝতে হবে। পরিবর্তিত এ বিশ্বে নিজেদেরকে জ্ঞান বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে পারদর্শী করার জন্য জিহাদ করতে হবে আগে তার পর যুদ্ধের জিহাদের কথা আসতে পারে।

    তবে জিহাদের আহ্বান কে দিতে পারে, জিহাদ কখন কিভাবে ফরজ হতে পারে এবং জিহাদ আর আত্মহত্যা যে এক নয় তা আগে বুঝতে হবে, জঙ্গিপনা, নিরাপরাধ মানুষ হত্যা বা সন্ত্রাস ছড়ানো যে ধর্ম হতে পারেনা তা বুঝতে হবে।

    জিহাদের ৭ম শতাব্দীর স্বরূপ যে এখন অকেজো সেটি বুজতে হলে সেই গ্রামের পুকুর পারের ইমামের বুঝা ইসলাম আর ইমাম গাজ্ঝালির বুঝা ইসলাম যে এক হতে পারেনা সেটি বুঝার চৈতন্য না থাকলে কি আর করা যায়? অন্যায় অত্যাচার হচ্ছে বলে জিহাদের নামে যুবসমাজকে রেডিক্যাল হওয়ার আহ্বান যে হারাম তা সবাইকে বুঝাতে হবে।

  2. 1
    মাহফুজ

    আপনার প্রবন্ধের বাস্তবধর্মী মূল বক্তব্যের সাথে সহমত। স্পষ্টভাবে বলার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

    অনেক আগে থেকেই আমিও এ কথাগুলোই বলার চেষ্টা করছি। আর এ কারণে আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেন- Are you 'Ahle-Quran'? / আপনি কি ভ্রান্ত 'আহলে-কুরআন'?

    1. 1.1
      মহিউদ্দিন

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.