«

»

Dec ২১

মরক্কোর রোজনামচা ৬

মরক্কোর রোজনামচা পর্ব-৫

পৃথিবীতে এমন কিছু হতভাগ্য মানুষ আছে ; তারা যদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে  কোন কিছু  করার চেষ্টা করে। তাদের সেই প্রচেষ্টা কখনো সফল হয়না। আমিও এই দল ভুক্ত মানুষ। আমার জীবনের কোন পরিকল্পনা সফল হয়নি। আমার ভাগ্যে অনেককে বন্ধু হিসাবে পেলেও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে সব সময় নাই নাই নেতিবাচক বাক্যটি অহরহ শুনে আসছি। চরম বিপদের সময় এই সব বন্ধুত্ব কোন উপকারে আসতে পারেনি। শুধু বন্ধুদের দোষ দিয়ে কি লাভ আমার নিজের শরীরের লোমও আমার সুখ দুঃখে আমাকে জিজ্ঞাস করেনা, তুমি কেমন আছো? অথচ অন্যদের জিজ্ঞাসা করার মত লোকের অভাব নেই! তারা না চাইলেও সাহায্যের হাত তাদের ঘরের দরজায় খটখটায়!!

এই যে বনের পাখি যাদের আপনারা আকাশে উড়তে দেখতে পান তাদেরও নিজস্ব বাসা আছে! অথচ আমার চারিদিকে এত আলো কিন্তু এক ভয়ংকর অন্ধকারের  মধ্যে দিয়ে আমি জীবনের পথ পরিক্রমা করে চলছি! নাস্তিক হতে হতে নাস্তিক হতে পারিনা, কারণ ডরপোক মানুষ।জানে ডর ভয় লেগেই থাকে।  তাই তো আস্তিক! আস্তিক বলেই বিশ্বাস করি, যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছেন!

আসলে সত্যি কথা আমার মত যাযাবর প্রকৃতির মানুষদের একমাত্র আল্লাহ ভরসা!  জীবনের এতটা পথ বেয়ে  যে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি  তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব একমাত্র আল্লাহর!

ছোটবেলা থেকেই আমার আশে পাশের অনেকেই প্রবাসে গিয়ে ছিলেন। কাজেই তরুণ বয়সে লেখা পড়ার চেয়ে বিদেশ যাওয়ার চিন্তা চেতনা প্রবল ছিলো। যখন ১৯৮২ সালে প্রথমবার কুয়েতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা লাভ করি তাতে দ্বিতীয় বার বিদেশ যাবার কোন ইচ্ছা ছিলোনা।

কুয়েতে গিয়ে একটি বিরাট বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত হয়েছিলাম । জানিনা এই বিপর্যয়ে আল্লাহ কেন আমাকে ফেলেছিলেন! আজ পর্যন্ত সে কলঙ্ক আমার কপালে ধারণ করে চলছি।  কুয়েতের যে লোকটি আমাদেরকে ভিসা দিয়ে তার ফার্মে এনেছিলো, সে ছিল এক ক্ষুদ্র প্রাইভেট কন্টাক্টর।  আমাদেরকে নিয়ে আসার পর সে এমন কোন কাজ পায়নি, যেখানে সে আমাদেরকে খাটাতে পারে। অবস্থা দৃষ্টে বুঝেছিলাম লোকটির এই লাইনে কোন অভিজ্ঞতা ছিলোনা। হয়তো আমাদের বাঙ্গালী দালালের প্ররোচনায় সে আমাদেরকে কুয়েত ওয়ার্ক-পারমিট বের করে নিয়ে এসেছিলো। ভেবে ছিলো কাজের লোক আনলেই কাজের কোন অভাব হবেনা।

শুধু খাবার চাল, ডাল, তেল, লবণ, মোরগ তার ঘর থেকে আমি গিয়ে নিয়ে আসতাম। কাজ নেই তাই বেতনও এক দিনার দেয়নি, কয়েক মাস বিনা বেতনে থাকার পর যখন বুঝতে পারি যে আসলে আমাদের কপাল খারাপ। যে  জায়গা জমি বিক্রি করে এসেছি তা আর কোনদিন ফিরিয়ে আনা যাবেনা। বাটার জুতাতে যে ভাবে বাটা লেখা  সীল মারা থাকে ঠিক সেই ভাবে আমার কপালেও এই ব্যর্থতার সীল আজীবনের জন্য লেগে গেল! আমার এত সাহস ছিলোনা না যে ভেগে অন্যত্র গিয়ে কাজ করবো।  বিনা বেতনে দশমাস কাটিয়ে দেবার পর কফিল আমাদেরকে জোর করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। একদিন সন্ধ্যার পর কফিল আমাদের ঘরে আসে, সাথে আরো দুইজন লোক। বলল- তুমি আর খোকার এখন বাংলাদেশে সফর করতে হবে! অবাক হলাম! অনুনয় বিনয় করলাম। হাজ্জ্ব আপনি এই ভাবে আমাকে পাঠিয়ে দিবেননা। দেশে জায়গা বিক্রি করে এসেছি, সে জমি গুলো উদ্ধার করতে না পারলে আমার পুরো পরিবার কষ্টে পড়ে যাবে!  সে কোন কথা মানতে রাজী নয়। তখন বললাম ঠিক আছে পাঠাবে যখন তখন আমাদের দশ মাসের বেতন দিয়ে দাও? রাগ করে বলল- খাল্লি বাল্লি তোর বেতন! তুই কাজ করেছিস যে তোদেরকে বেতন দেবো? বললাম- কাজতো তুমি দিতে পারোনি এর জন্য আমাদের কি দোষ?  বেতন না দিলে আমি দেশে যাবোনা। কফিল এসে আমাকে এত জোরে একটি চড় গালে বসিয়ে দিলো! আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। পাশে ছিলো মাছ কুটার  দা, যা দিয়ে আমরা মাছ মাংস কাটাকুটি করতাম। সেই দা হাতে তুলে নিয়ে যখনই আমি কফিলকে কোপ মারতে যাচ্ছি তখন আমার রুমের সকল বাঙ্গালী আমাকে লেপটে ধরে বসে। তারা অনুরোধ করে, বলে ভাই আপনি খুন খারাপি করবেন, আর আপনার সাথে আমাদের সবাইকে ধরে নিয়ে কল্লা কেটে মেরে ফেলবে! ভাই আপনার আল্লাহর দোহাই আপনি ক্ষান্ত দিন। আমাদের বউ বাচ্চারা বিধবা এবং এতিম হয়ে যাবে।  ভাই তুমি তো যুবক মাত্র আর সচ্ছল পরিবারের ছেলে, তুমি দেশে ফিরে গেলে তেমন অসুবিধা তো হবেনা!

কি আর করতে পারি এতগুলো মানুষ যে ভাবে আমাকে ঝাপটে ধরে রেখেছে, আর তাদের অনুরোধ উপরোধে আমার হাত মুঠো শিথিল হয়ে আসে। পরে সুবোধ বালকের মত কফিলের গাড়িতে গিয়ে উঠে বসি!!

 বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, আমি কাজের জন্য ঢাকাতে আসবো সে ধরনের চিন্তাও আমি কোনদিন করিনি।  কাজের জন্য আমি ঢাকায়ও আসতে চাইনি। ৮৩ সালের ৩রা নভেম্বর  কুয়েত থেকে বাধ্যতা মূলক ফিরে আসার  কয়েক মাসের মধ্যে আমার বড় দুলাভাই  মরহুম আব্দুল খালিক ধরে জোর করে  আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

ঐ সময়ে হোসেন মোহাম্মদ  এরশাদের শাসন শুরু হয়েছিলো। রাস্তাঘাটে ডাকাতি ছিনতাই তখনও ছিলো। তখন  ঢাকার ফুলবাড়িয়াতে বাস টার্মিনাল ছিলো।  রাত্রের গাড়িতে করে ঢাকা এসেছিলাম। ভোর ৬টায় ফুলবাড়িয়া এসে পৌছি। সেখান থেকে মাত্র চল্লিশ টাকা ভাড়ায় গুলশান ২ নম্বরে  সাইফুর রহমান সাহেবের বাসা জালালাবাদে এসে পৌছাই। গেট ভিতর থেকেই বন্ধ ছিলো। ডাকাডাকি আর কলিং-বেল টিপাটিপি  করেও কাউকে যখন পাচ্ছিলাম না তখন দেখি স্বয়ং সাইফুর রহমান সাহেব এসে গেট খুলে দিলেন। আমাদের নিয়ে দোতলাতে বসালেন। কিছুপর  ছাদে নিয়ে গেলেন। দূর থেকে গুলশান-২ এর গোলচক্করের সাথে সাততলা সাবেরা মার্কেটের বিল্ডিং দেখিয়ে বললেন, ঐ বিল্ডিং এ আমাদের গার্মেন্টস।

এই গার্মেন্টস শব্দটি  আমার জীবনে এই প্রথম শুনতে পেলাম। জিজ্ঞাস করলাম, গার্মেন্টস কি? ভাবলাম গভর্নমেন্ট শব্দকে কি তিনি গার্মেন্টস বলে ফেলেছেন!  বললেন, যেখানে কাপড় সেলাই করা হয়! শুনে এমন ভাবে বললাম, ওহ! দর্জির দোকান! বুঝতে পারলেন যে আমাকে বুঝাতে পারবেননা। বললেন, অপেক্ষা করো লোক এসে তোমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাবে। তখন নিজে দেখে বুঝতে পারবে। সেই যে গার্মেন্টস জীবনে আমি প্রবেশ করি  মাঝখানে ইংল্যান্ডে চার বছর বাদ দিয়ে এখনো সে জগতেই আছি। আছি বলতে পড়ে আছি। একজন মহানুভব ব্যক্তি করুণা করে ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন। 

সাইফুর রহমান সাহেবের গেঞ্জেস গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবার পর, এম আর সিদ্দিকী সাহেবের সিডকো গার্মেন্টসে আসি। এই সিডকো গার্মেন্টসেও আমি নিজে আসিনি।  তারা আমাকে একপ্রকার  জোর করে ধরে  নিয়ে আসেন। সেখানে বছর দুই কাজ করার সময়  এফ সি আই গ্রুপের দুই মালিকদের একজন মিঃ চৌধুরীর সাথে দেখা হয়। সিলেটী গার্মেন্টস টেকনিশিয়ান জানতে পেরে তিনি আমার সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেন। আমাকে দাওয়াত  দিয়ে হোটেলে নিয়ে যান। এই দেশের গার্মেন্টস জগত নিয়ে অনেক তথ্য জানতে পারেন।এর কয়েক মাস পরে ঢাকার বনানীতে এফসি আই এর অফিস খুলেন। অফিস উদ্বোধনির দিন আমিও উপস্থিত ছিলাম। পরে জানান তারা শারজাতে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি দিচ্ছেন। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে লোক নিবেন। আমি যেন তাদেরকে যোগ্য দক্ষ লোক এর ব্যবস্থা করে দেই।

আমাকে তাদের সাথে যোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু বেতন কম থাকায় প্রথমে যেতে চাইনি। পাকিস্তানী নাগরিক হাকিম নিজাম যিনি ছিলেন সারজাহ ফ্যাক্টরির  জেনারেল ম্যানেজার তিনি আমাকে অনেক অনুরোধ করে পরে রাজী করিয়েছিলেন।

আমাকে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসাবে নিয়োগ দিয়ে শারজাতে নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু যাবার সাথে সাথে আমাকে সে ফ্যাক্টরির দায়িত্ব দেয়া হয়নি। মামুলী সুপার ভাইজর হিসাবে নিয়োজিত করা হয়। ভাবলাম হয়তো মালিক আমার ধর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন। জানতে চেয়েছিলাম, কেন আমাকে আমার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছেনা। আমাকে জানান হলো আমাকে কুয়েত ফ্যাক্টরিতে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হবে।

আমি যখন আসি তখন আব্দুল হালিম নামক  এক ভদ্রলোক শারজার ফ্যাক্টরির দায়িত্বে ছিলেন। তবে তার পদ প্রোডাকশন ম্যানেজার ছিলোনা। ওয়ার্কারগন তাকে মাস্টার বলেই ডাকতো। বাংলাদেশের ফ্যাক্টরিতে আমরা ম্যান’স ওম্যান’স সার্ট ব্লাউজ, প্যান্ট স্কার্ট ইত্যাদি কাজ করেছি। জীবনে কোন দিন জ্যাকেট, কোট, রেনকোট, ব্লেজার ইত্যাদি উপর কাজ করিনি। শারজাহ ফ্যাক্টরিতে এসে হাই কোয়ালিটি ফ্যাশন্যাবুল জ্যাকেট, কোট, রেনকোট, ব্লেজার ইত্যাদির কাজ চলছে দেখতে পাই।

একদিন  হঠাত করে বস,  লাইনে রেনকোট ইনপুট করতে আমাকে নির্দেশ দিয়ে বসেন।  টিনের চালে কাক, আমি তো অবাক! এ কেমন আদেশ? অন্ততঃ আমাকে স্যাম্পল এনালাইসিসের সুযোগ তো দেয়ার দরকার? লে আউট সীট বানানোর সময় দেয়া দরকার! বসকে বললাম- অন্ততঃ কিছু সময় আমাকে দেন যাতে করে স্যাম্পলটি আমি লে-আউট করতে পারি! বস বললেন কিসের কি? কিসের লে-আউট? বিনা লে আউটে ইনপুট করতে হবে!

বুঝেছি পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে!! বিসমিল্লাহ্‌ বলে ইনপুট দেয়া শুরু করি। তবে আমি খুব পেরেশানে পড়ে গেলাম! রেনকোটের পকেট পর্যন্ত আসতে পারলেও এরপর স্যাম্পল না তৈরি করে  আর অগ্রসর হতে পারবোনা। আমি খুব আস্তে করে লাইনে প্রসেসের পর প্রসেস ইন করে যাচ্ছি। ভাবনা পকেট প্রসেস পর্যন্ত যেতে যেতে যেন বিকালের ছুটির টাইম পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। আমি অবশ্য ইনপুট থেকে আউটপুট পর্যন্ত নিয়ে যেতে তিন দিন সময় বসের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলাম ।

বস  ইংল্যান্ড থেকে আগত টেকনিশিয়ান কদ্দুস, শ্রীলংকার জিএম সুধাত, বাংলাদেশের হালিম, শ্রীলংকার শ্রীয়ানী সবাইকে কঠোর ভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন; যেন তারা আমাকে লাইন ইনপুটে কোন প্রকার সাহায্য না করে। আমার খুব মন্থর গতির ইনপুট দেখে অনেকে মুখ আড়াল করে হাসাহাসি করেছিলেন। আমার পরিকল্পনা মত পকেট পর্যন্ত আসতেই ফ্যাক্টরি ছুটির টাইম হয়ে যায়।

ফ্যাক্টরির ভিতরে এসির ব্যবস্থা থাকলেও সারাদিন হেভি টেনশনের কারণে আমি ঘেমে ভিজে সারা হয়ে গিয়েছিলাম। ছুটির পর দৌড়ে গোসলে চলে যাই। গরম পাণি দিয়ে গোসল করে আত্মাকে ঠাণ্ডা করতে পারিনি।  কোন রকম রাতের খাওয়া সেরে  আমার সুপারভাইজার রয়ের সাথে কথা বলি। তাকে অনুরোধ করি সে যেন আমার সাথে ফ্যাক্টরির ভিতর শুয়ে থাকে। আমার ম্যান্টল ডিপ্রেশন! একা থাকতে পারিনা। ফ্যাক্টরির চাবি চাইতে গেলে হালিম সাহেব জানতে চান কেন আমি ফ্যাক্টরির চাবি চাইছি। বললাম স্যাম্পল বানাবো। বলল- বাদ দেন তো স্যাম্পল কাল দিনে দেখা যাবে? আমি বললাম -না ভাই আমাকে স্যাম্পল বানাতে হবে। শেষে চাবি দেয়া হয়।

রয় এসে লাইনের  পাশে কয়েকটি  চেয়ার একত্র করে ঘুমিয়ে পড়ে। আর আমি শুরু করি এক নতুন মিশন। বাংলাদেশে আমার মত বেশীর ভাগ প্রোডাকশন ম্যানেজার তারা অন্যদেরকে দিয়ে কাজ আদায় করে নিতে পারলেও নিজে বসে কাপড় সেলাই করতে অভ্যস্ত নয়। কাজেই যে আমি বাংলাদেশে একটি সার্ট কোনদিন সেলাই করিনি, সেই আমি আজ রেইনকোট সেলাই করতে লেগেছি!!

সারা রাত্রে কতবার সেলাই করেছি আর কতবার যে খুলেছি তা আল্লাহ জানেন। অবশেষে আমি কমপ্লিট করতে সক্ষম হই। এবার আমার কাছে  ইনপুট পানির মত হয়ে গেল! আমি বুঝে গেছি কোন প্রসেসের পর কোন প্রসেস ধরে কোন মেশিন সেট করতে হবে। ঘুমোতে যাইনি। ভোরে সুইং অপারেটর আসার সাথে সাথে আমি লাইনে দ্রুত ভাবে প্রসেস সেট করতে থাকি। নয়টার মধ্যে আমি অনেক দূর এগিয়ে যাই। গতকাল যে সময় নষ্ট হয়েছিলো  আজকে তা কাভার করে অনেক এগিয়ে এসেছি।

নয়টার সময় বস এলেন। আমি অফিসে গিয়ে বসকে জানাই  নিজ হাতে একটি রেনকোট সেলাই করেছি। কাটিং সেকশনে তা ড্যামি ঝুলিয়ে রেখেছি। দয়াকরে যদি তা দেখে দিতেন! বস শুনে বিশ্বাস করতে চাননি যে আমি নিজ হাতে রেইন কোট সেলাই করেছি।  আমাকে সাথে করে কাটিং  এ চলে এলেন। ড্যামিতে রাখা রেনকোট পুংখানোপুংখ ভাবে চেক করে দেখেন। অবাক হয়ে বলেন, মুনিম বিশ্বাস করতে পারছিনা, তুমি এই কোট সেলাই করেছো। বললাম, বস সারারাত লেগেছে, এখনো ঘুমাইনি! বস বললেন, এই ভাবে রাত জাগলে কেন? শরীর তো খারাপ হয়ে যাবে।

বুঝতে পারছি আমার এই কাজ দেখে বস খুব খুশী হয়েছেন । তিনি আমাকে বললেন, যাও, যাও তোমার ছুটি। তুমি ঘুমাতে যাও । আজ আর তোমার আজ কাজে আসতে হবেনা। আমি তোমার লাইনের বাকি প্রসেস সেট করে দিয়ে যাবো।

চলে আসি রুমে, কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি।  জানিনা ঠিক কত সময় ঘুমিয়ে ছিলাম। কে যেন ডেকে বলল, আপনাকে বস ডাকছেন। মুখ ধোয়ে বসে অফিসে আসতে, বস আমাকে হাসি মুখে বসতে বললেন। বস সাদা ডেভিড অফ নামক সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। নিজে সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। বস বললেন, মুনিম আমি তোমার কাজে খুব খুশি হয়েছি, তাই সিদ্ধান্ত বদল করে ফেলেছি। এই শারজার ফ্যাক্টরি হচ্ছে আমাদের মাদার ফ্যাক্টরি, কাজেই তোমাকে কুয়েতে না পাঠিয়ে হালিমকে কুয়েতে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাকে এই ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসাবে এখনই ঘোষণা দিচ্ছি।

আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হালিম সাহেবকে ডেকে পাঠালেন। হালিম সাহেব আসার সাথে সাথে তাকে বসের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন। হালিম সাহেব খুব অনুরোধ করলেন। বললেন – বস আমি যতদিন শারজাহ ফ্যাক্টরিতে আছি ততদিন এই ঘোষণা দিবেন না প্লিজ!

বস আমাকে নিয়ে ফ্লোরে চলে আসেন। শ্রীলংকান অফিস ম্যানেজার মিঃ মেগাওয়াতাকে দোভাষী কাজের জন্য ডেকে নিলেন। ফ্লোরে সব কাজ বন্ধ করে, সবাইকে এক জায়গায় জড় করে বস জানিয়ে দিলেন যে, এখন থেকে এই ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসাবে মুনিমকে  দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মিঃ হালিমকে কোয়ালিটির দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে! ঘোষণা শোনা মাত্র উপস্থিত লোকদের মধ্যে বেশীর ভাগ লোক তুমুল করতালির মাধ্যমে বসের এই ঘোষণাকে স্বাগতম জানায়। চলবে-

৪ comments

Skip to comment form

  1. 2
    আমিনুল

    আপনার মরক্কো সিরিজ আগেই আরেকটি ব্লগে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনি বিবিধ কারনেই সেখান থেকে চলে আসেন। আপনার লেখা না পড়ার অতৃপ্তিটা তখন থেকেই ছিল। বার বার জানতে চাচ্ছিলাম মরক্কোর বাকী অভিজ্ঞতাটুকো কেমন ছিল- আজ এতদিন পরে আপনাকে আবার খুঁজে পেলাম। লেখাটা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাবেন- এই একটা অনুরোধই থাকবে। 

    লেখার সাথে আগের মতোই ছবি আশা করছি। বই বের করেছেন কী? আপনার সাথে যোগাযোগের খুব ইচ্ছে আছে। 

     

    1. 2.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      আপনি আমার পুরানো পাঠক জেনে খুশি হলাম। পড়া আর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  2. 1
    সাদাত

    মুনিম ভাই, নিঃসন্দেহে আপনার এই সিরিজ সদালাপে ভিন্ন মাত্রা ও বৈচিত্র্য এনে দিচ্ছে। ব্যস্ততার জন্য সব পর্ব বা কোন পর্বের সবটুকু হয়তো পড়া হয়ে ওঠে না। আসলে সদালাপেই তো ঠিকভাবে সময় দিতে পারি না।

    যা হোক, একটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখা দরকার, সদালাপের হোম পেজের ১৫টি লেখার ভেতর ৭টি লেখাই আপনার। এটা কিছুটা দৃষ্টকটু দেখাচ্ছে। 

    এটাও ঠিক যে সদালাপে লেখা কম আসার কারণে এবং পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে আপনি নতুন নতুন পর্ব না দিয়ে পারছেন না। সেক্ষত্রে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতে পারেন আপনার সর্বশেষ ২/৩টি লেখা রেখে বাকি লেখাগুলো প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে দিতে।

    1. 1.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      আপনার পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। সদালাপের এডমিনের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.