«

»

Apr ১২

অন্ধ সাহাবি রাঃ কর্তৃক দাসী হত্যা সংক্রান্ত হাদিস নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ

আমার “কাব আল আশরাফ এবং আব্দুল্লাহ বিন খাতাল হত্যা প্রসঙ্গে আমার পর্যবেক্ষণ” ব্লগে আমি যে সব তথ্য তোলে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলাম সে পর্যবেক্ষণ ভুল প্রমাণ করতে নুর সাইদ নামক এক ভাই তার দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নিম্নের হাদিসটি আমার ফেসবুক কমেন্টে তোলে ধরেছেন। তিনি অবশ্য আরবী ভাষায় তোলে ধরেছিলেন তার বাংলা ভার্সন নিম্নে তোলে ধরেছি। আসুন দেখি এই হাদিস নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ কি আসে?

 

আবু দাউদ [৪৩৬১] ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, একজন অন্ধ ব্যক্তির অধীনে একজন দাসী (উম্ম ওয়ালাদ) ছিলো। এই মহিলা রাসুল(সা:) কে অভিশাপ দিতো এবং তাকে সাবধান করার পরও সে বিরত হতো না। এক রাতে সে রাসুল(সা:) কে অভিশাপ দিতে শুরু করলে, সেই অন্ধ ব্যক্তি একটি ছুরি নিয়ে তার পেটে বিদ্ধ করলেন এবং ভিতরে চাপ দিতে লাগলেন যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। সকালে রাসুল(সা:) এর কাছে খবর পৌছুলো। রাসুল(সা:) লোকজনকে একত্রিত করে বললেন, আমি আল্লাহর নামে তোমাদের আদেশ করছি, যে কাজটি করেছো উঠে দাঁড়াও। অন্ধ ব্যক্তিটি উঠে দাঁড়ালেন এবং হেঁটে রাসুল(সা:) এর সামনে এসে বসে পড়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমিই সেই ব্যক্তি যে কাজটি করেছে। সে আপনাকে অভিশাপ দিতো এবং তাকে বিরত থাকার কথা বলার পরও সে বিরত হতো না। তার থেকে আমার মুক্তার মত দুটি সন্তান আছে এবং সে আমার প্রতি খুব সদয় ছিলো। কিন্তু গত রাতে সে আপনাকে অভিশাপ দিতে লাগলো। তাই আমি একটি ছুরি নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে দিলাম এবং মৃত্যু না পর্যন্ত তা চেপে ধরে রাখলাম। রাসুল(সা:) বললেন, জেনে রেখো, তার জন্য কোন রক্ত মূল্য নেই”।

আপনারা জানেন যে হাদিসের দুইটি অংশ থাকে একটি সনদ আর একটি মতন।  উপরে হাদিসে যে কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে মতন আর যিনি মারফত আমরা এই কাহিনী জানতে পারছি তাকে রাবী বলে এবং রাবীদের সিলসিলাকে সনদ বলে।

হাদিস বিজ্ঞান সম্পর্কে যারা সামান্য জ্ঞান রাখেন তারা জানেন যে, সহি হাদিস বলতে যে হাদিসের রাবীদের প্রত্যেকে নির্ভর করা যায় তাদের সনদকে সহি হাদিস বলে, অনেক সময় সহি হাদিসের মতন সহি নাও হতে পারে বা মতনের উপর সন্দেহ থাকতে পারে।

 আমাদের হাদিস বিশেষজ্ঞগণ উপরের হাদিসের সনদকে সহি বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন কিন্তু কেউ কেউ মতনকে দুর্বল বলে মনে করেছেন।  হাদিসে অনেক প্রকার আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে খবরে ওয়াহিদ। মানে যে হাদিসটি শুধুমাত্র একজন সাহাবী রা: এর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় তাকে খবরে ওয়াহিদ হাদিস বলে থাকে।

উপরের হাদিসটিও খবরে ওয়াহিদ হাদিস। এর বর্ণনাদাতা হচ্ছেন মাত্র একজন আর তিনি হচ্ছেন ইবনে আব্বাস রা: শুধু তাই নয় এই হাদিসটিও শুধু মাত্র একজন রাবী ইকরামা ইবনে আবু জাহেল রা: তিনি বর্ণনা করে গেছেন, ইবনে আব্বাস রা: এর বর্ণনা কৃত হাদিস টি ইকরামা রাঃ ছাড়া অন্য কেউ ইবনে আব্বাস রাঃ এর কাছ শুনেছেন বলেও কেউ বলে যাননি। আবার ইকরামা রা: এর কাছ থেকে  এই হাদিস এর একমাত্র শ্রোতা হচ্ছেন উসমান আল শাহ হাম  নামক ব্যক্তি ; অন্য কেউ এই হাদিসটি ইকরামা রা; এর কাছ থেকে শুনেছেন বলেও ইতিহাসে রেকর্ড নেই ।

পাঠক লক্ষ্য করুণ এই হাদিসের বর্ণনায় তিন প্রজন্মে একজন একজন করে রাবী ছিলেন। তদূপরি  হাদিস বিশেষজ্ঞগণ এই ৩য় রাবী উসমান আল শাহ হাম এর   বর্ণনা কৃত সকল হাদিস গ্রহণ করেননি কিছু গ্রহণ করেছেন কিছু বর্জন করেছেন; তিনি যে নির্ভেজাল রাবী ছিলেন না এর থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়।  

এধরণের একটি ঘটনার বিচারের রায় ফজরের নামাজের শেষে মসজিদের নববীতে মুসল্লিদের সামনে দিলেন সে ঘটনার বর্ণনা যে আর কোন সাহাবী কেরামদের মধ্যে থেকে এলোনা সেটি আমার কাছে অবাক করার মত ব্যাপার বটে।

উপরে বর্ণিত হাদিসটি ঘটনার প্রকৃত সময় জানা না গেলেও হাদিসের ঘটনার দ্বারা অনুমান করা যায় যে, তা হিজরতের প্রথম দিকে মদিনায় ঘটে ছিলো। আমাদেরকে এই হাদিসের প্রেক্ষাপট বিচার বিশ্লেষণ করতে হলে আমরা যার মাধ্যমে এই হাদিসটি পেয়েছি ঐ ঘটনার সময় তার অবস্থান সম্পর্কে জানা থাকা উচিত। ইবনে আব্বাস রা: জন্ম হিজরতের তিন বছর আগে হয়েছিলো এবং রাসুল সা: এর ইন্তেকালের সময় উনার বয়স মাত্র বারো তের ছিলো। তাই হাদিসের ঘটনার সময় ইবনে আব্বাস পরিণত বয়সের ছিলেন না।

হাদিসে বলা হচ্ছে মহিলাটি অন্ধ সাহাবীর উম ওলদ ছিলো। তার মানে মহিলাটি দাসী ছিলো সন্তান জন্মানোর কারণে সে আজাদ মহিলাতে পরিণত হয়। আমরা আরো এই হাদিস থেকে জানতে পারি এই মহিলার গর্ভে এই লোকটির দুটি সন্তান ছিলো। যদি মহিলা মুসলিম দাসী হতো তাহলে তা নিশ্চয় উল্লেখ থাকতো কারণ ইসলাম গ্রহণের পর যদি কেউ রাসুল সা: গালাগালি করে তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যায়। কোন মুরতাদের সাথে মুমিনের স্ত্রী বা উপপত্নীর সম্পর্ক থাকতে পারেনা। সে কারণে এই মহিলা মুসলিম যে ছিলোনা তা বুঝা যায়। মুশরিক নারীর সাথেও কোন মুসলিম বিয়ে কিংবা উপপত্নীর সম্পর্ক থাকতে পারেনা। তাহলে বুঝা যাচ্ছে এই নারীটি ইহুদী ছিলো আর যখন অন্ধ সাহাবী জানাচ্ছেন তিনি মহিলাটির মালিক তার মানে মহিলাটি যুদ্ধবন্দীনী থেকে উপপত্নী হয়েছিলো।

ইবনে আব্বাস রা ৮/৯ বছর বয়সের সময় খন্দকের যুদ্ধ হয়েছিলো এই সময় বনু কুরাইজাহর সব সক্ষম পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো, নারী আর শিশুদেরকে দাস করা হয়েছিলো। এই মহিলাটি তাদের মধ্যে একজন হতে পারে। তার আপনজন হারাবার কারণে হয়তো এই মহিলাটি রাসুল সা: এর শানে গালমন্দ করত।

এই মহিলা যে কাব আশরাফ বা খাতালের দাসীদের মত  নামকরা রাসুল সাঃ এর বিদ্বেষীদের কেউ ছিলোনা তা বুঝা যায় । সে যদি নামকরা রাসুল সাঃ বিদ্বেষী হতো তাহলে নিশ্চয় মদিনার আরো অনেকে জানতো এবং রাসুল সা: এর কাছে এর বিরুদ্ধে নালিশ জানাতো কিংবা রাসুল সা: এই মহিলাটিকে জানতেন।

হাদিস থেকে বুঝা যায় যে রাসুল সাঃ  নিহত মহিলাটি যে অন্ধ সাহাবীর উপপত্নী ছিলো তাও তিনি জানতেন না। জানলে তিনি এই বলে -আমি আল্লাহর নামে তোমাদের আদেশ করছি, যে কাজটি করেছো উঠে দাঁড়াও। তিনি যদি জানতেন যে অন্ধ সাহাবীর বাড়িতে মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে তাহলে তিনি প্রথমই অন্ধ সাহাবীকে জিজ্ঞাসা করতেন। কিন্তু তিনি যে ভাবে প্রশ্ন করলেন হুকুম দিলেন তাতে বুঝা যায় মহিলার লাশ হত্যার কাণ্ড ঘটার স্থানে ছিলোনা তাই অজ্ঞাত লাশের মতই তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতে চাইছেন।

যখন অন্ধ সাহাবী জানালেন তিনি কি কারনে মহিলাকে হত্যা করেছেন রাসুল সাঃ ঘটনা যে আকস্মিক ভাবে ঘটে গিয়েছে তা বুঝতে পারলেন। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমা করার মালিক তিনি অন্ধ লোকটিকে ক্ষমা করে দিলেন।  রায় দিলেন- জেনে রেখো, তার জন্য কোন রক্ত মূল্য নেই।

শরিয়তের দৃষ্টি দিয়ে যদি বিচার করা হয় তাহলে আমরা দেখতে পাবো কেন এই হত্যার জন্য কোন শরিয়ার শাস্তির বিধান প্রয়োগ করা হয়নি –

১- মহিলাটি জিম্মি ছিলো

২- মহিলাটি ঐ লোকেরা মালিকায় ছিলো

৩- মুসলিমরা কিতাবি নারীদেরকে উপপত্নী বা পত্নী করে রাখতে পারে তবে এর জন্য কিছু শর্ত মেনে চলার চুক্তি করতে হবে।

৪- অমুসলিমরা মুসলিম দেশে বাস করতে হলে কিছু শর্ত মেনেই বাস করতে হবে।

৫- ঐ সময় মুসলিমরা ইহুদীদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় ছিলো।

কাজেই মুসলিমদের দেশে বাস করে শর্ত মেনে মুসলিম ব্যক্তির ঘরে বাস করে কোন বিধর্মীদের অধিকার নাই মুসলিম শাসক রাসুল সা: এর শানে গালি দেয়া। যেহেতু মহিলাটির মালিক ছিলো অন্ধ সাহাবী এবং চুক্তির শর্ত মেনেই মহিলা তার ঘরে ছিলো মহিলাটি রাসুল সাঃকে গালাগালি করার কারণে শর্ত ভঙ্গ করে। লোকটি নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরেই মহিলাকে হত্যা করে ফেলে। রাসুল সা: মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক হিসাবে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। হয়তো আরো কোন কারণ থাকতে পারে। যেমন ইবনে উমর রা: পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ঘাতক আবু লুলুর নাবালক কন্যা সহ কয়েকজনকে হত্যা করে বসেছিলেন। উসমান রা: অবস্থা বুঝতে পেরে নিজের তহবিল থেকে রক্ত মূল্য পরিশোধ করে ইবনে উমর রা: ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। উসমান রা: ইবনে উমরকে ক্ষমা করে দেবার অর্থ নয় যে ইবনে উমর যা করেছিলেন তা ঠিক ছিলো, যে কেউ আপন জনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে হত্যাকারীর আপনজনকে হত্যা করতে পারবে।

ঠিক তদ্রূপ ভাবে অন্ধ সাহাবী কর্তৃক তার উপপত্নী হত্যাকাণ্ড থেকে তাকে ক্ষমা করার মাধ্যমে কেউ রাসুল সা: গালি দিলেই তা হত্যাকে বৈধ করার দলিল হতে পারেনা। আসলে এই হাদিসে বর্ণনা কৃত ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা বলেই আমি মনে করি।

সবচেয়ে বড় কথা খবরে ওয়াহিদ হাদিসকে দলিল করে মানুষকে হত্যার মত বড় দণ্ড দান করা ইসলামের ইনসাফ আর ন্যায় বিচারের মধ্যে পড়েনা।

২ comments

  1. 2
    শাহবাজ নজরুল

    চমত্কার বিশ্লেষণ করেছেন। হাদিসখানি আহাদ কিনা দেখে নিয়েন -- মনে হচ্ছে অনেক ইস্নাদ থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। আল- আলবানী হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। দুর্বল বলার কারণ হচ্ছে হাদিসটি মুরসাল। একটু দেখে নিয়ে আরেকটু গুছিয়ে লিখে রেখে দিলে আমাদের সবার উপকার হত। ভেবে দেখেন (1, 2)। 

    আর এখানে 

    পাঠক লক্ষ্য করুণ এই হাদিসের বর্ণনায় তিন প্রজন্মে একজন একজন করে রাবী ছিলেন।

     

    তিন প্রজন্ম বললে একটু বিভ্রান্তি আসতে পারে। প্রজন্ম হিসেবে ইবন আব্বাস (রা.) ও ইকরামা বিন আবি জাহল (রা.) উভয়ই সাহাবী ছিলেন। সেই অর্থে উসমান তাবেয়ী প্রজন্মের রাবী।

     

  2. 1
    Shahriar

    Very good write.. Well thought.

Leave a Reply

Your email address will not be published.