«

»

Dec ১০

মরক্কোর রোজনামচা- ৩

পর্ব ২

বৃহস্পতিবার দুপুরে রমেশ চোপড়া আমার হাতে দুবাই ফিরে যাবার রিটার্ন টিকেট দিয়ে জানায়; আজ সন্ধ্যায় আমি দুবাই ফিরে যাচ্ছি!

 যাক এবার বস তার কথা রেখেছেন।

সন্ধ্যায় কুয়েত এয়ার লায়ন্সের এ-৩২০এয়ার বাসে করে, কুয়েত ইন্টারন্যাশনাল এয়ার পোর্ট থেকে মাত্র এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় দুবাই আল মাখতুম ইন্টারন্যাশনাল এয়ার পোর্টে পৌঁছে যাই।  যখন এয়ারপোর্ট ছেড়ে বাইরে আসি তখন আমার কলিগ মশাহিদ চৌধুরী ভাইকে অপেক্ষারত দেখতে পাই, তিনি সারজাহ ফ্যাক্টরি থেকে আমাকে নিতে এসেছেন।

মশাহিদভাই গাড়ি চালানোতে দক্ষ বিধায়  এয়ার পোর্ট থেকে শেখ মুহাম্মদ জায়েদ রোড দিয়ে মাত্র ২৬ মিনিটের মধ্যে শারজার ফ্যাক্টরি গেটে পৌঁছে দিলেন।

আমি যখন অফিস আর ফ্যাক্টরির সংযোগ দরজা ঠেলে ফ্যাক্টরিতে প্রবেশ করি তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা ৯ টা। তখনও ফ্যাক্টরি ওভারটাইম কাজ চলছে।

আসলে শারজার ফ্যাক্টরিতে কোন বিরাম ছিলোনা কাজের। সেই সকাল সাড়ে সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত একটানা কাজ চলতো। দুই বার দশ মিনিটের টি ব্রেক আর একবার এক ঘণ্টার দুপুরের লাঞ্চ ব্রেক।

সাপ্তাহিক বন্ধ শুক্রবারেও কাজ চালিয়ে যেতে হতো। মূলত আমাদের চার দেয়ালের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টা কাটাতে হতো, চার দেয়ালের ভিতরেই কাজ খাওয়া আর ঘুমানো সারতে হতো। কদাচিৎ মাস দুই মাসে একবার শুক্রবারে ছুটি পাওয়া যেত!

ফ্যাক্টরিতে  প্রবেশের সাথে সাথে এই মাথা থেকে শেষ মাথা পর্যন্ত দ্রুত আমার উপস্থিতি সবাই জেনে যায়।  উপস্থিত সহকর্মীরা আনন্দে তুমুল করতালি দিয়ে উঠে! সকলে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানায়। এই প্রথম বুঝতে পারি এই ফ্যাক্টরির ছেলে মেয়েরা আমাকে কি পরিমাণ ভালোবাসে! তারা যে এই ভাবে আমাকে অনুভব করে তা আমি নিজেই অনুভব করতে পারিনি!

 ফ্যাক্টরির এক মাথা থেকে অন্য মাথায় পর্যন্ত সবার কুশল জেনে নিয়ে ঘুরে অফিসে ফিরে আসি।  ছোট বস বললেন, মুনিমভাই আপনি রেস্টে চলে যান। কাল কথা হবে। রুমে চলে আসি।

কাপড় চোপড় খুলে হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ি। এই দুইমাসে আমার অবর্তমানে পুরো ফ্যাক্টরি আবহ যেন বহু বদলে গেছে। নিজের কাছে আমাকে, কেমন বহিরাগত, বেমানান মনে হচ্ছে!

অথচ  এই ফ্যাক্টরি গড়তে, গত তিনবছর কিনা পরিশ্রম করেছি। বাংলাদেশ থেকে যে শ্রমিকরা এসেছিল, তারা সবাই ছিলো অনভিজ্ঞ । এরা কেউ কোন দিন কোন গার্মেন্টসে কাজ করে আসেনি।  দালালদেরকে ষাট থেকে- সত্তুর হাজার টাকা দিয়ে বিদেশে এসেছে। ভাব ছিলো এই, যে কোন উপায়ে একবার বিদেশ এলেই হলো। শুধু টাকা আর টাকা!!

কিন্তু একটা ফ্যাক্টরি চালাতে হলে তার প্রডাকশনের প্রয়োজন, শুধু  যেই সেই প্রডাকশন হলেও তো চলবে না, বায়ারের নির্ধারিত কোয়ালিটিও রক্ষা করার প্রয়োজন ।

এই পঞ্চাশ ষাট জন শ্রমিকের মধ্য মাত্র দশ জন শ্রমিক ছিলো অভিজ্ঞ। যাদেরকে  ঢাকা থেকে আসার সময় আমি  নিজে  রিক্রুট করে এনেছিলাম। তারা ছাড়া  বৃহত্তর সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালদের মাধ্যমে আসা সবাই একেবারে অনভিজ্ঞ। এদের দিয়ে কেমন করে মেশিন চালিয়ে কাপড় সেলাই করা যায়? সেলাই তো দুরের কথা সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে কেমন করে  সুতা ঢুকাতে হয়  তা তারা জানে না।

ভাগ্য কিছুটা ভালো ছিলো, বাংলাদেশী শ্রমিকদের আসার আগে শ্রীলংকা থেকে পঞ্চাশ/ষাটজন মেয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিলো। তারা সবাই প্রফেশনাল সুইং অপারেটর ছিলো। কাজেই ফ্যাক্টরির চাকা তাদের কল্যাণে একটু একটু করে ঘুরছিলো।

বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা শ্রমিকদের দেখে বসকে বললাম- বাংলাদেশ থেকে এই সব কি এনেছেন ? এখন কি করে এদের দিয়ে কাজ চালিয়ে যাই? বস সব শুনে বললেন- আমি তো দক্ষ গার্মেন্টস সুইং মেশিন অপারেটর হিসাবে ভিসা ইস্যু করে নিয়ে এসেছি। যারা কাজ পারবে না, তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দাও। 

 এই সংবাদ  ত্বরিত গতিতে বাংলাদেশ থেকে সদ্য আসা শ্রমিকদের মধ্যে জানা জানি হয়ে যায়, শ্রমিকরা তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখতে পেয়ে বিষম ভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। সব ছেলেরা আমার কাছে এসে খুব কান্না-কাটি শুরু করে। কেউ বলল- স্যার আমি আমার মায়ের সব গয়না-ঘাটি বিক্রি করে, কেউ বলল- বাবার শেষ সম্বল ধানী জমিটুকু বিক্রি করে, কেউ বলল- সুদি করে টাকা নিয়ে এখানে এসেছে। অতএব দেশে ফেরত যাওয়া মানে আত্মহত্যা করা। তারা কাকুতি মিনতি করতে লাগে – স্যার আপনিতো আমাদের দেশী, আপনার ছোট ভাই মনে করে আমাদের বাঁচান!

অগত্যা বসের কাছে গিয়ে বসকে বললাম- এতগুলো ছেলেকে কি করে দেশে ফেরত পাঠাবেন! এর জন্য আপনার প্লেন ভাড়া  কত টাকা লাগবে?  এরচেয়ে মাস তিনেক  সময় আমাকে দিন, আমি তাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে সুইং অপারেটর বানিয়ে নেই। বস আমার যুক্তি মেনে নেন।

 শুরু হয় দুর্গম এক মিশন। যে ছেলেগুলো কোন দিন সুইয়ের ভিতরে সুতা ঢুকাতে জানতোনা, আমার অক্লান্ত পরিশ্রমে তারা এক এক জন ঝানু সুইং অপারেটরে পরিণত হয়ে উঠে। পরে তারা শ্রীলংকান পেশাদার সুইং অপারেটরদের সাথে প্রতিযোগিতা করে পোশাক উৎপাদন শুরু করে। উৎপাদনে বাংলাদেশের ছেলেরা প্রায় পিছনে শ্রীলংকান মেয়েদেরকে ফেলে দিতো! লোহাকে কেমন করে পিটিয়ে সোনাতে রূপান্তরিত করতে হয় তা আমার জানা ছিলো।

আজ তিন বছর পর এখন যখন ফ্যাক্টরি স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতায় চলে এসেছে তখন দেশ থেকে ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আসছেন,  জিএম আসছেন,  পিএম আসছেন আমার সাজানো বাগানে বাক বাকুম বাক  করে ঘুরে আর উড়ে কাজ করছেন!

স্যার! নেপালের ডাকে বাস্তবে ফিরে এলাম। নেপাল বিনীত নম্র কণ্ঠে বলল-স্যার খেতে চলুন ক্যান্টিনে… । বললাম- ঠিক আছে যাও আমি আসছি। এই বাবু নেপাল চন্দ্র ঘোষকে  আমার চেয়ারে বসানো হয়েছে।

ক্যান্টিনে খাবার সময় ঢাকার মিরপুরের ছেলে, মাসুদ নামক সুইং অপারেটর আমার কাছে আসে। বলল-

শুনেছি  আমাদেরকে ছেড়ে আপনি মরক্কোতে চলে যাবেন! আগামীকাল শুক্রবার, ভাগ্য ভালো তাই এই শুক্রবারে ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখা হয়েছে! আসুননা স্যার শেষ বারের মত আপনাকে নিয়ে পারস্য উপসাগরের সৈকত বেড়িয়ে আসি!! বুঝতে পারি তার এই আমন্ত্রণের পিছনে আর একজন আছেন।

বললাম- ঠিক আছে আমি যাবো তোমাদের সাথে! চলবে।
 

পর্ব -৪

৪ comments

Skip to comment form

  1. 2
    কিংশুক

    পড়লাম মুনিম ভাই।

    1. 2.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

  2. 1
    Monowar Bin Zahid

    সুইং অপারেটরের কাজ টা কি ভাই? মানে তাদের কি করতে হয়?

    1. 1.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      সুইং অপারেটর  মানে সেলাইকর্মী মানে দর্জি।  ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.