«

»

Sep ১৭

আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান চর্চা

মানুষের জ্ঞান অর্জনের জন্য মহান আল্লাহ দুটি উৎস রেখেছেন। 

১) একটি হচ্ছে এ পৃথিবীতে মানুষের তার নিজস্ব বৈষয়িক প্রচেষ্টায় ও গবেষণা লব্ধ জ্ঞান যাকে বলা যায় অর্জিত জ্ঞান বা acquired knowledge 

২) আরেকটির হচ্ছে ঐশী উৎস divine source থেকে আসা যাকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় "ইলম্ উল ওহি" বা ওহির জ্ঞান। 

প্রথমটির জন্য মানুষের পরিশ্রম  ও চেষ্টা সাধনা লাগলেও তাতে জ্ঞানী বা পারদর্শী হতে উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা বা সততার খুব একটা দরকার হয়না। আর দ্বিতীয়টা, ওহির জ্ঞান অর্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টা সাধনার সাথে কিন্তু  উত্তম চরিত্র ও সততা, আন্তরিকতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার খুব বেশী প্রয়োজন। সে গুণাবলী কারো চরিত্রে না থাকলে তার পক্ষে   ঐশী জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই ওহির জ্ঞান সবার পক্ষে অর্জন করার ভাগ্য হয় না। আর ওহী জ্ঞানের ওস্তাদ হওয়ার দায়িত্ব আল্লাহ তার নবী রসুলকে দেন এবং তাদের দেয়া শিক্ষা ও পন্থা অনুসরণ করে অন্যরা তা সে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। 

তবে এই উভয় জ্ঞানের সমন্বয় ছাড়া যখন কোন সভ্যতাকে গড়ার প্রয়াস চলে সেথায় সত্যিকার অর্থে মানব কল্যাণ আসতে পারে না। ফলে এ বিশ্বে একটি ন্যায্য সমাজ ব্যবস্থা এবং  সুসম অর্থনৈতিক ও শোষণ-মুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা সহ বিশুদ্ধ মানব সভ্যতা গড়া অসম্ভব। আর এ উপলব্ধি বা ভাবনা (cogitation) আসতে পারে একমাত্র ঐশী জ্ঞান চর্চায়।

এটা দুর্ভাগ্যজনক যে বর্তমান সভ্যতা সেই ঐশী জ্ঞান চর্চাকে পরিত্যাগ করে কেবল মাত্র বৈষয়িক জ্ঞানের ভিত্তিতে চলতে চায়। এই সভ্যতার সার্বিক অগ্রাধিকার হচ্ছে প্রকৃতি, মানব দেহ এবং পদার্থ বিজ্ঞান তথা material world বিষয়ক মানুষের অর্জিত জ্ঞান নির্ভর। যা দিয়ে মানুষ তথ্য প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা শাস্ত্র সহ অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে ব্যবহার করতে পারে। সেই সাথে মানুষ একে অন্যের উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণহত্যার বিভিন্ন অস্ত্র তৈরির শিল্প গড়ে পারমানবিক মরনাস্ত্র পর্যন্ত তৈরি করে আরো শক্তিশালী হতে চাচ্ছে। এখানে শুধুমাত্র মানুষের দৈহিক আরাম আয়েশের দিকেই সবার নজর এবং ঐশ্বরিক জ্ঞান ভুলে যাওয়া ও সে চর্চা এড়িয়ে যাওয়া বা অগ্রাহ্য করাটাই হচ্ছে আসল লক্ষ্য। যদিও বিশ্ব মোড়লদেরকে মানবতা, ন্যায়বিচারের  যৌক্তিকতা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় কিন্তু এইগুলি শুধু চমৎকার শব্দের কিছু বুলি উচ্চারণ করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন বিশেষ গোষ্টির স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে থাকেনা! 

তাই আজ এই সভ্যতায় এমন এক ক্ষমতাধর গ্রুপের সৃষ্টি হতে পেরেছে যারা জানে কখন কিভাবে তথাকথিত Nation states এর উপাসনা ও নানা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে অর্থ কামাই করে লাভবান হওয়া যায়। ওরা পর্দার আড়াল থেকে কাজ করে। ওরা পারে অন্যকে যুদ্ধে জড়ায়ে নিজেদের ব্যবসায় লাভবান হতে। বর্তমানে মিয়ানমারে উগ্র সন্ত্রাসি বৌদ্ধদের ভয়াবহ বর্বরতা তার আরেক প্রমাণ।  তবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় তারা সরাসরি সামনে না আসলেও তাদের শিকারের নিশানা যে দেশ সমুহের দিকে যায় সেখানে শুরু হয় "প্রক্সি ওয়ার" সে সব যুদ্ধের তারা আবার উভয় পক্ষের সাথে হাত মিলায়। যেমনটি আমরা দেখেছি সিরিয়ায়, লিবিয়া ও ইয়েমেস সহ আরব বসন্ত উত্তর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বেলায়। তবে মাঝে মধ্যে তাদের মুখোশ যে খুলে যায় না তেমন নয়  কিন্ত কারো কিছু করার থাকে না। কেননা মানুষ ঐশী জ্ঞান থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছে!

অতএব মানুষের আচরণ নিখুঁত করতে ঐশী জ্ঞানের বিকল্প নাই। তবে এ ব্যাপারে একমাত্র মুসলিমরাই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে কেননা তাদের কাছে ঐশী জ্ঞানের যে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (স:) বিশেষ করে ওহির বানী আল কোরআন যা এখনও আছে অবিকৃত! শুধু প্রয়োজন সে কথাগুলির সঠিক ব্যাখ্যা এবং সঠিক অনুধাবন। কিন্তু কারা বুঝতে চায় কোরআনকে দার্শনিক দৃষ্টিতে? আর কারা বুঝতে চায় শুধু আক্ষরিক অর্থে এবং কেন? সেটি বুঝতে না পারাটই হচ্ছে ঐশী জ্ঞান লাভের আজ সবচেয়ে বড় অন্তরায়!

তবে ঐশী জ্ঞানের শিক্ষা ছাড়া শুধু পদার্থের বা প্রকৃতির অনুসন্ধানের মাধ্যমে সষ্ট্রাকে আবিষ্কার করার কোন উপায় নেই, এটা সম্ভব হত যদি সষ্ট্রা পদার্থের অংশ হতেন। ঐশী জ্ঞানের দর্শন এটা কখনও বলে না যে যে সৃষ্টি-জগত নিয়ে কেউ গবেষণা করতে পারবে না। শুধু সৃষ্টি জগতের এ গবেষণায় যেন সভ্যতা এমনভাবে ডুবে না যায় যে সৃষ্টি জগতের সষ্ট্রাকেই সে ভুলে যায়! তাই একমাত্র ঐশী জ্ঞান তথা ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান দিয়েই মানুষ তার সষ্ট্রা সম্পর্কিত “জ্ঞান” লাভ করতে সক্ষম হয় এবং মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি বা purpose of life" বলতে কিছু থাকতে পারে সে চিন্তার উদয় হয়। তখন তার পক্ষে বুঝা সম্ভব যে, "এই বিশ্ব বিপরীতধর্মী বস্তুর সমন্বয়ে অস্তিত্বশীল, এবং মানুষ সেই বৈপরীত্যের প্রকৃতি ধারণ করে, কেননা সে এই জগতের অংশ। তাই মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এজন্য শিল্প-সাহিত্য, দর্শন, আইন, সাধারণ চিন্তা-চেতনা সবকিছুতেই থাকে তাদের পার্থক্য ও দ্বিমতের স্থান। ধর্মেও সেই পার্থক্য রয়েছে। তবে স্রষ্টার ব্যাপারে ভিন্ন মত থাকলেও ‘স্রষ্টা আছেন” –এমন ধারণায় সকল ধর্মের ঐক্য রয়েছে। বিয়ে-শাদি, সামাজিক সম্পর্ক, আর্থিক লেন-দেন, ভাল-মন্দ, পাপ-পুণ্য ইত্যাদি অনেক বিষয়ে তাদের ঐক্য রয়েছে। সুতরাং নাস্তিকরা অনৈক্য নিয়ে যেসব কথা বলে সেগুলোও অনেকটা ফালতু। মানুষ ধর্ম ত্যাগ করলেই তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, এই ধারণা শুধু ফালতুই নয় বরং “মূর্খ”।

প্রশ্ন হতে পারে "ঐশী জ্ঞান তো  অনেকেই দাবী করতে পারে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক?" এ প্রশ্নের উত্তর তখনই আসবে যখন আমরা ইসলামকে জানতে পারব। কোরআনকে বুঝতে পারব। বস্তুত এরকম পরিস্থিতে মুসলিমরা কিভাবে অগ্রসর হতে হবে তার নির্দেশ আল্লাহ কোরআনে বলে দিয়েছেন:

Say: "O People of the Book! come to common terms as between us and you: That we worship none but Allah. that we associate no partners with him; that we erect not, from among ourselves, Lords and patrons other than Allah." If then they turn back, say ye: "Bear witness that we (at least) are Muslims (bowing to Allah.s Will).

বলুনঃ ‘হে আহলে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস-যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান-যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।

Ref:

Why we need islam ?

Why do we need Prophets?

৫ comments

Skip to comment form

  1. 3
    মহিউদ্দিন

    আরো কিছু কথা বলা দরকার। আলবার্ট আইনস্টাইন একজন বড় মাপের বৈজ্ঞানিক ছিলেন যিনি আমাদেরকে জানিয়েছেন  "নির্ভরশীলতার তত্ব" ও "আপেক্ষিক তত্ব" ইত্যাদি। বিজ্ঞান মানুষের মানবিক সত্তাকে কতটুটু উন্নত করতে পারে সে ব্যাপারে তার বক্তব্য ছিল,

    "To be sure, it is not the fruits of scientific research that elevate a man and enrich his nature." — (Albert Einstein -- The World as I see it. page 9).

    তাঁর কথাটা নিয়ে আমি চিন্তা করলাম। আসলেই বিজ্ঞানের উন্নতি ও আবিষ্কার মানুষের মনকে উন্নত করতে পারে না এবং তার স্বভাবকেও সমৃদ্ধ করে না । মানুষের মনের রোগ সেই অতীতে যেমন ছিল আজও সেই রকম আছে। একে পরিষ্কার করতে নৈতিকতার প্রয়োজন এবং তা ঐশী শিক্ষা থেকে নিতে হয়। আল কোরআন আল্লাহ প্রদত্ত বানী যার মাধ্যমে মানব জাতী ঐশী জ্ঞানের শিক্ষা পায়। এই কোরআন অনুসরণ করেই আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (স:) তার জীবনে সফলকাম হয়েছিলেন  তারঁ অনুসারীরাও এক সময় সভ্যতা গড়তে সক্ষম হয়েছিল ইতিহাস সে প্রমাণ দেয়।

    তবে এই কোরআন কিছু লোকের কাছে তখন যেমন পুরানো কালের কিচ্ছা কাহিনী ছাড়া কোন আবেদন রাখতে পারেনি (অবিশ্বাসীদের মাইন্ড সেট কেমন ছিল ওরা কি বলত তা কোরআন পড়লেই পাওয়া যায়) আজও তাই কোরআন অনেকের কাছে তা্ই মনে হয় এবং সেটি তথাকথিত মুসলিম সমাজেই বেশী দেখা যায়। ফলে ভণ্ডামি, মুনাফেকি, অসাধুতা, নৃশংসতা ও আত্মম্ভরিতা সহ বিভিন্ন পাপিষ্ঠ প্রকৃতির খারাপ প্রভাব মুক্ত করে তাদের মনকে পরিষ্কার করতে পারেনি! 

    এ প্রসঙ্গে নাস্তিককুলের মিলিটেন্ট ব্লগার ও তথাকথিত মুক্তমনাদের কাছে আমার প্রশ্ন তোমরা দিনে রাত্রের ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বের বস্তুবাদী সভ্যতার মোড়লদের তথা তাগুতি শক্তির চক্ষুশূল ইসলামী  আদর্শের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও তথ্য-সন্ত্রাসে যোগ দিয়ে নিজেদেরকে যে মহা পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী বলে জাহির করতে চাও তা না করে মানব জাতীর কল্যাণে কোন বিকল্প সমাধান নিয়ে আস না কেন? অর্থাৎ এ পৃথিবীতে আসলেই অন্যায় অত্যাচার, শোষন, বঞ্চনা, স্বার্থপরতা, অবৈধ দেশ দখল, অস্ত্র ব্যবসা, আধিপত্য-বাদ, স্বৈরাচার, দুর্নীতি, বর্ণবাদ ও বৈষম্য, জাতিগত নির্মূল (ethnic cleansing) ইত্যাদি অপকর্মে যেভাবে গণহত্যা চলছে এ সবের অবসানে কোন সমাধান বা শাসন ব্যবস্থা নিয়ে আস যা মানুষ অনুসরণ করতে পারে। আর তা না পারলে তোদের মূর্খতা বন্ধ কর and get lost!

  2. 2
    Abdus Samad

    অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    1. 2.1
      মহিউদ্দিন

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ।

  3. 1
    nomantutul

    আবুল হাসান আলী নদভীর 'ধর্ম ও কৃষ্টি' বইটি নিশ্চই পড়েছেন।
    আপনার কাছ থেকে বইটির বিষয়বস্তুর মূল্যায়ন আশা করছি যা আপনার লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক।

    1. 1.1
      মহিউদ্দিন

      ভাই,  আবুল হাসান আলী নদভীর 'ধর্ম ও কৃষ্টি' বইয়ের লিংক দেয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। এ বইটি এখনও পড়া হয়নি। ইনশাল্লাহ চেষ্টা করব ভবিষ্যতে সময় সুযোগে পড়তে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.