«

»

Jun ১৯

কালের আয়নায় ম্যাক্সিম গোর্কি ও তাঁর গল্প

220px-Maxim_Gorky_authographed_portrait

 

এক

আলেক্সেই পেশকভের জন্ম হয় ১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ। পিতৃপ্রদত্ত এই নাম মুছে দিয়ে গোর্কি নামেই উত্তরকালে তিনি জগৎবিখ্যাত হন। বিশ্ব সাহিত্যে ম্যাক্সিম গোর্কি বেশ আলোচিত নাম। নিজের সৃষ্টকর্ম দিয়েই তিনি নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে রেখে গেছেন। 'বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়' – ম্যাক্সিম গোর্কির পরিচয়ও তাঁর স্বীয় সৃষ্টিশীলতায়। তুচ্ছের মধ্যেই নাকি বৃহৎ কিছু খুঁজে নিতে হয় আর সে কারণে বোধহয় কোন বিষয়-বস্তুকেই কখনো-ই তিনি অবহেলা বা তুচ্ছের চোখে দেখেননি। উনিশ শতকে বিশ্বসাহিত্যে যে কয়েকজন হাতেগোনা সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যে ঝড় তুলেছেন ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। যদিও তিনি উপন্যাস এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন তথাপিও তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো তাঁকে সত্যিকারের গোর্কি হয়ে উঠতে অসামান্য অবদান রেখেছে। তাঁর গল্পের গাঁথুনি বেশ চমৎকার।

 

প্রথম দিকের গল্পগুলোতে নিটোল রোমান্টিকতা থাকলেও পরবর্তীতে গল্পের বিষবস্ত এবং উপস্থাপনা শৈলী ভিন্ন রূপ নিতে থাকে। সমকালীন বাস্তবতা, সমাজের নিচুতলার মানুষই তাঁর গল্পের উপজীব্য বিষয়। মূলত প্রথম দিকে তিনি লিখতেন প্রথাগত নিয়মে। পরবর্তীতে তাঁর পরিচয় হল এক বিখ্যাত তরুণ লেখক ভ্লাদিমির করোলেঙ্কার সাথে। করোলেঙ্কার কথায় চেতনা ফিরে পেলেন গোর্কি। প্রথাগত চেনার ধারাকে বাদ দিয়ে শুরু হল তাঁর নতুন পথে যাত্রা। সমাজের নিচুতলার মানুষেরা- চোর, লম্পট, ভবঘুরে, মাতাল, গণিকা, চাষী, মজুর, জেলে, সারিবদ্ধভাবে প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর রচনায়। এই পর্বের কয়েকটি বিখ্যাত গল্প হল মালভা, বুড়ো ইজরেগিল, চেলকাশ, একটি মানুষের জন্ম। গল্পগুলিতে একদিকে যেমন ফুটে ওঠেছে নিচু তলার মানুষের প্রতি গভীর মমতা অন্যদিকে অসাধারণ বর্ণনা, কল্পনা আর তাঁর সৃজনশক্তি।

 

এইসব লেখাগুলি বেশিরভাগই ছাপা হয়েছিল ভলগা তীরের মফস্বলী পত্রিকায়। স্থানীয় মানুষ, কিছু লেখক, সমালোচক তাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হলেন। তখনো যশ-খ্যাতি পাননি গোর্কি। ১৮৯৮ সালে তাঁর প্রবন্ধ ও গল্প নিয়ে একটি ছোট সংকলন প্রকাশিত হল। নাম দেয়া হল ‘রেখাচিত্র ও কাহিনি’। এই বই প্রকাশের সাথে সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল গোর্কির নাম।

 

শুরু হল গোর্কির নতুন জীবন। তাঁর সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর বাবা ম্যাক্সিম পেশকভের বিশেষ কোন অবদান না থাকলেও মা ভার্ভারা’র অবদানকে কোন অংশেই খাটো করে দেখা যাবে না। যদিও অল্প বয়সে তাঁকে রেখে তাঁর বাবা মারা যান। বাবা মারা যাবার পর মার সাথে এসে আশ্রয় নিলেন মামার বাড়ি নিজনি নভোগরোদ শহরে। কিছুদিন পর স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করেন। ইতোমধ্যে মা ভার্ভারা আরেকজনকে বিয়ে করেছেন। ভদ্রমহিলা তার চেয়ে দশ বছরের ছোট এক অপদার্থকে বিয়ে করেন। পরের বিয়ে মোটেও সুখের হয়নি। এর কিছুদনি পরেই তিনি ক্ষয়রোগে মারা গেলেন। হঠাৎ করে মা মারা যাওয়ায় তাঁর ভরণপোষণের দায়িত্ব এসে পড়ল দাদার ওপর। দাদামশাই আর গোর্কির দায়িত্বভার নিতে চাইলেন না। মায়ের শেষকৃত্যের কয়েকদিন পরেই তাঁকে ডেকে বললেন, ‘‘তোমাকে এভাবে গলায় মেডেলের মতো ঝুলিয়ে রাখব তা তো চলতে পারে না। এখানে আর তোমার জায়গা হবে না। এবার তোমার দুনিয়ার ঘাটে বেরুনোর সময় হয়েছে।’’

 

সেই থেকে শুরু হল গোর্কির সংগ্রামমুখর নতুন জীবন। শহরের সদর রাস্তার উপর এক সৌখিন জুতোর দোকানের বয়। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম। পরিশ্রমকে তিনি পুরুষের অলঙ্কার স্বরূপ মনে করতেন। একদিন দোকানের চাকরি ছেড়ে দিলেন। যাদের নির্বাসন দেয়া হত তাদের সেই জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হত। জাহাজের কর্মচারীদের বাসন ধোয়ার কাজ ছিল গোর্কির। ভোর ছয়টা থেকে মাঝরাত অবধি কাজ। তারই ফাঁকে ফাঁকে দুচোখ ভরে দেখতেন নদীর অপরূপ রূপ। দুপারের গ্রামের দৃশ্য হিসাবপত্র মিটিয়ে হাতে আট রুবল নিয়ে ফিরে এলেন নিজের শহর নিজনি নভগরোদে।

বৈচিত্র্যতায় ভরপুর তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে একপেশা থেকে আরেক পেশায় ঘুরতে ঘুরতে বড় হয়ে উঠতে থাকেন গোর্কি। সবিছুর মধ্যেও বই পড়ার নেশা বেড়ে চলে। বইয়ের কোন বাদবিচার ছিল না। সর্বভূকের মতো যা পেতেন তাই পড়তেন। একদিন হাতে এল মহান রুশ কবি পুশকিনের একটি কবিতার বই। একনষ্ঠিভাবে পড়লেন। পড়তে পড়তে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন।

 

 

দুই

 

বিশ্ব যখন অস্থির সময় পার করছিল ঠিক তখন রাশিয়ায় চলছিল জারের রাজত্বকাল। দেশ জুড়ে চলছিল শাসনের নামে শোষণ অত্যাচার। বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত হয়েই গোর্কি পরিচিত হলেন মার্ক্সের রচনাবলির সাথে। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজনীতি, দর্শন, আরো আরো নানান বিষয়ের বই পড়তে আরম্ভ করলেন। দারিদ্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কিছুদিন পর একটি রুটির দোকানে কাজ পেলেন। সন্ধ্যে থেকে পরদিন দুপুর অবধি একটানা কাজ করতে হত। তারই ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন বই পড়তেন।

 

 

বাস্তমুখর জীবনের পরতে পরতে তিনি কষ্টকে, পরিশ্রমকে বন্ধুর মতোই নিত্য সঙ্গী হিশেবে দেখেছেন। তাঁর এই সময়কার জীবনে অভিজ্ঞতার কাহিনি অবলম্বনে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প ' ছাবিবশজন লোক আর একটি রুটি’। কারখানায় কাজ করার সময় পুলিশের সন্দেহ পড়েছিল তার ওপর। সুকৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতেন গোর্কি। হারভাঙা পরিশ্রম করতে করতে মনের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার ওপর যখন সন্দেহ অবিশ্বাস; নিজের ওপরেই সব বিশ্বাসটুকু হারিয়ে ফেলতেন।

 

মনে হত এই জীবন মূল্যহীন, বেঁচে থাকার কোন অর্থ নেই। এই মনে করেই তিনি বাজার থেকে একটি পিস্তল কিনলেন। ১৮৮৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর নদীর তীরে গিয়ে নিজের বুকে গুলি করলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তাররা জীবনের আশা ত্যাগ করলেও অদম্য প্রাণশক্তির জোরে বেঁচে যায় গোর্কি। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে তিনি যে প্রবাদপুরুষ তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 

 

এক বৃদ্ধ বিপ্লবী মাঝে মাঝে রুটির কারখানায় আসতেন।  সুস্থ হয়ে উঠতেই গোর্কিকে নিয়ে গেলেন নিজের গ্রামের বাড়িতে। ঘুরতে ঘুরতে এলেন নিজের ক্যাসপিয়ান সাগরের তীরে এক ছোট্ট শহরে। কোথাও বেশিদিন থাকতে মন চায় না। রেলে পাহারাদারির কাজ নিয়ে এলেন নিজের পুরনো শহর নিজনি নভগোরদে। এই সময়ে সে কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন। নাম দেন ’পুরনো ওকের গান’। দুজন বিপ্লবীর সাথে পরিচয় ছিল। সেইজন্য পুলিশ তাকে বন্দী করল।  কিন্তু প্রমাণের অভাবে অভাবে কিছুদিন পর তাকে ছেড়ে দিল। প্রায় দুবছর সেখানে রয়ে গেলেন।

 

পরবর্তীতে কুলঝানি নামক একভদ্রলোক তাঁকে নিয়ে গেলেন স্থানীয় পত্রিকা অফিসে। নিজের নাম সই করার সময় ’আলেক্সই পেশকভ’ এর পরিবর্তে লেখলেন ম্যাক্সিম গোর্কি। ম্যাক্সিম শব্দের রুশ অর্থ হল তিক্ত। গল্পটি প্রকাশিত হল ১৮৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এই গল্পে বাস্তবতার চেয়ে রোমান্টিকতার প্রভাবই বেশি ছিল। ‘এমিলিয়ান পিলিইয়াই’ গল্প পড়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সাহিত্যিক ভ্লাদিমির গালাক্কিওনচিভচ করলিয়েনক উৎসাহ দেবার পর ’চেলকাশ’ গল্প যখন কাগজে বেরুল তখন গোর্কিকে তিনি সাংবাদিকতার চাকরির প্রস্তাব দেন: সামারার একটি বড় কাগজে চাকরি, মাস গেলে ১০০ রুবল আসবে। গোর্কিও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন।

 

তিফলিস শহর থেকে প্রকাশিত ‘কাফকাজ’ (অর্থাৎ ককেশাস) দৈনিক সংবাদপত্রে ১৮৯২-এর ১২ই সেপ্টেম্বর শনিবার একটি গল্প ছাপা হল: মাকার্ চুদ্রা। লেখকের নাম ম. গোর্কি। এরপর অনেক পত্রিকায় ক্রমে ক্রমে লেখা ছাপা হতে থাকে – যেমন ভোলগা সংবাদপত্র, দৈনিক সামারা, ওদেসা সংবাদ, নিঝেগরোদ পত্র ইত্যাদি। ১৯১৫ সালে তিনি নিজেই লিয়েতপিস (কড়চা) পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ১৯২১ থেকে তাঁর সম্পাদনায় বেরুনো শুরু হয়।

তাঁর রচনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গেয়র্ক লুকাচ বলেন- ‘‘লেখক হিশেবে গোর্কি সর্বদাই তাঁর সমকালীন ঘনাবলীর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন এবং নিজের রচনার মধ্যে এমন ভেদরেখা টেনে দেননি যাতে কতটুকু একজন সাহিত্যিকের লেখা আর কতটুকু এক বিপ্লবী সাংবাদিক ও প্রচারকর্মীর তা ধরা যায়। সত্য এর বিপরীতটাই। তাঁর মহত্তম সাহিত্যকীর্তি সর্বদা সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে উত্থিত হয়েছে।

                                                                       – (মুক্তিদাতা, য়োরোপীয় বাস্তববাদ বিবেচনা)

তাঁর অন্যান্য গল্পগন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- 

মানুষের জন্ম (১৮৯২)

বুড়ি ইজরেগিল (১৮৯৪)

চেলকাশ (১৮৯৪)

কনভালভ (১৮৯৫)

বোলেসস্নভ (১৮৯৬)

ঝড়োপাখির গান (১৯০১)

 

তাঁর গল্পগুলোতে তাঁর নিজস্ব ঢঙের ছাপ রয়েছে। সরাসরি ব্যক্তি মানসের প্রভাবকেও তাঁর গল্পে অস্বীকার করা যায় না। সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের বই তিনি পড়তেন কিন্তু তাদের হুবহু অনুসরণ করতেন না। সাহিত্যিকদের দুভাগে ভাগ করা যায়। এক . মেজর সাহিত্যিক

                            দুই . ননমেজর সাহিত্যিক

প্রধান সাহিত্যিকরা কারো নির্দেশিত পথে চলেন না। তাঁরা নিজেরা সাহিত্যের নতুন পথ সৃষ্টি করে নেন। তা যেমন হতে পারে প্রকরণে, বিষয়বস্তুতে তেমনি আঙ্গিকে। গোর্কি মেজর সাহিত্যিক। প্রতিটি রচনার মধ্যেই তাঁর সে ছাপ রয়েছে। সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোকে অনেকটা রঙ্গ-ব্যাঙ্গের মাধ্যমে নিজস্ব ঢঙে তাঁর গল্পের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর এখানেই গোর্কির নিজস্বতা লুকায়িত। কালের আয়নায় সে নিখুঁত গল্পগুলোর আবেদন নিঃসন্দেহে দীর্ঘস্থায়ী

 

জগৎবিখ্যাত এই  সাহিত্যিক ১৯২১ সালে যক্ষায় আক্রমণ হন। লেনিন তাকে চিকিৎসার জন্য জার্মানি পাঠান। দু বছর সেখানে কাটিয়ে ১৯২৪ সালের এপ্রিলের প্রথমে গেলেন তাঁর প্রিয় জায়গা ক্যাপ্রিতে, পরে সেখান থেকে সোরেন্তো  ফেরেন ১৯২৮-এ। অসুখ ভালোমতো সারে না। চিকিৎসারত অবস্থায় আটষট্টি বছর বয়সে ১৯৩৬-এর ২৮ জুন তিনি আকস্মিকভাবে মারা যান।

 

মুনশি আলিম

পূর্ব শিবগঞ্জ, সিলেট।

ইমেইল: munshialim1@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.