«

»

Feb ১৫

মরক্কোর রোজনামচা ৯

মরক্কোর রোজনামচা পর্ব ৯

যে সকল শ্রীলঙ্কান মেয়েরা ফ্যাক্টরি আয়োজিত পিকনিকের যায়নি, সিদ্ধান্ত নিলো আগামীতে যে শুক্রবারে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকবে, সে বন্ধের দিন আমাকে নিয়ে দুবাই জুমেরিয়্যা বীচে বেড়াতে যাবে। খুব গোপনীয়তা রক্ষা করে মাসুদ আমাকে জানিয়ে সম্মতি নিতে আসে।

বীচে যাবার পর,উপস্থিত মেয়েদেরকে বললাম,সেদিন তোমরা ফ্যাক্টরির পিকনিকে যে যাবেনা সে বিষয়ে ঘুণাক্ষরে তোমরা আমাকে জানাওনি। অথচ তোমাদের না যাওয়ার দায় আমার উপর এসে পড়েছে। পিকনিকের পরের দিন,আমাকে এই কারণে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তা বাতিল করা হয়।।

বললাম, এক এক করে আমার দায়িত্ব অন্যদের কাছে দেয়া হচ্ছে। যার মানে পরিষ্কার ! সময় হলে আমাকে এই ফ্যাক্টরি ত্যাগ করতে হবে। আমার বক্তব্য শুনে আনন্দ করতে এসে, সবার মন খারাপ হয়ে গেল! আমি অবশ্য চেষ্টা করেছি আসর জমানোর জন্য।

সেদিন থেকে চান্দ্রার মধ্যে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সে যেন অধিক হারে আমার কাছে আসার চেষ্টা করছে।

বৃষ্টি ঝরবে বলেই আকাশে মেঘ জমে। চান্দ্রা নামক মেয়েটি আমার জীবনে ভালোবাসার আবেশে জড়িয়ে পড়বে বলেই নববর্ষের দিন নাচতে নেমেছিলাম।

যদি নববর্ষ অনুষ্ঠান না হতো। না কানে ভেসে আসতো দিভিয়ার গীত ছবির গান। যদি রয় আমাকে ঠেলে না দিতো নাচের জন্য তাহলে তো আজ এই ঘটনা ঘটতোনা।

ধীরে ধীরে চান্দ্রা নামক মেয়েটি আমাকে সত্যিকার ভাবে ভালোবেসে ফেলে। আর আমিও স্বেচ্ছাবন্দী জীবনে ভালবাসার আহ্বানকে উপেক্ষা করার মত শক্তি রাখতে পারিনি। এরপর ক্বচিৎ কালে ছুটি পেলে, ছুটে আসতাম পারস্য উপ সাগরের তটে,বালুকাবেলায়। হাসি আর আনন্দে কেটে যেত সেই দিনটি।

বস,একদিন সব ম্যানেজার অফিসারদের ডাকলেন। জানালেন, আগামী রবিবার উনার পাটনার মতিন ভাই লন্ডন থেকে সপরিবারে শারজাহ ফ্যাক্টরি ভিজিটে আসছেন। প্রথমবার আসার কারণে, ফ্যাক্টরিকে যথাসাধ্য ক্লিন করে রাখা হয়।। আতিক ভাইকে বললেন, তিনি যেন সুন্দর দেখে ফুলের তোড়া কিনে আনেন।

রবিবারে অতিথিদেরকে বহন করে গাড়ি যখন ফ্যাক্টরির আঙ্গিনায় এসে থামে,প্রথমে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন,ছোট খাটো অবয়ব, সুদর্শন যুবক, এরপর হাফপ্যান্ট আর হাফ স্লিভ পরা ৭/৮ বছর বয়সী এক কিশোর, তারপর সালওয়ার কামিজ পরা ১২/১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী, কিশোরীর হাত ধরা এক নান্নি মুন্নু ২/৩ বছর বয়সী শিশু মেয়ে।

ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো দেখে, যুবক বলে উঠেন, ইতার কিতা দরকার আছিল রে বা চধরী ভাই! (এইসবের কি দরকার ছিলো চৌধুরী ভাই)। বস পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার পাটনার মতিন ভাই, সাথে তান( উনার) বাচ্চারা!

আসলে আব্দুল মাতিন সাহেবকে দেখে মনে হয়নি উনার বয়স ২৫শের উপরে। একে তো মেদহীন শরীর তার উপর উজ্জ্বল ফর্সা রঙ এর শরীর। মাথা ভর্তি গভীর কালো চুল। হাসি খুশি ফুর ফুর মেজাজের তবে কথা কম বলার ভাব দেখে মনে হলো তিনি রাশভারী স্বভাবের লোক।

আমাদের কলিগ ছিলেন, শামসুল ইসলাম, তিনি সম্পর্কে আব্দুল মাতিন সাহেবের স্ত্রীর বড়ভাই। বাচ্চারা মামাকে দেখতে পেরে আনন্দে মামাকে সাথে নিয়ে ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখতে আবদার জানায়। সামসুল ইসলাম ভাই আমাকে উনার সাথে ডেকে নেন। পুরো ফ্যাক্টরি ঘুরিয়ে তাদেরকে দেখিয়েছিলাম।

তিনি প্রথমেই উনার ভাগনা ভাগ্নিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

মেয়েটির নাম পিংকি, ছেলেটির নাম মেহের, বেবি মেয়েটির নাম আফরিন। পিংকি সদা হাসি খুশি চপল চঞ্চলা বলে বুঝা যাচ্ছে । হাসি মুখে এটির কি নাম? এটি দিয়ে কি করা হয়? ইত্যাদি কত প্রশ্ন করে যাচ্ছে । পাশে মেহের কিন্তু নীরব শুধু দেখেই যাচ্ছে কোন হাসি বা কোন প্রশ্ন করছেনা। পিংকি তার মামাকে জিজ্ঞাস করে আমার দায়িত্ব কি? মামা জানান, আমাদের ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ম্যানেজার। শুনেই হেসে হেসে বলে, না বাবা, আমি এত বড় পদ বলে ডাকতে পারবোনা, আমাকে বলল- আমি আপনাকে পিএম বলবো। আমিও হেসে জানাই, সে তোমার ইচ্ছা! শামসুল ইসলাম হেসে বলেন, তাহলে মুনিম ভাই প্রাইম মিনিস্টার হয়ে যাবেন?

শ্রীলঙ্কান মহিলা সুইং অপারেটর মধ্যে, কুমারী মেয়েদের চেয়ে বিবাহিত মহিলাদের চলাফেরায় বেপরোয়া ভাব দেখা গেলেও কুমারী মেয়েরা সব সময় খুব রক্ষণশীলতা বজায় রেখে চলাফেরা করে। তাদের চলারফেরার এই পার্থক্য আমার চোখে পড়ে। এর জন্য একদিন চান্দ্রাকে আমি প্রশ্ন করি।

চান্দ্রা আমাকে পাল্টা জিজ্ঞাস করেছিলো,মুনিম স্যার আপনাদের দেশে কি বিয়ের রাতে নতুন বৌয়ের সতীত্ব পরীক্ষা করা মত কোন অনুষ্ঠান হয় কিনা?

সম্পূর্ণ অভাবিত প্রশ্ন। এমন কথা দেশে থাকতে শুনা বা জানার কোন সুযোগ ছিলোনা। অবাক হয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম সে কি বলতে চাচ্ছে!
চান্দ্রা তেমন ভালো ইংরেজি জানতোনা, আর আমার পক্ষেও সব সিংহলী ভাষাও আয়ত্ত করা হয়নি। চান্দ্রা বুঝতে পারে আমি বুঝতে পারিনি সে কি বলতে চাচ্ছে।

বললো – এই বিষয়ের উপর আমাদের দেশে সিনেমা হয়েছে, এর ভিডিও ক্যাসেট আমাদের কাছে আছে, সে সিনেমা দেখলে সব বুঝতে পারবেন।

হ্যাঁ সে আমাকে সেদিন সে সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট এনে দিয়েছিলো।
ফ্লিম দেখে বুঝতে পারছি, সে আমাকে কি ম্যাসেজ দেবার চেষ্টা করছে!

একজন শ্রীলংকান মেয়ে, বিয়ের আগে কখনও কুমারীত্ব হারাতে পারেনা। কারণ তাদের সমাজে বিয়ের রাতে সতীত্ব পরীক্ষা দিতে হয়। বাসর রাতে ছেলে পক্ষের কোন মহিলা নববধূর পরনের সাদা কাপড় খোলে নিয়ে একটি ট্র্যাঙ্কে ভরে রাখবে। বৌভাতের জন্য আগত বয়স্ক মহিলারা সে ট্রাংক খুলে সে কাপড় পরীক্ষা করে দেখবে, কোন রক্তের দাগ আছে কিনা? যদি থাকে বাড়ীর সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে। শুরু হবে মহা আনন্দে বৌভাতের আয়োজন।

আর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে সানাইয়ের সুর বন্ধ হয়ে যাবে সাথে সাথে সব আয়োজনও। হতভাগী মেয়েটিকে বিধবার মত সাদা শাড়ি পরিয়ে, ঘরের এক কোনে এনে বসিয়ে রাখবে । বাবার বাড়ির লোকজন এলে মেয়েকে তাদের সাথে ফেরত পাঠিয়ে দিবে ।

যার কারণে বিবাহিতা বা তালাক প্রাপ্ত নারীদের মধ্যে কেউ কেউ যা তা করে পার পেয়ে গেলেও কুমারী মেয়েরা বিয়ের রাতে পরিবারের সকলের মান ইজ্জত হারানোর ভয়ে তারা বিয়ের আগে খুব রক্ষণশীল থাকে। বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফাটেনা। শুধু তাই নয় চরিত্রহীনা অপবাদের ভয়ে শ্রীলংকান অবিবাহিত মেয়েরা তাদের পিউবিক হেয়ারকেও বাসর রাত পর্যন্ত অক্ষত রাখতে হয়।

কালভদ্রে ছুটি পেলেই ছুটে যাই পারস্য উপসাগরের বালুময় সৈকতে। সাগরের নীল জল আর ঢেউ এর ধ্বনি, আমার হৃদয়ে ধরকান বাড়িয়ে দিত। দৃষ্টি যেত দূর ঐ প্রান্তসীমায়, যেখানে আকাশ ও সাগর মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে। কখনো কখনো আমাদেরও মিশে যাওয়ার ইচ্ছা জেগে উঠত! আহা! এই সাগরে, মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া শঙ্খচিলের মত পাখা মেলে আনন্দের রথে চড়ে উড়ে যেতে পারতাম! এ ভাবে দুটি মন কাছাকাছি এসে যায়। তারপরও গান গাইতে হয়- বাড়ির পাশে আরশি নগর সেথা পড়শি বসত করে- আমি একদিনো না দেখিলাম তারে—

এই মেয়েটিকে নিয়ে এত ঘটনা ! সিদ্ধান্ত নিলাম। চান্দ্রাকে বিয়ে করব। এর জন্য চান্দ্রা তার ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি। সে জন্য রোলা, শারজার সিটি সেন্টারে আদালত পর্যন্ত গিয়েছি।

আদালতের বিজ্ঞ হাকিম, চান্দ্রাকে জানায় তোমাকে মুসলিম হবার জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে যে তুমি শুধু ছেলেকে বিয়ের জন্য মুসলিম হতে চাওনা, তুমি মুসলিম হতে চাও ইসলাম ধর্মকে ভালোবেসে।

আমাদের জীবনে সে তিন মাস আর আসেনি। এর আগেই কুয়েতের টিকেট হাতে ধরিয়ে দিলেন বস।

আদালত থেকে আসার দিন পনেরোর মধ্যে বস অফিসে ডেকে নিয়ে বললেন, তোমাকে আগামীকাল কুয়েতে যেতে হবে!

মনে পড়ে বসের সে দিনের কথা! শারজাহর ফ্যাক্টরি হচ্ছে আমাদের মাদার ফ্যাক্টরি তাই তোমাকে আমরা এখানেই রাখতে চাচ্ছি! অথচ আজ পরিস্থিতির জন্য আমাকে কুয়েত পাঠিয়ে দিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে!
বস বললেন, তোমার ফ্যাক্টরি তোমার থাকবে! শুধু মাস তিন কুয়েতে গিয়ে ফ্যাক্টরির কোয়ালিটি ঠিক করে আসবে!

অগত্যা আমাকে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কুয়েত যেতে হয়েছে!

ক্র …. ক্র ….. সাৎ করে মাথার উপর দিয়ে, সঙ্গীহারা মরালীর আর্তনাদ করতে করতে উড়ে গেল! , হুশ ফিরে এলো।

কতক্ষণ হলো, পারস্য উপ সাগরের আলখান সমুদ্র সৈকতে এভাবে মূক আর বধীর দাঁড়িয়ে আছি বুঝতে পারছিনা। তবে চান্দ্রার বুকের হ্রস্ব দীর্ঘ ছাপ আর অনুভূত হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে শান্ত সমাহিত কোন সন্ন্যাসী ধ্যানে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের পানিতে বুকের কাপড় সিক্ত ! সে যেন কোথায় কোন দিকচক্রবালে হারিয়ে গেছে।

ঃ চান্দ্রা। ………….

ঃ হ্যাঁ …..

ঃ এভাবে কতক্ষণ….

ঃ মাটা দাননে / আমি জানিনা। ।

ঃ দুঃখিত! আমি দুঃখিত- গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, কেমন করে বলি ….

ঃ আপনার মরক্কো যাওয়ার কথা? শুধু আমি নই সারা শারজাহ জানে-

ঃ তাই না কি?

ঃ শুধু তা নয়, আপনার টিকিটও রেডি, আপনি আগামী তেসরা অক্টোবর মরক্কো যাচ্ছেন–

ঃ কে বলেছে এ কথা?

ঃ বস

ঃ বস বললেন তোমাকে?

ঃ হ্যাঁ অফিসে ডেকে এনে মজা করে বলছেন।

ঃ তোমার কি মত?

ঃ যাও, বাধা দেবনা …. জানতাম একদিন এমন ঘটনা ঘটতো, হয় বাংলাদেশ না হয় অন্য কোথায়।

ঃ চল আমরা বাংলাদেশ চলে যাই.. ?

ঃ না। বাংলাদেশে নয়। আমি চাই আপনি মরক্কোতে যান, সেখানে গিয়ে যদি আপনি লাল পাটার লামাই( লাল রঙ এর মেয়ে) লাচ্চানাই লাচ্ছানাই (সুন্দরী সুন্দরী) মেয়ে দেখার পরও আপনি আমাকে মনে রাখতে পারেন তাহলে বুঝব আপনি আমাকে সত্যি ভালোবাসেন ,আর যদি না মনে রাখতে পারেন তাহলে প্রমাণিত হবে আপনার ভালোবাসা, ভালোবাসা নয় স্রেফ সাময়িক ভালোলাগা ছিলো।

ততক্ষণে সাগরের অন্ধকারে গ্রাস করে বসে আছে চারিদিক। ঝাপসা অন্ধকারের মধ্যে সাগরের ঢেউ এর আছড়ে পড়া শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনা যাচ্ছেনা। অন্ধকারে মাসুদ আর এরোমা কোথা তা দেখতে পাচ্ছিনা ! যারা আমাদের সাথে এসেছিলো। অন্ধকারের দিকে লক্ষ্য করে ডাকি-

ঃ মাসুদ ……………….

ঃ আমরা এখানে, আপনাদের অপেক্ষায় স্যার । মাসুদ বেশ দূর থেকে মাসুদের কন্ঠ শোনা গেল।

২রা অক্টোবর ১৯৯৩ সাল। রোজ রবিবার।

সে রাত ছিলো পূর্ণ পূর্ণিমার রাত! সজনা গাছের উপর দিয়ে বিশাল থালার আকারে সোনালী চাঁদ দুনিয়াটাকে সোনাঝরা ভোরের মত চারিদিক আলোকিত করে আছে!

আর ঘণ্টা দুয়েক পর রাত বারোটা বাজার সাথে সাথে ৩রা অক্টোবরে উপনীত হবে। এই রাত আমার শারজাহ জীবনের তিন বছরের শেষরাত।

চান্দ্রার অপেক্ষায় ক্যান্টিনে বসে আছি, যেহেতু আমি চলে যাচ্ছি তাই কর্তৃপক্ষ চান্দ্রাকে রাত্রবেলা মেয়েদের কোয়াটার থেকে বের হয়ে ক্যান্টিনে আসার ব্যাপারে কড়াকড়ি নিয়ম শিথিল করে অনুমতি দিয়েছেন।

হাতে পরিষ্কার সাদা চিনামাটির প্লেটে সবুজ পাতা সহ কয়েকটি সাদা ফুল নিয়ে ক্লান্ত বিষণ্ণ চান্দ্রা ক্যান্টিনে প্রবেশ করে। প্লেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল- আপনি এই ফুল গুলো খেয়ে নিন!

মানুষ কত কিছু খায় কিন্তু কাঁচা ফুল খাবার কথা কোন দিন শুনিনি! কিছুটা বিচলিত বোধ করছি- চান্দ্রা বলে মুনিম স্যার, আপনি সফরে বের হবেন, তাই পথে যাতে কোন অকল্যাণ না হয় সেই জন্য এই ফুল খেতে আপনাকে দিলাম। খেয়ে নিন উপকার না হলেও কোন ক্ষতি করবেনা এই ফুলগুলো!

চান্দ্রা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বুঝতে পারি হয়তো আমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় কোন মন্ত্রতন্ত্র পড়ে এই ফুলগুলো দিয়েছে। বিসমিল্লাহ্‌ বলে খেয়ে ফেলি!

ঃ স্যার আপনার জন্য আমি গর্ববোধ করি !

ঃ কেন?

ঃ কারণ আপনি মানুষ ভালো ছিলেন বলেই আমাকে মেয়ে থেকে নারীতে বদলে ফেলেননি!

ঃ তোমার জন্য তো ভালো হলো, আমাদের আর দেখা না হয় তাহলে তো তোমাকে বিপদে পড়তে হবেনা!

ঃ চান্দ্রা আগামীতে হয়তো দেখা হবে, হয়তো দেখা না হতে পারে। দেখা হলে তো কথা নেই । যদি দেখা না হয় তাহলে কষ্ট হলেও ক্ষমা করে দিবে!

ঃ মুনিম স্যার, আশাকরি আমাদের আবার দেখা হবে! আগামীকাল ভোরে আপনাকে যেতে হবে, যান এবার ঘুমিয়ে রেস্ট নিন।

৩রা অক্টোবর ১৯৯৩ সাল।

মাত্র ভোর হতে শুরু করছে, এক এক সকল বাংলাদেশী ও শ্রীলংকান, ছেলে মেয়ে ফ্যাক্টরি বিশাল লোহার গেটের সামনে জড় হয়েছে।

মসাহিদ ভাই, আতিক ভাই আমাকে বাইর হওয়ার সময় হয়ে গেছে জানিয়ে গেলেন। ঝটপট আমিও বাইরে আসি, লাগেজ আগেই গাড়ির বয়নেটে জায়গা করে নিয়েছে।

বাইরে এসে এত দিনের, এতগুলো পরিচিত মুখ দেখে কান্না পেল। স্পষ্ট বুঝলাম এই মানুষগুলোর মধ্যে বেশীর ভাগের সাথে জীবনে আর কখনও দেখা হবেনা।

শ্রীলংকান মেয়েরা এক একজন বিদায় নেবার সময় হান্ডস্যাক করে করে বলল, মুনিম স্যরা যদি কখনো মনে দুঃখ দিয়ে থাকি তাহলে আমাকে ক্ষমা করবেন। যেখানে থাকুন ভালো থাকবেন। আমাদের কথা মনে রাখবেন। বাংলাদেশী ছেলেরাও এক এক এলো সালাম দিলো আলিঙ্গন করে করে দোয়া করতে বলল।

সবাই আমাকে বিদায় বেলা কিছু বলতে অনুরোধ জানায় । বলতে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু আমার সব কথাগুলো আমার কণ্ঠ ভেদ করে বাইরে নিয়ে আসতে পারছিনা!! না বলতে পারার ব্যর্থতার জন্য আমার তুমুল কান্না পেল। শুধু হাত জোড় করে সবার উদ্দেশ্যে মাফ চাইলাম।

আতিকভাই তাড়া দিয়ে বললেন- মুনিম ভাই দেরি হয়ে যাচ্ছে! অশ্রু সজল চোখে আমি গাড়ির দিকে রওয়ানা দিচ্ছি- এই সময় মনে হলো আরে চান্দ্রার কাছ থেকে তো বিদায় নেয়া হলোনা?

পিছন ফিরে চান্দ্রাকে খুঁজি, এক পিলারের আড়ালে মেয়েটি অঝোরে কাঁদছে। ডাকলাম- চান্দ্রা তুমি কি বিদায় দিবেনা?

সে বোধহয় এই ডাক শোনার জন্য অপেক্ষায় ছিল। ডাক শোনে, পাগলের মত দৌড়ে এসে, সব লজ্জাকে বিসর্জন দিয়ে, জড়িয়ে ধরে, হু হু করে কেঁদে ফেলে।

অন্যান্য মেয়েরা এসে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে কিন্তু কারো কথা সে শুনছে না। আতিক ভাই মেয়েদের নির্দেশ দিলেন তাকে ছাড়িয়ে নিতে। মেয়েরা জোর করে ছাড়িয়ে নিতেই চান্দ্রা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

শুধু কানে এলো চান্দ্রার বুক ফাটা আর্তনাদ- মুনিম স্যার….. মুনিম স্যার…… আমি দাঁড়িয়ে পড়তেই মসাহিদ ভাই টান মেরে আমাকে গাড়িতে ভিতরে ঢোকালেন।

কৃষ্ণের বিদায় বেলা, রাধা যেমন কেঁদে কেঁদে ব্যাকুল হয়ে কৃষ্ণকে ডেকে ছিল, কিন্তু কৃষ্ণ ফিরে আসেনি। তেমনি চান্দ্রা যখন কেঁদে কেঁদে লুটোপুটি খাচ্ছিল তখন আমি আর পিছনে ফিরেও তাকাইনি।যদিও তাকাইনি তবুও ভিতরটা আমার ভেঙ্গে চূড় চূড় হয়ে যাচ্ছে।

সকাল ৮টায় রয়েল জর্ডনের ডিসি টেন বিমানে করে দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে রওয়ানা হয়ে আবুধাবি, আম্মান, তিউনিসিয়া হয়ে কাসাব্ল্যাংকা মোহাম্মদ ফাইভ এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছি।

সেদিনও ছিলো ৩রা অক্টোবর ১৯৯৩ সাল তবে সময় ছিলো স্থানীয় সময় বিকাল ৪ টা। শুরু হলো আর এক নতুন জীবন!! চলবে-

৬ comments

Skip to comment form

  1. 4
    rur

    ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’
    দুঃখীত ভাই।আল্লাহ্‌তায়ালা যেন আপনার আম্মুকে বেহেশত নসিব করেন।(আমিন)

  2. 3
    rur

    জবাব কই জবাব!!!
    লেখক কোথায় লেখক!!!

    1. 3.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      আমার আম্মা ইন্তেকাল করার জন্য সদালাপে আস্তে পারিনি। আমি দুঃখিত! না চান্দ্রার সাথে প্রথম কয়েক মাস চিঠি পত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ থাকলেও পরবর্তিতে যোগাযোগ বচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন তার সাথে ইচ্ছা থাকলেও যোগাযোগ করতে পারছিনা কারণ তার পোস্টাল ঠিকানা মরক্কোতে আমার এক খাতায় লিখা ছিলো, সে খাতা বহু চেষ্টা করেও উদ্ধার করতে পারিনি।ধন্যবাদ।

  3. 2
    rur

    *ট্রান্সফার হওয়ার পর কি লেখক চান্দ্রার সাথে যোগাযোগ করেন নি? না করে থাকলে কেন করেন নি।
    *এখন কি যোগাযোগ করার সুযোগ নাই?সুযোগ থাকলে যোগাযোগ করেন না কেন।

  4. 1
    Sayed

    Life's like that!!…..চান্দ্রা এখন কোথায়? শ্রীলংকায় ফিরে গেছে?

    1. 1.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      আমি যখন শারজাহ ছেড়ে আসি তার ১০দিন পর সেও শ্রীলংকা চলে যায়। কয়েক মাস পর কোম্পানীকে অনুরোধ করে তাকে শারজাহতে ফিরিয়ে এনেছিলাম কিন্তু সে আবার শ্রীলংকায় চলে যায়। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এখন বলতে পারিনা সে কোথায় কি ভাবে আছে কেমন আছে? তবে যেখানে থাকুক ভালো থাকুক সুখে থাকুক এই কামনা করি। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.