«

»

Mar ১৬

আস্তিকরা নাস্তিকদের সাথে বিতর্কে জড়াবেন কখন ও কীভাবে?

কেন লিখছিঃ কেস স্টাডি

প্রায়শই ফেইসবুকে অনেকেই আমাকে ম্যাসেজ করে যে, “পিয়াল ভাই, অমুক অমুক প্রশ্নের জবাব কি হবে?” যদি প্রশ্নগুলো আহামরি কঠিন হতো, তবে বুঝতাম হয়ত তিনি কঠিন একটা সুক্ষ্ম ব্যপারে আটকে গেছেন। কিন্তু অধিকাংশ প্রশ্নই এতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ সহজ-সাধারণ হয় যে, ভাবতে শঙ্কা হয়, কোন দুঃসাহসে সে এমন এক টপিকে তর্কে লিপ্ত হয়েছে যে, তার প্রাথমিক ধারনাটি বা সাধারণ জবাবটিও জানা নেই! তারা জানে না বিতর্ক করতে হলে কী কী বিষয় জানতে হবে, কী কী বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হয়, কীভাবে বিতর্ক শুরু করতে হবে, কোথা থেকেই বা শুরু করা দরকার! অথচ তাদের আছে কেবলমাত্র প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি এবং আত্মবিশ্বাস। মনে রাখা দরকার যে, জেনে-শুনে-পড়ালেখা করেই বিতর্ক করতে হয়। আর পড়ালেখা আর জানাই হলো আত্মবিশ্বাসের পূর্বশর্ত। নাস্তিকেরা যখন আস্তিকের সাথে বিতর্কে জড়াতে চায়, তখন আমরা কিভাবে সেটার মোকাবেলা করতে পারি, এটা জানা না থাকলে কিভাবে চলবে? গত চার বছরের অভিজ্ঞতার আলোকেই বলার চেষ্টা করব।

 

কী কী বিষয় জানা জরুরী?

জানার কোনো বিকল্প নেই। কিছু কিছু বিষয় অবশ্যই জানা থাকতে হবে। যেমন- (১) তর্ক-বিতর্ক কী? (২) তার জন্য প্রস্তুতি কিভাবে নিতে হবে? (৩) প্রতিপক্ষের প্রশ্নের জবাব কিভাবে উপস্থাপন করবেন? (৪) যুক্তি, ভ্রান্তযুক্তি এবং হেত্বাভাস কী? (৫) যুক্তি প্রয়োগ এবং যুক্তি খন্ডন, (৬) বিভিন্ন তত্ত্ব, তথ্য জানা এবং যথাযথ স্থানে প্রয়োগ করা- ইত্যাদি।

 

কী কী বিষয় শুনতে পারেন!

একজন ভাল বক্তা মাত্রই একজন ভাল স্রোতাও। তাই তাকে কিছু কিছু বিষয় শুনতে হবে। যেমন- (১) হক্কানী ওলামায়ে কিরামগণের ওয়াজ মাহফিল, (২) তাফসির মাহফিল, (৩) দুই গ্রুপের বাহাস, (৪) বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান, (৫) টক-শো শোনা, (৬) ইউ-টিউবে কিংবা সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোতে বিভিন্ন টপিকের উপর ভিডিও, (৭) ডকুমেন্টারী, (৮) (যাদের টিভি দেখার অভ্যাস আছে) বিভিন্ন শিক্ষামূলক চ্যানেল: যেমন- ডিসকভারী, হিস্টোরী চ্যানেল প্রভৃতি!

 

কী কী পড়া উচিত?

ছাত্রজীবনে লেখাপড়া করুন বা না-ই করুন, বিতর্ক করতে হলে অবশ্যই লেখাপড়া করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। নিয়মত প্রচুর লেখাপড়া করতে হবে। যেমন- (১) বিষয়ভিত্তিক বই বা ম্যাগাজিন বা মাসিক পত্রিকা, (২) দৈনিক পত্রিকা, নিয়মিত একটি পত্রিকা পড়া উচিত, পারলে তার পাশাপাশি আরো কিছু দেখা যেতে পারে! (৩) গল্প, প্রবন্ধ, জার্নাল (৪) ব্লগ, ফেইসবুক স্ট্যাটাস, বিভিন্ন ওয়েবসাইট প্রভৃতি।

 

বিতর্ক কেন হয়?

(১) মানুষের জানার আগ্রহ, (২) মেনে না নেওয়ার দৃঢ়দা, (৩) নিজের মতামত ব্যক্ত করার পাশাপাশি তা প্রতিষ্ঠিত করার একান্ত ইচ্ছা, (৪) কিছু একটা বলবার প্রয়াস, (৫) অনুগত না হওয়ার প্রবল প্রত্যয়ই বিতর্কের ইন্ধ জোগায়।

 

বক্তা ও বিতার্কিকের মধ্যে পার্থক্যঃ

বক্তা ও বিতার্কিকের মধ্যে রয়েছে। বিতার্কিক মাত্রই বক্তা, কিন্তু বক্তা মাত্রই বিতার্কিক নাও হতে পারেন।

 

তর্ক ও বিতর্কের মধ্যে পার্থক্যঃ

তর্ক ও বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। তর্ক হয় ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, আর বিতর্ক হয় এক দলের সাথে আরেক দলের।

 

তর্ক-বিতর্কের শৈল্পিক আবেদন!

তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে শাণিত যুক্তির অবারিত প্রবাহ, শব্দচয়ন শৌকর্য, শব্দের সুন্দর ব্যবহার, চিন্তার শুদ্ধ প্রকাশ, নির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন বা নিজহস্ব পদ্ধতি নির্মান, বাবনার বৈচিত্র বা চিন্তার বহুমাত্রিকতা, নিজস্ব উপস্থাপন শৈলির মধ্যেই রয়েছে শৈল্পিক আবেদন।

 

বিতর্কের ইতিবাচক দিকঃ

চেতনাকে জাগ্রত করে, চিন্তাকে উদ্দীপ্ত করে, মনকে আলোড়িত করে, জীবন-জগত সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়, যৌক্তিক বোধের শুদ্ধ প্রকাশ ঘটায়।

 

বিতর্কের নেতিবাচক দিকঃ

যুক্তির দুর্বলতার কারণে কিংবা যুক্তির মারপ্যাচে ফেলে একটি অনৈতিক বিষয়কেও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। আপনি হয়ত বুঝতে পারবেন যুক্তি দেখানো হচ্ছে বটে, যুক্তিগুলো শুনতেও চমৎকার লাগছে, কিন্তু আসলেই বিষয়টা অনৈতিক। কিন্তু উপস্থাপনার জন্য সেটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাচ্ছে কেবল মাত্র যুক্তির কাধে সওয়ার হয়ে! তখন বুঝতে হবে, যুক্তি আছে বটে তবে এখানে নেই নীতিবোধ কিংবা নান্দনিকতা! যুক্তিঃ সত্যকে জানতে হলে দরকার যুক্তি। নান্দনিকতাঃ সুন্দরকে জানতে হলে প্রয়োজন নান্দনিকতার। নীতিবোধঃ কল্যানময় জীবনের জন্য কাম্য সমুন্নত নীতিবোধ। এই তিনের সমন্বয় না ঘটলে বিতর্কের ফলাফল নেতিবাচক হতে বাধ্য।

 

বিতর্কের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত?

প্রকৃত সত্যের অনুসন্ধানই বিতর্কের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

 

প্রশ্নঃ

মানুষের জানার আগ্রহ থেকেই প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রশ্ন আমাদের ভাবায়, জানতে আগ্রহী করে, সত্যকে চিনতে বা উপলব্ধি করতে শেখায়। সঠিক প্রশ্ন করাটাও একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়। জন হেউড নামক এক মনিষী বলেছেনঃ “অজ্ঞ লোকেরা সচেতনভাবে প্রশ্ন করতে পারে না।” হযরত আলী (রা.) বলেছিলেনঃ “প্রশ্নই হলো জ্ঞানের কুঞ্জি।” প্রশ্নই অন্ধ এবং বন্ধ মনের জানালা খুলে দিতে পারে।

 

বিতর্ক শুরু এবং প্রস্তুতিঃ

শুরুটা যদি ভাল হয়, তেব অর্ধে কাজ হয়ে যায়। ইংরেজীতে একটা কথা আছে- “Well begun is half done.” চিন্তার বহুমাত্রিকতা, যুক্তির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, তথ্যসূত্র উপস্থাপন, যুক্তি খন্ডনে বুদ্ধিদীপ্ততা-ই হলো প্রকৃত প্রস্তুতি।

 

“কথার জবাব হোক কথা দিয়েই”

অ্যারিস্ততল বলেছিলেনঃ "If it is a disgrace to a man when he cannot defend himself in a bodily way, it would be absurd not to think him disgraced when he cannot defend himself with reason in a speech." (Aristotle from The Rhetoric)

 

জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেনঃ "I have always dated from these conversations my own real inauguration as an original and independent thinker." (John Stuart Mill's Autobiography, Paragraph 71)

 

জন এফ কেনেডী বলেছিলেনঃ "A good debater must not only study material in support of his own case, but he must also, of course, thoroughly analyze the expected argument of his opponent." (John F. Kennedy, August 22, 1960)

 

আজ আপাতত এই পর্যন্তই। ইনশা’আল্লাহ্ আগামী পর্বে আরো আলোচনা করার ইচ্ছে রইলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.